📄 শরিয়তের বিধান লঙ্ঘন ও একটি পর্যালোচনা
প্রশ্ন: সমকালে অনেক রাজনৈতিক দলকে দেখা যায় একদিকে দাবি করছেন তারা ইসলামি হুকুমত কায়েম করার চেষ্টায় আছেন, অপরদিকে নেতৃবৃন্দ ও সদস্যবর্গ শরিয়তের সীমালঙ্ঘন করে নানা ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করে বেড়াচ্ছেন। এ নিয়ে তাদের কোনো অনুতাপ নেই, উলটো কর্মকৌশল, বিশেষ কল্যাণ, রাজনীতি ইত্যাদি শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করে জায়েজ প্রমাণের চেষ্টা করেন। এক হাদিসে নাকি আছে, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাবা শরিফের যে অংশটি চার দেয়ালের বাইরে থেকে গিয়েছিল, সেটুকুকে ভেতরে নিয়ে ঘরটি পুনঃনির্মাণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু মানুষের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি হয়ে ফেতনা ছড়াতে পারে আশঙ্কায় এ থেকে বিরত থেকেছিলেন। সে সময় আফসোস করে একজনকে বলেছিলেন—তোমার গোত্রের লোকজন যদি সদ্য ইসলামগ্রহণকারী না হত, তাহলে আমি এ অংশটুকু ভেতরে নিয়ে কাবাকে নতুন করে নির্মাণ করতাম। তারা নিজেদের শরিয়ত লঙ্ঘনের পক্ষে এই হাদিস দিয়ে দলিল দেন। তাদের এই চিন্তা এবং এর পক্ষে প্রমাণ হিসেবে যা পেশ করেছেন, তা কি সঠিক? আশা করছি বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে জাতিকে সঠিক পথের দিশা দেখাবেন। আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করুন।
উত্তর : এ তো সকলেই জানে—জাগতিক কোনো স্বার্থ হাসিলের জন্য গুনাহের কাজ করা বা কোনো ফরজ ওয়াজিব ছেড়ে দেওয়া বিলকুল জায়েজ নেই। ধরা যাক, এক লোক পার্থিব কোনো স্বার্থ হাসিলের জন্য মিথ্যা বলতে শুরু করল বা মানুষকে ধোঁকা দিতে লাগল অথবা নামাজ ছেড়ে দিল কিংবা নামাজের জামাতে যাওয়া বন্ধ করে দিল; তার এসব কাজ যেকোনোভাবেই জায়েজ নয়; বরং সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও হারাম—এ কথা সবাই বোঝে। দলিল দিয়ে বুঝিয়ে বলার দরকার পড়ে না। তেমনই কোনো দীনি কল্যাণ লাভের জন্যও এ ধরনের গুনাহের কাজে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ নেই। সম্পূর্ণ হারাম। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য ও অনুসরণ পার্থিব-অপার্থিব সকল কল্যাণের আগে; বরং এটিই সমস্ত কল্যাণের উৎস। যেকোনো লাভ-লোকসানের সমস্ত হিসাব তুচ্ছ ও গৌণ।
কেউ যদি মাদরাসা চালানোর জন্য সিনেমার ব্যবসা করে বা সুদি কারবার করে টাকা উপার্জন করে, অথবা ধরা যাক, নাচগানের আসর বসাল এ উদ্দেশ্যে যে, কিছুক্ষণ গান শোনানোর পর যখন অনেক মানুষ জমে যাবে, তখন সবাইকে দীনি আলোচনা শুনিয়ে দেবে—একে কি জায়েজ বলা যাবে? কখনোই না। শক্ত গুনাহ ও শয়তানের কুমন্ত্রণা। দীনি কাজের নামে বিভ্রান্তি ও সুস্পষ্ট গোমরাহি।
অবশ্য, কোনো কাজ যদি এমন হয় যে, এটি ফরজ-ওয়াজিব কিছুই না; স্রেফ বৈধ বা মুস্তাহাব, এমন পর্যায়ের কোনো কাজ দীনি কোনো কল্যাণের জন্য ছেড়ে দেওয়া জায়েজ আছে। দীনি কল্যাণ, যথা—জনসাধারণকে ফেতনা থেকে বাঁচানো বা তাদের কোনো কষ্ট লাঘব করা কিংবা গুনাহ থেকে বাঁচিয়ে রাখা ইত্যাদি। ফিকহের কিতাবে এরকম দৃষ্টান্ত রয়েছে। যেমন, ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন, মুসল্লিরা ক্লান্তি বোধ করলে তারাবির নামাজের বৈঠকে দরুদ শরিফ সংক্ষিপ্ত করা এবং শেষের দোয়া মাসুরা না পড়া জায়েজ আছে।
এ মাসআলার সূত্রে আল্লামা হাসকাফি রহ. বলেন, ইমাম তাশাহহুদের পর আরও কিছু দোয়া-দরুদ পড়বে। তবে মুসল্লিরা ক্লান্ত হলে শুধু দরুদ শরিফ পড়বে। তা-ও সবটুকু না পড়ে কেবল 'আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা' পড়বে, এরপর আর কোনো দোয়া না পড়েই সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করে দেবে। ইমাম শাফেয়ি রহ.-এর মতে দরুদ শরিফ থেকে কমপক্ষে এতটুকু পড়া ফরজ। তাই সতর্কতাবশত এ অংশটুকু পড়তে হচ্ছে।³⁶
তবে, বিশেষ কোনো কল্যাণের কথা বিবেচনা করে কোনো মুস্তাহাব বা বৈধ বিষয়কে বাদ দিতে হলেও একটি শর্ত আছে। আর তা হল, এই বাদ দেওয়ার কারণে শরিয়তের কোনো বিধানে বিকৃতি ঘটতে পারবে না, এমনিভাবে লক্ষ রাখতে হবে এর দ্বারা যেন শরিয়তের মধ্যে হস্তক্ষেপ হওয়ার ঘটনা না ঘটে। যেমন, বৈধ বা মুস্তাহাব কাজটি এমন আঙ্গিকে বাদ দেওয়া হল যে, একপর্যায়ে মানুষ একে হারাম ভাবতে শুরু করল। অথবা হারাম মনে করে না ঠিক, কিন্তু এর সাথে আচরণ করে হারাম কাজের মতোই। অথবা ধরা যাক, শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ কোনো বিষয় নিষিদ্ধ করে রাষ্ট্রীয়ভাবে আইন জারি করা হল। বিশেষ কল্যাণের দোহাই দিয়ে এসবের কিছুই করা যাবে না। করলে তা হবে শরিয়ত বিকৃতি ও শরিয়তে হস্তক্ষেপ করার নামান্তর।
এ থেকে বোঝা গেল বিশেষ কোনো কল্যাণের দোহাই দিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে বা বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে আইন করা জায়েজ নেই, যদিও এ দুটোর কোনোটিই ফরজ-ওয়াজিব কিছু নয়; বৈধমাত্র। কারণ, বিয়ে একটি শরিয়তঘনিষ্ঠ বিষয় এবং শরিয়ত একে জায়েজ বলেছে। কিন্তু আইন করে নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে মূলত শরিয়তের বিপরীতে গিয়ে একে হারাম ঘোষণা করা হচ্ছে। এটাই দীন ও শরিয়তের মধ্যে হস্তক্ষেপ। এ কাজ কোনোভাবেই জায়েজ হতে পারে না। কিন্তু নিছক ব্যবস্থাপনাগত কোনো বিষয়ে যদি আইন জারি করা হয়, তাহলে এর সুযোগ আছে। যেমন, রাস্তায় শুধু ডান বা বাম দিক ধরে চলার আইন করা অথবা কোনো রাষ্ট্রের ট্রাফিকব্যবস্থার সুবিধার জন্য সে দেশের রোডগুলোকে ওয়ানওয়ে রোড হিসেবে ঘোষণা করা ইত্যাদি—এ জাতীয় সাধারণ আরও যত ট্রাফিক আইন আছে, এসবে কোনো আপত্তি নেই।
প্রশ্নের মধ্যে কাবা শরিফ নির্মাণের যে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে, তা ছিল সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনাগত একটি বিষয়, শরিয়তের দৃষ্টিতে ফরজ-ওয়াজিব কিছু ছিল না। এমনকি মুস্তাহাব বলাও মুশকিল। কারণ, হাতিমকে কাবার চার দেয়ালের ভেতর নিয়ে যাওয়া, দরজা নিচে নামানো, একটির পরিবর্তে দরজা দুটো বানানো—এ কাজগুলোর মধ্যে মুস্তাহাব হওয়ার মতো কোনো কারণ উপস্থিত নেই। এগুলো স্রেফ ব্যবস্থাপনাগত বিষয়। আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্যের প্রশ্ন। বড়জোর এটুকু বলা যায়—এর কারণে ইবাদতের মধ্যে একটু সহজতা সৃষ্টি হত, তাই পরোক্ষ মুস্তাহাব। এগুলোকে যদি সরাসরি মুস্তাহাবও ধরা হয়, যেমন হাতিমকে কাবার ভেতরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি বাহ্যত এমনই মনে হচ্ছে, তাহলেও এর দ্বারা শুধু এতটুকু প্রমাণিত হয়, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৎকালীন নওমুসলিম লোকদের ফেতনা থেকে বাঁচিয়ে তাদের ইমান হেফাজত করার জন্য একটি মুস্তাহাব কাজ ছেড়ে দিয়েছেন; কিন্তু এই ঘটনা দ্বারা এটা কীভাবে প্রমাণ করা সম্ভব যে, বিশেষ কোনো কল্যাণের খাতিরে রীতিমতো ফরজ-ওয়াজিব পরিত্যাগ করা এবং বিভিন্ন পাপ কাজে লিপ্ত হওয়া জায়েজ?
এজন্যই আমরা দেখি হাফেজ ইবনে হাজার রহ. এই ঘটনাটির উপসংহার টেনে বলেন, কোনো বিষয় মৌলিকভাবে অনুত্তম হলেও জনগণের কল্যাণের খাতিরে শাসক তা বাস্তবায়ন করতে পারবে, তবে অবশ্যই হারাম কিছু হতে পারবে না।³⁷
ইমাম বুখারি রহ.-ও এ হাদিসকে কেন্দ্র করে সে অধ্যায়ের শিরোনাম দিয়েছেন এভাবে—যে ব্যক্তি ‘মানুষ না বুঝে ফেতনায় নিপতিত হবে এই ভয়ে উত্তম কোনো বিষয় বর্জন করে’। মোটকথা, বিশেষ কল্যাণের খাতিরে মুস্তাহাব কোনো কাজ তো বাদ দেওয়া যাবে; কিন্তু এর জন্য আল্লাহ তায়ালার বেঁধে দেওয়া কোনো সীমানা লঙ্ঘন করা বা শরিয়তের বিপরীত অবস্থান গ্রহণ করা কোনোভাবেই জায়েজ নেই।
এ সূত্রে কিছু ঘটনা উল্লেখ করা যাক, যেগুলো থেকে প্রমাণিত হয় নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম শরিয়তের বিধানের বিপরীতে নামসর্বস্ব কল্যাণের বিবেচনা কখনোই গ্রহণযোগ্য মনে করেননি।
১. নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত জয়নব রা.-কে বিয়ে করার ইচ্ছা করলেন। শরিয়তের দৃষ্টিতে এটা তার জন্য নিঃসন্দেহে জায়েজ ছিল। কিন্তু তৎকালের সমাজ একে অবৈধ মনে করত এবং খারাপ চোখে দেখত। তাই তাঁর মনে আশঙ্কা জাগল, সাধারণ লোকজন এ বিয়েকে কেন্দ্র করে ফেতনায় পড়ে যাবে এবং কানাঘুষা করে আপত্তিকর নানা কথা বলে নিজেদের ইমান-আমল বরবাদ করে ফেলবে। পাশাপাশি ইসলামের ব্যাপারেও তাদের মনে তৈরি হতে পারে খারাপ ধারণা। ফলে তারা দীন থেকেই দূরে সরে যাবে। এসব ভেবে তিনি বিয়ে থেকে দূরে রইলেন। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা চাইলেন মানুষের বিভ্রান্তি ও কুসংস্কার দূর হোক। তাই ক্ষুদ্র কল্যাণের বিবেচনা না করে ইসলামের বিধান প্রাধান্য দিলেন এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবহিত করে অহি নাজিল করলেন : এবং আপনি মানুষকে ভয় করছেন; অথচ আল্লাহ তায়ালাই আপনার ভয়ের অধিক দাবিদার। এরপর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জাইনাব রা.-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করিয়ে দিলেন। কারণ, তখন যদি 'লোকে কী বলবে' ভয়ে শরিয়তের বৈধ এই কাজটি পরিত্যাগ করা হত, তাহলে 'পালক পুত্রের স্ত্রী আপন পুত্রবধুর মতো নয়; পালক বাবার জন্য তাকে বিয়ে করা সম্পূর্ণ জায়েজ'—গুরুত্বপূর্ণ এই বিধানটির বাস্তব রূপ দেখা যেত না এবং মানুষের মন থেকে কুসংস্কারটিও দূর হত না। যার কারণে দীনের মধ্যে অস্পষ্টতা, অসম্পূর্ণতা ও বিকৃতি তৈরি হত।
২. কেবলা পরিবর্তনের ঘটনায় ইহুদিদের পক্ষ থেকে প্রবল বিরোধিতা ও ফেতনার আশঙ্কা ছিল। তাছাড়া এটি যেহেতু ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম কোনো 'বিধান রহিতকরণ'—এর বিষয় ছিল, ভুল বুঝে অনেকে মুরতাদ হয়ে যাওয়ার ভয়ও ছিল। কিন্তু এসব সত্ত্বেও আল্লাহ তায়ালা নবিজিকে সতর্ক করে আয়াত নাজিল করলেন—হে নবি, আপনার কাছে সত্য জ্ঞান আসার পরও যদি আপনি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করেন, তাহলে নিশ্চিতরূপেই আপনি জালেমদের অন্তর্ভুক্ত। ফলে নবিজি সেই আশঙ্কা ও কল্যাণের কথা আমলে না নিয়ে আল্লাহর নির্দেশের ওপর অটল রইলেন।
৩. নবিজির ওফাতের পরপর চারদিকে বেশ কিছু ফেতনা ছড়িয়ে পড়ল। নামে-মুসলমান যারা ছিল, ইসলাম ছেড়ে দলে দলে মুরতাদ হতে লাগল। আবু বকর রা. সবেমাত্র খলিফা হয়েছেন, শাসনকার্যে পুরোপুরি স্থির হয়ে বসার আগেই তাকে নামতে হল এসব ফেতনার মোকাবেলায়। এসবের মধ্যে সেসব লোকদের ফেতনাও ছিল, যারা বলছিল, প্রকাশ্য সম্পদের জাকাত উসুল করার হক শুধুমাত্র নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরই ছিল। তার পরবর্তী কোনো খলিফার সে অধিকার নেই। কিন্তু খলিফা আবু বকর রা. ইসলামের বিধানের প্রশ্নে ছিলেন অটল ও আপসহীন। অত্যন্ত নিষ্কম্প কণ্ঠে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদের ঘোষণা দিলেন। সে সময়ে একই সাথে কয়েক দিকে বেজে উঠল জিহাদের রণঢঙ্কা। উমর রা. বিশেষ এই সংকটের মুহূর্তে কল্যাণ বিবেচনা করে এখনই জিহাদ শুরু না করার পরামর্শ দিলেও তিনি তাতে কর্ণপাত করেননি। ইমানি চেতনা থেকে দৃঢ়চিত্তে বললেন, আমি বেঁচে থাকতে দীনের সামান্য কোনো বিকৃতিও হতে দেব না। শেষ পর্যন্ত হজরত উমর রা.-সহ অন্যান্য সাহাবাগণ স্বীকার করলেন, খলিফা আবু বকরের সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল এবং তাদের মনে যে খটকা ছিল তা দূরীভূত হয়েছে।
৪. হজরত উমর রা.-এর শাসনকালে ইসলাম গ্রহণ করেছিল গাসসানের বাদশা জাবালা ইবনে আইহাম। একবার তাওয়াফ করতে এসে মামুলি কোনো কথার জের ধরে সে এক বেদুইনকে থাপ্পড় মেরে বসে। এতে লোকটির দাঁত পড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে নালিশ গেল উমরের দরবারে। তিনি কিসাসস্বরূপ বাদশার দাঁতও ফেলে দেওয়ার ফরমান জারি করলেন। বোঝাই যাচ্ছিল নওমুসলিম বাদশা নিজের এ অপমান মেনে নিতে পারবে না। ফলে, ইসলামের স্বার্থেই তার সাজাটি তখন মওকুফ করার প্রয়োজন ছিল। উমরের মতো মানুষ চাইলে সে বেদুইন লোকটিকে বুঝিয়ে-সমঝিয়ে মোকদ্দমাটি শেষ করে দিতে পারতেন। কারণ, একটা দেশের রাষ্ট্রপ্রধান মুসলমান হওয়াতে তৎকালে ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু শরিয়তের বিধানের প্রশ্নে খলিফা উমর ছিলেন অনড়। সাজা মওকুফ করার কথা তার মনে জাগেনি। ইসলামের ফয়সালাটি সোজা শুনিয়ে দিলেন—আহত লোকটি থেকে ক্ষমা নিয়ে নাও, না হয় কেসাস আমি নেবই। বাদশা বিপাকে পড়ে চিন্তাভাবনার জন্য কিছু সময় চেয়ে নিল এবং রাতে রাতেই মুরতাদ হয়ে পালিয়ে গেল。
ঘটনাগুলো থেকে আমরা এ শিক্ষাটিই পাই—বিশেষ কোনো কল্যাণের কথা ভেবে কোনো অবস্থাতেই গুনাহের কাজে লিপ্ত হওয়া যাবে না। রদবদল করা যাবে না শরিয়তের সামান্য কোনো বিধানের মধ্যেও।
অবশ্য, শরিয়তে একটি মূলনীতি রয়েছে—বড় কোনো বিপদ থেকে বাঁচার লক্ষ্যে ছোট কোনো বিপদ মেনে নেওয়া হয়। যেমন, কোনো ব্যক্তি নামাজে দাঁড়ানোর পর দেখতে পেল অন্ধ এক লোক পথ ভুল করে কুয়ায় পড়ে যাচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে নামাজ ভাঙা গুনাহের কাজ হলেও এই পরিস্থিতিতে তা করা আবশ্যক ও ফরজ। নামাজ ছেড়ে দিয়ে অন্ধ লোকটিকে বাঁচাতে হবে। এখানে নামাজ ভঙ্গ করার মতো ছোট বিষয়টিকে মেনে নেওয়া হয়েছে বড় বিপদটি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই। ফিকহের ভাষায় একে বলা হয়-'আহওয়ানুল বালিইয়্যাতাইন' বা দুই বিপদের ছোটটিকে গ্রহণ করা।
বিবেক, বুদ্ধি ও শরিয়তের সরাসরি বক্তব্য এবং অভিজ্ঞতা বলে—আল্লাহ তায়ালার নাফরমানি করে মুসলিম জাতি কখনোই সফল হতে পারবে না। এ পথে কাফেররা যে সফলতা পায়, এ দিয়ে মুসলমানদের পরিমাপ করা ভুল চিন্তা। কারণ, কাফের ও মুসলমানদের সত্তাগত রুচি ও প্রবণতার মাঝে আসমান-জমিন ব্যবধান। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে—একটি ওষুধ একজনের জন্য কার্যকর কিন্তু স্বভাব ও রুচির ব্যবধানের কারণে অপরজনের জন্য ক্ষতিকর। প্রসিদ্ধ একটি ঘটনা আছে—একজন মেথর লোক আতরের দোকানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তার মস্তিষ্ক যেহেতু পূর্ব থেকে মনুষ্য মলের দুর্গন্ধে প্রীত ও অভ্যস্ত হয়ে আছে, তাই আতরের সুগন্ধ বরদাশত করতে পারেনি। বেহুঁশ হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। এটা-ওটা নানা রকমের চিকিৎসা করেও কিছুতে কিছু হল না। একসময় তার ভাইয়ের কাছে সংবাদ পৌঁছলে সে তৎক্ষণাৎ একটি শিশিতে ভরে এক শিশি মল এনে তার নাকে ধরল এবং বেহুঁশ লোকটি সাথে সাথে চোখ মেলে তাকাল।
ঠিক এভাবে কাফের ও ফাসেকদের মস্তিষ্ক গুনাহের কদর্যতায় লেপ্টে আছে, এজন্য হারাম ও নাজায়েজ কাজের দুর্গন্ধ তাদের জন্য খুব উপকারী। কিন্তু মুসলমান সে তুলনায় শাহজাদার মতো। তার মস্তিষ্ক খুব পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র। তার জন্য ইসলামের বিধানাবলির সুগন্ধই শুধু উপকারী হয়। কোনো শাহজাদা যদি এমন পরিস্থিতিতে পড়ে আর বোকা কোনো লোক তাকে মেথরের ওপর বিবেচনা করে মলের দুর্গন্ধ শুঁকিয়ে দেয়, তাহলে তার মস্তিষ্ক আরও গড়বড় হয়ে যাবে।
উহুদ যুদ্ধের ঘটনাই দেখুন—মুসলমানরা কাফেরদের বিরুদ্ধে জয়ী হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু একটি ইজতেহাদি ভুলের কারণে জয়টি পরাজয়ে রূপান্তরিত হল। আল্লাহ তায়ালা আয়াত নাজিল করলেন :
"আল্লাহ তোমাদের সাথে তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছিলেন যখন তোমরা আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাদের বিনাশ করছিলে, যে পর্যন্ত না তোমরা সাহস হারালে এবং নির্দেশ সম্বন্ধে মতভেদ সৃষ্টি করলে এবং যা তোমরা ভালোবাসো তা তোমাদের দেখানোর পর তোমরা অবাধ্য হলে। তোমাদের কেউ ইহকাল চাচ্ছিল আর কেউ পরকাল চাচ্ছিল। অতঃপর তিনি পরীক্ষা করার জন্য তোমাদেরকে তাদের হতে ফিরিয়ে দিলেন। অবশ্য তিনি তোমাদের ক্ষমা করলেন এবং আল্লাহ মুমিনদের প্রতি অনুগ্রহশীল।"³⁸
সাহাবায়ে কেরাম যদিও হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সোহবতপ্রাপ্ত ছিলেন এবং তাদের নিয়তের মধ্যে দুনিয়া অর্জনের কোনো লোভ ছিল না, তবু তাদের এই গবেষণা ও ধারণাগত ভুলটিই বিজয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।³⁹
জিহাদ, রাষ্ট্র পরিচালনা ও অন্যান্য রাজনৈতিক কার্যাবলিতে সফলতা লাভ করার মূল শর্তই হল সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ-নির্দেশিত পন্থায় করতে হবে, তাঁর নাফরমানি থেকে বেঁচে থাকতে হবে।
ইবনে আব্বাস রা. বলেন, আয়াতের (৬:১২৯) ব্যাখ্যা হল—কোনো জাতির (পাপাচারের কারণে) আল্লাহ যখন তাদের শাস্তি দিতে চান, তাদের ওপর নিকৃষ্ট শাসকদের চাপিয়ে দেন।⁴⁰
মালেক ইবনে দিনার রহ. বলেন, আমি জবুর কিতাবে এই কথাটি পড়েছি—আমি মুনাফিকদের দিয়ে মুনাফিকদের থেকে প্রতিশোধ নিই, এরপর সকল মুনাফিককে ধ্বংস করি।⁴¹
ইমাম আমাশ রহ. বলেন, আমি বড়দের থেকে এই আয়াতের ব্যাখ্যাটি শুনেছি, তারা বলেছেন, আল্লাহ বলছেন—মানুষ যখন খারাপ হয়ে যায়, আমি নিকৃষ্ট লোকদের তাদের শাসক বানিয়ে দিই।⁴²
মালেক ইবনে দিনার রহ.-এর উক্তিটি ইবনে আবি হাতিম ও আবুশ শায়খ রহ.-ও বর্ণনা করেছেন।⁴³ একই রেফারেন্সে ইমাম হাকিম তার ইতিহাসগ্রন্থে এবং ইমাম বায়হাকি শুআবুল ইমান গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন—নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা যেমন, তোমাদের শাসকও তেমনই হবে।⁴⁴
একবার হজরত হাসান বসরি রহ. শুনতে পেলেন, এক লোক হাজ্জাজের বিরুদ্ধে বদদোয়া করছে। তখন তিনি বললেন : না, এটা করবে না। তোমরা পাপাচারের মাধ্যমে হাজ্জাজকে নিয়ে এসেছ। আমার আশঙ্কা হয়, হাজ্জাজ যদি পদত্যাগ করে বা মারা যায়, তাহলে বানর আর শুকরকে তোমাদের শাসক হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হবে।⁴⁵
ইমাম বায়হাকি রহ. কাব আল-আহবার রহ. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন—প্রতি যুগে মানুষের অন্তরের অবস্থা অনুপাতে আল্লাহ তায়ালা একজন শাসক নিযুক্ত করেন।⁴⁶
ইমাম বায়হাকি রহ. হজরত হাসান রহ. থেকে বর্ণনা করেন—বনি ইসরাইলের লোকজন একবার মুসা আ.-এর কাছে গিয়ে আবদার করল—আল্লাহ তায়ালা আমাদের ওপর কখন সন্তুষ্ট থাকেন আর কখন অসন্তুষ্ট থাকেন, এটা আমরা বুঝতে পারি মতো। মুসা আ. সে অনুযায়ী আল্লাহ তায়ালার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন: তাদের বলে দিন—আমি যখন তাদের ওপর সন্তুষ্ট থাকি, তখন সবচেয়ে ন্যায়পরায়ণ উত্তম মানুষটিকে তাদের শাসনকর্তা বানাই; কিন্তু যখন অসন্তুষ্ট হই, তখন শাসক বানাই সবচেয়ে নিকৃষ্ট জালেম ব্যক্তিটিকে।⁴⁷
ইমাম বায়হাকি রহ. উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, আমার কাছে বর্ণনা করা হয়েছে—মুসা অথবা ইসা আলাইহিস সালাম জিজ্ঞেস করলেন, প্রভু! সৃষ্টিকুলের প্রতি আপনার সন্তুষ্ট থাকার আলামত কী? তিনি বললেন, আমি যখন তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকি, তখন তাদের ফসল বোনার সময় বৃষ্টিপাত করি এবং ফসল কাটার সময় তা বন্ধ রাখি; সবচেয়ে জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান লোককে তাদের শাসক বানাই।⁴⁸
হজরত আবু দারদা রা. নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন—আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি আল্লাহ। আমি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আমি সমস্ত বাদশার মালিক—বাদশাদের বাদশা। সকল শাসকের অন্তর আমার হাতে। বান্দারা যখন আমার বাধ্য হয়ে থাকে, আমি বাদশাদের হৃদয়ে তাদের প্রতি মমতা ও ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিই; কিন্তু তারা যখন আমার অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়, আমি শাসকদের হৃদয়ে তাদের প্রতি ক্ষোভ ও ঘৃণা ঢেলে দিই।⁴⁹ তাবরানির বর্ণনায় মাজমাউজ জাওয়ায়েদেও এমনটি উল্লেখ করা হয়েছে।⁵⁰
আল্লাহ তায়ালা যখন কোনো সম্প্রদায়ের ওপর রাগান্বিত হন, তাদের ভূমিধস ও শরীর বিকৃত করে শাস্তি দেন না; শাস্তি দেন দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়িয়ে, বৃষ্টি বন্ধ করে দিয়ে এবং সবচেয়ে নিকৃষ্ট লোককে তাদের শাসক হিসেবে চাপিয়ে দিয়ে।⁵¹
মাজমাউজ জাওয়ায়েদে হজরত জাবের রা. থেকে বর্ণিত, তিনি একে মারফু হিসেবে উল্লেখ করেছেন— আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি যাদের ওপর ক্রুদ্ধ হই, তার থেকে প্রতিশোধ নিই আমার ক্রোধে নিপতিত অন্য লোকদের দিয়ে, এরপর উভয় দলকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করি।⁵²
আবু উমামা রা.-এর সূত্রে বর্ণিত—তোমরা শাসকদের গালি দিয়ো না; বরং দোয়া করো তারা যেন সংশোধিত হয়ে যায়।⁵³
তোমরা তোমাদের হৃদয়কে শাসককে গালি দেওয়ার কাজে লিপ্ত কোরো না; বরং তাদের জন্য কল্যাণের দোয়া করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করো।⁵⁴
ইমাম ইবনে আবু শায়বা মালেক ইবনে মিগওয়াল থেকে বর্ণনা করেন—দাউদ আ.-এর জবুর কিতাবে লিখিত আছে, আল্লাহ বলেছেন: আমিই আল্লাহ। আমি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আমি বাদশাদের বাদশা। পৃথিবীর সকল শাসকের হৃদয় আমার মুঠোয়।⁵⁵
হজরত আলি রা. থেকে বর্ণিত, নবিজি স. বলেছেন, মুসলমান যখন আলেমদের ঘৃণা করতে শুরু করবে, মার্কেটে বিশাল বিশাল ভবন নির্মাণ করবে, সম্পদ লাভের জন্য বিয়ে করবে, আল্লাহ তাদের ওপর চার ধরনের আজাব পাঠাবেন—দুর্ভিক্ষ, জালেম শাসক, খেয়ানতকারী বিচারক ও শত্রুর আক্রমণ।⁵⁶
আবদ ইবনে হুমাইদ হজরত মুআজ ইবনে জাবাল রা. থেকে বর্ণনা করেন, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হয় তোমরা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে বারণ করার দায়িত্ব পালন করবে, না হয় আল্লাহ তোমাদের ওপর নিকৃষ্ট লোকদের শাসকরূপে চাপিয়ে দেবেন।⁵⁷
হজরত আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে আখেরাতের ধ্যানে মশগুল হয়ে থাকে, আল্লাহ তার হৃদয় ধনী বানিয়ে দেন, তার সকল পেরেশানি দূর করে দেন এবং পৃথিবী তার পায়ের কাছে এসে পড়ে থাকে; কিন্তু যে রাতদিন দুনিয়া নিয়ে পড়ে থাকে, আল্লাহ তার চারদিকে দারিদ্র্য সেঁটে দেন।⁵⁸
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, নবিজি স. বলেছেন—যখন কিছু চাইবে, কেবল তাঁর কাছে চাইবে। যখন কোনো সাহায্য প্রার্থনা করবে, শুধুমাত্র তাঁর কাছেই প্রার্থনা করবে। মনে রেখো, পৃথিবীর সকলে মিলে যদি তোমাকে কোনো সাহায্য করতে চায়, তাহলে কেবল সেটুকুই করতে পারবে, যেটুকু তিনি তোমার জন্য লিখে রেখেছেন।⁵⁹
হজরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, নবিজি স. বলেন—আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, বান্দা যদি আমার অনুগত হয়ে চলত, তাহলে আমি তাদের রাতের বেলা বৃষ্টি দিতাম, দিনের বেলা সূর্য উঠত।⁶⁰
হজরত আবু জর গিফারি রা. থেকে বর্ণিত, নবিজি স. বলেন, আমি একটা আয়াত জানি, মানুষ যদি তা আঁকড়ে ধরত, তবে তাদের আর কোনো পেরেশানি থাকত না। তিনি বললেন : যে আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তাকে কোনো না কোনো মুক্তির পথ বের করে দেবেন।⁶¹
হজরত হানজালা আল-আসলামি রা. বলেন, একবার আবু বকর রা. খালেদ ইবনে ওয়ালিদকে মুরতাদদের কাছে পাঠালেন। বলে দিলেন, তুমি তাদের পাঁচটি বিষয়ে আহ্বান করবে।⁶²
আবু বকর রা.-এর সময়ে 'আজনাদাইন'-এ রোমকদের সাথে ভীষণ এক যুদ্ধ হল। সব শুনে সেনাপতি বলল, তোমার কথা যদি সত্য হয়, তাহলে পৃথিবীর বুকে এমন বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে মাটির নিচে চলে যাওয়া উত্তম।⁶³
হজরত আবু বকর রা. ইয়ারমুকের যুদ্ধের সময় সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ রা.-কে তার সফলতার জন্য শুভেচ্ছা-বাণী পাঠিয়ে সাথে এই নসিহতটিও করেছিলেন, তোমাদের হৃদয়ে কখনো যেন আত্মগর্ব ও মুগ্ধতা না আসে।⁶⁴
হজরত উমর রা. সাদ রা.-কে Iraqi যুদ্ধের দায়িত্ব দিয়ে বললেন, আল্লাহর সামনে বংশ মর্যাদার কোনো গুরুত্ব নেই। তিনি শুধু দেখেন কার তাকওয়া ও আনুগত্য কেমন।⁶⁵
হজরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা. বলেন, আমি বিশটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। একটি গর্বের কথা মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল। আর বিপদ তো কথার পিঠেই লুকিয়ে থাকে, এখানেও তা-ই হল।⁶⁶
সাদ রা. বলেন, আল্লাহর কসম, আল্লাহ নিশ্চয়ই তাঁর বন্ধুকে সাহায্য করবেন, তাঁর দীনকে বিজয়ী করবেন, যদি সৈন্যবাহিনীতে পুণ্যের চেয়ে পাপ ও অবাধ্যতার পরিমাণ বেশি না হয়।⁶⁷
হাজ্জাজের এই কথা শুনে তারা বললেন, তাদের অন্তরে কী ছিল তা তো আমরা জানি না; তবে বাহ্যিকভাবে আমরা যা দেখেছি, এমন দুনিয়াবিমুখ লোকজন ইতঃপূর্বে আমরা আর পাইনি।⁶⁸
বাদশা হেরাক্লিয়াস বলল, তুমি যা শোনালে, তা-ই যদি সত্য হয়, তাহলে অচিরেই তারা আমার দাঁড়ানোর এই জায়গাটিও কবজা করবে।⁶⁹
সিংহের আত্মসমর্পণ
ইবনুল মুনকাদির থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোলাম সাফিনা রা. সিংহকে বললেন, হে সিংহ, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গোলাম। এ কথা শুনে সিংহটি অনুগত হয়ে তাকে নিয়ে চলতে লাগল এবং রাস্তা চিনিয়ে মুসলিম বাহিনীর কাছে পৌঁছে দিল।⁷⁰
বশীভূত হল বনের পশুরা
হজরত উকবা রা. সাহাবিদের একত্র করলেন। তিনি ডাক দিয়ে বললেন, হে জঙ্গলের কীটপতঙ্গ ও হিংস্র পশুর দল, আমরা আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবি। আমরা এখানে অবস্থান করব। তোমরা অন্য কোথাও চলে যাও। এরপর মানুষ খুবই অদ্ভুত এক কাণ্ড ঘটতে দেখল। দেখল হিংস্র পশু, বাঘ ও সাপের নিজেদের বাচ্চা মুখে মুখে নিয়ে দলে দলে বেরিয়ে যাচ্ছে।⁷¹
মাদায়েন ও কিসরার রাজ্যজয়
পানির ওপর দিয়ে লোকগুলো যখন ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে, তারা বলতে লাগল—দানব! দানব! সে তেলাওয়াত করল "আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো প্রাণ মৃত্যুবরণ করতে পারবে না।"⁷² নদীতে তারা এমনভাবে চলতে লাগলেন, মনেই হয় না নদী; মনে হয় যেন সমতল ভূমিই।
সাদা প্রাসাদে বিজয়ের শুকরিয়াস্বরূপ আট রাকাত নামাজ আদায় করলেন। সাদ এই আয়াতটি তেলাওয়াত করছিলেন : "কত তারা ছেড়ে গিয়েছে উদ্যান ও প্রস্রবণ, আর শস্যক্ষেত্র ও মনোরম স্থান।"⁷³
আলা হাজরামি রা.-এর অব্যর্থ দোয়া
হজরত আলা রা. দু রাকাত নামাজ পড়ে দোয়া করলেন। সমুদ্র পাড়ি দিলেন। আবু হুরায়রা রা. বলেন, আমরা পানির ওপর দিয়ে যাচ্ছিলাম, কিন্তু আল্লাহর কসম, না আমাদের পা ভিজেছে, না মোজা, এমনকি ঘোড়ার ক্ষুর পর্যন্ত ভেজেনি।⁷⁴
কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা বলছেন, "আর যে আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করবে অতঃপর সে নিহত হোক কিংবা বিজয়ী, অচিরেই আমি তাকে দেব মহা পুরস্কার।"⁷⁵
"বলো, 'তোমরা কেবল আমাদের জন্য দুটি কল্যাণের একটির জন্য অপেক্ষা করছ..."⁷⁶
"নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাদের জানমাল ক্রয় করে নিয়েছেন (এর বিনিময়ে) যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত।"⁷⁷
টিকাঃ
৩৬. রদ্দুল মুহতার, ১:৬৬৩
৩৭. ফাতহুল বারি, ১:১৯৯
৩৮. সুরা আলে ইমরান : ১৫২
৩৯. অনুবাদকের নোট: সাহাবাদের ঘাঁটি ছেড়ে আসার বিষয়টি নির্দেশ অমান্য ছিল না, বরং তাদের ইজতেহাদি ভুল ছিল।
৪০. আল-বাহরুল মুহিত, ৪: ২২২
৪১. তাফসিরে ইবনে কাসির, ২: ১৭৬
৪২. আদ-দুররুল মানসুর, ৩:৪৬
৪৩. প্রাগুক্ত
৪৪. বায়হাকি রহ. বলেছেন, হাদিসটি মুনকাতি এবং বর্ণনাকারী ইয়াহইয়া দুর্বল।
৪৫. আল-মাকাসিদুল হাসানা : ৩২৬
৪৬. আদ-দুররুল মানসুর, ৩:৪৬
৪৭. প্রাগুক্ত
৪৮. প্রাগুক্ত
৪৯. হিলয়াতুল আউলিয়া, ২:৩৮৮
৫০. আল-ইতিদাল: ৮৪
৫১. আল-জামিউস সগির, ১:৬৬
৫২. আল-ইতিদাল: ৮৬
৫৩. আল-জামিউস সগির, ২:১৯৯
৫৪. প্রাগুক্ত, ২:২০০
৫৫. প্রাগুক্ত
৫৬. মুস্তাদরাকে হাকিম, ৪:৩২৫
৫৭. আদ-দুররুল মানসুর, ২:৩০০
৫৮. তিরমিজি, আবওয়াবু সিফাতিল কিয়ামা
৫৯. আহমদ, তিরমিজি (মেশকাত, তাওয়াক্কুল ও সবর অধ্যায়)
৬০. আহমদ (মেশকাত, তাওয়াক্কুল ও সবর অধ্যায়)
৬১. আহমদ, ইবনে মাজাহ, দারেমি (মেশকাত, তাওয়াক্কুল ও সবর অধ্যায়)
৬২. খামিস, ২:২০৫
৬৩. প্রাগুক্ত, ২:২৩৫
৬৪. প্রাগুক্ত, ২:২২৯
৬৫. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭:৩৫
৬৬. খামিস, ২:২১৬
৬৭. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ২:৬৫
৬৮. ইবনুল আসিরকৃত আল-কামিল, ২:৪৫৪
৬৯. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭:৫৩; তাবারি, ৩:৯৯
৭০. মেশকাত: ৫৪৫
৭১. মুজামুল বুলদান, ৪:৪২০
৭২. সূরা আলে ইমরান: ১৪৫
৭৩. সুরা দুখান : ২৫-২৮
৭৪. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, 7:64; তাবারি, ১:১১৯
৭৫. সুরা নিসা : ৭৪
৭৬. সুরা তওবা : ৯
৭৭. সুরা তওবা : ১১১