📄 কবরের আযাব ও তার ভয়াবহতার জন্য ক্রন্দন
মৃত্যুর পরবর্তীকালের বর্ণনা প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআন ও হাদিসে কবরের বর্ণনা এসেছে। প্রাক ইসলামী যুগে আরবের পৌত্তলিকগণ এবং ইয়াহুদী ও নাসারা নির্বিশেষে সকলেরই মৃতদেহ কবরস্থ করত। স্কুল ও বাহ্য দৃষ্টিতে কবর একটি মৃত্তিকাগর্ত মাত্র যার মধ্যে মৃতদেহ সমাহিত করা হয়। মাটি সে মৃতদেহ ভক্ষণ করে ফেলে। কিন্তু সত্যিকার কবর এক অদৃশ্য সূক্ষ্ম জগতের বস্তু। যা আমাদের জ্ঞান বুদ্ধি ও কল্পনার অতীত।
আসল কথা হলো এই যে, মৃত্যুর পর মানুষ কবরস্থ হোক অথবা চিতায় ভস্মিভূত হোক, বন্য জন্তর উদরস্থ হোক অথবা জলমগ্ন হয়ে জলজন্তর আহারে পরিণত হোক, তার দেহচ্যুত আত্মাকে যে স্থানটিতে রাখা হবে সেটাই তার কবর। ফেরাউন তার বাহিনীসহ লোহিত সাগরের অতল তলে নিমজ্জিত হয়েছে। বিরাট বাহিনী হয়তো জলজন্তুর আহারে পরিণত হয়েছে। আর ফেরাউনের মৃতদেহ হাজার হাজার বছর ধরে মিসরের জাদুঘরে আছে। যাকে কেউ ইচ্ছা করলে এখনো স্বচক্ষে দেখতে পারে। কিন্তু তাদের সকলেরই আত্মা নিজ নিজ কবরেই অবস্থান করছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন:
النَّارُ يُعْرَضُونَ فَوَقاهُ اللهُ سَيِّئَاتِ مَا مَكَرُوا وَحَاقَ بآل فِرْعَوْنَ سُوءُ الْعَذَابِ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيًّا وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ أَدْخِلُوا آلَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَذَابِ
অর্থ: “শেষ পর্যন্ত তারা ঐ ঈমানদারদের বিরুদ্ধে যেসব জঘন্য চক্রান্ত করেছে আল্লাহ তা'আলা তাকে তা থেকে রক্ষা করেছেন। আর ফেরাউনের সাঙ্গপাঙ্গরাই জঘন্য আযাবের চক্রে পড়ে গিয়েছে। সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের আগুনের সামনে পেশ করা হয় এবং যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন আদেশ করা হবে, ফেরাউন 'গোত্রকে কঠিনতর আযাবে দাখিল কর।”
মৃত্যুর পরই কবরে পাপীদের শাস্তি ও নেককার বান্দাদের শান্তি শুরু হবে। পাপীদের কবরের আযাব বা শাস্তি হবে ভয়াবহ।
তাই ইসলাম আমাদের কবরের আযাব ও তার ভয়াবহতা থেকে পানাহ চাওয়ার জন্য বলেছেন। রাসূল ﷺ সর্বদা কবরের আযাব ও তার ভয়াবহতার জন্য কাঁদতেন।
কবরের আযাব থেকে বাঁচার জন্য রাসূল ﷺ এর নির্দেশনা
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا تَشَهَّدَ أَحَدُكُمْ فَلْيَسْتَعِدْ بِاللهِ مِنْ أرْبَع يَقُولُ اللهُمَّ إنِّي أَعُودُ بِكَ مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ وَمِنْ عَذَابٍ القَبْرِ وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ وَمِنْ شَرِّ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল ﷺ বলেছেন, তোমরা যখন কেউ নামাযে তাশাহুদ পড় তখন চারটি জিনিস থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করা চাই। এই বলে দো'আ করবে, হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে জাহান্নাম ও কবরের আযাব থেকে, জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা থেকে এবং মাসীহ দাজ্জালের ফিতনার ক্ষতি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
টিকাঃ
৪৬. আল্লাহ তা'আলা এখানে সুস্পষ্ট ভাষায় আযাবের দু'টি পর্যায়ের উল্লেখ করেছেন। একটি হচ্ছে কম মাত্রার আযাব যা কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার পূর্বে ফেরাউনের অনুসারীদের দেয়া হচ্ছে অর্থাৎ তাদেরকে সকাল সন্ধ্যায় দোযখের আগুনের সামনে পেশ করা হয় আর ঐ আগুন দেখে তারা সর্বক্ষণ আতঙ্কিত হয়ে কাটায় এই ভেবে যে, এ দোযখেই শেষ পর্যন্ত তাদেরকে যেতে হবে। এরপর কিয়ামত আসলে তাদেরকে তাদের জন্য নির্ধারিত সত্যিকার ও বড় আযাব হবে। এ ব্যাপারটি কেবলমাত্র ফেরাউন ও তার অনুসারীদের জন্য নির্দিষ্ট নয়। বরং সকল মানুষের জন্যই এরূপ। রাসূল (সা) বলেছেন,
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا: أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنَّ أَحَدَكُمْ إِذَا مَاتَ عُرِضْ عَلَيْهِ مَقْعَدُهُ بِالغَدَاةِ وَالعَشِيِّ، إِنْ كَانَ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ فَمِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ، وَإِنْ كَانَ مِنْ أهل النار فمن أهل النار، يُقالُ لَهُ: هَذَا مَقْعَدُكَ حَتَّى يَبْعَثَكَ اللهُ إِليه يَوْمِ الْقِيَامَةِ.
“আব্দুল্লাহ ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন: তোমাদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তিই মারা যায় তাকেই সকাল ও সন্ধ্যায় তার শেষ বাসস্থান অর্থাৎ জান্নাত ও জাহান্নাম দেখানো হতে থাকে। সে জান্নাতী হওয়ার উপযুক্ত হলে জান্নাতী এবং দোযখী হওয়ার উপযুক্ত হলে দোযখে তার জায়গা দেখানো হবে। তাকে বলা হবে কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তোমাকে পুনরায় জীবিত করবেন, তখন তোমাকে আল্লাহ যে জায়গা দান করবেন, এটা সেই জায়গা।” সহীহ বুখারী, অধ্যায়: জানায়েয, অনুচ্ছেদ: আল-মায়্যিতু উ'রদু আলাইহি মাক'আদাহু বিল গদাতি ওয়াল 'আশিয়্যি,
৪৭. আল-কুরআন, সূরা আল-মুমিন, ৪০: ৪৫-৪৬
৪৮. আবু আবদুল্লাহ আহমদ ইবন হাম্বল, মুসনাদ, অধ্যায়: জুহুদ, অনুচ্ছেদ: আল-হুযন ওয়াল বুকা, খ. ৪র্থ, পৃ. ২৯৪, হাদিস নং ১৮৬২৪। আলবানি হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।
৪৯. মুসলিম, আস-সহীহ, অধ্যায়: মাসাজিদ, অনুচ্ছেদ: মা ইউসতায়াজু মিনহু ফিস সালাত, খ. ২য়, পৃ. ৯৩, হাদিস নং. ১৩৫২
📄 বিশেষ কোনো বিষয়ে আল্লাহর সাহায্য চেয়ে কান্না
বিশেষ কোনো কাজে সফলতা অর্জনের জন্য দু'আ করার সময় আল্লাহর সাহায্য চেয়ে কান্নাকাটি করার অনুমোদন ইসলামে রয়েছে। যার প্রমাণ আমরা আল্লাহর রাসূলের জীবনে পাই, যেমন বদর যুদ্ধের আগের দিনের ক্রন্দন। আলী ইবন আবি তালিব (রা) থেকে বর্ণিত,
عَنْ عَلِيٍّ ، قَالَ : مَا كَانَ فِينَا فَارِسٌ يَوْمَ بَدْرٍ غَيْرُ المِقْدَادِ ، وَلَقَدْ رَأَيْتُنَا وَمَا فِينَا قَائِمٌ إِلَّا رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم يُصلّي تَحْتَ شَجَرَةٍ وَيَبْكِي حَتَّى أَصْبَحَ
তিনি বলেন, বদর যুদ্ধের দিন মিকদাদ (রা) ছাড়া আমাদের আর কেউ অশ্বারোহী ছিল না। আমরা দেখলাম রাসূল ﷺ একটি গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সারারাত নামাজ পড়ছেন আর কাঁদছেন এ অবস্থায় সকাল হয়ে গেল।
টিকাঃ
৫০. আবু ইয়ালা আহমদ ইবন আলী, মুসনাদে আবু ইয়ালা (আল-মাকতাবাতুশ শামেলাহ), খ. ১ম, পৃ. ১৭৫, হাদিস নং. ২৮০
📄 কবর যিয়ারতের সময় ক্রন্দন
কবর যিয়ারত করলে মন নরম হয় এবং মৃত্যুর কথা স্মরণ হয়। এছাড়াও আশা ছোট হয়, দুনিয়ার প্রতি আসক্তি কমে, চোখে কান্না আসে, উদাসীনতা দূর হয় এবং ইবাদাতের জন্য চেষ্টার আগ্রহ জাগে। তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
عَنِ ابْنِ بُرَيْدَةَ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ القُبُورِ فَزُورُوهَا، وَنَهَيْتُكُمْ عَنْ لُحُومِ الأَضَاحِي فَوْقَ ثَلَاثٍ، فَأَمْسِكُوا مَا بَدَا وَنَهَيْتُكُمْ عَن النَّبِيذِ إِلَّا فِي سِقاء، فَاشْرَبُوا فِي الأسْقِيَةِ كُلَّهَا، وَلَا تَشْرَبُوا لَكُمْ، مُسْكِرًا» قَالَ ابْنُ نُمَيْرٍ فِي رِوَايَتِهِ: عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْن بُرَيْدَةَ، عَنْ أَبِيهِ،
“ইবনে বুরাইদাহ তার পিতার নিকট থেকে বর্ণনা করেন তার পিতা বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত নিষেধ করেছিলাম, এখন যিয়ারত কর। আমি তোমাদেরকে কুরবানীর গোশত তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমাদের যতদিন প্রয়োজন তা সংরক্ষণ কর। আমি তোমাদেরকে 'নবীয' করতে নিষেধ করেছিলাম শুধুমাত্র পান করার জন্য ছাড়া। অতএব তোমরা সকল পাত্রে পান কর তবে নিশা জাতীয় জিনিস পান কর না।”
তিনি আরো বলেন,
عن أبي هريرة عن النبي صلى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أنه قال: "زوروا القبور فإنها تذكر الموت".
আবু হুরাইরা (রা) রাসূল ﷺ থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল ﷺ বলেন, “তোমরা কবর যিয়ারত কর। কবর যিয়ারত মৃত্যুকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
নবী ﷺ বলেন,
عَنِ ابْنِ بُرَيْدَةَ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ القُبُورِ، فَزُورُوهَا، فَإِنَّ فِي زِيَارَتِهَا تَذْكِرَهُ»
আবু বুরাইদাহ (রা) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূল ﷺ বলেন, “আমি তোমাদের কবর যিয়ারতে নিষেধ করেছিলাম, এখন যিয়ারত কর, কবর যিয়ারতে রয়েছে শিক্ষা ও উপদেশ।”
কবর যিয়ারত মানুষকে তাঁর নিজের মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই কবর যিযারতের সময় আল্লাহর ভয়ে কান্নাকাটি করার অনুমোদন ইসলামে রয়েছে। রাসূল ﷺ কবর যিয়ারতের সময় কাঁদতেন।
টিকাঃ
৫১. মুসলিম, আস-সহীহ, অধ্যায়: জানায়েয, অনুচ্ছেদ: ইসতিযানু নাবী রব্বাহু আয্যা ওয়া জাল্লা ফি যিয়ারাতি কবরি উম্মিহি, খ. ২য়, পৃ. ৬৭২, হাদিস নং. ৯৭৭
৫২. মুসলিম, আস-সহীহ, অধ্যায়: জানায়েয, অনুচ্ছেদ: ইসতিযানু নাবী রব্বাহু আয্যা ওয়া জাল্লা ফি যিয়ারাতি কবরি উম্মিহি, খ. ২য়, পৃ. ৬৭১, হাদিস নং. ৯৭৬
৫৩. আবু দাউদ, আস-সুনান, অধ্যায়: জানায়েয, অনুচ্ছেদ: যিয়ারতুল কুবুর, খ. ৩য়, পৃ. ২১৮, হাদিস নং, ৩২৩৫
৫৪. মুসলিম, আস-সহীহ, অধ্যায়: জানায়েয, অনুচ্ছেদ: ইসতিযানু নাবী রব্বাহু আয্যা ওয়া জাল্লা ফি যিয়ারাতি কবরি উম্মিহি, খ. ৩য়, পৃ. ৬৫, হাদিস নং, ২৩০৪
📄 সন্তান সন্ততি ও আত্মীয়স্বজনের মৃত্যুর পরে ক্রন্দন
সন্তান-সন্ততি ও আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যুর পরে কান্নাটা স্বাভাবিক ব্যাপার। তাই শরী'আহ এ ক্ষেত্রে কান্নার অনুমতি দিয়েছে। স্বয়ং রাসূল ﷺ থেকে তাঁর ছেলে-মেয়ে ও আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যুর পর কান্নার উদাহরণ রয়েছে। রাসূল ﷺ এর চাচা হামজা (রা) এর শাহাদাতের পর যখন তাঁর নাক, কান কেটে বিকৃত করা হয়েছিল তখনও রাসূল ﷺ এই পৈচাশিকতা দেখে কেঁদেছিলেন।
টিকাঃ
৫৫. বুখারী, আস-সহীহ, অধ্যায়: জানায়িয, অনুচ্ছেদ: কওলুন্নাবী (সা) ইন্না বিকা লা মাহযুনুন, খ. ৫ম, পৃ. ৫৭, হাদিস নং, ১২২০
৫৬. ইবন মাজাহ, আস-সুনান, অধ্যায়: জানায়েয, অনুচ্ছেদ: মা যায়া ফিল বুকা আলাল মায়্যিত, খ. ২য়, পৃ. ৫২৫, হাদিস নং, ১৫৯১, আলবানি বলেন, হাদিসটি হাসান সহীহ।