📄 বয়কট ও হরতাল
উদাহরণত সরকার থেকে নিজেদের দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য আজকাল হরতাল পালন করা হয়। ব্যাপার যদি শুধু এতটুকু হত যে, লোকজন দাবি আদায়ের জন্য স্বেচ্ছায় নিজেদের ব্যবসাবাণিজ্য ও গাড়িঘোড়া বন্ধ করে রাখে, তাহলে অন্যান্য ক্ষতিকর দিক না থাকার শর্তে একে একটি বৈধ কৌশল বলা যেত। এ প্রসঙ্গে হাকিমুল উম্মত রহ. বলেন, বয়কট বা নন কো-অপারেশন—শরিয়তের চোখে একে জিহাদের অংশ বলার সুযোগ নেই। (প্রমাণবিষয়ক আলোচনায় বিষয়টি দেখে নেবেন।) এ বরং স্বতন্ত্র একটি প্রতিবাদ পদ্ধতি, যা মৌলিকভাবে বৈধ।²⁰
কিন্তু এমন হরতাল বা বয়কট, যা সকলে খুশি মনে পালন করে, দুনিয়ায় এর অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। বেশির ভাগ সময়ই মানুষকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে এসবে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। কেউ অস্বীকৃতি জানালে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়, আর্থিকভাবেও ক্ষতির মুখে ফেলা হয়। পাশাপাশি মারামারি ও বোমাবাজি তো হরতালের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পথঘাটে মানুষ ও গাড়ি চলাচল আটকে দেওয়া হয়, গাড়ি ভাঙচুর হয় অনেক, ব্যবসায়ীরা হামলার ভয়ে দোকানপাট বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়, আর বিশেষ প্রয়োজনে যাদের বাইরে বের হতেই হয়, তারাও সবসময় ভয়ে থাকে কখন কী হয়ে যায়। হরতাল চলাকালীন অনেক নিরীহ মানুষ মারা যায়, অনেক রোগী হসপিটালে যেতে না পেরে কাতরাতে কাতরাতে মারা যায় এবং অনেক দিনমজুর-দরিদ্র মানুষের জীবন অর্থ ও খাদ্য সংকটে পড়ে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
এসব বর্তমানে হরতালের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এসব ছাড়া একটি সফল হরতালের কল্পনাও করা যায় না। বোঝাই যাচ্ছে, এগুলো শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম। আর যে জিনিসটির কারণে এত সব হারাম কাজ করতে হয়, তা জায়েজ হয় কীভাবে? এজন্য হাকিমুল উম্মত রহ. প্রচলিত হরতালকে নাজায়েজ বলতেন। খেলাফত আন্দোলনের সময় যে 'অনশন আন্দোলন' চলছিল, এর মধ্যে হরতালও ছিল। এ আন্দোলনের একটি সিদ্ধান্ত ছিল ব্রিটিশ পণ্য বয়কট করা। ফলে, ব্রিটিশ পণ্য বিক্রি করে এমন দোকানগুলোতে আন্দোলনের পক্ষ থেকে স্বেচ্ছাসেবক নিযুক্ত করে দেওয়া হত, যাদের কাজ ছিল যেভাবেই হোক ক্রেতাদের সেসব দোকান থেকে ফিরিয়ে রাখতে হবে। একান্ত কিনেই যদি ফেলত কেউ, তখন পণ্য ফেরত দিয়ে আসতে বাধ্য করা হত। এমনকি দোকানদারদেরও বাধ্য করা হত তারা যেন ব্রিটিশ পণ্য না রাখে। যদি কেউ অমান্য করত, তাকে নানাভাবে শায়েস্তা করা হত, লোকটার জীবিকা নির্বাহের অন্য কোনো মাধ্যম আছে কি নেই তা দেখার প্রয়োজন বোধ করা হত না। তার পরিবার কি না খেয়ে মরল, সে নিয়েও কারও ভাবনা ছিল না।
হাকিমুল উম্মত রহ. এমন পদ্ধতির বয়কট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, এই ঘটনার মধ্যেও অনেকগুলো গুনাহের কাজ জড়িয়ে আছে। এক হল— একটি বৈধ কাজ পরিত্যাগ করতে বাধ্য করা। কারণ, বিশেষ কিছু জিনিস ছাড়া বাকি সকল পণ্য বেচাকেনা আহলে হারব তথা যুদ্ধে লিপ্ত শত্রুদের সাথেও করা জায়েজ, চুক্তির আওতাধীন লোকদের সাথে তো বটেই।
দ্বিতীয়ত, ক্রয়-বিক্রয় চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার পর পণ্য ফেরত দিতে বাধ্য করা আরও বড় গুনাহ। কারণ, ‘খেয়ারের শর্ত’ বা পণ্য ফেরত দেওয়ার স্বাধীনতা থাকার শর্ত না থাকলে ফেরত দেওয়াটা মূলত নতুন করে কেনাবেচার মতোই। ফলে, এখানে উভয় পক্ষের সম্মতি আবশ্যক। এ ছাড়া তা জায়েজ হবে না। কিন্তু তৃতীয় পক্ষ এসে বাধ্য করলে সে সম্মতি পাওয়া গেল কীভাবে?
তৃতীয়ত, কেউ এই জবরদস্তি মানতে অস্বীকার করলে তাকে নানাভাবে কষ্টে ফেলা জুলুম। এটা আরেকটা অপরাধ। চতুর্থত, ক্রেতা বা ব্যবসায়ীর পরিবার-পরিজনকে অসুবিধায় ফেলাও গুনাহের কাজ। এটাও জুলুম। পঞ্চমত, একে শরিয়তের দৃষ্টিতে ওয়াজিব বলে ঘোষণা করা হলে তা শরিয়ত বিকৃতি হবে।²¹
বয়কটের আলোচনার পর তিনি হরতাল বিষয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, এর মধ্যেও ওপরে তিন নম্বরে উল্লেখিত আপত্তিটি রয়েছে। এবং যদি এই আন্দোলনে শরিক না হলে শারীরিকভাবে কষ্ট দেওয়া হয়, তাহলে এটি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেয়েও বড় অপরাধ। ইসলামের রুচি ও দাবির সাথে এ কোনোভাবেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তা ছাড়া বয়কট ও হরতালে অংশ নিতে বাধ্য করার দ্বারা এই বলপ্রয়োগকারী লোকগুলো নিজেদের পছন্দ করা 'স্বাধীনতানীতি' নিজেরাই ভঙ্গ করে বসে আছে। আর না হয় নিজেদের জন্য স্বাধীনতা চাইতে গিয়ে অন্যের স্বাধীনতায় হাত দেওয়ার কী অর্থ!²²
টিকাঃ
২০. আর-রাওজাতুন নাজিরা, ইফাদাতে আশরাফিয়া দর মাসায়িলে সিয়াসিয়া: ১০
২১. মুআমালাতুল মুসলিমিন, ইফাদাতে আশরাফিয়া: ২৭-২৮
২২. দেখুন-ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৬:২০১
📄 আমরণ অনশন
এমনিভাবে দাবিদাওয়া আদায় করার জন্য আরেকটি বিশেষ পদ্ধতি পালন করা হয়—আমরণ অনশন। হাকিমুল উম্মত রহ. এ ব্যাপারে বলেন, গ্রেফতার হয়ে জেলে যাওয়ার পর অনেকে আমরণ অনশন শুরু করে। এটি করতে গিয়ে কেউ কেউ এমনকি জীবন পর্যন্ত দিয়ে দেয় এবং জনগণ তাদের এই প্রাণ উৎসর্গের প্রশংসা করে।
হজরত থানবি রহ.-এর শরয়ি বিধান বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, এ যে আত্মহত্যা এবং নাজায়েজ এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তোমরা নিজেদের হত্যা কোরো না। হিদায়া গ্রন্থের 'ইকরাহ' অধ্যায়ে বলা হয়েছে : সে গুনাহগার হবে, যেমনটি হয় নিতান্ত ক্ষুধার্ত অবস্থায়। এবং ইনায়া গ্রন্থে বলা হয়েছে : সুতরাং, আহার থেকে বিরত থাকাটি হল হালাল খাবার থেকে বিরত থেকে মারা যাওয়া বা অঙ্গহানি ঘটানোর মতো। ফলে, সে গুনাহগার হবে...
এই বিবরণ থেকে জানা গেল, জান বাঁচানো এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি ফরজ যে, একদম নিরুপায় অবস্থায় যদি মারা যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয় এবং মৃত জন্তু খেলে বেঁচে যাবে বলে মনে করে, তাহলে এমন সময়ে তা না খেয়ে মরে যাওয়া গুনাহের কাজ। সে জায়গায় হালাল খাবার না খেয়ে জীবন দিয়ে দেওয়া তো অবশ্যই গুনাহ। আর, এমন গুনাহের একটি কাজের প্রশংসা করলে তো ইমান চলে যাওয়ারই আশঙ্কা হয়। কারণ, এর দ্বারা স্পষ্টভাবেই শরিয়তকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়। কেননা শরিয়ত যে কাজকে নিন্দনীয় বলেছে, প্রশংসাকারীরা একেই ভালো কাজ বলে প্রশংসায় মেতে উঠছে।²³
অন্য এক জায়গায় বলেন, এই (আমরণ অনশন) আত্মহত্যার নামান্তর। এতে সত্যিই যদি মারা যায়, তাহলে সে মৃত্যু হারাম হবে।²⁴
টিকাঃ
২৩. ইফাদাতে আশরাফিয়া দর মাসায়েলে সিয়াসিয়া: ২৮-২৯
২৪. আল-ইফাদাতুল ইয়াউমিয়া, ৩:৩০, মালফুজ নং: ১৪
📄 রাজনৈতিক পাবলিসিটির প্রচলিত রূপ
বর্তমান রাজনীতিতে পাবলিসিটি ও প্রোপাগান্ডা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে পশ্চিমের বিখ্যাত রাজনীতিক গোয়েবলস-এর নীতিটি মান্য করা হয় : মিথ্যা খুব জোরেসোরে লাগাতার বলতে থাকো, মানুষ একসময় একে সত্য বলে ধরে নেবে।
বর্তমানের সরকার ও ধর্মহীন রাজনৈতিক দলগুলো তো এ নীতি অনুসরণ করছেই, কিন্তু দুঃখজনক হল অনেক সময় ইসলামিক দলগুলোও পরিবেশ-পরিস্থিতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এ নীতির ওপর উঠে আসছে। হয়তো তারা এর জায়েজ হওয়া না-হওয়া নিয়ে ভাবছেই না, অথবা এখানেও সেই চিন্তাটিই লালন করছে— রাজনীতিকে শুদ্ধ করার এ অভিযানে এমন ছোট ছোট বিষয়গুলো থেকে একটু- আধটু চোখ বন্ধ করে রাখতেই হবে।
মিথ্যা বলা তো হারামই। এ নিয়ে আর সন্দেহ কী! কিন্তু এ নিয়ে যেন কেউ ভাবছেই না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য বৈধ কারণ ছাড়া গিবত করা, তাদের বিরুদ্ধে নাজায়েজ কথা বলা, অপবাদ আরোপ করা, যাচাই না করেই প্রোপাগান্ডা ছড়ানো, বা তত্ত্বতালাশ না করে সেসব বিশ্বাস করা—এ সবকিছু আমাদের ইসলামিক দলগুলোর মধ্যেও প্রবেশ করে বসে আছে, সচেতনে বা অবচেতনে। পরিণতিতে অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলা, দলবাজি ও হানাহানি বাড়ছেই শুধু। হাকিমুল উম্মত রহ. বিভিন্ন বক্তব্যে এমন কর্মকাণ্ড নাজায়েজ ও অবশ্যই পরিত্যাজ্য ঘোষণা করেছেন।
এমনিভাবে, সভাসমাবেশও জনগণ পর্যন্ত নিজেদের বক্তব্য পৌঁছানোর মাধ্যম হিসেবে খুবই জনপ্রিয়। কিন্তু এখানেও অনেক সময় শরয়ি বিধিবিধানের তোয়াক্কা করা হয় না। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, যখন কোনো কৌশল কুরআন-হাদিসে বর্ণিত সুস্পষ্ট কৌশলের বিরুদ্ধে যায়, তখন তা তো নিষিদ্ধই। বিশেষ করে সেটি যখন অনর্থক ও ক্ষতিকর হয়, তখন তা নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে কী সন্দেহ! এখানে তো 'শরিয়ত সমর্থিত প্রয়োজন নিষিদ্ধ কাজকে প্রয়োজন অনুপাতে বৈধ করে দেয়' মূলনীতিটিও প্রয়োগ হওয়ার সুযোগ নেই। যেমন হরতাল, সভাসমাবেশ। এগুলোতে অযথা সময় নষ্ট হয়, পয়সা খরচ হয়, দরিদ্র মানুষকে অন্যায় দুর্ভোগ পোহাতে হয়, নামাজের সময় পেরিয়ে যায়—কেউ টেরও পায় না। এত সব স্পষ্ট গুনাহের কাজ থাকার পরও তা কীভাবে জায়েজ হতে পারে? একজন জিজ্ঞেস করল, যদি এসবে অংশগ্রহণ করা দ্বারা হক ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা উদ্দেশ্য হয়, তাহলে? জবাবে তিনি বললেন, এসবের দ্বারা হক ও ইনসাফকে সাহায্য করা হয় না। দ্বিতীয় কথা হল—কোনো নাজায়েজ কাজ নিয়তের দ্বারা জায়েজ হয়ে যায় না।²⁵
অন্য আরেক জায়গায় প্রচলিত রাজনৈতিক কর্মপন্থার ব্যাপারে নিজের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গিটি আরও পরিষ্কার ভাষায় তুলে ধরেছেন। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল—যারা সরকারের মোকাবেলা করতে যান, এরপর গ্রেফতারও হন, আবার পালটা কিছু করেনও না। এক ধরনের নীরব লড়াই। সরকার যদি জুলুম ও নিপীড়ন চালায়, তখনো পালটা প্রতিরোধের জন্য বিশেষ কিছু করে না। আগের মতোই—প্রতিবাদ করো, জেলে যাও, তারপর আবার প্রতিবাদ করো—এভাবে চলতে থাকে। এ ব্যাপারে শরিয়তের বক্তব্য কী?
জবাবে তিনি বলেছিলেন, আমাদের বিবেচনায় এখানে দুটো পথই শুধু দেখি: হয় মোকাবেলা করার শক্তি আছে, না হয় নাই। যদি শক্তি থাকে, তাহলে গ্রেফতার হবে কেন? তার জন্য উচিত জানপ্রাণ দিয়ে লড়াই ও প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়া। তা যদি না পারে, তাহলে বোঝাই যাচ্ছে এটা হল অক্ষমতা ও অপারগতার কাল। এমন সময়ে স্বেচ্ছায় নিজেকে জুলুমের মুখে ফেলা, কারাগারে বন্দি হওয়া, শরিয়তে এসবের অনুমতি নেই; বরং এমন নিষ্ফল অক্ষম মোকাবেলার পরিবর্তে সবর করা উচিত। মোটকথা দাঁড়াল এই—শক্তি থাকলে প্রতিরোধ করো, না থাকলে সবর করো। এর বাইরে তৃতীয় কোনো পথের কথা শরিয়তে বর্ণিত নেই।
সামনে গিয়ে বললেন, এই সময়ে মুসলমানদের ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় কারণ—তাদের নেতৃত্বে বড় কেউ নেই এবং কেন্দ্রীয় কোনো শক্তি নেই। আর হওয়া সম্ভবও নয়, যদি না ঘটনাক্রমে সকলে মিলে বড় কাউকে নেতৃত্বের আসনে বসায়। ইমাম ছাড়া কিছুই হবে না। এমন একজন ইমাম যদি মিলে যায়, সবই হবে। তার নির্দেশে ময়দানে যাবে, জান দিতে হলে দেবে, কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এটা কেমন, প্রস্তুতি ছাড়া বসে থেকে হঠাৎ গিয়ে প্রাণ দিয়ে আসে? এটা কোনো মনুষ্যত্ব হল? সুতরাং, মূল কথা সেই ওপরেরটাই—সর্বোত্তম তিন যুগে যে পথটি অনুসরণ করা হয়েছে—শক্তি থাকলে লড়ো, না হয় সবর করো। বাকি সব মনগড়া পদ্ধতি। এজন্যই এসবে কোনো কল্যাণ হতে পারে না। আর কল্যাণ না থাকলে এসব পথে মুসলমান কখনো বাহ্যত সফল হলেও সে সফলতার কী দাম! আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সন্তুষ্টির বাইরে বাহ্যিক এ সফলতার কোনো মূল্য নেই। এমন অপূর্ণ সফলতা তো কাফেররাও পেতে পারে। মুসলমানদের সত্যিকারের সফলতা তো এটিই—গোলাম হয়ে থাকলেও আল্লাহর সন্তুষ্টি নিয়ে থাকবে। যদি এমন হয়—রাষ্ট্রক্ষমতা পেলে, কিন্তু আল্লাহ সন্তুষ্ট হলেন না, তাহলে এ ক্ষমতা আর ফেরাউনের রাজত্বে পার্থক্য রইল কই? সুতরাং, আল্লাহকে খুশি করার চেষ্টা করো, তাঁর সাথে সত্যিকারের সম্পর্ক তৈরি করো, ইসলাম ও শরিয়তের বিধিবিধান মেনে চলো। ওই সমস্ত মূর্তির পূজা তো অনেক হল, এবার আল্লাহর সামনে মাথা রেখেও দেখো কী হয়।²⁶
টিকাঃ
২৫. আল-ইফাদাতুল ইয়াউমিয়া, ৫:১৩৬, মালফুজ নং: ১৫২
২৬. আল-ইজাফাতুল ইয়াউমিয়া, ৫:১৬৮-১৬৯, মালফুজ নং: ১৯০
📄 শাসকদের সাথে আচরণপদ্ধতি
ইসলাম মূল জোরটি দিয়েছে এ কথার ওপর যে, মুসলমান যে অবস্থায়ই থাকুক, সবসময় শরিয়ত মেনে চলবে। যদি শাসকের পক্ষ থেকে শরিয়তের খেলাফ কোনো কাজের আদেশ জারি করা হয়, তাহলে তা মানা আবশ্যক নয়। সুস্পষ্টভাবে নিরুপায় হওয়ার আগ পর্যন্ত শরিয়ত মেনে চলতে হবে। তা মানতে গিয়ে যত কষ্টই হোক, সবর করবে। আল্লাহ তায়ালা তাকে এই সবরের প্রতিদান দান করবেন। এমনিভাবে শাসক যদি শরিয়তের খেলাফ কোনো কাজ করে, তাহলে সমস্ত শর্ত মেনে সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে বারণ করার দায়িত্বটিও পালন করে যেতে হবে এবং প্রয়োজনের সময় তার সামনে সত্য প্রকাশের সৎ সাহসও দেখাতে হবে।
হাদিস শরিফে একে 'সর্বোত্তম জিহাদ' আখ্যায়িত করা হয়েছে। এই সমস্ত কাজ সম্পূর্ণ শরিয়তসম্মত, শর্ত হল শরিয়তের বেঁধে দেওয়া সীমানা লঙ্ঘন করা যাবে না। এ কাজের উদ্দেশ্য থাকবে একমাত্র আল্লাহ তায়ালাকে সন্তুষ্ট করা এবং দীন ইসলামের প্রচার ও সাহায্য করা। শুধুমাত্র নিজের বাহাদুরি দেখানো, মানুষের হাততালি পাওয়া এবং নেতৃত্ব লাভ করার লোভ থাকলে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।
কিন্তু হাল জামানার রাজনীতির ময়দানে এ বিষয়টিতেও প্রচণ্ড প্রান্তিকতা দেখা যায়। সরকার দলীয় বা সরকারপন্থি মানুষেরা চোখ বন্ধ করে একচেটিয়া সরকারের প্রশংসা করে, ন্যায়-অন্যায় না দেখে সকল কাজেই সমর্থন জানায়, বিরোধীদের অন্যায়ভাবে দমনের কাজে সহযোগিতা করে। সরকারের নানা জুলুম-নির্যাতন দেখেও এ ব্যাপারে মুখে তালা লাগিয়ে বসে থাকে আর সাফাই গেয়ে নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দাঁড় করে। এটা সুস্পষ্ট চাটুকারিতা। কেউ কেউ তো সরকারকে বাঁচাতে গিয়ে দীন বিকৃত করতেও পিছপা হয় না। অপরদিকে যারা বিরোধীদলীয় বা সরকারবিরোধী লোক, তাদের কাজের লক্ষ্যই পরিবর্তন হয়ে যায়। ন্যায় ও ইনসাফের বাস্তবায়ন নয়, সরকারবিরোধিতাই তাদের মূল কাজ। সরকারবিরোধিতা তাদের কাছে একটি রাজনৈতিক ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। তাদের বিশেষ দায়িত্বই হয়ে দাঁড়ায়—সরকার ভালোমন্দ যা-ই করুক, আমাদের বিরোধিতা করতে হবে। তাদের কোনো ভালো কাজের স্বীকৃতি দিতে মোটেও প্রস্তুত নয়।
এসব করার দ্বারা বেশির ভাগ সময় তাদের মূল লক্ষ্যই থাকে নিজেদের জন্য নেতৃত্ব ছিনিয়ে নেওয়া এবং জনগণ থেকে বাহবা অর্জন করা। জনগণের মধ্যে এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তারা সুযোগ পেলেই সরকারকে গালি দেয়, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, বদনাম করে। সভাসমাবেশে সরকারদলীয় নেতাদের এমনকি কুকুর-শুকর বানিয়ে তাদের বিরুদ্ধে তুমুল স্লোগান তোলা হয়। রাজনৈতিক সমাবেশে আয়োজন করে শাসকদের কথা ওঠানো হয়, এরপর তাদের বিরুদ্ধে শুরু হয় নিন্দা আর গালমন্দের ঝড়। বৈধ কোনো কারণ না থাকায় এটি গিবত তো হয়ই, অনেক সময় মিথ্যা অপবাদ পর্যন্ত গিয়ে গড়ায়। কিন্তু সবাই ধরে নেয় ফাসেক শাসকদের নিন্দা করা গিবতের অন্তর্ভুক্ত নয়। হাকিমুল উম্মত রহ. এই কর্মপদ্ধতির সমালোচনাও করেছেন।
তিনি বলেন, হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ এই উম্মতের সবচেয়ে বড় প্রসিদ্ধ জালেম। কিন্তু এক বুজুর্গের মজলিসে একজন তার ওপর একটি মিথ্যা অপবাদ দিলে তিনি নাখোশ হয়ে বললেন, সে যদিও জালেম ও ফাসেক; কিন্তু তার সাথে আল্লাহ তায়ালার আলাদা কোনো দুশমনি নাই। তিনি যেমনিভাবে হাজ্জাজ থেকে অন্য মজলুমদের প্রতিশোধ নেবেন, তেমনই হাজ্জাজের ওপর জুলুম হলে এর বিচারও তিনি করবেন।²⁷
এ ছাড়াও হজরত থানবি রহ. কয়েক জায়গায় পরিষ্কার বলেছেন, প্রয়োজন ছাড়া প্রকাশ্যে শাসকদের অপমান করা শরিয়তের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয়। তিনি বলেন, ইসলামি শাসকদের প্রকাশ্যে অপমান করলে জনগণের ক্ষতি হয়। সরকারের ভাবগাম্ভীর্য নষ্ট হয়ে গেলে দেশে নানা ফেতনা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এজন্য তাদের সম্মান করা উচিত।²⁸
হাকিমুল উম্মতের এই কথাটি মূলত নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাদিসের ব্যাখ্যা। হজরত ইয়াদ ইবনে গুনম রা. বর্ণনা করেন— নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো ক্ষমতাবান বা নেতৃত্বস্থানীয় লোককে নসিহত করতে চায় সে যেন তা প্রকাশ্যে না করে; বরং, সে তার হাত ধরে গোপন কোথাও নিয়ে যাক, এরপর সে যদি নসিহত কবুল করে, তাহলে তো ভালো; অন্যথায় সে তার দায়িত্ব আদায় করেছে।²⁹
অন্য আরেকটি বয়ানে তিনি বলেন, অনেক মানুষ বিপদাপদে নিরাশ ও হতোদ্যম হয়ে সরকারকে গালমন্দ করতে শুরু করে। এটিও ধৈর্যহীনতার পরিচয়। পছন্দনীয় কোনো আচরণ নয়। হাদিস শরিফেও এটি করতে নিষেধ করা হয়েছে। নবিজি বলেছেন, তোমরা শাসকদের গালি দিয়ো না। তাদের হৃদয় আমার (আল্লাহর) হাতে। আমার অনুগত হয়ে চলো, আমি তাদের হৃদয় তোমাদের ওপর নরম করে দেব।³⁰
যে হাদিসের দিকে তিনি ইঙ্গিত করেছেন, এটি বিভিন্ন সাহাবায়ে কেরাম বিভিন্ন শব্দে বর্ণনা করেছেন। আয়েশা রা.-এর বর্ণনাটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে— নিজের শাসককে গালমন্দ করার কাজে লেগে থেকো না; বরং তাদের জন্য দোয়া ও আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন করো, তিনিই তাদের হৃদয় তোমাদের জন্য রহমপূর্ণ করে দেবেন।³¹
আবু দারদা রা. থেকে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন : আমি আল্লাহ। আমি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আমি সমস্ত জাহানের অধিপতি, বাদশাদের বাদশা। সকল শাসকের অন্তর আমার হাতে। বান্দারা যখন আমার বাধ্য হয়ে থাকে, আমি বাদশাদের হৃদয়ে তাদের প্রতি মমতা ও ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিই; কিন্তু তারা যখন আমার অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়, আমি শাসকদের হৃদয়ে তাদের প্রতি ক্ষোভ ও ঘৃণা ঢেলে দিই। ফলে, তারা তাদের নিষ্ঠুর নির্যাতন করতে শুরু করে। সুতরাং, বাদশাদের বিরুদ্ধে বদ দোয়ায় মত্ত হয়ে পোড়ো না; বরং বিগলিত হয়ে আমার স্মরণে আত্মনিয়োগ করো, আমি তোমাদের জালেম শাসকদের হাত থেকে উদ্ধার করব।
হজরত আবু উমামা রা. হাদিসটি বর্ণনা করেছেন এভাবে—শাসকদের তোমরা গালমন্দ কোরো না; বরং তাদের জন্য সংশোধনের দোয়া করো। কেননা তারা সংশোধিত হলে তোমরাও সংশোধিত হবে।³²
যা-ই হোক, প্রয়োজন ছাড়া অযথাই শাসকদের নিন্দা করাকে নিজের বিশেষ কাজ বানিয়ে নেওয়া শরিয়তের দৃষ্টিতে পছন্দনীয় নয়। তারা যদি সীমালঙ্ঘন করে এত দূর চলে যায় যে, তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বৈধ হয়ে পড়ে, তাহলে শরিয়তের বিধিবিধান ও নির্দেশনা মেনে বিদ্রোহ করা উচিত। কিন্তু নিয়ম করে ক্রমাগত নিন্দা করে যাওয়াকে নিষেধ করা হয়েছে। গিবতের গুনাহ তো আছেই, আরও একটি হেকমতের দিকে থানবি রহ. ইশারা করেছেন—ভালোমন্দ যা-ই হোক, দেশের ভেতরে শেষ পর্যন্ত সরকারের একটা ভাবমূর্তি টিকে থাকা জরুরি। অন্যথায় সমাজে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক শক্তি, নানা অপরাধী সংঘ একসাথে জেগে উঠে পরস্পর দ্বন্দ্বে লিপ্ত হবে এবং গণমানুষের নিরাপত্তা ও জীবন বিপন্ন হবে。
টিকাঃ
২৭. মাজালিসে হাকিমুল উম্মত: ৯২, মালফুজাত, রমজান ১৩৪৮ হি.
২৮. আনফাসে ইসা, ১:৩৭৫, অধ্যায়: ৪
২৯. মাজমাউজ জাওয়ায়েদ, ৫:২২৯, মুসনাদে আহমদের সূত্রে বর্ণিত। বর্ণনাকারী সকলেই সিকাহ।
৩০. ওয়াজুস সবর: ৩৬, ইসলাহুল মুসলিমিন: ৫২২ থেকে গৃহীত
৩১. মাজমাউজ জাওয়ায়েদ, ৫:২৪৯, তাবারানির সূত্রে বর্ণিত।
৩২. আজিজিকৃত আস-সিরাজুল মুনির, ৪:৪১১। হাদিসটি বর্ণনার পর তিনি বলেছেন, এর সূত্র হাসান।