📄 অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গিয়ে কান্না
মদিনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের বনী 'সায়িদাহ' শাখার সন্তান ছিলেন সাদ ইবনে উবাদা (রা)। শেষ আকাবার বাই'আতের সময় সাদ (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে বনী সায়িদার নাকীব (দায়িত্বশীল) নিয়োগ করেন। হিজরতের দ্বাদশ মাসে রাসূলুল্লাহ ﷺ কুরাইশদের গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য ছোট একটি বাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে 'আবওয়া' নামক স্থানে যান। এটাকে 'ওয়াদ্দান' অভিযানও বলা হয়। এ বাহিনীতে কোনো আনসার মুজাহিদ ছিল না। এ সময় পনেরোটি রাত রাসূলুল্লাহ ﷺ মদিনার বাইরে ছিলেন। তিনি সাদ ইবন উবাদাকে (রা) স্বীয় প্রতিনিধি হিসেবে মদিনায় রেখে যান। মক্কা বিজয়ের দিন খোদ রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ঝাণ্ডাটি সাদের হাতে ছিল। একবার তিনি অসুস্থ হলে রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবাগণকে সংগে করে তাঁকে দেখতে যান এবং কান্নাকাটি করেন। আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা) বলেন,
قَالَ اشْتَكَى سَعْدُ بْنُ عُبَادَةَ شَكْوَى لَهُ فَأَتَاهُ النَّبِيُّ - صلى الله عليه وسلم - يَعُودُهُ مَعَ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ وَسَعْدِ بْنِ أَبِي وَقَّاصٍ وَعَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ رضی الله عنهم - فلمَّا دَخَلَ عَلَيْهِ فَوَجَدَهُ فِي غَاشِيَةِ أَهْلِهِ فَقالَ « قد قضى » . قالوا لا يَا رَسُولَ اللهِ . فَبَكَى النَّبِيُّ - صلى الله عليه وسلم - فلمَّا رَأَى الْقَوْمُ بُكَاءَ النَّبِيِّ - صلى الله عليه وسلم - بَكَوْا فقالَ « أَلا تَسْمَعُونَ إِنَّ اللَّهَ لَا يُعَذِّبُ بِدَمْعِ الْعَيْنِ ، ولا يحزن القلب ، وَلَكِنْ يُعَذِّبُ بهَذا - وَأَشَارَ إِلى لِسَانِهِ أَوْ يَرْحَمُ وَإِنَّ الْمَيِّتَ يُعَدَّبُ ببُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ » وَكَانَ عُمَرُ ، رَضِيَ اللهُ عَنْهُ ، يَضْرِبُ فِيهِ بِالْعَصَا وَيَرْمِي بِالحِجَارَةِ وَيَحْلِي بِالتُّرَابِ.
সাদ বিন উবাদাহ (রা) কোনো এক রোগে ভুগছিলেন। নবী ﷺ আব্দুর রহমান ইবনে আওফ, সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস এবং আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) সহ তাঁকে দেখতে আসলেন। তাঁর কাছে গিয়ে দেখলেন তিনি পরিবার পরিজন দ্বারা বেষ্টিত আছেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি কি মারা গেছেন? তারা বলল, না, হে আল্লাহর রাসূল! একথা শুনে রাসূল ﷺ কেঁদে ফেললেন। রাসূল ﷺ এর কান্না দেখে তাঁরাও কাঁদতে লাগল। তখন তিনি বলেন, তোমাদের কোনো চোখের অশ্রু এবং অন্তরের শোকের জন্য আল্লাহ কাউকে শাস্তি দেবেন না। কিন্তু শাস্তি দেবেন অথবা দয়া করবেন এর জন্য, (এ বলে তিনি) নিজ জিহ্বার দিকে ইশারা করলেন। নিঃসন্দেহে মৃতের প্রতি পরিজনের বিলাপের দরুন শাস্তি দেওয়া হয়। উমর (রা) এর পুত্র আবদুল্লাহ (রা) আরো বলেন, উমর (রা) এর অবস্থা ছিল এমন যে, তিনি এরূপ কাঁদার জন্য লাঠি দ্বারা আঘাত করতেন, কংকর নিক্ষেপ করতেন এবং মুখে মাটি পুরে দিতেন।
টিকাঃ
১২০. বুখারী, আস-সহীহ, অধ্যায়: জানায়েয, অনুচ্ছেদ: আল-বুকা ইনদাল মারিদ, খ. ১ম, পৃ. ৪৩৯, হাদিস নং: ১২৪২
📄 বদরের বন্দিদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর ক্রন্দন
বদরের যুদ্ধের সময় সত্তর জন কাফের মুসলমানদের হাতে বন্দি হন। তাদেরকে যুদ্ধের পরে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। মুক্তিপণ বাবদ প্রত্যেকের নিকট থেকে ৪০০০ দিরহাম গ্রহণ করা হয়। যারা দারিদ্রের কারণে অর্থ পরিশোধ করতে পারেনি কিন্তু লেখাপড়া জানে তাদেরকে আটকে রেখে মুক্তিপণ নির্ধারণ করা হয় প্রত্যেক বন্দি দশ জন নিরক্ষর মুসলমানকে পড়া লেখা শেখাবে। যারা না মুক্তিপণ পরিশোধে সক্ষম ছিল, না লেখাপড়া জানতো, তাদের এমনিতেই মুক্ত করে দেওয়া হয়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে এতে একদিকে মহানবীর ন্যায়বিচার এবং অন্যদিকে একজন নিখুঁত পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তির স্বাভাবিক মর্যাদাই প্রতিফলিত হয়। এ ঘটনাটি বেশ কিছুসংখ্যক গ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে। আল্লামা শিবলি নোমানীর ভাষায়, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জামাতা আবুল আস এই বন্দিদের মধ্যে একজন ছিলেন। মুক্তিপণের অর্থ তার কাছে ছিল না। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কন্যা যয়নাব তার স্ত্রী। মক্কায় তার স্ত্রীর নিকট মুক্তিপণের অর্থ পাঠানোর জন্য তিনি খবর পাঠালেন। যয়নাবের বিয়ের সময় মাতা খাদিজা (রা) একটি মূল্যবান গলার হার উপহার হিসেবে তাঁকে দিয়েছিলেন। যয়নাব এই হারটি খুলে মুক্তিপণ বাবদ মদিনায় পাঠালেন। হারটি দেখে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ২৫ বছর পূর্বেকার স্মৃতি মনে পড়ে গেল। মেয়ের প্রতি স্নেহের কারণে তিনি কান্না রোধ করতে পারলেন না। কান্নারত অবস্থায় তাঁর সাহাবাগণকে বললেন, তোমরা যদি চাও তাহলে তাঁর মায়ের দেয়া স্মৃতি চিহ্নটি তাঁর মেয়ের কাছে ফেরত দিতে পারো। সকলে এই প্রস্তাবে সম্মতি দিলেন এবং হারটি মক্কায় ফেরত পাঠানো হলো। আবুল আস মুক্তি লাভ করে মক্কায় ফিরে গিয়ে যয়নাবকে মদিনায় পাঠিয়ে দিলেন।
মুক্তিপণের বিনিময়ে বদরের যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি দেওয়া আল্লাহ পছন্দ করেননি। তাই তিনি ওহীর মাধ্যমে সতর্ক করে দিলেন। তিরস্কারসূচক এই ওহী নাযিলের পর রাসূলুল্লাহ ﷺ ও আবু বকর (রা) কেঁদে ফেলেন। এ ব্যাপারে ইবনে আব্বাস (রা) এর হাদিসটি প্রণিধানযোগ্য।
ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, বদরের যুদ্ধের দিন যখন মুসলমানরা কুরাইশদের বন্দি করে নিয়ে আসলো তখন রাসূল ﷺ ব্যাপারে আবু বকর ও উমর (রা) এর সঙ্গে পরামর্শ করে কয়েদিদের ব্যাপারে তাদের অভিমত জানতে চাইলেন। জবাবে আবু বকর (রা) বললেন, হে আল্লাহর নবী! ওরা সবাই আমাদের চাচাতো ভাই ও স্বগোত্রীয়, তাই আমি মনে করি, তাদের থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ করা হোক। ফলে একদিকে কাফিরদের ওপর আমাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি পাবে। অপরদিকে হয়তো অচিরেই আল্লাহ তাদেরকে ইসলামের হেদায়াত দান করবেন। অতপর রাসূল ﷺ উমরকে (রা) লক্ষ্য করে বললেন, হে ইবনুল খাত্তাব! তোমার অভিমত কি? জবাবে তিনি বলেন, আমি বললাম (আবু বকর যা বলেছেন) আল্লাহর কসম, তা হতে পারে না, হে আল্লাহর রাসূল! আবু বকরের মতের সাথে আমি একমত নই। আমি মনে করি যদি আমাদের ক্ষমতা বা অধিকার দেওয়া হয় তাহলে আমরা তাদের সকলের ঘাড় সংহার করে দেব। সুতরাং আলী (রা) কে অধিকার দিন তিনি (তাঁর ভাই) আকিল থেকে বুঝাপড়া করে নেবে এবং তিনিই তার ঘাড় সংহার করবেন। আর আমি উমারকে আমার নিকটতম অমুক সম্পর্কে অধিকার দিন, আমি তার ঘাড় সংহার করব। কেননা তারা হচ্ছে কুফরের সংগঠন এবং তাদেরই নেতা বা সরদার। (উমর (রা) বলেন) কিন্তু রাসূল ﷺ আবু বকর যা বলেছেন সে দিকেই ঝুঁকে পড়লেন বা তা সমর্থন করলেন, আর আমি যা বললাম তা সমর্থন করলেন না। পরদিন আমি যখন গেলাম তখন দেখলাম, রাসূল ﷺ ও আবু বকর (রা) উভয়ে এক জায়গায় উপবিষ্ট। কিন্তু দুজনই কাঁদছেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! অনুগ্রহ করে আমাকে বলুন, আপনিই বা কেন কাঁদছেন আর আপনার সাথীই বা কেন কাঁদছে? যদি আমি পারি তাহলে আমিও কাঁদব, আর যদি আমার কান্না না আসে, অন্তত আপনাদের উভয়ের কান্নার দরুন আমিও কান্নার ভান করব। উত্তরে রাসূল ﷺ বললেন, ওসব কয়েদিদের থেকে মুক্তিপণ হিসাবে মাল নেওয়ায় তোমার সাথীদের ওপর যে বিপর্যয় নেমে আসছে সে জন্য আমি কাঁদছি। বস্তুত তাদের উপরের আযাব ও শাস্তি ঐ বৃক্ষটির চেয়ে অতি নিকটে আমার নিকট তুলে ধরা হয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন (এ কথাগুলো বলার সময়) নবী ﷺ এর নিকট একটি বৃক্ষ ছিল। অতঃপর আল্লাহ তা'য়ালা নিম্নের আয়াতটি নাযিল করেন। আল্লাহর বাণী ১২২: “দেশে সম্পূর্ণভাবে শত্রু নিপাত না করা পর্যন্ত নিজের কাছে বন্দি রাখা কোনো নবীর জন্য সংগত নয়। যা হোক যুদ্ধে তোমরা যা লাভ করেছ তা বৈধ ও উত্তম বলে ভোগ কর,” এই পর্যন্ত। সে থেকে আল্লাহ মুসলমানদের জন্য গণীমাত হালাল করেছেন।
টিকাঃ
১২১. আবদুল মালিক ইবন হিশাম, আল-সীরাতুন নাবাবীয়্যা, কায়রো: ১৯৫৫খ্রি., ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৬৫৩; মুহাম্মাদ ইবন আবদাল বাকী আল-যুরকানী, আরহুল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়াহ, খণ্ড ৮ম, পৃ. ৪৫১; মুহাম্মাদ ইবনুল জারীর আত-তাবারী, তারীখুর রসূল ওয়াল মুলুক, মিশর: ১৯৬১, ১০ম খণ্ড, পৃ. ৩৬৮; সুসান আবু দাউদ, পৃ. ১১; শিবলী নোমানী, সীরাতুন্নবী, ভারত: আযমগড়: ১৩৭৫হি. পৃ. ৩৩৩
১২২. আল-কুআনুল কারীম, সূরা আনফাল, আয়াত ৬৮।
১২৩. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, বাবু আল-ইমদাদ বিল মালাইকাহ ফি গুযওয়াতি বদর, খ. ৫, পৃ. ১৫৬, হাদিস নং ৪৬৮৭।
📄 রাসূল ﷺ এর চাচা হামজা (রা) এর জন্য ক্রন্দন
হামজা (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আপন চাচা অন্যদিকে তাঁর দুধ ভাই। আবু লাহাবের দাসী সুওয়াইবা তাঁদের দুজনকে দুধ পান করিয়েছিল। বয়সে তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ অপেক্ষা দু' বছর মতান্তরে চার বছরের বড় ছিলেন। উমর (রা) এর ইসলাম গ্রহণের কিছুদিন পূর্বে হামজা (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর ইসলাম গ্রহণের পর মুসলমানদের ওপর কাফেরদের অহেতুক বাড়াবাড়ি ও বেপরোয়া ভাব অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়। কারণ তাঁর সাহস ও বীরত্বের কথা মক্কার প্রতিটি লোক জানতো। নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বছরে আরো অনেকের সাথে তিনি মদিনায় হিজরত করেন। ইসলামের ইতিহাসের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ বদর। এ যুদ্ধে কাফেরদের নেতৃস্থানীয় অনেকে হামজা (রা) এর হাতে নিহত হয়, এ কারণে কুরাইশদের সকলেই তাঁকে হত্যা করার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল। পরবর্তী যুদ্ধ ওহুদে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। হামজার শাহাদাতের পর কুরাইশ রমণীরা আনন্দ সংগিত গেয়েছিল। আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা বিনতে উতবা হামজার নাক-কান কেটে অলংকার বানিয়েছিল। বুক, পেট চিরে কলিজা বের করে চিবিয়ে থুথু নিক্ষেপ করেছিল। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছিলেন, সে কি তার কিছু অংশ খেয়েও ফেলেছে? লোকেরা বলেছিল, না। তিনি বলেছিলেন, হামজার দেহের কোনো একটি অংশও আল্লাহ জাহান্নামে যেতে দেবেন না। যেহেতু হিন্দা তাঁর নাক-কান কেটে বিকৃত করে ফেলেছিল, তাই এ দৃশ্য দেখে তিনি কেঁদে ফেললেন। তিনি বললেন, কিয়ামতের দিন তুমি হবে 'সাইয়্যেদুশ শুহাদা' বা সকল শহীদের নেতা। তিনি আরো বলেন, তোমার ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। আমার জানামতে তুমি ছিলে আত্মীয়তার সম্পর্কের ব্যাপারে অধিক সচেতন, অতিশয় সৎকর্মশীল। যদি সাফিয়্যার শোক ও দুঃখের কথা আমার জানা না থাকতো তাহলে এভাবেই তোমাকে ফেলে রেখে যেতাম, যাতে পশু পাখি তোমাকে খেয়ে ফেলত এবং কিয়ামতের দিন তাদের পেট থেকে আল্লাহ তোমাকে জীবিত করতেন। আল্লাহর কসম তোমার প্রতিশোধ নেওয়া আমার ওপর ওয়াজিব। আমি তাদের সত্তরজনকে তোমার মত নাক-কান কেটে বিকৃত করব। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কসমের পর জিবরীল (আ) সূরা নাহলের নিম্নোক্ত আয়াত দু'টি নিয়ে অবতীর্ণ হলেন:
وَإِنْ عَاقِبْتُمْ فَعَاقِبُوا بِمِثْل مَا عُوقِبْتُمْ بِهِ وَلَئِنْ صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِلصَّابِرِينَ وَاصْبِرْ وَمَا صَبْرُكَ إلا باللهِ وَلا تَحْزَنْ عَلَيْهِمْ وَلا تَكُ فِي ضَيْقَ مِمَّا يَمْكُرُونَ
"আর যদি তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ কর, তবে ঐ পরিমাণ প্রতিশোধ গ্রহণ করবে, যে পরিমাণ তোমাদেরকে কষ্ট দেওয়া হয়। যদি সবর কর, তবে সবরকারীদের জন্য আল্লাহ উত্তম। আপনি সবর করবেন। আপনার সবর একমাত্র আল্লাহর জন্য। তাদের জন্য দুঃখ করবেন না এবং তাদের চক্রান্তের কারণে মন ছোট করবেন না।” এ আয়াত নাযিলের পর রাসূলুল্লাহ ﷺ কসমের কাফফারা আদায় করেন।
চাচা হামজা (রা) উহুদ যুদ্ধে'২৫ শাহাদাতের পর যখন তাঁর নাক, কান কেটে বিকৃত করা হয়েছিল তখন রাসূল ﷺ এই পৈচাশিকতা দেখে কেঁদেছিলেন। ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত হাদিস, ১২৬
أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عَلَيْهِ وسَلَّمَ مَرَّ بِنِسَاءِ عَبْدِ الأَشهَل يَبْكِينَ هَلَكَاهُنَّ يَوْمَ أحُدٍ, فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وسَلَّمَ : لَكِنَّ حَمْزَةَ لَا بَوَاكِيَ لَهُ, فَجَاءَ نِسَاءُ الأنصار يَبْكِينَ حَمْزَةَ ، فَاسْتَيْقَظَ رَسُولُ اللهِ صلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ, فَقَالَ : وَيْحَهُنَّ مَا انْقَلَبْنَ بَعْدُ ؟ مُرُوهُنَّ فَلْيَنْقَلِبْنَ ، وَلا يَبْكِينَ عَلَى هَالِكِ بَعْدَ الْيَوْمِ.
রাসূল ﷺ বনূ আশহালের মহিলাদের পার্শ্ব দিয়ে যাচ্ছিলেন, তারা ওহুদ যুদ্ধের দিন শাহাদাত প্রাপ্তদের জন্য কাঁদছিলেন। রাসূল ﷺ বললেন, কিন্তু হামজা (রা) এর জন্য কান্নার কেউ নেই। অতঃপর আনসার মহিলাদের একদল এসে হামজা (রা) এর জন্য কান্না শুরু করে দিল। (কান্নার শব্দে) রাসূল ﷺ জেগে উঠে বললেন, তোমাদের ধ্বংস হোক! এরপর কি তোমরা পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাবে? আজকের পরে তারা আর কোনো শাহাদাত বরণকারীর জন্য (জাহেলিয়াত যুগের ন্যায় জড় হয়ে) কাঁদেন নাই।
টিকাঃ
১২৪. আল-কুরআন সূরা নাহল, ১২৬-২৭
১২৫. উহুদ যুদ্ধ: ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দে ৩ হিজরীর শাওয়াল মাসে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে ৭০ জন মুসলমান শাহাদাত বরণ করেন। যার মধ্যে রাসূল (সা) এর চাচা হামজা (রা)ও ছিলেন।
১২৬. ইবনে মাজাহ, কিতাবুল জানায়েয, বাবু মা যায়া ফিল বুকা আলাল মায়্যিত, খ. ২, পৃ. ৫২৫, হাদিস নং ১৫৯১, আলবানি বলেন, হাদিসটি হাসান সহীহ।
📄 মুতাহ'র যুদ্ধের তিন জন সাহাবীর জন্য ক্রন্দন
মুতাহ'র যুদ্ধে'২৭ শাহাদাত বরণকারী তিনজন সেনাপতিই ছিলেন আল্লাহর ওয়াদা পালনকারী বান্দা। যে সব ওয়াদা পালনকারী বান্দা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ১২৮
إِنَّ اللهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيل الله فيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالإِنْجِيلِ وَالْقُرْآنِ وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُمْ بِهِ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
“আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাঁদের জান ও মাল এই মূল্যে ক্রয় করেছেন যে, তাঁদের জন্য রয়েছে জান্নাত। তাঁরা যুদ্ধ করে আল্লাহর রাস্তায় অতঃপর মারে ও মরে। তাওরাত, ইঞ্জিল ও কুরআনে তিনি এ সত্য প্রতিশ্রুতিতে অবিচল। আর আল্লাহর চেয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কে অধিক? সুতরাং তোমরা আনন্দিত হও সে লেন-দেনের ওপর, যা তোমরা করছ তাঁর সাথে। আর এ হল মহান সাফল্য।"
যায়েদ ইবনে হারেসা, জাফর ইবনে আবি তালিব এবং আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার শাহাদাতের পর রাসূল ﷺ অঝোর ধারায় কেঁদেছিলেন। হাদিসে এসেছে,
عَنْ أَنَسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَعَى زَيْدًا وَجَعْفَرًا وَابْنَ رَوَاحَة لِلنَّاسِ قَبْلَ أَنْ يَأْتِيَهُمْ خَبَرُهُمْ فَقَالَ أَخَذَ الرَّايَة زَيْدٌ فَأَصِيبَ ثُمَّ أَخَذَ جَعْفَرٌ قاصِيبَ ثُمَّ أَخَذَ ابْنُ رَوَاحَة فَأَصِيبَ وَعَيْنَاهُ تَدْرفان حَتَّى أَخَذَ الرَّايَةَ سَيْفٌ مِنْ سُيُوفِ اللَّهِ حَتَّى فَتَحَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ
আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। (তিনি বলেছেন) যুদ্ধের ময়দান থেকে খবর আসার আগেই নবী ﷺ লোকদেরকে যায়েদ ইবনে হারেসা, জাফর ইবনে আবু তালিব এবং আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহার শাহাদাতের কথা জানিয়ে দিলেন। তিনি বললেন, যায়েদ পতাকা নিয়ে অগ্রসর হলো এবং শাহাদাতবরণ করল। তখন জাফর পতাকা নিয়ে অগ্রসর হলো এবং সেও শাহাদাতবরণ করল। এরপর ইবনে রাওয়াহা পতাকা নিয়ে অগ্রসর হলো এবং সেও শাহাদাতবরণ করল। একথা বলার সময় নবী ﷺ এর দুচোখ থেকে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়তে থাকলো। তিনি বললেন, অবশেষে আল্লাহর এক তরবারি পতাকা হাতে অগ্রসর হলো আর তাঁর নেতৃেত্বে আল্লাহ তাঁদেরকে শত্রুদের বিরুদ্ধে বিজয় দান করলেন।
টিকাঃ
১২৭. মুতার যুদ্ধঃ মুতা হলো উরদুন অঞ্চলের বালকা নামক স্থানের নিকটবর্তী একটি জনপদের নাম। ৮ম হিজরীর জামদিউল উলা মাসে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। রাসূল ﷺ এর জীবদ্দশাতে এটি ছিল সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। রাসূল ﷺ যায়েদ ইবন হারেসাকে প্রথম অধিনায়ক মনোনীত করে দেন এবং বলেন, যায়েদ শাহাদাত বরণ করলে তোমাদের অধিনায়কের দায়িত্ব গ্রহণ করবে জা'ফর ইবন আবি তালিব। জাফর শাহাদাত বরণ করলে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা এ দায়িত্ব গ্রহণ করবে। যুদ্ধের মাঠে একে একে তিনজন সেনাপতিই শাহাদাত বরণ করলে খালিদ বিন ওয়ালীদ চতুর্থ সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তার হাতেই মুসলমানরা বিজয় অর্জন করেন।
১২৮. কুরআনুল কারীম, সূরা আত-তওবাহ, আয়াত ১১১।
১২৯. সহীহ বুখারী, কিতাবুল মাগাজি, বাবু গুজওয়াতুল মুতা, খ. ৪, পৃ. ১৫৫৪, হাদিস নং ৪০১৪।