📄 রাসূল ﷺ এর কথা
ইতিপূর্বে আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কিছু গুণাবলী সম্পর্কে জেনেছি। এখন আমরা রাসূল ﷺ এর কথা-বার্তা সম্পর্কে জানবো। কেমন ছিলো তাঁর কথা বলার ধরণ এবং কিভাবে তিনি কথা বলতেন? আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পবিত্র জবান থেকে কথা শোনার পূর্বে সাহাবায়ে কেরামদের রা. থেকে তাঁর কথা বলা সম্পর্কে জানবো। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
مَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَسْرُدُ سُرْدَكُمْ هَذَا ، وَلَكِنَّهُ كَانَ يَتَكَلَّمُ بِكَلامٍ بَيِّنٍ فَصْلٍ ، يَحْفَظُهُ مَنْ جَلَسَ إِلَيْهِ. "
রাসূলুল্লাহ ﷺ তোমাদের ন্যায় চটপটে, তথা অস্পষ্টভাবে তাড়াতাড়ি কথা বলতেন না, বরং তাঁর প্রতিটি কথা ছিলো সুস্পষ্ট। আর শ্রোতারা খুব সহজেই তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারতো。
রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন অত্যন্ত নরম ও কোমল হৃদয়ের অধিকারী। তিনি মানুষের সাথে কোমলভাবে সহজ ভাষায় কথা বলতেন। তিনি চাইতেন তাঁর কথা যেন সকলেই বুঝতে পারে। উম্মতের প্রতি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর খেয়াল ছিলো এতটাই বেশি যে, তিনি শ্রোতাদের বোধ ও স্মৃতি শক্তির তারতম্যের প্রতি খেয়াল রেখে কথা বলতেন। আর এটা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ধৈর্যশীলতা ও সহনশীলতারও প্রমাণ বহন করে।
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
كَانَ كَلاَمُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَلامًا فَصْلاً يَفْهَمُهُ كُلُّ مَنْ يَسْمَعُهُ
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কথা ছিল সুস্পষ্ট ও ধীরস্থির, প্রত্যেক শ্রোতাই তাঁর কথা বুঝতে পারতো。
প্রিয় ভাই! একবার চিন্তা করে দেখো যে, কেমন ছিলো রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কোমলতা ও তাঁর অন্তরের প্রশস্ততা। শ্রোতারা যেন তার কথা ঠিক মত বুঝতে পারে সেজন্য তিনি একটি কথা কয়েকবার বলতেন।
আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ , يُعِيدُ الْكَلِمَةَ ثَلاَثًا لِتُعْقَلَ عَنْهُ."
রাসূলুল্লাহ ﷺ কোন কোন কথা তিনবার বলতেন, যাতে (শ্রোতারা) ভালোভাবে তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারে。
রাসূলুল্লাহ ﷺ মানুষের সাথে কোমল আচরণ করতেন। তাদের সান্ত্বনা দিতেন। তারা যেন তাকে ভয় না করে সে বিষয়ে তাদেরকে প্রবোধ দিতেন। কারণ অনেকেই তাঁকে ভয় করে চলতো।
ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَجُلٌ ، فَكَلَّمَهُ ، فَجَعَلَ تُرْعَدُ فَرَائِصُهُ ، فَقَالَ لَهُ : هَوِّنْ عَلَيْكَ ، فَإِنِّي لَسْتُ بِمَلِكِ ، إِنَّمَا أَنَا ابْنُ امْرَأَةٍ تَأْكُلُ الْقَدِيدَ
এক লোক নবী কারীম ﷺ এর নিকট এসে তাঁর সাথে কথা বললো। তখন ভয়ে তার শরীর কাঁপছিলো। তখন তিনি তাকে বললেন, স্বাভাবিক হও। ভয়ের কোন কারণ নেই। আমি কোন ফেরেশতা নই। আমি তো একজন মায়ের সন্তান যিনি শুকনো গোশত খেতেন。
টিকাঃ
১৯ তিরমিযি, হাদিস: ৩৬৩৯
২০ আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৩৯
২১ বুখারী, হাদিস: ৯৪, ৯৫, ৬২৪৪
২২ ইবন মাজাহ, হাদিস: ৩৩১২
📄 বড়ির ভিতর
আমরা এখন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বাড়িতে, তাঁর ঘরের ভিতরে অবস্থান করছি। আমরা আমাদের নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বাড়ি ও ঘরের প্রতিটি বিষয় দেখবো এবং সেগুলোকে আমাদের জীবনে এবং আমাদের বাড়ি ও ঘরের উত্তম আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করবো। সাহাবায়ে কেরামগণ রা. আমাদের নিকট এই ঘরের বিভিন্ন বিষয়ের বর্ণনা দিবেন।
আমরা যখন তাঁর ঘরের অভ্যন্তর ও তার দেয়ালের দিকে তাকাবো তখন আমরা দেখবো ও জানতে পারবো যে, এই ঘরের মূল ভিত্তি হচ্ছে বিনয় এবং তার আসবাব পত্র হচ্ছে ঈমান। এ কারণেই আমরা দেখবো তাঁর ঘরের দেয়ালে কোন প্রাণী বা অন্য কোন ছবি টানো নেই। কিন্তু আফসোস! বর্তমানে বেশীরভাগ ঘরে বিভিন্ন প্রাণীর ছবি ও প্রতিকৃতি ঝুলানো থাকে। অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
لا تدخل الملائكة بيتا فيه كلب ولا تصاوير যেই ঘরে কুকুর বা অন্য কোন প্রাণীর ছবি থাকে তাতে ফেরেশতা প্রবেশ করে না।
এরপর আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ জীবনে ব্যবহার্য কিছু জিনিসের দিকে দৃষ্টি দেবো। ছাবেত রা. বর্ণনা করেন,
أخرج إلينا أنس بن مالك قدح خشب غليظا مضببًا بجديد فقال: يا ثابت لم - . وكان - صلى الله عليه وسلم هذا قدح رسول الله - صلى الله عليه وسلم - . - يشرب فيه الماء والنبيذ والعسل واللبن.
একবার আনাস ইবনে মালেক রাঃ আমদের সামনে মোটা লোহার পাত দিয়ে তৈরি কাঠের একটি পাত্র নিয়ে এলেন। অতঃপর বললেন, ছাবেত! এটা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পাত্র। তিনি এতে পানি, নাবিজ, মধু এবং দুধ পান করতেন。
আনাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
أن رسول الله - صلى الله عليه وسلم - كان يتنفس في الشراب ثلاثا». يعني: يتنفس خارج الإناء.
রাসূলুল্লাহ তিন শ্বাসে পানি পান করতেন। (অর্থাৎ তিনি পাত্রের বাইরে নিঃশ্বাস ফেলতেন。)
অন্য এক হাদিসে এসেছে, ونهى عليه الصلاة والسلام أن يتنفس في الإناء أو ينفخ فيه
রাসূলুল্লাহ পাত্রের ভিতরে নিঃশ্বাস ফেলতে অথবা ফুঁ দিতে নিষেধ করেছেন。
আর সেই বর্ম যেটা পরিধান করে রাসূলুল্লাহ জিহাদে গিয়েছেন, কঠিন দিনগুলোতে যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর মোকাবেলা করেছেন। হয় তো সেটা এখন রাসূলুল্লাহ এর বাড়িতে নেই। কারণ রাসূলুল্লাহ সেটা এক ইহুদির কাছ বন্ধক রেখে তার কাছ থেকে ত্রিশ সের জব নিয়েছেন ধার হিসেবে। যেমনটি আয়েশা রা. বলেছেন,
ومات الرسول - صلى الله عليه وسلم - والدرع عند اليهودي
রাসূলুল্লাহ এর ইন্তেকালের সময়ও বর্মটি ইহুদি লোকটির কাছেই ছিলো。
রাসূলুল্লাহ কখনই হঠাৎ করে, লুকিয়ে লুকিয়ে ঘরে চলে আসতেন না। বরং তিনি তার আগমন সম্পর্কে ঘরের লোকদের অবগত করে তবেই ঘরে প্রবেশ করতেন। তিনি ঘরে প্রবেশের পূর্বে তাদেরকে সালাম দিতেন。
প্রিয় ভাই! তুমি রাসূলুল্লাহ এর এই হাদিস নিয়ে একটু চিন্তা-ফিকির করো, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
طوبى لمن هدي إلى الإسلام، وكان عيشه كفافًا وقنع
সুসংবাদ ঐব্যক্তির জন্য যাকে ইসলামের দিকে হেদায়াত করা হয়েছে এবং তার জীবন যাপন ছিল সাদামাটা চলার মত আর সে ছিলো এতেই তৃপ্ত。
তুমি তোমার কর্ণকে প্রসারিত করে রাসূলুল্লাহ এর এই কথাটা একবার শোনো, তিনি বলেছেন,
من أصبح آمنا في سربه، معافى في جسده، عنده قوت يومه، فكأنما حيزت له الدنيا بحذافيرها
যে ব্যক্তি তার গোত্রের লোকদের মধ্যে নিরাপদে আছে। তার শরীরও সুস্থ। আর তার কাছে একদিনের পরিমাণ খাবার রয়েছে। দুনিয়ার সকল সুখ- শান্তিই যেন তাকে দেওয়া হয়েছে。
টিকাঃ
১ মুসলিম, হাদিস: ২১০৬
২৩ তিরমিযী
২৪ তিরমিযী, হাদিস: ১৯০৭
২৫ তিরমিযী, হাদিস: ১৯০৭
২৬ বুখারী ও মুসলিম
২৭ যাদুল মা'আদ ২/৩৮১
২৮ তিরমিযী, হাদিস: ২৩৪৯
২৯ তিরমিযী, হাদিস: ২৩৪