📄 কান্নার বর্জনীয় দিকসমূহ
কান্না যেমন আমাদের আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও গুনাহ মাফে সাহায্য করে, ঠিক তেমনি কান্না আবার আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও গুনাহর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই, ইসলাম কান্নার বিভিন্ন দিককে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। ইসলামে কান্নার নিষিদ্ধ দিকসমূহ হলো:
১. উচ্চস্বরে কাঁদা।
২. বিলাপ বা মাতম করে কাঁদা।
৩. কাঁদার সময় জামা কাপড় ছিড়া।
৪. কান্নার প্রকাশ ঘটানোর জন্য মাথা মুড়ানো।
রাসূল ﷺ-এর হাদিসে এর বিস্তারিত বর্ণনা আছে। যেমন:
আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন,
عَنْ عَبْدِ اللهِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قالَ قالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيْسَ مِنَّا مَنْ لطم الحُدُودَ وَشَقَّ الجُيُوبَ وَدَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ
যে ব্যক্তি (শোকাতুর হয়ে) গাল চাপড়ায়, বুকের জামা ছেড়ে, আর জাহেলী যুগের রীতি অনুযায়ী চিৎকার করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়।
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ইবন বাত্তাল (র) বলেন, 'লাইছা মিন্না' অর্থ হলো, আমার সুন্নাত বা পথের উপরে না থাকা, ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়া নয়।
অন্য হাদিসে নবী ﷺ বলেন,
عَنْ أَبُو بُرْدَةَ بْنُ أَبِي مُوسَى رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ وَجِعَ أَبو مُوسَى وَجَعًا شَدِيدًا فَعْشِيَ عَلَيْهِ وَرَأسَهُ فِي حَجْرٍ امْرَأَةٍ مِنْ أَهْلِهِ فَلَمْ يَسْتَطِعْ أَنْ يَرُدَّ عَلَيْهَا شَيْئًا فَلَمَّا أفاق قَالَ أَنَا بَرِيءٌ مِمَّنْ بَرِئَ مِنْهُ رَسولُ اللهِ صلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ رَسُولَ اللهِ صلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَرِئَ مِنَ الصَّالِقَةِ وَالْحَالِقَةِ وَالشَّاقَةِ
আবু বুরদাহ ইবন আবু মুসা (রা) বলেন, একদা আবু মুসা রোগ যন্ত্রনায় সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন, তখন তাঁর মাথা পরিবারস্থ কোনো এক মহিলার কোলে ছিল, মহিলাটি ক্রন্দন করছিল। কিন্তু তার কান্না বন্ধ করার মতো শক্তি তাঁর ছিল না। অতঃপর যখন তিনি হুশ ফিরে পেলেন তখন বললেন, রাসূল ﷺ যাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন, তাদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। বস্তুতঃ রাসূল ﷺ সেই সমস্ত নারীদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন যারা শোকে বিলাপ করে, মাথা মুড়ায় এবং কাপড় ছিড়ে।
এমনকি আল্লাহর রাসূল ﷺ বিলাপ না করার জন্য অঙ্গীকার গ্রহণ করতেন। যেমন: হাদিসে এসেছে,
عَنْ أُمِّ عَطِيَّة قالت أخَذ عَلَيْنَا رَسولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم - مَعَ البَيْعَةِ الا ننوح فَمَا وَقت مِنَّا امْرَأَهُ إِلَّا خَمْسٌ أَمُّ سُلَيْمٍ وَأمُّ العَلَاءِ وَابْنَهُ أَبِي سَبْرَةَ امْرَأَهُ مُعَادٍ أو ابْنَهُ أبي سَبْرَةَ وَامْرَأَةٌ مُعَادٍ.
উম্মে আতীয়া (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল ﷺ বাইয়্যাতের সময় আমাদের কাছ থেকে এই অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, আমরা (মৃতের জন্য) বিলাপ করব না। কিন্তু পাঁচজন ব্যতীত আর কেউ তা রক্ষা করতে পারেনি। তারা হচ্ছেন উম্মে সুলাঈম, উম্মে আলা, আবু ছাবরার কন্যা-মুয়াযের স্ত্রী এবং অন্য দু'জন মহিলা। অথবা (বলেছেন) আবু ছাবরার কন্যা, মুয়াযের স্ত্রী এবং অন্য একজন মহিলা।
বিলাপকারীদের জন্য আল্লাহর লানত রয়েছে। রাসূল ﷺ বলেন:
أنس بن مالك يقول : قال رَسُول الله صلى الله عليه وسلم : صوتان عن ملعونان في الدنيا والآخرة : مزمار عند نعمة ورنة عند مصيبة.
আনাস (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন দুই ধরনের চিৎকারের জন্য মানুষ দুনিয়া ও আখেরাতে অভিশাপ প্রাপ্ত হবে। আল্লাহর নেয়ামত প্রাপ্ত অবস্থায় (সুখী) উচ্চস্বরে গান বাজনা করা, আর বিপদ মুসিবতের সময় উচ্চস্বরে ক্রন্দন করা।
উচ্চস্বরে কান্নাকে রাসূল ﷺ জাহেলী কার্যক্রম হিসাবে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন,
أَنَّ أَبَا مَالِكٍ الأَشْعَرِى حَدَّتَهُ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ أَرْبَعٌ فِي أُمَّتِي منْ أَمْرِ الجَاهِلِيَّةِ لا يَتْرُكونَهُنَّ الفَخْرُ فِي الأَحْسَابِ وَالطَّعْنُ فِي الْأَنْسَابِ والاستسقاء بالنُّجُومِ وَالنِّيَاحَةُ وَقالَ النَّائِحَةُ إِذا لَمْ تَتُبْ قَبْلَ مَوْتِهَا تُقَامُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَعَلَيْهَا سِرْبَالٌ مِنْ قَطِرَانِ وَدِرْعٌ مِنْ جَرَبٍ.
আবু মালেক আল-আশ'আরী (রা) বলেন, নবী ﷺ বলেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে চারটি জাহেলী কাজ রয়ে গেছে যা লোকেরা পরিত্যাগ করতে চাইবে না। ১. বংশের গৌরব, ২. অন্যকে বংশের খোঁটা দেওয়া, ৩. নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করা, ৪. মৃতের জন্য বিলাপ করে কান্নাকাটি করা। তিনি আরও বলেন, বিলাপকারী যদি মৃত্যুর পূর্বে তাওবা না করে, তাহলে কিয়ামতের দিন তাকে এভাবে ওঠানো হবে যে, তার গায়ে আলকাতরার চাদর এবং খসখসে চামড়ার ওড়না থাকবে।
টিকাঃ
৭৮. বুখারী, আস-সহীহ, অধ্যায়: জানায়েয, পরিচ্ছেদ: লাইছা মিন্না মান শাক্কাল যুয়ুব, হাদিস নং ১২১২
৭৯. আবুল হাসান আলী ইবন খলফ ইবন বাত্তাল, শরহু সহিহুল বুখারী (রিয়াদ: মাকতাবাতুর রুশদ, ২য় সং ২০০৩) খ. ৩য়, পৃ. ৭৭
৮০. বুখারী, আস-সহীহ, অধ্যায়: জানায়েয, পরিচ্ছেদ: মা ইউনহা মিনাল হালকে ইনদাল মুসিবাতে, হাদিস নং. ১২৯৬
৮১. উম্মু আতিয়্যা একজন আনসার মহিলা। রাসূলুল্লাহ মদিনায় হিজরতের পূর্বেই উম্মু আতিয়্যা (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন। অনুমান করা হয় যে, তিনি নবুওয়াতের ১২তম বছরে প্রথম বাই'য়াতে আকাবার পর ইসলাম করেন। এভাবে তিনি আনসারদের মধ্যে আস-সাবিকুনাল আউয়ালুন (প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণকারীদের) মধ্যে পরিগণিত হন। উম্মে আতিয়্যা রাসূলুল্লাহ -এর সাথে ৭টি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। তিনি নিজেই বলেছেন- আমি নবীর সাথে সাতটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। তাঁদের পিছনে তাঁবুতে থেকে তাঁদের জন্য খাবার তৈরী করতাম। আহতদের ঔষধ পান করাতাম এবং রোগীদের সেবায় নিয়োজিত থাকতাম। যে সকল আনসারী মহিলা তীক্ষ্ণ স্মৃতিশক্তির অধিকারিণী ছিলেন উম্মু আতিয়্যা (রা) তাঁদের অন্যতম। তিনি রাসূলুল্লাহ -এর বেশ কিছু হাদিস স্মৃতিতে ধারণ ও বর্ণনা করেছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ থেকে ৪০টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। বসরায় তিনি একজন ফকীহ মহিলা সাহাবা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর হাদীসের বুঝ, শরী'আতের বিধান সম্পর্কে সূক্ষ্ম জ্ঞান এবং রাসূলুল্লাহ -এর নৈকট্যের কথা জানাজানি হওয়ার পর সকল শ্রেণীর মানুষের শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিতে পরিণত হন।
৮২. মুসলিম, আস-সহীহ, অধ্যায়: জানায়েয, পরিচ্ছেদ: আত-তাশদীদ ফিন নিহায়াতে, হাদিস নং. ২২ও৬
৮৩. ইবন আমর বাজ্জার, মুসনাদে বাজার, খ. ১৪তম, পৃ. ৬২
৮৪. মুসলিম, আস-সহীহ, অধা্যয়: জানায়েয, পরিচ্ছেদ: আত-তাশদীদ ফিন নিয়াহাতে, খ. ৫ম, পৃ. ৮, হাদিস নং. ১৫৫০