📄 রাজনৈতিক পাবলিসিটির প্রচলিত রূপ
বর্তমান রাজনীতিতে পাবলিসিটি ও প্রোপাগান্ডা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে পশ্চিমের বিখ্যাত রাজনীতিক গোয়েবলস-এর নীতিটি মান্য করা হয় : মিথ্যা খুব জোরেসোরে লাগাতার বলতে থাকো, মানুষ একসময় একে সত্য বলে ধরে নেবে।
বর্তমানের সরকার ও ধর্মহীন রাজনৈতিক দলগুলো তো এ নীতি অনুসরণ করছেই, কিন্তু দুঃখজনক হল অনেক সময় ইসলামিক দলগুলোও পরিবেশ-পরিস্থিতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এ নীতির ওপর উঠে আসছে। হয়তো তারা এর জায়েজ হওয়া না-হওয়া নিয়ে ভাবছেই না, অথবা এখানেও সেই চিন্তাটিই লালন করছে— রাজনীতিকে শুদ্ধ করার এ অভিযানে এমন ছোট ছোট বিষয়গুলো থেকে একটু- আধটু চোখ বন্ধ করে রাখতেই হবে।
মিথ্যা বলা তো হারামই। এ নিয়ে আর সন্দেহ কী! কিন্তু এ নিয়ে যেন কেউ ভাবছেই না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য বৈধ কারণ ছাড়া গিবত করা, তাদের বিরুদ্ধে নাজায়েজ কথা বলা, অপবাদ আরোপ করা, যাচাই না করেই প্রোপাগান্ডা ছড়ানো, বা তত্ত্বতালাশ না করে সেসব বিশ্বাস করা—এ সবকিছু আমাদের ইসলামিক দলগুলোর মধ্যেও প্রবেশ করে বসে আছে, সচেতনে বা অবচেতনে। পরিণতিতে অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলা, দলবাজি ও হানাহানি বাড়ছেই শুধু। হাকিমুল উম্মত রহ. বিভিন্ন বক্তব্যে এমন কর্মকাণ্ড নাজায়েজ ও অবশ্যই পরিত্যাজ্য ঘোষণা করেছেন।
এমনিভাবে, সভাসমাবেশও জনগণ পর্যন্ত নিজেদের বক্তব্য পৌঁছানোর মাধ্যম হিসেবে খুবই জনপ্রিয়। কিন্তু এখানেও অনেক সময় শরয়ি বিধিবিধানের তোয়াক্কা করা হয় না। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, যখন কোনো কৌশল কুরআন-হাদিসে বর্ণিত সুস্পষ্ট কৌশলের বিরুদ্ধে যায়, তখন তা তো নিষিদ্ধই। বিশেষ করে সেটি যখন অনর্থক ও ক্ষতিকর হয়, তখন তা নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে কী সন্দেহ! এখানে তো 'শরিয়ত সমর্থিত প্রয়োজন নিষিদ্ধ কাজকে প্রয়োজন অনুপাতে বৈধ করে দেয়' মূলনীতিটিও প্রয়োগ হওয়ার সুযোগ নেই। যেমন হরতাল, সভাসমাবেশ। এগুলোতে অযথা সময় নষ্ট হয়, পয়সা খরচ হয়, দরিদ্র মানুষকে অন্যায় দুর্ভোগ পোহাতে হয়, নামাজের সময় পেরিয়ে যায়—কেউ টেরও পায় না। এত সব স্পষ্ট গুনাহের কাজ থাকার পরও তা কীভাবে জায়েজ হতে পারে? একজন জিজ্ঞেস করল, যদি এসবে অংশগ্রহণ করা দ্বারা হক ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা উদ্দেশ্য হয়, তাহলে? জবাবে তিনি বললেন, এসবের দ্বারা হক ও ইনসাফকে সাহায্য করা হয় না। দ্বিতীয় কথা হল—কোনো নাজায়েজ কাজ নিয়তের দ্বারা জায়েজ হয়ে যায় না।²⁵
অন্য আরেক জায়গায় প্রচলিত রাজনৈতিক কর্মপন্থার ব্যাপারে নিজের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গিটি আরও পরিষ্কার ভাষায় তুলে ধরেছেন। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল—যারা সরকারের মোকাবেলা করতে যান, এরপর গ্রেফতারও হন, আবার পালটা কিছু করেনও না। এক ধরনের নীরব লড়াই। সরকার যদি জুলুম ও নিপীড়ন চালায়, তখনো পালটা প্রতিরোধের জন্য বিশেষ কিছু করে না। আগের মতোই—প্রতিবাদ করো, জেলে যাও, তারপর আবার প্রতিবাদ করো—এভাবে চলতে থাকে। এ ব্যাপারে শরিয়তের বক্তব্য কী?
জবাবে তিনি বলেছিলেন, আমাদের বিবেচনায় এখানে দুটো পথই শুধু দেখি: হয় মোকাবেলা করার শক্তি আছে, না হয় নাই। যদি শক্তি থাকে, তাহলে গ্রেফতার হবে কেন? তার জন্য উচিত জানপ্রাণ দিয়ে লড়াই ও প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়া। তা যদি না পারে, তাহলে বোঝাই যাচ্ছে এটা হল অক্ষমতা ও অপারগতার কাল। এমন সময়ে স্বেচ্ছায় নিজেকে জুলুমের মুখে ফেলা, কারাগারে বন্দি হওয়া, শরিয়তে এসবের অনুমতি নেই; বরং এমন নিষ্ফল অক্ষম মোকাবেলার পরিবর্তে সবর করা উচিত। মোটকথা দাঁড়াল এই—শক্তি থাকলে প্রতিরোধ করো, না থাকলে সবর করো। এর বাইরে তৃতীয় কোনো পথের কথা শরিয়তে বর্ণিত নেই।
সামনে গিয়ে বললেন, এই সময়ে মুসলমানদের ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় কারণ—তাদের নেতৃত্বে বড় কেউ নেই এবং কেন্দ্রীয় কোনো শক্তি নেই। আর হওয়া সম্ভবও নয়, যদি না ঘটনাক্রমে সকলে মিলে বড় কাউকে নেতৃত্বের আসনে বসায়। ইমাম ছাড়া কিছুই হবে না। এমন একজন ইমাম যদি মিলে যায়, সবই হবে। তার নির্দেশে ময়দানে যাবে, জান দিতে হলে দেবে, কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এটা কেমন, প্রস্তুতি ছাড়া বসে থেকে হঠাৎ গিয়ে প্রাণ দিয়ে আসে? এটা কোনো মনুষ্যত্ব হল? সুতরাং, মূল কথা সেই ওপরেরটাই—সর্বোত্তম তিন যুগে যে পথটি অনুসরণ করা হয়েছে—শক্তি থাকলে লড়ো, না হয় সবর করো। বাকি সব মনগড়া পদ্ধতি। এজন্যই এসবে কোনো কল্যাণ হতে পারে না। আর কল্যাণ না থাকলে এসব পথে মুসলমান কখনো বাহ্যত সফল হলেও সে সফলতার কী দাম! আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সন্তুষ্টির বাইরে বাহ্যিক এ সফলতার কোনো মূল্য নেই। এমন অপূর্ণ সফলতা তো কাফেররাও পেতে পারে। মুসলমানদের সত্যিকারের সফলতা তো এটিই—গোলাম হয়ে থাকলেও আল্লাহর সন্তুষ্টি নিয়ে থাকবে। যদি এমন হয়—রাষ্ট্রক্ষমতা পেলে, কিন্তু আল্লাহ সন্তুষ্ট হলেন না, তাহলে এ ক্ষমতা আর ফেরাউনের রাজত্বে পার্থক্য রইল কই? সুতরাং, আল্লাহকে খুশি করার চেষ্টা করো, তাঁর সাথে সত্যিকারের সম্পর্ক তৈরি করো, ইসলাম ও শরিয়তের বিধিবিধান মেনে চলো। ওই সমস্ত মূর্তির পূজা তো অনেক হল, এবার আল্লাহর সামনে মাথা রেখেও দেখো কী হয়।²⁶
টিকাঃ
২৫. আল-ইফাদাতুল ইয়াউমিয়া, ৫:১৩৬, মালফুজ নং: ১৫২
২৬. আল-ইজাফাতুল ইয়াউমিয়া, ৫:১৬৮-১৬৯, মালফুজ নং: ১৯০
📄 শাসকদের সাথে আচরণপদ্ধতি
ইসলাম মূল জোরটি দিয়েছে এ কথার ওপর যে, মুসলমান যে অবস্থায়ই থাকুক, সবসময় শরিয়ত মেনে চলবে। যদি শাসকের পক্ষ থেকে শরিয়তের খেলাফ কোনো কাজের আদেশ জারি করা হয়, তাহলে তা মানা আবশ্যক নয়। সুস্পষ্টভাবে নিরুপায় হওয়ার আগ পর্যন্ত শরিয়ত মেনে চলতে হবে। তা মানতে গিয়ে যত কষ্টই হোক, সবর করবে। আল্লাহ তায়ালা তাকে এই সবরের প্রতিদান দান করবেন। এমনিভাবে শাসক যদি শরিয়তের খেলাফ কোনো কাজ করে, তাহলে সমস্ত শর্ত মেনে সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে বারণ করার দায়িত্বটিও পালন করে যেতে হবে এবং প্রয়োজনের সময় তার সামনে সত্য প্রকাশের সৎ সাহসও দেখাতে হবে।
হাদিস শরিফে একে 'সর্বোত্তম জিহাদ' আখ্যায়িত করা হয়েছে। এই সমস্ত কাজ সম্পূর্ণ শরিয়তসম্মত, শর্ত হল শরিয়তের বেঁধে দেওয়া সীমানা লঙ্ঘন করা যাবে না। এ কাজের উদ্দেশ্য থাকবে একমাত্র আল্লাহ তায়ালাকে সন্তুষ্ট করা এবং দীন ইসলামের প্রচার ও সাহায্য করা। শুধুমাত্র নিজের বাহাদুরি দেখানো, মানুষের হাততালি পাওয়া এবং নেতৃত্ব লাভ করার লোভ থাকলে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।
কিন্তু হাল জামানার রাজনীতির ময়দানে এ বিষয়টিতেও প্রচণ্ড প্রান্তিকতা দেখা যায়। সরকার দলীয় বা সরকারপন্থি মানুষেরা চোখ বন্ধ করে একচেটিয়া সরকারের প্রশংসা করে, ন্যায়-অন্যায় না দেখে সকল কাজেই সমর্থন জানায়, বিরোধীদের অন্যায়ভাবে দমনের কাজে সহযোগিতা করে। সরকারের নানা জুলুম-নির্যাতন দেখেও এ ব্যাপারে মুখে তালা লাগিয়ে বসে থাকে আর সাফাই গেয়ে নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দাঁড় করে। এটা সুস্পষ্ট চাটুকারিতা। কেউ কেউ তো সরকারকে বাঁচাতে গিয়ে দীন বিকৃত করতেও পিছপা হয় না। অপরদিকে যারা বিরোধীদলীয় বা সরকারবিরোধী লোক, তাদের কাজের লক্ষ্যই পরিবর্তন হয়ে যায়। ন্যায় ও ইনসাফের বাস্তবায়ন নয়, সরকারবিরোধিতাই তাদের মূল কাজ। সরকারবিরোধিতা তাদের কাছে একটি রাজনৈতিক ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। তাদের বিশেষ দায়িত্বই হয়ে দাঁড়ায়—সরকার ভালোমন্দ যা-ই করুক, আমাদের বিরোধিতা করতে হবে। তাদের কোনো ভালো কাজের স্বীকৃতি দিতে মোটেও প্রস্তুত নয়।
এসব করার দ্বারা বেশির ভাগ সময় তাদের মূল লক্ষ্যই থাকে নিজেদের জন্য নেতৃত্ব ছিনিয়ে নেওয়া এবং জনগণ থেকে বাহবা অর্জন করা। জনগণের মধ্যে এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তারা সুযোগ পেলেই সরকারকে গালি দেয়, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, বদনাম করে। সভাসমাবেশে সরকারদলীয় নেতাদের এমনকি কুকুর-শুকর বানিয়ে তাদের বিরুদ্ধে তুমুল স্লোগান তোলা হয়। রাজনৈতিক সমাবেশে আয়োজন করে শাসকদের কথা ওঠানো হয়, এরপর তাদের বিরুদ্ধে শুরু হয় নিন্দা আর গালমন্দের ঝড়। বৈধ কোনো কারণ না থাকায় এটি গিবত তো হয়ই, অনেক সময় মিথ্যা অপবাদ পর্যন্ত গিয়ে গড়ায়। কিন্তু সবাই ধরে নেয় ফাসেক শাসকদের নিন্দা করা গিবতের অন্তর্ভুক্ত নয়। হাকিমুল উম্মত রহ. এই কর্মপদ্ধতির সমালোচনাও করেছেন।
তিনি বলেন, হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ এই উম্মতের সবচেয়ে বড় প্রসিদ্ধ জালেম। কিন্তু এক বুজুর্গের মজলিসে একজন তার ওপর একটি মিথ্যা অপবাদ দিলে তিনি নাখোশ হয়ে বললেন, সে যদিও জালেম ও ফাসেক; কিন্তু তার সাথে আল্লাহ তায়ালার আলাদা কোনো দুশমনি নাই। তিনি যেমনিভাবে হাজ্জাজ থেকে অন্য মজলুমদের প্রতিশোধ নেবেন, তেমনই হাজ্জাজের ওপর জুলুম হলে এর বিচারও তিনি করবেন।²⁷
এ ছাড়াও হজরত থানবি রহ. কয়েক জায়গায় পরিষ্কার বলেছেন, প্রয়োজন ছাড়া প্রকাশ্যে শাসকদের অপমান করা শরিয়তের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয়। তিনি বলেন, ইসলামি শাসকদের প্রকাশ্যে অপমান করলে জনগণের ক্ষতি হয়। সরকারের ভাবগাম্ভীর্য নষ্ট হয়ে গেলে দেশে নানা ফেতনা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এজন্য তাদের সম্মান করা উচিত।²⁸
হাকিমুল উম্মতের এই কথাটি মূলত নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাদিসের ব্যাখ্যা। হজরত ইয়াদ ইবনে গুনম রা. বর্ণনা করেন— নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো ক্ষমতাবান বা নেতৃত্বস্থানীয় লোককে নসিহত করতে চায় সে যেন তা প্রকাশ্যে না করে; বরং, সে তার হাত ধরে গোপন কোথাও নিয়ে যাক, এরপর সে যদি নসিহত কবুল করে, তাহলে তো ভালো; অন্যথায় সে তার দায়িত্ব আদায় করেছে।²⁹
অন্য আরেকটি বয়ানে তিনি বলেন, অনেক মানুষ বিপদাপদে নিরাশ ও হতোদ্যম হয়ে সরকারকে গালমন্দ করতে শুরু করে। এটিও ধৈর্যহীনতার পরিচয়। পছন্দনীয় কোনো আচরণ নয়। হাদিস শরিফেও এটি করতে নিষেধ করা হয়েছে। নবিজি বলেছেন, তোমরা শাসকদের গালি দিয়ো না। তাদের হৃদয় আমার (আল্লাহর) হাতে। আমার অনুগত হয়ে চলো, আমি তাদের হৃদয় তোমাদের ওপর নরম করে দেব।³⁰
যে হাদিসের দিকে তিনি ইঙ্গিত করেছেন, এটি বিভিন্ন সাহাবায়ে কেরাম বিভিন্ন শব্দে বর্ণনা করেছেন। আয়েশা রা.-এর বর্ণনাটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে— নিজের শাসককে গালমন্দ করার কাজে লেগে থেকো না; বরং তাদের জন্য দোয়া ও আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন করো, তিনিই তাদের হৃদয় তোমাদের জন্য রহমপূর্ণ করে দেবেন।³¹
আবু দারদা রা. থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন : আমি আল্লাহ। আমি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আমি সমস্ত জাহানের অধিপতি, বাদশাদের বাদশা। সকল শাসকের অন্তর আমার হাতে। বান্দারা যখন আমার বাধ্য হয়ে থাকে, আমি বাদশাদের হৃদয়ে তাদের প্রতি মমতা ও ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিই; কিন্তু তারা যখন আমার অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়, আমি শাসকদের হৃদয়ে তাদের প্রতি ক্ষোভ ও ঘৃণা ঢেলে দিই। ফলে, তারা তাদের নিষ্ঠুর নির্যাতন করতে শুরু করে। সুতরাং, বাদশাদের বিরুদ্ধে বদ দোয়ায় মত্ত হয়ে পোড়ো না; বরং বিগলিত হয়ে আমার স্মরণে আত্মনিয়োগ করো, আমি তোমাদের জালেম শাসকদের হাত থেকে উদ্ধার করব।
হজরত আবু উমামা রা. হাদিসটি বর্ণনা করেছেন এভাবে—শাসকদের তোমরা গালমন্দ কোরো না; বরং তাদের জন্য সংশোধনের দোয়া করো। কেননা তারা সংশোধিত হলে তোমরাও সংশোধিত হবে।³²
যা-ই হোক, প্রয়োজন ছাড়া অযথাই শাসকদের নিন্দা করাকে নিজের বিশেষ কাজ বানিয়ে নেওয়া শরিয়তের দৃষ্টিতে পছন্দনীয় নয়। তারা যদি সীমালঙ্ঘন করে এত দূর চলে যায় যে, তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বৈধ হয়ে পড়ে, তাহলে শরিয়তের বিধিবিধান ও নির্দেশনা মেনে বিদ্রোহ করা উচিত। কিন্তু নিয়ম করে ক্রমাগত নিন্দা করে যাওয়াকে নিষেধ করা হয়েছে। গিবতের গুনাহ তো আছেই, আরও একটি হেকমতের দিকে থানবি রহ. ইশারা করেছেন—ভালোমন্দ যা-ই হোক, দেশের ভেতরে শেষ পর্যন্ত সরকারের একটা ভাবমূর্তি টিকে থাকা জরুরি। অন্যথায় সমাজে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক শক্তি, নানা অপরাধী সংঘ একসাথে জেগে উঠে পরস্পর দ্বন্দ্বে লিপ্ত হবে এবং গণমানুষের নিরাপত্তা ও জীবন বিপন্ন হবে。
টিকাঃ
২৭. মাজালিসে হাকিমুল উম্মত: ৯২, মালফুজাত, রমজান ১৩৪৮ হি.
২৮. আনফাসে ইসা, ১:৩৭৫, অধ্যায়: ৪
২৯. মাজমাউজ জাওয়ায়েদ, ৫:২২৯, মুসনাদে আহমদের সূত্রে বর্ণিত। বর্ণনাকারী সকলেই সিকাহ।
৩০. ওয়াজুস সবর: ৩৬, ইসলাহুল মুসলিমিন: ৫২২ থেকে গৃহীত
৩১. মাজমাউজ জাওয়ায়েদ, ৫:২৪৯, তাবারানির সূত্রে বর্ণিত।
৩২. আজিজিকৃত আস-সিরাজুল মুনির, ৪:৪১১। হাদিসটি বর্ণনার পর তিনি বলেছেন, এর সূত্র হাসান।
📄 ইসলামবিরোধী আইন ও শরিয়তবিরোধী পদক্ষেপে করণীয়
এখানে স্বাভাবিকভাবে একটা প্রশ্ন আসবে—সরকারের শরিয়তবিরোধী আইন ও অবস্থানের বিরুদ্ধে যদি হরতাল, ধর্মঘট ও হালে প্রচলিত অন্যান্য বিষয়গুলো বাদ দিতে হয়, তাহলে আমাদের করণীয় কী? শরিয়তবিরোধী আইনকানন যাচ্ছেতাই করার জন্য সরকারকে সরকারের পথে ছেড়ে দেব? জনগণকে ইসলাম ও ইসলামি শিক্ষা থেকে ফিরিয়ে বদ-দীন বানানোর জন্য সরকার নিজের প্ল্যান-প্রোগ্রাম স্বাধীনভাবে বাস্তবায়ন করতে থাকবে, স্কুল কলেজ মিডিয়া ইত্যাদি ব্যবহার করে ইসলামবিরোধী মতবাদ চারদিকে ছড়িয়ে দেবে, আর আমরা যারা দীন মেনে চলতে চাই, তারা স্রেফ মৌখিক ওয়াজ-নসিহত করে চুপচাপ বসে থাকব? অথচ পরিষ্কারভাবেই জানি মুখের কথায় সরকার বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করে না এবং নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করার আগ পর্যন্ত কোনো দাবি-দাওয়া মানতে চায় না!
হাকিমুল উম্মত রহ.-এর বক্তব্যের আলোকে এই প্রশ্নের জবাব হল—পশ্চিমা রাজনীতির প্রভাবে আমরা ধরেই নিয়েছি হরতাল ধর্মঘট ইত্যাদি ছাড়া প্রতিবাদের কোনো পথই নেই। অথচ পশ্চিমা সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে প্রত্যেকের উচিত প্রতিবাদের পদ্ধতি ও ভাষা নিজেদের শরিয়ত থেকে গ্রহণ করা। এ জায়গায় শরিয়তের নির্দেশনাটি কী?
তিনি বলেন, সরকার যদি শরিয়তের বিরোধিতা করে সশস্ত্র বিদ্রোহ বৈধ হওয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তাহলে সেখানে তো বিদ্রোহ বৈধতার বিধান চলে আসবে। কিন্তু যেখানে বিদ্রোহ বৈধ হবে না, সেখানে ওয়াজ-নসিহত ছাড়াও মুসলমানদের আরও বড় একটি অস্ত্র হল— নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই হাদিস :
লা তায়াতা লি মাখলুকিন ফি মায়সিয়াতিল খালিক (لا طاعة لمخلوق في معصية الخالق)
অর্থাৎ, আল্লাহর নাফরমানির বিষয়ে বান্দার আনুগত্য করা বৈধ নয়। এই পদ্ধতি বড় বড় সরকারকেও পিছু হটতে বাধ্য করে।
এ পদ্ধতি স্বয়ং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশনার আলোকে প্রমাণিত। হজরত মুআজ ইবনে জাবাল রা.-এর সূত্রে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ভাতা যতক্ষণ পর্যন্ত ভাতা হিসেবে বহাল থাকবে, ততক্ষণ তা গ্রহণ করো; কিন্তু যখন তা দীন বিক্রির ঘুষে পরিণত হবে, তখন আর গ্রহণ করবে না। কিন্তু আমি জানি, তোমরা দারিদ্র্যের ভয় ও প্রয়োজনের তাড়নায় একে ছাড়বে না। খুব ভালোভাবে শুনে নাও, ইসলামের চাকা ঘুরতে শুরু করেছে, এজন্য কুরআন যেখানে যাবে তোমরাও তার সাথে সেখানে যেয়ো। খবরদার! অচিরেই কুরআন ও শাসন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, এমন পরিস্থিতিতে তোমরা কুরআন ছাড়বে না। মনে রেখো, তোমাদের মাথার ওপর এমন কিছু শাসক আসবে, যারা নিজেদের ব্যাপারে যে ফায়সালা করবে তোমাদের জন্য তা করবে না। যদি এর বিরোধিতা করো তাহলে তোমাদের হত্যা করবে, আর যদি আনুগত্য করো তাহলে পথভ্রষ্ট করে দেবে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, এ অবস্থায় আমরা কী করব? তিনি বললেন: ইবনে মরিয়ম আলাইহিস সালামের সাথিদের সাথে যা করা হয়েছে তোমরাও সেই ভাগ্য বরণ করে নিয়ো। তাদের চিরুনি দিয়ে আঁচড়ানো হয়েছে এবং জ্বলন্ত কাঠের শূলীতে চড়ানো হয়েছে। আল্লাহর আনুগত্য করতে গিয়ে যদি মৃত্যু এসে যায়, তাহলে আল্লাহর নাফরমানিতে জীবন কাটানোর চেয়ে মৃত্যুই উত্তম।³³
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, যদি সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট কুরআনবিরোধী কোনো আইন জারি করা হয়, তাহলে একজন মুসলমানের দায়িত্ব হল সেদিকে না তাকিয়ে আল্লাহর বিধানটিই মেনে চলা। এ পদ্ধতি একদিকে যেমন দুনিয়া ও আখেরাতের নাজাতের পথ, অপরদিকে এতে রয়েছে সমাজ সংশোধনের বিরাট সম্ভাবনা। কারণ, জনগণের মধ্যে যদি ব্যাপকভাবে দীনি এই চেতনাটি ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা শরিয়তবিরোধী আইন মানা থেকে হাত গুটিয়ে নেয়, তাহলে একটি সরকারের ওপর এর চেয়ে বড় চাপ আর কিছু দ্বারা সৃষ্টি হতে পারে না।
ভেবে দেখুন, প্রত্যেক মুসলমান যদি সিদ্ধান্ত নেয় সুদি ব্যাংকে কোনো অ্যাকাউন্ট খুলবে না, চাকরিজীবীরা সেখানে চাকরি করা ছেড়ে দেয়, ব্যবসায়ীরা সুদি লোন নেওয়া পরিত্যাগ করে, তাহলে এই সুদি ব্যাংকগুলো কি একদিনও টিকতে পারবে? এমনিভাবে যদি বিচারক সিদ্ধান্ত নেন ইসলামবিরোধী আইন দিয়ে তারা একটি বিচারও করবেন না, এর জন্য যদি চাকরি ছাড়তে হয় ছাড়বেন, আইনজীবীরা সিদ্ধান্ত নেন তারা অনৈসলামিক আইনব্যবস্থার অধীনে একটি মামলার শুনানিতেও অংশ নেবেন না, এর কারণে যত পয়সাই হাতছাড়া হোক, তাহলে এই অনৈসলামিক বিচারব্যবস্থা কয়দিন থাকতে পারবে? মুসলিম সরকারী চাকরিজীবীরা যদি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন তারা সরকারের ইসলামবিরোধী কোনো পদক্ষেপে কোনোভাবেই অংশ নেবেন না, যদি অংশ নিতে বাধ্য করা হয় তারা চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে কুণ্ঠিত হবেন না, তাহলে ইসলামবিরোধী পদক্ষেপগুলো সফল হতে পারবে?
প্রতিবাদের এই পদ্ধতিতে সমস্যা কোথায়? সমস্যা একটাই—এটি পশ্চিমের টাকশাল থেকে তৈরি হয়ে আসেনি। এ কারণে সবার কাছে কেমন অস্বস্তিপূর্ণ মনে হবে। কিন্তু পরিপূর্ণভাবে একে যদি বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে এটি দেশের পুরো সিস্টেম বদলে দিতে সক্ষম, পাশাপাশি এতে সে দুর্যোগগুলো নেই, যেগুলো হরতাল-অনশনের মধ্যে রয়েছে। শুধু এটুকু প্রয়োজন—ইসলামি শাসন বাস্তবায়নের জন্য যারা দৌড়ঝাঁপ করছেন, তাদের হৃদয়ে আল্লাহভীতি, আখেরাতের ফিকির, আল্লাহ তায়ালার সামনে জবাবদিহিতার ভয় এবং শরিয়ত মেনে চলার নিখাদ আবেগ থাকতে হবে। এবং সবচেয়ে বড় কথা হল, প্রথমে নিজেরা ব্যক্তিগত জীবনে ইসলামি অনুশাসন মেনে চলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে।
এর বিপরীতে প্রচলিত পদ্ধতির প্রতিবাদ মানুষের কাছে সহজ মনে হয়, কারণ এতে সবার আগে নিজের জীবনে ইসলাম পালনের শর্ত নেই। যার জীবনে এমনকি ইসলামি মৌলিক বিষয়গুলোও অনুপস্থিত সেও পর্যন্ত ইসলাম কায়েমের ঝান্ডা উঁচিয়ে স্লোগানে স্লোগানে রাজপথ কাঁপিয়ে তোলে। এ পথে নিজের দীনি চেতনা জাহির করার জন্য একদিন হরতাল পালনে অংশ নেওয়াই যথেষ্ট। এর আগেপরে সবসময় নিজের দোকানে অফিসে যদি নির্ভেজাল শরিয়তবিরোধী কাজে লিপ্ত থাকে, তাহলেও সে 'ইসলামি আন্দোলনে' কোনো সমস্যা হয় না।
অথচ, বিস্ময়ের কথা হল যে নিজের জীবনে ইসলামের বিধানাবলি কার্যকর করতে পারে না, সে কীভাবে আশা করে ইসলামের জন্য তার এই সব দৌড়ঝাঁপ আর দাবি-দাওয়া ইসলামের বিজয় ছিনিয়ে আনবে? অন্তত এটুকু শর্ত তো থাকা দরকার, যে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করবে, সবার আগে তার নিজের জীবনকে ইসলামের আদলে গড়ে তুলতে হবে এবং এই পথে জানমাল স্বার্থ ও বিচার-বিবেচনাহীন জোশ-জজবা, প্রবৃত্তিপ্রভাবিত অন্য সব চিন্তা-চেতনা কুরবানি করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে। এই মূল শর্তটিই যদি গায়েব হয়ে যায়, তাহলে ইসলাম কায়েম করার জন্য এই সব চেষ্টা ও পরিশ্রমের মূল্য কী? নিষ্প্রাণ ভাসাভাসা এক হট্টগোল ছাড়া কিছুই নয়।
টিকাঃ
৩৩. মাজমাউজ জাওয়ায়েদ, ৫:২৩৮, তাবারানির সূত্রে বর্ণিত।
📄 সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামি হুকুমতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে ভয়ানক অপরাধ আখ্যায়িত করেছেন, এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এ ব্যাপারে সকল ফকিহ একমত।
একজন ন্যায়পরায়ণ শাসকের বিরুদ্ধে কখন বিদ্রোহ করা জায়েজ—এ বিষয়ে ফিকহের গ্রন্থগুলোতে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত নানা হাদিস থেকে এ কথা পরিষ্কার—কোনো শাসকের দিক থেকে যখন সুস্পষ্ট কুফরি প্রকাশিত হয়, তখন তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বিলকুল জায়েজ। কিন্তু যদি সে ফাসেকি ও পাপাচারে লিপ্ত হয়, তাহলে সাধারণত ফফিহগণ বিদ্রোহ বৈধ বলেন না। কারণ, হাদিসে শুধুমাত্র স্পষ্ট কুফরি পেলে তবেই বিদ্রোহ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু কিছু হাদিসে কিছু কিছু শব্দ এর বিপরীত ধারণাও দেয়। মনে হয় যেন পাপাচারে লিপ্ত হলেও বিদ্রোহ করার সুযোগ আছে। এ কারণে কোনো কোনো ফকিহও ভিন্নরকমের মতামত দিয়েছেন। একটা সময় পর্যন্ত স্বয়ং লেখকেরও এ ব্যাপারে অস্পষ্টতা ছিল। পরিষ্কার কোনো কথা সামনে আসছিল না।
হাকিমুল উম্মত রহ. এ বিষয়ে সমৃদ্ধ একটি পুস্তিকা রচনা করেছেন। অত্যন্ত শক্তিশালী প্রমাণাদির আলোকে সুবিস্তারিত আলোচনা। পুস্তিকাটি ইমদাদুল ফাতাওয়ার ৫ম খণ্ডে জাজলুল কালাম ফি আজলিল ইমাম শিরোনামে ছাপা হয়েছে। এতে তিনি সংশ্লিষ্ট সকল হাদিস একত্র করেছেন, এনেছেন ফকিহদের সব ধরনের বক্তব্য, এরপর চমৎকার বিশ্লেষণের সাথে সম্ভাব্য সকল পরিস্থিতি আলাদা করে দেখিয়ে সবগুলোর বিধান উল্লেখ করেছেন—হাদিস ও ফিকহের দৃষ্টিকোণ থেকে। আমার দেখামতে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে তাঁর পুস্তিকাটিই সবচেয়ে সুন্দর ও শক্তিশালী। এর মতো দ্বিতীয়টি পাইনি।
তার সে আলোচনার শেষ কথাটি হল—সরকারের অনৈসলামিক কর্মকাণ্ডের বেশ কিছু ভাগ আছে। স্বাভাবিকভাবেই সবগুলোর বিধান এক নয়; আলাদা।
১. শাসক এমন অন্যায় ও গুনাহের কাজে লিপ্ত, যেগুলো তার নিজের মধ্যেই সীমিত থাকে, জনগণকে আক্রান্ত করে না। যেমন, মদ খাওয়া ইত্যাদি। এর বিধান হল—যদি কোনো ফেতনা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়া ছাড়া সহজেই অপসারণ করা সম্ভব হয়, তাহলে সরিয়ে দেওয়া হবে; অন্যথায় ধৈর্য ধরে থাকতে হবে। ... এবং ক্ষমতাচ্যুত করা বৈধ নয়—এমন পরিস্থিতিতে কেউ যদি সশস্ত্র বিদ্রোহ করে বসে, তাহলে পেছনে যে ষষ্ঠ নম্বর বক্তব্যে বলা হয়েছে : সুতরাং যদি মুসলমান কোনো দল সশস্ত্র বিদ্রোহ করে..., সে আলোকে সকল মুসলমানের উচিত শাসকের পক্ষে দাঁড়ানো। বিশেষ করে শাসক যখন নির্দেশ দেবে, তখন সবাইকে সে নির্দেশ পালন করতে হবে।
২. শাসকের অপরাধ অন্যকেও আক্রান্ত করে। যেমন, জনগণের সম্পদ অন্যায়ভাবে ছিনিয়ে নিতে লাগল। কিন্তু পুরোপুরি ছিনিয়ে নেওয়াও বলা যায় না; বৈধ হওয়ার একটু সম্ভাবনাও আছে। ধরা যাক, রাষ্ট্রীয় কল্যাণ ও উন্নয়নের কথা বলে ট্যাক্স নিল—এমন হলেও সশস্ত্র বিদ্রোহ করা যাবে না।
৩. কিন্তু যদি বৈধতার কোনো সম্ভাবনাও না থাকে, তাহলে এর বিধান হল জনগণ নিজের ওপর হওয়া জুলুম প্রতিহত করবে, এতে যদি যুদ্ধও করতে হয়, করতে পারবে। এমতাবস্থায় যুদ্ধ না বাধিয়ে ধৈর্য ধরে থাকাও জায়েজ; বরং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সার্বিক বিবেচনায় ধৈর্যধারণই অধিক উত্তম।
৪. জনগণকে গুনাহের কাজে লিপ্ত হতে বাধ্য করে, তবে এর দ্বারা দীনকে হেয় করা উদ্দেশ্য নয়, বা কুফরিকে ভালোবাসার কারণে নয়; বরং এমনিতেই নিজের প্রবৃত্তির বশে বা আপন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য, তাহলে এমতাবস্থায় বিধান হল—জনগণকে মাজুর বা অক্ষম বিবেচনা করা হবে এবং ফিকহের গ্রন্থগুলোতে মাজুর ব্যক্তিদের যে বিস্তারিত বিধান উল্লেখ আছে, সেগুলো জারি হবে। কিন্তু সশস্ত্র বিদ্রোহ বৈধ হবে না।
৫. জনগণকে গুনাহের কাজে লিপ্ত হতে বাধ্য করে এবং এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য হল দীনকে হেয়প্রতিপন্ন করা বা কাজটা সে করে গুনাহ ও কুফরকে ভালোবাসার কারণে, তাহলে তা কুফর বলে বিবেচিত হবে। এমনও হতে পারে মানুষকে গুনাহের কাজে বাধ্য করার দ্বারা উপস্থিত সময় হয়তো দীনকে হেয় করা তার উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু কাজটা সে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এত ব্যাপকভাবে শুরু করল যে, এভাবে চলতে থাকলে একসময় স্বয়ংক্রিয়ভাবেই মানুষের মনে দীনের প্রতি হেয়তা সৃষ্টি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। তখনো একে কুফর হিসেবেই বিবেচনা করা হবে। এ সকল অবস্থায় স্পষ্ট কুফরি করলে যে বিধানাবলি আরোপ হয় এখানেও তা-ই হবে। সুস্পষ্ট কুফরির বিধানটি ষষ্ঠ নম্বরে উল্লেখ করা হচ্ছে।
৬. আল্লাহ না করুন, শাসক যদি কাফের হয়ে যায়, তাহলে এ পরিস্থিতির বিধানগুলো নিম্নরূপ :
সাথে সাথে পদচ্যুত হবে। যদি ক্ষমতা না ছাড়ে তাহলে তাকে জোরপূর্বক ক্ষমতাচ্যুত করা সকলের ওপর ওয়াজিব, শর্ত হল এর জন্য সামর্থ্য থাকতে হবে। এ সময় খুব গুরুত্বের সাথে কয়েকটি বিষয় অবশ্যই লক্ষ রাখতে হবে : কুফরি কর্মটি সকলের ঐকমত্যে কুফরি হতে হবে। এমনিভাবে তার থেকে কুফরি প্রকাশ হওয়ার বিষয়টিও সচক্ষে দেখার মতো নিশ্চিত হতে হবে; শোনা কথায় প্রমাণিত হবে না। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্য থেকে এমনটিই প্রমাণিত।
কোনো কুফরি কাজ শাসকের কাফের হওয়ার প্রতি নির্দেশ করা বা কুফরি কর্ম প্রমাণিত হওয়ার বিষয়টি পরিস্থিতি ও বক্তব্যসংক্রান্ত আলামতের ভিন্নতার কারণে মতপার্থক্যপূর্ণ হতে পারে। মতবিরোধপূর্ণ হতে পারে স্বয়ং অকাট্য কোনো বিধানও। কখনো ইজমাতেও দেখা দিতে পারে মতভিন্নতা। এ সকল অবস্থায় সে কাজে লিপ্ত ব্যক্তি অজুহাত প্রদর্শনের সুযোগ পাবে।
এম্পিভাবে অন্য আরেকটি সময়েও মতপার্থক্য বিবেচ্য ও গ্রহণযোগ্য হবে। তা হল—পঞ্চম উদ্ধৃতিতে বলা হয়েছে দুটো কল্যাণের মধ্যে যখন বিরোধ দেখা দেবে, সবচেয়ে কম ক্ষতিকর ও তুলনামূলক বেশি লাভজনক বিষয়টিকেই প্রাধান্য দেওয়া হবে—সে আলোকে বলা যায়, সে কল্যাণ কোনটি তা নির্ধারণ নিয়ে দুজন বিশেষজ্ঞের মতবিরোধ দেখা দিতে পারে। এ কথাটি সকলেই মেনে নিলে নির্ভরযোগ্য উলামায়ে কেরামের মধ্যেও যে নানা মতবিরোধ পাওয়া যায়, সেগুলোর সুষ্ঠু নিরসন হয়ে যায়।
অতঃপর, যে সকল অবস্থায় সশস্ত্র বিদ্রোহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে বা ওয়াজিব বলা হয়েছে, সে সময়েও শর্ত হল বিদ্রোহের জন্য প্রয়োজনীয় সামর্থ্য বিদ্যমান থাকতে হবে এবং এ বিদ্রোহের ফলে এর চেয়েও নিকৃষ্ট কোনো শাসক ক্ষমতায় বসা বা কোনো অমুসলিম শাসক রাষ্ট্র দখলে নেওয়ার আশঙ্কা না থাকতে হবে।³⁴
এখানে আমরা হজরত থানবি রহ.-এর গবেষণা ও বিশ্লেষণের সংক্ষিপ্ত সারনির্যাস পেশ করলাম শুধু। তার মূল আলোচনা এত সংক্ষিপ্ত নয়; বরং প্রতিটি অংশ হাদিস ও ফিকহের শক্তিশালী দলিল-প্রমাণ দিয়ে অত্যন্ত মজবুতভাবে আলোচনা করেছেন। সাথে সমস্ত উহ্য প্রশ্ন ও সংশয়ের নিরসনও করেছেন। গবেষক ও জ্ঞানী মানুষদের জন্য এ পুস্তিকাটি অত্যন্ত উপকারী ও প্রশান্তদায়ক হবে ইনশাআল্লাহ।³⁵
টিকাঃ
৩৪. ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৫:১২০
৩৫. মাসিক আল-বালাগ, শাবান-রমজান সংখ্যা, ১৪১০ হিজরি