📘 রাসুলুল্লাহ সাঃ এর কান্না > 📄 কুরআন তেলাওয়াতে কান্না

📄 কুরআন তেলাওয়াতে কান্না


রাসূল ﷺ কুরআন তেলাওয়াতের সময় কাঁদতেন, বিশেষ করে রাত্রে দাঁড়িয়ে বার বার তিনি উম্মাহর জন্য ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতেন আর বলতেন,
إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ﴾
“এখন যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি দেন তাহলে তারা তো আপনার বান্দা আর যদি মাফ করে দেন তাহলে আপনি তো পরাক্রমশালী ও জ্ঞানময়।” এভাবে তিনি কখনও কখনও সারা রাত দাঁড়িয়ে কাঁদতেন।
রাসূল ﷺ যখন কুরআন তেলাওয়াত করতেন বা শুনতেন তখন হৃদয় ও মনের সকল অনুভূতি খোলা রাখতেন, সে কারণে রাসূল ﷺ কুরআন তেলাওয়াত শোনোর সময় কাঁদতেন। হাদিসে এসেছে,
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْن مَسْعُودٍ قَالَ : قَالَ لِي النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم اقْرَأ عَلَيَّ قُلتُ يَا رَسُولَ اللهِ أقرأ عَلَيْكَ وَعَلَيْكَ أُنْزِلَ قَالَ نَعَمْ فَقَرَأْتُ سُورَةَ النِّسَاءِ حَتَّى أَتَيْتُ إلى هَذِهِ الْآيَةِ فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا} قالَ حَسْبُكَ الْآنَ فَالْتَفَتُ إِلَيْهِ فَإِذَا عَيْنَاهُ تَدْرِفان
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেন, একদিন হুজুর ﷺ আমাকে বলেন আমাকে কুরআন তেলাওয়াত করে শোনাও। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার সামনে কুরআন তেলাওয়াত করব? অথচ আপনার ওপর কুরআন নাযিল করা হয়েছে। রাসূল ﷺ বললেন, হ্যাঁ (আমি অন্যের নিকট শুনতে ভালোবাসি)। অতঃপর আমি 'সূরা নিসা' তেলাওয়াত করা শুরু করলাম যখন এ পর্যন্ত পৌঁছালাম فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا} (তারা কি করবে যখন আমি প্রত্যেক উম্মত থেকে একজন সাক্ষী আনব এবং তাদের ওপর তোমাকে সাক্ষী হিসাবে দাঁড় করাব?)
রাসূল ﷺ বললেন, এখন থাম, ইহাই যথেষ্ট। এরপর আমি তাঁর মুখমণ্ডলের দিকে তাকালাম এবং দেখতে পেলাম তাঁর চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে।
কুরআন তেলাওয়াতের সময় রাসূল ﷺ আল্লাহর ভয়ে বিনীত থাকতেন। হাদিসে এসেছে,
একদিন রাত্রে দাঁড়িয়ে রাসূল ﷺ আবু মুসা (রা)-এর তেলাওয়াত শুনছিলেন। তিনি বর্ণনা করেছেন, রাসূল ﷺ তাকে লক্ষ্য করে বলেছেন, হে আবু মুসা! তোমাকে দাউদ (আ)-এর পরিবারের সঙ্গীতযন্ত্রের মধ্য থেকে একটি (সুললিত কণ্ঠ) দান করা হয়েছে। ইমাম বায়হাকি বলেন, আবু মুসা বলেন, আমি যদি জানতাম আপনি আমার তেলাওয়াত শুনছেন তাহলে আমি আরো সুন্দর ও চমৎকার করে তেলাওয়াত করতাম।

টিকাঃ
১০৫. আল-কুরআন, সূরা আল- মায়েদাহ, ৫: ১১৮।
১০৬. প্রাগুক্ত, সূরা নিসা আয়াত ৪১।
১০৭. সহীহ বুখারী, কিতাব: ফাদায়িলুল কুরআন, কওলুল মুকরিয়ু লিলকারী: হাসবুক, খ. ৪, পৃ. ১৯২৫, হাদিস নং ৪৭৬৩।
১০৮. সহীহ বুখারী, কিতাব: ফাদায়িলুল কুরআন, বাবু হুসনুস সাওতু বিল কিরায়াতে বিল কুরআন খ. ৪, পৃ. ১৯২৫, হাদিস নং ৪৭৬৩।
১০৯. সূনানুল কুবরা লিল বাইহাকি, হাদিস নং, ৪৪৮৪।

📘 রাসুলুল্লাহ সাঃ এর কান্না > 📄 নামাজের মধ্যে ক্রন্দন

📄 নামাজের মধ্যে ক্রন্দন


রাসূলুল্লাহ ﷺ নামাজরত অবস্থায় এমনভাবে কাঁদতেন যে দূর থেকে তাঁর কান্নার আওয়াজ শোনো যেত। একবার আয়েশা (রা) কে প্রশ্ন করা হলো রাসূল ﷺ সম্পর্কে আপনার জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা কী? তিনি বললেন, এক রাতে উঠে রাসূল ﷺ আমাকে বললেন, আয়েশা তুমি আমাকে ছাড়, আমি আমার প্রভুর ইবাদত করি। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি আপনার নৈকট্য পছন্দ করি এবং আপনার পছন্দের জিনিসও পছন্দ করি। আয়েশা (রা) বলেন, তিনি উঠে অযু করলেন এবং নামাজে দাঁড়ালেন। আর কাঁদতে আরম্ভ করলেন। কাঁদতে কাঁদতে তাঁর বক্ষ ভিজে গেল। আরো কাঁদলেন, কাঁদতে কাঁদতে মাটি পর্যন্ত ভিজে গেল। বেলাল (রা) তাঁকে ফজরের নামাজের সংবাদ দিতে এসে দেখেন তিনি কাঁদছেন। বেলাল (রা) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কাঁদছেন? অথচ আল্লাহ আপনার আগের ও পরের সকল গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন। রাসূল ﷺ বললেন, আমার কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হতে মনে চায় না? আজ রাতে আমার ওপর কয়েকটি আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে, যে এগুলো পড়বে আর চিন্তা-ফিকির করবে না, সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অতঃপর সূরা আল ইমারনের কতিপয় আয়াত পড়লেন।
অন্য একটি হাদিসে এসেছে,
عَنْ مُطَرِّفٍ عَنْ أَبِيهِ قَالَ أَتَيْتُ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ يُصَلَّى وَلِجَوْفِهِ أُزِيزٌ كَازِيزِ الْمِرْجَلُ يَعْنِي يَبْكِي
মুতাররিফ (র) থেকে তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী ﷺ এর নিকট আসলাম, তিনি তখন নামাজরত ছিলেন এবং তাঁর পেটের মধ্যে হাপরের মধ্য থেকে নির্গত আওয়াজের অনুরূপ আওয়াজ হচ্ছিল অর্থাৎ তিনি কাঁদছিলেন।

টিকাঃ
১১০. সহীহ ইবন হিব্বান আতা (রা) থেকে। হাদিস নং-৬৮
১১১. আবু আব্দুর রহমান আহমদ আন-নাসায়ী, আস-সুনান, অধ্যায়: সিফাতুস সালাত, পরিচ্ছেদ: আল-বুকা ফিস সালাত, হাদিস নং, ১২১৪; আলবানি হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।

📘 রাসুলুল্লাহ সাঃ এর কান্না > 📄 কবরের আযাব ও তার শাস্তির কথা স্মরণ করে কান্না

📄 কবরের আযাব ও তার শাস্তির কথা স্মরণ করে কান্না


কবরের আযাব ও তার শাস্তির কথা স্মরণ করে আল্লাহর রাসূল ﷺ কাঁদতেন। যেমন হাদিসে এসেছে,
عَنِ البَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ قَالَ : بَيْنَمَا نَحْنُ مَعَ رَسُولِ اللهِ صلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِدْ بَصُرَ بِجَمَاعَةٍ ، فَقَالَ : عَلامَ اجْتَمَعَ عَلَيْهِ هَؤُلاء ؟ قِيلَ : عَلَى قَبْرٍ يَحْفِرُونَهُ قال : ففزعَ رَسُولُ اللهِ صلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، فَبَدَرَ بَيْنَ يَدَيْ أَصْحَابِهِ مُسْرِعًا حَتَّى انْتَهَى إلى القَبْرِ ، فَجَنَّا عَلَيْهِ . قَالَ : فَاسْتَقْبَلْتُهُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ لأَنظُرَ مَا يَصْنَعُ ، فبَكَى حَتَّى بَلَّ الثَّرَى مِنْ دُمُوعِهِ ، ثُمَّ أَقْبَلَ عَلَيْنَا قَالَ : أَي إِخْوَانِي لِمِثْلِ الْيَوْمِ فَأَعِدُّوا ؟.
বারা ইবন আজিব (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসূল ﷺ এর সাথে চলছিলাম এবং এক জায়গায় অনেক লোকজন দেখে রাসূল ﷺ জিজ্ঞাসা করলেন, লোকরা কেন এখানে একত্রিত হয়েছে? বলা হলো তারা একটা কবর খুড়ছে। রাবী বলেন, রাসূল ﷺ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে গেলেন এবং সাহাবীদের সামনে থেকে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে কবরের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে গেলেন। রাবী বলেন, তিনি কি করেন এটা দেখার জন্য আমরা তাঁর সামনে দাঁড়ালাম। অতঃপর তিনি কাঁদতে লাগলেন এমনকি তাঁর চোখের পানিতে মাটি সিক্ত হয়ে গেল। এরপর আমাদের নিকট এসে বললেন, হে আমার সাথীরা! তোমরা কি আজকের দিনের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছ?
যেমন অন্য হাদিসে এসেছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ زَارَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم - قبْرَ أُمِّهِ فَبَكَى وَأَبْكَى مَنْ حَوْلَهُ فَقَالَ « اسْتَأذنتُ رَبِّي فِي أنْ أسْتَغْفِرَ لَهَا فَلَمْ يُؤْذِنْ لِي وَاسْتَأْذَنَتُهُ فِي أَنْ أُزُورَ قَبْرَهَا فَأَذِنَ لِى فَزُورُوا القُبُورَ فَإِنَّهَا تُذَكَّرُ الْمَوْتَ ».
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করতে গেলেন। তিনি কাঁদলেন এবং আশেপাশের সবাইকে কাঁদালেন। রাসূল ﷺ বললেন, আমি আমার রবের নিকট মায়ের জন্য ক্ষমার অনুমতি চাইলাম। কিন্তু আমাকে অনুমতি দেয়া হলো না। অতএব তোমরা কবর যিয়ারত কর। কেননা কবর যিয়ারত তোমাদেরকে মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

টিকাঃ
১১২. আবু আবদুল্লাহ আহমদ ইবন হাম্বল, মুসনাদ, অধ্যায়: জুহুদ, অনুচ্ছেদ: আল-হুযন ওয়াল বুকা, খ. ৪র্থ, পৃ. ২৯৪, হাদিস নং ১৮৬২৪। আলবানি হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
১১৩. মুসলিম, আস-সহীহ, অধ্যায়: জানায়েয, অনুচ্ছেদ: ইসতিযানু নাবী রব্বাহু আয্যা ওয়া জাল্লা ফি যিয়ারাতি কবরি উম্মিহি, খ. ৩য়, পৃ. ৬৫, হাদিস নং, ২৩০৪

📘 রাসুলুল্লাহ সাঃ এর কান্না > 📄 বদরের যুদ্ধের আগের দিন ক্রন্দন

📄 বদরের যুদ্ধের আগের দিন ক্রন্দন


মদিনা থেকে ৮০ মাইল দূরে বদর একটি ক্ষুদ্র গ্রাম। ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদরের যুদ্ধ এখানেই সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে কাফেরদের সৈন্য সংখ্যা ছিল এক হাজার। তারা অস্ত্রশস্ত্রে পরিপূর্ণভাবে সজ্জিত ছিল। তাদের বাহিনীতে তিনশত ঘোড়া ও সাতশ উট ছিল। অন্যদিকে মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র তিনশত তের জন এবং দুটি ঘোড়া ও সত্তরটি উট ছিল। আর কাফেরদের মতো মুসলমানদের তেমন অস্ত্রশস্ত্রও ছিল না। যুদ্ধের আগের দিন রাসূল ﷺ বদরের প্রান্তরে কাঁদছিলেন এই বলে, হে আল্লাহ! এই ছোট বাহিনীকে যদি তুমি শেষ করে দাও তবে এ পৃথিবীতে তোমার নাম স্মরণ করার মতো কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। যেমন আলী ইবন আবি তালিব (রা) থেকে বর্ণিত,
مَا كَانَ فِينَا فَارِسٌ يَوْمَ بَدْرٍ غَيْرُ الْمِقْدَادِ ، وَلَقَدْ رَأَيْتُنَا وَمَا فِينَا قَائِمٌ إِلَّا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يُصَلِّي تَحْتَ شَجَرَةٍ وَيَبْكِي حَتَّى أَصْبَحَ
তিনি বলেন, বদর যুদ্ধের দিন মিকদাদ (রা) ছাড়া আমাদের আর কেউ অশ্বারোহী ছিল না। আমরা দেখলাম রাসূল ﷺ একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সারারাত নামাজ পড়ছেন আর কাঁদছেন। এ অবস্থায় সকাল হয়ে গেল।
উল্লেখ্য যে আল্লাহ তার এই দোয়া কবুল করেন এবং মুসলমানদের বিজয় সংবাদ দান করে ওহী নাযিল করেন।

টিকাঃ
১১৪. আবু ইয়ালা আহমদ ইবন আলী, মুসনাদে আবু ইয়ালা (আল-মাকতাবাতুশ শামেলাহ), খ. ১ম, পৃ. ১৭৫, হাদিস নং. ২৮০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00