📘 রাষ্ট্র রাজনীতি ও ইসলাম > 📄 সেক্যুলারিজমের পরিচয়

📄 সেক্যুলারিজমের পরিচয়


সেক্যুলারিজম কী—এ নিয়ে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বড় রকমের তর্ক আছে। ফলে এর পরিচয় হিসেবে নির্দিষ্ট একটি সংজ্ঞা হাজির করা মুশকিল।

কারও মতে এটি একটি মতাদর্শ ও বিশ্বাস। এ বিশ্বাসমতে রাষ্ট্র শিক্ষা ও নৈতিকতার জায়গা থেকে ধর্মকে দূরে রাখা আবশ্যক। এগুলোর কোনোটিতেই গির্জা ও ধর্মীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রভাব স্বীকার করা উচিত নয়। পাশাপাশি এটাও মনে করে—ধর্ম নয়, মানুষের মুক্তির একমাত্র পথ তার নিজস্ব জ্ঞান ও বুদ্ধি। শুধুমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ দিয়েই মানুষ সকল অনিষ্টতা অকল্যাণ ও পতন থেকে উত্তোলিত হয়ে সত্য ও সুন্দরের পথে এবং ন্যায় ও মানবিকতার দিকে এগিয়ে যেতে পারে। সুতরাং, সমস্ত গায়েবি বিশ্বাস পরিত্যাগ করতে হবে।

কেউ বলেন, এটি এমন এক মতবাদ, যার মূল দর্শন হল—মানুষের চরিত্র, নীতি-নৈতিকতা, মানব-উন্নয়ন ও বিকাশ এবং মূল্যবোধ—ধর্ম এগুলোর কোনোটিরই ভিত্তি হতে পারে না। ধর্মনিরপেক্ষতা মানেই হল গির্জা ও তার সকল অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের সমুদয় সম্পত্তি রাষ্ট্রের হাতে ন্যস্ত করার নাম। রাষ্ট্র এসব দিয়ে সমকালীন উদ্ভূত সংকটগুলোর মোকাবেলা করবে।

আবার সংক্ষিপ্ত শব্দে কেউ কেউ এভাবেও বলেছেন—ধর্মনিরপেক্ষতা মূলত একটি সামাজিক আন্দোলন, যার লক্ষ্য মানুষের মনোযোগ পরকাল থেকে সরিয়ে শুধুমাত্র ইহকাল ও পার্থিব জগতের অভিমুখে করে দেওয়া।

কেউ বলেছেন—ধর্মনিরপেক্ষতা হল মানুষের জীবনের ভেতর গড়ে তোলা একটি বিশেষ প্রবণতা, যার মূল দর্শন দাঁড়িয়ে আছে এ কথার ওপর—ধর্মীয় বিবেচনাসমূহ রাষ্ট্রপরিচালনায় কোনো ধরনের ভূমিকা রাখতে পারবে না। চারিত্রিক ও নৈতিক বিষয়ে এটি একটি সামাজিক শৃঙ্খলার নাম। একটি বিশেষ দর্শন। মানুষের পারস্পরিক সহাবস্থান, মানুষের বিনিময় ও আচরণ এবং চরিত্র ও নৈতিকতাসংক্রান্ত সমস্ত মূল্যবোধ গড়ে উঠবে শুধুমাত্র দুটো জিনিসের ওপর ভিত্তি করে : ১. সমকালীন জীবনপ্রবাহের দাবি। ২. সামাজিক নিরাপত্তা। এ ক্ষেত্রে ধর্ম ও ধর্মীয় নির্দেশনাগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করা সঠিক নয়।

অন্য শব্দে এভাবেও বলা হয়েছে—ধর্মনিরপেক্ষতা পরিপূর্ণ একটি জীবন-পরিচালনাব্যবস্থা। জগৎ বিষয়ে এর সুস্পষ্ট একটি দর্শন ও বিস্তারিত একটি স্বপ্ন রয়েছে। এটি পরকাল ও সমস্ত গায়েবি বিশ্বাস সম্পূর্ণ নাকচ করে। এর নিজস্ব কিছু নৈতিকতা-সূত্র আছে, যার ভিত্তি দুটি জিনিসের ওপর: ১. বুদ্ধি ও বিবেকবাদিতা। ২. উপকার ও কল্যাণবাদিতা।

কুয়েতের রাজনীতিকোষে এর পরিচয়ে বলা হয়েছে—ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী হল ধার্মিকের সম্পূর্ণ বিপরীত। এটি একটি পরিভাষারূপে ব্যবহার করা হয় এবং এ দিয়ে ইঙ্গিত করা হয় জীবনের একটি বিশেষ প্রবেশপথের দিকে, যা পরিপূর্ণরূপে দীনমুক্ত। শুধুমাত্র সমকালীন জাগতিক বিষয়ের প্রতি সমস্ত মনোযোগ ও গুরুত্ব ঢেলে দেওয়ার মাধ্যমে এটি একটি দর্শন আকারে হাজির হয়।

📘 রাষ্ট্র রাজনীতি ও ইসলাম > 📄 মুসলিম সেক্যুলারদের নতুন ব্যাখ্যা

📄 মুসলিম সেক্যুলারদের নতুন ব্যাখ্যা


মুসলিম জাতির মধ্যে যেহেতু সামগ্রিকভাবে একটা দীনি চেতনা সবসময় বিদ্যমান, তাই তাদের সামনে সেক্যুলারিজমের পশ্চিমা সংজ্ঞা নিয়ে হাজির হলে কিছুতেই মানতে চাইবে না। এজন্য আমরা দেখি আরবের (ও অন্যান্য মুসলিম দেশের) সেক্যুলাররা নিজের মতো ধর্মনিরপেক্ষতার একটি সংজ্ঞা তৈরি করেছেন এবং বেশির ভাগ পশ্চিমা সংজ্ঞাগুলোতে ধর্মদ্রোহিতা ও ধর্মহীনতার যে মর্ম ছিল, সেগুলোকে নিজেদের সংজ্ঞায় চুপিসারে লুকিয়ে ফেলতে চান।

এমনিভাবে দাবি করেন, ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাটি শুধুমাত্র রাজনীতি ও রাষ্ট্রপরিচালনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু এটা একটা কৌশলমাত্র। এর মাধ্যমে তারা ধর্মীয় দিক থেকে উঠে আসা প্রশ্ন ও আপত্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে চেষ্টা করেন। কারণ, মুসলিম কান্ট্রির বেশির ভাগ মানুষ রাজনীতি ও রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে শরিয়তের প্রতি মনোযোগী না হলেও জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে গভীর দীনি চেতনা লালন করেন এবং বাস্তবে যে যতটুকুই শরিয়ত পালন করুক, অন্তত বোধ ও বিশ্বাসগতভাবে এ কথার ওপর অবিচল যে, আমাদের জীবনপ্রবাহটি একমাত্র ইসলাম দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হোক। বিশেষ করে মূল্যবোধ, নৈতিকতা, চারিত্রিক বিষয়াবলি এবং সামাজিক শৃঙ্খলা ও বিন্যাসের ক্ষেত্রে এ চেতনাটি অনেক গভীর。

সেক্যুলারিজমের যে আসল পরিচয় ও মূল মর্মটি, যেটি শুধু রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং জীবনের সকল ক্ষেত্রে পরিব্যপ্ত হয়ে সবকিছু আচ্ছাদিত করে ফেলে এবং ধর্ম ও ধর্মীয় মূল্যবোধগুলো সরিয়ে দিয়ে সেখানে নিজেই আলাদা এক ধর্ম আকারে প্রতিস্থাপিত হয়, আরবের বেশির ভাগ সেক্যুলার এই অপকৌশলের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতার সে বাস্তব পরিচয়টি পর্দার অন্তরালে লুকিয়ে ফেলেন। এবং এ ছাড়া তাদের উপায়ও নেই আসলে।

📘 রাষ্ট্র রাজনীতি ও ইসলাম > 📄 সেক্যুলারিজমের সূচনা ও পরিণতি

📄 সেক্যুলারিজমের সূচনা ও পরিণতি


নতুন সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে এই অস্থিরতা তো আছেই, এর বাইরে সেক্যুলারিজমের প্রসিদ্ধ যে সংজ্ঞাটি, অর্থাৎ 'ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করা', এটিকেও তারা নিজেদের মতো ব্যাখ্যা করে বৈধ করতে চান। তারা বলেন, কথাটির প্রকৃত মর্ম বুঝতে আমাদের ইতিহাসের মূলের কাছে ফিরে যেতে হবে। এরপর তারা ধর্মনিরপেক্ষতার পরিচয় নির্ধারণে এমন এক ঐতিহাসিক সূত্র ও মর্ম পেশ করেন, বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্ব নেই。

কারণ, ইতিহাসের পাঠকমাত্রই জানেন, ইউরোপে ধর্মনিরপেক্ষতার সূচনাটি কীভাবে হয়েছিল। তারা ধর্মকে প্রথমে রাষ্ট্র থেকে আলাদা করে, এরপর সেই চেতনা ও প্রবণতা ক্রমশ উন্নতি করে একসময় ধর্মকে পুরো জীবন থেকেই বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এভাবে তারা একটি সূচনা থেকে ক্রমশ এগিয়ে একটি পরিণতিতে পৌঁছেছে। এটা একদমই স্বভাবজাত একটা গতি। রাষ্ট্র থেকে ধর্ম আলাদা করার মাধ্যমে প্রথম পদক্ষেপটি নেওয়ার পর ধর্মকে পুরো জীবন থেকেই বিচ্ছিন্ন করার পরিণতিতে পৌঁছা পর্যন্ত এ গতি কখনোই থামবে না। বর্তমান মুসলিম জাতি ঠিক এই সূচনার পথটি ধরেই পরিণতির দিকে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে।

📘 রাষ্ট্র রাজনীতি ও ইসলাম > 📄 এ বইয়ের আলোচ্য সেক্যুলারিজম

📄 এ বইয়ের আলোচ্য সেক্যুলারিজম


এই বইয়ের মূল আলোচনায় 'সেক্যুলারিজম' বলতে আমরা কী বুঝিয়েছি, এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আমাদের বক্তব্য পরিষ্কার হওয়ার জন্য এই জায়গাটা চিহ্নিত হওয়া জরুরি। এখানে সেক্যুলারিজম বলতে আমরা বুঝিয়েছি—অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিসহ রাজনীতির যে পূর্ণ ধারণা ও তৎসংশ্লিষ্ট কর্মযজ্ঞ, সেখান থেকে সমস্ত ইসলামি মূল্যবোধ খুলে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। অনেক ইসলামপন্থি বুদ্ধিজীবী ও চিন্তক এ ক্ষেত্রগুলোতে ধর্মনিরপেক্ষতা কবুল করে বসেছেন এবং তাদের বক্তব্য, বিশ্লেষণ ও প্রস্তাবনা এর ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়েছে; কিন্তু পশ্চিমা সংজ্ঞায় ধর্মনিরপেক্ষতার যে সর্বগ্রাসী রূপ, সে পর্যন্ত তারা এখন অবধি পৌঁছাননি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00