📄 শাসকদের সঙ্গে মেলামেশার অবস্থাসমূহ
(৮৯) ইমাম গাযালি তার ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন গ্রন্থে শাসকদের বিরুদ্ধাচরণ, তাদের মজলিসে গমনাগমন এবং তাদের দরবারে উপস্থিত হওয়া প্রসঙ্গে একটি স্বতন্ত্র পরিচ্ছেদ রচনা করেছেন। তিনি তাতে লেখেন, "জেনে রেখো, শাসকদের সঙ্গে তোমাদের তিন অবস্থা: ক) শাসকদের দরবারে যাতায়াত করা। আর এটাই সবচেয়ে নিকৃষ্ট অবস্থা। খ) শাসকবর্গ তোমার দুয়ারে উপস্থিত হওয়া। এটা ভয়াবহতার দিক থেকে পূর্বেরটার থেকে কিছুটা নিম্নস্তরের। গ) তুমি তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে। তুমিও তাদের দেখবে না আর তারাও তোমাকে দেখবে না। আর এটাই সবচেয়ে নিরাপদ হালত।"
প্রথমটি, অর্থাৎ তাদের দরবারে গমন করা শরিয়াহর দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিন্দনীয়। এ ব্যাপারে অনেক কঠোর ও অনমনীয় নুসুস বর্ণিত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বর্ণিত হাদিস এবং আসার 'মুতাওয়াতির' এর স্তরে উপনীত। তাই আমরা সেগুলো উদ্ধৃত করছি, যাতে তুমি এই কর্মের নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে শরিয়াহর স্বচ্ছ অবস্থান জানতে পারো। এরপর আমরা এর প্রকারগুলো-হারাম, মুবাহ এবং মাকরুহ সম্পর্কে আলোকপাত করব, ইলমের দৃশ্যমান বিশ্লেষণও ফাতওয়া যা দাবি করে, তার আলোকে।”
এরপর ইমাম গাযালি অসংখ্য হাদিস এবং আসার উদ্ধৃত করেন, যার অনেকগুলোর বিবরণ ওপরে আলোচনাপ্রসঙ্গে অতিক্রান্ত হয়েছে। তিনি যেসব বিষয় উল্লেখ করেছেন, কিন্তু পূর্বে আমাদের আলোচনায় উল্লেখিত হয়নি, এমন যা যা রয়েছে, তা নিম্নে উদ্ধৃত হলো:
(৯০) সুফয়ান বলেন, "জাহান্নামে একটি উপত্যকা রয়েছে যাতে শুধু সে সকল কারীরা অবস্থান করবে, যারা রাজা-বাদশাহদের দরবারে অধিক যাতায়াত করে।”
(৯১) আওযায়ি বলেন, "আল্লাহর কাছে সেই আলিমের থেকে অধিক ঘৃণ্য কিছু নেই, যে কোনো গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।"
(৯২) ইসহাক বলেন, "আমি সেই আলিমকে আলিম হিসাবেই স্বীকৃতি দিই না, যার মজলিসে উপস্থিত হয়ে তাকে পাওয়া যায় না, অনন্তর তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে জবাব আসে-'তিনি তো আমিরের দরবারে।'
এককালে আমরা শুনতাম, বলা হতো যে, “যখন তোমরা কোনো আলিমকে শাসকের দরবারে গমন করতে দেখো, তখন তোমরা তাকে তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে অভিযুক্ত করো। আমি শাসকের দরবারে যখনই গমন করেছি, তখনই বের হয়ে এসে অন্তরের মুহাসাবা করেছি। শাসকদের খেয়ালখুশির প্রচণ্ড বিরোধিতা এবং তাদের সাথে রূঢ় আচরণ করার কারণে আমি যে অবস্থার সম্মুখীন হতাম-তার জন্য নফসের ওপর একধরনের পুরস্কার ছুড়ে দেওয়ার আদত গড়েছি।”
(৯৩) সাইদ ইবনুল মুসাইয়িব তেলের ব্যবসা করতেন আর বলতেন, “নিশ্চয়ই এতে রয়েছে এ সকল শাসকদের থেকে অমুখাপেক্ষী থাকার উপকরণ।”
(৯৪) ওয়াহব বলেন, “নিশ্চয়ই এ সকল আলিমরা—যারা শাসকদের দরবারে গমন করে—উম্মাহর জন্য জুয়াড়িদের থেকেও অধিক ভয়ানক।”
(৯৫) মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ বলেন, “পায়খানার ওপরের মাছি শাসকদের দুয়ারের এ সকল কারীদের থেকে শ্রেষ্ঠ।”
(৯৬) যুহরি যখন সুলতানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করলেন, তখন তার উদ্দেশে তার এক দ্বীনী ভাই লিখলেন, “আল্লাহ আমাদের এবং আপনাকে—হে আবু বকর!—সকল প্রকার ফিতনা থেকে রক্ষা করুন। আপনি এমন এক অবস্থায় এসে উপনীত হয়েছেন, যারা আপনাকে চেনে, তাদের জন্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, আপনার কল্যাণের জন্য দুয়া করা এবং রহমত প্রার্থনা করা। আপনি বয়োবৃদ্ধ হয়ে গেছেন; অপরদিকে আল্লাহ তাআলার নিয়ামতসমূহ—তিনি আপনাকে তার কিতাবের যে উপলব্ধি দান করেছেন এবং তার নবি এর সুন্নাহর যে ইলম শিক্ষা দান করেছেন—আপনার পিঠকে ভারাক্রান্ত করে রেখেছে। আল্লাহ আলিমদের থেকে এমনটা অঙ্গীকার নেননি।
জেনে রাখুন, আপনি যে পাপ করেছেন এবং যে দুঃসাহসিকতা নিজের মাঝে ধারণ করেছেন তার সবচেয়ে সরল ও সাধারণ সমীকরণ হলো—আপনি জালিমের নিঃসঙ্গতার সাথে ঘনিষ্ঠ হয়েছেন এবং ভ্রষ্টতার পথ সহজ করেছেন। আপনি এসব মানুষদের কাছে ভেড়ার মাধ্যমে অন্যায়ের দুয়ার উন্মোচিত করেছেন। তারা আপনাকে নৈকট্য প্রদান করার সময়ও কোনো হক আদায় করেনি আর কোনো অন্যায় পরিহার করেনি। তারা আপনাকে গ্রহণ করেছে জাঁতাকলের চাকার এক অক্ষ হিসাবে, তাই আপনাকে কেন্দ্র করে তাদের জুলমের চাকা আবর্তিত হবে; গ্রহণ করেছে একটি সাঁকো হিসাবে, ফলে আপনার ওপর দিয়ে পাড়ি দিয়ে তারা পৌঁছবে তাদের দুর্যোগের দিকে; গ্রহণ করেছে একটি সিঁড়িরূপে, যাতে চড়ে তারা আরোহণ করবে তাদের গোমরাহির দিকে। তারা আপনাকে প্রদর্শন করে আলিমদের মাঝে সংশয় ও দোদুল্যমানতার অনুপ্রবেশ ঘটাবেন। আর আপনাকে ব্যবহার করে অজ্ঞ শ্রেণির আন্তরিক সমর্থন ছিনিয়ে নেবে। তারা আপনার জন্য যা কিছু ব্যয় করেছে তা ওই জিনিসের তুলনায় অতি স্বল্প, যা আপনার থেকে উজাড় করে নিয়েছে। তারা আপনার থেকে যা কিছু লাভ করে নিয়েছে-তা বাস্তবে কতইনা বেশি, কারণ তারা আপনার জন্য আপনার দ্বীনকে বরবাদ করে ছেড়েছে। আপনাকে যেন এ বিষয়টি নির্ভয় না করে যে, আপনি তাদের অন্তর্ভুক্ত হবেন, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন: "তাদের পর তাদের স্থলাভিস্থিক্ত হলো এমন উত্তরসূরিরা, যারা নামাজ বরবাদ করল এবং ইন্দ্রিয়-চাহিদার অনুগামী হলো।”⁹³
আপনি এমন সত্তার সাথে লেনদেন করছেন, যিনি কোনো কিছু বিস্মৃত হন না। উদাসীনতা যাদের কখনোই ছুঁতে পারে না-এমন ফিরেশতাগণ আপনার সব কার্যকলাপ হুবহু সংরক্ষণ করছেন। সুতরাং আপনি আপনার দ্বীনের চিকিৎসা করুন। কারণ, তাতে রোগের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। আর আপনার পাথেয় প্রস্তুত করুন। কারণ, দূরবর্তী সফর ঘনিয়ে এসেছে। পৃথিবী কিংবা আকাশের কোনো কিছুই আল্লাহর কাছে গোপন থাকে না। ওয়াসসালাম।"
(৯৭) সুফয়ান সাওরি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু জাফরের মজলিসে প্রবেশ করলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, "আপনি আপনার প্রয়োজন তুলে ধরুন।" তখন আমি তাকে বললাম, "আপনি আল্লাহকে ভয় করুন। সারাটা পৃথিবীকে জুলম এবং অত্যাচারে ভরে ফেলেছেন!" সুফয়ান বলেন, আবু জাফর তখন তার মাথা ঝোঁকালেন। এরপর তিনি মাথা উঠিয়ে বললেন, "আপনার প্রয়োজন তুলে ধরুন।" তখন আমি বললাম, নিশ্চয়ই এই জায়গা মুসলিমদের কবজায় এসেছে মুহাজির এবং আনসার সাহাবিদের তরবারির মাধ্যমে আর তাদের সন্তানেরা আজ ক্ষুধার তাড়নায় মৃত্যু-পথযাত্রী। আপনি আল্লাহকে ভয় করুন এবং তাদের সমীপে তাদের হক পৌঁছে দিন। সুফয়ান বলেন, এরপর তিনি মাথা ঝোঁকালেন। এরপর মাথা তুলে বললেন, “আমাদের সামনে আপনার প্রয়োজন তুলে ধরুন।” তখন আমি বললাম, “উমর ইবনুল খাত্তাব হজ করেছেন। হজ আদায়কালে তিনি তার হিসাবরক্ষককে জিজ্ঞাসা করলেন, “কত খরচ করেছ?” সে বলল, “তেরো দিরহামের চেয়ে একটু বেশি।” অথচ আমি আপনাদের এখানে এত সব জিনিস দেখছি, উটও যা বহন করার সাধ্য রাখে না। এ কথাগুলো বলে সুফয়ান বেরিয়ে গেলেন।
টিকাঃ
৮৯. দ্বিতীয় খণ্ড, ১৪০-১৪৫ পৃষ্ঠা। আলোচনাপ্রসঙ্গে উল্লিখিত বর্ণনাসমূহও ইহইয়া থেকে গৃহীত।
৯০. সুনানুল বায়হাকি
৯১. হিলয়াতুল আওলিয়া
৯২. হিলয়াতুল আওলিয়া
৯৩. সুরা মারয়াম (১৯): ৫৯
৯৪. আসসামত, ইবনু আবিদ-দুনয়া: ২১৮-২১৯; আলকামিল, ইবনু 'আদি: ৫/১৯১৭; আসসিলসিলাতুয যায়িফা: ১৩৯৯
৯৫. তাবাকাতুশ শাফি'ইয়্যাহ আলকুবরা, সুবকি: ৬/৩১৪
(৮৯) ইমাম গাযালি তার ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন গ্রন্থে শাসকদের বিরুদ্ধাচরণ, তাদের মজলিসে গমনাগমন এবং তাদের দরবারে উপস্থিত হওয়া প্রসঙ্গে একটি স্বতন্ত্র পরিচ্ছেদ রচনা করেছেন। তিনি তাতে লেখেন, "জেনে রেখো, শাসকদের সঙ্গে তোমাদের তিন অবস্থা: ক) শাসকদের দরবারে যাতায়াত করা। আর এটাই সবচেয়ে নিকৃষ্ট অবস্থা। খ) শাসকবর্গ তোমার দুয়ারে উপস্থিত হওয়া। এটা ভয়াবহতার দিক থেকে পূর্বেরটার থেকে কিছুটা নিম্নস্তরের। গ) তুমি তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে। তুমিও তাদের দেখবে না আর তারাও তোমাকে দেখবে না। আর এটাই সবচেয়ে নিরাপদ হালত।"
প্রথমটি, অর্থাৎ তাদের দরবারে গমন করা শরিয়াহর দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিন্দনীয়। এ ব্যাপারে অনেক কঠোর ও অনমনীয় নুসুস বর্ণিত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বর্ণিত হাদিস এবং আসার 'মুতাওয়াতির' এর স্তরে উপনীত। তাই আমরা সেগুলো উদ্ধৃত করছি, যাতে তুমি এই কর্মের নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে শরিয়াহর স্বচ্ছ অবস্থান জানতে পারো। এরপর আমরা এর প্রকারগুলো-হারাম, মুবাহ এবং মাকরুহ সম্পর্কে আলোকপাত করব, ইলমের দৃশ্যমান বিশ্লেষণও ফাতওয়া যা দাবি করে, তার আলোকে।”
এরপর ইমাম গাযালি অসংখ্য হাদিস এবং আসার উদ্ধৃত করেন, যার অনেকগুলোর বিবরণ ওপরে আলোচনাপ্রসঙ্গে অতিক্রান্ত হয়েছে। তিনি যেসব বিষয় উল্লেখ করেছেন, কিন্তু পূর্বে আমাদের আলোচনায় উল্লেখিত হয়নি, এমন যা যা রয়েছে, তা নিম্নে উদ্ধৃত হলো:
(৯০) সুফয়ান বলেন, "জাহান্নামে একটি উপত্যকা রয়েছে যাতে শুধু সে সকল কারীরা অবস্থান করবে, যারা রাজা-বাদশাহদের দরবারে অধিক যাতায়াত করে।”
(৯১) আওযায়ি বলেন, "আল্লাহর কাছে সেই আলিমের থেকে অধিক ঘৃণ্য কিছু নেই, যে কোনো গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।"
(৯২) ইসহাক বলেন, "আমি সেই আলিমকে আলিম হিসাবেই স্বীকৃতি দিই না, যার মজলিসে উপস্থিত হয়ে তাকে পাওয়া যায় না, অনন্তর তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে জবাব আসে-'তিনি তো আমিরের দরবারে।'
এককালে আমরা শুনতাম, বলা হতো যে, “যখন তোমরা কোনো আলিমকে শাসকের দরবারে গমন করতে দেখো, তখন তোমরা তাকে তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে অভিযুক্ত করো। আমি শাসকের দরবারে যখনই গমন করেছি, তখনই বের হয়ে এসে অন্তরের মুহাসাবা করেছি। শাসকদের খেয়ালখুশির প্রচণ্ড বিরোধিতা এবং তাদের সাথে রূঢ় আচরণ করার কারণে আমি যে অবস্থার সম্মুখীন হতাম-তার জন্য নফসের ওপর একধরনের পুরস্কার ছুড়ে দেওয়ার আদত গড়েছি।”
(৯৩) সাইদ ইবনুল মুসাইয়িব তেলের ব্যবসা করতেন আর বলতেন, “নিশ্চয়ই এতে রয়েছে এ সকল শাসকদের থেকে অমুখাপেক্ষী থাকার উপকরণ।”
(৯৪) ওয়াহব বলেন, “নিশ্চয়ই এ সকল আলিমরা—যারা শাসকদের দরবারে গমন করে—উম্মাহর জন্য জুয়াড়িদের থেকেও অধিক ভয়ানক।”
(৯৫) মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ বলেন, “পায়খানার ওপরের মাছি শাসকদের দুয়ারের এ সকল কারীদের থেকে শ্রেষ্ঠ।”
(৯৬) যুহরি যখন সুলতানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করলেন, তখন তার উদ্দেশে তার এক দ্বীনী ভাই লিখলেন, “আল্লাহ আমাদের এবং আপনাকে—হে আবু বকর!—সকল প্রকার ফিতনা থেকে রক্ষা করুন। আপনি এমন এক অবস্থায় এসে উপনীত হয়েছেন, যারা আপনাকে চেনে, তাদের জন্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, আপনার কল্যাণের জন্য দুয়া করা এবং রহমত প্রার্থনা করা। আপনি বয়োবৃদ্ধ হয়ে গেছেন; অপরদিকে আল্লাহ তাআলার নিয়ামতসমূহ—তিনি আপনাকে তার কিতাবের যে উপলব্ধি দান করেছেন এবং তার নবি এর সুন্নাহর যে ইলম শিক্ষা দান করেছেন—আপনার পিঠকে ভারাক্রান্ত করে রেখেছে। আল্লাহ আলিমদের থেকে এমনটা অঙ্গীকার নেননি।
জেনে রাখুন, আপনি যে পাপ করেছেন এবং যে দুঃসাহসিকতা নিজের মাঝে ধারণ করেছেন তার সবচেয়ে সরল ও সাধারণ সমীকরণ হলো—আপনি জালিমের নিঃসঙ্গতার সাথে ঘনিষ্ঠ হয়েছেন এবং ভ্রষ্টতার পথ সহজ করেছেন। আপনি এসব মানুষদের কাছে ভেড়ার মাধ্যমে অন্যায়ের দুয়ার উন্মোচিত করেছেন। তারা আপনাকে নৈকট্য প্রদান করার সময়ও কোনো হক আদায় করেনি আর কোনো অন্যায় পরিহার করেনি। তারা আপনাকে গ্রহণ করেছে জাঁতাকলের চাকার এক অক্ষ হিসাবে, তাই আপনাকে কেন্দ্র করে তাদের জুলমের চাকা আবর্তিত হবে; গ্রহণ করেছে একটি সাঁকো হিসাবে, ফলে আপনার ওপর দিয়ে পাড়ি দিয়ে তারা পৌঁছবে তাদের দুর্যোগের দিকে; গ্রহণ করেছে একটি সিঁড়িরূপে, যাতে চড়ে তারা আরোহণ করবে তাদের গোমরাহির দিকে। তারা আপনাকে প্রদর্শন করে আলিমদের মাঝে সংশয় ও দোদুল্যমানতার অনুপ্রবেশ ঘটাবেন। আর আপনাকে ব্যবহার করে অজ্ঞ শ্রেণির আন্তরিক সমর্থন ছিনিয়ে নেবে। তারা আপনার জন্য যা কিছু ব্যয় করেছে তা ওই জিনিসের তুলনায় অতি স্বল্প, যা আপনার থেকে উজাড় করে নিয়েছে। তারা আপনার থেকে যা কিছু লাভ করে নিয়েছে-তা বাস্তবে কতইনা বেশি, কারণ তারা আপনার জন্য আপনার দ্বীনকে বরবাদ করে ছেড়েছে। আপনাকে যেন এ বিষয়টি নির্ভয় না করে যে, আপনি তাদের অন্তর্ভুক্ত হবেন, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন: "তাদের পর তাদের স্থলাভিস্থিক্ত হলো এমন উত্তরসূরিরা, যারা নামাজ বরবাদ করল এবং ইন্দ্রিয়-চাহিদার অনুগামী হলো।”⁹³
আপনি এমন সত্তার সাথে লেনদেন করছেন, যিনি কোনো কিছু বিস্মৃত হন না। উদাসীনতা যাদের কখনোই ছুঁতে পারে না-এমন ফিরেশতাগণ আপনার সব কার্যকলাপ হুবহু সংরক্ষণ করছেন। সুতরাং আপনি আপনার দ্বীনের চিকিৎসা করুন। কারণ, তাতে রোগের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। আর আপনার পাথেয় প্রস্তুত করুন। কারণ, দূরবর্তী সফর ঘনিয়ে এসেছে। পৃথিবী কিংবা আকাশের কোনো কিছুই আল্লাহর কাছে গোপন থাকে না। ওয়াসসালাম।"
(৯৭) সুফয়ান সাওরি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু জাফরের মজলিসে প্রবেশ করলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, "আপনি আপনার প্রয়োজন তুলে ধরুন।" তখন আমি তাকে বললাম, "আপনি আল্লাহকে ভয় করুন। সারাটা পৃথিবীকে জুলম এবং অত্যাচারে ভরে ফেলেছেন!" সুফয়ান বলেন, আবু জাফর তখন তার মাথা ঝোঁকালেন। এরপর তিনি মাথা উঠিয়ে বললেন, "আপনার প্রয়োজন তুলে ধরুন।" তখন আমি বললাম, নিশ্চয়ই এই জায়গা মুসলিমদের কবজায় এসেছে মুহাজির এবং আনসার সাহাবিদের তরবারির মাধ্যমে আর তাদের সন্তানেরা আজ ক্ষুধার তাড়নায় মৃত্যু-পথযাত্রী। আপনি আল্লাহকে ভয় করুন এবং তাদের সমীপে তাদের হক পৌঁছে দিন। সুফয়ান বলেন, এরপর তিনি মাথা ঝোঁকালেন। এরপর মাথা তুলে বললেন, “আমাদের সামনে আপনার প্রয়োজন তুলে ধরুন।” তখন আমি বললাম, “উমর ইবনুল খাত্তাব হজ করেছেন। হজ আদায়কালে তিনি তার হিসাবরক্ষককে জিজ্ঞাসা করলেন, “কত খরচ করেছ?” সে বলল, “তেরো দিরহামের চেয়ে একটু বেশি।” অথচ আমি আপনাদের এখানে এত সব জিনিস দেখছি, উটও যা বহন করার সাধ্য রাখে না। এ কথাগুলো বলে সুফয়ান বেরিয়ে গেলেন।
টিকাঃ
৮৯. দ্বিতীয় খণ্ড, ১৪০-১৪৫ পৃষ্ঠা। আলোচনাপ্রসঙ্গে উল্লিখিত বর্ণনাসমূহও ইহইয়া থেকে গৃহীত।
৯০. সুনানুল বায়হাকি
৯১. হিলয়াতুল আওলিয়া
৯২. হিলয়াতুল আওলিয়া
৯৩. সুরা মারয়াম (১৯): ৫৯
৯৪. আসসামত, ইবনু আবিদ-দুনয়া: ২১৮-২১৯; আলকামিল, ইবনু 'আদি: ৫/১৯১৭; আসসিলসিলাতুয যায়িফা: ১৩৯৯
৯৫. তাবাকাতুশ শাফি'ইয়্যাহ আলকুবরা, সুবকি: ৬/৩১৪
📄 আলিমের জন্য যেসব বৈশিষ্ট্য ধারণ করা উচিত
(৯৮) শায়খ ইযযুদ্দীন ইবনু আব্দিস সালাম এর একটি ঘটনা আলআমালি গ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে। গ্রন্থটি তার থেকে তার ছাত্র বিদগ্ধ মালেকি ইমাম শায়খ শিহাবুদ্দীন আলকারাফি গ্রন্থনা করেছেন। ঘটনাটি হলো, তার কাছে রাষ্ট্রের জনৈক কর্ণধার পত্র লেখেন। পত্রে তাকে তাদের সময়ের রাজার দরবারে একত্র হওয়ার এবং নিয়মিত রাজদরবারে যাতায়াত অব্যাহত রাখার জন্য উৎসাহ দেন—যাতে এর মাধ্যমে রাজার প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটা তার শত্রুশ্রেণির জন্য ঈর্ষার কারণ হয়। তখন তিনি বললেন, “আমি ইলম অধ্যয়ন করেছি যাতে আমি আল্লাহ এবং তার সৃষ্টির মাঝে মধ্যস্থতাকারী হতে পারি। আর আমি কিনা এদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে বেড়াব? কারাফি বলেন, “তিনি এর দ্বারা এদিকে ইঙ্গিত করলেন যে, যে ব্যক্তি ইলমের ধারক হয়, সে এ পর্যায়ে উপনীত হয় যে, সে আল্লাহ এর পক্ষ থেকে তার বান্দাদের দিকে ফরমান উদ্ধৃত করে। সে বার্তাবাহকের স্তরে থাকে। যার মর্যাদা এমন, তার জন্য এসব শোভন নয়।
(৯৯) ইবনুল হাজ আলমাদখাল গ্রন্থে বলেন, “আলিমের জন্য উচিত হলো, বরং তার জন্য আবশ্যিক কর্তব্য, সে কখনো কোনো দুনিয়াদারের দ্বারস্থ হবে না। কারণ, আলিমের শান হলো, মানুষেরা তার দুয়ারে থাকবে। অবস্থা উল্টে যাওয়া, অর্থাৎ আলিম সাধারণ মানুষদের দুয়ারে পড়ে থাকা কিছুতেই সংগত নয়। যে আলিম দুনিয়াদারদের দুয়ারে দুয়ারে পড়ে থাকে, সে কখনোই তার এই কাজের বৈধতা প্রমাণ করতে পারবে না। সে এ কথা বলতে পারবে না যে, “আমি শত্রু, হিংসুটে বা এ ধরনের কারও শঙ্কা করছিলাম, যে কোনো গণ্ডগোল-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে।” অথবা এ কথাও বলতে পারবে না যে, “আমার তো প্রত্যাশা ছিল, আমি এমন কোনো কিছু রোধ করতে পারব, যা সকলের জন্য শঙ্কার কারণ।” তার এ কথা বলারও অবকাশ নেই যে, “আমি তো ভেবেছিলাম, শাসকের দরবারে আমার এই যাতায়াত হবে মুসলমানদের বিপদাপদ ও প্রয়োজন পূরণের জন্য একটি অনন্য উপকরণ। আমার এ যাতায়াতের মাধ্যমে তাদের কোনো উপকার সাধিত হবে অথবা এর মাধ্যমে তাদের কোনো আপদ দূর হবে।” বস্তুত তার এমন কোনো অজুহাত নেই, যা তার পক্ষে ইতিবাচক কিছু নির্দেশ করবে।
আল্লাহ ই সেই মহান সত্তা, যিনি বান্দার সকল প্রয়োজন পূরণ করেন, তার শঙ্কাসমূহকে রোধ করেন, সৃষ্টিকুলের অন্তরসমূহকে অনুগত করেন এবং যার দিকে চান ও যেভাবে চান অন্তরসমূহকে ফিরিয়ে দেন। আল্লাহ সৃষ্টজীবের নেতাকে সম্বোধন করে বলছেন, "পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে, আপনি যদি তার সবটুকু ব্যয় করতেন, তবুও তাদের অন্তরসমূহের মাঝে সম্প্রীতি সৃষ্টি করতে পারতেন না। কিন্তু আল্লাহ তাদের অন্তরসমূহের মাঝে সম্প্রীতি সৃষ্টি করেছেন।”⁹⁶ তো আল্লাহ তাঁর নবি এর ওপর অনুগ্রহ বর্ণনার স্থানে এটাকে উল্লেখ করেছেন। আলিম যখন তাঁর অনুসারী হবে, বিশেষত সর্বক্ষেত্রে মাখলুককে পরিহার করে আল্লাহ এর ওপর ভরসা এবং নির্ভর করার ক্ষেত্রে, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ এই অনুসরণের বরকতে তার সঙ্গে সেরূপ সহৃদয় আচরণ করবেন, যেমনটি তাঁর নবি এর সঙ্গে করেছেন।
নিয়ামত পাওয়া বা না-পাওয়ার ব্যাপারে মহান আল্লাহর ওপর যারা আস্থা রাখে, আলিমগণ তাদের মধ্যে প্রণিধানযোগ্য। আলিম দুনিয়ার পেছনে ছোটার কারণ হিসাবে পরিবারের ভরণপোষণ সন্ধানের ওজর পেশ করতে পারে না। কারণ, আলিম যদি এই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানের ব্যাপারে শঙ্কাবোধ করে তা পরিহার করে, তা হলে নিশ্চয়ই মহামহিম আল্লাহ তার সদিচ্ছাকে নষ্ট করবেন না। আল্লাহ তার রিযিকের ব্যবস্থা করবেন, তার জন্য গাইবের দরজা খুলে দেবেন, নিশ্চয়ই যা পার্থিব লোভনীয় বস্তুর চেয়ে অনেক উত্তম, তাকে সাহায্য করবেন, তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে পূর্ণতা দান করবেন—যার জন্য চান, যেভাবে চান। আল্লাহ প্রদত্ত রিযিক নির্দিষ্ট কোনো উপায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
(১০০) তাবাকাতুল হানাফিয়্যাহ গ্রন্থে আলি ইবনু হাসান আস্সানদালি এর জীবনীতে রয়েছে, "সুলতান মালিক শাহ একজন আলিমকে বললেন, তুমি কেন আমার কাছে আসো না? তিনি বললেন, আমি চেয়েছি, আপনি শ্রেষ্ঠ আমিরদের একজন হন, যিনি আলিমদের যিয়ারত করেন। আমি সবচেয়ে নিকৃষ্ট আলিম হতে চাইনি, যে আমিরদের সাথে সাক্ষাৎ করে।"
(১০১) ইবনু আদি আলকামিল গ্রন্থে বলেন, আমি আবুল হুসাইন মুহাম্মাদ ইবনুল মুযাফফার কে বলতে শুনেছি, আমি মিসরে অবস্থানরত আমার শাইখদের শুনেছি, তারা আবু আব্দির রহমান আননাসায়ি এর শ্রেষ্ঠত্ব এবং ইমামাহর স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন, তার রাতভর নিয়মতান্ত্রিক ইবাদত এবং নিরবচ্ছিন্ন অধ্যবসায়ের স্তুতি বর্ণনা করেন। একবার তিনি মিসরের গভর্নরের সঙ্গে যুদ্ধে বের হলেন। তখন তার বিচক্ষণতা, রাসুলুল্লাহ এর প্রমাণিত সুন্নাহর প্রতিষ্ঠা এবং যে শাসনক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তির সঙ্গে তিনি বেরিয়েছেন, সযত্নে তার মজলিস থেকেও দূরে দূরে থাকার বৈশিষ্ট্যের কথা আলোচিত হলো। এটাই ছিল তার স্বভাব-বৈশিষ্ট্য, যাবৎ না তিনি শাহাদাতবরণ করেছেন।
(১০২) মিযযি এর তাহযিবুল কামাল গ্রন্থে বুখারি এর শায়খ আবু ইয়াহইয়া আহমাদ ইবনু আব্দিল মালিক আলহাররানি এর জীবনীতে বর্ণিত রয়েছে, তার হুবহু ভাষ্য হলো, "আবুল হাসান আল-মাইমুনি বলেন, আমি আহমদ ইবনু হাম্বল কে তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তখন তিনি বললেন, সে আমাদের এখানে ছিল। আমি তাকে বুদ্ধিমানই দেখেছি। তার মাঝে কোনো দোষ বা সমস্যা দেখিনি। আমার দেখামতে সে হাদিসের হাফিজ। আমি তার মাঝে শুধু উৎকৃষ্টতাই প্রত্যক্ষ করেছি।” আহমদ বলেন, “আমি একদল লোককে দেখেছি তার ব্যাপারে মন্দ কথা বলে।” তিনি বলেন, “সে শাসকের কাছে যাতায়াত করত তার একখণ্ড জমির কারণে।”
টিকাঃ
৯৬. সুরা আনফাল (০৮): ৬৩
৯৭. বর্ণনাটি ভিত্তিহীন। আলখাতিব বর্ণনাটি উদ্ধৃত করেছেন (৩/১৮০)। এর বর্ণনাসূত্রে ইউনুস ইবনু 'আতা এবং জাদ্দুস সাওরি নামক দুজন বর্ণনাকারী রয়েছেন। এ দুজন সম্পর্কে ইমামগণের বক্তব্য জানতে দ্রষ্টব্য-আলমিযান: ৪/৪৮২; লিসান: ৬/৩৩৩
(৯৮) শায়খ ইযযুদ্দীন ইবনু আব্দিস সালাম এর একটি ঘটনা আলআমালি গ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে। গ্রন্থটি তার থেকে তার ছাত্র বিদগ্ধ মালেকি ইমাম শায়খ শিহাবুদ্দীন আলকারাফি গ্রন্থনা করেছেন। ঘটনাটি হলো, তার কাছে রাষ্ট্রের জনৈক কর্ণধার পত্র লেখেন। পত্রে তাকে তাদের সময়ের রাজার দরবারে একত্র হওয়ার এবং নিয়মিত রাজদরবারে যাতায়াত অব্যাহত রাখার জন্য উৎসাহ দেন—যাতে এর মাধ্যমে রাজার প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটা তার শত্রুশ্রেণির জন্য ঈর্ষার কারণ হয়। তখন তিনি বললেন, “আমি ইলম অধ্যয়ন করেছি যাতে আমি আল্লাহ এবং তার সৃষ্টির মাঝে মধ্যস্থতাকারী হতে পারি। আর আমি কিনা এদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে বেড়াব? কারাফি বলেন, “তিনি এর দ্বারা এদিকে ইঙ্গিত করলেন যে, যে ব্যক্তি ইলমের ধারক হয়, সে এ পর্যায়ে উপনীত হয় যে, সে আল্লাহ এর পক্ষ থেকে তার বান্দাদের দিকে ফরমান উদ্ধৃত করে। সে বার্তাবাহকের স্তরে থাকে। যার মর্যাদা এমন, তার জন্য এসব শোভন নয়।
(৯৯) ইবনুল হাজ আলমাদখাল গ্রন্থে বলেন, “আলিমের জন্য উচিত হলো, বরং তার জন্য আবশ্যিক কর্তব্য, সে কখনো কোনো দুনিয়াদারের দ্বারস্থ হবে না। কারণ, আলিমের শান হলো, মানুষেরা তার দুয়ারে থাকবে। অবস্থা উল্টে যাওয়া, অর্থাৎ আলিম সাধারণ মানুষদের দুয়ারে পড়ে থাকা কিছুতেই সংগত নয়। যে আলিম দুনিয়াদারদের দুয়ারে দুয়ারে পড়ে থাকে, সে কখনোই তার এই কাজের বৈধতা প্রমাণ করতে পারবে না। সে এ কথা বলতে পারবে না যে, “আমি শত্রু, হিংসুটে বা এ ধরনের কারও শঙ্কা করছিলাম, যে কোনো গণ্ডগোল-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে।” অথবা এ কথাও বলতে পারবে না যে, “আমার তো প্রত্যাশা ছিল, আমি এমন কোনো কিছু রোধ করতে পারব, যা সকলের জন্য শঙ্কার কারণ।” তার এ কথা বলারও অবকাশ নেই যে, “আমি তো ভেবেছিলাম, শাসকের দরবারে আমার এই যাতায়াত হবে মুসলমানদের বিপদাপদ ও প্রয়োজন পূরণের জন্য একটি অনন্য উপকরণ। আমার এ যাতায়াতের মাধ্যমে তাদের কোনো উপকার সাধিত হবে অথবা এর মাধ্যমে তাদের কোনো আপদ দূর হবে।” বস্তুত তার এমন কোনো অজুহাত নেই, যা তার পক্ষে ইতিবাচক কিছু নির্দেশ করবে।
আল্লাহ ই সেই মহান সত্তা, যিনি বান্দার সকল প্রয়োজন পূরণ করেন, তার শঙ্কাসমূহকে রোধ করেন, সৃষ্টিকুলের অন্তরসমূহকে অনুগত করেন এবং যার দিকে চান ও যেভাবে চান অন্তরসমূহকে ফিরিয়ে দেন। আল্লাহ সৃষ্টজীবের নেতাকে সম্বোধন করে বলছেন, "পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে, আপনি যদি তার সবটুকু ব্যয় করতেন, তবুও তাদের অন্তরসমূহের মাঝে সম্প্রীতি সৃষ্টি করতে পারতেন না। কিন্তু আল্লাহ তাদের অন্তরসমূহের মাঝে সম্প্রীতি সৃষ্টি করেছেন।”⁹⁶ তো আল্লাহ তাঁর নবি এর ওপর অনুগ্রহ বর্ণনার স্থানে এটাকে উল্লেখ করেছেন। আলিম যখন তাঁর অনুসারী হবে, বিশেষত সর্বক্ষেত্রে মাখলুককে পরিহার করে আল্লাহ এর ওপর ভরসা এবং নির্ভর করার ক্ষেত্রে, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ এই অনুসরণের বরকতে তার সঙ্গে সেরূপ সহৃদয় আচরণ করবেন, যেমনটি তাঁর নবি এর সঙ্গে করেছেন।
নিয়ামত পাওয়া বা না-পাওয়ার ব্যাপারে মহান আল্লাহর ওপর যারা আস্থা রাখে, আলিমগণ তাদের মধ্যে প্রণিধানযোগ্য। আলিম দুনিয়ার পেছনে ছোটার কারণ হিসাবে পরিবারের ভরণপোষণ সন্ধানের ওজর পেশ করতে পারে না। কারণ, আলিম যদি এই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানের ব্যাপারে শঙ্কাবোধ করে তা পরিহার করে, তা হলে নিশ্চয়ই মহামহিম আল্লাহ তার সদিচ্ছাকে নষ্ট করবেন না। আল্লাহ তার রিযিকের ব্যবস্থা করবেন, তার জন্য গাইবের দরজা খুলে দেবেন, নিশ্চয়ই যা পার্থিব লোভনীয় বস্তুর চেয়ে অনেক উত্তম, তাকে সাহায্য করবেন, তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে পূর্ণতা দান করবেন—যার জন্য চান, যেভাবে চান। আল্লাহ প্রদত্ত রিযিক নির্দিষ্ট কোনো উপায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
(১০০) তাবাকাতুল হানাফিয়্যাহ গ্রন্থে আলি ইবনু হাসান আস্সানদালি এর জীবনীতে রয়েছে, "সুলতান মালিক শাহ একজন আলিমকে বললেন, তুমি কেন আমার কাছে আসো না? তিনি বললেন, আমি চেয়েছি, আপনি শ্রেষ্ঠ আমিরদের একজন হন, যিনি আলিমদের যিয়ারত করেন। আমি সবচেয়ে নিকৃষ্ট আলিম হতে চাইনি, যে আমিরদের সাথে সাক্ষাৎ করে।"
(১০১) ইবনু আদি আলকামিল গ্রন্থে বলেন, আমি আবুল হুসাইন মুহাম্মাদ ইবনুল মুযাফফার কে বলতে শুনেছি, আমি মিসরে অবস্থানরত আমার শাইখদের শুনেছি, তারা আবু আব্দির রহমান আননাসায়ি এর শ্রেষ্ঠত্ব এবং ইমামাহর স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন, তার রাতভর নিয়মতান্ত্রিক ইবাদত এবং নিরবচ্ছিন্ন অধ্যবসায়ের স্তুতি বর্ণনা করেন। একবার তিনি মিসরের গভর্নরের সঙ্গে যুদ্ধে বের হলেন। তখন তার বিচক্ষণতা, রাসুলুল্লাহ এর প্রমাণিত সুন্নাহর প্রতিষ্ঠা এবং যে শাসনক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তির সঙ্গে তিনি বেরিয়েছেন, সযত্নে তার মজলিস থেকেও দূরে দূরে থাকার বৈশিষ্ট্যের কথা আলোচিত হলো। এটাই ছিল তার স্বভাব-বৈশিষ্ট্য, যাবৎ না তিনি শাহাদাতবরণ করেছেন।
(১০২) মিযযি এর তাহযিবুল কামাল গ্রন্থে বুখারি এর শায়খ আবু ইয়াহইয়া আহমাদ ইবনু আব্দিল মালিক আলহাররানি এর জীবনীতে বর্ণিত রয়েছে, তার হুবহু ভাষ্য হলো, "আবুল হাসান আল-মাইমুনি বলেন, আমি আহমদ ইবনু হাম্বল কে তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তখন তিনি বললেন, সে আমাদের এখানে ছিল। আমি তাকে বুদ্ধিমানই দেখেছি। তার মাঝে কোনো দোষ বা সমস্যা দেখিনি। আমার দেখামতে সে হাদিসের হাফিজ। আমি তার মাঝে শুধু উৎকৃষ্টতাই প্রত্যক্ষ করেছি।” আহমদ বলেন, “আমি একদল লোককে দেখেছি তার ব্যাপারে মন্দ কথা বলে।” তিনি বলেন, “সে শাসকের কাছে যাতায়াত করত তার একখণ্ড জমির কারণে।”
টিকাঃ
৯৬. সুরা আনফাল (০৮): ৬৩
৯৭. বর্ণনাটি ভিত্তিহীন। আলখাতিব বর্ণনাটি উদ্ধৃত করেছেন (৩/১৮০)। এর বর্ণনাসূত্রে ইউনুস ইবনু 'আতা এবং জাদ্দুস সাওরি নামক দুজন বর্ণনাকারী রয়েছেন। এ দুজন সম্পর্কে ইমামগণের বক্তব্য জানতে দ্রষ্টব্য-আলমিযান: ৪/৪৮২; লিসান: ৬/৩৩৩
📄 শেষ যামানায় সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস
(১০৩) তাহযিবুল কামাল গ্রন্থে রিশদিন ইবনু সা'দ থেকে আরও বর্ণিত রয়েছে, তিনি বলেন, আমি ইবরাহিম ইবনু আদহাম কে বলতে শুনেছি, আমি শুনেছি, “শেষ যামানায় সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস হবে তিনটি— দ্বীনি ভাই, যার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়া যায়; হালাল পন্থায় রৌপ্যমুদ্রা উপার্জন এবং শাসকের সামনে সত্য কথা।”
টিকাঃ
৯৮. তাহযিবুল কামাল, মিযযি: ১/৩০
৯৯. তাহযিবুল কামাল, মিযযি: ১/৪৯
(১০৩) তাহযিবুল কামাল গ্রন্থে রিশদিন ইবনু সা'দ থেকে আরও বর্ণিত রয়েছে, তিনি বলেন, আমি ইবরাহিম ইবনু আদহাম কে বলতে শুনেছি, আমি শুনেছি, “শেষ যামানায় সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস হবে তিনটি— দ্বীনি ভাই, যার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়া যায়; হালাল পন্থায় রৌপ্যমুদ্রা উপার্জন এবং শাসকের সামনে সত্য কথা।”
টিকাঃ
৯৮. তাহযিবুল কামাল, মিযযি: ১/৩০
৯৯. তাহযিবুল কামাল, মিযযি: ১/৪৯
📄 শাসকদের কাছে গমনাগমনের ব্যাপারে কবিদের বক্তব্য
(১০৪) খালফ ইবনু তামিম বলেন, আমি ইবরাহিম ইবনু আদহাম কে আবৃত্তি করতে শুনেছি, তিনি বলছেন, “আমি অসংখ্য মানুষকে দেখেছি, যারা একেবারে স্বল্প দ্বীনদারি নিয়ে সন্তুষ্ট। অথচ আমি তাদের পার্থিব জীবনের স্বল্প ভোগসামগ্রী নিয়ে সন্তুষ্ট হতে দেখিনি। সুতরাং তুমি আল্লাহকে নিয়ে তুষ্ট হয়ে রাজা-বাদশাহদের দুনিয়া থেকে অমুখাপেক্ষী হও; যেমনিভাবে রাজা-বাদশাহরা তাদের দুনিয়া নিয়ে দ্বীনদারি থেকে অমুখাপেক্ষী হয়েছে। "¹⁰⁰
(১০৫) আল-কালি তার আমালি গ্রন্থে উল্লেখ করেন, "সুলায়মান আল-মুহাল্লাবি খাইল ইবনু আহমাদ এর কাছে এক লক্ষ দিরহাম দিয়ে পাঠালেন। এবং তার কাছে তার সান্নিধ্য প্রার্থনা করলেন। তখন তিনি তার এক লক্ষ দিরহাম ফিরিয়ে দিলেন এবং তার উদ্দেশে কয়েকটি চরণ লিখলেন, "তুমি সুলায়মানের কাছে এ সংবাদ পৌঁছে দাও যে, আমি তার থেকে অধিক প্রাচুর্য এবং সচ্ছলতায় রয়েছি, তবে আমি সম্পদশালী নই। আমি আন্তরিকভাবে উদার। আমি কাউকে ক্ষুধার্ত হয়ে শীর্ণ দেহে মরে যেতে এবং ভাগ্যবিড়ম্বনার শেষ স্তরে উপনীত হয়ে কাতরাতে দেখিনি। রিযিক সুনির্ধারিত, ভাগ্যলিপিতে লিপিবদ্ধ। অক্ষমতা তা হ্রাস করে না, আর কৌশল-অবলম্বনকারীর কৌশল তাতে প্রবৃদ্ধি আনে না। দারিদ্র্য থাকে অন্তরে, সম্পদে নয়—যা তুমি জানো। আর অনুরূপভাবে সচ্ছলতাও থাকে অন্তরে, সম্পদে নয়।”¹⁰¹
(১০৬) আবু নুয়াইম হিলয়াতুল আওলিয়া গ্রন্থে মুহাম্মাদ ইবনু উহাইব ইবনু হিশাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ইবনুল মুবারক এর একজন শাগরিদ আমাদের এই কবিতা আবৃত্তি করে শোনালেন, "তুমি শুষ্ক রুটি, চাল এবং যবের চাপাতি খেয়ে জীবনধারণ করো। এগুলোকেই তোমার হালাল খাবাররূপে গ্রহণ করো। এসব তোমাকে জাহান্নামের উষ্ণতা থেকে রক্ষা করবে। আমি তো আর পারলাম না। আল্লাহ তোমাকে শাসকের দরবার থেকে রক্ষা করে সাফল্যের পথে পরিচালিত করুন। "¹⁰²
(১০৭) আবু নুয়াইম হিলয়াতুল আওলিয়া গ্রন্থে আহমাদ ইবনু জামিল আলমারওয়াযি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারাক কে বলা হলো, ইসমাইল ইবনু উলাইয়াহ সাদাকা উশুলের কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তখন তার উদ্দেশে ইবনুল মুবারাক লিখলেন, “হে ওই ব্যক্তি, যে তার ইলমকে শ্যেনে পরিণত করেছে, যা মিসকিনদের ধনসম্পদ ছোঁ মেরে শিকার করে আনে। দুনিয়া এবং তার স্বাদ এমন অপকৌশলের মাধ্যমে অধিকারে আসে, যা দ্বীনকে রীতিমতো বিলুপ্ত করে দেয়। তুমি নিজেই দুনিয়া পেয়ে উন্মাদ হয়ে গেছ। অথচ একদা তুমিই ছিলে উন্মাদদের প্রতিষেধক। শাসকদের দরবার ত্যাগ করার যে সকল বর্ণনা তুমি বর্ণনা করতে, কোথায় গেল আজ সেসব? ইতিপূর্বে ইবনু আওন আর ইবনু সিরিনের থেকে যে সকল বর্ণনা তুমি উদ্ধৃত করতে, আজ কোথায় তা অবলুপ্ত হলো? যদি তুমি বলো, আমাকে বাধ্য করা হয়েছে, তা হলে এটা একটা বেহুদা কথা। ইলমের নির্মাণশিল্পী মৃত্তিকায় পদস্খলিত হয়েছে।” বর্ণনাকারী বলেন, তিনি যখন এই চিঠিটা পড়লেন, তখন কেঁদে ফেললেন এবং চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়ে নিলেন।¹⁰³
(১০৮) ইমাম শাফেয়ি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার একজন বন্ধু ছিল, যার নাম ছিল হাসিন। সে আমার সাথে সদাচারণ করত এবং সর্বদা সুসম্পর্ক বজায় রাখত। একদিন আমিরুল মুমিনিন তাকে শাসনকর্তা পদে নিয়োগ দিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, ইমাম শাফেয়ি তখন তার উদ্দেশে লিখলেন, "তুমি এই সম্পর্ককে তোমার কাছে রেখে দাও। কেননা, তোমার সম্প্রীতি আমার থেকে তালাকপ্রাপ্ত। তবে তা অপ্রত্যাহার্য তালাক নয়। যদি তুমি নিবৃত্ত হও, তবে তা এক তালাক হয়ে থাকবে। আমার জন্য তোমার ভালোবাসা এরপরও দুইয়ের ওপর স্থায়ী হবে। আর যদি তুমি আঁকাবাঁকা পথে চলো, তা হলে তুমি তার পরবর্তী তালাকগুলোর জন্য আবদার উত্থাপন করলে। সুতরাং পরবর্তী দুই মাসিক স্রাবে অবশিষ্ট দুই তালাক পতিত হয়ে যাবে। কেননা, তিন তালাক আমার পক্ষ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তোমার কাছে এসেছে। এ ক্ষেত্রে বাহরাইনের শাসনক্ষমতা তোমার কোনো উপকারে আসবে না। আমি আসলে এক হাসিনকে ছেড়ে দিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছি না; বরং আমি এক আদর্শ রেখে যেতে চাচ্ছি, যাতে প্রত্যেক হাসিনপন্থীর চেহারা কালিমালিপ্ত হয়। "¹⁰⁴
(১০৯) আবু নুয়াইম মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াহব থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ইবনুল মুবারক এর এক শাগরিদ আমাদের এই কবিতা আবৃত্তি করে শোনালেন, “তোমরা তোমাদের মিসআর সুফয়ান এবং ইবনু মিগওয়াল আর তাই গোত্রের তাকির অনুসরণ করলে না কেন—যখন তারা সকলে ছিল তাকওয়ার বন্ধনীতে আবদ্ধ। তাকি তো সমগ্র বিশ্বের শোভা এবং সমকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। তাদের দৃষ্টান্ত মস্তিষ্কের মতো। তুমি তাদের দেখবে রাতের নামাজে নিদ্রাহীন চোখে দণ্ডায়মান। দু-চোখে নেই একফোঁটা ঘুম কিংবা নিদ। সর্বদা ঘরে উপবিষ্ট। গৃহের ডালে চুপটি মেরে আসীন। একান্ত কোনো বিপদ আপতিত হলে কিংবা জুম’আর প্রয়োজনেই শুধু তারা বাইরে বেরিয়ে থাকে। কলজেসহ ক্ষুধার্ত ও সংকুচিত উদর। তাকওয়ার ভীতিতে তারা কখনো হারাম আস্বাদন করে না। তাদের রয়েছে জনমানুষের চিন্তা। আর ফসল কর্তনের সময় কাওমের সকল চিন্তা থাকে শুধু নিজেদের নিয়ে, অথচ কাওমের লোকেরা বীজই বপন করেনি।
(১১০) হাফিজ আবু নাসর ইবনু মা’কুলা বলেছেন, “আমি শাসকের দরবার পরিহার করেছি। কারণ, আমি এমন কিছু জানি, যা গোটা জিন-ইনসান জানে না। আমি সুহাইলকে দেখেছি, যে জীবনের পথচলায় সূর্যের থেকে অপমানজনক অবস্থান ছাড়া অন্য কিছুই পায়নি।”
(১১১) কবি বলেছেন, “হায়রে দিবাস্বপ্ন! শাসকের কাছে বিপদ নেমেছে। শাসকের দুয়ারে প্রবেশকারী পথভ্রষ্ট হয়েছে।”
(১১২) শাসক ইযযুদ্দীন শায়খ শাতেব এর কাছে তার দরবারে উপস্থিত হওয়ার জন্য সংবাদ পাঠালেন। তখন শায়খ তার এক ছাত্রকে নিচের পঙ্ক্তিগুলো লিখতে বললেন, “তুমি সতর্ক ও দূরদর্শী উপদেশ-প্রদানকারীর পক্ষ থেকে শাসককে বলো যে, ফকিহ যখন তোমাদের দুয়ারে এসে উপস্থিত হবে, তখন আর তাতে কোনো কল্যাণ অবশিষ্ট থাকবে না।”
(১১৩) যায়দ ইবনু আসলাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু হাযিম এর সঙ্গে ছিলাম। তখন শাসক আব্দুর রহমান ইবনু খালিদ তার কাছে এই সংবাদ দিয়ে দূত পাঠালেন যে, "আপনি আমাদের কাছে আগমন করুন। যাতে আমরা আপনার কাছে বিভিন্ন বিষয় জিজ্ঞাসা করতে পারি এবং আপনি আমাদের কাছে হাদিস বর্ণনা করতে পারেন।” তখন আবু হাযিম বললেন, "আল্লাহর কাছে পানাহ! আমি আহলুল ইলমকে দেখেছি, তারা দুনিয়াবাসী র কাছে ইলম বহন করে নিয়ে যায় না। নিশ্চয়ই আমি এই অপরাধকর্মের প্রথম প্রবক্তা হতে পারব না। যদি আপনার কোনো প্রয়োজন থেকে থাকে, তা হলে আপনি আমাদের কাছে তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করুন।" তখন আব্দুর রহমান তার কাছে দূত মারফত এই সংবাদ পৌঁছালেন যে, "আপনি এর মাধ্যমে আমাদের চোখে আরও অধিক মর্যাদাবান হয়েছেন।”
টিকাঃ
১০০. হিলয়াতুল আওলিয়া: ৬/৩৭৬
১০১. মু'জামুল উদাবা, ইয়াকুত হামাবি: ১১/৭৫-৭৬; তাবাকাতুন নাহবিয়্যিন, যাবিদি: ৪৭; ইম্বাহুর রুওয়াত: ১/২৪৪
১০২. আসসিয়ার, যাহাবি ৮/৪১৪-৪১৫
১০৩. জামি'উ বায়ানিল ইলম, ইবনু আব্দিল বার: ২৬৭-২৬৮; আসসিয়ার, যাহাবি: ৮/৪১১-৪১২; সিফাতুস সাফওয়াহ, ইবনুল জাওযি: ৪/১৪০
১০৪. তারিখু ইবনি আসাকির
(১০৪) খালফ ইবনু তামিম বলেন, আমি ইবরাহিম ইবনু আদহাম কে আবৃত্তি করতে শুনেছি, তিনি বলছেন, “আমি অসংখ্য মানুষকে দেখেছি, যারা একেবারে স্বল্প দ্বীনদারি নিয়ে সন্তুষ্ট। অথচ আমি তাদের পার্থিব জীবনের স্বল্প ভোগসামগ্রী নিয়ে সন্তুষ্ট হতে দেখিনি। সুতরাং তুমি আল্লাহকে নিয়ে তুষ্ট হয়ে রাজা-বাদশাহদের দুনিয়া থেকে অমুখাপেক্ষী হও; যেমনিভাবে রাজা-বাদশাহরা তাদের দুনিয়া নিয়ে দ্বীনদারি থেকে অমুখাপেক্ষী হয়েছে। "¹⁰⁰
(১০৫) আল-কালি তার আমালি গ্রন্থে উল্লেখ করেন, "সুলায়মান আল-মুহাল্লাবি খাইল ইবনু আহমাদ এর কাছে এক লক্ষ দিরহাম দিয়ে পাঠালেন। এবং তার কাছে তার সান্নিধ্য প্রার্থনা করলেন। তখন তিনি তার এক লক্ষ দিরহাম ফিরিয়ে দিলেন এবং তার উদ্দেশে কয়েকটি চরণ লিখলেন, "তুমি সুলায়মানের কাছে এ সংবাদ পৌঁছে দাও যে, আমি তার থেকে অধিক প্রাচুর্য এবং সচ্ছলতায় রয়েছি, তবে আমি সম্পদশালী নই। আমি আন্তরিকভাবে উদার। আমি কাউকে ক্ষুধার্ত হয়ে শীর্ণ দেহে মরে যেতে এবং ভাগ্যবিড়ম্বনার শেষ স্তরে উপনীত হয়ে কাতরাতে দেখিনি। রিযিক সুনির্ধারিত, ভাগ্যলিপিতে লিপিবদ্ধ। অক্ষমতা তা হ্রাস করে না, আর কৌশল-অবলম্বনকারীর কৌশল তাতে প্রবৃদ্ধি আনে না। দারিদ্র্য থাকে অন্তরে, সম্পদে নয়—যা তুমি জানো। আর অনুরূপভাবে সচ্ছলতাও থাকে অন্তরে, সম্পদে নয়।”¹⁰¹
(১০৬) আবু নুয়াইম হিলয়াতুল আওলিয়া গ্রন্থে মুহাম্মাদ ইবনু উহাইব ইবনু হিশাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ইবনুল মুবারক এর একজন শাগরিদ আমাদের এই কবিতা আবৃত্তি করে শোনালেন, "তুমি শুষ্ক রুটি, চাল এবং যবের চাপাতি খেয়ে জীবনধারণ করো। এগুলোকেই তোমার হালাল খাবাররূপে গ্রহণ করো। এসব তোমাকে জাহান্নামের উষ্ণতা থেকে রক্ষা করবে। আমি তো আর পারলাম না। আল্লাহ তোমাকে শাসকের দরবার থেকে রক্ষা করে সাফল্যের পথে পরিচালিত করুন। "¹⁰²
(১০৭) আবু নুয়াইম হিলয়াতুল আওলিয়া গ্রন্থে আহমাদ ইবনু জামিল আলমারওয়াযি থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারাক কে বলা হলো, ইসমাইল ইবনু উলাইয়াহ সাদাকা উশুলের কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তখন তার উদ্দেশে ইবনুল মুবারাক লিখলেন, “হে ওই ব্যক্তি, যে তার ইলমকে শ্যেনে পরিণত করেছে, যা মিসকিনদের ধনসম্পদ ছোঁ মেরে শিকার করে আনে। দুনিয়া এবং তার স্বাদ এমন অপকৌশলের মাধ্যমে অধিকারে আসে, যা দ্বীনকে রীতিমতো বিলুপ্ত করে দেয়। তুমি নিজেই দুনিয়া পেয়ে উন্মাদ হয়ে গেছ। অথচ একদা তুমিই ছিলে উন্মাদদের প্রতিষেধক। শাসকদের দরবার ত্যাগ করার যে সকল বর্ণনা তুমি বর্ণনা করতে, কোথায় গেল আজ সেসব? ইতিপূর্বে ইবনু আওন আর ইবনু সিরিনের থেকে যে সকল বর্ণনা তুমি উদ্ধৃত করতে, আজ কোথায় তা অবলুপ্ত হলো? যদি তুমি বলো, আমাকে বাধ্য করা হয়েছে, তা হলে এটা একটা বেহুদা কথা। ইলমের নির্মাণশিল্পী মৃত্তিকায় পদস্খলিত হয়েছে।” বর্ণনাকারী বলেন, তিনি যখন এই চিঠিটা পড়লেন, তখন কেঁদে ফেললেন এবং চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়ে নিলেন।¹⁰³
(১০৮) ইমাম শাফেয়ি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার একজন বন্ধু ছিল, যার নাম ছিল হাসিন। সে আমার সাথে সদাচারণ করত এবং সর্বদা সুসম্পর্ক বজায় রাখত। একদিন আমিরুল মুমিনিন তাকে শাসনকর্তা পদে নিয়োগ দিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, ইমাম শাফেয়ি তখন তার উদ্দেশে লিখলেন, "তুমি এই সম্পর্ককে তোমার কাছে রেখে দাও। কেননা, তোমার সম্প্রীতি আমার থেকে তালাকপ্রাপ্ত। তবে তা অপ্রত্যাহার্য তালাক নয়। যদি তুমি নিবৃত্ত হও, তবে তা এক তালাক হয়ে থাকবে। আমার জন্য তোমার ভালোবাসা এরপরও দুইয়ের ওপর স্থায়ী হবে। আর যদি তুমি আঁকাবাঁকা পথে চলো, তা হলে তুমি তার পরবর্তী তালাকগুলোর জন্য আবদার উত্থাপন করলে। সুতরাং পরবর্তী দুই মাসিক স্রাবে অবশিষ্ট দুই তালাক পতিত হয়ে যাবে। কেননা, তিন তালাক আমার পক্ষ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তোমার কাছে এসেছে। এ ক্ষেত্রে বাহরাইনের শাসনক্ষমতা তোমার কোনো উপকারে আসবে না। আমি আসলে এক হাসিনকে ছেড়ে দিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছি না; বরং আমি এক আদর্শ রেখে যেতে চাচ্ছি, যাতে প্রত্যেক হাসিনপন্থীর চেহারা কালিমালিপ্ত হয়। "¹⁰⁴
(১০৯) আবু নুয়াইম মুহাম্মাদ ইবনু ওয়াহব থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ইবনুল মুবারক এর এক শাগরিদ আমাদের এই কবিতা আবৃত্তি করে শোনালেন, “তোমরা তোমাদের মিসআর সুফয়ান এবং ইবনু মিগওয়াল আর তাই গোত্রের তাকির অনুসরণ করলে না কেন—যখন তারা সকলে ছিল তাকওয়ার বন্ধনীতে আবদ্ধ। তাকি তো সমগ্র বিশ্বের শোভা এবং সমকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব। তাদের দৃষ্টান্ত মস্তিষ্কের মতো। তুমি তাদের দেখবে রাতের নামাজে নিদ্রাহীন চোখে দণ্ডায়মান। দু-চোখে নেই একফোঁটা ঘুম কিংবা নিদ। সর্বদা ঘরে উপবিষ্ট। গৃহের ডালে চুপটি মেরে আসীন। একান্ত কোনো বিপদ আপতিত হলে কিংবা জুম’আর প্রয়োজনেই শুধু তারা বাইরে বেরিয়ে থাকে। কলজেসহ ক্ষুধার্ত ও সংকুচিত উদর। তাকওয়ার ভীতিতে তারা কখনো হারাম আস্বাদন করে না। তাদের রয়েছে জনমানুষের চিন্তা। আর ফসল কর্তনের সময় কাওমের সকল চিন্তা থাকে শুধু নিজেদের নিয়ে, অথচ কাওমের লোকেরা বীজই বপন করেনি।
(১১০) হাফিজ আবু নাসর ইবনু মা’কুলা বলেছেন, “আমি শাসকের দরবার পরিহার করেছি। কারণ, আমি এমন কিছু জানি, যা গোটা জিন-ইনসান জানে না। আমি সুহাইলকে দেখেছি, যে জীবনের পথচলায় সূর্যের থেকে অপমানজনক অবস্থান ছাড়া অন্য কিছুই পায়নি।”
(১১১) কবি বলেছেন, “হায়রে দিবাস্বপ্ন! শাসকের কাছে বিপদ নেমেছে। শাসকের দুয়ারে প্রবেশকারী পথভ্রষ্ট হয়েছে।”
(১১২) শাসক ইযযুদ্দীন শায়খ শাতেব এর কাছে তার দরবারে উপস্থিত হওয়ার জন্য সংবাদ পাঠালেন। তখন শায়খ তার এক ছাত্রকে নিচের পঙ্ক্তিগুলো লিখতে বললেন, “তুমি সতর্ক ও দূরদর্শী উপদেশ-প্রদানকারীর পক্ষ থেকে শাসককে বলো যে, ফকিহ যখন তোমাদের দুয়ারে এসে উপস্থিত হবে, তখন আর তাতে কোনো কল্যাণ অবশিষ্ট থাকবে না।”
(১১৩) যায়দ ইবনু আসলাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু হাযিম এর সঙ্গে ছিলাম। তখন শাসক আব্দুর রহমান ইবনু খালিদ তার কাছে এই সংবাদ দিয়ে দূত পাঠালেন যে, "আপনি আমাদের কাছে আগমন করুন। যাতে আমরা আপনার কাছে বিভিন্ন বিষয় জিজ্ঞাসা করতে পারি এবং আপনি আমাদের কাছে হাদিস বর্ণনা করতে পারেন।” তখন আবু হাযিম বললেন, "আল্লাহর কাছে পানাহ! আমি আহলুল ইলমকে দেখেছি, তারা দুনিয়াবাসী র কাছে ইলম বহন করে নিয়ে যায় না। নিশ্চয়ই আমি এই অপরাধকর্মের প্রথম প্রবক্তা হতে পারব না। যদি আপনার কোনো প্রয়োজন থেকে থাকে, তা হলে আপনি আমাদের কাছে তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করুন।" তখন আব্দুর রহমান তার কাছে দূত মারফত এই সংবাদ পৌঁছালেন যে, "আপনি এর মাধ্যমে আমাদের চোখে আরও অধিক মর্যাদাবান হয়েছেন।”
টিকাঃ
১০০. হিলয়াতুল আওলিয়া: ৬/৩৭৬
১০১. মু'জামুল উদাবা, ইয়াকুত হামাবি: ১১/৭৫-৭৬; তাবাকাতুন নাহবিয়্যিন, যাবিদি: ৪৭; ইম্বাহুর রুওয়াত: ১/২৪৪
১০২. আসসিয়ার, যাহাবি ৮/৪১৪-৪১৫
১০৩. জামি'উ বায়ানিল ইলম, ইবনু আব্দিল বার: ২৬৭-২৬৮; আসসিয়ার, যাহাবি: ৮/৪১১-৪১২; সিফাতুস সাফওয়াহ, ইবনুল জাওযি: ৪/১৪০
১০৪. তারিখু ইবনি আসাকির