📄 বদরের যুদ্ধের আগের দিন ক্রন্দন
মদিনা থেকে ৮০ মাইল দূরে বদর একটি ক্ষুদ্র গ্রাম। ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদরের যুদ্ধ এখানেই সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে কাফেরদের সৈন্য সংখ্যা ছিল এক হাজার। তারা অস্ত্রশস্ত্রে পরিপূর্ণভাবে সজ্জিত ছিল। তাদের বাহিনীতে তিনশত ঘোড়া ও সাতশ উট ছিল। অন্যদিকে মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র তিনশত তের জন এবং দুটি ঘোড়া ও সত্তরটি উট ছিল। আর কাফেরদের মতো মুসলমানদের তেমন অস্ত্রশস্ত্রও ছিল না। যুদ্ধের আগের দিন রাসূল ﷺ বদরের প্রান্তরে কাঁদছিলেন এই বলে, হে আল্লাহ! এই ছোট বাহিনীকে যদি তুমি শেষ করে দাও তবে এ পৃথিবীতে তোমার নাম স্মরণ করার মতো কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। যেমন আলী ইবন আবি তালিব (রা) থেকে বর্ণিত,
مَا كَانَ فِينَا فَارِسٌ يَوْمَ بَدْرٍ غَيْرُ الْمِقْدَادِ ، وَلَقَدْ رَأَيْتُنَا وَمَا فِينَا قَائِمٌ إِلَّا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يُصَلِّي تَحْتَ شَجَرَةٍ وَيَبْكِي حَتَّى أَصْبَحَ
তিনি বলেন, বদর যুদ্ধের দিন মিকদাদ (রা) ছাড়া আমাদের আর কেউ অশ্বারোহী ছিল না। আমরা দেখলাম রাসূল ﷺ একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সারারাত নামাজ পড়ছেন আর কাঁদছেন। এ অবস্থায় সকাল হয়ে গেল।
উল্লেখ্য যে আল্লাহ তার এই দোয়া কবুল করেন এবং মুসলমানদের বিজয় সংবাদ দান করে ওহী নাযিল করেন।
টিকাঃ
১১৪. আবু ইয়ালা আহমদ ইবন আলী, মুসনাদে আবু ইয়ালা (আল-মাকতাবাতুশ শামেলাহ), খ. ১ম, পৃ. ১৭৫, হাদিস নং. ২৮০
📄 সন্তান সন্ততির মৃত্যুর পর ক্রন্দন
সন্তান-সন্ততির মৃত্যুর পরে কান্নাটা রহমতের। রাসূল ﷺ এর চারজন কন্যা সন্তান ছিলেন। তাঁরা সকলেই প্রথম স্ত্রী খাদিজা (রা) এর ঔরষজাত সন্তান ছিলেন। তাঁরা হলেন: যয়নব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম ও ফাতিমা (রা)। ফাতিমা (রা) বাদে বাকি তিনজনই রাসূল ﷺ এর জীবদ্দশাতেই ইন্তেকাল করেন। একমাত্র কন্যা ফাতিমা (রা) রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ওফাতের তিন মাস পরে ইন্তেকাল করেন। এছাড়া তিনজন পুত্র সন্তান ছিল। এদের মধ্যে দু'জন ছিল প্রথম স্ত্রী খাদিজা (রা) এর এবং অন্যজন দাসী মারিয়া কিবতিয়া (রা) এর। এরা হলেন কাশেম, আব্দুল্লাহ ও ইবরাহীম। এরা সবাই শিশুকালেই মারা যান। পুত্র ইবরাহীম যখন মৃত্যুবরণ করেন, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ কান্নাকাটি করেন।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رضى الله عنه قَالَ دَخَلْنَا مَعَ رَسُول الله صلى الله عليه وسلم - عَلى أبى سَيْفِ القين - وَكَانَ ظِيْرًا لِإِبْرَاهِيمَ - عَلَيْهِ السَّلَامُ - فَأَخَذَ رَسُولُ اللهِ - صلى الله عليه وسلم - إِبْرَاهِيمَ فَقَبَّلَهُ وَشَمَّهُ ، ثُمَّ دَخَلْنَا عَلَيْهِ بَعْدَ ذلِكَ ، وَإِبْرَاهِيمُ يَجُودُ بِنَفْسِهِ ، فَجَعَلَتْ عَيْنَا رَسُولُ اللهِ - صلى الله عليه وسلم - تذرفان . فقالَ لَهُ عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ عَوْفٍ رضى الله عنه - وَأَنْتَ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَقَالَ « يَا ابْنَ عَوْفٍ إِنَّهَا رَحْمَة » . ثُمَّ أَتْبَعَهَا بأخرى فقال - صلى الله عليه وسلم « إِنَّ العَيْنَ تَدْمَعُ ، وَالقَلبَ يَحْزَنُ ، وَلا نَقُولُ إِلا مَا يَرْضَى رَبُّنَا ، وَإِنَّا بِفِرَاقِكَ يَا إِبْرَاهِيمُ لَمَحْزُونُونَ »
আনাস ইবন মালেক (রা) বলেন, আমরা রাসূল ﷺ এর সাথে তাঁর পুত্র ইবরাহীমের ধাত্রীর স্বামী কর্মকার আবু সাঈফের নিকট গেলাম। রাসূল ﷺ ইবরাহীমকে কোলে নিয়ে চুম্বন করলেন এবং আদর করলেন। এরপর আবার আমরা তাঁর কাছে গিয়ে দেখলাম ইবরাহীমের মুমূর্ষু অবস্থা। তখন রাসূল ﷺ এর চক্ষুদ্বয় হতে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছিল। আব্দুর রহমান ইবন আওফ (রা) বলে উঠলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনিও (কাঁদছেন?)! তিনি বললেন, হে ইবন আওফ! ইহা মমতা। পুনরায় অশ্রুপাত করে বললেন, নিঃসন্দেহে চোখ কাঁদে আর হৃদয় হয় ব্যথিত। কিন্তু, আমরা কেবল তাই বলি যা আমাদের রব পছন্দ করেন। হে ইবরাহীম! আমরা তোমার বিচ্ছেদে শোকাভিভূত।
عَن ابْنِ عَبَّاس قالَ لمَّا حُضِرَت بنت لِرَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم- صَغِيرَةٌ فَأَخَذَهَا رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم - فَضَمَّهَا إِلَى صَدْرِهِ ثُمَّ وَضَعَ يَدَهُ عَلَيْهَا فَقَضَتْ وَهِيَ بَيْنَ يَدَيْ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم- فَبَكَتْ أُمُّ أَيْمَنَ فَقَالَ لَهَا رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم- « يَا أمَّ أَيْمَنَ أَتَبْكِينَ وَرَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم - عِنْدَكَ ». فقالت مَا لِي لا أَبْكِي وَرَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَبْكِي فَقَالَ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم « إِنِّي لستُ أَبْكِي وَلَكِنَّهَا رَحْمَةٌ ». ثمَّ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم- « الْمُؤْمِنُ بِخَيْرٍ عَلَى كُلِّ حَالٍ تُنْزَعُ نَفْسُهُ مِنْ بَيْنِ جَنْبَيْهِ وَهُوَ يَحْمَدُ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ ».
ইবন আব্বাস (রা) বলেন, রাসূল ﷺ এর ছোট মেয়ের মৃত্যু উপস্থিত হলে তিনি তাঁকে তুলে নিয়ে নিজ বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন, তারপর নিজের হাত তার ওপর রাখলেন। রাসূল ﷺ এর সামনেই তাঁর মৃত্যু হলো। তাতে উম্মে আইমান (রা) কাঁদতে লাগলেন। রাসূল ﷺ তাঁকে বললেন, হে উম্মে আইমান! তুমি কাঁদছো অথচ আল্লাহর রাসূল ﷺ তোমার সামনে উপস্থিত। তিনি বলেন, আমি কেন কাঁদব না যখন স্বয়ং আল্লাহর রাসূল ﷺ কাঁদছেন। রাসূল ﷺ বলেন, আমি কাঁদছি না বরং তা অন্তরের প্রকৃতিগত মায়া-মমতা। অতঃপর রাসূল ﷺ বলেন, মুমিন ব্যক্তি সর্বাবস্থায় ভালো থাকে। তার পার্শ্বদ্বয় থেকে তাঁর রুহ বের করা হয় অথচ তখনও সে মহামহিম আল্লাহর প্রশংসা করতে থাকে।
টিকাঃ
১১৫. আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি রাসূল ﷺ থেকে বর্ণনা করেছেন, নবী ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তার রহমতকে একশত ভাগে বিভক্ত করেছেন, একভাগ সমগ্র সৃষ্টির মাঝে বণ্টন করে দিয়েছেন। যার ফলে তোমরা পরস্পরের প্রতি রহম কর এবং অনুগ্রহ কর। এ কারণে বন্য প্রাণীও তার বাচ্চাদের প্রতি অনুগ্রহ করে। আর বাকী ৯৯ ভাগ রহমত দিয়ে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার বান্দাদের প্রতি অনুগ্রহ করবেন। সূনানে ইবনে মাজাহ, কিতাবুল জুহুদ, বাবু মা ইউরজা মিন রহমাতিল্লাহ ইয়াওমাল কিয়ামাহ, খ. ৫ পৃ. ৩৫২, হাদিস নং, ৪২৯৩।
১১৬. ইবন সাদ, আত-তবাকাতুল কুবরা, ৮ম খণ্ড, পৃ. ১৯-৩০।
১১৭. ইবরাহীম রাসূলুল্লাহ (সা) এর তৃতীয় পুত্র ছিলেন এবং তিনি ৮ম হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মহানবী (সা) এর সর্বশেষ সন্তান ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর জন্মের ৭ম দিনে আকীকা করেন। এতে তিনি দু'টি মেষ জবেহ করে সম্পূর্ণ দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করে দেন এবং তাঁর মাথা মুণ্ডন করে চুল মাটিতে পুঁতে রাখেন এবং চুল পরিমাণ রৌপ্যর মূল্য গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দেন। তিনি ১০ হিজরীর ১০ রবিউল আউয়াল মাসে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুতে নবী (সা) বলেন, আল্লাহ ইবরাহীমের লালন পালনের জন্য বেহেশেতে জান্নাতী সেবিকা প্রেরণ করবেন। ইবন সাদ, আত-তবাকাতুল কুবরা, ৮ম খণ্ড, পৃ. ৭।
১১৮. বুখারী, আস-সহীহ, অধ্যায়: জানায়িয, অনুচ্ছেদ: কওলুন্নাবী (সা) ইন্না বিকা লা মাহযুনুন, খ. ৫ম, পৃ. ৫৭, হাদিস নং. ১২২০
১১৯. আহমদ ইবন শুআইব আবু আব্দুর রহমান আন নাসায়ী, আস-সুনান, অধ্যায়: জানায়িয, অনুচ্ছেদ: ফিল বুকা আলাল মায়্যিত, খ. ৬, পৃ. ৪১৯, হাদিস নং. ১৮০৪ আলবানি হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
📄 অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গিয়ে কান্না
মদিনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের বনী 'সায়িদাহ' শাখার সন্তান ছিলেন সাদ ইবনে উবাদা (রা)। শেষ আকাবার বাই'আতের সময় সাদ (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে বনী সায়িদার নাকীব (দায়িত্বশীল) নিয়োগ করেন। হিজরতের দ্বাদশ মাসে রাসূলুল্লাহ ﷺ কুরাইশদের গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য ছোট একটি বাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে 'আবওয়া' নামক স্থানে যান। এটাকে 'ওয়াদ্দান' অভিযানও বলা হয়। এ বাহিনীতে কোনো আনসার মুজাহিদ ছিল না। এ সময় পনেরোটি রাত রাসূলুল্লাহ ﷺ মদিনার বাইরে ছিলেন। তিনি সাদ ইবন উবাদাকে (রা) স্বীয় প্রতিনিধি হিসেবে মদিনায় রেখে যান। মক্কা বিজয়ের দিন খোদ রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ঝাণ্ডাটি সাদের হাতে ছিল। একবার তিনি অসুস্থ হলে রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবাগণকে সংগে করে তাঁকে দেখতে যান এবং কান্নাকাটি করেন। আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা) বলেন,
قَالَ اشْتَكَى سَعْدُ بْنُ عُبَادَةَ شَكْوَى لَهُ فَأَتَاهُ النَّبِيُّ - صلى الله عليه وسلم - يَعُودُهُ مَعَ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ وَسَعْدِ بْنِ أَبِي وَقَّاصٍ وَعَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ رضی الله عنهم - فلمَّا دَخَلَ عَلَيْهِ فَوَجَدَهُ فِي غَاشِيَةِ أَهْلِهِ فَقالَ « قد قضى » . قالوا لا يَا رَسُولَ اللهِ . فَبَكَى النَّبِيُّ - صلى الله عليه وسلم - فلمَّا رَأَى الْقَوْمُ بُكَاءَ النَّبِيِّ - صلى الله عليه وسلم - بَكَوْا فقالَ « أَلا تَسْمَعُونَ إِنَّ اللَّهَ لَا يُعَذِّبُ بِدَمْعِ الْعَيْنِ ، ولا يحزن القلب ، وَلَكِنْ يُعَذِّبُ بهَذا - وَأَشَارَ إِلى لِسَانِهِ أَوْ يَرْحَمُ وَإِنَّ الْمَيِّتَ يُعَدَّبُ ببُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ » وَكَانَ عُمَرُ ، رَضِيَ اللهُ عَنْهُ ، يَضْرِبُ فِيهِ بِالْعَصَا وَيَرْمِي بِالحِجَارَةِ وَيَحْلِي بِالتُّرَابِ.
সাদ বিন উবাদাহ (রা) কোনো এক রোগে ভুগছিলেন। নবী ﷺ আব্দুর রহমান ইবনে আওফ, সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস এবং আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) সহ তাঁকে দেখতে আসলেন। তাঁর কাছে গিয়ে দেখলেন তিনি পরিবার পরিজন দ্বারা বেষ্টিত আছেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি কি মারা গেছেন? তারা বলল, না, হে আল্লাহর রাসূল! একথা শুনে রাসূল ﷺ কেঁদে ফেললেন। রাসূল ﷺ এর কান্না দেখে তাঁরাও কাঁদতে লাগল। তখন তিনি বলেন, তোমাদের কোনো চোখের অশ্রু এবং অন্তরের শোকের জন্য আল্লাহ কাউকে শাস্তি দেবেন না। কিন্তু শাস্তি দেবেন অথবা দয়া করবেন এর জন্য, (এ বলে তিনি) নিজ জিহ্বার দিকে ইশারা করলেন। নিঃসন্দেহে মৃতের প্রতি পরিজনের বিলাপের দরুন শাস্তি দেওয়া হয়। উমর (রা) এর পুত্র আবদুল্লাহ (রা) আরো বলেন, উমর (রা) এর অবস্থা ছিল এমন যে, তিনি এরূপ কাঁদার জন্য লাঠি দ্বারা আঘাত করতেন, কংকর নিক্ষেপ করতেন এবং মুখে মাটি পুরে দিতেন।
টিকাঃ
১২০. বুখারী, আস-সহীহ, অধ্যায়: জানায়েয, অনুচ্ছেদ: আল-বুকা ইনদাল মারিদ, খ. ১ম, পৃ. ৪৩৯, হাদিস নং: ১২৪২
📄 বদরের বন্দিদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর ক্রন্দন
বদরের যুদ্ধের সময় সত্তর জন কাফের মুসলমানদের হাতে বন্দি হন। তাদেরকে যুদ্ধের পরে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। মুক্তিপণ বাবদ প্রত্যেকের নিকট থেকে ৪০০০ দিরহাম গ্রহণ করা হয়। যারা দারিদ্রের কারণে অর্থ পরিশোধ করতে পারেনি কিন্তু লেখাপড়া জানে তাদেরকে আটকে রেখে মুক্তিপণ নির্ধারণ করা হয় প্রত্যেক বন্দি দশ জন নিরক্ষর মুসলমানকে পড়া লেখা শেখাবে। যারা না মুক্তিপণ পরিশোধে সক্ষম ছিল, না লেখাপড়া জানতো, তাদের এমনিতেই মুক্ত করে দেওয়া হয়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে এতে একদিকে মহানবীর ন্যায়বিচার এবং অন্যদিকে একজন নিখুঁত পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তির স্বাভাবিক মর্যাদাই প্রতিফলিত হয়। এ ঘটনাটি বেশ কিছুসংখ্যক গ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে। আল্লামা শিবলি নোমানীর ভাষায়, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জামাতা আবুল আস এই বন্দিদের মধ্যে একজন ছিলেন। মুক্তিপণের অর্থ তার কাছে ছিল না। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কন্যা যয়নাব তার স্ত্রী। মক্কায় তার স্ত্রীর নিকট মুক্তিপণের অর্থ পাঠানোর জন্য তিনি খবর পাঠালেন। যয়নাবের বিয়ের সময় মাতা খাদিজা (রা) একটি মূল্যবান গলার হার উপহার হিসেবে তাঁকে দিয়েছিলেন। যয়নাব এই হারটি খুলে মুক্তিপণ বাবদ মদিনায় পাঠালেন। হারটি দেখে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ২৫ বছর পূর্বেকার স্মৃতি মনে পড়ে গেল। মেয়ের প্রতি স্নেহের কারণে তিনি কান্না রোধ করতে পারলেন না। কান্নারত অবস্থায় তাঁর সাহাবাগণকে বললেন, তোমরা যদি চাও তাহলে তাঁর মায়ের দেয়া স্মৃতি চিহ্নটি তাঁর মেয়ের কাছে ফেরত দিতে পারো। সকলে এই প্রস্তাবে সম্মতি দিলেন এবং হারটি মক্কায় ফেরত পাঠানো হলো। আবুল আস মুক্তি লাভ করে মক্কায় ফিরে গিয়ে যয়নাবকে মদিনায় পাঠিয়ে দিলেন।
মুক্তিপণের বিনিময়ে বদরের যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি দেওয়া আল্লাহ পছন্দ করেননি। তাই তিনি ওহীর মাধ্যমে সতর্ক করে দিলেন। তিরস্কারসূচক এই ওহী নাযিলের পর রাসূলুল্লাহ ﷺ ও আবু বকর (রা) কেঁদে ফেলেন। এ ব্যাপারে ইবনে আব্বাস (রা) এর হাদিসটি প্রণিধানযোগ্য।
ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, বদরের যুদ্ধের দিন যখন মুসলমানরা কুরাইশদের বন্দি করে নিয়ে আসলো তখন রাসূল ﷺ ব্যাপারে আবু বকর ও উমর (রা) এর সঙ্গে পরামর্শ করে কয়েদিদের ব্যাপারে তাদের অভিমত জানতে চাইলেন। জবাবে আবু বকর (রা) বললেন, হে আল্লাহর নবী! ওরা সবাই আমাদের চাচাতো ভাই ও স্বগোত্রীয়, তাই আমি মনে করি, তাদের থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ করা হোক। ফলে একদিকে কাফিরদের ওপর আমাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি পাবে। অপরদিকে হয়তো অচিরেই আল্লাহ তাদেরকে ইসলামের হেদায়াত দান করবেন। অতপর রাসূল ﷺ উমরকে (রা) লক্ষ্য করে বললেন, হে ইবনুল খাত্তাব! তোমার অভিমত কি? জবাবে তিনি বলেন, আমি বললাম (আবু বকর যা বলেছেন) আল্লাহর কসম, তা হতে পারে না, হে আল্লাহর রাসূল! আবু বকরের মতের সাথে আমি একমত নই। আমি মনে করি যদি আমাদের ক্ষমতা বা অধিকার দেওয়া হয় তাহলে আমরা তাদের সকলের ঘাড় সংহার করে দেব। সুতরাং আলী (রা) কে অধিকার দিন তিনি (তাঁর ভাই) আকিল থেকে বুঝাপড়া করে নেবে এবং তিনিই তার ঘাড় সংহার করবেন। আর আমি উমারকে আমার নিকটতম অমুক সম্পর্কে অধিকার দিন, আমি তার ঘাড় সংহার করব। কেননা তারা হচ্ছে কুফরের সংগঠন এবং তাদেরই নেতা বা সরদার। (উমর (রা) বলেন) কিন্তু রাসূল ﷺ আবু বকর যা বলেছেন সে দিকেই ঝুঁকে পড়লেন বা তা সমর্থন করলেন, আর আমি যা বললাম তা সমর্থন করলেন না। পরদিন আমি যখন গেলাম তখন দেখলাম, রাসূল ﷺ ও আবু বকর (রা) উভয়ে এক জায়গায় উপবিষ্ট। কিন্তু দুজনই কাঁদছেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! অনুগ্রহ করে আমাকে বলুন, আপনিই বা কেন কাঁদছেন আর আপনার সাথীই বা কেন কাঁদছে? যদি আমি পারি তাহলে আমিও কাঁদব, আর যদি আমার কান্না না আসে, অন্তত আপনাদের উভয়ের কান্নার দরুন আমিও কান্নার ভান করব। উত্তরে রাসূল ﷺ বললেন, ওসব কয়েদিদের থেকে মুক্তিপণ হিসাবে মাল নেওয়ায় তোমার সাথীদের ওপর যে বিপর্যয় নেমে আসছে সে জন্য আমি কাঁদছি। বস্তুত তাদের উপরের আযাব ও শাস্তি ঐ বৃক্ষটির চেয়ে অতি নিকটে আমার নিকট তুলে ধরা হয়েছে। বর্ণনাকারী বলেন (এ কথাগুলো বলার সময়) নবী ﷺ এর নিকট একটি বৃক্ষ ছিল। অতঃপর আল্লাহ তা'য়ালা নিম্নের আয়াতটি নাযিল করেন। আল্লাহর বাণী ১২২: “দেশে সম্পূর্ণভাবে শত্রু নিপাত না করা পর্যন্ত নিজের কাছে বন্দি রাখা কোনো নবীর জন্য সংগত নয়। যা হোক যুদ্ধে তোমরা যা লাভ করেছ তা বৈধ ও উত্তম বলে ভোগ কর,” এই পর্যন্ত। সে থেকে আল্লাহ মুসলমানদের জন্য গণীমাত হালাল করেছেন।
টিকাঃ
১২১. আবদুল মালিক ইবন হিশাম, আল-সীরাতুন নাবাবীয়্যা, কায়রো: ১৯৫৫খ্রি., ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৬৫৩; মুহাম্মাদ ইবন আবদাল বাকী আল-যুরকানী, আরহুল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়াহ, খণ্ড ৮ম, পৃ. ৪৫১; মুহাম্মাদ ইবনুল জারীর আত-তাবারী, তারীখুর রসূল ওয়াল মুলুক, মিশর: ১৯৬১, ১০ম খণ্ড, পৃ. ৩৬৮; সুসান আবু দাউদ, পৃ. ১১; শিবলী নোমানী, সীরাতুন্নবী, ভারত: আযমগড়: ১৩৭৫হি. পৃ. ৩৩৩
১২২. আল-কুআনুল কারীম, সূরা আনফাল, আয়াত ৬৮।
১২৩. সহীহ মুসলিম, কিতাবুল জিহাদ, বাবু আল-ইমদাদ বিল মালাইকাহ ফি গুযওয়াতি বদর, খ. ৫, পৃ. ১৫৬, হাদিস নং ৪৬৮৭।