📘 রাসূল ﷺ এর বাড়িতে একদিন 📄 রাসূল ﷺ এর কন্যাগণ

📄 রাসূল ﷺ এর কন্যাগণ


জাহেলিয়‍্যাতের যুগে কন্যা সন্তানের জন্মের দিনটি ছিলো পিতা-মাতার জন্য এক কালো শোক দিবস। বরং কন্যা সন্তানের জন্ম ছিলো পুরো পরিবার এবং বংশের জন্য লজ্জা ও কলঙ্কের। ঐ সমাজে কন্যা সন্তান জন্মের লজ্জা ও কলঙ্ক থেকে বাঁচার জন্য তারা মেয়েদের জীবন্ত মাটিতে পুঁতে হত্যা করতো।

আর তাদেরকে জীবন্ত পুঁতে ফেলার কর্মটিও সম্পাদন করতো অত্যন্ত কুৎসিত ও নির্দয়ভাবে। এজন্য তাদের মনে থাকতো না কোন ধরণের দয়া ও সহানুভূতি। কন্যা সন্তানকে জীবন্ত পুঁতে ফেলা হতো। আর তারা এই অপরাধ কর্মটি সম্পাদন করতো বিভিন্ন নির্মম পদ্ধতিতে।

যেমন কেউ কেউ মেয়েকে বড় হতে দিতো। অতঃপর তার বয়স যখন সাত বছর হতো তখন বাবা তার মাকে বলতো। তাকে সুন্দর করে সাজিয়ে সুগন্ধি মেখে প্রস্তুত করে দাও। আমি তাকে নিয়ে আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে যাবো। অন্য দিকে সে মরুভূমিতে আগ থেকেই গর্ত খুঁড়ে আসতো। অতঃপর সে যখন মেয়েকে নিয়ে সেই কূপের কাছে আসতো তখন তাকে বলতো, তুমি দেখো তো তাতে কী আছে। মেয়ে যখন কূপের দিকে তাকাতো তখন পিছন থেকে ধাক্কা দিয়ে তাকে ভিতরে ফেলে দিতো, এবং খুব হিংস্র ও নির্দয়ভাবে তাকে মাটি চাপা দিতো।

এই জাহেলী সমাজেই নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্য ও ইনসাফের দ্বীন নিয়ে এলেন। যেই ধর্ম নারীকে মর্যাদা দিয়েছে, একজন মা হিসেবে, কন্যা হিসেবে, বোন হিসেবে, ফুফু ও খালা হিসেবে এবং একজন স্ত্রী হিসেবে। সেই জাহেলী সমাজে রাসূলুল্লাহ তাঁর কন্যাদের দিয়েছেন আন্তরিক ভালোবাসা এবং পূর্ণ মর্যাদা। সেই ভালোবাসা ও মর্যাদার একটা চিত্র দেখুন।

মেয়ে ফাতেমা রা. যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট আসতেন তখন তিনি সস্থান থেকে উঠে সামনে এগিয়ে গিয়ে তাকে স্বগত জানাতেন এবং তার হাত ধরে তাতে চুমু খেতেন এবং নিজ স্থানে তাকে নিয়ে বসাতেন। অন্য দিকে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও যখন ফাতেমা রা. এর বাড়িতে আসতেন তখন তিনি উঠে গিয়ে তাঁর হাত ধরে তাতে চুমু খেতেন এবং নিজ আসনে নিয়ে তাঁকে বসাতেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কন্যাদের সীমাহীন ভালোবাসলেও দ্বীনের উপর কখনই তিনি তাদেরকে প্রাধান্য দিতেন না। তার একটি নমুনা দেখুন। দ্বীনের দাওয়াত বন্ধ করার জন্য মক্কার মুশরিকরা যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর উপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করতে লাগলো। তারা তাকে শারীরিক ও মানষিক ভাবে কষ্ট দিতে লাগলো। যারা রাসূলুল্লাহ কে বিভিন্নভাবে কষ্ট দিতো তাদের মধ্যে সামনের কাতারে থেকে নেতৃত্ব দানকারী লোকগুলোর মধ্যে তাঁর আপন চাচা আবু লাহাব ছিল অন্যতম।

আবু লাহাবের ধ্বংসের ব্যাপারে কুরআনে আয়াত নাযিল হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত এবং ধ্বংস হোক সেও। আবু লাহাবের দুই ছেলে উতবা ও উতাইবার সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দুই কন্যা উম্মে কুলসুম এবং রুকায়‍্যার বিয়ে হয়। কোরাইশরা রাসূলুল্লাহ ﷺ কে দ্বীনের দাওয়াত বন্ধ না করলে তাঁর মেয়েকে তালাক দেওয়ার হুমকি দিলো এবং তাদের তালাক দিয়ে দিলো。

রাসূলুল্লাহ অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে এই বিপদ মেনে নিলেন এবং মজবুত পাহাড়ের ন্যায় দ্বীনের দাওয়াতের ক্ষেত্রে অটল রইলেন।

মেয়েদের প্রতি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ভালোবাসা এবং তাদের জন্য আনন্দিত হওয়ার আরেকটা উদাহরণ। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
كنا أزواج النبي - صلى الله عليه وسلم - عنده، فأقبلت فاطمة رضي الله عنها تمشي ما تخطيء مشيتها من مشية رسول الله - صلى الله عليه وسلم - شيئًا فلما رآها رحب بها وقال: مرحبا بابنتي ثم أجلسها عن يمينه أو عن شماله

একবার আমরা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রীরা তাঁর নিকট বসা ছিলাম। তখন ফাতেমা রা. আসলেন। তাঁর হাঁটা ছিলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাঁটার মত। তিনি যখন তাকে দেখলেন, তখন তাকে অভিনন্দন জানালেন, এবং বললেন, “মেয়ে আমার! অভিনন্দন তোমাকে”। অতঃপর তাকে তাঁর ডান অথবা বাম পাশে বসালেন।

রাসূলুল্লাহ তাঁর মেয়েদের ভালোবাসতেন, আদর করতেন। কিন্তু দ্বীনের ক্ষেত্রে তাদেরকে সামন্যতমও ছাড় দিতেন না এবং তাদের দুনিয়াকে আখেরাতের উপর প্রাধান্য দিতে দিতেন না। তিনি সর্বদাই চাইতেন তাঁর কলিজার টুকরো কন্যারা যেন আখেরাতে সুখে থাকে। তাদের আখেরাত যেন হয় অনেক সুন্দর ও শান্তির। বিষয়টিকে আমরা সামনের ঘটনা থেকেই বুঝতে পারবো। সাথে সাথে ঘটনাটি থেকে আমরা আরো বুঝতে পারবো যে, রাসূলুল্লাহ কন্যাদের বিভিন্ন প্রয়োজনে তাদের বাড়ি যেতেন এবং তাদের খোঁজ খবর নিতেন। আলী রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,

أَنَّ فَاطِمَةَ - عَلَيْهِمَا السَّلامُ - شَكَتْ مَا تَلْقَى فِي يَدِهَا مِنَ الرَّحَى، فَأَتَتِ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم تَسْأَلُهُ خَادِمًا، فَلَمْ تَجِدْهُ ، فَذَكَرَتْ ذَلِكَ لِعَائِشَةَ، فَلَمَّا جَاءَ أَخْبَرَتْهُ. قَالَ فَجَاءَنَا وَقَدْ أَخَذْنَا مَضَاجِعَنَا، فَذَهَبْتُ أَقُومُ فَقَالَ " مَكَانَكِ ". فَجَلَسَ بَيْنَنَا حَتَّى وَجَدْتُ بَرْدَ قَدَمَيْهِ عَلَى صَدْرِي فَقَالَ " أَلَا أَدُلُّكُمَا عَلَى مَا هُوَ خَيْرٌ لَكُمَا مِنْ خَادِمٍ، إِذَا أَوَيْتُمَا إِلَى فِرَاشِكُمَا، أَو أَخَذْتُمَا مَضَاجِعَكُمَا، فَكَبِّرًا ثَلَاثًا وَثَلاثِينَ، وَسَبِّحَا ثَلاثًا وَثَلاثِينَ، وَاحْمَدًا ثَلاثًا وَثَلَاثِينَ، فَهَذَا خَيْرٌ لَكُمَا مِنْ خَادِمٍ ". وَعَنْ شُعْبَةَ عَنْ خَالِدٍ عَنِ ابْنِ سِيرِينَ قَالَ التَّسْبِيحُ أَرْبَعُ وَثَلَاثُونَ.

একবার গম পেষার যাঁতা ঘুরানোর কারণে ফাতেমা রা. এর হাতে ফোস্কা পড়ে গেলো। তখন তিনি একটি খাদেম চেয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এলেন। কিন্তু তিনি তাঁকে পেলেন না। তখন তিনি আসার উদ্দেশ্যটি আয়েশা (রাঃ) এর নিকট ব্যক্ত করে গেলেন। এরপর তিনি যখন গৃহে ফিরলেন তখন আয়েশা (রাঃ) এ বিষয়টি তাঁকে জানালেন। তারপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে এমন সময় আগমন করলেন যখন আমরা বিছানায় বিশ্রাম গ্রহণ করেছি। তখন আমি উঠতে চাইলে তিনি বললেন, নিজ স্থানেই অবস্থান করো। তারপর আমাদের মাঝখানেই তিনি এমনিভাবে বসে গেলেন যে, আমি তার দু'পায়ের শীতল স্পর্শ আমার বুকে অনুভব করলাম। তিনি বললেন, আমি কি তোমাদের এমন একটি আমল বলে দেব না, যা তোমাদের জন্য একটি খাদেমের চেয়েও অধিক উত্তম। যখন তোমরা শয্যা গ্রহণ করতে যাবে, তখন তোমরা আল্লাহু আকবার ৩৩ বার, সুবহানাল্লাহ ৩৩ বার, আলহামদুলিল্লাহ ৩৩ বার পড়বে। এটা তোমাদের জন্য একটি খাদেমের চেয়েও অধিক কল্যাণকর। ইবনু সীরীন (রহ.) বলেনঃ তাসবীহ হলো ৩৪ বার।

রাসূলুল্লাহ এর প্রতিটি বিষয়ই তো আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। সন্তান হারানোর পর ধৈর্য ধারণ করার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ কে উত্তম আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করবো। একমাত্র ফাতেমা রা. ব্যতীত তাঁর সকল পুত্র ও কন্যা সন্তানের ইন্তেকাল হয় তাঁর জীবদ্দশায়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ আল্লাহ তা'আলার ফায়সালার উপর পরিপূর্ণ ধৈর্য ধারণ করেন। তিনি কোন ধরণের বিলাপ করেননি, চিৎকার চেঁচামেচি করেননি, মাটিতে হাত মুখ চাপরাননি এবং বিলাপ করতে করতে নিজের জামা কাপড় ছিরে ফেলেননি। বরং তিনি আল্লাহ তা'আলার ফায়সালার উপর সন্তুষ্ট থেকে উত্তমভাবে ধৈর্য ধারণ করেছেন। বিপদগ্রস্ত ও দুঃখকষ্টে আক্রান্ত লোকেরা যদি আল্লাহ তা'আলার ফায়সালার উপর সন্তুষ্ট থেকে ধৈর্য ধারণ করে তাহলে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে অনেক সওয়াব ও প্রতিদান দান করেন। রাসূলুল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি বিপদে মুসিবতে বলবে,
إنا لله وإنا إليه راجعون اللهم أجرني في مصيبتي واخلف لي خيراً منها
আল্লাহ তা'আলা তাকে তার চেয়ে উত্তম কিছু দান করবেন। إنا لله وإنا إليه راجعون (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমাদের প্রত্যাবর্তন তাঁর নিকটই) এই দো'আ বিপদগ্রস্ত ও মুসিবতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের আশ্রয়স্থল। যারা বিপদের সময় ধৈর্য ধারণ করে এই দো'আ পড়বে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে অনেক অনেক প্রতিদান দান করবেন। ধৈর্যশীলদের পুরুষ্কারের ঘোষণা দিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ
নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের প্রতিদান দেওয়া হবে অগণিত।

টিকাঃ
৪৮ আবু দাউদ, তিরমিযী ও নাসায়ী
৪৯ মুসলিম, হাদিস: ২৪৫০
৫০ বুখারী, হাদিস: ৩৭০৫
৫১ মুসলিম, হাদিস: ৯১৮
৫২ সূরা বাকারাহ: ১৫৬
৫৩ সূরা জুমার-১০

📘 রাসূল ﷺ এর বাড়িতে একদিন 📄 স্ত্রীদের সাথে ব্যবহার

📄 স্ত্রীদের সাথে ব্যবহার


রাসূল এরশাদ করেন:
الدنيا كلها متاع وخير متاع الدنيا الزوجة الصالحة
সারা দুনিয়াটাই হলো সম্পদ। আর দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ হলো নেককার সতী স্ত্রী।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উত্তম আচরণ ও স্ত্রীদের ভালোবাসার বড় একটি প্রমাণ হলো তিনি উম্মুল মুমিনীনদের নাম আদর করে সংক্ষিপ্ত করে ডাকতেন এবং তাদেরকে খুশী করার জন্য বিভিন্ন সংবাদ তাদের শুনাতেন। যেমন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন
قال رسول الله - صلى الله عليه وسلم - يوما: يا عائش! هذا جبريل يقرئك السلام .
রাসূল একদিন বললেন, হে আয়েশা! (আয়েশা রা. নামকে সংক্ষিপ্তাকারে) জিবরাঈল আ. এই মাত্র তোমাকে সালাম দিয়ে গেল”।

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন এই উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ এবং সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। দাম্পত্যজীবনে স্ত্রীদের অবেগ অনুভূতির প্রতি লক্ষ করে, তাদের সাথে কোমল আচরণ করা, তাদেরকে আদর সোহাগ করা এবং তাদের সাথে উত্তম আচরণের এক উজ্জ্বল নমুনা রেখে গেছেন আমাদের সামনে। তিনি স্ত্রীদেরকে এমন অবস্থান দিয়েছেন যা প্রতিটি স্ত্রীই তার স্বামীর কাছ থেকে আশা করে। যাতে করে সে স্বামীর অর্ধাঙ্গিনীতে পরিণত হতে পারে। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন:
كنت أشرب وأنا حائض، فأناوله النبي - صلى الله عليه وسلم -، فيضع فاه على موضع في فيشرب، وأتعرق العرق فيتناوله ويضع فاه على موضع في
আমি ঋতুস্রাব অবস্থায় কিছু পান করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দিতাম। আর তিনি আমার মুখ রাখার স্থানে মুখ রেখে পান করতেন এবং আমি হাড়ের মাংস খেয়ে শেষ করলে তিনি তা নিয়ে আমার মুখ লাগানোর স্থানে মুখ লাগাতেন।

মুনাফিক এবং মুস্তাশরিকরা যেমন ধারণা করে এবং মিথ্যা অপবাদ ও বাতিল দাবী করে থাকে যে, তিনি দম্পত্যজীবনে স্ত্রীদের প্রতি কঠোর। এটা মোটেও ঠিক না। তিনি কখনই এমন ছিলেন না। বরং তিনি দাম্পত্যজীবনে সর্বোত্তম এবং সবচেয়ে সহজ-সরল পন্থা অবলম্বন করেছিলেন。

আয়েশ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:
إن النبي - صلى الله عليه وسلم - قبل امرأة من نسائه ثم خرج إلى الصلاة ولم يتوضأ
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীদের মধ্য থেকে কোন একজন স্ত্রীকে চুমু দিয়ে অজু না করেই নামাযের জন্য মসজিদের যেতেন।

রাসূলুল্লাহ বিভিন্ন জায়গায় নারীর অধিকার, মর্যাদা ও সম্মানের কথা প্রকাশ করেছেন। এই যে দেখুন: রাসূলুল্লাহ আমর বিন আস রা. এর এক প্রশ্নের উত্তর এবং তাকে শিক্ষা দিতে গিয়ে বলেন, স্ত্রীর ভালোবাসা, জ্ঞানী, ন্যায়পরায়ণ ও সম্মানিত ব্যক্তিকে কোন ক্রমেই অপমানিত ও খাটো করে না।

আমর বিন আস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ কে প্রশ্ন করে বলেন,
أي الناس أحب إليك؟ قال: «عائشة
আপনার নিকট কোন মানুষ সবচেয়ে বেশী প্রিয়? তিনি বলেন: আয়েশা। যে ব্যক্তি দাম্পত্য জীবনে সুখী হতে চায়, সে যেন উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. এর এ হাদিসটি পড়ে এবং তা নিয়ে ভালোভাবে চিন্তা-গবেষণা করে দেখে যে, কিভাবে আল্লাহর রাসূল তাঁর স্ত্রীদের সাথে আচরণ করতেন এবং তাদেরকে ভালোবাসতেন।

আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন:
كنت أغتسل أنا ورسول الله - صلى الله عليه وسلم - من إناء واحد
আমি এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ এক পাত্র হতে পানি নিয়ে গোসল করতাম।

স্ত্রীদের ভালোবাসা এবং তাদেরকে বৈধ পন্থায় খুশী করা আমাদের শরয়ী এবং নৈতিক দায়িত্ব। আর একারণেই আমরা রাসূলুল্লাহ কে দেখতে পাই তিনি সকল বৈধ পন্থায় স্ত্রীদের খুশী করাতেন এবং তাদের মনে আনন্দ দিতেন। আয়েশা রা. বলেন:
خرجت مع رسول الله - صلى الله عليه وسلم - في بعض أسفاره، وأنا جارية لم أحمل اللحم ولم أبدن، فقال للناس: تقدموا» فتقدموا ثم قال: «تعالي حتى أسابقك» فسابقته فسبقته، فسكت عني حتى حملت اللحم، وبدنت وسمنت وخرجت معه في بعض أسفاره فقال للناس «تقدموا» ثم قال: «تعالي أسابقك» فسبقني، فجعل يضحك ويقول: «هذه بتلك.
আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে কোন এক ভ্রমণে বের হলাম, সে সময় আমি অল্প বয়সী ও শারীরিক গঠনের দিক দিয়েও হালকা-পাতলা ছিলাম। তিনি সাহাবীদেরকে বললেন: তোমরা সামনের দিকে অগ্রসর হও। তারা সামনের দিকে অগ্রসর হল। অতঃপর তিনি আমাকে বললেন: “এসো আমি তোমার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করি। তখন আমি তাঁর সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হলাম এবং তাকে পেছনে ফেলে আমি অগ্রসর হয়ে গেলাম। তখন তিনি আমাকে কিছুই বললেন না। যখন আমি শারীরিক দিক দিয়ে মোটা ও ভারী হলাম। তাঁর সাথে কোন এক সফরে বের হলাম। তিনি সাহাবীদেরকে বললেন: তোমরা সামনের দিকে অগ্রসর হও। তারা সামনে অগ্রসর হলো: তখন তিনি আমাকে বললেন: এসো আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করি, এবারের প্রতিযোগিতায় তিনি আমার আগে চলে গেলেন এবং হাসতে হাসতে বললেন: এইটা সেটার বদলা ।

এটা একদিকে যেমন সরস কৌতুক অন্য দিকে স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা ও সীমাহীন গুরুত্বের প্রতিচ্ছবি। স্ত্রীর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করার জন্য তিনি সাহাবাদের সামনে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিলেন। এর মাধ্যমে তিনি স্ত্রীর মনে আনন্দ দিলেন। অতঃপর তিনি পূর্বের বিনোদনের ইতিহাস টেনে আজকের বিজয়ের তুলনা করে বললেন, এইটা সেটার বদলা।

বর্তমানে যারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করে এবং বিভিন্ন রাষ্ট্র-নায়ক, বড়বড় সেনা অফিসার ও উচ্চশ্রেণীর লোকদের অবস্থা প্রত্যক্ষ করে তারা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর অবস্থা ও স্ত্রীদের সাথে তাঁর আচরণ দেখলে অবাক হয়ে যাবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ একদিকে উম্মতের নবী অন্য দিকে বিজয়ী সেনাপতি, আরবের শ্রেষ্ঠ গোত্র কোরাইশ বংশের, এবং কোরাইশদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ গোত্র বনী হাশিম গোত্রের সন্তান। তিনি কোন এক বিজয়ের দিনে, বিজয়ী বেশে ফিরে আসছেন। বিশাল সেনাবাহিনী তার নেতৃত্ব চলছে। এত কিছুর পরও তিনি, স্ত্রীদের প্রতি অত্যন্ত ভালোবাসা পূর্ণ আচরণ করছেন। উম্মাহাতুল মুমিনীনদের সাথে কোমল আচরণ করছেন। বিশাল সেনাবাহিনির নেতৃত্ব, যুদ্ধ বিজয়ের গৌরব, আর দীর্ঘ পথের ক্লান্তি তাকে স্ত্রীদের প্রতি ভালোবাসা পূর্ণ আচরণ, কোমল ব্যবহার, স্ত্রীদের সাথে নরম স্বরে প্রেমালাপ ও আলতো করে তাদের ছুঁয়ে দেওয়ার কথা ভুলিয়ে রাখতে পারেনি। তিনি ভালোবাসা দিয়ে তাদের দীর্ঘ ছফরের ক্লান্তি ভুলিয়ে রাখতেন।

এই উম্মতের নবী, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক ও শ্রেষ্ঠ সেনাপতির স্ত্রীদের সাথে প্রেমের আচরণের এক দৃশ্য দেখুন। ইমাম বুখারী বর্ণনা করেন, রাসূল খায়বারের যুদ্ধ শেষে ফেরার সময় সাফিয়া বিনতে হুয়াই রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বিবাহ করেন। এবার যে উটের পিঠে সাফিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহা আরোহণ করবেন পর্দার জন্য সেই উটকে চার পাশ থেকে কাপড় দিয়ে ঢেকে দিলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ ﷺ উটের সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন আর স্ত্রী ছফিয়্যাহ রা. তাঁর হাঁটুর উপর পা রেখে উটের উপর আরোহণ করলেন।

এই ঘটনা সাহাবীদের মধ্যে অনেক প্রভাব ফেলেছে। এর মাধ্যমে এক বিজয়ী সেনাপতি, ও প্রেরিত নবী তার উম্মতদের শিক্ষা দিলেন, স্ত্রীদের ভালোবাসলে, তাদেরকে কোন কাজে সহযোগিতা করলে, স্ত্রীদের সাথে বিনয় ও কোমল আচরণ করলে স্বামী বা পুরুষের মর্যাদা ক্ষুন্ন হয় না বরং এটা করাই তার কর্তব্য। রাসূলুল্লাহ উম্মতকে অসিয়ত করে বলেছেন।
ألا واستوصوا بالنساء خيرا
সাবধান! তোমরা নারীদের হিতাকাংক্ষী হও।

টিকাঃ
৫৪ সহীহ আল-জামে আস-সাগীর, আহমদ, হাদিস: ৬৫৬৭ নাসায়ী, হাদিস: ৩২৩
৫৫ বুখারী, হাদিস: ৩৭৬৮; মুসলিম, হাদিস: ۸৯৭৫
৫৬ মুসলিম, হাদিস: ৩০০
৫৭ আবু দাউদ, হাদিস: ১৭৯; আহমদ, হাদিস: ২৫৭৩২
৫৮ বুখারী, হাদিস: ২৬৩
৬০ বুখারি, হাদিস: ৫১৮৬; মুসলিম, হাদিস: ১৪৬৮- ৬১

📘 রাসূল ﷺ এর বাড়িতে একদিন 📄 একাধিক স্ত্রী

📄 একাধিক স্ত্রী


রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মোট এগারো জন স্ত্রী ছিলেন। এদেরকে উম্মাহাতুল মুমিনীন (মুমিনদের মা) বলা হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ইন্তেকালের সময় তাঁর নয়জন স্ত্রী জীবিত ছিলেন। দুইজন তাঁর ইন্তেকালের পূর্বেই ইহজগত ত্যাগ করেছেন। এ সকল নারীদের ভাগ্য কতইনা প্রশস্ত যে, তারা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর স্ত্রী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করতে পেরেছেন।

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর স্ত্রীদের মধ্যে সকলেই ছিলেন, বয়স্ক, বিধবা, তালাক প্রাপ্তা এবং দুর্বল। একমাত্র আয়েশা রা. ব্যতীত আর কেউই কুমারী ছিলেন না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদাই তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে সমতা, ইনসাফ, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেছেন। কখনই তিনি স্ত্রীদের মাঝে কম বেশি করেননি। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
كان رسول الله - صلى الله عليه وسلم - إذا أراد سفرًا أقرع بين نسائه فأيتهن خرج سهمها خرج بها معه، وكان يقسم لكل امرأة منهن يومها وليلتها
রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন সফরের ইচ্ছা করতেন তখন সব স্ত্রীদের নামে লটারি করতেন, যার নাম উঠতো তাকে নিয়ে সফরে বের হতেন। আর প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য পালাক্রমে দিন-রাত বণ্টন করতেন।

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ন্যায় ও ইনসাফের আরেকটি নিদর্শন দেখুন। আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
كان للنبي - صلى الله عليه وسلم - تسع نسوة، فكان إذا قسم بينهن لا ينتهي إلى المرأة الأولى إلا في تسع فكن يجتمعن كل ليلة في بيت التي يأتيها، فكان في بيت عائشة فجاءت زينب فمد يده إليها فقالت عائشة: هذه زينب، فكف النبي - صلى الله عليه وسلم - يده
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নয় জন স্ত্রী ছিলেন, তিনি যখন তাদের মাঝে দিন বণ্টন করতেন তখন এক জনের দিকে ঝুঁকে পরতেন না বরং নয় জনের মাঝেই সমানভাবে দিন বণ্টন করতেন। প্রতি রাতেই সকলে পালাপ্রাপ্তা স্ত্রীর বাড়িতে একত্র হতেন। রাসূল একদিন আয়েশা রা. এর বাড়িতে ছিলেন, তখন যায়নাব রা. সেখানে আসলো আর রাসূল তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন। আয়েশা রা. তখন বললেন ইনি তো যায়নাব ! নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন হাত গুটিয়ে নিলেন।

আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা তাঁর আপন রহমত ও দয়া দিয়ে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বদা ঢেকে রেখেছেন। প্রতিটি কাজেই তিনি আল্লাহর রহমত প্রাপ্ত হয়েছেন। ঘরে ও পরিবারে এমন অসম্ভব প্রায় বিরল ইনসাফ ও ন্যায়ের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা আল্লাহর রহমত ছাড়া সম্ভব না। আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে ওহী ও তাওফিক না থাকলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাড়ি এত সুন্দর ও ইনসাফপূর্ণভাবে পরিচালিত হতোໜা।

রাসূলুল্লাহ কথা ও কর্মের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার শুকরিয়া আদায় করতেন। তিনি স্ত্রীদেরকে আল্লাহ তা'আলার ইবাদাতের প্রতি উৎসাহ প্রদান করতেন এবং আল্লাহর হুকুম পালনের ক্ষেত্রে তাদেরকে সহযোগিতা করতেন। আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ কে বলেন:
وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَأَصْطَبِرْ عَلَيْهَا لَا نَسْتَلُكَ رِزْقًا نَحْنُ نَرْزُقُكَ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوَى
অর্থাৎ আর তোমার পরিবারবর্গকে নামাযের আদেশ দাও ও তাতে অবিচল থাকো, আমি তোমার নিকট কোন রিযিক কামনা করি না, আমিই তোমাকে রিযিক দেই এবং শুভ পরিণাম তো মুত্তাকীদের জন্য।

আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
كان النبي - صلى الله عليه وسلم - يصلي وأنا راقدة معترضة على فراشه فإذا أراد أن يوتر أيقظني
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (রাতে উঠে তাহাজ্জুদের) নামায আদায় করতেন। আর আমি তাঁর বিছানায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে শুয়ে থাকতাম, যখন তিনি বিতর নামায আদায়ের ইচ্ছা করতেন তখন আমাকে জাগাতেন”

রাসূলুল্লাহ ﷺ উম্মতকে তাহাজ্জুদের নামায আদায়ের ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন এক্ষেত্রে যেন স্বামী-স্ত্রী পরস্পর একে অপরকে সহযোগিতা করে। এমনকি পানির ছিটা দিয়ে হলেও যেন একে অপরকে জাগ্রত করে। হাদিস শরীফে এসেছে, আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
رحم الله رجلاً قام من الليل فصلى وأيقظ امرأته فصلت فإن أبت نضح في وجهها الماء، ورحم الله امرأة قامت من الليل فصلت وأيقظت زوجها فصلى فإن أبى نضحت في وجهه الماء
আল্লাহ তা'আলা এমন লোকের প্রতি দয়া করেন, যে রাতে ঘুম থেকে উঠে নামায আদায় করে এবং তার স্ত্রীকে জাগ্রত করে অতঃপর সেও নামায আদায় করে। সে যদি উঠতে না চায় তাহলে তার চেহারায় পানির ছিটা দিয়ে তাকে জাগ্রত করে। আল্লাহ তা'আলা এমন স্ত্রীর প্রতি দয়া করেন যে রাতে ঘুম থেকে উঠে নামায আদায় করে এবং তার স্বামীকে জাগ্রত করে অতঃপর সেও ছালাত আদায় করে। সে যদি উঠতে না চায় তাহলে তার চেহারায় পানির ছিটা দিয়ে তাকে জাগ্রত করে।

পূর্ণাঙ্গ মুমিন তার ভিতরগত বিষয়ের সাথে সাথে বাহ্যিক দিকটাও পূতপবিত্র রাখে। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর অন্তর যেমনিভাবে পরিচ্ছন্ন ও পূতপবিত্র ছিলো তেমনিভাবে তার বাহ্যিক দিকটাও ছিলো পরিচ্ছন্ন ও পূতপবিত্র। তিনি শরীর ও কাপড় পরিচ্ছন্ন রাখতেন, সুগন্ধি ব্যবহার করতেন, মাথায় তেল দিতেন এবং দাত পরিস্কার রাখতেন। রাসূলুল্লাহ মিসওয়াকের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন, তিনি অন্যদেরও মিসওয়াক করতে বলতেন। যেমন হাদিস শরীফে এসেছ, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
لو لا أن أشق على أمتي لأمرتهم بالسواك عند كل صلاة
আমি যদি আমার উম্মতের উপর কঠিন মনে না করতাম তবে প্রত্যেক নামাযের পূর্বে তাদেরকে মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম।

হুজাইফা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
إذا قام من النوم يشوص فاه بالسواك
রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন ঘুম থেকে জাগ্রত হতেন, তখন তিনি মিসওয়াক দিয়ে মুখ পরিস্কার করে নিতেন।

শুরাইহ ইবনে হানী রা. বলেন, আমি আয়েশা রা.কে জিজ্ঞেস করলাম,
بأي شيء كان يبدأ النبي - صلى الله عليه وسلم - إذا دخل بيته؟ قالت: بالسواك.
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বাড়িতে প্রবেশ করতেন তখন সর্বপ্রথম কোন কাজ করতেন? তিনি বলেন, মিসওয়াক করতেন।

উপরের হাদিসগুলো থেকেই বুঝা যায়, রাসূলুল্লাহ পবিত্র ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে ঘরে প্রবেশ করতেন।

হাদিস শরীফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ঘরে প্রবেশের সময় এই দো'আ পড়তেন,
بِسْمِ اللهِ وَلَجْنَا، وَبِسْمِ اللهِ خَرَجْنَا، وَعَلَى رَبِّنَا تَوَكَّلْنَا
আল্লাহর নাম নিয়ে প্রবেশ করলাম এবং আল্লাহর নাম নিয়েই বের হয়েছিলাম এবং আমরা আমাদের প্রতিপালকের উপর ভরসা করি। অতঃপর তিনি সালাম দিতেন।

প্রিয় ভাই! তুমিও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে ঘরে প্রবেশ করো এবং পরিবারের লোকদের সালাম দাও। এমন লোকদের অন্তর্ভূক্ত হয়ো না যারা ঘরে প্রবেশ করেই বিভিন্ন দোষত্রুটি ধরে এবং তিরস্কার করে।

টিকাঃ
৬২ মুসলিম, হাদিস: ১৪৬২
৬৩ আবুদাউদ, হাদিস: ১৩০৮ নাসায়ী, হাদিস: ১৬১০
৬৪ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫
৬৫ মুসলিম, হাদিস: ২৫৩
৬৬ আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৯৬

📘 রাসূল ﷺ এর বাড়িতে একদিন 📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর রসিকতা

📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর রসিকতা


মানুষের যখন ব্যস্ততা ও দায়িত্ব বাড়তে থাকে, তখন সে ধীরেধীরে পরিবারকে সময় দেওয়া, সাধারণ মানুষদের সাথে মেলামেশা ও তাদের সাথে রসিকতা ও হাসি-ঠাট্টার কথা ভুলে যায়। তারা নিজ কর্ম নিয়েই ব্যস্ত থাকে। অন্য দিকে সময় দেওয়ার সুযোগ পায় না বা দেয় না। কখনো কখনো তো এক ব্যস্ততার কারণে অন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও ছুটে যায়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ একদিকে উম্মতের নবী, রাষ্ট্রনায়ক ও সেনাপ্রধান, তাকে উম্মতের বিষয়, সেনাবাহিনীর বিষয়, ও পরিবারের বিষয় নিয়ে সর্বদা ব্যস্ত থাকতে হয়। অন্য দিকে কখনো কখনো ওহী নাযিলের বিষয়টা তো আছেই, এছাড়াও আরো অনেক ব্যস্ততা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ প্রতিটি বিষয় যথাযথভাবে আনজাম দিয়েছেন। একটার জন্য অন্যটার হক নষ্ট হয়নি। এত দায়িত্ব ও কাজের ভার থাকা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ ﷺ এর অন্তরে ছোটদের জন্য আলাদা একটা স্থান ছিল। তিনি তাদের আদর করতেন এবং তাদের সাথে রসিকতাও করতেন, তাদের মনে আনন্দ দিতেন। যার কারণে তিনি ছিলেন ছোটদের নিকট অনেক প্রিয় এবং তিনি ছোটদের মনের একেবারে কাছের মানুষ ছিলেন。

রাসূলুল্লাহ ﷺ কখনো কখনো বড়দের সাথেও রসিকতা করতেন। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
قالوا يا رسول الله: إنك تداعبنا، قال: «نعم. غير أني لا أقول إلا حقًا
সাহাবাগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনিও আামদের সাথে রসিকতা করেন!! তিনি বললেন, হ্যাঁ, তবে আমি সর্বদা সত্য বলি। (অর্থাৎ আমার রসিকতা হয়ে থাকে সত্যের মাধ্যমে। মিথ্যা কথা বলে বা মিথ্যার মাধ্যমে আমি কখনো রসিকতা করি না।)

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর রসিকতার একটা হলো, প্রিয় কোন সাহাবিকে রসিকতা করে, কখনো কখনো নাম ব্যতীত অন্য নামেও ডাকতেন। যেমন আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,
إن النبي - صلى الله عليه وسلم - قال له: يا ذا الأذنين
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলতেন, 'হে দুই কান ওয়ালা'।

আনাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, উম্মে সুলাইমের এক ছেলে, নাম আবু উমায়ের। রাসূলুল্লাহ ﷺ তার সাথে কখনো কখনো রসিকতা করতেন। রাসূলুল্লাহ একবার রসিকতা করে তাকে আদর করার জন্য তার বাড়িতে গিয়ে দেখেন সে মন খারাপ করে বসে আছে। তখন তাকে বললেন, কি হলো? আবু উমায়েরের মন খারাপ দেখছি যে!! উপস্থিত লোকেরা বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে যে নুগাইর পাখির সাথে খেলা করতো তা মারা গিয়েছে। এরপর রাসূলুল্লাহ সা. তাকে কখনো কখনো রসিকতা করে সম্বোধন করতেন,
يا أبا عمير، ما فعل النغير؟
হে আবু উমায়ের! তোমার নুগাইরের কি হয়েছে?

বড়দের সাথে রসিকতার একটা উদাহরণ হলো, আনাস ইবনে মালেক রা. বর্ণনা করে বলেন,
إن رجلاً من أهل البادية كان اسمه زاهر بن حرام، قال: وكان النبي - صلى الله عليه وسلم - يحبه وكان دميما، فأتاه النبي - صلى الله عليه وسلم - يومًا يبيع متاعه، فاحتضنه من خلفه وهو لا يبصر: فقال: أرسلني، من هذا؟ فالتفت فعرف النبي - صلى الله عليه وسلم - فجعل لا يألو ما ألزق ظهره بصدر النبي - صلى الله عليه وسلم - حين عرفه، وجعل النبي - صلى الله عليه وسلم - يقول: من يشتري العبد فقال: يا رسول الله إذا والله تجدني كاسدًا، فقال النبي: «لكن عند الله أنت غال
জাহের ইবনে হারাম নামে এক গ্রম্য বেদুঈন ছিলো। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে অনেক ভালোবাসতেন। সে ছিলো কালো। একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ তার কাছে এলেন, তখন সে মালামাল বিক্রির কাজে ব্যস্ত ছিলো। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলেন। সে রাসূল ﷺ কে দেখতে পায়নি। তাই সে বলল, কে? ছাড়ো আমাকে। অতঃপর পিছনে তাকিয়ে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখতে পেলো, তখন আর তার পিঠ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সিনা থেকে সরিয়ে নিতে চাইলো না। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বলতে লাগলেন, কে এই গোলাম ক্রয় করবে? তখন সে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর শপথ তাহলে আপনি আমার মূল্য অনেক শস্তা পাবেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কিন্তু আল্লাহ তা'আলার নিকট তোমার মূল্য অনেক।

সুবহানাল্লাহ! কি সরলতা! কত উঁচু মনের মানুষ, একজন নবী, একজন রাষ্ট্র প্রধান, একজন সেনপতি হয়ে সাধরণ একজন গ্রাম্য লোকের সাথে কি সরল আচরণ! কি সরল রসিকতা! এমন সুন্দর দৃশ্য পৃথিবী দ্বিতীয়টি দেখেছে কি?

রাসূলুল্লাহ কখনো মুখ গোমরা করে থাকতেন না। তিনি সদা হাস্যোজ্জ্বল থাকতেন। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
مَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ مُسْتَجْمِعًا قَطُّ ضَاحِكًا حَتَّى تُرَى مِنْهُ لَهَوَاتُهُ، وَإِنَّمَا كَانَ يَتَبَسَّمُ
আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কখনো অট্টহাসি দিতে দেখিনি যার ফলে মুখের ভিতরের তালু প্রকাশ পায়, বরং তিনি মুচকি হাসতেন।

এমন হাস্যোজ্জ্বল চেহারা ও সুন্দর আচরণ হওয়া স্বত্ত্বেও তার সামনে কেউ আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করলে তাঁর চেহারা মলিন হয়ে যেতো।

আয়েশা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ একবার সফর থেকে ফিরলেন, আমি তখন ছবি যুক্ত কাপড় দিয়ে পর্দা টানিয়েছিলাম। রাসূলুল্লাহ এটা দেখে, টেনে ছিঁড়ে ফেললেন এবং তারা চেহারার রং পরিবর্তন হয়ে গেলো। তিনি বললেন,
يا عائشة: أشد الناس عذابًا عند الله يوم القيامة الذين يضاهون بخلق الله
হে আয়েশা! যারা আল্লাহর সৃষ্টির ছবি আঁকবে (প্রাণীর ছবি আঁকবে) কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা'আলার নিকট তারা সবচেয়ে বেশি কঠিন শাস্তি ভোগ করবে।

• এর মাধ্যমে প্রমাণ হয় যে, ঘরে প্রাণীর ছবি টানানো হারাম। দেওয়ালে প্রাণীর ছবি টানিয়ে রাখা, বা কারুকাজ করে কোন প্রাণীর ছবি আঁকা, টেবিল বা আলমারির উপরে কোন ছবি বা মূর্তি রাখা কঠিন হারাম। যতক্ষণ ঘরে এই ছবি টানানো থাকবে তার গুনাহ হতে থাকবে, এবং সেই ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না।

টিকাঃ
৬৭ আহমাদ, হাদিস: ৮৪৮১; তিরমিযি: ১৯৯০
৬৮ আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৬৯
৬৯ বুখারী ও মুসলিম
৭০ আহমাদ, হাদিস: ১২৬৪৮
৭১ বুখারী, হাদিস: ৬০৯২; মুসলিম, হাদিস: ৮৯৯
৭২ বুখারী, হাদিস: ৫৯৫৪; মুসলিম: ২১০৭

ফন্ট সাইজ
15px
17px