📘 রাষ্ট্র রাজনীতি ও ইসলাম > 📄 রাজনৈতিক কৌশল ও কিছু কথা

📄 রাজনৈতিক কৌশল ও কিছু কথা


হজরত হাকিমুল উম্মত রহ. নিজের গ্রন্থ ও বিভিন্ন আলোচনায় বারবার এ কথার ওপর জোর দিয়েছেন—ইসলামি রাজনীতিতে শুধুমাত্র উদ্দেশ্যটি নেক ও শরিয়তসম্মত হলেই হবে না; বরং কর্মপদ্ধতি এবং কৌশলগুলোও শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী হতে হবে। কেউ যদি শরিয়তের বিধিবিধানের তোয়াক্কা না করে, কুরআন ও হাদিসের বিরুদ্ধাচরণ করে ইসলামি হুকুমত কায়েম করে ফেলবে মনে করে, তাহলে তা নিছক খামখেয়ালিপূর্ণ কাজ। নির্বুদ্ধিতা ছাড়া কিছু নয়। এর পরিণতি শুধুই বঞ্চনা। ঘটনাক্রমে যদি ক্ষমতা পেয়েও যায়, তাহলে সেটি ইসলামি হুকুমত হবে না, ইসলামি হুকুমতের নামে বিভ্রান্তি শুধু।

ইসলামে রাজনীতি ও রাষ্ট্রশাসন মৌলিক কোনো উদ্দেশ্য নয়; বরং মূল বিষয় হল শরিয়তের অনুসরণ এবং এর মধ্য দিয়ে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভ। এ বিষয়ে পুস্তিকার শুরুতে থানবি রহ.-এর বিস্তারিত বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তিনি অত্যন্ত মজবুত দলিল দিয়ে একে প্রমাণ করেছেন। সুতরাং ইসলামি হুকুমত কায়েম করার চেষ্টা করতে গিয়ে শরিয়তের কিছু বিধান উপেক্ষা করাতে কোনো সমস্যা নেই এবং রাষ্ট্রশাসনকে সর্বোচ্চ লক্ষ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তা অর্জনের জন্য শরিয়তের শাখাগত বিভিন্ন বিধানকে কুরবানি করা জায়েজ আছে—এমন চিন্তা কোনোভাবেই ইসলামের সাথে যায় না; বরং সকল মুসলমানের জন্য উচিত হল শরিয়তের গণ্ডির ভেতরে থেকেই চেষ্টা ও সাধনা চালিয়ে যাওয়া এবং সেসব কৌশলই গ্রহণ করা, যেসবের কারণে শরিয়ত লঙ্ঘন করতে না হয়। মুসলমানদের সফলতার গোপন রহস্য শরিয়তকে অনুসরণ করার মধ্যেই নিহিত। এ পথে চললেই আল্লাহ তায়ালা সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সুতরাং সফলতাও ইনশাআল্লাহ এ পথেই আসবে।

আর যদি ধরেও নেওয়া হয়—শরিয়তের কোনো বিধান পালন করতে গেলে বাহ্যিক কোনো সফলতা হাতছাড়া হয়ে যাবে, তাহলে হোক। মুসলমান এর চেয়ে বেশি কিছু করার জন্য আদিষ্ট নয়। জাগতিক এই ব্যর্থতার দায়ভার তার ওপর বর্তাবে না। আখেরাতেও এর জন্য তাকে কোনো জবাবদিহিতার মুখে পড়তে হবে না। এদিক-সেদিক না তাকিয়ে সে যদি পূর্ণরূপে শরিয়ত অনুসরণ করে চলতে পারে, এটুকুই তার জন্য পরিপূর্ণ সফলতা। সে প্রতিদানের জন্য যোগ্য হয়ে উঠবে এবং তার জীবনের যে মূল লক্ষ্য তা সর্ব অর্থে অর্জিত হবে।

এজন্য রাজনীতির ময়দানে কাজ করতে গেলে প্রতিটি কৌশল ও পদক্ষেপ গ্রহণের আগে সুনিশ্চিত হয়ে নিতে হবে—শরিয়তের দৃষ্টিতে তা জায়েজ নাকি নাজায়েজ? কোনো কৌশল গ্রহণের জন্য শুধু এটুকু যথেষ্ট নয় যে, এটি রাজনীতিতে বিশ্বজুড়ে প্রচলিত ও সমাদৃত। বা এটি রাজনীতিতে অব্যর্থ এক অস্ত্র। বর্তমানে এ ছাড়া রাজনীতি কল্পনাও করা যায় না।

শরিয়তের মূলনীতির আলোকে বিষয়টি যদি নাজায়েজ হয় বা শরয়ি বিশ্লেষণের আলোকে এর মধ্যে অনিষ্টতা ও আপত্তি থাকে, তাহলে বর্তমান রাজনীতি বিশেষজ্ঞগণ একে যতই আবশ্যক ও অবিকল্প হিসেবে দেখুন না কেন, কোনোভাবেই তা গ্রহণ করা যাবে না। কারণ, রাজনীতি আমাদের মূল উদ্দেশ্য নয়; মূল উদ্দেশ্য হল শরিয়তের আনুগত্য ও অনুসরণ। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জীবন এবং সাহাবায়ে কেরামের ঘটনাবলিতে এমন অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়, যেখানে তাঁরা ভীষণ কার্যকরী অনেক কৌশলও পরিত্যাগ করেছেন শুধু এ কারণে যে, এটি শরিয়তের সাথে সাংঘর্ষিক।

বদরের যুদ্ধটি ছিল ইসলামি ইতিহাসের প্রথম যুদ্ধ, যেখানে সত্য ও মিথ্যা যুদ্ধের ময়দানে প্রথমবারের মতো মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। মুসলমানদের পক্ষে ছিলেন সাকুল্যে তিনশ তেরোজন সৈনিক, অস্ত্র বলতে যাদের তেমন কিছুই ছিল না। এমন ভীষণ পরিস্থিতিতে একজন সৈনিকের মূল্যও অনেক। ঘটনাক্রমে সামান্য একটু শক্তিও যদি বাহিনীতে বৃদ্ধি পেত, তাহলে বিজয় লাভের ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। এমন সংকটময় মুহূর্তে হুজায়ফা ইবনে ইয়ামান রা.-এর মতো লড়াকু যোদ্ধা ও তার পিতা এসে মুসলিমবাহিনীতে যোগদানের আবেদন করলেন। কিন্তু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু এ কারণে তাদের যোগ দিতে বারণ করলেন, মদিনায় আসার পথে কাফেররা তাদের আটক করে ফেলেছিল এবং এ শর্তে মুক্তি দিয়েছিল যে, তারা যুদ্ধে মুসলমানদের সাহায্য করবে না। নবিজি তাদের আবেদন ফিরিয়ে দিয়ে বললেন : আমরা তাদের সাথে কৃত ওয়াদা রক্ষা করব এবং তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহ তায়ালার কাছে সাহায্য চাইব।¹⁷

এই যুদ্ধেই একজন মুশরিক নবিজির সাথে যুদ্ধে শরিক হতে চাইল। সে ছিল খুবই অভিজ্ঞ এক যোদ্ধা। লড়াইয়ের কৌশল ও বাহাদুরিতে সবার মাঝে তার প্রসিদ্ধি ছিল। কিন্তু এটা ছিল সত্য-মিথ্যার প্রথম লড়াই। এ লড়াইয়ে কোনো কাফের থেকে সাহায্য নেওয়া ইসলামের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। সে সময় নির্দেশনা এমনই ছিল—কোনো কাফের থেকে সাহায্য নেওয়া যাবে না। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন। বললেন, ফিরে যাও; আমরা কোনো মুশরিক থেকে সাহায্য নেব না।¹⁸

খোলাফায়ে রাশেদিনের অবস্থান তো অনেক ওপরে, পরবর্তী সাহাবায়ে কেরামও সর্বদা এই মূলনীতিটি অনুসরণ করে चलेছেন। হজরত মুআবিয়া রা.-এর শাসনামলে রোমকদের সাথে একবার শান্তিচুক্তি চলছিল। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেভাগেই হজরত মুআবিয়া সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করে ফেললেন। এরপর সময় শেষ হওয়ার সাথে সাথে হামলা শুরু করলেন। রোমকরা আচানক এ আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না, তাই পিছু হটতে লাগল। মুআবিয়া রা. এলাকার পর এলাকা জয় করে সামনে এগোতে লাগলেন। ইত্যবসরে সাহাবি আমর ইবনে আবাসা রা. পেছন থেকে দ্রুত বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে মুআবিয়া রা.-এর পথরোধ করে দাঁড়ালেন। এরপর একটি হাদিস শোনালেন, যার আলোকে এই হামলা বৈধ হয় না। মুআবিয়া রা.-এর ধারণা ছিল, আক্রমণটি যেহেতু শান্তিচুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরই করা হয়েছে, তাই এটা চুক্তিভঙ্গের আওতায় পড়ে না। কিন্তু আবাসা রা.-এর থেকে হাদিসটি শোনামাত্রই কোনো ব্যাখ্যা ও তাবিলের আশ্রয় না নিয়ে বিজিত এলাকা ছেড়ে পুরো বাহিনী নিয়ে সোজা ফিরে এলেন।¹⁹

যে সেনাপতি নিজের সফল একটি কৌশল নিয়ে বিজয়ের নেশায় সামনে এগিয়ে যায়, তার জন্য আক্রমণ থামানোই তো মহা মুশকিল, সে জায়গায় বিজিত এলাকা ছেড়ে দিয়ে পিছু হটা তো অকল্পনীয় ব্যাপার। কিন্তু মূল লক্ষ্য যেহেতু সিয়াসাত ও রাষ্ট্রশাসন নয়, বরং শরিয়তের আনুগত্য ও অনুসরণ, তাই এ অভিযান অবৈধ হওয়ার বিষয়টি জানামাত্রই তিনি ফিরে এসেছিলেন।

তো, আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস এমন অভাবনীয় অতুলনীয় সব উদাহরণে ভরপুর, যাতে মুসলমানরা যত কার্যকর কৌশলই হোক না কেন, এর কারণে শরিয়তের ক্ষুদ্র একটি বিধান লঙ্ঘন করতেও সম্মত হয়নি; বরং সে কৌশলটিই ছুড়ে ফেলেছে।

এজন্য ইসলামি রাজনীতিতে সকল কর্মকাণ্ড শরিয়তের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হওয়া জরুরি। কিন্তু দুঃখজনক হল বর্তমানে এ বিষয়টি কীভাবে যেন সকলের চোখের আড়ালে চলে গেছে। ধর্মের সাথে সম্পর্কহীন প্রচলিত রাজনীতির চিন্তক ও বিশেষজ্ঞরা যে পদ্ধতি ও কৌশল ঠিক করে দেন এবং যেগুলো বিশ্বজুড়ে সমাদৃত রেওয়াজে পরিণত হয়েছে, সেগুলোই ইসলামি রাজনীতিতে গ্রহণ করা হচ্ছে, অথচ এটা দেখার প্রয়োজন মনে করা হচ্ছে না—এ ব্যাপারে শরিয়ত কী বলে? কৌশলটি এবং এর সাথে আবশ্যকীয়ভাবে যুক্ত অন্য সকল বিষয় শরিয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ নাকি নাজায়েজ?

টিকাঃ
১৭. সহিহ মুসলিম, ২:১০৬; সিয়ার, ২:৩৬২-৩৬৩; ইসাবা, ২:২২৩
১৮. জামে তিরমিজি, কিতাবুস সিয়ার, আহলুষ যিম্মাহ ইয়াকযুনা অধ্যায়
১৯. তিরমিজি, আবওয়াবুস সিয়ার, মা জা-আ ফিল গাদরি অধ্যায়।

📘 রাষ্ট্র রাজনীতি ও ইসলাম > 📄 বয়কট ও হরতাল

📄 বয়কট ও হরতাল


উদাহরণত সরকার থেকে নিজেদের দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য আজকাল হরতাল পালন করা হয়। ব্যাপার যদি শুধু এতটুকু হত যে, লোকজন দাবি আদায়ের জন্য স্বেচ্ছায় নিজেদের ব্যবসাবাণিজ্য ও গাড়িঘোড়া বন্ধ করে রাখে, তাহলে অন্যান্য ক্ষতিকর দিক না থাকার শর্তে একে একটি বৈধ কৌশল বলা যেত। এ প্রসঙ্গে হাকিমুল উম্মত রহ. বলেন, বয়কট বা নন কো-অপারেশন—শরিয়তের চোখে একে জিহাদের অংশ বলার সুযোগ নেই। (প্রমাণবিষয়ক আলোচনায় বিষয়টি দেখে নেবেন।) এ বরং স্বতন্ত্র একটি প্রতিবাদ পদ্ধতি, যা মৌলিকভাবে বৈধ।²⁰

কিন্তু এমন হরতাল বা বয়কট, যা সকলে খুশি মনে পালন করে, দুনিয়ায় এর অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। বেশির ভাগ সময়ই মানুষকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে এসবে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। কেউ অস্বীকৃতি জানালে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়, আর্থিকভাবেও ক্ষতির মুখে ফেলা হয়। পাশাপাশি মারামারি ও বোমাবাজি তো হরতালের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পথঘাটে মানুষ ও গাড়ি চলাচল আটকে দেওয়া হয়, গাড়ি ভাঙচুর হয় অনেক, ব্যবসায়ীরা হামলার ভয়ে দোকানপাট বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়, আর বিশেষ প্রয়োজনে যাদের বাইরে বের হতেই হয়, তারাও সবসময় ভয়ে থাকে কখন কী হয়ে যায়। হরতাল চলাকালীন অনেক নিরীহ মানুষ মারা যায়, অনেক রোগী হসপিটালে যেতে না পেরে কাতরাতে কাতরাতে মারা যায় এবং অনেক দিনমজুর-দরিদ্র মানুষের জীবন অর্থ ও খাদ্য সংকটে পড়ে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।

এসব বর্তমানে হরতালের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এসব ছাড়া একটি সফল হরতালের কল্পনাও করা যায় না। বোঝাই যাচ্ছে, এগুলো শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম। আর যে জিনিসটির কারণে এত সব হারাম কাজ করতে হয়, তা জায়েজ হয় কীভাবে? এজন্য হাকিমুল উম্মত রহ. প্রচলিত হরতালকে নাজায়েজ বলতেন। খেলাফত আন্দোলনের সময় যে 'অনশন আন্দোলন' চলছিল, এর মধ্যে হরতালও ছিল। এ আন্দোলনের একটি সিদ্ধান্ত ছিল ব্রিটিশ পণ্য বয়কট করা। ফলে, ব্রিটিশ পণ্য বিক্রি করে এমন দোকানগুলোতে আন্দোলনের পক্ষ থেকে স্বেচ্ছাসেবক নিযুক্ত করে দেওয়া হত, যাদের কাজ ছিল যেভাবেই হোক ক্রেতাদের সেসব দোকান থেকে ফিরিয়ে রাখতে হবে। একান্ত কিনেই যদি ফেলত কেউ, তখন পণ্য ফেরত দিয়ে আসতে বাধ্য করা হত। এমনকি দোকানদারদেরও বাধ্য করা হত তারা যেন ব্রিটিশ পণ্য না রাখে। যদি কেউ অমান্য করত, তাকে নানাভাবে শায়েস্তা করা হত, লোকটার জীবিকা নির্বাহের অন্য কোনো মাধ্যম আছে কি নেই তা দেখার প্রয়োজন বোধ করা হত না। তার পরিবার কি না খেয়ে মরল, সে নিয়েও কারও ভাবনা ছিল না।

হাকিমুল উম্মত রহ. এমন পদ্ধতির বয়কট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, এই ঘটনার মধ্যেও অনেকগুলো গুনাহের কাজ জড়িয়ে আছে। এক হল— একটি বৈধ কাজ পরিত্যাগ করতে বাধ্য করা। কারণ, বিশেষ কিছু জিনিস ছাড়া বাকি সকল পণ্য বেচাকেনা আহলে হারব তথা যুদ্ধে লিপ্ত শত্রুদের সাথেও করা জায়েজ, চুক্তির আওতাধীন লোকদের সাথে তো বটেই।

দ্বিতীয়ত, ক্রয়-বিক্রয় চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার পর পণ্য ফেরত দিতে বাধ্য করা আরও বড় গুনাহ। কারণ, ‘খেয়ারের শর্ত’ বা পণ্য ফেরত দেওয়ার স্বাধীনতা থাকার শর্ত না থাকলে ফেরত দেওয়াটা মূলত নতুন করে কেনাবেচার মতোই। ফলে, এখানে উভয় পক্ষের সম্মতি আবশ্যক। এ ছাড়া তা জায়েজ হবে না। কিন্তু তৃতীয় পক্ষ এসে বাধ্য করলে সে সম্মতি পাওয়া গেল কীভাবে?

তৃতীয়ত, কেউ এই জবরদস্তি মানতে অস্বীকার করলে তাকে নানাভাবে কষ্টে ফেলা জুলুম। এটা আরেকটা অপরাধ। চতুর্থত, ক্রেতা বা ব্যবসায়ীর পরিবার-পরিজনকে অসুবিধায় ফেলাও গুনাহের কাজ। এটাও জুলুম। পঞ্চমত, একে শরিয়তের দৃষ্টিতে ওয়াজিব বলে ঘোষণা করা হলে তা শরিয়ত বিকৃতি হবে।²¹

বয়কটের আলোচনার পর তিনি হরতাল বিষয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, এর মধ্যেও ওপরে তিন নম্বরে উল্লেখিত আপত্তিটি রয়েছে। এবং যদি এই আন্দোলনে শরিক না হলে শারীরিকভাবে কষ্ট দেওয়া হয়, তাহলে এটি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেয়েও বড় অপরাধ। ইসলামের রুচি ও দাবির সাথে এ কোনোভাবেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তা ছাড়া বয়কট ও হরতালে অংশ নিতে বাধ্য করার দ্বারা এই বলপ্রয়োগকারী লোকগুলো নিজেদের পছন্দ করা 'স্বাধীনতানীতি' নিজেরাই ভঙ্গ করে বসে আছে। আর না হয় নিজেদের জন্য স্বাধীনতা চাইতে গিয়ে অন্যের স্বাধীনতায় হাত দেওয়ার কী অর্থ!²²

টিকাঃ
২০. আর-রাওজাতুন নাজিরা, ইফাদাতে আশরাফিয়া দর মাসায়িলে সিয়াসিয়া: ১০
২১. মুআমালাতুল মুসলিমিন, ইফাদাতে আশরাফিয়া: ২৭-২৮
২২. দেখুন-ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৬:২০১

📘 রাষ্ট্র রাজনীতি ও ইসলাম > 📄 আমরণ অনশন

📄 আমরণ অনশন


এমনিভাবে দাবিদাওয়া আদায় করার জন্য আরেকটি বিশেষ পদ্ধতি পালন করা হয়—আমরণ অনশন। হাকিমুল উম্মত রহ. এ ব্যাপারে বলেন, গ্রেফতার হয়ে জেলে যাওয়ার পর অনেকে আমরণ অনশন শুরু করে। এটি করতে গিয়ে কেউ কেউ এমনকি জীবন পর্যন্ত দিয়ে দেয় এবং জনগণ তাদের এই প্রাণ উৎসর্গের প্রশংসা করে।

হজরত থানবি রহ.-এর শরয়ি বিধান বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, এ যে আত্মহত্যা এবং নাজায়েজ এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তোমরা নিজেদের হত্যা কোরো না। হিদায়া গ্রন্থের 'ইকরাহ' অধ্যায়ে বলা হয়েছে : সে গুনাহগার হবে, যেমনটি হয় নিতান্ত ক্ষুধার্ত অবস্থায়। এবং ইনায়া গ্রন্থে বলা হয়েছে : সুতরাং, আহার থেকে বিরত থাকাটি হল হালাল খাবার থেকে বিরত থেকে মারা যাওয়া বা অঙ্গহানি ঘটানোর মতো। ফলে, সে গুনাহগার হবে...

এই বিবরণ থেকে জানা গেল, জান বাঁচানো এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি ফরজ যে, একদম নিরুপায় অবস্থায় যদি মারা যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয় এবং মৃত জন্তু খেলে বেঁচে যাবে বলে মনে করে, তাহলে এমন সময়ে তা না খেয়ে মরে যাওয়া গুনাহের কাজ। সে জায়গায় হালাল খাবার না খেয়ে জীবন দিয়ে দেওয়া তো অবশ্যই গুনাহ। আর, এমন গুনাহের একটি কাজের প্রশংসা করলে তো ইমান চলে যাওয়ারই আশঙ্কা হয়। কারণ, এর দ্বারা স্পষ্টভাবেই শরিয়তকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়। কেননা শরিয়ত যে কাজকে নিন্দনীয় বলেছে, প্রশংসাকারীরা একেই ভালো কাজ বলে প্রশংসায় মেতে উঠছে।²³

অন্য এক জায়গায় বলেন, এই (আমরণ অনশন) আত্মহত্যার নামান্তর। এতে সত্যিই যদি মারা যায়, তাহলে সে মৃত্যু হারাম হবে।²⁴

টিকাঃ
২৩. ইফাদাতে আশরাফিয়া দর মাসায়েলে সিয়াসিয়া: ২৮-২৯
২৪. আল-ইফাদাতুল ইয়াউমিয়া, ৩:৩০, মালফুজ নং: ১৪

📘 রাষ্ট্র রাজনীতি ও ইসলাম > 📄 রাজনৈতিক পাবলিসিটির প্রচলিত রূপ

📄 রাজনৈতিক পাবলিসিটির প্রচলিত রূপ


বর্তমান রাজনীতিতে পাবলিসিটি ও প্রোপাগান্ডা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে পশ্চিমের বিখ্যাত রাজনীতিক গোয়েবলস-এর নীতিটি মান্য করা হয় : মিথ্যা খুব জোরেসোরে লাগাতার বলতে থাকো, মানুষ একসময় একে সত্য বলে ধরে নেবে।

বর্তমানের সরকার ও ধর্মহীন রাজনৈতিক দলগুলো তো এ নীতি অনুসরণ করছেই, কিন্তু দুঃখজনক হল অনেক সময় ইসলামিক দলগুলোও পরিবেশ-পরিস্থিতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এ নীতির ওপর উঠে আসছে। হয়তো তারা এর জায়েজ হওয়া না-হওয়া নিয়ে ভাবছেই না, অথবা এখানেও সেই চিন্তাটিই লালন করছে— রাজনীতিকে শুদ্ধ করার এ অভিযানে এমন ছোট ছোট বিষয়গুলো থেকে একটু- আধটু চোখ বন্ধ করে রাখতেই হবে।

মিথ্যা বলা তো হারামই। এ নিয়ে আর সন্দেহ কী! কিন্তু এ নিয়ে যেন কেউ ভাবছেই না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য বৈধ কারণ ছাড়া গিবত করা, তাদের বিরুদ্ধে নাজায়েজ কথা বলা, অপবাদ আরোপ করা, যাচাই না করেই প্রোপাগান্ডা ছড়ানো, বা তত্ত্বতালাশ না করে সেসব বিশ্বাস করা—এ সবকিছু আমাদের ইসলামিক দলগুলোর মধ্যেও প্রবেশ করে বসে আছে, সচেতনে বা অবচেতনে। পরিণতিতে অনৈক্য ও বিশৃঙ্খলা, দলবাজি ও হানাহানি বাড়ছেই শুধু। হাকিমুল উম্মত রহ. বিভিন্ন বক্তব্যে এমন কর্মকাণ্ড নাজায়েজ ও অবশ্যই পরিত্যাজ্য ঘোষণা করেছেন।

এমনিভাবে, সভাসমাবেশও জনগণ পর্যন্ত নিজেদের বক্তব্য পৌঁছানোর মাধ্যম হিসেবে খুবই জনপ্রিয়। কিন্তু এখানেও অনেক সময় শরয়ি বিধিবিধানের তোয়াক্কা করা হয় না। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, যখন কোনো কৌশল কুরআন-হাদিসে বর্ণিত সুস্পষ্ট কৌশলের বিরুদ্ধে যায়, তখন তা তো নিষিদ্ধই। বিশেষ করে সেটি যখন অনর্থক ও ক্ষতিকর হয়, তখন তা নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে কী সন্দেহ! এখানে তো 'শরিয়ত সমর্থিত প্রয়োজন নিষিদ্ধ কাজকে প্রয়োজন অনুপাতে বৈধ করে দেয়' মূলনীতিটিও প্রয়োগ হওয়ার সুযোগ নেই। যেমন হরতাল, সভাসমাবেশ। এগুলোতে অযথা সময় নষ্ট হয়, পয়সা খরচ হয়, দরিদ্র মানুষকে অন্যায় দুর্ভোগ পোহাতে হয়, নামাজের সময় পেরিয়ে যায়—কেউ টেরও পায় না। এত সব স্পষ্ট গুনাহের কাজ থাকার পরও তা কীভাবে জায়েজ হতে পারে? একজন জিজ্ঞেস করল, যদি এসবে অংশগ্রহণ করা দ্বারা হক ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা উদ্দেশ্য হয়, তাহলে? জবাবে তিনি বললেন, এসবের দ্বারা হক ও ইনসাফকে সাহায্য করা হয় না। দ্বিতীয় কথা হল—কোনো নাজায়েজ কাজ নিয়তের দ্বারা জায়েজ হয়ে যায় না।²⁵

অন্য আরেক জায়গায় প্রচলিত রাজনৈতিক কর্মপন্থার ব্যাপারে নিজের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গিটি আরও পরিষ্কার ভাষায় তুলে ধরেছেন। তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল—যারা সরকারের মোকাবেলা করতে যান, এরপর গ্রেফতারও হন, আবার পালটা কিছু করেনও না। এক ধরনের নীরব লড়াই। সরকার যদি জুলুম ও নিপীড়ন চালায়, তখনো পালটা প্রতিরোধের জন্য বিশেষ কিছু করে না। আগের মতোই—প্রতিবাদ করো, জেলে যাও, তারপর আবার প্রতিবাদ করো—এভাবে চলতে থাকে। এ ব্যাপারে শরিয়তের বক্তব্য কী?

জবাবে তিনি বলেছিলেন, আমাদের বিবেচনায় এখানে দুটো পথই শুধু দেখি: হয় মোকাবেলা করার শক্তি আছে, না হয় নাই। যদি শক্তি থাকে, তাহলে গ্রেফতার হবে কেন? তার জন্য উচিত জানপ্রাণ দিয়ে লড়াই ও প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়া। তা যদি না পারে, তাহলে বোঝাই যাচ্ছে এটা হল অক্ষমতা ও অপারগতার কাল। এমন সময়ে স্বেচ্ছায় নিজেকে জুলুমের মুখে ফেলা, কারাগারে বন্দি হওয়া, শরিয়তে এসবের অনুমতি নেই; বরং এমন নিষ্ফল অক্ষম মোকাবেলার পরিবর্তে সবর করা উচিত। মোটকথা দাঁড়াল এই—শক্তি থাকলে প্রতিরোধ করো, না থাকলে সবর করো। এর বাইরে তৃতীয় কোনো পথের কথা শরিয়তে বর্ণিত নেই।

সামনে গিয়ে বললেন, এই সময়ে মুসলমানদের ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় কারণ—তাদের নেতৃত্বে বড় কেউ নেই এবং কেন্দ্রীয় কোনো শক্তি নেই। আর হওয়া সম্ভবও নয়, যদি না ঘটনাক্রমে সকলে মিলে বড় কাউকে নেতৃত্বের আসনে বসায়। ইমাম ছাড়া কিছুই হবে না। এমন একজন ইমাম যদি মিলে যায়, সবই হবে। তার নির্দেশে ময়দানে যাবে, জান দিতে হলে দেবে, কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এটা কেমন, প্রস্তুতি ছাড়া বসে থেকে হঠাৎ গিয়ে প্রাণ দিয়ে আসে? এটা কোনো মনুষ্যত্ব হল? সুতরাং, মূল কথা সেই ওপরেরটাই—সর্বোত্তম তিন যুগে যে পথটি অনুসরণ করা হয়েছে—শক্তি থাকলে লড়ো, না হয় সবর করো। বাকি সব মনগড়া পদ্ধতি। এজন্যই এসবে কোনো কল্যাণ হতে পারে না। আর কল্যাণ না থাকলে এসব পথে মুসলমান কখনো বাহ্যত সফল হলেও সে সফলতার কী দাম! আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সন্তুষ্টির বাইরে বাহ্যিক এ সফলতার কোনো মূল্য নেই। এমন অপূর্ণ সফলতা তো কাফেররাও পেতে পারে। মুসলমানদের সত্যিকারের সফলতা তো এটিই—গোলাম হয়ে থাকলেও আল্লাহর সন্তুষ্টি নিয়ে থাকবে। যদি এমন হয়—রাষ্ট্রক্ষমতা পেলে, কিন্তু আল্লাহ সন্তুষ্ট হলেন না, তাহলে এ ক্ষমতা আর ফেরাউনের রাজত্বে পার্থক্য রইল কই? সুতরাং, আল্লাহকে খুশি করার চেষ্টা করো, তাঁর সাথে সত্যিকারের সম্পর্ক তৈরি করো, ইসলাম ও শরিয়তের বিধিবিধান মেনে চলো। ওই সমস্ত মূর্তির পূজা তো অনেক হল, এবার আল্লাহর সামনে মাথা রেখেও দেখো কী হয়।²⁶

টিকাঃ
২৫. আল-ইফাদাতুল ইয়াউমিয়া, ৫:১৩৬, মালফুজ নং: ১৫২
২৬. আল-ইজাফাতুল ইয়াউমিয়া, ৫:১৬৮-১৬৯, মালফুজ নং: ১৯০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00