📘 রাষ্ট্র রাজনীতি ও ইসলাম > 📄 ইউরোপে যেভাবে গড়ে উঠল সেক্যুলারিজম

📄 ইউরোপে যেভাবে গড়ে উঠল সেক্যুলারিজম


সেক্যুলারিজম নির্ভেজাল পশ্চিমা একটি দর্শন। পশ্চিমে জন্ম হয়েছে এবং সেখানেই ডালপালা ছড়িয়ে বিশাল মহিরুহের আকৃতি ধারণ করেছে। এরপর পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি একে পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে পৃথিবীজুড়ে।

সুতরাং, এটি এমন বিশেষ কোনো চিন্তা নয়, যেটি মানুষের স্বভাবজাত প্রবণতা থেকে স্বাভাবিকভাবে উৎপন্ন হয়েছে; এমনও নয় যে চিন্তাটি আপন বিভা ও উৎকর্ষের কারণে মহাদেশগুলোতে বিস্তৃত হয়েছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে, এবং পৃথিবীর চিন্তার ইতিহাসে এটিই একমাত্র শেষ কথা নয়। ব্যাপারটি কোনোভাবেই এমন নয় যে, এর বিপরীতে অন্য কোনো চিন্তা হাজির হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই; বরং এটি সাধারণ একটি চিন্তামাত্র, যাকে অধুনা পশ্চিমা সভ্যতা বিশেষভাবে গড়ে তুলেছে এবং ইতিহাসের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ধীরে ধীরে বিকশিত হয়ে আজকের এই রূপে এসে উপনীত হয়েছে।

খ্রিষ্টবাদের সাথে সেক্যুলারিজমের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আরও সূক্ষ্মভাবে বললে—খ্রিষ্টবাদ নয়; পৌলবাদের সাথে। ইউরোপে একদম সূচনার সময়ে ধর্ম মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং খ্রিষ্টবাদ গ্রহণ করা হয়েছিল শরিয়ত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নিছক একটি আকিদা ও বিশ্বাসরূপে। শরিয়ত বা ধর্মীয় জীবনবিধান ইউরোপকে কখনোই শাসন করেনি, খুব সামান্য কিছু পরিসর ছাড়া।

ইউরোপীয় রেনেসাঁ-পরবর্তী সময়ে নব আবিষ্কৃত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ প্রতিষ্ঠিত হলে ইউরোপীয় সমাজজীবনের অল্প কিছু ক্ষেত্রে বিক্ষিপ্তভাবে ধর্মের যে-সকল অনুশাসন তখনো বাকি ছিল, সেগুলোকেও তারা ছুড়ে ফেলল এবং ধর্মকে সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ নির্বাসিত করল। এমনকি তাদের চিন্তাচেতনা ও অনুভূতি থেকে পর্যন্ত মুছে গেল ধর্মের সামান্য বোধ।

কিন্তু আমাদের দেশের বিষয়টি ছিল অন্যরকম। ইসলাম মুসলিম কান্ট্রিগুলোকে শাসন করেছে যুগের পর যুগ। এখানে শরিয়তের বিধানাবলি পালিত হয়েছে, আকিদা-বিশ্বাসের প্রচারপ্রসার ও লালন হয়েছে ব্যাপকভাবে। ফলে ইসলামি বিশ্বের হৃদয়ে সেক্যুলারিজম অনুপ্রবেশের বিষয়টি ছিল খুবই কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং।

পাশাপাশি ইউরোপে আরও কিছু বিষয় ছিল, যেগুলো সেখানের মাটিতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ সৃষ্টিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। যেমন :

মধ্যযুগে ইউরোপিয়ানদের মন-মস্তিস্ক ও দেহ ভয়ংকরভাবে গ্রাস করে রেখেছিল গির্জাগুলো। ফলে ব্যাপকভাবে তারা এই জুলুম থেকে নিষ্কৃতি পেতে চাইছিল। শেষ পর্যন্ত তাদের চিন্তা ও আন্দোলনগুলো এমনভাবে গঠিত হয়েছে যে, শুধুমাত্র গির্জা থেকে মুক্ত হওয়ার পরিবর্তে তারা পুরোপুরি ধর্ম থেকেই বেরিয়ে এসেছিল।

আরও একটি কারণ ছিল—পৌত্তলিক গ্রিক সভ্যতার প্রভাব। এই সভ্যতা মানুষ ও সৃষ্টিকর্তার মাঝে এমন এক সম্পর্কের ধারণা গড়ে তুলেছিল, যা কেবল দুজন শত্রুর মাঝেই হতে পারে। এ সম্পর্ক সর্বদাই প্রবল দ্বন্দ্বমুখর। মানুষ এর মুখে দাঁড়িয়ে সবসময় বিবমিষায় আক্রান্ত হয়েছে, গোপন ক্ষোভের অনলে পুড়েছে; কখনো শান্তি ও আনন্দ লাভ করতে পারেনি; কিন্তু এ সবকিছু মেনে নেওয়া ছাড়া বাহ্যত তাদের কিছুই করার ছিল না। সে সময়ে ধর্মনিরপেক্ষতার মতবাদটি কল্পিত সেই প্রভুদের কবজা থেকে নিষ্কৃতি লাভের অব্যর্থ এক অবলম্বন হিসেবে তাদের সামনে হাজির হয়েছিল।

এভাবেই ইউরোপিয়ানদের কাছে ধর্মের বিষয়টি গুরুত্বহীন ও পরিত্যাজ্য হয়ে পড়ে। তারা অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নিল ধর্ম কখনোই মানবিক মূল্যবোধের উৎস হতে পারে না। ধর্মের পরিবর্তে তারা গ্রহণ করল প্রকৃতিপূজা, আর সেক্যুলারিজমকে গ্রহণ করল মহান একটি ধর্ম হিসেবে, যে ধর্মটি আসমান থেকে নাজিল হয়নি; নিজেরাই গড়ে নিয়েছে, মাটির পৃথিবীতেই, নিজেদের সুবিধামতো।

সেক্যুলারিজম নির্ভেজাল পশ্চিমা একটি দর্শন। পশ্চিমে জন্ম হয়েছে এবং সেখানেই ডালপালা ছড়িয়ে বিশাল মহিরুহের আকৃতি ধারণ করেছে। এরপর পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি একে পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে পৃথিবীজুড়ে।

সুতরাং, এটি এমন বিশেষ কোনো চিন্তা নয়, যেটি মানুষের স্বভাবজাত প্রবণতা থেকে স্বাভাবিকভাবে উৎপন্ন হয়েছে; এমনও নয় যে চিন্তাটি আপন বিভা ও উৎকর্ষের কারণে মহাদেশগুলোতে বিস্তৃত হয়েছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে, এবং পৃথিবীর চিন্তার ইতিহাসে এটিই একমাত্র শেষ কথা নয়। ব্যাপারটি কোনোভাবেই এমন নয় যে, এর বিপরীতে অন্য কোনো চিন্তা হাজির হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই; বরং এটি সাধারণ একটি চিন্তামাত্র, যাকে অধুনা পশ্চিমা সভ্যতা বিশেষভাবে গড়ে তুলেছে এবং ইতিহাসের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ধীরে ধীরে বিকশিত হয়ে আজকের এই রূপে এসে উপনীত হয়েছে।

খ্রিষ্টবাদের সাথে সেক্যুলারিজমের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আরও সূক্ষ্মভাবে বললে—খ্রিষ্টবাদ নয়; পৌলবাদের সাথে। ইউরোপে একদম সূচনার সময়ে ধর্ম মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং খ্রিষ্টবাদ গ্রহণ করা হয়েছিল শরিয়ত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নিছক একটি আকিদা ও বিশ্বাসরূপে। শরিয়ত বা ধর্মীয় জীবনবিধান ইউরোপকে কখনোই শাসন করেনি, খুব সামান্য কিছু পরিসর ছাড়া।

ইউরোপীয় রেনেসাঁ-পরবর্তী সময়ে নব আবিষ্কৃত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ প্রতিষ্ঠিত হলে ইউরোপীয় সমাজজীবনের অল্প কিছু ক্ষেত্রে বিক্ষিপ্তভাবে ধর্মের যে-সকল অনুশাসন তখনো বাকি ছিল, সেগুলোকেও তারা ছুড়ে ফেলল এবং ধর্মকে সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ নির্বাসিত করল। এমনকি তাদের চিন্তাচেতনা ও অনুভূতি থেকে পর্যন্ত মুছে গেল ধর্মের সামান্য বোধ।

কিন্তু আমাদের দেশের বিষয়টি ছিল অন্যরকম। ইসলাম মুসলিম কান্ট্রিগুলোকে শাসন করেছে যুগের পর যুগ। এখানে শরিয়তের বিধানাবলি পালিত হয়েছে, আকিদা-বিশ্বাসের প্রচারপ্রসার ও লালন হয়েছে ব্যাপকভাবে। ফলে ইসলামি বিশ্বের হৃদয়ে সেক্যুলারিজম অনুপ্রবেশের বিষয়টি ছিল খুবই কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং।

পাশাপাশি ইউরোপে আরও কিছু বিষয় ছিল, যেগুলো সেখানের মাটিতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ সৃষ্টিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। যেমন :

মধ্যযুগে ইউরোপিয়ানদের মন-মস্তিস্ক ও দেহ ভয়ংকরভাবে গ্রাস করে রেখেছিল গির্জাগুলো। ফলে ব্যাপকভাবে তারা এই জুলুম থেকে নিষ্কৃতি পেতে চাইছিল। শেষ পর্যন্ত তাদের চিন্তা ও আন্দোলনগুলো এমনভাবে গঠিত হয়েছে যে, শুধুমাত্র গির্জা থেকে মুক্ত হওয়ার পরিবর্তে তারা পুরোপুরি ধর্ম থেকেই বেরিয়ে এসেছিল।

আরও একটি কারণ ছিল—পৌত্তলিক গ্রিক সভ্যতার প্রভাব। এই সভ্যতা মানুষ ও সৃষ্টিকর্তার মাঝে এমন এক সম্পর্কের ধারণা গড়ে তুলেছিল, যা কেবল দুজন শত্রুর মাঝেই হতে পারে। এ সম্পর্ক সর্বদাই প্রবল দ্বন্দ্বমুখর। মানুষ এর মুখে দাঁড়িয়ে সবসময় বিবমিষায় আক্রান্ত হয়েছে, গোপন ক্ষোভের অনলে পুড়েছে; কখনো শান্তি ও আনন্দ লাভ করতে পারেনি; কিন্তু এ সবকিছু মেনে নেওয়া ছাড়া বাহ্যত তাদের কিছুই করার ছিল না। সে সময়ে ধর্মনিরপেক্ষতার মতবাদটি কল্পিত সেই প্রভুদের কবজা থেকে নিষ্কৃতি লাভের অব্যর্থ এক অবলম্বন হিসেবে তাদের সামনে হাজির হয়েছিল।

এভাবেই ইউরোপিয়ানদের কাছে ধর্মের বিষয়টি গুরুত্বহীন ও পরিত্যাজ্য হয়ে পড়ে। তারা অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নিল ধর্ম কখনোই মানবিক মূল্যবোধের উৎস হতে পারে না। ধর্মের পরিবর্তে তারা গ্রহণ করল প্রকৃতিপূজা, আর সেক্যুলারিজমকে গ্রহণ করল মহান একটি ধর্ম হিসেবে, যে ধর্মটি আসমান থেকে নাজিল হয়নি; নিজেরাই গড়ে নিয়েছে, মাটির পৃথিবীতেই, নিজেদের সুবিধামতো।

📘 রাষ্ট্র রাজনীতি ও ইসলাম > 📄 শরিয়তের দৃষ্টিতে সেক্যুলারিজমের বিধান

📄 শরিয়তের দৃষ্টিতে সেক্যুলারিজমের বিধান


সেক্যুলারিজমকে আপনি যেভাবেই সংজ্ঞায়িত করুন এবং যে আকৃতিতেই উপস্থাপন করুন, কোনোভাবেই এটি ইসলামের সাথে যায় না। সংক্ষিপ্তভাবে নয়, বিস্তারিত আকারেও নয়। কারণ, ইসলাম মানেই আল্লাহর বিধানের সামনে নতজানু হয়ে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করা। আর সেক্যুলারিজম ঠিক এর উলটোটাই শিক্ষা দেয়। অর্থাৎ, শরিয়তের বক্তব্যগুলো এড়িয়ে চলা এবং মানুষের জীবনে আল্লাহ মনোনীত শরিয়তটি মূল কেন্দ্র আকারে হাজির হওয়াকে অস্বীকার করার প্রবণতা ও উদ্দীপনা তৈরি করে।

সেক্যুলারিজমকে আপনি যেভাবেই সংজ্ঞায়িত করুন এবং যে আকৃতিতেই উপস্থাপন করুন, কোনোভাবেই এটি ইসলামের সাথে যায় না। সংক্ষিপ্তভাবে নয়, বিস্তারিত আকারেও নয়। কারণ, ইসলাম মানেই আল্লাহর বিধানের সামনে নতজানু হয়ে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করা। আর সেক্যুলারিজম ঠিক এর উলটোটাই শিক্ষা দেয়। অর্থাৎ, শরিয়তের বক্তব্যগুলো এড়িয়ে চলা এবং মানুষের জীবনে আল্লাহ মনোনীত শরিয়তটি মূল কেন্দ্র আকারে হাজির হওয়াকে অস্বীকার করার প্রবণতা ও উদ্দীপনা তৈরি করে।

📘 রাষ্ট্র রাজনীতি ও ইসলাম > 📄 ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষতার সংঘাত

📄 ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষতার সংঘাত


ইসলামের সাথে সেক্যুলারিজমের সংঘর্ষের জায়গাগুলো সংক্ষিপ্তভাবে এমন :-

১. সেক্যুলারিজম-আল্লাহর রুবুবিয়াতের মধ্যে শিরক
রুবুবিয়াত মানে হল জাগতিক ও শরয়ি-সকল বিষয়ে আল্লাহ তায়ালাই একমাত্র কর্তৃত্বের অধিকারী, সার্বভৌম ক্ষমতাবান। এ প্রসঙ্গে দুটো বিষয়কেই একসাথে উল্লেখ করে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন— আল-খালকু ওয়াল আমর (الخلق والامر)।

জাগতিক বিষয়: যেমন, সৃষ্টি করা, গঠন ও উৎপন্ন করা, অস্তিত্বে আনা, জগৎ পরিচালনা করা, এর সমস্ত কর্ম ও বিষয় সম্পন্ন ও সম্পাদন করা ইত্যাদি। শরয়ি বিষয়: যেমন, আদেশ-নিষেধ, হালাল-হারাম ও শরিয়তের অন্যান্য বিধান। শরয়ি বিষয়ে আল্লাহ তায়ালাকে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী বিশ্বাস করার অর্থ হল, আল্লাহ যা হালাল করেছেন এর বাইরে আর কোনো হালাল নেই; তিনি যা হারাম বলে ঘোষণা করেছেন, এর বাইরে অন্য কোনো হারাম নেই, এবং আল্লাহপ্রদত্ত শরিয়তের বাইরে আর কোনো দীন নেই।

আদি ইবনে হাতিম রা. একবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তেলাওয়াত করতে শুনলেন ( اتخذوا احبارهم ورهبانهم اربابا من دون الله —দিয়ে তারা তাদের ধর্মগুরুদের রব হিসেবে গ্রহণ করেছে), তখন তিনি বললেন, আমরা তো তাদের ইবাদত করতাম না! নবিজি বললেন, ব্যাপারটি কি এমন ছিল না যে, আল্লাহ যা হালাল করেছেন, তারা সেগুলোকে হারাম বলে ঘোষণা করত, এরপর তোমরাও তা হারাম বলে বিশ্বাস করতে; এবং আল্লাহ যা হারাম করেছেন, তারা সেগুলোকে হালাল বলে ঘোষণা করত, তারপর তোমরাও তা হালাল বলে বিশ্বাস করতে? আদি ইবনে হাতিম রা. বললেন, হ্যাঁ, বিষয়টি এমনই ছিল। নবিজি বললেন, এটিই তাদের উপাসনা করা।

এদিকে সেক্যুলারিজম দাবি করে, রাজনীতিতে ধর্ম অচল এবং ধর্মের ভেতরে রাজনীতির কোনো বিষয় নেই। সুতরাং, ঐশী বিধানাবলি বলতে কিছুই গ্রহণযোগ্য নয়; বরং মানুষ যে আইনের ওপর একমত হবে, কেবল সেটিই হবে সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য ও পালনীয়। আইনপ্রণয়নের বিষয়টি দীন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও পরিপূর্ণরূপে দীনের আওতামুক্ত। অন্যভাবে বললে, সেক্যুলারিজম শরিয়তের বিধানাবলির পুরো বিষয়টিকেই অস্বীকার করে।

২. সেক্যুলারিজম-উলুহিয়্যাতের মধ্যে শিরক
উলুহিয়্যাতের একত্ববাদ বা ইলাহ ও উপাস্য হওয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালাকে এক বলে স্বীকার করার মধ্যে বড় দুটি বিষয় রয়েছে :

নিয়ত ও ইচ্ছার ক্ষেত্রে একত্ববাদ : অর্থাৎ, নামাজ রোজা হজ নজর-মান্নত ইত্যাদি এবাদত জাতীয় সকল কিছু একমাত্র আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্যে সম্পন্ন করা এবং এসবের জন্য তিনিই একমাত্র উপযুক্ত ও একচ্ছত্র দাবিদার বলে বিশ্বাস করা এবং মুখে স্বীকার করা।

আনুগত্য ও অনুসরণের ক্ষেত্রে একত্ববাদ : অর্থাৎ, পূর্ণ আনুগত্য ও সবিনয় সমর্পণ একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্যই হওয়া। আর এটি বাস্তবায়িত হবে যখন জীবনের সকল বিষয়ে তাঁর শরিয়তকে ফয়সালাকারী হিসেবে গ্রহণ করা হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

"বলুন, নিশ্চয়ই আমার রব আমাকে সিরাতে মুস্তাকিমের দিশা দিয়েছেন। ...এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। বলুন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ সকল কিছু একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্যই, যিনি সকল জগতের রব। তাঁর কোনো শরিক নেই। এবং এর জন্যই আমাকে আদেশ করা হয়েছে। আর আমি প্রথম মুসলমান।"⁷⁸

প্রথম আয়াতটি আনুগত্য ও অনুসরণ বলতে কী বোঝায় সেদিকে ইঙ্গিত করছে এবং পরের দুটো আয়াত ইঙ্গিত করছে ইচ্ছা ও নিয়তের একত্ববাদের দিকে। সুতরাং, আল্লাহর শরিয়তের বাইরে অন্য কিছুকে ফয়সালাকারী হিসেবে গ্রহণ করা হল ইবাদতের মধ্যে শিরক। এ কারণে সকল আলেম এ ব্যাপারে একমত যে, সিদ্ধান্ত ও ফয়সালা প্রদানের জায়গা থেকে আল্লাহর শরিয়তকে হটিয়ে দেওয়া অনেক বড় অপরাধ।

৩. সেক্যুলারিজম-নবুয়তের মধ্যে কলঙ্ক
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পরিপূর্ণ একটি দীন দিয়ে পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে আকিদার বিষয়গুলো যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে শরিয়ত বা আল্লাহপ্রদত্ত বিধিবিধান। সকল মুসলমানের জন্য আবশ্যক হল তিনি যে সকল বিষয় জানিয়ে গেছেন, সবকিছুকে সত্য বলে দ্বিধাহীনচিত্তে গ্রহণ করা এবং শরিয়ত আকারে যে আদেশ ও নিষেধ রেখে গেছেন, তার পরিপূর্ণ অনুসরণ করা।

আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন, অপরদিকে তাঁর নবিকে রাসুল হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করার অর্থ হল, সবিনয় আত্মসমর্পণের সাথে তাঁর অনুসরণ করা এবং তাঁর সামনে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে ন্যস্ত করা; এমন যে, তার কাছে তিনি নিজের জীবনের চেয়েও অধিক প্রিয়। ফলে সে তার বাণী ছাড়া অন্য কোথাও থেকে আলো ও হেদায়েত গ্রহণ করে না, জীবনের সকল বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ হতে ফয়সালাকারী হিসেবে একমাত্র তাঁকেই গ্রহণ করে; বিপরীতে অন্য কাউকে সিদ্ধান্তদাতা হিসেবে মান্য করে না, এবং তিনি ব্যতীত আর কারও ফয়সালায় কখনো সে সন্তুষ্ট হয় না।

অথচ সেক্যুলারিজম নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিয়ে আসা এই শরিয়ত বাতিল করে দেয়। এবং একে রাজনীতি, অর্থনীতি ও অন্য সকল বিষয়ে মানুষের জীবনে সামান্য ভূমিকা রাখা থেকেও খারিজ করে দেয়। বলুন, নবুয়তের সাথে এর চেয়ে বড় কুফরি আর কী হতে পারে!

টিকাঃ
৭৮. সুরা আনআম : ১৬১-১৬৩

ইসলামের সাথে সেক্যুলারিজমের সংঘর্ষের জায়গাগুলো সংক্ষিপ্তভাবে এমন :-

১. সেক্যুলারিজম-আল্লাহর রুবুবিয়াতের মধ্যে শিরক
রুবুবিয়াত মানে হল জাগতিক ও শরয়ি-সকল বিষয়ে আল্লাহ তায়ালাই একমাত্র কর্তৃত্বের অধিকারী, সার্বভৌম ক্ষমতাবান। এ প্রসঙ্গে দুটো বিষয়কেই একসাথে উল্লেখ করে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন— আল-খালকু ওয়াল আমর (الخلق والامر)।

জাগতিক বিষয়: যেমন, সৃষ্টি করা, গঠন ও উৎপন্ন করা, অস্তিত্বে আনা, জগৎ পরিচালনা করা, এর সমস্ত কর্ম ও বিষয় সম্পন্ন ও সম্পাদন করা ইত্যাদি। শরয়ি বিষয়: যেমন, আদেশ-নিষেধ, হালাল-হারাম ও শরিয়তের অন্যান্য বিধান। শরয়ি বিষয়ে আল্লাহ তায়ালাকে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী বিশ্বাস করার অর্থ হল, আল্লাহ যা হালাল করেছেন এর বাইরে আর কোনো হালাল নেই; তিনি যা হারাম বলে ঘোষণা করেছেন, এর বাইরে অন্য কোনো হারাম নেই, এবং আল্লাহপ্রদত্ত শরিয়তের বাইরে আর কোনো দীন নেই।

আদি ইবনে হাতিম রা. একবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তেলাওয়াত করতে শুনলেন ( اتخذوا احبارهم ورهبانهم اربابا من دون الله —দিয়ে তারা তাদের ধর্মগুরুদের রব হিসেবে গ্রহণ করেছে), তখন তিনি বললেন, আমরা তো তাদের ইবাদত করতাম না! নবিজি বললেন, ব্যাপারটি কি এমন ছিল না যে, আল্লাহ যা হালাল করেছেন, তারা সেগুলোকে হারাম বলে ঘোষণা করত, এরপর তোমরাও তা হারাম বলে বিশ্বাস করতে; এবং আল্লাহ যা হারাম করেছেন, তারা সেগুলোকে হালাল বলে ঘোষণা করত, তারপর তোমরাও তা হালাল বলে বিশ্বাস করতে? আদি ইবনে হাতিম রা. বললেন, হ্যাঁ, বিষয়টি এমনই ছিল। নবিজি বললেন, এটিই তাদের উপাসনা করা।

এদিকে সেক্যুলারিজম দাবি করে, রাজনীতিতে ধর্ম অচল এবং ধর্মের ভেতরে রাজনীতির কোনো বিষয় নেই। সুতরাং, ঐশী বিধানাবলি বলতে কিছুই গ্রহণযোগ্য নয়; বরং মানুষ যে আইনের ওপর একমত হবে, কেবল সেটিই হবে সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য ও পালনীয়। আইনপ্রণয়নের বিষয়টি দীন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও পরিপূর্ণরূপে দীনের আওতামুক্ত। অন্যভাবে বললে, সেক্যুলারিজম শরিয়তের বিধানাবলির পুরো বিষয়টিকেই অস্বীকার করে।

২. সেক্যুলারিজম-উলুহিয়্যাতের মধ্যে শিরক
উলুহিয়্যাতের একত্ববাদ বা ইলাহ ও উপাস্য হওয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালাকে এক বলে স্বীকার করার মধ্যে বড় দুটি বিষয় রয়েছে :

নিয়ত ও ইচ্ছার ক্ষেত্রে একত্ববাদ : অর্থাৎ, নামাজ রোজা হজ নজর-মান্নত ইত্যাদি এবাদত জাতীয় সকল কিছু একমাত্র আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্যে সম্পন্ন করা এবং এসবের জন্য তিনিই একমাত্র উপযুক্ত ও একচ্ছত্র দাবিদার বলে বিশ্বাস করা এবং মুখে স্বীকার করা।

আনুগত্য ও অনুসরণের ক্ষেত্রে একত্ববাদ : অর্থাৎ, পূর্ণ আনুগত্য ও সবিনয় সমর্পণ একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্যই হওয়া। আর এটি বাস্তবায়িত হবে যখন জীবনের সকল বিষয়ে তাঁর শরিয়তকে ফয়সালাকারী হিসেবে গ্রহণ করা হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

"বলুন, নিশ্চয়ই আমার রব আমাকে সিরাতে মুস্তাকিমের দিশা দিয়েছেন। ...এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। বলুন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ সকল কিছু একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্যই, যিনি সকল জগতের রব। তাঁর কোনো শরিক নেই। এবং এর জন্যই আমাকে আদেশ করা হয়েছে। আর আমি প্রথম মুসলমান।"⁷⁸

প্রথম আয়াতটি আনুগত্য ও অনুসরণ বলতে কী বোঝায় সেদিকে ইঙ্গিত করছে এবং পরের দুটো আয়াত ইঙ্গিত করছে ইচ্ছা ও নিয়তের একত্ববাদের দিকে। সুতরাং, আল্লাহর শরিয়তের বাইরে অন্য কিছুকে ফয়সালাকারী হিসেবে গ্রহণ করা হল ইবাদতের মধ্যে শিরক। এ কারণে সকল আলেম এ ব্যাপারে একমত যে, সিদ্ধান্ত ও ফয়সালা প্রদানের জায়গা থেকে আল্লাহর শরিয়তকে হটিয়ে দেওয়া অনেক বড় অপরাধ।

৩. সেক্যুলারিজম-নবুয়তের মধ্যে কলঙ্ক
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পরিপূর্ণ একটি দীন দিয়ে পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে আকিদার বিষয়গুলো যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে শরিয়ত বা আল্লাহপ্রদত্ত বিধিবিধান। সকল মুসলমানের জন্য আবশ্যক হল তিনি যে সকল বিষয় জানিয়ে গেছেন, সবকিছুকে সত্য বলে দ্বিধাহীনচিত্তে গ্রহণ করা এবং শরিয়ত আকারে যে আদেশ ও নিষেধ রেখে গেছেন, তার পরিপূর্ণ অনুসরণ করা।

আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন, অপরদিকে তাঁর নবিকে রাসুল হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করার অর্থ হল, সবিনয় আত্মসমর্পণের সাথে তাঁর অনুসরণ করা এবং তাঁর সামনে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে ন্যস্ত করা; এমন যে, তার কাছে তিনি নিজের জীবনের চেয়েও অধিক প্রিয়। ফলে সে তার বাণী ছাড়া অন্য কোথাও থেকে আলো ও হেদায়েত গ্রহণ করে না, জীবনের সকল বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ হতে ফয়সালাকারী হিসেবে একমাত্র তাঁকেই গ্রহণ করে; বিপরীতে অন্য কাউকে সিদ্ধান্তদাতা হিসেবে মান্য করে না, এবং তিনি ব্যতীত আর কারও ফয়সালায় কখনো সে সন্তুষ্ট হয় না।

অথচ সেক্যুলারিজম নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিয়ে আসা এই শরিয়ত বাতিল করে দেয়। এবং একে রাজনীতি, অর্থনীতি ও অন্য সকল বিষয়ে মানুষের জীবনে সামান্য ভূমিকা রাখা থেকেও খারিজ করে দেয়। বলুন, নবুয়তের সাথে এর চেয়ে বড় কুফরি আর কী হতে পারে!

টিকাঃ
৭৮. সুরা আনআম : ১৬১-১৬৩

📘 রাষ্ট্র রাজনীতি ও ইসলাম > 📄 মুসলিম সেক্যুলারদের ঈমানের ধরন

📄 মুসলিম সেক্যুলারদের ঈমানের ধরন


সেক্যুলারিজম যখন আল্লাহর শরিয়ত বাতিল করে দেয়, তখন ইমানের মর্ম থেকে আনুগত্যের মূল বিষয়টি হারিয়ে যায়। ফলে, নবিজির আনীত সংবাদসংশ্লিষ্ট বিশ্বাস ছাড়া ইমানের আর কিছুই বাকি থাকে না। এমন ইমান হল নবিজির ব্যাপারে ইহুদিদের বিশ্বাসটির মতো। তারা গভীরভাবে জানত যে তিনি সত্য নবি, তা সত্ত্বেও তাঁর আনুগত্য গ্রহণ করেনি।

সেক্যুলারিজম যখন আল্লাহর শরিয়ত বাতিল করে দেয়, তখন ইমানের মর্ম থেকে আনুগত্যের মূল বিষয়টি হারিয়ে যায়। ফলে, নবিজির আনীত সংবাদসংশ্লিষ্ট বিশ্বাস ছাড়া ইমানের আর কিছুই বাকি থাকে না। এমন ইমান হল নবিজির ব্যাপারে ইহুদিদের বিশ্বাসটির মতো। তারা গভীরভাবে জানত যে তিনি সত্য নবি, তা সত্ত্বেও তাঁর আনুগত্য গ্রহণ করেনি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00