📘 রাসূল ﷺ এর বাড়িতে একদিন 📄 বড়ির ভিতর

📄 বড়ির ভিতর


আমরা এখন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বাড়িতে, তাঁর ঘরের ভিতরে অবস্থান করছি। আমরা আমাদের নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বাড়ি ও ঘরের প্রতিটি বিষয় দেখবো এবং সেগুলোকে আমাদের জীবনে এবং আমাদের বাড়ি ও ঘরের উত্তম আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করবো। সাহাবায়ে কেরামগণ রা. আমাদের নিকট এই ঘরের বিভিন্ন বিষয়ের বর্ণনা দিবেন।
আমরা যখন তাঁর ঘরের অভ্যন্তর ও তার দেয়ালের দিকে তাকাবো তখন আমরা দেখবো ও জানতে পারবো যে, এই ঘরের মূল ভিত্তি হচ্ছে বিনয় এবং তার আসবাব পত্র হচ্ছে ঈমান। এ কারণেই আমরা দেখবো তাঁর ঘরের দেয়ালে কোন প্রাণী বা অন্য কোন ছবি টানো নেই। কিন্তু আফসোস! বর্তমানে বেশীরভাগ ঘরে বিভিন্ন প্রাণীর ছবি ও প্রতিকৃতি ঝুলানো থাকে। অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
لا تدخل الملائكة بيتا فيه كلب ولا تصاوير যেই ঘরে কুকুর বা অন্য কোন প্রাণীর ছবি থাকে তাতে ফেরেশতা প্রবেশ করে না।
এরপর আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ জীবনে ব্যবহার্য কিছু জিনিসের দিকে দৃষ্টি দেবো। ছাবেত রা. বর্ণনা করেন,
أخرج إلينا أنس بن مالك قدح خشب غليظا مضببًا بجديد فقال: يا ثابت لم - . وكان - صلى الله عليه وسلم هذا قدح رسول الله - صلى الله عليه وسلم - . - يشرب فيه الماء والنبيذ والعسل واللبن.
একবার আনাস ইবনে মালেক রাঃ আমদের সামনে মোটা লোহার পাত দিয়ে তৈরি কাঠের একটি পাত্র নিয়ে এলেন। অতঃপর বললেন, ছাবেত! এটা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পাত্র। তিনি এতে পানি, নাবিজ, মধু এবং দুধ পান করতেন。
আনাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
أن رسول الله - صلى الله عليه وسلم - كان يتنفس في الشراب ثلاثا». يعني: يتنفس خارج الإناء.
রাসূলুল্লাহ তিন শ্বাসে পানি পান করতেন। (অর্থাৎ তিনি পাত্রের বাইরে নিঃশ্বাস ফেলতেন。)
অন্য এক হাদিসে এসেছে, ونهى عليه الصلاة والسلام أن يتنفس في الإناء أو ينفخ فيه
রাসূলুল্লাহ পাত্রের ভিতরে নিঃশ্বাস ফেলতে অথবা ফুঁ দিতে নিষেধ করেছেন。
আর সেই বর্ম যেটা পরিধান করে রাসূলুল্লাহ জিহাদে গিয়েছেন, কঠিন দিনগুলোতে যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর মোকাবেলা করেছেন। হয় তো সেটা এখন রাসূলুল্লাহ এর বাড়িতে নেই। কারণ রাসূলুল্লাহ সেটা এক ইহুদির কাছ বন্ধক রেখে তার কাছ থেকে ত্রিশ সের জব নিয়েছেন ধার হিসেবে। যেমনটি আয়েশা রা. বলেছেন,
ومات الرسول - صلى الله عليه وسلم - والدرع عند اليهودي
রাসূলুল্লাহ এর ইন্তেকালের সময়ও বর্মটি ইহুদি লোকটির কাছেই ছিলো。
রাসূলুল্লাহ কখনই হঠাৎ করে, লুকিয়ে লুকিয়ে ঘরে চলে আসতেন না। বরং তিনি তার আগমন সম্পর্কে ঘরের লোকদের অবগত করে তবেই ঘরে প্রবেশ করতেন। তিনি ঘরে প্রবেশের পূর্বে তাদেরকে সালাম দিতেন。
প্রিয় ভাই! তুমি রাসূলুল্লাহ এর এই হাদিস নিয়ে একটু চিন্তা-ফিকির করো, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
طوبى لمن هدي إلى الإسلام، وكان عيشه كفافًا وقنع
সুসংবাদ ঐব্যক্তির জন্য যাকে ইসলামের দিকে হেদায়াত করা হয়েছে এবং তার জীবন যাপন ছিল সাদামাটা চলার মত আর সে ছিলো এতেই তৃপ্ত。
তুমি তোমার কর্ণকে প্রসারিত করে রাসূলুল্লাহ এর এই কথাটা একবার শোনো, তিনি বলেছেন,
من أصبح آمنا في سربه، معافى في جسده، عنده قوت يومه، فكأنما حيزت له الدنيا بحذافيرها
যে ব্যক্তি তার গোত্রের লোকদের মধ্যে নিরাপদে আছে। তার শরীরও সুস্থ। আর তার কাছে একদিনের পরিমাণ খাবার রয়েছে। দুনিয়ার সকল সুখ- শান্তিই যেন তাকে দেওয়া হয়েছে。

টিকাঃ
১ মুসলিম, হাদিস: ২১০৬
২৩ তিরমিযী
২৪ তিরমিযী, হাদিস: ১৯০৭
২৫ তিরমিযী, হাদিস: ১৯০৭
২৬ বুখারী ও মুসলিম
২৭ যাদুল মা'আদ ২/৩৮১
২৮ তিরমিযী, হাদিস: ২৩৪৯
২৯ তিরমিযী, হাদিস: ২৩৪

📘 রাসূল ﷺ এর বাড়িতে একদিন 📄 নিকটাত্মীয়

📄 নিকটাত্মীয়


এই উম্মতের নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ পরিপূর্ণভাবে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতেন। কখনই কোনভাবে এই সম্পর্ক ছিন্ন হতে দিতেন না। বর্তমানে মানুষ আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে না। সামান্য কারণেই এই মহান সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলে। রাসূলুল্লাহ ছিলেন একজন পূর্ণাঙ্গ মানব। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ।

আর একারণেই তো নবুওয়াতের পূর্বে কাফেররাই তাঁর উপাধি দিয়েছিলো, আস-সাদেক, আল-আমীন (বিশ্বস্ত-সত্যবাদী)। আর নবীজীর উপর সর্বপ্রথম ওহী নাযিল হওয়ার পর যখন তিনি হয়রান-পেরেশান হয়ে খাদিজা রা.-এর কাছে আসলেন তখন খাদিজা রা. তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, আল্লাহ আপনাকে অপদস্থ করবেন না। এরপর নবীজীর যে উত্তম গুণাবলীর উল্লেখ করেছিলেন তার মধ্যে একটি ছিলো-
إنك لتصل الرحم وتصدق
নিশ্চয়ই আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রেখে চলেন এবং দান করেন।

রাসূলুল্লাহ মায়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসার পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তার উপর থাকা মায়ের হক সর্বোত্তমভাবে আদায় করেছেন। তিনি মায়ের কবর যিয়ারতে যেতেন। মমতাময়ী মায়ের ছায়া তো তার উপর থেকে সাত বছর বয়সেই উঠে গিয়েছিলো। কিন্তু তিনি মায়ের কথা কখনো ভুলেননি, এমনকি জীবনের শেষ দিন পর্যন্তও না।

কিন্তু আফসোস আমরা বর্তমানে মাকে ভুলে যাই। মৃত্যুর পর মায়ের কথা স্মরণ রাখা তো দূরের কথা জীবিত থাকা অবস্থাতেও অনেক সময়, মাকে ভুলে যাই। মায়ের সাথে খারাপ আচরণ করি, তাকে ঘর থেকে বের করে দেই। কিন্তু আমাদের নবীজী কখনও মাকে ভুলতে পারেননি, এমনকি নবুওয়ত পাওয়ার পর শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও তিনি মায়ের কবর যিয়ারত করতে যেতেন। আবূ হুরাইরা রা. বর্ণনা করে বলেন,

زار النَّبِيُّ - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - قَبْرَ أُمِّهِ، فَبَكَى وَأَبْكَى مَنْ حَوْلَهُ فَقَالَ: اسْتَأْذَنْتُ رَبِّي فِي أَنْ أَسْتَغْفِرَ لَهَا فَلَمْ يَأْذَنْ لِي، وَاسْتَأْذَنْتُهُ فِي أَنْ أَزُورَ قَبْرَهَا فَأَذِنَ لِي، فَزُورُوا الْقُبُورَ، فَإِنَّهَا تُذَكِّرُ الْمَوْتَ
রাসূলুল্লাহ তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করলেন, নিজে কাঁদলেন এবং আশেপাশের সকলকে কাঁদালেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট তার জন্য (আমার মায়ের জন্য) ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুমতি চাইলাম। তিনি আমাকে এই অনুমতি দেননি। আমি তার কবর যিয়ারতের অনুমতি চেয়েছি তখন আমাকে এই অনুমতি দিয়েছেন। সুতরাং তোমরা কবর যিয়ারত করো কেননা তা মৃত্যুকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

একবার চিন্তা করে দেখো, নিকটাত্মীয়দের প্রতি তার মুহাব্বত কেমন ছিলো? তিনি তাদেরকে কতটা ভালোবাসতেন। তাদেরকে হেদায়াতের পথে আনা ও জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করার ব্যাপারে তিনি কতটা পেরেশান ছিলেন। এজন্য তো তিনি অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন, তবুও তাদেরকে হেদায়েতের পথে আনার চেষ্টা করে গেছেন অবিরাম। আমরা আবু হুরায়রা রা. এর জবান থেকেই শুনি কী চেষ্টা করেছেন তিনি তাদেরকে হেদায়েতের পথে আনতে।

আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
لَمَّا أُنْزِلَتْ هَذِهِ الآيَةُ ( وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ) دَعَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قُرَيْشًا فَاجْتَمَعُوا فَعَمَّ وَخَصَّ فَقَالَ " يَا بَنِي كَعْبِ بْنِ لُؤَيٍّ أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ يَا بَنِي مُرَّةَ بْنِ كَعْبٍ أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ يَا بَنِي عَبْدِ شَمْسٍ أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ يَا بَنِي عَبْدِ مَنَافٍ أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ يَا بَنِي هَاشِمِ أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ يَا بَنِي عَبْدِ الْمُطَّلِبِ أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ يَا فَاطِمَةُ أَنْقِذِي نَفْسَكَ مِنَ النَّارِ فَإِنِّي لَا أَمْلِكُ لَكُمْ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا غَيْرَ أَنَّ لَكُمْ رَحِمًا سَأَبُلُّهَا بِبَلالِهَا ".

যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়: (وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ) “তোমার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করে দাও” (সূরাহ আশ শু'আরা ২৬ - ২১৪)। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ কোরাইশদের ডাকলেন। তারা একত্রিত হলো। তারপর তিনি তাদের সাধারণ ও বিশেষ সকলকে সম্বোধন করে বললেন, হে কাব ইবনে লুওয়াই-এর বংশধর! জাহান্নাম থেকে তোমরা নিজেদের বাঁচাও। হে মুররাহ ইবনে কাব-এর বংশধর! জাহান্নাম থেকে তোমরা আত্মরক্ষা করো। হে আবদে শামস-এর বংশধর! জাহান্নাম থেকে তোমরা আত্মরক্ষা করো। হে আবদে মানাফ-এর বংশধর! জাহান্নাম থেকে তোমরা নিজেদের বাঁচাও। হে হাশিম-এর বংশধর! জাহান্নাম থেকে তোমরা আত্মরক্ষা করো। হে আবদুল মুত্তালিব-এর বংশধর! জাহান্নাম থেকে তোমরা নিজেদের বাঁচাও। হে ফাতিমা! জাহান্নাম থেকে তুমি নিজেকে বাঁচাও।

কারণ, আল্লাহর (আযাব) থেকে রক্ষা করার ব্যাপারে আমার কোন ক্ষমতা নেই। অবশ্য আমি তোমাদের সঙ্গে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করবো।

এই তো আমরা দেখতে পাচ্ছি, আপন চাচা আবু তালিবকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করার জন্য তিনি কতটা পেরেশান। তিনি বারবার যাচ্ছেন তার বাড়িতে, তাকে বুঝানোর জন্য, হেদায়েতের পথে আনার জন্য। এমনকি চাচা আবু তালিব যখন মৃত্যুশয্যায় তখনও তিনি তার কাছে গেলেন এবং তাকে ঈমান নামক সুশীতল মিষ্টি পানি পান করার আহ্বান করলেন। হাদিস শরীফে এসেছে, সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যাব (রহ.) তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করে বলেন,

لَمَّا حَضَرَتْ أَبَا طَالِبِ الْوَفَاةُ جَاءَهُ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَوَجَدَ عِنْدَهُ أَبَا جَهْلِ بْنَ هِشَامٍ وَعَبْدَ اللهِ بْنَ أَبِي أُمَيَّةَ بْنَ الْمُغِيرَةِ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لأبي طَالِبٍ يَا عَمّ قُلْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ كَلِمَةً أَشْهَدُ لَكَ بِهَا عِنْدَ اللَّهِ فَقَالَ أَبُو جَهْلٍ وَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ أَبِي أُمَيَّةَ يَا أَبَا طَالِبٍ أَتَرْغَبُ عَنْ مِلَّةِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَلَمْ يَزَلْ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَعْرِضُهَا عَلَيْهِ وَيَعُودَانِ بِتِلْكَ الْمَقَالَةِ حَتَّى قَالَ أَبُو طَالِبٍ آخِرَ مَا كَلَّمَهُمْ هُوَ عَلَى مِلَّةِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ وَأَبَى أَنْ يَقُولَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم أَمَا وَاللَّهِ لَاسْتَغْفِرَنَّ لَكَ مَا لَمْ أُنْهَ عَنْكَ فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى فِيهِ (مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ) الآيَةَ

আবু তালিব-এর মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে, আল্লাহর রাসূল তার নিকট আসলেন। তিনি সেখানে আবু জাহল ইবনে হিশাম ও 'আবদুল্লাহ্ ইবনে আবু উমায়্যা ইবনে মুগীরাকে উপস্থিত দেখতে পেলেন। (রাবী বলেন) আল্লাহর রাসূল আবু তালিবকে লক্ষ করে বললেনঃ চাচাজান! 'লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ' কালিমা পাঠ করুন, তা হলে এর ওসীলায় আমি আল্লাহ্র সমীপে আপনার জন্য সাক্ষ্য দিতে পারবো। আবু জাহল ও 'আবদুল্লাহ্ ইবনু আবু উমায়্যা বলে উঠলো, হে আবু তালিব! তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম হতে বিমুখ হবে? অতঃপর আল্লাহর রাসূল তার নিকট কালিমা পেশ করতে থাকেন, আর তারা দু'জনও তাদের উক্তি পুনরাবৃত্তি করতে থাকে। অবশেষে আবু তালিব তাদের সামনে শেষ কথাটি যা বলল, তা এই যে, সে আবদুল মুত্তালিবের ধর্মের উপর অবিচল রয়েছে, সে 'লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ' বলতে অস্বীকার করলো। আল্লাহর রাসূল বললেন, আল্লাহ্র কসম! তবুও আমি আপনার জন্য মাগফেরাত কামনা করতে থাকবো, যতক্ষণ না আমাকে তা হতে নিষেধ করা হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করেন:

مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَن يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَى مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ
নবী ও মুমিনের উচিত নয় মুশরিকদের জন্য মাগফেরাত কামনা করে, যদিও তারা আত্মীয় হোক একথা সুস্পষ্ট হওয়ার পর যে তারা জাহান্নামী।

এবং এই আয়াত নাযিল হয়
إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاء وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ
অর্থাৎ: হে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি যাকে চাইবেন তাকেই হেদায়েত করতে পারবেন না। (সূরা কাসাস, আয়াত: ৫৬)

রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর (চাচা আবু তালিবের) জীবদ্দশায় তাকে অনেক অনেক বার ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। এমনকি তার শেষ মূহুর্তে মৃত্যুর সময়ও তাকে দাওয়াত দিতে থেকেছেন। এমনকি মৃত্যুর পরও তার মুহাব্বত ও ভালোবাসার প্রকাশ ঘটিয়ে তিনি চাচার জন্য ইস্তেগফার করেছেন। কিন্তু যখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে মুশরিকদের জন্য ইস্তেগফার না করার ব্যাপারে আয়াত নাযিল হলো তখন তিনি তার জন্য ইস্তেগফার করা বন্ধ করে দিলেন। এই ঘটনা থেকে আমরা দু'টো জিনিস দেখতে পাই,
*নিকটাত্মীয়দের প্রতি তাঁর সীমাহীন দরদ, মুহাব্বতম ও ভালোবাসা।
*দ্বীনকে ভালোবেসে সকল মুহাব্বত ও দরদ-ভালোবাসাকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া। অর্থাৎ এই ঘটনার মধ্যে ফুটে উঠেছে, আল্লাহর দ্বীনের প্রতি সর্বোচ্চ ওলায়াত তথা বন্ধুত্ব। আর মুশরিকদের থেকে সম্পূর্ণ বারাআত তথা সম্পর্ক ছিন্ন করা, এমনকি তারা যদি নিকটাত্মীয়ও হয় তবুও।

টিকাঃ
৩০ মুসলিম, হাদিস: ৯৭৬
৩১ মুসলিম, হাদিস: ২০৪
৩২ আত্-তাওবাহঃ ১১৩
৩৩ আহমাদ, হাদিস: ২৩৬৪৭; বুখারী, হাদিস: ১৩৬০; মুসলিম, হাদিস: ২৪

📘 রাসূল ﷺ এর বাড়িতে একদিন 📄 রাসূল ﷺ এর আদর্শ ও বৈশিষ্ট্য

📄 রাসূল ﷺ এর আদর্শ ও বৈশিষ্ট্য


মানুষের চলা-ফেরা ও আচার ব্যবহারই তার জ্ঞানের পরিধি ও অন্তরের প্রশস্ততার আলামত বহন করে।

আয়েশা রা. রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সহধর্মিণী। তিনি জাগ্রত অবস্থায়, ঘুমন্ত অবস্থায়, অসুস্থতার সময়, সুস্থতার সময়, ক্রোধের সময়, শান্ত-স্থীর থাকার সময় এক কথায় সর্বাবস্থায় তাঁর পাশে থেকেছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ এর ব্যাপারে অনেক সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বর্ণনা দিয়েছেন। আয়েশা রা. বলেন,

لم يكن رسول الله - صلى الله عليه وسلم - فاحشا ولا متفحشا، ولا صخابا في الأسواق ولا يجزي بالسيئة السيئة ولكن يعفو ويصفح
রাসূলুল্লাহ অশ্লীল ও নোংরা ছিলেন না। তিনি অশ্লীলতা ও নোংরামী পছন্দও করতেন না। তিনি হাট বাজারে হৈ-চৈ চিল্লা-ফাল্লা করতেন না। তিনি মন্দের প্রতিদান মন্দ দ্বারা দিতেন না বরং তিনি ক্ষমা করে দিতেন ও দয়া করতেন।

এটাই হলো উম্মতের দয়ার নবী, হেদায়েতের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য। রাসূল এর নাতি, জান্নাতের সরদার, হুসাইন ইবনে আলী রা. রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কিছু বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেন। হুসাইন ইবনে আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,

سَأَلْتُ أَبِي عَنْ سِيرَةِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي جُلَسَائِهِ ، فَقَالَ : " كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ, دَائِمَ الْبِشْرِ ، سَهْلَ الْخُلُقِ ، لَيْنَ الْجَانِبِ ، لَيْسَ بِفَظٍّ وَلا غَلِيظٌ ، وَلا صَخَّابٍ وَلا فَحَّاشٍ ، وَلَا عَيَّابٍ وَلَا مَشَّاحٍ ، يَتَغَافَلُ عَمَّا لا يَشْتَهِي ، وَلا يُؤْيِسُ مِنْهُ رَاجِيهِ وَلَا يُخَيَّبُ فِيهِ ، قَدْ تَرَكَ نَفْسَهُ مِنْ ثَلَاثٍ : الْمِرَاءِ وَالإِكْثَارِ, وَمَا لا يَعْنِيهِ ، وَتَرَكَ النَّاسَ مِنْ ثَلَاثٍ : كَانَ لَا يَدُمُ أَحَدًا ، وَلا يَعِيبُهُ ، وَلا يَطْلُبُ عَوْرَتَهُ ، وَلَا يَتَكَلَّمُ إِلَّا فِيمَا رَجَا ثَوَابَهُ ، وَإِذَا تَكَلَّمَ أَطْرَقَ جُلَسَاؤُهُ ، كَأَنَّمَا عَلَى رُءُوسِهِمُ الطَّيْرُ ، فَإِذَا سَكَتَ تَكَلَّمُوا لا يَتَنَازَعُونَ عِنْدَهُ الْحَدِيثَ ، وَمَنْ تَكَلَّمَ عِنْدَهُ أَنْصَتُوا لَهُ حَتَّى يَفْرُغَ ، حَدِيثُهُمْ عِنْدَهُ حَدِيثُ أَوَّلِهِمْ ، يَضْحَكُ مِمَّا يَضْحَكُونَ مِنْهُ ، وَيَتَعَجَّبُ مِمَّا يَتَعَجَّبُونَ مِنْهُ ، وَيَصْبِرُ لِلْغَرِيبِ عَلَى الْجَفْوَةِ فِي مَنْطِقِهِ وَمَسْأَلَتِهِ, حَتَّى إِنْ كَانَ أَصْحَابُهُ, وَيَقُولُ : إِذَا رَأَيْتُمْ طَالِبَ حَاجَةٍ يَطْلُبُهَا فَأَرْفِدُوهُ ، وَلَا يَقْبَلُ الثَّنَاءَ إِلَّا مِنْ مُكَافِي وَلَا يَقْطَعُ عَلَى أَحَدٍ حَدِيثَهُ حَتَّى يَجُوزَ فَيَقْطَعُهُ بِنَهْيِ أَوْ قِيَامٍ "

আমি আমার পিতাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথীদের ব্যাপারে তাঁর আচরণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। উত্তরে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছিলেন সদা হাস্যোজ্জ্বল ও নম্র স্বভাবের অধিকারী। তিনি রূঢ়ভাষী বা কঠিন হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন না। তিনি উচ্চস্বরে কথা বলতেন না, অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করতেন না, অপরের দোষ খুঁজে বেড়াতেন না এবং কৃপণ ছিলেন না। তিনি অপছন্দনীয় কথা হতে বিরত থাকতেন। তিনি কাউকে নিরাশ করতেন না, আবার মিথ্যা প্রতিশ্রুতিও দিতেন না। তিনটি বিষয় থেকে তিনি দূরে থাকতেন -
* ঝগড়া-বিবাদ।
* অহংকার করা।
* অযথা কথাবার্তা বলা।

লোকদের ব্যপারে তিনটি কাজ হতে বিরত থাকতেন -
* কারো নিন্দা করতেন না।
* কাউকে অপবাদ দিতেন না।
* এবং কারো দোষ-ত্রুটি তালাশ করতেন না。

যে কথায় সওয়াব হয়, শুধু তাই বলতেন। তিনি যখন কথা বলতেন তখন উপস্থিত শ্রোতাদের মনোযোগ এমনভাবে আকর্ষণ করতেন, যেন তাদের মাথার উপর পাখি বসে আছে। তিনি কথা বলা শেষ করলে অন্যরা তাকে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা জিজ্ঞেস করতে পারতো। তাঁর কথায় কেউ বাদানুবাদ করতো না। কেউ কোন কথা বলা শুরু করলে তাঁর কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি চুপ থাকতেন। কেউ কোন কথায় হাসলে বা বিস্ময় প্রকাশ করলে তিনিও হাসতেন কিংবা বিস্ময় প্রকাশ করতেন।

অপরিচিত ব্যক্তির রূঢ় আচরণ কিংবা কঠোর উক্তি ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করতেন। কখনো কখনো সাহাবীগণ অপরিচিত লোক নিয়ে আসতেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলতেন, কারো কোন প্রয়োজন দেখলে তা সমাধান করতে তোমরা সাহায্য করবে। কেউ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে তিনি চুপ করে থাকতেন। কেউ কথা বলতে থাকলে তাকে থামিয়ে দিয়ে নিজে কথা আরম্ভ করতেন না। অবশ্য কেউ অযথা কথা বলতে থাকলে তাকে নিষেধ করে দিতেন, অথবা মজলিস হতে উঠে যেতেন, যাতে বক্তার কথা বন্ধ হয়ে যায়।

তুমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে একটি একটি করে চিন্তা করো এবং তা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন ঘটাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করো। কারণ এই বৈশিষ্টগুলোর মধ্যেই রয়েছে পূর্ণ কল্যাণ এবং উভয় জাহানের সফলতার সোপান।

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বৈশিষ্ট্যের একটি ছিলো তিনি তার সাথীদেরকে দ্বীনের বিষয়াদি শিক্ষা দিতেন। যেমন তিনি মজলিসে সাহাবায়ে কেরাম রা. দের উদ্দেশ্য করে বলতেন,
من مات وهو يدعو من دون الله ندا دخل النار
যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলার সাথে অন্য কাউকে শরীক করে মারা গেলো সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলতেন,
المسلم من سلم المسلمون من لسانه ويده، والمهاجر من هجر ما نهى الله عنه
মুসলিম তো সে যার জবান ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ থাকে। আর মুহাজির হলো সেই যে, আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয় পরিত্যাগ করে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলতেন,
بشروا المشائين في الظلم إلى المساجد بالنور التام يوم القيامة
যারা অন্ধকারের মধ্যে হেঁটে হেঁটে মসজিদে আসে তাদেরকে কিয়ামতের দিনে পূর্ণ নূরের সুসংবাদ দাও।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলতেন,
جاهدوا المشركين بأموالكم وأنفسكم وألسنتكم
তোমারা তোমাদের জান, মাল ও জবানের মাধ্যমে মুশরিকদের সাথে জিহাদ করো।

তিনি আরো বলেন,
إن العبد ليتكلم بالكلمة ما يتبين فيها يزل بها إلى النار أبعد مما بين المشرق والمغرب
নিশ্চয়ই বান্দা এমনও কথা বলে এবং তাতে সে এমন কিছু প্রকাশ করে, যার ফলে সে পূর্ব-পশ্চিমের দূরত্ব পরিমাণ জাহান্নামের দিকে ছিটকে পড়ে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
إني لم أبعث لعانا، وإنما بعثت رحمة
আমি অভিশম্পাতকারী রূপে প্রেরিত হইনি। আমি প্রেরিত হয়েছি রহমত স্বরূপ।

ওমর রা. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
لا تطروني كما أطرت النصارى ابن مريم
তোমরা আমার ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করো না যেমনিভাবে খৃষ্টানরা ঈসা ইবনে মারইয়াম আ. এর ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করেছে।

জুনদুব ইবনে আব্দুল্লাহ (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
سَمِعْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَبْلَ أَنْ يَمُوتَ بِخَمْسٍ وَهُوَ يَقُولُ " إِنِّي أَبْرَأُ إِلَى الله أَنْ يَكُونَ لِي مِنْكُمْ خَلِيلٌ فَإِنَّ اللَّهَ تَعَالَى قَدِ اتَّخَذَنِي خَلِيلاً كَمَا اتَّخَذَ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلاً وَلَوْ كُنْتُ مُتَّخِذًا مِنْ أُمَّتِي خَلِيلاً لَاتَّخَذْتُ أَبَا بَكْرٍ خَلِيلاً أَلَا وَإِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَانُوا يَتَّخِذُونَ قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ وَصَالِحِيهِمْ مَسَاجِدَ أَلَا فَلَا تَتَّخِذُوا الْقُبُورَ مَسَاجِدَ إِنِّي أَنْهَاكُمْ عَنْ ذَلِكَ
আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মৃত্যুর পাঁচদিন পূর্বে তাকে বলতে শুনেছি যে, তোমাদের মধ্যে থেকে আমার কোন খলীল বা একান্ত বন্ধু থাকার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে মুক্ত। কারণ মহান আল্লাহ ইবরাহীমকে যেমন খলীল বা একান্ত বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন, সে রকমভাবে আমাকেও খলীল বা একান্ত বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আমি আমার উম্মাতের মধ্য থেকে কাউকে খলীল বা একান্ত বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে চাইলে আবু বকরকেই করতাম। সাবধান থেকো তোমাদের পূর্বের যুগের লোকেরা তাদের নাবী ও নেককার লোকদের কবরসমূহকে মসজিদ (সেজদার স্থান) হিসেবে গ্রহণ করতো। সাবধান তোমরা কবরসমূহকে সেজদার স্থান বানাবে না। আমি এরূপ করতে তোমাদেরকে নিষেধ করে যাচ্ছি।

এর উপর ভিত্তি করে বলা হয় যেই মসজিদে এক বা একাধিক কবর রয়েছে তাতে নামায আদায় করা জায়েয নেই।

টিকাঃ
৩৯ আহমাদ
৪০ তিরমিযী
৪১ বুখারী, হাদিস: ১০; মুসলিম, হাদিস: ৪২
৪২ তিরমিযী, হাদিস: ২২৩; ইবনু মাযাহ, হাদিস: ৭৮
৪৩ আবু দাউদ
৪৪ বুখারী, হাদিস: ৬৪৭৭; মুসলিম, হাদিস: ২৯৮৮
৪৫ মুসলিম, হাদিস: ২৫৯৯
৪৬ বুখারী, হাদিস: ৩৪৪৫
৪৭ মুসলিম, হাদিস: ৫৩২

📘 রাসূল ﷺ এর বাড়িতে একদিন 📄 রাসূল ﷺ এর কন্যাগণ

📄 রাসূল ﷺ এর কন্যাগণ


জাহেলিয়‍্যাতের যুগে কন্যা সন্তানের জন্মের দিনটি ছিলো পিতা-মাতার জন্য এক কালো শোক দিবস। বরং কন্যা সন্তানের জন্ম ছিলো পুরো পরিবার এবং বংশের জন্য লজ্জা ও কলঙ্কের। ঐ সমাজে কন্যা সন্তান জন্মের লজ্জা ও কলঙ্ক থেকে বাঁচার জন্য তারা মেয়েদের জীবন্ত মাটিতে পুঁতে হত্যা করতো।

আর তাদেরকে জীবন্ত পুঁতে ফেলার কর্মটিও সম্পাদন করতো অত্যন্ত কুৎসিত ও নির্দয়ভাবে। এজন্য তাদের মনে থাকতো না কোন ধরণের দয়া ও সহানুভূতি। কন্যা সন্তানকে জীবন্ত পুঁতে ফেলা হতো। আর তারা এই অপরাধ কর্মটি সম্পাদন করতো বিভিন্ন নির্মম পদ্ধতিতে।

যেমন কেউ কেউ মেয়েকে বড় হতে দিতো। অতঃপর তার বয়স যখন সাত বছর হতো তখন বাবা তার মাকে বলতো। তাকে সুন্দর করে সাজিয়ে সুগন্ধি মেখে প্রস্তুত করে দাও। আমি তাকে নিয়ে আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে যাবো। অন্য দিকে সে মরুভূমিতে আগ থেকেই গর্ত খুঁড়ে আসতো। অতঃপর সে যখন মেয়েকে নিয়ে সেই কূপের কাছে আসতো তখন তাকে বলতো, তুমি দেখো তো তাতে কী আছে। মেয়ে যখন কূপের দিকে তাকাতো তখন পিছন থেকে ধাক্কা দিয়ে তাকে ভিতরে ফেলে দিতো, এবং খুব হিংস্র ও নির্দয়ভাবে তাকে মাটি চাপা দিতো।

এই জাহেলী সমাজেই নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্য ও ইনসাফের দ্বীন নিয়ে এলেন। যেই ধর্ম নারীকে মর্যাদা দিয়েছে, একজন মা হিসেবে, কন্যা হিসেবে, বোন হিসেবে, ফুফু ও খালা হিসেবে এবং একজন স্ত্রী হিসেবে। সেই জাহেলী সমাজে রাসূলুল্লাহ তাঁর কন্যাদের দিয়েছেন আন্তরিক ভালোবাসা এবং পূর্ণ মর্যাদা। সেই ভালোবাসা ও মর্যাদার একটা চিত্র দেখুন।

মেয়ে ফাতেমা রা. যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট আসতেন তখন তিনি সস্থান থেকে উঠে সামনে এগিয়ে গিয়ে তাকে স্বগত জানাতেন এবং তার হাত ধরে তাতে চুমু খেতেন এবং নিজ স্থানে তাকে নিয়ে বসাতেন। অন্য দিকে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও যখন ফাতেমা রা. এর বাড়িতে আসতেন তখন তিনি উঠে গিয়ে তাঁর হাত ধরে তাতে চুমু খেতেন এবং নিজ আসনে নিয়ে তাঁকে বসাতেন।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কন্যাদের সীমাহীন ভালোবাসলেও দ্বীনের উপর কখনই তিনি তাদেরকে প্রাধান্য দিতেন না। তার একটি নমুনা দেখুন। দ্বীনের দাওয়াত বন্ধ করার জন্য মক্কার মুশরিকরা যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর উপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করতে লাগলো। তারা তাকে শারীরিক ও মানষিক ভাবে কষ্ট দিতে লাগলো। যারা রাসূলুল্লাহ কে বিভিন্নভাবে কষ্ট দিতো তাদের মধ্যে সামনের কাতারে থেকে নেতৃত্ব দানকারী লোকগুলোর মধ্যে তাঁর আপন চাচা আবু লাহাব ছিল অন্যতম।

আবু লাহাবের ধ্বংসের ব্যাপারে কুরআনে আয়াত নাযিল হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত এবং ধ্বংস হোক সেও। আবু লাহাবের দুই ছেলে উতবা ও উতাইবার সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দুই কন্যা উম্মে কুলসুম এবং রুকায়‍্যার বিয়ে হয়। কোরাইশরা রাসূলুল্লাহ ﷺ কে দ্বীনের দাওয়াত বন্ধ না করলে তাঁর মেয়েকে তালাক দেওয়ার হুমকি দিলো এবং তাদের তালাক দিয়ে দিলো。

রাসূলুল্লাহ অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে এই বিপদ মেনে নিলেন এবং মজবুত পাহাড়ের ন্যায় দ্বীনের দাওয়াতের ক্ষেত্রে অটল রইলেন।

মেয়েদের প্রতি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ভালোবাসা এবং তাদের জন্য আনন্দিত হওয়ার আরেকটা উদাহরণ। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
كنا أزواج النبي - صلى الله عليه وسلم - عنده، فأقبلت فاطمة رضي الله عنها تمشي ما تخطيء مشيتها من مشية رسول الله - صلى الله عليه وسلم - شيئًا فلما رآها رحب بها وقال: مرحبا بابنتي ثم أجلسها عن يمينه أو عن شماله

একবার আমরা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রীরা তাঁর নিকট বসা ছিলাম। তখন ফাতেমা রা. আসলেন। তাঁর হাঁটা ছিলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাঁটার মত। তিনি যখন তাকে দেখলেন, তখন তাকে অভিনন্দন জানালেন, এবং বললেন, “মেয়ে আমার! অভিনন্দন তোমাকে”। অতঃপর তাকে তাঁর ডান অথবা বাম পাশে বসালেন।

রাসূলুল্লাহ তাঁর মেয়েদের ভালোবাসতেন, আদর করতেন। কিন্তু দ্বীনের ক্ষেত্রে তাদেরকে সামন্যতমও ছাড় দিতেন না এবং তাদের দুনিয়াকে আখেরাতের উপর প্রাধান্য দিতে দিতেন না। তিনি সর্বদাই চাইতেন তাঁর কলিজার টুকরো কন্যারা যেন আখেরাতে সুখে থাকে। তাদের আখেরাত যেন হয় অনেক সুন্দর ও শান্তির। বিষয়টিকে আমরা সামনের ঘটনা থেকেই বুঝতে পারবো। সাথে সাথে ঘটনাটি থেকে আমরা আরো বুঝতে পারবো যে, রাসূলুল্লাহ কন্যাদের বিভিন্ন প্রয়োজনে তাদের বাড়ি যেতেন এবং তাদের খোঁজ খবর নিতেন। আলী রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,

أَنَّ فَاطِمَةَ - عَلَيْهِمَا السَّلامُ - شَكَتْ مَا تَلْقَى فِي يَدِهَا مِنَ الرَّحَى، فَأَتَتِ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم تَسْأَلُهُ خَادِمًا، فَلَمْ تَجِدْهُ ، فَذَكَرَتْ ذَلِكَ لِعَائِشَةَ، فَلَمَّا جَاءَ أَخْبَرَتْهُ. قَالَ فَجَاءَنَا وَقَدْ أَخَذْنَا مَضَاجِعَنَا، فَذَهَبْتُ أَقُومُ فَقَالَ " مَكَانَكِ ". فَجَلَسَ بَيْنَنَا حَتَّى وَجَدْتُ بَرْدَ قَدَمَيْهِ عَلَى صَدْرِي فَقَالَ " أَلَا أَدُلُّكُمَا عَلَى مَا هُوَ خَيْرٌ لَكُمَا مِنْ خَادِمٍ، إِذَا أَوَيْتُمَا إِلَى فِرَاشِكُمَا، أَو أَخَذْتُمَا مَضَاجِعَكُمَا، فَكَبِّرًا ثَلَاثًا وَثَلاثِينَ، وَسَبِّحَا ثَلاثًا وَثَلاثِينَ، وَاحْمَدًا ثَلاثًا وَثَلَاثِينَ، فَهَذَا خَيْرٌ لَكُمَا مِنْ خَادِمٍ ". وَعَنْ شُعْبَةَ عَنْ خَالِدٍ عَنِ ابْنِ سِيرِينَ قَالَ التَّسْبِيحُ أَرْبَعُ وَثَلَاثُونَ.

একবার গম পেষার যাঁতা ঘুরানোর কারণে ফাতেমা রা. এর হাতে ফোস্কা পড়ে গেলো। তখন তিনি একটি খাদেম চেয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এলেন। কিন্তু তিনি তাঁকে পেলেন না। তখন তিনি আসার উদ্দেশ্যটি আয়েশা (রাঃ) এর নিকট ব্যক্ত করে গেলেন। এরপর তিনি যখন গৃহে ফিরলেন তখন আয়েশা (রাঃ) এ বিষয়টি তাঁকে জানালেন। তারপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে এমন সময় আগমন করলেন যখন আমরা বিছানায় বিশ্রাম গ্রহণ করেছি। তখন আমি উঠতে চাইলে তিনি বললেন, নিজ স্থানেই অবস্থান করো। তারপর আমাদের মাঝখানেই তিনি এমনিভাবে বসে গেলেন যে, আমি তার দু'পায়ের শীতল স্পর্শ আমার বুকে অনুভব করলাম। তিনি বললেন, আমি কি তোমাদের এমন একটি আমল বলে দেব না, যা তোমাদের জন্য একটি খাদেমের চেয়েও অধিক উত্তম। যখন তোমরা শয্যা গ্রহণ করতে যাবে, তখন তোমরা আল্লাহু আকবার ৩৩ বার, সুবহানাল্লাহ ৩৩ বার, আলহামদুলিল্লাহ ৩৩ বার পড়বে। এটা তোমাদের জন্য একটি খাদেমের চেয়েও অধিক কল্যাণকর। ইবনু সীরীন (রহ.) বলেনঃ তাসবীহ হলো ৩৪ বার।

রাসূলুল্লাহ এর প্রতিটি বিষয়ই তো আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। সন্তান হারানোর পর ধৈর্য ধারণ করার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ কে উত্তম আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করবো। একমাত্র ফাতেমা রা. ব্যতীত তাঁর সকল পুত্র ও কন্যা সন্তানের ইন্তেকাল হয় তাঁর জীবদ্দশায়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ আল্লাহ তা'আলার ফায়সালার উপর পরিপূর্ণ ধৈর্য ধারণ করেন। তিনি কোন ধরণের বিলাপ করেননি, চিৎকার চেঁচামেচি করেননি, মাটিতে হাত মুখ চাপরাননি এবং বিলাপ করতে করতে নিজের জামা কাপড় ছিরে ফেলেননি। বরং তিনি আল্লাহ তা'আলার ফায়সালার উপর সন্তুষ্ট থেকে উত্তমভাবে ধৈর্য ধারণ করেছেন। বিপদগ্রস্ত ও দুঃখকষ্টে আক্রান্ত লোকেরা যদি আল্লাহ তা'আলার ফায়সালার উপর সন্তুষ্ট থেকে ধৈর্য ধারণ করে তাহলে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে অনেক সওয়াব ও প্রতিদান দান করেন। রাসূলুল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি বিপদে মুসিবতে বলবে,
إنا لله وإنا إليه راجعون اللهم أجرني في مصيبتي واخلف لي خيراً منها
আল্লাহ তা'আলা তাকে তার চেয়ে উত্তম কিছু দান করবেন। إنا لله وإنا إليه راجعون (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমাদের প্রত্যাবর্তন তাঁর নিকটই) এই দো'আ বিপদগ্রস্ত ও মুসিবতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের আশ্রয়স্থল। যারা বিপদের সময় ধৈর্য ধারণ করে এই দো'আ পড়বে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে অনেক অনেক প্রতিদান দান করবেন। ধৈর্যশীলদের পুরুষ্কারের ঘোষণা দিয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ
নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের প্রতিদান দেওয়া হবে অগণিত।

টিকাঃ
৪৮ আবু দাউদ, তিরমিযী ও নাসায়ী
৪৯ মুসলিম, হাদিস: ২৪৫০
৫০ বুখারী, হাদিস: ৩৭০৫
৫১ মুসলিম, হাদিস: ৯১৮
৫২ সূরা বাকারাহ: ১৫৬
৫৩ সূরা জুমার-১০

ফন্ট সাইজ
15px
17px