📘 রাসুলুল্লাহ সাঃ এর কান্না > 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


কান্না মানুষের এক সহজাত প্রবৃত্তি। কান্নায় মানুষের নম্রতা ও বিনয়ীভাব প্রকাশ পায়। কান্নায় মানুষের বেদনা দূরীভূত হয়। অহংকারী মানুষ কাঁদতে পারে না। তবে ধৈর্যহারা, কাপুরুষ, ভীতু ও বিলাপকারীর কান্না প্রশংসনীয় নয়। আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন একজন মুমিন ব্যক্তির সবচেয়ে বড় যোগ্যতা। কান্না আত্মশুদ্ধির প্রতিভূ। নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে অশ্রুবিসর্জনকারীকে কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের নিচে ছায়াপ্রাপ্ত সাত শ্রেণির একজন বলা হয়েছে। রাসূল বলেছেন, "দুটি ফোঁটা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়; (তন্মধ্যে) একটি হলো আল্লাহর ভয়ে প্রবাহিত অশ্রু ফোঁটা।” (জামে তিরমিজি)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সবচেয়ে দরদী মনের মানুষ। তিনি সহজেই কাঁদতে পারতেন। তিনি নিষ্পাপ হওয়া সত্তেও সব সময় বেশি বেশি তাওবাহ, ইসতিগফার, সালাত, সুযুদ ও আত্মসমালোচনার মাধ্যমে আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করতেন। তিনি ছিলেন বিশ্বের সেরা বিপ্লবী ও সমাজ সংস্কারক। তিনি যেমন ছিলেন অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম-নির্যাতন, কুফর-শিরকের বিরুদ্ধে বজ্র কঠোর, তেমনি মানবতার জন্য তিনি ছিলেন অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের অধিকারী একজন নেতা। এ জন্য তার নেতৃত্ব সবসময় অনুসারিদের ভালবাসায় সিক্ত ছিল। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে রাসূলের এ গুনের কথা এভাবে স্বীকৃতি দেন : হে নবী, এটা আল্লাহর বড়ই অনুগ্রহ যে, তুমি তাদের প্রতি খুবই কোমল হৃদয়ের অধিকারী। যদি তুমি রুক্ষ স্বভাবের বা কঠোর চিত্তের হতে তাহলে তারা সবাই তোমার চারপাশ থেকে সরে যেত। (সূরা আলে ইমরান ১৫৯)
রাসূলের এ কোমলতার বহিঃপ্রকাশ ঘটত বিভিন্ন প্রেক্ষিতে বিভিন্ন প্রসঙ্গে তার অন্তর বিগলিত করা কান্নার মাধ্যমে। আলোচ্য 'রাসূলুল্লাহ -এর কান্না' বইটিতে সেসব ঘটনাই চমৎকারভাবে সংকলন করেছেন ড. আবদুল মান্নান ও ড. রাশীদাহ। এতে লেখকদ্বয় আল্লাহর রাসূল -এর বিভিন্ন প্রসঙ্গে কান্নার ঘটনা উল্লেখ করে মুমিন জীবনে কান্নার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। এ ছাড়া কান্না বিষয়ে প্রাসঙ্গিক অনেক তত্ত্ব ও তথ্যের সমাহার ঘটিয়ে বইটিকে আরো সমৃদ্ধ করেছেন।
এ বইটি পড়ে পাঠকের হৃদয়ে যদি আল্লাহর ভয় জাগ্রত হয়, বিগলিত হৃদয়ে আমরা যদি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে একান্তে চোখের পানি ফেলার মতো যোগ্যতা অর্জন করতে পারি তাহলেই আমাদের সকলের পরিশ্রম স্বার্থক হবে। বিন্দু প্রকাশ থেকে এ মানসম্পন্ন বইটি প্রকাশ করতে পেরে আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করছি। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর উত্তম বান্দা হিসেবে কবুল করুন। আমিন।

লেখকের কথা
সিজদায় মস্তক অবনত করছি মহান মা'বুদের দরবারে, যার একান্ত মেহেরবাণীতে “রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কান্না” বইটির কাজ শেষ করতে পেরেছি, 'আল-হামদুলিল্লাহ'। এখন থেকে ৩ বছর আগে বইটির কাজ আমরা দুইজন (স্বামী-স্ত্রী) শুরু করেছিলাম। বইটিতে মুলতঃ বিশ্বনবী কবে, কোথায়, কেন কেঁদেছেন এবং কান্নার ব্যাপারে শরীয়াতের দৃষ্টিভঙ্গি কুরআন, হাদীস এবং ইমামদের মতামতসহ উল্লেখ করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে এটি একটি গবেষণাধর্মী বই।
বইটি এতটাই আবেদনময়ী যে, কাজ করার সময় যতবার পড়েছি মনের অজান্তে রাসূল এর বিভিন্ন সময়ের কান্না আমাদেরকে বারংবার অশ্রুসিক্ত করেছে। বইটি পড়ে যদি একজন পাঠকও অশ্রুসিক্ত হন তাহলে তা হতে পারে তার জাহান্নামের আগুনকে নির্বাপিত করার বড় হাতিয়ার, ঈমানের ওপর অবিচল থাকার পাহাড়সম শক্তি, বাতিলের বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়াই করার ইস্পাত কঠিন অঙ্গিকার, সর্বোপরি আল্লাহর নৈকট্য হাসিল ও তাঁর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি এবং আধ্যাত্মিকতার অনন্য মাধ্যম।
বিন্দু প্রকাশ বইটি প্রকাশ করায় তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় বহুদিনের লালিত স্বপ্ন আজ মলাটবদ্ধ হয়েছে। বইটিতে অনিচ্ছাকৃত বা জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে কোন ভুল বা ত্রুটি থাকলে আমাদেরকে জানানোর দরখাস্ত পেশ করছি। সবিশেষ নিবেদন, হে আরশের মালিক! কিয়ামতের কঠিন মুসিবতের দিনে আমাদের এ ক্ষুদ্র কাজটুকুকে নাজাতের অসিলা বানিয়ে দিও। আমিন!!!

ড. মুহাম্মাদ আব্দুল মান্নান
ড. রাশীদাহ
তাং- ২৫.১০.২০২০

ভূমিকা
মানুষ দুঃখ-কষ্ট, বেদনা, হারানো, মৃত্যু এমনকি সাফল্যের চরম শিখরে উঠেও কান্নার মাধ্যমে তার অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। অন্যায়, অবিচার, যুল্ম, নির্যাতন, নিষ্পেষণ, পাপাচার ইত্যাদি অপরাধ থেকে বাঁচার জন্য মানুষ যখন অনুতপ্ত হয়ে অশ্রু প্রবাহিত করে তখন তা আল্লাহর নিকট কবুল হয়ে যায়। তাই আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক স্থাপনের শ্রেষ্ঠতম মাধ্যম হলো ক্রন্দন। কান্না মানুষের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। মানুষ ইচ্ছা করলে কান্না বন্ধ করতে পারে না, কারণ আল্লাহ মানুষকে কান্না দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। কান্না মানুষের হৃদয়ের ব্যাধি দূর করে। আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন মানুষের আত্মাকে নরম করে এবং যাবতীয় নোংরা থেকে পরিচ্ছন্ন করে। সাতটি কারণে মানুষের কান্না আসে; আনন্দ, বেদনা, নিষ্পেষণ, না পাওয়া, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, ব্যথা এবং আল্লাহর ভয়। বেশি বেশি আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন জাহান্নামের আগুনকে নির্বাপিত করে। যারা আল্লাহর ভয়ে কাঁদে আল্লাহ তাদের প্রশংসা করেন। রাসূল আমাদের জন্য 'উসওয়ায়ে হাসানাহ' বা সর্বোত্তম আদর্শ। মহান আল্লাহ বলেন:

لقدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أَسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُوا اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا﴾

“যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।”
মানব জীবনের এমন কোনো দিক ও বিভাগ নেই যে ব্যাপারে তাঁর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই। রাসূল ﷺ নিষ্পাপ হয়েও সর্বদা বেশি বেশি তাওবাহ, ইস্তিগফার, সালাত, সুযুদ, আত্মসমালোচনার মাধ্যমে আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করতেন। এটা প্রমাণ করে তাঁর অন্তর আল্লাহর ভয়ে সর্বদা কম্পমান ছিল। আমাদের অন্তর এতটাই কঠিন যে ঠিক করে আমরা বলতে পারি না আমার চক্ষু কবে আল্লাহর ভয়ে একটু লোনা পানি বিসর্জন দিয়েছে? কাজেই রাসূল -এর আদর্শে উজ্জিবীত হয়ে পঙ্কিলতামুক্ত জীবন গড়ার জন্য আমাদেরকে খুঁজে বের করতে হবে কবে, কোথায় এবং কিভাবে তিনি ক্রন্দন করেছেন অতঃপর সে অনুযায়ী নিজেদের জীবন গঠনের মাধ্যমে জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ বের করতে হবে। কান্নার ক্ষেত্রে ইসলাম প্রয়োজনীয় নির্দেশনা, নীতিমালা ও আইন নির্ধারণ করেছে। এই বই থেকে আমরা রাসূল কবে, কোথায় এবং কেন কান্না করেছিলেন তা জানতে পারব এবং সাথে সাথে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে কান্নার বিধি-বিধান জানতে পারব।

টিকাঃ
১. আল-কুরআন, সূরা আল-মায়েদাহ ৫:৮৩
২. আল-কুরআন, সূরা আল-আহযাব ৩৩:২১

📘 রাসুলুল্লাহ সাঃ এর কান্না > 📄 উপসংহার

📄 উপসংহার


ইসলামী শরীয়াত কান্নার যে নীতিমালা প্রণয়ন করেছে তা পরিপূর্ণ ও সামগ্রিক। পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহে বর্ণিত দিক নির্দেশনার আলোকে আমরা বলতে পারি যে, আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যম হলো কান্না। কান্না আল্লাহর রহমতের নিদর্শন। আল্লাহর ভয়ে কান্না, অন্তরকে পরিশোধিত করে, আত্মাকে কোমল করে। কান্না মানব জীবনের এমন একটি অনুসঙ্গ যা পৃথিবীতে আগমনের সাথে সাথেই প্রকাশ পায়। মানুষের দুঃখ-কষ্ট, বেদনা, হারানো, মৃত্যু এমনকি সাফল্যের চরম শিখরে উঠেও মানুষ কান্নার মাধ্যমে তার প্রকাশ ঘটায়। অন্যায়, অবিচার, নির্যাতন, নিষ্পেষণ, পাপাচার ইত্যাদি অপরাধ থেকে বাঁচার জন্য মানুষ যখন অনুতপ্ত হয়ে অশ্রু প্রবাহিত করে তখন তা আল্লাহর নিকট কবুল হয়ে যায়। আমাদের গুনাহ মাফের জন্য এবং যে কোনো ভালো-মন্দ, আনন্দ-বেদনায় কান্নার সময় শরীয়াত নির্ধারিত সীমারেখার প্রতি লক্ষ্য রেখেই আমাদের কাঁদা উচিত। অন্যথায় আমাদের আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে তাঁর অসন্তুষ্টি ও শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

📘 রাসুলুল্লাহ সাঃ এর কান্না > 📄 গ্রন্থপঞ্জী

📄 গ্রন্থপঞ্জী


আল-কুরাআন।
আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবন ইসমাঈল আল-বুখারী, আল-জামে' আল-মুসনাদ আস-সহীহ আল মুখতাছার মিন উমুরি রাসূলিল্লাহ ﷺ ওয়া সুনানিহী ওয়া আইয়্যামিহী, বৈরূত: দারু ইবন কাছীর, ৩য় সং, ১৯৭৮।
আবুল হুসাইন মুসলিম ইবন হাজ্জাজ আল কুশাইরী আন-নিশাপুরী, আস-সহীহ, আল-মাকতাবাতুশ-শামেলাহ।
আবু ঈসা মুহাম্মদ ইবন ঈসা আত-তিরমিযী, আস-সুনান, আল-মাকতাবাতুশ-শামেলাহ।
আবু আব্দুর রহমান আহমদ আন-নাসায়ী, আস-সুনান, আল-মাকতাবাতুশ-শামেলাহ।
আহমদ ইবন আবু বকর রাযী আল-জাসসাস, আহকামুল কুরআন, বৈরূত: দারু ইয়াহইয়া আত-তুরাছিল আরাবী, ১৪০৫হি.।
আবু উমর আবদুল আযীয ইবন ফাতহী আস সায়্যিদ নিদা, মাওসুয়াতুল আদাবিল ইসলামিয়্যাহ, রিয়াদ: দারু তয়্যিবাহ লিন নাশরী ওয়াত তাওযী', ২য় সং, ২০০৪।
আবু ইয়ালা আহমদ ইবন আলী, মুসনাদে আবু ইয়ালা, আল-মাকতাবাতুশ শামেলাহ।
আয-যাহাবী, শামসুদ্দিন মুহাম্মাদ, তারিখুল ইসলাম ওয়া তাবাকাত আল-মাশাহীর ওয়াল আ'লাম, বৈরূত: দারুল কিতাব আল-আরাবি, ১ম সং ১৯৮৭।
আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবন আহমদ ইবন আবি বকর কুরতুবী, আল-জামিলি আহকামিল কুরআন, কায়রো দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যা, ২য় সং, ১৯৬৪।
আলাউদ্দিন আল-আযহারী, আরবি বাংলা অভিধান, ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১ম সং, ১৯৯৩।
আবুল হাসান আলী ইবন খাল্লাফ ইবন বাত্তাল, শরহে সহীহিল বুখারী, রিয়াদ: মাকতাবাতুর রুশদ, ২য় সং, ২০০৩।
আবুল হাসান আলী ইবন ইসমাইল আল মুরসী, আল মুহকাম ওয়াল মুহিতুল আযাম, বৈরূত: দারুল কুতুবিল 'ইলমিয়্যাহ, ১ম সং, ২০০০।
ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব, বৈরূত: দারু সাদির, তা. বি.।
ইবরাহীম মাদকুর, আল-মু'জামুল ওয়াসীত, কায়রো: দারুদ দা'ওয়াহ, ২য় সং, ১৯৯২।
ইমামুদ্দিন ইসমামঈল ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, বৈরূত: দারু ইহইয়া আত তুরাসিল 'আরাবী, ১ম সং, ১৯৮৮।
ইমাম গাজ্জালী, ইহইয়ায়ি উলুমুদ্দীন, কায়রো: দারুল হাদিস, তা. বি.।
ইবন আমর বাজ্জার, মুসনাদে বাজ্জার, আল-মাকতাবাতুশ-শামেলাহ।
মুহাম্মদ ইবন আবি বকর ইবন আব্দিল কাদীর আর-রাযী, মুখতারুস-সিহাহ, বৈরূত: দারুল কুতুবিল 'ইলমিয়্যাহ, ১ম সং, ১৯৯৪
মুহাম্মদ ইবন ইয়াযীদ ইবন মাজাহ, আস-সুনান
মুহাম্মদ রশীদ ইবন আলী রিদা, তাফসীরুল মানার, মিসর: আল-হাইআতুল মিসরিয়্যা, ১৯৯০।
মুহিউস সুন্নাহ আবু মুহাম্মদ আল হুসাইন আল-বাগাভী, মা'আলিমুত তানযিল, দারু তয়্যিবা, ৪র্থ সং, ১৯৯৭।
শিহাবুদ্দীন আবি হাফস উমার ইবন মুহাম্মদ ইবন আব্দিল্লাহ, 'আওয়ারিফুল মা'আরিফ, আল-মাকতাবতুশ শামেলাহ, তা. বি.।
সম্পাদনা পরিষদ, আল মাওসুয়াতুল ফিকহিয়‍্যা, কুয়েত: ওযারাতুল আওকাফ ওয়াশ শুয়ুনুল ইসলামিয়া, ১৪০৪-১৪২৭হি.।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00