📄 কিয়ামুল লাইল
মদিনায় রাত নেমে এসেছে। রাত্র তার কালো চাদর দিয়ে মদিনা শহরকে ঢেকে দিয়েছে। সকল মানুষ যার যার ঘরে গিয়ে বিছানায় আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ বিছানায় আশ্রয় নেননি, তিনি ঘুমাননি, তিনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, নামায আদায় করছেন, আল্লাহর জিকির করছেন, তাঁর নিকট কাকুতি মিনতি করে দো'আ করছেন। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা তাকে এই আদেশ দিয়েছেন, আল্লাহ তা'আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا نِصْفَهُ أَوِ انْقُصْ مِنْهُ قَلِيلًا أَوْ زِدْ عَلَيْهِ وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا
হে বস্ত্রাবৃত! রাত্রিতে দন্ডায়মান হোন কিছু অংশ বাদ দিয়ে; অর্ধরাত্রি অথবা তদপেক্ষা কিছু কম অথবা তদপেক্ষা বেশি এবং কোরআন আবৃত্তি করুন সুবিন্যস্তভাবে ও স্পষ্টভাবে।
হাদিস শরীফে এসেছে, আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
كَانَ رَسُولُ اللهِ - صلى الله عليه وسلم - يُصَلِّي حَتَّى تَوَرَّمَتْ قَدَمَاهُ فَقِيلَ لَهُ إِنَّ اللَّهَ قَدْ غَفَرَ لَكَ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ . قَالَ " أَفَلَا أَكُونُ عَبْدًا شكُورًا " .
রাসূলুল্লাহ ﷺ (দীর্ঘক্ষণ ধরে) নামায পড়তে থাকতেন, এমনকি তাঁর পা দু'টো ফুলে যেতো। তাঁকে বলা হলো, আল্লাহ আপনার পূর্বাপর সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন (তাহলে আপনি নিজেকে কেন এত কষ্টপ্রদান করছেন ?)৷ তিনি বলেন, আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না?
আসওয়াদ ইবনে ইয়াযিদ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আয়েশা রা.কে রাসূলুল্লাহ এর রাতের নামায সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন,
سَأَلْتُ عَائِشَةَ - رضى الله عنها - كَيْفَ صَلاةُ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم بِاللَّيْلِ قَالَتْ كَانَ يَنَامُ أَوَّلَهُ وَيَقُومُ آخِرَهُ، فَيُصَلِّي ثُمَّ يَرْجِعُ إِلَى فِرَاشِهِ، فَإِذَا أَذَّنَ الْمُؤَذِّنُ وَثَبَ، فَإِنْ كَانَ بِهِ حَاجَةُ اغْتَسَلَ، وَإِلَّا تَوَضَّأَ وَخَرَجَ.
তিনি রাতের প্রথমাংশে ঘুমাতেন, শেষাংশে জেগে নামায আদায় করতেন। এরপর তাঁর শয্যায় ফিরে যেতেন, মুয়ায্যিন আযান দিলে দ্রুত উঠে পড়তেন, তখন তাঁর প্রয়োজন থাকলে গোসল করতেন, অন্যথায় ওজু করে (মসজিদের দিকে) বেরিয়ে যেতেন।
রাসূলুল্লাহ রাতে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে নামায আদায় করতেন। তাঁর রাতের নামায ছিলো অনেক আশ্চর্যজনক।
হাদিস শরীফে এসেছে, হুজাইফা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
صَلَّيْتُ مَعَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم ذَاتَ لَيْلَةٍ فَافْتَتَحَ الْبَقَرَةَ فَقُلْتُ يَرْكَعُ عِنْدَ الْمِائَةِ . ثُمَّ مَضَى فَقُلْتُ يُصَلِّي بِهَا فِي رَكْعَةٍ فَمَضَى فَقُلْتُ يَرْكَعُ بِهَا . ثُمَّ افْتَتَحَ النِّسَاءَ فَقَرَأَهَا ثُمَّ افْتَتَحَ آلَ عِمْرَانَ فَقَرَأَهَا يَقْرَأُ مُتَرَسِّلاً إِذَا مَرَّ بِآيَةٍ فِيهَا تَسْبِيحُ سَبَّحَ وَإِذَا مَرَّ بِسُؤَالٍ سَأَلَ وَإِذَا مَرَّ بِتَعَوذ تَعَوَّذَ ثُمَّ رَكَعَ فَجَعَلَ يَقُولُ " سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ " . فَكَانَ رُكُوعُهُ نَحْوًا مِنْ قِيَامِهِ ثُمَّ قَالَ " سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ " . ثُمَّ قَامَ طَوِيلاً قَرِيبًا مِمَّا رَكَعَ ثُمَّ سَجَدَ فَقَالَ " سُبْحَانَ رَبِّي الأَعْلَى " ، فَكَانَ سُجُودُهُ قَرِيبًا مِنْ قِيَامِهِ . قَالَ وَفِي حَدِيثِ جَرِيرٍ مِنَ الزَّيَادَةِ فَقَالَ " سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ".
এক রাতে আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে নামায আদায় করছিলাম। তিনি সূরা বাকারা শুরু করলেন, আমি মনে করলাম সম্ভবত একশত আয়াতের মাথায় রুকু করবেন। কিন্তু তিনি অগ্রসর হয়ে গেলেন। তখন আমি ভাবলাম, তিনি সূরা বাকারা দিয়ে সালাত পূর্ণ করবেন। কিন্তু তিনি সূরা নিসা আরম্ভ করলেন এবং তাও পড়ে আল ইমরান শুরু করে তাও পড়ে ফেললেন। তিনি ধীর-স্থিরতার সাথে পাঠ করে যাচ্ছিলেন। যখন তাসবীহ যুক্ত কোন আয়াতে উপনীত হতেন তখন তাসবীহ (সুবহানাল্লাহ) পাঠ করতেন এবং যখন প্রার্থনার কোন আয়াতে উপনীত হতেন তখন তিনি প্রার্থনা করে নিতেন। আর যখন (আল্লাহর কাছে) আশ্রয় গ্রহণের আয়াতে পৌঁছতেন তখন (আল্লাহর কাছে) পানাহ চাইতেন। তারপর রুকু করলেন এবং রুকুতে سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ (আমার মহান প্রতিপালকের পবিত্রতা ঘোষণা করছি), বলতে থাকেন। তার রুকু ছিল প্রায় তার দাঁড়ানোর সমান (দীর্ঘ)। এরপর বললেন, سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ (যে ব্যাক্তি আল্লাহর প্রশংসা করে আল্লাহ তা শোনেন)। তারপর দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকলেন রুকুতে যতক্ষণ ছিলেন তার কাছাকাছি। তারপর সিজদা করলেন এবং سُبْحَانَ رَبِّي الْأَعْلَى (আমার সুমহান প্রতিপালকের পবিত্রতা ঘোষণা করছি), বললেন। তাঁর সিজদার পরিমাণ ছিলো তার দাঁড়ানোর কাছাকাছি। বর্ণনাকারী বলেন, জারীর (রহঃ) এর হাদীসে অতিরিক্ত রয়েছে যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدِ (যে ব্যাক্তি আল্লাহর প্রশংসা করে, তিনি তা শোনেন। আমাদের প্রতিপালক! আপনারই জন্য সকল প্রশংসা)
টিকাঃ
৭৯ সূরা মুযাম্মিল, আয়াত: ১-৪
৮০ বুখারি, হাদিস: ১১৩০; ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৪১৯
৮১ বুখারী
৮২ মুসলিম, হাদিস: ৭৭২; আহমদ, হাদিও পার
📄 ফজরের পর
মদিনার রাত্র যখন তার কালো চাদর উঠিয়ে ফেলতো, ফজর আলোকিত হতো। মসজিদে গিয়ে জামাতের নামায আদায়ের পর রাসূলুল্লাহ ﷺ সূর্যদয় পর্যন্ত মসজিদেই বসে বসে আল্লাহর জিকির করতেন। সূর্যোদয়ের পর তিনি দুই রাকাত নামায আদায় করতেন। জাবের ইবনে সামুরা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
أَن النَّبِيَّ - صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - كَانَ إِذَا صَلَّى الْفَجْرَ جَلَسَ فِي مُصَلَّاهُ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ حَسَنًا
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামায আদায় করে জায়নামাযেই বসে থাকতেন, ভালোভাবে সূর্য উদিত হওয়া পর্যন্ত।
ফজরের নামাযের পর জায়নামাযে বসে আল্লাহর জিকির করা, অতঃপর দুই রাকাত নামায আদায়ের মধ্যে অনেক ফজিলত রয়েছে। আর একারণেই রাসূলুল্লাহ ﷺ উম্মতকে এই মহান সুন্নত আদায় করার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেছেন, যাতে তারা এই প্রতিদান আর্জন করতে পারে। আনাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
مَنْ صَلَّى الْفَجْرَ فِي جَمَاعَةٍ، ثُمَّ قَعَدَ يَذْكُرُ اللهَ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ، كَانَتْ لَهُ كَأَجْرِ حَجَّةٍ وَعُمْرَةٍ، تَامَّةٍ، تَامَّةٍ، تَامَّةٍ
যে ব্যক্তি জামাতের সাথে ফজর নামায আদায় করার পর সূর্যোদয় পর্যন্ত বসে বসে আল্লাহর জিকির করে অতঃপর দুই রাকাত নামায আদায় করে। তার একটি পূর্ণ হজ ও উমরার সাওয়াব হয়। পরিপূর্ণ, পরিপূর্ণ, পরিপূর্ণ।
টিকাঃ
৮৩ মুসলিম, হাদিস: ৬৭০
৮৪ তিরমিযী, হাদিস: ৫৮৬
📄 সালাতুদ দুহা বা চাশতের নামায
দ্বিপ্রহর হবে হবে ভাব, সূর্যের উত্তাপ প্রখর হয়ে উঠেছে। তাপে মুখ পুড়ে যাবার উপক্রম। এটাই হলো সালাতুদ দুহা বা চাশতের সময়। এই সময়টা কাজের সময়, প্রয়োজন পূরণের সময়। কাঁধে রিসালাতের ভারি বুঝা, বিভিন্ন প্রতিনিধি দলের সাথে সাক্ষাৎ, সাহাবাদের তালিম দেওয়া, এবং পরিবারের দায়িত্ব আদায় করা এসব কিছুর মধ্যেও রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহ তা'আলার ইবদত-বন্দেগীতে মাশগুল থাকতেন পূর্ণভাবে। এত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি সালাতুদ দুহা তথা চাশতের নামায আদায় করতেন। মুআজাহ রা. বলেন,
قلت لعائشة رضي الله عنها: أكان النبي - صلى الله عليه وسلم - يصلي الضحى؟ قالت: «نعم أربع ركعات ويزيد ما شاء الله عز وجل
আমি আয়েশা রা.কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি চাশতের নামায আদায় করতেন? তিনি বলেন, হ্যাঁ চার রাকাত নামায আদায় করতেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় বেশিও আদায় করতেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ সালাতুদ দুহা তথা চাশতের নামায আদয়ের ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং সাহাবাদেরও তা পড়ার ওসিয়ত করেছেন। আবূ হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
أوصاني خليلي - صلى الله عليه وسلم - بصيام ثلاثة أيام من كل شهر، وركعتي الضحى، وأن أوتر قبل أن أرقد
আমার বন্ধু আমাকে প্রতি মাসে তিন দিন রোযা রাখা, চাশতের সময় দুই রাকাত নামায আদায় করা এবং ঘুমের পূর্বেই বিতর নামায আদায়ের অসিয়ত করেছেন।
টিকাঃ
৮৫ মুসলিম, হাদিস: ৭১৯
৮৬ বুখারী, হাদিস: ১৯৮১; মুসলিম, হাদিস: ৭২১
📄 ঘরে নফল নামায আদায় করা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ঘর ছিল ঈমান দ্বারা নির্মিত এবং তা ছিলো, ইবাদত বন্দেগী ও জিকির আজকারের মাধ্যমে পূর্ণ। ইবাদত ও আল্লাহর জিকিরহীন ঘর হলো মৃত কবরের মত। রাসূলুল্লাহ আমাদেরকে আদেশ করেছেন, আমরা যেন আমাদের ঘরে নামায আদায় করি এবং তাকে কবরে পরিণত না করি। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
اجعلوا في بيوتكم من صلاتكم ولا تتخذوها قبورًا
তোমরা তোমাদের ঘরে নামায (নফল নামায) আদায় করো এবং তাকে তোমরা কবরে পরিণত করো না।
ইবনে কাইয়্যুম রহ. বলেন, রাসূলুল্লাহ কোন কারণ ছাড়া সকল সুন্নত ও নফল নামায বাড়িতে আদায় করতেন। বিশেষ করে মাগরিবের সুন্নত। মাগরিবের সুন্নত তিনি কখনো মসজিদের পড়েছেন এমন কোন বর্ণনা নেই।
ঘরে নফল নামায পড়ার অনেক ফায়দা রয়েছে,
* সুন্নতের অনুসরণ।
* এর মাধ্যমে ঘরের মহিলা ও শিশুদের নামাযের কাইফিয়াত শিক্ষা দেওয়া হয়।
* জিকির ও কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে ঘর থেকে শয়তান দূর হয়।
* লৌকিকতা ও অহংকার মুক্ত থাকা যায়।
টিকাঃ
৮৭ বুখারী, হাদিস: ৪৩২