📄 মুস'আব ইবনে উমায়ের (রা) এর জন্য ক্রন্দন
মুসআব ইবনে উমাইর (রা) কে মদিনাতে তালি দেওয়া কাপড় পরতে দেখে রাসূল ﷺ কাঁদছিলেন আর বলছিলেন,
عَلِيَّ بْنَ أَبي طَالِبٍ ، يَقُولُ : إِنَّا لَجُلُوسٌ مَعَ رَسُولِ اللهِ صلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي المَسْجِدِ إِذْ طَلَعَ مُصْعَبُ بْنُ عُمَيْرٍ مَا عَلَيْهِ إِلا بُرْدَهُ لَهُ مَرْفُوعَةٌ بِفَرُو فَلَمَّا رَآهُ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَكَى لِلَّذِي كَانَ فِيهِ مِنَ النِّعْمَةِ وَالَّذِي هُوَ الْيَوْمَ فِيهِ ، ثُمَّ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : كَيْفَ بِكُمْ إِذَا غَدَا أَحَدُكُمْ فِي حُلَّةٍ وَرَاحَ فِي حُلَّةٍ وَوُضِعَتْ بَيْنَ يَدَيْهِ صَحْفَة وَرُفِعَتْ أُخْرَى وَسَتَرْتُمْ بُيُوتَكُمْ كَمَا تُسْتَرُ الكَعْبَة ؟ قالوا : يَا رَسُولَ اللَّهِ نَحْنُ يَوْمَئِذٍ خَيْرٌ مِنَّا الْيَوْمَ نَتَفَرَّعُ لِلْعِبَادَةِ وتكفى المُؤْنَة ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : لأَنتُمُ الْيَوْمَ خَيْرٌ مِنْكُمْ يَوْمَئِذٍ.
আলী ইবনে আবি তালিব (রা) বলেন, আমরা রাসূল ﷺ এর সাথে মসজিদে বসা ছিলাম। এমন সময় চামড়ার তালিযুক্ত একটি চাদর গায়ে মুসআব ইবনে উমাইর (রা) এসে আমাদের সামনে উপস্থিত হন। রাসূল ﷺ তাঁর বর্তমান করুণ অবস্থা দেখে এবং তাঁর অতীতের স্বচ্ছল অবস্থার কথা স্মরণ করে কেঁদে ফেললেন। অতঃপর রাসূল ﷺ বললেন, সে সময় তোমাদের কি অবস্থা হবে, যখন তোমাদের কেউ সকালে এক জোড়া পোশাক পরবে আর বিকালে পরবে অন্য জোড়া। আর তার সামনে খাদ্যভর্তি একটি পেয়ালা রাখা হবে আর অপরটি উঠিয়ে নেওয়া হবে। তোমরা তোমাদের ঘরসমূহকে এমনভাবে ঢেকে রাখবে, যেভাবে কাবা ঘরকে গিলাফে ঢেকে রাখা হয়। সাহাবীগণ আরয করলেন হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তো তখন বর্তমানের চাইতে অনেক স্বচ্ছল থাকবো। ফলে ইবাদত বন্দেগীর জন্য অনেক অবসর পাব। রাসূল ﷺ বললেন, বরং বর্তমানটাই তোমাদের জন্য তখনকার তুলনায় অনেক উত্তম।
ওহুদে মুসআব ইবনে উমায়েরের (রা) শাহাদাতের পর দাফনের সময় কাপড় কম পড়ে যায়, মাথা ঢাকলে পা আর পা ঢাকলে মাথা বের হয়ে যায়। মুসআব ইবনে উমাইর (রা) এর এ অবস্থা সাহাবা কেরাম রাসূল ﷺ কে বললে তিনি কাঁদতে থাকেন আর বলেন, চাদর দিয়ে মাথার দিক দিয়ে যতটুকু ঢাকা যায় ঢেকে দাও, বাকি পায়ের দিকে 'ইযখীর' ঘাস দাও। রাসূল ﷺ মুসআবের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে পাঠ করলেন,
مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللهَ عَلَيْهِ فَمِنْهُمْ مَنْ قَضَى نَحْبَهُ وَمِنْهُمْ مَنْ يَنتَظِرُ وَمَا بَدَّلُوا تَبْدِيلًا
“মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছে। তাদের কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষা করছে। তারা তাদের সংকল্প মোটেই পরিবর্তন করেনি। "
তারপর তাঁর কাফনের চাদরটির দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি তোমাকে মক্কায় দেখেছি। সেখানে তোমার চেয়ে কোমল চাদর এবং সুন্দর যুলফী আর কারো ছিল না। আর আজ তুমি এখানে এই চাদরে ধুলি মলিন অবস্থায় পড়ে আছ। তিনি আরো বলেন, আল্লাহর রাসূল সাক্ষ্য দিচ্ছে, কিয়ামতের দিন তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে সাক্ষ্যদানকারী হবে। তারপর সংগীদের দিকে ফিরে তিনি বলেন, ওহে জনমণ্ডলী! তোমরা তাঁদের যিয়ারত কর, তাদের কাছে এস। তাঁদের ওপর সালাম পেশ কর। যাঁর হাতে আমার জীবন সেই সত্তার শপথ! কিয়ামত পর্যন্ত যে কেউ তাঁদের ওপর সালাম পেশ করবে তাঁরা সেই সালামের জওয়াব দেবে।
টিকাঃ
১৩০. মুসআব ইবন উমাইর পিতা-মাতার পরম আদরে ঐশ্বর্যের মধ্যে লালিত মক্কার অন্যতম সুদর্শন যুবক ছিলেন। মা সম্পদশালী হওয়ার কারণে অত্যন্ত ভোগ বিলাসের মধ্যে তাঁকে প্রতিপালন করেন। তখনকার যুগে মক্কার যত রকমের চমৎকার পোশাক ও উৎকৃষ্ট খুশবু পাওয়া যেত তা সবই তিনি ব্যবহার করতেন। ইসলামের প্রথম যুগেই তিনি মুসলমান হন এবং হাবশায় হিজরত করেন। হজ্জের সময় মদিনা থেকে কতিপয় লোক মক্কায় এসে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে গোপনে আকাবায় সাক্ষাৎ করল এবং তাঁর উপর ঈমান এনে বাইয়াত করল। তাদেরকে দ্বীনের তালিম দেওয়ার জন্য, অন্যদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য এবং মদিনাকে হিজরতের জন্য প্রস্তুত করার জন্য তারা মদিনায় ফিরে যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ মুসআবকে তাঁদের সাথে দূত হিসেবে প্রেরণ করেন। এভাবে তিনি ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের প্রথম দূত। উহুদের যুদ্ধের দিন মুসআব মুসলমানদের ঝাণ্ডা বহন করেন। মুসলমানরা যখন বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েন মুসআব তখন অটল হয়ে রুখে দাঁড়ান। অশ্বারোহী ইবন কামীয়া তাঁর দিকে এগিয়ে এসে তরবারির এক আঘাতে তাঁর ডান হাতটি বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। মুসআব তখন বলে ওঠেন, وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ মুহাম্মদ একজন রাসূল ছাড়া আর কিছু নন। তাঁর পূর্বে আরো বহু রাসূল অতিবাহিত হয়েছেন। মুসআব বাম হাতে ঝাণ্ডাটি তুলে ধরেন। তরবারির অন্য একটি আঘাতে তাঁর বাম হাতটিও বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। আবারো তিনি وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ মুহাম্মদ একজন রাসূল ছাড়া আর কিছু নন এ কথাটি বলতে বলতে ঝাণ্ডার উপর ঝুঁকে পড়ে দুই বাহু দ্বারা সেটি তুলে ধরেন। তারপর তার প্রতি বর্শা নিক্ষেপ করা হয়। পতাকাসহ তিনি মাটিতে ঢলে পড়েন এবং শাহাদাত বরণ করেন। মুসআব শাহাদাতের পূর্বে যে বাক্যটি বার বার উচ্চারণ করছিলেন তখনও কিন্তু সেটি কুরআনের আয়াত হিসেবে নাযিল হয়নি। উহুদের এ ঘটনার পরই وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ এ আয়াতটি নিয়ে জিবরীল (আ) উপস্থিত হন। ওহুদে মুসআব ইবনে উমায়েরের (রা) শাহাদাতের পর দাফনের সময় কাপড় কম পড়ে যায়, মাথা ঢাকলে পা আর পা ঢাকলে মাথা বের হয়ে যায়। মুসআব ইবনে উমাইর (রা) এর এ অবস্থা সাহাবা কেরাম রাসূল ﷺ কে বললে তিনি কাঁদতে থাকেন আর বলেন, ১৩২ চাদর দিয়ে মাথার দিক দিয়ে যতটুকু ঢাকা যায় ঢেকে দাও, বাকি পায়ের দিকে 'ইযখীর' ঘাস দাও। রাসূল ﷺ মুসআবের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে পাঠ করলেন,
مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللهَ عَلَيْهِ فَمِنْهُمْ مَنْ قَضَى نَحْبَهُ وَمِنْهُمْ مَنْ يَنتَظِرُ وَمَا بَدَّلُوا تَبْدِيلًا
“মুমিনদের মধ্যে কতক আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছে। তাদের কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষা করছে। তারা তাদের সংকল্প মোটেই পরিবর্তন করেনি। "১৩৩
তারপর তাঁর কাফনের চাদরটির দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি তোমাকে মক্কায় দেখেছি। সেখানে তোমার চেয়ে কোমল চাদর এবং সুন্দর যুলফী আর কারো ছিল না। আর আজ তুমি এখানে এই চাদরে ধুলি মলিন অবস্থায় পড়ে আছ। তিনি আরো বলেন, আল্লাহর রাসূল সাক্ষ্য দিচ্ছে, কিয়ামতের দিন তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে সাক্ষ্যদানকারী হবে। তারপর সংগীদের দিকে ফিরে তিনি বলেন, ওহে জনমণ্ডলী! তোমরা তাঁদের যিয়ারত কর, তাদের কাছে এস। তাঁদের ওপর সালাম পেশ কর। যাঁর হাতে আমার জীবন সেই সত্তার শপথ! কিয়ামত পর্যন্ত যে কেউ তাঁদের ওপর সালাম পেশ করবে তাঁরা সেই সালামের জওয়াব দেবে।
টিকাঃ
১৩২. প্রাগুক্ত, কিতাবুর রিকাক, বাবু ফাদলুল ফাকর।
১৩৩. কুরআনুল কারীম, সূরা আল-আহযাব, আয়াত ২৩।
১৩১. সুনান আত-তিরমিজি, কিতাবু ছিফাতুল কিয়ামাহ, বাব ৩৫: কষ্টের দিন স্বাচ্ছন্দের দিনের চেয়ে উত্তম, খ. ৪, পৃ. ২২৮, হাদিস নং ২৪৭৬, ইমাম তিরমিজি বলেন, হাদিসটি হাসান গরীব।
১৩২. প্রাগুক্ত, কিতাবুর রিকাক, বাবু ফাদলুল ফাকর।
১৩৩. কুরআনুল কারীম, সূরা আল-আহযাব, আয়াত ২৩।
📄 চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণের নামাজের সময় ক্রন্দন
হাদিসে এসেছে,
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرو ، قَالَ : كَسَفَتِ الشَّمْسُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم ، فصلى رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم فأَطالَ القِيَامَ ، ثُمَّ رَكَعَ فأطال الركوع ، ثُمَّ رَفَعَ فأطالَ - قَالَ شُعْبَهُ : وَأَحْسَبُهُ قَالَ : فِي السُّجُودِ نَحْوَ ذلِكَ - وَجَعَلَ يَبْكِي فِي سُجُودِهِ وَيَنْفُخُ وَيَقُولُ : رَبِّ لَمْ تَعِدْنِي هَذَا وَأَنَا أَسْتَغْفِرُكَ ، لَمْ تَعِدْنِي هَذَا وَأَنَا فِيهِمْ ، فَلمَّا صَلَّى قَالَ : عُرِضَتْ عَلَيَّ الْجَنَّهُ حَتَّى لَوْ مَدَدْتُ يَدِي تَنَاوَلَتْ مِنْ قُطُوفِهَا ، وَعُرِضَتْ عَلَيَّ النَّارُ فَجَعَلْتُ أَنْفُحُ خَشْيَةً أَنْ يَعْشَاكُمْ حَرَّهَا ، وَرَأَيْتُ فِيهَا سَارِقَ بَدَنَتَيْ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم ، وَرَأَيْتُ فِيهَا أَخَا بَنِي دُعْدُع سَارِقَ الحَجيج ، فَإِذَا فُطِنَ لَهُ قَالَ : هَذَا عَمَلُ الْمِحْجَنِ ، وَرَأَيْتُ فِيهَا امْرَأَة طويلة سَوْدَاءَ تُعَذِّبُ فِي هِرَّةٍ رَبَطتُهَا ، فَلمْ تُطْعِمْهَا وَلَمْ تَسْقِهَا ، وَلَمْ تَدَعْهَا تَأْكُلُ مِنْ خَشَاشِ الأَرْضِ حَتَّى مَاتَتْ ، وَإِنَّ الشَّمْسَ وَالْقَمَرُ لَا يَنْكَسِفَانِ لِمَوْتِ أَحَدٍ وَلَا لِحَيَاتِهِ ، وَلَكِنَّهُمَا آيَتَانِ مِنْ آيَاتِ اللَّهِ ، فَإِذَا انْكَسَفَتْ إِحْدَاهُمَا - أَوْ قَالَ : فَعَلَ أَحَدُهُمَا شَيْئًا مِنْ ذَلِكَ - فَاسْعَوْا إِلى ذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ.
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা) বলেন, রাসূল ﷺ এর যুগে সূর্যগ্রহণ হলো। রাসূল ﷺ নামাজ পড়লেন এবং তাতে দীর্ঘ কিয়াম করলেন। অতঃপর রুকুতে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করলেন। এরপর রুকু থেকে উঠে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন। (অধস্তন রাবী) শো'বা বলেন, আমার ধারণা মতে তিনি (আতা) সিজদার ব্যাপারেও অনুরূপ বলেছেন। তিনি সিজদার অবস্থায় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছেন আর বলেছেন: “হে আমার রব! আমি তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনারত অবস্থায় তুমি আমার সাথে এটির (শাস্তি প্রদানের) ওয়াদা করনি। আমি তাদের মাঝে বিদ্যমান থাকা অবস্থায় তুমি আমার সাথে এটির (শাস্তি প্রদানের) ওয়াদা করনি (বরং তার বিপরীত ওয়াদা করেছ)।” তিনি নামাজ শেষে বলেন, আমার সামনে জান্নাত পেশ করা হয়েছিল, এমনকি আমি যদি আমার হাত প্রসারিত করতাম তাহলে তার ফলগুচ্ছ সংগ্রহ করতে পারতাম। আমার সামনে দোজখও পেশ করা হয়েছিল। আমি তাতে এই আশংকায় ফুঁ দিতে লাগলাম যে, তার উত্তাপ তোমাদের পরিবেষ্টন করে কি না! আমি তাতে আল্লাহর রাসূলের (আমার) একজোড়া উট চোরকেও দেখলাম। আমি তাতে হাজীদের মালচোর আদ-দা'দা' গোত্রের সেই ব্যক্তিকেও দেখলাম। তার শাস্তি অনুভূত হলে সে বলে, এতো বাঁকা মাথাবিশিষ্ট লাঠির কাজ। আমি তাতে দীর্ঘকায় এক নারীকেও দেখলাম যাকে একটি বিড়াল বেঁধে রাখার অপরাধে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। সে সেটিকে পানাহারও করতে দেয়নি এবং বন্ধনমুক্তও করেনি যে, তা জমিনের কীটপতঙ্গ খেয়ে জীবন ধারণ করতে পারত, শেষে সেটি মারা যায়। আর নিশ্চয় চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ কারো জন্ম বা মৃত্যুর কারণে হয় না, বরং এরা হলো আল্লাহর নিদর্শনসমূহের দুটি নিদর্শন। অতএব যখন এতদুভয়ের কোনোটির গ্রহণ লাগে অথবা এর কোনোটির অনুরূপ কোনো কিছু ঘটে তখন তোমরা মহামহিম আল্লাহর যিকিরে ধাবিত হও।
টিকাঃ
১৩৪. সহীহ বুখারী, অধ্যায়: আল-কুসূফ, অনুচ্ছেদ: খুতবাতুল ইমামি ফিল কুসূফ, হাদিস নং-৯৯৯, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৫৫; সূর্য গ্রহণের নামাজকে সালাতুল কুসূফ বলে, আর চন্দ্র গ্রহণের নামাজকে সালাতুল খুসূফ বলে। তবে কখনো কখনো একটি অন্যটির অর্থেও ব্যবহৃত হয়। হানাফী মতে সূর্য গ্রহণের নামাজ সুন্নাত এবং জামাআতে পড়তে হয়। চন্দ্র গ্রহণের নামাজ মুস্তাহাব এবং একা একা পড়তে হয়। উভয় নামাজ দুই থেকে চার রাকাআত পর্যন্ত পড়া যায়। অন্যান্য সুন্নাত ও নফল নামাজের নিয়তেই তা পড়তে হয়; অর্থাৎ-প্রতি রাকাআতে এক রুকূ দুই সিজদা। ইমাম আবু হানিফা ও শাফেয়ী (র) এর মতে, সূর্য গ্রহণের নামাজে কিরআত উচ্চম্বরে পড়া যাবে না। কিন্তু এই দুই ইমামের অনুসারীরা তাদের স্ব স্ব ইমামের মত ত্যাগ করেছে। সুনানে তিরমিযী, অনুবাদ, বি, আই. সি. ৫ম সং, ২০০৯, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৯৬
১৩৫. রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ছেলে ইবরাহীম যেদিন মৃত্যুবরণ করেন সেদিন সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। ফলে লোকেরা বলাবলি করতে লাগলো যে, ইবরাহীমের মৃত্যুর কারণেই সূর্যগ্রহণ হয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম। কারো মরা অথবা বাঁচার কারণে এদের গ্রহণ হয় না। অতএব তোমরা যখনই এদের গ্রহণ দেখবে তখন ছেড়ে না যাওয়া পর্যন্ত তোমরা আল্লাহর কাছে দু'আ করতে এবং নামাজ পড়তে থাকবে। হায়কল, ড. মুহাম্মদ হুসাইন, অনু. মাওলানা আব্দুল আউয়াল, মহানবীর জীবন চরিত (ঢাকা: ই. ফা. বা. ১ম সং, ১৯৯৮), পৃ. ৬০৭
১৩৬. সূনান আন-নাসায়ী, কিতাবুল খুসুফ, বাবু আল কওলু ফিস সুজুদ ফি সালাতিল কুসুف, খ. ৫, পৃ. ৩৯৭, হাদিস নং ১৪৭৯, আলবানি হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন। বুখারী ও মুসলিমে হাদিসটি কান্নার শব্দটি বাদ দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
📄 উসমান ইবনে মাজউন (রা) এর জন্য ক্রন্দন
আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, উসমান ইবনে মাজউন (রা) অসুস্থ হলে রাসূল ﷺ দেখতে গেলে তাকে মৃত অবস্থায় পেলেন। অতঃপর রাসূল ﷺ মুখ খুললেন এবং অধমুখী হয়ে তাকে চুমু দিয়ে কান্না শুরু করলেন, এমনকি (রাবী বলেন) আমি দেখলাম তাঁর চোখের পানি দুই গণ্ডদেশ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
টিকাঃ
১৩৭. উসমান ইবন মাজউন (রা) ছিলেন ইসলামের প্রথম যুগে ইসলাম গ্রহণকারী মুসলমান। তাঁর পূর্বে তেরজন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন এ হিসেবে চৌদ্দতম ব্যক্তি। নবুওয়াতের ৫ম বর্ষে সর্বপ্রথম মুসলমানদের যে দলটি হাবশায় হিজরত করেন। তিনি ছিলেন তাঁদের আমীর বা নেতা। ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদরেও তিনি অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধ থেকে ফেরার পথেই তিনি অসুস্থ হয়ে যান এবং এ অসুস্থতাতেই মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ছিলেন মদিনায় স্বাভাবিক মৃত্যুবরণকারী প্রথম মুহাজির এবং মদিনার জান্নাতুল বাকী গোরস্থানে দাফনকৃত প্রথম মুসলমান।
১৩৮. সূনানুল কুবরা, লিল বায়হাকী, কিতাবুল জানায়েজ, বাবু আদ-দুখুল আলাল মায়্যেত ওয়া তাকবিলিহী, খ. ৩, পৃ. ৪০৭, হাদিস নং ৬৯৫৯। আলবানি হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
📄 হুনায়েনের গণিমাত বন্টনের সময় ক্রন্দন
হুনায়েনের যুদ্ধে ১৩৯ মুসলমানরা প্রচুর গণিমাত লাভ করেন। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলেন,
لما أعطى رسول الله صلى الله عليه وسلم، ما أعطى من تلك الغنائم في قريش وقبائل العرب ولم يعط الأنصار شيئاً وجدوا في أنفسهم حتى قال قائلهم: لقي رسول الله صلى الله عليه وسلم قومه فأخبر سعد بن عبادة رسول الله، صلى الله عليه وسلم، بذلك، فقال له: فأين أنت يا سعد ؟ قال: أنا من قومي. قال: فاجمع قومك لي، فجمعهم. فأتاهم رسول الله صلى الله عليه وسلم، فقال: ما حديث بلغني عنكم ؟ ألم أتكم ضلالاً فهداكم الله بي ؟ وفقراء فأغناكم الله بي ؟ وأعداء فألف الله بين قلوبكم بي ؟ قالوا : بلى والله يا رسول الله، والله ورسوله المن والفضل. فقال: ألا تجيبوني ؟ قالوا: بماذا نجيبك ؟ فقال: والله لو شئتم لقلتم فصدقتم أتيتنا مكذبا فصدقناك، ومخذولا فنصرناك، وطريدا فأويناك، وعائلا فواسيناك، أوجدتم يا معشر الأنصار في لعاعة من الدنيا تألفت بها قوماً ليسلموا ووكلتكم إلى إسلامكم، أفلا ترضون أن يذهب الناس بالشاة والبعير وترجعوا برسول الله إلى رحالكم ؟ والذي نفسي بيده لولا الهجرة لكنت أمرأ من الأنصار ، ولو سلك الناس شعباً وسلكت الأنصار شعباً لسلكت شعب الأنصار اللهم ارحم الأنصار وأبناء الأنصار وأبناء أبناء الأنصار. قال: فبكى القوم حتى أخضلوا لحاهم وقالوا: رضينا برسول الله قسماً وحظاً.
রাসূল ﷺ যখন নব দীক্ষিত মুসলমানদের বেশি পরিমাণ গণিমাত দান করলেন তখন আনসার সাহাবীরা পরস্পর বলাবলি করছিলো যে, “আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর কওমের লোকদের পেট ভরে দিয়েছেন।” আনসারদের নেতা সাদ ইবনে উবাদাহ (রা) আনসারদের মনোভাব রাসূল ﷺ কে বললেন। রাসূল ﷺ তখন সাদ ইবনে উবাদাহকে উদ্দেশ্যে করে বললেন, فأين أنت يا سعد ؟ 'হে সাদ, তোমার মতামত কি?' তখন সাদ ইবনে উবাদাহ বলেন, أنا من قومي 'আমি আমার কওমের পক্ষে।' রাসূল ﷺ তখন সাদ ইবনে উবাদাহকে তাঁর কওমকে একত্রিত করতে বললেন এবং তাদের নিকট গিয়ে ভাষণ দিলেন। মহানবী ﷺ বললেন, হে আনসার সম্প্রদায়! তোমাদের সম্পর্কে আমি যেসব কথা শুনতে পেলাম তা কি সত্য? আমি কি তোমাদের পথভ্রষ্ট পাইনি? এরপর আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদেরকে সত্য পথ প্রদর্শন করেছেন। তোমরা কি গরীব ছিলে না? অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তোমাদের স্বচ্ছলতা দান করেছেন। তোমরা কি একে অপরের শত্রু ছিলে না? অতঃপর আমার মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদেরকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন। আনসারগণ তখন বললেন, হ্যাঁ, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ আমাদের প্রতি অশেষ অনুগ্রহ প্রদর্শন করেছেন। রাসূল ﷺ আনসারদের বললেন, তোমরা কি আমার প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব দেবে না? তারা বললেন, সত্যিই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ আমাদের প্রতি অশেষ অনুগ্রহ প্রদর্শন করেছেন।
রাসূল ﷺ বললেন, আল্লাহর শপথ! তোমরা ইচ্ছা করলে জবাব দিতে পারতে আর তা সঠিক হতো ও প্রমাণিতও হতো। যেমন তোমরা বলতে পারতে, আপনি এরূপ পরিস্থিতিতে এসেছিলেন যে, মানুষ আপনার কথা বিশ্বাস করছিলো না। কিন্তু আমরা আপনার কথা বিশ্বাস করেছি। আপনাকে জন্মভূমি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিলো, কিন্তু আমরা আপনাকে আশ্রয় দান করেছি। আপনি নিঃস্ব ছিলেন, আমরা আপনার প্রতি সমবেদনা জানিয়েছি। হে আনসার সম্পদায়! আমি নতুন মুসলমানদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার যে সম্পদ আমি তাদের দিয়েছি তাতে কি তোমরা মন খারাপ করেছ? বস্তুত আমি তোমাদের ঈমানের দৃঢ়তার ওপর পুরোপুরি আস্থা স্থাপন করেছি। হে আনসার সম্প্রদায়! তোমরা কি আনন্দিত ও সন্তুষ্ট নও যে, মানুষ তাদের সাথে উট, ছাগল, ভেড়া নিয়ে যাবে, আর তোমরা আল্লাহর রাসূলকে সাথে নিয়ে ফিরে যাবে। মহান সত্তার কসম যার হাতে আমার প্রাণ, তাঁর শপথ করে বলছি, যদি হিজরত না হতো, তাহলে আমিও আনসারদের একজন হতাম। সব লোক যদি এক পথে চলে আর আনসাররা যদি ভিন্ন পথে চলে তাহলে আমি আনসারদের পথে চলবো। হে আল্লাহ! আনসারদের প্রতি, আনসারদের সন্তানদের প্রতি এবং তাদের সন্তাদের সন্তান-সন্ততির প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন কর। মহানবী ﷺ এর ভাষণে আনসাররা এরূপ প্রভাবিত হয়ে পড়েন যে, তারা কাঁদতে শুরু করেন। তারা বলতে আরম্ভ করেন, আমরা তাতেই সন্তুষ্ট যে, আল্লাহর রাসূল ﷺ আমাদের ভাগে এসেছেন।
টিকাঃ
১৩৯. হুনায়েনের যুদ্ধ: হুনায়েন ছিল যুল মাজাযের নিকটবর্তী একটি স্থানের নাম। মক্কা বিজয়ের পর হওয়াজিন ও সাকিফ গোত্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে নতুনভাবে ষড়যন্ত্র শুরু করেছিল। এরই অংশ হিসেবে তারা রাসূল ﷺ এর মোকাবেলা করার জন্য হুনায়েনে তাঁবু খাটালেন। তাদের ষড়যন্ত্রের খবর জানতে পেরে রাসূল ﷺ ১২০০০ সৈন্য নিয়ে ৮ম হিজরীর ৬ শাওয়াল মাসে, মক্কা বিজয়েরর ১৯তম দিনে হুনায়েন অভিমুখে যাত্রা করেন। যুদ্ধের শুরুতে মুসলিম শিবিরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলেও শেষ পর্যন্ত রাসূল ﷺ এর নেতৃত্বে মুসলমানরা বিজয় অর্জন করেন। এ যুদ্ধ থেকে মুসলিম বাহিনী যে গনিমত লাভ করে এর পরিমাণ হলো: ২৪০০০ উট, ৪০০০০ ভেড়া, ৪০০০ আওকিয়া রৌপ্যমুদ্রা, ৬০০০ যুদ্ধ বন্দি। ইবন সাদ, আত-তবাকাতুল কুবরা, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৫২।
১৪০. আল-কামিল ফিত তারিখ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৩৯।