📘 রাসূল ﷺ এর বাড়িতে একদিন 📄 রাসূল ﷺ এর বর্ণনা

📄 রাসূল ﷺ এর বর্ণনা


আমরা রাসূল ﷺ এর বাড়ির একেবারে নিকটে চলে এসেছি। আমরা তার দরজায় আওয়াজ দিয়ে ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইবো। আমরা এখন সেই সাহাবীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবো যারা রাসূল ﷺ কে দেখেছেন এবং নিখুঁতভাবে তাঁর বর্ণনা দিয়েছেন।
বারা ইবনে আজেব রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
كَانَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم أَحْسَنَ النَّاسِ وَجْهَا وَأَحْسَنَهُ خَلْقًا لَيْسَ بِالطَّوِيْلِ الْبَائِنِ وَلَا بِالْقَصِيْرِ
আল্লাহর রাসূল ﷺ এর চেহারা ছিলো মানুষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সুন্দর এবং তিনি ছিলেন সর্বোত্তম আখলাকের অধিকারী। তিনি বেশি লম্বাও ছিলেন না এবং বেঁটেও ছিলেন না。
বারা ইবনে আজেব রা. থেকে বর্ণিত অন্য এক হাদিসে এসেছে। তিনি বলেন,
كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم مَرْبُوعًا بَعِيدَ مَا بَيْنَ الْمَنْكِبَيْنِ لَهُ شَعَرُ يَبْلُغُ شَحْمَةَ أُذُنِهِ رَأَيْتُهُ فِي حُلَّةٍ حَمْرَاءَ لَمْ أَرَ شَيْئًا قَطُّ أَحْسَنَ مِنْهُ قَالَ يُوسُفُ بْنُ أَبِي إِسْحَاقَ عَنْ أَبِيْهِ إِلَى مَنْكِبَيْهِ
নবী কারীম মাঝারি গড়নের ছিলেন। তাঁর উভয় কাঁধের মধ্যস্থল প্রশস্ত ছিলো। তাঁর মাথার চুল দুই কানের লতি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। আমি তাঁকে লাল ডোরাকাটা জোড় চাদর পরা অবস্থায় দেখেছি। তাঁর চেয়ে বেশি সুন্দর আমি কখনো কাউকে দেখিনি। ইউসুফ ইবনে আবু ইসহাক তাঁর পিতা হতে হাদীস বর্ণনায় বলেন, নাবী ﷺ এর মাথার চুল কাঁধ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো。
আবু ইসহাক আস সাবিয়ী রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
سَأَلَ رَجُلُ الْبَرَاءَ بْنَ عَازِبٍ : أَكَانَ وَجْهُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ . " مثل السَّيْفِ ؟ قَالَ : " لا ، بَلْ مثل الْقَمَرِ
একবার বারা ইবনে আযিব (রাঃ) কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর চেহারা কি তরবারির ন্যায় ছিলো? তিনি বললেন, না; বরং তা ছিলো চাঁদের মত。
আনাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
- ما مسست بيدي ديباجًا ولا حريرًا، ولا شيئًا ألين من كف رسول الله صلى الله عليه وسلم -، ولا شممت رائحة أطيب من ريح رسول الله صلى الله عليه وسلم
আমি রেশম ও রেশমী কাপড় ও অন্যান্য নরম জিনিস ধরে দেখেছি, কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ এর হাতের চেয়ে নরম কিছু পাইনি। রাসূলের শরীরের ঘ্রাণের চেয়ে উত্তম কোন ঘ্রাণ আমি কখনো পাইনি。
রাসূল ﷺ এর গুনাবলীর অন্যতম একটি হলো, লজ্জা। আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
كان - صلى الله عليه وسلم - أشد حياء من العذراء في خدرها، فإذا رأى شيئًا يكرهه عرفناه في وجهه
রাসূলুল্লাহ পর্দার আড়ালে থাকা কুমারী বলিকার চেয়েও বেশি লজ্জাশীল ছিলেন। অপছন্দনীয় কিছু তাঁর চোখে পড়লে আমরা তাঁর চেহারা দেখেই তা বুঝতে পারতাম。

টিকাঃ
১৪ বুখারী, হাদিস: ৩৫৪৯, মুসলিম ৪৩/২৫ হাঃ ২৩৩৭, আহমাদ ১৮৫৮২
১৫ বুখারী, হাদিস: ৩৫৫১, মুসলিম হাদিস: ২৩৩৭
১৬ বুখারী, হাদিস: ৩৫৫২
১৭ বুখারী, হাদিসি: ৩৫৬১ মুসলিম, হাদিস: ২৩৩০
১৮ বুখারী, হাদিস: ৩৫৬২

📘 রাসূল ﷺ এর বাড়িতে একদিন 📄 রাসূল ﷺ এর কথা

📄 রাসূল ﷺ এর কথা


ইতিপূর্বে আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কিছু গুণাবলী সম্পর্কে জেনেছি। এখন আমরা রাসূল ﷺ এর কথা-বার্তা সম্পর্কে জানবো। কেমন ছিলো তাঁর কথা বলার ধরণ এবং কিভাবে তিনি কথা বলতেন? আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পবিত্র জবান থেকে কথা শোনার পূর্বে সাহাবায়ে কেরামদের রা. থেকে তাঁর কথা বলা সম্পর্কে জানবো। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
مَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَسْرُدُ سُرْدَكُمْ هَذَا ، وَلَكِنَّهُ كَانَ يَتَكَلَّمُ بِكَلامٍ بَيِّنٍ فَصْلٍ ، يَحْفَظُهُ مَنْ جَلَسَ إِلَيْهِ. "
রাসূলুল্লাহ ﷺ তোমাদের ন্যায় চটপটে, তথা অস্পষ্টভাবে তাড়াতাড়ি কথা বলতেন না, বরং তাঁর প্রতিটি কথা ছিলো সুস্পষ্ট। আর শ্রোতারা খুব সহজেই তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারতো。
রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন অত্যন্ত নরম ও কোমল হৃদয়ের অধিকারী। তিনি মানুষের সাথে কোমলভাবে সহজ ভাষায় কথা বলতেন। তিনি চাইতেন তাঁর কথা যেন সকলেই বুঝতে পারে। উম্মতের প্রতি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর খেয়াল ছিলো এতটাই বেশি যে, তিনি শ্রোতাদের বোধ ও স্মৃতি শক্তির তারতম্যের প্রতি খেয়াল রেখে কথা বলতেন। আর এটা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ধৈর্যশীলতা ও সহনশীলতারও প্রমাণ বহন করে।
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
كَانَ كَلاَمُ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَلامًا فَصْلاً يَفْهَمُهُ كُلُّ مَنْ يَسْمَعُهُ
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কথা ছিল সুস্পষ্ট ও ধীরস্থির, প্রত্যেক শ্রোতাই তাঁর কথা বুঝতে পারতো。
প্রিয় ভাই! একবার চিন্তা করে দেখো যে, কেমন ছিলো রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কোমলতা ও তাঁর অন্তরের প্রশস্ততা। শ্রোতারা যেন তার কথা ঠিক মত বুঝতে পারে সেজন্য তিনি একটি কথা কয়েকবার বলতেন।
আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ , يُعِيدُ الْكَلِمَةَ ثَلاَثًا لِتُعْقَلَ عَنْهُ."
রাসূলুল্লাহ ﷺ কোন কোন কথা তিনবার বলতেন, যাতে (শ্রোতারা) ভালোভাবে তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারে。
রাসূলুল্লাহ ﷺ মানুষের সাথে কোমল আচরণ করতেন। তাদের সান্ত্বনা দিতেন। তারা যেন তাকে ভয় না করে সে বিষয়ে তাদেরকে প্রবোধ দিতেন। কারণ অনেকেই তাঁকে ভয় করে চলতো।
ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَجُلٌ ، فَكَلَّمَهُ ، فَجَعَلَ تُرْعَدُ فَرَائِصُهُ ، فَقَالَ لَهُ : هَوِّنْ عَلَيْكَ ، فَإِنِّي لَسْتُ بِمَلِكِ ، إِنَّمَا أَنَا ابْنُ امْرَأَةٍ تَأْكُلُ الْقَدِيدَ
এক লোক নবী কারীম ﷺ এর নিকট এসে তাঁর সাথে কথা বললো। তখন ভয়ে তার শরীর কাঁপছিলো। তখন তিনি তাকে বললেন, স্বাভাবিক হও। ভয়ের কোন কারণ নেই। আমি কোন ফেরেশতা নই। আমি তো একজন মায়ের সন্তান যিনি শুকনো গোশত খেতেন。

টিকাঃ
১৯ তিরমিযি, হাদিস: ৩৬৩৯
২০ আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৩৯
২১ বুখারী, হাদিস: ৯৪, ৯৫, ৬২৪৪
২২ ইবন মাজাহ, হাদিস: ৩৩১২

📘 রাসূল ﷺ এর বাড়িতে একদিন 📄 বড়ির ভিতর

📄 বড়ির ভিতর


আমরা এখন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বাড়িতে, তাঁর ঘরের ভিতরে অবস্থান করছি। আমরা আমাদের নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বাড়ি ও ঘরের প্রতিটি বিষয় দেখবো এবং সেগুলোকে আমাদের জীবনে এবং আমাদের বাড়ি ও ঘরের উত্তম আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করবো। সাহাবায়ে কেরামগণ রা. আমাদের নিকট এই ঘরের বিভিন্ন বিষয়ের বর্ণনা দিবেন।
আমরা যখন তাঁর ঘরের অভ্যন্তর ও তার দেয়ালের দিকে তাকাবো তখন আমরা দেখবো ও জানতে পারবো যে, এই ঘরের মূল ভিত্তি হচ্ছে বিনয় এবং তার আসবাব পত্র হচ্ছে ঈমান। এ কারণেই আমরা দেখবো তাঁর ঘরের দেয়ালে কোন প্রাণী বা অন্য কোন ছবি টানো নেই। কিন্তু আফসোস! বর্তমানে বেশীরভাগ ঘরে বিভিন্ন প্রাণীর ছবি ও প্রতিকৃতি ঝুলানো থাকে। অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
لا تدخل الملائكة بيتا فيه كلب ولا تصاوير যেই ঘরে কুকুর বা অন্য কোন প্রাণীর ছবি থাকে তাতে ফেরেশতা প্রবেশ করে না।
এরপর আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ জীবনে ব্যবহার্য কিছু জিনিসের দিকে দৃষ্টি দেবো। ছাবেত রা. বর্ণনা করেন,
أخرج إلينا أنس بن مالك قدح خشب غليظا مضببًا بجديد فقال: يا ثابت لم - . وكان - صلى الله عليه وسلم هذا قدح رسول الله - صلى الله عليه وسلم - . - يشرب فيه الماء والنبيذ والعسل واللبن.
একবার আনাস ইবনে মালেক রাঃ আমদের সামনে মোটা লোহার পাত দিয়ে তৈরি কাঠের একটি পাত্র নিয়ে এলেন। অতঃপর বললেন, ছাবেত! এটা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পাত্র। তিনি এতে পানি, নাবিজ, মধু এবং দুধ পান করতেন。
আনাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
أن رسول الله - صلى الله عليه وسلم - كان يتنفس في الشراب ثلاثا». يعني: يتنفس خارج الإناء.
রাসূলুল্লাহ তিন শ্বাসে পানি পান করতেন। (অর্থাৎ তিনি পাত্রের বাইরে নিঃশ্বাস ফেলতেন。)
অন্য এক হাদিসে এসেছে, ونهى عليه الصلاة والسلام أن يتنفس في الإناء أو ينفخ فيه
রাসূলুল্লাহ পাত্রের ভিতরে নিঃশ্বাস ফেলতে অথবা ফুঁ দিতে নিষেধ করেছেন。
আর সেই বর্ম যেটা পরিধান করে রাসূলুল্লাহ জিহাদে গিয়েছেন, কঠিন দিনগুলোতে যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর মোকাবেলা করেছেন। হয় তো সেটা এখন রাসূলুল্লাহ এর বাড়িতে নেই। কারণ রাসূলুল্লাহ সেটা এক ইহুদির কাছ বন্ধক রেখে তার কাছ থেকে ত্রিশ সের জব নিয়েছেন ধার হিসেবে। যেমনটি আয়েশা রা. বলেছেন,
ومات الرسول - صلى الله عليه وسلم - والدرع عند اليهودي
রাসূলুল্লাহ এর ইন্তেকালের সময়ও বর্মটি ইহুদি লোকটির কাছেই ছিলো。
রাসূলুল্লাহ কখনই হঠাৎ করে, লুকিয়ে লুকিয়ে ঘরে চলে আসতেন না। বরং তিনি তার আগমন সম্পর্কে ঘরের লোকদের অবগত করে তবেই ঘরে প্রবেশ করতেন। তিনি ঘরে প্রবেশের পূর্বে তাদেরকে সালাম দিতেন。
প্রিয় ভাই! তুমি রাসূলুল্লাহ এর এই হাদিস নিয়ে একটু চিন্তা-ফিকির করো, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
طوبى لمن هدي إلى الإسلام، وكان عيشه كفافًا وقنع
সুসংবাদ ঐব্যক্তির জন্য যাকে ইসলামের দিকে হেদায়াত করা হয়েছে এবং তার জীবন যাপন ছিল সাদামাটা চলার মত আর সে ছিলো এতেই তৃপ্ত。
তুমি তোমার কর্ণকে প্রসারিত করে রাসূলুল্লাহ এর এই কথাটা একবার শোনো, তিনি বলেছেন,
من أصبح آمنا في سربه، معافى في جسده، عنده قوت يومه، فكأنما حيزت له الدنيا بحذافيرها
যে ব্যক্তি তার গোত্রের লোকদের মধ্যে নিরাপদে আছে। তার শরীরও সুস্থ। আর তার কাছে একদিনের পরিমাণ খাবার রয়েছে। দুনিয়ার সকল সুখ- শান্তিই যেন তাকে দেওয়া হয়েছে。

টিকাঃ
১ মুসলিম, হাদিস: ২১০৬
২৩ তিরমিযী
২৪ তিরমিযী, হাদিস: ১৯০৭
২৫ তিরমিযী, হাদিস: ১৯০৭
২৬ বুখারী ও মুসলিম
২৭ যাদুল মা'আদ ২/৩৮১
২৮ তিরমিযী, হাদিস: ২৩৪৯
২৯ তিরমিযী, হাদিস: ২৩৪

📘 রাসূল ﷺ এর বাড়িতে একদিন 📄 নিকটাত্মীয়

📄 নিকটাত্মীয়


এই উম্মতের নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ পরিপূর্ণভাবে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতেন। কখনই কোনভাবে এই সম্পর্ক ছিন্ন হতে দিতেন না। বর্তমানে মানুষ আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে না। সামান্য কারণেই এই মহান সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলে। রাসূলুল্লাহ ছিলেন একজন পূর্ণাঙ্গ মানব। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ।

আর একারণেই তো নবুওয়াতের পূর্বে কাফেররাই তাঁর উপাধি দিয়েছিলো, আস-সাদেক, আল-আমীন (বিশ্বস্ত-সত্যবাদী)। আর নবীজীর উপর সর্বপ্রথম ওহী নাযিল হওয়ার পর যখন তিনি হয়রান-পেরেশান হয়ে খাদিজা রা.-এর কাছে আসলেন তখন খাদিজা রা. তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, আল্লাহ আপনাকে অপদস্থ করবেন না। এরপর নবীজীর যে উত্তম গুণাবলীর উল্লেখ করেছিলেন তার মধ্যে একটি ছিলো-
إنك لتصل الرحم وتصدق
নিশ্চয়ই আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রেখে চলেন এবং দান করেন।

রাসূলুল্লাহ মায়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসার পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তার উপর থাকা মায়ের হক সর্বোত্তমভাবে আদায় করেছেন। তিনি মায়ের কবর যিয়ারতে যেতেন। মমতাময়ী মায়ের ছায়া তো তার উপর থেকে সাত বছর বয়সেই উঠে গিয়েছিলো। কিন্তু তিনি মায়ের কথা কখনো ভুলেননি, এমনকি জীবনের শেষ দিন পর্যন্তও না।

কিন্তু আফসোস আমরা বর্তমানে মাকে ভুলে যাই। মৃত্যুর পর মায়ের কথা স্মরণ রাখা তো দূরের কথা জীবিত থাকা অবস্থাতেও অনেক সময়, মাকে ভুলে যাই। মায়ের সাথে খারাপ আচরণ করি, তাকে ঘর থেকে বের করে দেই। কিন্তু আমাদের নবীজী কখনও মাকে ভুলতে পারেননি, এমনকি নবুওয়ত পাওয়ার পর শত ব্যস্ততা সত্ত্বেও তিনি মায়ের কবর যিয়ারত করতে যেতেন। আবূ হুরাইরা রা. বর্ণনা করে বলেন,

زار النَّبِيُّ - صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - قَبْرَ أُمِّهِ، فَبَكَى وَأَبْكَى مَنْ حَوْلَهُ فَقَالَ: اسْتَأْذَنْتُ رَبِّي فِي أَنْ أَسْتَغْفِرَ لَهَا فَلَمْ يَأْذَنْ لِي، وَاسْتَأْذَنْتُهُ فِي أَنْ أَزُورَ قَبْرَهَا فَأَذِنَ لِي، فَزُورُوا الْقُبُورَ، فَإِنَّهَا تُذَكِّرُ الْمَوْتَ
রাসূলুল্লাহ তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করলেন, নিজে কাঁদলেন এবং আশেপাশের সকলকে কাঁদালেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমি আল্লাহ তা'আলার নিকট তার জন্য (আমার মায়ের জন্য) ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুমতি চাইলাম। তিনি আমাকে এই অনুমতি দেননি। আমি তার কবর যিয়ারতের অনুমতি চেয়েছি তখন আমাকে এই অনুমতি দিয়েছেন। সুতরাং তোমরা কবর যিয়ারত করো কেননা তা মৃত্যুকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

একবার চিন্তা করে দেখো, নিকটাত্মীয়দের প্রতি তার মুহাব্বত কেমন ছিলো? তিনি তাদেরকে কতটা ভালোবাসতেন। তাদেরকে হেদায়াতের পথে আনা ও জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করার ব্যাপারে তিনি কতটা পেরেশান ছিলেন। এজন্য তো তিনি অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন, তবুও তাদেরকে হেদায়েতের পথে আনার চেষ্টা করে গেছেন অবিরাম। আমরা আবু হুরায়রা রা. এর জবান থেকেই শুনি কী চেষ্টা করেছেন তিনি তাদেরকে হেদায়েতের পথে আনতে।

আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
لَمَّا أُنْزِلَتْ هَذِهِ الآيَةُ ( وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ) دَعَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قُرَيْشًا فَاجْتَمَعُوا فَعَمَّ وَخَصَّ فَقَالَ " يَا بَنِي كَعْبِ بْنِ لُؤَيٍّ أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ يَا بَنِي مُرَّةَ بْنِ كَعْبٍ أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ يَا بَنِي عَبْدِ شَمْسٍ أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ يَا بَنِي عَبْدِ مَنَافٍ أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ يَا بَنِي هَاشِمِ أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ يَا بَنِي عَبْدِ الْمُطَّلِبِ أَنْقِذُوا أَنْفُسَكُمْ مِنَ النَّارِ يَا فَاطِمَةُ أَنْقِذِي نَفْسَكَ مِنَ النَّارِ فَإِنِّي لَا أَمْلِكُ لَكُمْ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا غَيْرَ أَنَّ لَكُمْ رَحِمًا سَأَبُلُّهَا بِبَلالِهَا ".

যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হয়: (وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ) “তোমার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করে দাও” (সূরাহ আশ শু'আরা ২৬ - ২১৪)। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ কোরাইশদের ডাকলেন। তারা একত্রিত হলো। তারপর তিনি তাদের সাধারণ ও বিশেষ সকলকে সম্বোধন করে বললেন, হে কাব ইবনে লুওয়াই-এর বংশধর! জাহান্নাম থেকে তোমরা নিজেদের বাঁচাও। হে মুররাহ ইবনে কাব-এর বংশধর! জাহান্নাম থেকে তোমরা আত্মরক্ষা করো। হে আবদে শামস-এর বংশধর! জাহান্নাম থেকে তোমরা আত্মরক্ষা করো। হে আবদে মানাফ-এর বংশধর! জাহান্নাম থেকে তোমরা নিজেদের বাঁচাও। হে হাশিম-এর বংশধর! জাহান্নাম থেকে তোমরা আত্মরক্ষা করো। হে আবদুল মুত্তালিব-এর বংশধর! জাহান্নাম থেকে তোমরা নিজেদের বাঁচাও। হে ফাতিমা! জাহান্নাম থেকে তুমি নিজেকে বাঁচাও।

কারণ, আল্লাহর (আযাব) থেকে রক্ষা করার ব্যাপারে আমার কোন ক্ষমতা নেই। অবশ্য আমি তোমাদের সঙ্গে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করবো।

এই তো আমরা দেখতে পাচ্ছি, আপন চাচা আবু তালিবকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করার জন্য তিনি কতটা পেরেশান। তিনি বারবার যাচ্ছেন তার বাড়িতে, তাকে বুঝানোর জন্য, হেদায়েতের পথে আনার জন্য। এমনকি চাচা আবু তালিব যখন মৃত্যুশয্যায় তখনও তিনি তার কাছে গেলেন এবং তাকে ঈমান নামক সুশীতল মিষ্টি পানি পান করার আহ্বান করলেন। হাদিস শরীফে এসেছে, সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যাব (রহ.) তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করে বলেন,

لَمَّا حَضَرَتْ أَبَا طَالِبِ الْوَفَاةُ جَاءَهُ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَوَجَدَ عِنْدَهُ أَبَا جَهْلِ بْنَ هِشَامٍ وَعَبْدَ اللهِ بْنَ أَبِي أُمَيَّةَ بْنَ الْمُغِيرَةِ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لأبي طَالِبٍ يَا عَمّ قُلْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ كَلِمَةً أَشْهَدُ لَكَ بِهَا عِنْدَ اللَّهِ فَقَالَ أَبُو جَهْلٍ وَعَبْدُ اللَّهِ بْنُ أَبِي أُمَيَّةَ يَا أَبَا طَالِبٍ أَتَرْغَبُ عَنْ مِلَّةِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَلَمْ يَزَلْ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَعْرِضُهَا عَلَيْهِ وَيَعُودَانِ بِتِلْكَ الْمَقَالَةِ حَتَّى قَالَ أَبُو طَالِبٍ آخِرَ مَا كَلَّمَهُمْ هُوَ عَلَى مِلَّةِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ وَأَبَى أَنْ يَقُولَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم أَمَا وَاللَّهِ لَاسْتَغْفِرَنَّ لَكَ مَا لَمْ أُنْهَ عَنْكَ فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى فِيهِ (مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ) الآيَةَ

আবু তালিব-এর মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে, আল্লাহর রাসূল তার নিকট আসলেন। তিনি সেখানে আবু জাহল ইবনে হিশাম ও 'আবদুল্লাহ্ ইবনে আবু উমায়্যা ইবনে মুগীরাকে উপস্থিত দেখতে পেলেন। (রাবী বলেন) আল্লাহর রাসূল আবু তালিবকে লক্ষ করে বললেনঃ চাচাজান! 'লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ' কালিমা পাঠ করুন, তা হলে এর ওসীলায় আমি আল্লাহ্র সমীপে আপনার জন্য সাক্ষ্য দিতে পারবো। আবু জাহল ও 'আবদুল্লাহ্ ইবনু আবু উমায়্যা বলে উঠলো, হে আবু তালিব! তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের ধর্ম হতে বিমুখ হবে? অতঃপর আল্লাহর রাসূল তার নিকট কালিমা পেশ করতে থাকেন, আর তারা দু'জনও তাদের উক্তি পুনরাবৃত্তি করতে থাকে। অবশেষে আবু তালিব তাদের সামনে শেষ কথাটি যা বলল, তা এই যে, সে আবদুল মুত্তালিবের ধর্মের উপর অবিচল রয়েছে, সে 'লা- ইলা-হা ইল্লাল্লাহ' বলতে অস্বীকার করলো। আল্লাহর রাসূল বললেন, আল্লাহ্র কসম! তবুও আমি আপনার জন্য মাগফেরাত কামনা করতে থাকবো, যতক্ষণ না আমাকে তা হতে নিষেধ করা হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করেন:

مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَن يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَى مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ
নবী ও মুমিনের উচিত নয় মুশরিকদের জন্য মাগফেরাত কামনা করে, যদিও তারা আত্মীয় হোক একথা সুস্পষ্ট হওয়ার পর যে তারা জাহান্নামী।

এবং এই আয়াত নাযিল হয়
إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاء وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ
অর্থাৎ: হে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি যাকে চাইবেন তাকেই হেদায়েত করতে পারবেন না। (সূরা কাসাস, আয়াত: ৫৬)

রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর (চাচা আবু তালিবের) জীবদ্দশায় তাকে অনেক অনেক বার ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। এমনকি তার শেষ মূহুর্তে মৃত্যুর সময়ও তাকে দাওয়াত দিতে থেকেছেন। এমনকি মৃত্যুর পরও তার মুহাব্বত ও ভালোবাসার প্রকাশ ঘটিয়ে তিনি চাচার জন্য ইস্তেগফার করেছেন। কিন্তু যখন আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে মুশরিকদের জন্য ইস্তেগফার না করার ব্যাপারে আয়াত নাযিল হলো তখন তিনি তার জন্য ইস্তেগফার করা বন্ধ করে দিলেন। এই ঘটনা থেকে আমরা দু'টো জিনিস দেখতে পাই,
*নিকটাত্মীয়দের প্রতি তাঁর সীমাহীন দরদ, মুহাব্বতম ও ভালোবাসা।
*দ্বীনকে ভালোবেসে সকল মুহাব্বত ও দরদ-ভালোবাসাকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া। অর্থাৎ এই ঘটনার মধ্যে ফুটে উঠেছে, আল্লাহর দ্বীনের প্রতি সর্বোচ্চ ওলায়াত তথা বন্ধুত্ব। আর মুশরিকদের থেকে সম্পূর্ণ বারাআত তথা সম্পর্ক ছিন্ন করা, এমনকি তারা যদি নিকটাত্মীয়ও হয় তবুও।

টিকাঃ
৩০ মুসলিম, হাদিস: ৯৭৬
৩১ মুসলিম, হাদিস: ২০৪
৩২ আত্-তাওবাহঃ ১১৩
৩৩ আহমাদ, হাদিস: ২৩৬৪৭; বুখারী, হাদিস: ১৩৬০; মুসলিম, হাদিস: ২৪

ফন্ট সাইজ
15px
17px