📄 পরিবার পরিজনের কান্নার জন্য মৃত ব্যক্তির শাস্তি হবে কি না?
এমন অনেক ব্যাপার আছে যা মানুষের আয়ত্বের বাইরে। সেজন্য আল্লাহ হিসেব গ্রহণ করবেন না। তার মধ্যে একটি হচ্ছে দুঃখ-বেদনা। দ্বিতীয়টি চোখের পানি, যা দুঃখ ভারাক্রান্ত চোখে বয়ে যায়। এছাড়াও আরো অনেক ব্যাপার আছে যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তাই আমরা দেখতে পাই, রাসূল ﷺ ছেলে ইবরাহীম (রা) এর ইন্তিকালের পর শুধু দুঃখই প্রকাশ করেননি বরং চোখের পানিও ফেলেছেন। আয়েশা (রা) বলেছেন, যখন সাদ ইবন মুয়ায (রা) ইন্তিকাল করলেন, তখন আবু বকর (রা) এবং উমার (রা) এমন হাউমাউ করে কাঁদছিলেন, তাঁদের কান্নার আওয়াজে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল।
রাসূল ﷺ এর ওফাতের পর আবু বকর (রা) অনেক অশ্রু ঝরিয়েছেন। তবে আবু বকর (রা) মৃতের জন্য বিলাপ করা ভীষণ অপছন্দ করতেন। আয়েশা (রা) বলেন, যখন আবু বকর (রা) এর পুত্র আব্দুল্লাহর ইন্তিকাল হলো, তখন মহিলারা বিলাপ করা শুরু করলেন। আবু বকর (রা) ঘর থেকে বেরিয়ে যারা সান্ত্বনা প্রদানের জন্য এসেছিলেন তাদেরকে বললেন, মহিলারা ভেতরে বিলাপ করছে এ জন্য আমি দুঃখিত। আপনাদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। কেননা জাহেলী যুগ থেকে আমরা ইসলামে সবেমাত্র প্রবেশ করেছি। খুব বেশি দিনের কথা নয়। এজন্যই তারা এরূপ করছে। অথচ রাসূল ﷺ কে বলতে শুনেছি-জীবিতদের কান্নাকাটির কারণে মৃত ব্যক্তিকে গরম পানির ছিটে দেয়া হয়। এখানে কান্নাকাটি বলতে বিলাপ করা এবং ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদার কথা বুঝানো হয়েছে।
এরূপ মত পাওয়া যায় উমর (রা) থেকেও। যেমন হাদিসে এসেছে:
عَنْ عُبَيْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ قَالَ حَدَّثَنَا نَافِعٌ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ أَنَّ حَمْصَةً بَكَتْ عَلَى عُمَرَ فقالَ مَهْلا يَا بُنَيَّهُ أَلَمْ تَعْلَمِي أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم- قَالَ « إِنَّ المَيِّتَ يُعَذِّبُ بِبُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ ».
আব্দুল্লাহ ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, হাফসা (রা) উমরের জন্য (ঘাতক কর্তৃক আহত হলে) কাঁদছিলেন। তখন উমর (রা) বললেন, হে স্নেহের কন্যা! তুমি কি জান না? রাসূল ﷺ বলেছেন, মৃত ব্যক্তিকে তার স্বজনদের কান্নাকাটির দরুন শাস্তি দেওয়া হয়।
অন্য হাদিসে রাসূল ﷺ বলেন,
عَنِ ابْنِ عُمَرَ عَنْ عُمَرَ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قالَ « الْمَيِّتُ يُعَذِّبُ فِي قَبْرِهِ بِمَا نِيحَ عَلَيْهِ ».
ইবন উমর (রা) উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি নবী ﷺ থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূল ﷺ বলেন, মৃত ব্যক্তিকে তার প্রতি অধিক মাতম করে কান্নাকাটির দরুণ কবরে আযাব দেওয়া হয়।
উপরের হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী (র) বলেন, ওলামারা এ হাদিসের ব্যাখ্যায় দুই ধরনের মতামত দিয়েছেন।
১ম অভিমত: জমহুর আলেমগণ বলেন, মাতম করা যদি মৃত ব্যক্তির অসিয়ত, নির্দেশ অথবা তার ইচ্ছানুযায়ী হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে উপরিউক্ত হাদিস অনুযায়ী তার কবরে আযাব হবে। কেননা আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا ﴾
তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে এবং পরিবার পরিজনদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর।
নবী ﷺ বলেছেন,
عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: " كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ، فَالْأَمِيرُ رَاعٍ عَلى النَّاسِ وَهُوَ مَسْؤُولٌ، وَالرَّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِهِ وَهُوَ مَسْؤُولٌ، وَالمَرْأةُ رَاعِيَة عَلى بَيْتِ زَوْجِهَا وَهِيَ مَسْئُولَةٌ، وَالْعَبْدُ رَاعِ عَلَى مَالِ سَيِّدِهِ وَهُوَ مَسْؤُولٌ، فكلكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ "
ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমারা প্রত্যেকেই রক্ষক ও দায়িত্বশীল। অতএব তোমাদের প্রত্যেককেই নিজের অধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আমির/ বাদশাহ সমগ্র (দেশের) মানুষের ওপর দায়িত্বশীল এবং তাঁকে অধীনস্থ সকলের ব্যাপারে (কিয়ামতের দিন) জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। কোনো একজন পুরুষ তার পরিবারের ব্যাপারে দায়িত্বশীল এবং তাকে তার পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। একজন স্ত্রী তার স্বামীর গৃহের ব্যাপারে দায়িত্বশীল এবং তাকেও স্বামীর গৃহের (আমানত) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। একজন গোলাম তার মনিবের সম্পদের হেফাজতকারী, তাকেও তার মনিবের সম্পদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে। অতএব তোমরা (জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে) দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।
ইমাম ইবন হাজার আল-হাইতামি (র) বলেন, মৃত্যুর সময় যদি স্বজনেরা চিৎকার করে কান্নাকাটি করে তাহলে সে নিষেধ না করলে তার ওপর শাস্তি আরোপিত হবে।
২য় অভিমত: কান্না যদি মৃত ব্যক্তির ইচ্ছানুযায়ী বা তার নির্দেশ ও অসিয়ত না হয়, তাহলে মৃত ব্যক্তির ওপর কান্নার আযাব পতিত হবে না। যেমন কুরআনুল কারীমে আল্লাহ বলেন,
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى
'কোনো ভারবাহী অন্যের বোঝা বহন করবে না।'
অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَلا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى وَإِنْ تَدْعُ مُثقلة إلى حِمْلِهَا لَا يُحْمَلْ مِنْهُ شَيْءٌ وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى
“কোনো ভারবাহী অন্যের বোঝা বহন করবে না। যদি কোনো ভার বহনকারী তার বোঝা উঠাবার জন্য অন্যের সাহায্য কামনা করে তাহলে তার দ্বারা এর সামান্য পরিমাণও উত্থিত হবে না যদিও সে তার আপনজন হয়।"
উল্লেখ্য তৎকালীন আরবের রেওয়াজ অনুযায়ী অনেকে মৃত্যুর পূর্বে পরিবারকে বিলাপ অথবা মাতমের মাধ্যমে শোক পালনের জন্য অসিয়াত করে যেত। তাই রাসূল ﷺ তাদের কবরে শাস্তির কথা বলেছেন। আর যে কান্নার স্বীকৃতি রয়েছে তা হচ্ছে মাতমবিহীন কান্না, শব্দবিহীন অশ্রু বিসর্জন করা। এতে কোনো গুনাহ নাই। বরং এ ধরনের কান্না মানুষের শোককে হালকা করে।
টিকাঃ
৬৮. আল-মুগনী, ২য় খণ্ড, পৃ. ৫৪৬
৬৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭০-৫৪৬
৭০. কানযুল উম্মাল, ১৫শ খণ্ড, পৃ. ৭২৯
৭১. মুসলিম, আস-সহীহ, বাবু আল-মায়্যেতু ইউয়্যায্যিবু লি বুকায়ি আহলিহি খ. ৩য়, পৃ. ৪১, হাদিস নং, ২১৮১
৭২. প্রাগুক্ত, হাদিস নং, ২১৮২
৭৩. আল-কুরআন, সূরা আত-তাহরীম, ৬৬: ৬
৭৪. বুখারী, আস-সহীহ, অধ্যায়: ইতক, অনুচ্ছেদ: আল আব্দু রায়িন আন মালি সায়্যিদিহী খ. ২য়, পৃ. ৯০২, হাদিস নং, ২৪১৯
৭৫. মুহাম্মাদ রশীদ ইবন আলী রিদা, তাফসীরুল মানার (মিসর: আল-হাইআতুল মিসরিয়্যা, ১৯৯০), খ. ৮ম, পৃ. ২১৮
৭৬. আল-কুরআন, সূরা আনআম, ৬: ১৬৪
৭৭. আল-কুরআন, সূরা ফাতির, ৩৫: ১৮