📄 এ বইয়ের আলোচ্য সেক্যুলারিজম
এই বইয়ের মূল আলোচনায় 'সেক্যুলারিজম' বলতে আমরা কী বুঝিয়েছি, এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আমাদের বক্তব্য পরিষ্কার হওয়ার জন্য এই জায়গাটা চিহ্নিত হওয়া জরুরি। এখানে সেক্যুলারিজম বলতে আমরা বুঝিয়েছি—অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিসহ রাজনীতির যে পূর্ণ ধারণা ও তৎসংশ্লিষ্ট কর্মযজ্ঞ, সেখান থেকে সমস্ত ইসলামি মূল্যবোধ খুলে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। অনেক ইসলামপন্থি বুদ্ধিজীবী ও চিন্তক এ ক্ষেত্রগুলোতে ধর্মনিরপেক্ষতা কবুল করে বসেছেন এবং তাদের বক্তব্য, বিশ্লেষণ ও প্রস্তাবনা এর ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়েছে; কিন্তু পশ্চিমা সংজ্ঞায় ধর্মনিরপেক্ষতার যে সর্বগ্রাসী রূপ, সে পর্যন্ত তারা এখন অবধি পৌঁছাননি।
📄 সেক্যুলারিজমের প্রকরণ ও বিন্যাস
অনেক গবেষক নানা দিক বিবেচনায় সেক্যুলারিজমকে কয়েক ভাগে ভাগ করেছেন। ড. আবদুল ওয়াহহাব মাসিরির ভাগটি সবচেয়ে প্রসিদ্ধ। তিনি বলেন, সেক্যুলারিজম মূলত দুই প্রকার : আংশিক সেক্যুলারিজম ও পূর্ণ সেক্যুলারিজম।
আংশিক সেক্যুলারিজম হল শুধুমাত্র রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা করা।
পূর্ণ সেক্যুলারিজম একটি পরিপূর্ণ জগৎদর্শন; রাষ্ট্র কিংবা ব্যাপক পরিসরে প্রবাহিত জনজীবনের কিছু দিক থেকে ধর্মকে আলাদা করার মধ্যে এটি সীমিত নয়; বরং এটি ধর্মীয়, চারিত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধকে প্রথমে সামগ্রিক জীবন ও সমাজ পরিক্রমা থেকে বিচ্ছিন্ন করে, অতঃপর এই মিশন নিয়ে এটি প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিজীবনে গিয়েও হাজির হয়। ব্যক্তির বিশ্বাস ও পবিত্রতাবোধ নিশ্চিহ্ন করে দেয়, বস্তুকেন্দ্রিকতাকে তার চিন্তার কেন্দ্রভূমিতে স্থাপন করে এবং সকল বিষয়ে নিরেট মনোভাব দূর করে দিয়ে একধরনের হেঁয়ালিপূর্ণ আপেক্ষিকতার মনোভাব সৃষ্টি করে।
অনেক গবেষক নানা দিক বিবেচনায় সেক্যুলারিজমকে কয়েক ভাগে ভাগ করেছেন। ড. আবদুল ওয়াহহাব মাসিরির ভাগটি সবচেয়ে প্রসিদ্ধ। তিনি বলেন, সেক্যুলারিজম মূলত দুই প্রকার : আংশিক সেক্যুলারিজম ও পূর্ণ সেক্যুলারিজম।
আংশিক সেক্যুলারিজম হল শুধুমাত্র রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা করা।
পূর্ণ সেক্যুলারিজম একটি পরিপূর্ণ জগৎদর্শন; রাষ্ট্র কিংবা ব্যাপক পরিসরে প্রবাহিত জনজীবনের কিছু দিক থেকে ধর্মকে আলাদা করার মধ্যে এটি সীমিত নয়; বরং এটি ধর্মীয়, চারিত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধকে প্রথমে সামগ্রিক জীবন ও সমাজ পরিক্রমা থেকে বিচ্ছিন্ন করে, অতঃপর এই মিশন নিয়ে এটি প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিজীবনে গিয়েও হাজির হয়। ব্যক্তির বিশ্বাস ও পবিত্রতাবোধ নিশ্চিহ্ন করে দেয়, বস্তুকেন্দ্রিকতাকে তার চিন্তার কেন্দ্রভূমিতে স্থাপন করে এবং সকল বিষয়ে নিরেট মনোভাব দূর করে দিয়ে একধরনের হেঁয়ালিপূর্ণ আপেক্ষিকতার মনোভাব সৃষ্টি করে।
📄 সেক্যুলারিজমের নেতিবাচক প্রভাব
সর্বগ্রাসী মূল সেক্যুলারিজমটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার দ্বারা অনেক ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। আমাদের জীবনের সকল ক্ষেত্র থেকে নৈতিক ও চারিত্রিক মানদণ্ডগুলো হারিয়ে গেছে। সে জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পরিপূর্ণ মূল্যবোধহীন নিছক দক্ষতা ও কথিত সমতার মানদণ্ড।
ফলে অর্থনীতিকে নিছক অর্থনৈতিক মানদণ্ড দিয়ে বিচার করা হয়, রাজনীতিকে মাপা হয় শুধুমাত্র রাজনৈতিক মানদণ্ড দিয়েই, এবং এখান থেকেই জন্ম নিয়েছে 'আর্ট ফর আর্ট' একটি কুসংস্কার; অর্থাৎ, শিল্প নির্মাণ করতে গিয়ে নৈতিকতা, চরিত্র বা ধর্ম—কোনো কিছুকে গ্রাহ্য করা যাবে না; বরং এখানে একমাত্র অন্বেষা হবে সৌন্দর্যের। এবং বিষয়টি এত দূর এগিয়েছে, এখন নারী-পুরুষের ধারণাটি পর্যন্ত বিচার করা হচ্ছে শুধুমাত্র দেহকেন্দ্রিকতা দিয়ে, চারিত্রিক ও নৈতিক দিক থেকে সে বিচার যত আপত্তিজনকই হোক।
দ্বিতীয় আরেকটি ভাগ সেক্যুলারিজমের প্রসিদ্ধ আরেকটি ভাগ আছে—চরমপন্থি ও মধ্যপন্থি।
চরমপন্থি সেক্যুলারিজম হল, যেটি ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করেই ক্ষান্ত হয় না; বরং পরিপূর্ণরূপে ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ফলে, এতে আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়, নবি-রাসুলকে অস্বীকার করা হয়, নাকচ করা হয় গায়েবের সকল বিশ্বাস, এবং ধর্মের অনুসারীদের তার শত্রুতার প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
মধ্যমপন্থি সেক্যুলারিজম হল, যেটি শুধুমাত্র ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করার কথা বলে। ফলে এতে একদিকে যেমন আল্লাহ ও রাসুলের অস্তিত্ব এবং গায়েবের বিশ্বাসগুলোকে নাকচ করা হয় না, অপরদিকে সরাসরি ধর্ম ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও ঘোষণা করে না; কিন্তু এ ধারার অনুসারীরা দীনকে ব্যাখ্যা করেন অসম্পূর্ণভাবে। তারা মনে করেন, ধর্ম মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়; রাষ্ট্র ও সমাজ পরিসরে এর কোনো ভূমিকা নেই।
এই ভাগটি মূলত পশ্চিমা মূল সেক্যুলারিজম ইসলামি রাজনীতিবিদ, দায়ি ও আলেমদের ওপর যে ভয়ানক চাপ তৈরি করেছিল, সেখান থেকে জন্ম নিয়েছে। এই চাপের মুখে পড়ে তাদের কেউ কেউ মন্দের ভালো নীতিতে তালাশ করতে লাগলেন ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য কোন সেক্যুলারিজমটি বেশি ক্ষতিকর, কোনটি কম।
সর্বগ্রাসী মূল সেক্যুলারিজমটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার দ্বারা অনেক ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। আমাদের জীবনের সকল ক্ষেত্র থেকে নৈতিক ও চারিত্রিক মানদণ্ডগুলো হারিয়ে গেছে। সে জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পরিপূর্ণ মূল্যবোধহীন নিছক দক্ষতা ও কথিত সমতার মানদণ্ড।
ফলে অর্থনীতিকে নিছক অর্থনৈতিক মানদণ্ড দিয়ে বিচার করা হয়, রাজনীতিকে মাপা হয় শুধুমাত্র রাজনৈতিক মানদণ্ড দিয়েই, এবং এখান থেকেই জন্ম নিয়েছে 'আর্ট ফর আর্ট' একটি কুসংস্কার; অর্থাৎ, শিল্প নির্মাণ করতে গিয়ে নৈতিকতা, চরিত্র বা ধর্ম—কোনো কিছুকে গ্রাহ্য করা যাবে না; বরং এখানে একমাত্র অন্বেষা হবে সৌন্দর্যের। এবং বিষয়টি এত দূর এগিয়েছে, এখন নারী-পুরুষের ধারণাটি পর্যন্ত বিচার করা হচ্ছে শুধুমাত্র দেহকেন্দ্রিকতা দিয়ে, চারিত্রিক ও নৈতিক দিক থেকে সে বিচার যত আপত্তিজনকই হোক।
দ্বিতীয় আরেকটি ভাগ সেক্যুলারিজমের প্রসিদ্ধ আরেকটি ভাগ আছে—চরমপন্থি ও মধ্যপন্থি।
চরমপন্থি সেক্যুলারিজম হল, যেটি ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করেই ক্ষান্ত হয় না; বরং পরিপূর্ণরূপে ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ফলে, এতে আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়, নবি-রাসুলকে অস্বীকার করা হয়, নাকচ করা হয় গায়েবের সকল বিশ্বাস, এবং ধর্মের অনুসারীদের তার শত্রুতার প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।
মধ্যমপন্থি সেক্যুলারিজম হল, যেটি শুধুমাত্র ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করার কথা বলে। ফলে এতে একদিকে যেমন আল্লাহ ও রাসুলের অস্তিত্ব এবং গায়েবের বিশ্বাসগুলোকে নাকচ করা হয় না, অপরদিকে সরাসরি ধর্ম ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও ঘোষণা করে না; কিন্তু এ ধারার অনুসারীরা দীনকে ব্যাখ্যা করেন অসম্পূর্ণভাবে। তারা মনে করেন, ধর্ম মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়; রাষ্ট্র ও সমাজ পরিসরে এর কোনো ভূমিকা নেই।
এই ভাগটি মূলত পশ্চিমা মূল সেক্যুলারিজম ইসলামি রাজনীতিবিদ, দায়ি ও আলেমদের ওপর যে ভয়ানক চাপ তৈরি করেছিল, সেখান থেকে জন্ম নিয়েছে। এই চাপের মুখে পড়ে তাদের কেউ কেউ মন্দের ভালো নীতিতে তালাশ করতে লাগলেন ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য কোন সেক্যুলারিজমটি বেশি ক্ষতিকর, কোনটি কম।
📄 ইউরোপে যেভাবে গড়ে উঠল সেক্যুলারিজম
সেক্যুলারিজম নির্ভেজাল পশ্চিমা একটি দর্শন। পশ্চিমে জন্ম হয়েছে এবং সেখানেই ডালপালা ছড়িয়ে বিশাল মহিরুহের আকৃতি ধারণ করেছে। এরপর পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি একে পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে পৃথিবীজুড়ে।
সুতরাং, এটি এমন বিশেষ কোনো চিন্তা নয়, যেটি মানুষের স্বভাবজাত প্রবণতা থেকে স্বাভাবিকভাবে উৎপন্ন হয়েছে; এমনও নয় যে চিন্তাটি আপন বিভা ও উৎকর্ষের কারণে মহাদেশগুলোতে বিস্তৃত হয়েছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে, এবং পৃথিবীর চিন্তার ইতিহাসে এটিই একমাত্র শেষ কথা নয়। ব্যাপারটি কোনোভাবেই এমন নয় যে, এর বিপরীতে অন্য কোনো চিন্তা হাজির হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই; বরং এটি সাধারণ একটি চিন্তামাত্র, যাকে অধুনা পশ্চিমা সভ্যতা বিশেষভাবে গড়ে তুলেছে এবং ইতিহাসের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ধীরে ধীরে বিকশিত হয়ে আজকের এই রূপে এসে উপনীত হয়েছে।
খ্রিষ্টবাদের সাথে সেক্যুলারিজমের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আরও সূক্ষ্মভাবে বললে—খ্রিষ্টবাদ নয়; পৌলবাদের সাথে। ইউরোপে একদম সূচনার সময়ে ধর্ম মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং খ্রিষ্টবাদ গ্রহণ করা হয়েছিল শরিয়ত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নিছক একটি আকিদা ও বিশ্বাসরূপে। শরিয়ত বা ধর্মীয় জীবনবিধান ইউরোপকে কখনোই শাসন করেনি, খুব সামান্য কিছু পরিসর ছাড়া।
ইউরোপীয় রেনেসাঁ-পরবর্তী সময়ে নব আবিষ্কৃত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ প্রতিষ্ঠিত হলে ইউরোপীয় সমাজজীবনের অল্প কিছু ক্ষেত্রে বিক্ষিপ্তভাবে ধর্মের যে-সকল অনুশাসন তখনো বাকি ছিল, সেগুলোকেও তারা ছুড়ে ফেলল এবং ধর্মকে সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ নির্বাসিত করল। এমনকি তাদের চিন্তাচেতনা ও অনুভূতি থেকে পর্যন্ত মুছে গেল ধর্মের সামান্য বোধ।
কিন্তু আমাদের দেশের বিষয়টি ছিল অন্যরকম। ইসলাম মুসলিম কান্ট্রিগুলোকে শাসন করেছে যুগের পর যুগ। এখানে শরিয়তের বিধানাবলি পালিত হয়েছে, আকিদা-বিশ্বাসের প্রচারপ্রসার ও লালন হয়েছে ব্যাপকভাবে। ফলে ইসলামি বিশ্বের হৃদয়ে সেক্যুলারিজম অনুপ্রবেশের বিষয়টি ছিল খুবই কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং।
পাশাপাশি ইউরোপে আরও কিছু বিষয় ছিল, যেগুলো সেখানের মাটিতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ সৃষ্টিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। যেমন :
মধ্যযুগে ইউরোপিয়ানদের মন-মস্তিস্ক ও দেহ ভয়ংকরভাবে গ্রাস করে রেখেছিল গির্জাগুলো। ফলে ব্যাপকভাবে তারা এই জুলুম থেকে নিষ্কৃতি পেতে চাইছিল। শেষ পর্যন্ত তাদের চিন্তা ও আন্দোলনগুলো এমনভাবে গঠিত হয়েছে যে, শুধুমাত্র গির্জা থেকে মুক্ত হওয়ার পরিবর্তে তারা পুরোপুরি ধর্ম থেকেই বেরিয়ে এসেছিল।
আরও একটি কারণ ছিল—পৌত্তলিক গ্রিক সভ্যতার প্রভাব। এই সভ্যতা মানুষ ও সৃষ্টিকর্তার মাঝে এমন এক সম্পর্কের ধারণা গড়ে তুলেছিল, যা কেবল দুজন শত্রুর মাঝেই হতে পারে। এ সম্পর্ক সর্বদাই প্রবল দ্বন্দ্বমুখর। মানুষ এর মুখে দাঁড়িয়ে সবসময় বিবমিষায় আক্রান্ত হয়েছে, গোপন ক্ষোভের অনলে পুড়েছে; কখনো শান্তি ও আনন্দ লাভ করতে পারেনি; কিন্তু এ সবকিছু মেনে নেওয়া ছাড়া বাহ্যত তাদের কিছুই করার ছিল না। সে সময়ে ধর্মনিরপেক্ষতার মতবাদটি কল্পিত সেই প্রভুদের কবজা থেকে নিষ্কৃতি লাভের অব্যর্থ এক অবলম্বন হিসেবে তাদের সামনে হাজির হয়েছিল।
এভাবেই ইউরোপিয়ানদের কাছে ধর্মের বিষয়টি গুরুত্বহীন ও পরিত্যাজ্য হয়ে পড়ে। তারা অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নিল ধর্ম কখনোই মানবিক মূল্যবোধের উৎস হতে পারে না। ধর্মের পরিবর্তে তারা গ্রহণ করল প্রকৃতিপূজা, আর সেক্যুলারিজমকে গ্রহণ করল মহান একটি ধর্ম হিসেবে, যে ধর্মটি আসমান থেকে নাজিল হয়নি; নিজেরাই গড়ে নিয়েছে, মাটির পৃথিবীতেই, নিজেদের সুবিধামতো।
সেক্যুলারিজম নির্ভেজাল পশ্চিমা একটি দর্শন। পশ্চিমে জন্ম হয়েছে এবং সেখানেই ডালপালা ছড়িয়ে বিশাল মহিরুহের আকৃতি ধারণ করেছে। এরপর পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি একে পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে পৃথিবীজুড়ে।
সুতরাং, এটি এমন বিশেষ কোনো চিন্তা নয়, যেটি মানুষের স্বভাবজাত প্রবণতা থেকে স্বাভাবিকভাবে উৎপন্ন হয়েছে; এমনও নয় যে চিন্তাটি আপন বিভা ও উৎকর্ষের কারণে মহাদেশগুলোতে বিস্তৃত হয়েছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে, এবং পৃথিবীর চিন্তার ইতিহাসে এটিই একমাত্র শেষ কথা নয়। ব্যাপারটি কোনোভাবেই এমন নয় যে, এর বিপরীতে অন্য কোনো চিন্তা হাজির হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই; বরং এটি সাধারণ একটি চিন্তামাত্র, যাকে অধুনা পশ্চিমা সভ্যতা বিশেষভাবে গড়ে তুলেছে এবং ইতিহাসের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ধীরে ধীরে বিকশিত হয়ে আজকের এই রূপে এসে উপনীত হয়েছে।
খ্রিষ্টবাদের সাথে সেক্যুলারিজমের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আরও সূক্ষ্মভাবে বললে—খ্রিষ্টবাদ নয়; পৌলবাদের সাথে। ইউরোপে একদম সূচনার সময়ে ধর্ম মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং খ্রিষ্টবাদ গ্রহণ করা হয়েছিল শরিয়ত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নিছক একটি আকিদা ও বিশ্বাসরূপে। শরিয়ত বা ধর্মীয় জীবনবিধান ইউরোপকে কখনোই শাসন করেনি, খুব সামান্য কিছু পরিসর ছাড়া।
ইউরোপীয় রেনেসাঁ-পরবর্তী সময়ে নব আবিষ্কৃত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ প্রতিষ্ঠিত হলে ইউরোপীয় সমাজজীবনের অল্প কিছু ক্ষেত্রে বিক্ষিপ্তভাবে ধর্মের যে-সকল অনুশাসন তখনো বাকি ছিল, সেগুলোকেও তারা ছুড়ে ফেলল এবং ধর্মকে সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ নির্বাসিত করল। এমনকি তাদের চিন্তাচেতনা ও অনুভূতি থেকে পর্যন্ত মুছে গেল ধর্মের সামান্য বোধ।
কিন্তু আমাদের দেশের বিষয়টি ছিল অন্যরকম। ইসলাম মুসলিম কান্ট্রিগুলোকে শাসন করেছে যুগের পর যুগ। এখানে শরিয়তের বিধানাবলি পালিত হয়েছে, আকিদা-বিশ্বাসের প্রচারপ্রসার ও লালন হয়েছে ব্যাপকভাবে। ফলে ইসলামি বিশ্বের হৃদয়ে সেক্যুলারিজম অনুপ্রবেশের বিষয়টি ছিল খুবই কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং।
পাশাপাশি ইউরোপে আরও কিছু বিষয় ছিল, যেগুলো সেখানের মাটিতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ সৃষ্টিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। যেমন :
মধ্যযুগে ইউরোপিয়ানদের মন-মস্তিস্ক ও দেহ ভয়ংকরভাবে গ্রাস করে রেখেছিল গির্জাগুলো। ফলে ব্যাপকভাবে তারা এই জুলুম থেকে নিষ্কৃতি পেতে চাইছিল। শেষ পর্যন্ত তাদের চিন্তা ও আন্দোলনগুলো এমনভাবে গঠিত হয়েছে যে, শুধুমাত্র গির্জা থেকে মুক্ত হওয়ার পরিবর্তে তারা পুরোপুরি ধর্ম থেকেই বেরিয়ে এসেছিল।
আরও একটি কারণ ছিল—পৌত্তলিক গ্রিক সভ্যতার প্রভাব। এই সভ্যতা মানুষ ও সৃষ্টিকর্তার মাঝে এমন এক সম্পর্কের ধারণা গড়ে তুলেছিল, যা কেবল দুজন শত্রুর মাঝেই হতে পারে। এ সম্পর্ক সর্বদাই প্রবল দ্বন্দ্বমুখর। মানুষ এর মুখে দাঁড়িয়ে সবসময় বিবমিষায় আক্রান্ত হয়েছে, গোপন ক্ষোভের অনলে পুড়েছে; কখনো শান্তি ও আনন্দ লাভ করতে পারেনি; কিন্তু এ সবকিছু মেনে নেওয়া ছাড়া বাহ্যত তাদের কিছুই করার ছিল না। সে সময়ে ধর্মনিরপেক্ষতার মতবাদটি কল্পিত সেই প্রভুদের কবজা থেকে নিষ্কৃতি লাভের অব্যর্থ এক অবলম্বন হিসেবে তাদের সামনে হাজির হয়েছিল।
এভাবেই ইউরোপিয়ানদের কাছে ধর্মের বিষয়টি গুরুত্বহীন ও পরিত্যাজ্য হয়ে পড়ে। তারা অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নিল ধর্ম কখনোই মানবিক মূল্যবোধের উৎস হতে পারে না। ধর্মের পরিবর্তে তারা গ্রহণ করল প্রকৃতিপূজা, আর সেক্যুলারিজমকে গ্রহণ করল মহান একটি ধর্ম হিসেবে, যে ধর্মটি আসমান থেকে নাজিল হয়নি; নিজেরাই গড়ে নিয়েছে, মাটির পৃথিবীতেই, নিজেদের সুবিধামতো।