📘 রাজদরবারে আলিমদের গমন একটি সতর্কবার্তা > 📄 হাম্মাদ ইবনু সালামাহ (রহ.) এবং ইরাকের আমির

📄 হাম্মাদ ইবনু সালামাহ (রহ.) এবং ইরাকের আমির


(৮৪) মুকাতিল ইবনু সালিহ আল-খুরাসানি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আমি হাম্মাদ ইবনু সালামাহ্ এর কাছে গেলাম। আমি তার কাছে বসা ছিলাম, ইত্যবসরে একজন আগন্তুক দরজায় কড়া নাড়ল। তখন তিনি বললেন, "খুকি, বেরিয়ে দেখো তো, কে এখানে?" সে দেখে জানাল, "বসরা এবং কুফার আমির মুহাম্মাদ ইবনু সুলায়মান আল-হাশেমির পক্ষ থেকে প্রেরিত দূত।” তিনি বললেন, "তুমি তাকে বলো, সে যেন ভেতরে একাকী প্রবেশ করে।" অনন্তর সে প্রবেশ করে সালাম দিলো। এরপর আমিরের চিঠি অর্পণ করল। তখন তিনি তাকে বললেন, "তুমি এটা পাঠ করো।” তখন চিঠির পাতায় যা দেখা গেল, "পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। সুলায়মানের পক্ষ থেকে হাম্মাদ ইবনু সালামাহর উদ্দেশে। পর সমাচার হলো, আল্লাহ আপনাকে প্রাণবন্ত করুন, যেভাবে তিনি তার ওলি এবং আনুগত্যপরায়ণ বান্দাদের প্রাণবন্ত করেন। একটি মাসআলা দেখা দিয়েছে, তাই আমরা তার সমাধান জানার জন্য আপনার দ্বারস্থ হয়েছি।" তখন তিনি বললেন, "খুকি, তুমি দোয়াত নিয়ে আসো।" এরপর তিনি আমাকে বললেন, "চিঠিটা উল্টাও।” তারপর তিনি লিখলেন, "হামদ ও সালাতের পর, আল্লাহ আপনাকে প্রাণবন্ত করুন, যেভাবে তিনি তার ওলি এবং আনুগত্যপরায়ণ বান্দাদের প্রাণবন্ত করেন। আমরা আলিমদের এমতাবস্থায় পেয়েছি যে, তারা কারও কাছে গমনাগমন করতেন না। যদি কোনো মাসআলা দেখা দিয়ে থাকে, তা হলে আমাদের কাছে এসে আপনার সামনে যা কিছু দেখা দিয়েছে, তা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। আর হাঁ, যদি আমার কাছে আসেন, তা হলে একাকী আসবেন। আপনি আপনার অশ্বারোহী এবং পদাতিকদের নিয়ে আসবেন না। এর ব্যত্যয় হলে আমি আপনাকে নাসিহাহ করব না, আমার নিজেকেও কোনোপ্রকার নাসিহাহ করব না। ওয়াসসালাম।" একদিন আমি তার কাছে ছিলাম, এমতাবস্থায় জনৈক আগন্তুক দরজায় করাঘাত করল। তখন তিনি বললেন, "খুকি, বের হয়ে দেখো, এখানে কে?" সে বলল, "এখানে মুহাম্মাদ ইবনু সুলায়মান।” তিনি বললেন, "তুমি তাকে বলো, তিনি যেন একাকী প্রবেশ করেন।” মুহাম্মাদ ইবনু সুলায়মান তখন প্রবেশ করে সালাম দিলেন, এরপর তার সামনে উপবিষ্ট হলেন। তিনি বললেন, "আমার কী হলো যে, আমি যখন আপনার দিকে দৃষ্টিপাত করি, তখন সারা শরীর একধরনের আতঙ্কে শিহরিত হয়ে ওঠে!" তখন হাম্মাদ বললেন, “আমি সাবিত আল-বুনানি কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আনাস ইবনু মালিক বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ কে বলতে শুনেছি, “আলিম যখন তার ইলমের দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য নিয়ে থাকে, তখন সকল কিছু তাকে ভয় করে। আর যদি এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য হয়, সম্পদ বৃদ্ধি, তখন সে সবকিছুকে ভয় করে।” এরপর তিনি বাকি ঘটনা উল্লেখ করলেন।”⁸⁷

(৮৫) মুফলিহ ইবনুল আসওয়াদ বলেন, “মামুন ইয়াহইয়া ইবনু আকসাম কে বলেন, আমি বিশর ইবনুল হারিসকে দেখতে চাই। তিনি বললেন, “তা হলে আমি তার সঙ্গে আপনার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করি—যখন আপনি ইচ্ছা করেন, হে আমিরুল মুমিনিন!” এক রাতে তারা বিশর এর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে বের হলেন। তারা তাদের বাহনে আরোহণ করে বিশর এর ঘরে পৌঁছে গেলেন। সেখানে পৌঁছে বাহন থেকে অবতরণ করে ইয়াহইয়া বিশর এর দরজায় করাঘাত করলেন। বিশর বললেন, “কে এখানে?” ইয়াহইয়া উত্তর দিলেন, “তোমার ওপর যার আনুগত্য অপরিহার্য।” তিনি বললেন, “আপনি কী চাচ্ছেন?” তিনি বললেন, “আমি তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাচ্ছি।” বিশর বললেন, “স্বতঃস্ফূর্তভাবে নাকি বলপ্রয়োগ করে?” বর্ণনাকারী বলেন, তখন মামুন বুঝে ফেললেন। তিনি তখন ইয়াহইয়াকে বললেন, “বাহনে চড়ো।” তারা সেখান থেকে ফিরছিলেন। পথিমধ্যে তারা ইশার সালাত আদায়রত এক ব্যক্তির দেখা পেলেন। তখন তারাও সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে বাহন থেকে নেমে মসজিদে প্রবেশ করলেন। সেই ইমামের তিলাওয়াত তাদের অত্যন্ত মুগ্ধ করল, তাদের অন্তরাত্মাকে একেবারে ছুঁয়ে গেল। সকালবেলা মামুন সেই পাঠকারীর কাছে দূত পাঠালেন। দূত গিয়ে তাকে নিয়ে এল। সেই পাঠকারী দরবারে আসার পর মামুন তার সাথে ফিকহি আলোচনা-পর্যালোচনার ধারাপাত করলেন। তখন দেখা গেল, সেই পাঠকারী একের পর এক মামুনের থেকে বিপরীত মতামত প্রদান করেই যাচ্ছে এবং বলছে, “এই মাসআলার হুকুম আপনি যা বলছেন, তা নয়; বরং বক্তব্য এর বিপরীত।” একপর্যায়ে মামুন রেগে গেল। যখন সেই পাঠকারীর বিরোধিতার পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেল, তখন মামুন বলল, “তোমার প্রতি আমার ধারণা হলো, যখন তুমি তোমার সঙ্গীদের কাছে ফিরে যাবে, তখন তুমি এ কথা বলে বেড়াবে যে, তুমি আমিরুল মুমিনিনকে ভুল প্রমাণিত করেছ।” তখন সে বলল, “আল্লাহর কসম! হে আমিরুল মুমিনিন! আমি এতে লজ্জাবোধ করি যে, আমার সঙ্গীরা জানুক—আমি আপনার কাছে এসেছি।” তখন মামুন বলল, “সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি আমার প্রজাদের মধ্যে এমন ব্যক্তিকে রেখেছেন, যে আমার কাছে আসতে লজ্জাবোধ করে।” এরপর তিনি শুকরিয়া আদায়ের জন্য আল্লাহ তাআলাকে সিজদা করেন। সেই পাঠকারী ছিলেন ইবরাহিম ইবনু ইসহাক আলহারবি।⁸⁸

(৮৬) সুফয়ান সাওরি বলেন, “ইলম সম্মানিত একটি বস্তু ছিল। কিন্তু তারা যখন ইলমকে রাজাদের দুয়ারে বয়ে নিয়ে গেল এবং এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করল, তখন আল্লাহ তাদের অন্তর থেকে ইলমের মিষ্টতা উঠিয়ে নিলেন এবং তাদের তার ইলম থেকে বিরত করলেন।”

(৮৭) বিশর আল-হাফি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “কতই-না নিকৃষ্ট অবস্থা এই যে, যখন কোনো আলিমকে তলব করা হয়, তখন জবাব আসে, তিনি আমিরের দুয়ারে।”

(৮৮) ফুযায়ল ইবনু ইয়াজ বলেন, "কারীদের আপদ হলো আত্মগরিমা। তোমরা রাজা-বাদশাহর দুয়ার থেকে দূরে থাকো। কেননা, তা আল্লাহপ্রদত্ত নিয়ামত বিলুপ্ত করে দেয়। তখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, "কীভাবে?” তিনি বললেন, "কোনো ব্যক্তির ওপর যখন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নিয়ামত বর্ষিত হয়ে থাকে, তখন সৃষ্টজীবের কাছে তার আর কোনো প্রয়োজনীয়তা বাকি থাকে না। যখন সে এ সকল শাসক-প্রশাসকের দরবারে অনুপ্রবেশ করে, তখন তাদের উন্নত প্রাসাদ এবং সেবক-সেবিকাদের হালত-অবস্থা দেখে সে মোহিত হয়ে পড়ে, অনন্তর সে তার মাঝে যে কল্যাণ নিহিত রয়েছে তাকে তুচ্ছ দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে। এভাবে তার থেকে নিয়ামতসমূহ বিলুপ্ত হয়ে যায়।”

টিকাঃ
৮৭. কানযুল 'উম্মাল: ৪৬১৩১; ইতহাফুস সাদাহ : ৬/১৩৬; তাযকিরাতুল মাওযু'আত : ২০; আলফাওয়ায়িদুল মাজমু'আ: ২৮৬
৮৮. তারিখু ইবনিন নাজ্জার

(৮৪) মুকাতিল ইবনু সালিহ আল-খুরাসানি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আমি হাম্মাদ ইবনু সালামাহ্ এর কাছে গেলাম। আমি তার কাছে বসা ছিলাম, ইত্যবসরে একজন আগন্তুক দরজায় কড়া নাড়ল। তখন তিনি বললেন, "খুকি, বেরিয়ে দেখো তো, কে এখানে?" সে দেখে জানাল, "বসরা এবং কুফার আমির মুহাম্মাদ ইবনু সুলায়মান আল-হাশেমির পক্ষ থেকে প্রেরিত দূত।” তিনি বললেন, "তুমি তাকে বলো, সে যেন ভেতরে একাকী প্রবেশ করে।" অনন্তর সে প্রবেশ করে সালাম দিলো। এরপর আমিরের চিঠি অর্পণ করল। তখন তিনি তাকে বললেন, "তুমি এটা পাঠ করো।” তখন চিঠির পাতায় যা দেখা গেল, "পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। সুলায়মানের পক্ষ থেকে হাম্মাদ ইবনু সালামাহর উদ্দেশে। পর সমাচার হলো, আল্লাহ আপনাকে প্রাণবন্ত করুন, যেভাবে তিনি তার ওলি এবং আনুগত্যপরায়ণ বান্দাদের প্রাণবন্ত করেন। একটি মাসআলা দেখা দিয়েছে, তাই আমরা তার সমাধান জানার জন্য আপনার দ্বারস্থ হয়েছি।" তখন তিনি বললেন, "খুকি, তুমি দোয়াত নিয়ে আসো।" এরপর তিনি আমাকে বললেন, "চিঠিটা উল্টাও।” তারপর তিনি লিখলেন, "হামদ ও সালাতের পর, আল্লাহ আপনাকে প্রাণবন্ত করুন, যেভাবে তিনি তার ওলি এবং আনুগত্যপরায়ণ বান্দাদের প্রাণবন্ত করেন। আমরা আলিমদের এমতাবস্থায় পেয়েছি যে, তারা কারও কাছে গমনাগমন করতেন না। যদি কোনো মাসআলা দেখা দিয়ে থাকে, তা হলে আমাদের কাছে এসে আপনার সামনে যা কিছু দেখা দিয়েছে, তা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। আর হাঁ, যদি আমার কাছে আসেন, তা হলে একাকী আসবেন। আপনি আপনার অশ্বারোহী এবং পদাতিকদের নিয়ে আসবেন না। এর ব্যত্যয় হলে আমি আপনাকে নাসিহাহ করব না, আমার নিজেকেও কোনোপ্রকার নাসিহাহ করব না। ওয়াসসালাম।" একদিন আমি তার কাছে ছিলাম, এমতাবস্থায় জনৈক আগন্তুক দরজায় করাঘাত করল। তখন তিনি বললেন, "খুকি, বের হয়ে দেখো, এখানে কে?" সে বলল, "এখানে মুহাম্মাদ ইবনু সুলায়মান।” তিনি বললেন, "তুমি তাকে বলো, তিনি যেন একাকী প্রবেশ করেন।” মুহাম্মাদ ইবনু সুলায়মান তখন প্রবেশ করে সালাম দিলেন, এরপর তার সামনে উপবিষ্ট হলেন। তিনি বললেন, "আমার কী হলো যে, আমি যখন আপনার দিকে দৃষ্টিপাত করি, তখন সারা শরীর একধরনের আতঙ্কে শিহরিত হয়ে ওঠে!" তখন হাম্মাদ বললেন, “আমি সাবিত আল-বুনানি কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আনাস ইবনু মালিক বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ কে বলতে শুনেছি, “আলিম যখন তার ইলমের দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য নিয়ে থাকে, তখন সকল কিছু তাকে ভয় করে। আর যদি এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য হয়, সম্পদ বৃদ্ধি, তখন সে সবকিছুকে ভয় করে।” এরপর তিনি বাকি ঘটনা উল্লেখ করলেন।”⁸⁷

(৮৫) মুফলিহ ইবনুল আসওয়াদ বলেন, “মামুন ইয়াহইয়া ইবনু আকসাম কে বলেন, আমি বিশর ইবনুল হারিসকে দেখতে চাই। তিনি বললেন, “তা হলে আমি তার সঙ্গে আপনার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করি—যখন আপনি ইচ্ছা করেন, হে আমিরুল মুমিনিন!” এক রাতে তারা বিশর এর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে বের হলেন। তারা তাদের বাহনে আরোহণ করে বিশর এর ঘরে পৌঁছে গেলেন। সেখানে পৌঁছে বাহন থেকে অবতরণ করে ইয়াহইয়া বিশর এর দরজায় করাঘাত করলেন। বিশর বললেন, “কে এখানে?” ইয়াহইয়া উত্তর দিলেন, “তোমার ওপর যার আনুগত্য অপরিহার্য।” তিনি বললেন, “আপনি কী চাচ্ছেন?” তিনি বললেন, “আমি তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাচ্ছি।” বিশর বললেন, “স্বতঃস্ফূর্তভাবে নাকি বলপ্রয়োগ করে?” বর্ণনাকারী বলেন, তখন মামুন বুঝে ফেললেন। তিনি তখন ইয়াহইয়াকে বললেন, “বাহনে চড়ো।” তারা সেখান থেকে ফিরছিলেন। পথিমধ্যে তারা ইশার সালাত আদায়রত এক ব্যক্তির দেখা পেলেন। তখন তারাও সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে বাহন থেকে নেমে মসজিদে প্রবেশ করলেন। সেই ইমামের তিলাওয়াত তাদের অত্যন্ত মুগ্ধ করল, তাদের অন্তরাত্মাকে একেবারে ছুঁয়ে গেল। সকালবেলা মামুন সেই পাঠকারীর কাছে দূত পাঠালেন। দূত গিয়ে তাকে নিয়ে এল। সেই পাঠকারী দরবারে আসার পর মামুন তার সাথে ফিকহি আলোচনা-পর্যালোচনার ধারাপাত করলেন। তখন দেখা গেল, সেই পাঠকারী একের পর এক মামুনের থেকে বিপরীত মতামত প্রদান করেই যাচ্ছে এবং বলছে, “এই মাসআলার হুকুম আপনি যা বলছেন, তা নয়; বরং বক্তব্য এর বিপরীত।” একপর্যায়ে মামুন রেগে গেল। যখন সেই পাঠকারীর বিরোধিতার পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেল, তখন মামুন বলল, “তোমার প্রতি আমার ধারণা হলো, যখন তুমি তোমার সঙ্গীদের কাছে ফিরে যাবে, তখন তুমি এ কথা বলে বেড়াবে যে, তুমি আমিরুল মুমিনিনকে ভুল প্রমাণিত করেছ।” তখন সে বলল, “আল্লাহর কসম! হে আমিরুল মুমিনিন! আমি এতে লজ্জাবোধ করি যে, আমার সঙ্গীরা জানুক—আমি আপনার কাছে এসেছি।” তখন মামুন বলল, “সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি আমার প্রজাদের মধ্যে এমন ব্যক্তিকে রেখেছেন, যে আমার কাছে আসতে লজ্জাবোধ করে।” এরপর তিনি শুকরিয়া আদায়ের জন্য আল্লাহ তাআলাকে সিজদা করেন। সেই পাঠকারী ছিলেন ইবরাহিম ইবনু ইসহাক আলহারবি।⁸⁸

(৮৬) সুফয়ান সাওরি বলেন, “ইলম সম্মানিত একটি বস্তু ছিল। কিন্তু তারা যখন ইলমকে রাজাদের দুয়ারে বয়ে নিয়ে গেল এবং এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করল, তখন আল্লাহ তাদের অন্তর থেকে ইলমের মিষ্টতা উঠিয়ে নিলেন এবং তাদের তার ইলম থেকে বিরত করলেন।”

(৮৭) বিশর আল-হাফি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “কতই-না নিকৃষ্ট অবস্থা এই যে, যখন কোনো আলিমকে তলব করা হয়, তখন জবাব আসে, তিনি আমিরের দুয়ারে।”

(৮৮) ফুযায়ল ইবনু ইয়াজ বলেন, "কারীদের আপদ হলো আত্মগরিমা। তোমরা রাজা-বাদশাহর দুয়ার থেকে দূরে থাকো। কেননা, তা আল্লাহপ্রদত্ত নিয়ামত বিলুপ্ত করে দেয়। তখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, "কীভাবে?” তিনি বললেন, "কোনো ব্যক্তির ওপর যখন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নিয়ামত বর্ষিত হয়ে থাকে, তখন সৃষ্টজীবের কাছে তার আর কোনো প্রয়োজনীয়তা বাকি থাকে না। যখন সে এ সকল শাসক-প্রশাসকের দরবারে অনুপ্রবেশ করে, তখন তাদের উন্নত প্রাসাদ এবং সেবক-সেবিকাদের হালত-অবস্থা দেখে সে মোহিত হয়ে পড়ে, অনন্তর সে তার মাঝে যে কল্যাণ নিহিত রয়েছে তাকে তুচ্ছ দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে। এভাবে তার থেকে নিয়ামতসমূহ বিলুপ্ত হয়ে যায়।”

টিকাঃ
৮৭. কানযুল 'উম্মাল: ৪৬১৩১; ইতহাফুস সাদাহ : ৬/১৩৬; তাযকিরাতুল মাওযু'আত : ২০; আলফাওয়ায়িদুল মাজমু'আ: ২৮৬
৮৮. তারিখু ইবনিন নাজ্জার

📘 রাজদরবারে আলিমদের গমন একটি সতর্কবার্তা > 📄 শাসকদের সঙ্গে মেলামেশার অবস্থাসমূহ

📄 শাসকদের সঙ্গে মেলামেশার অবস্থাসমূহ


(৮৯) ইমাম গাযালি তার ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন গ্রন্থে শাসকদের বিরুদ্ধাচরণ, তাদের মজলিসে গমনাগমন এবং তাদের দরবারে উপস্থিত হওয়া প্রসঙ্গে একটি স্বতন্ত্র পরিচ্ছেদ রচনা করেছেন। তিনি তাতে লেখেন, "জেনে রেখো, শাসকদের সঙ্গে তোমাদের তিন অবস্থা: ক) শাসকদের দরবারে যাতায়াত করা। আর এটাই সবচেয়ে নিকৃষ্ট অবস্থা। খ) শাসকবর্গ তোমার দুয়ারে উপস্থিত হওয়া। এটা ভয়াবহতার দিক থেকে পূর্বেরটার থেকে কিছুটা নিম্নস্তরের। গ) তুমি তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে। তুমিও তাদের দেখবে না আর তারাও তোমাকে দেখবে না। আর এটাই সবচেয়ে নিরাপদ হালত।"

প্রথমটি, অর্থাৎ তাদের দরবারে গমন করা শরিয়াহর দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিন্দনীয়। এ ব্যাপারে অনেক কঠোর ও অনমনীয় নুসুস বর্ণিত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বর্ণিত হাদিস এবং আসার 'মুতাওয়াতির' এর স্তরে উপনীত। তাই আমরা সেগুলো উদ্ধৃত করছি, যাতে তুমি এই কর্মের নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে শরিয়াহর স্বচ্ছ অবস্থান জানতে পারো। এরপর আমরা এর প্রকারগুলো-হারাম, মুবাহ এবং মাকরুহ সম্পর্কে আলোকপাত করব, ইলমের দৃশ্যমান বিশ্লেষণও ফাতওয়া যা দাবি করে, তার আলোকে।”

এরপর ইমাম গাযালি অসংখ্য হাদিস এবং আসার উদ্ধৃত করেন, যার অনেকগুলোর বিবরণ ওপরে আলোচনাপ্রসঙ্গে অতিক্রান্ত হয়েছে। তিনি যেসব বিষয় উল্লেখ করেছেন, কিন্তু পূর্বে আমাদের আলোচনায় উল্লেখিত হয়নি, এমন যা যা রয়েছে, তা নিম্নে উদ্ধৃত হলো:

(৯০) সুফয়ান বলেন, "জাহান্নামে একটি উপত্যকা রয়েছে যাতে শুধু সে সকল কারীরা অবস্থান করবে, যারা রাজা-বাদশাহদের দরবারে অধিক যাতায়াত করে।”

(৯১) আওযায়ি বলেন, "আল্লাহর কাছে সেই আলিমের থেকে অধিক ঘৃণ্য কিছু নেই, যে কোনো গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।"

(৯২) ইসহাক বলেন, "আমি সেই আলিমকে আলিম হিসাবেই স্বীকৃতি দিই না, যার মজলিসে উপস্থিত হয়ে তাকে পাওয়া যায় না, অনন্তর তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে জবাব আসে-'তিনি তো আমিরের দরবারে।'
এককালে আমরা শুনতাম, বলা হতো যে, “যখন তোমরা কোনো আলিমকে শাসকের দরবারে গমন করতে দেখো, তখন তোমরা তাকে তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে অভিযুক্ত করো। আমি শাসকের দরবারে যখনই গমন করেছি, তখনই বের হয়ে এসে অন্তরের মুহাসাবা করেছি। শাসকদের খেয়ালখুশির প্রচণ্ড বিরোধিতা এবং তাদের সাথে রূঢ় আচরণ করার কারণে আমি যে অবস্থার সম্মুখীন হতাম-তার জন্য নফসের ওপর একধরনের পুরস্কার ছুড়ে দেওয়ার আদত গড়েছি।”

(৯৩) সাইদ ইবনুল মুসাইয়িব তেলের ব্যবসা করতেন আর বলতেন, “নিশ্চয়ই এতে রয়েছে এ সকল শাসকদের থেকে অমুখাপেক্ষী থাকার উপকরণ।”

(৯৪) ওয়াহব বলেন, “নিশ্চয়ই এ সকল আলিমরা—যারা শাসকদের দরবারে গমন করে—উম্মাহর জন্য জুয়াড়িদের থেকেও অধিক ভয়ানক।”

(৯৫) মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ বলেন, “পায়খানার ওপরের মাছি শাসকদের দুয়ারের এ সকল কারীদের থেকে শ্রেষ্ঠ।”

(৯৬) যুহরি যখন সুলতানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করলেন, তখন তার উদ্দেশে তার এক দ্বীনী ভাই লিখলেন, “আল্লাহ আমাদের এবং আপনাকে—হে আবু বকর!—সকল প্রকার ফিতনা থেকে রক্ষা করুন। আপনি এমন এক অবস্থায় এসে উপনীত হয়েছেন, যারা আপনাকে চেনে, তাদের জন্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, আপনার কল্যাণের জন্য দুয়া করা এবং রহমত প্রার্থনা করা। আপনি বয়োবৃদ্ধ হয়ে গেছেন; অপরদিকে আল্লাহ তাআলার নিয়ামতসমূহ—তিনি আপনাকে তার কিতাবের যে উপলব্ধি দান করেছেন এবং তার নবি এর সুন্নাহর যে ইলম শিক্ষা দান করেছেন—আপনার পিঠকে ভারাক্রান্ত করে রেখেছে। আল্লাহ আলিমদের থেকে এমনটা অঙ্গীকার নেননি।

জেনে রাখুন, আপনি যে পাপ করেছেন এবং যে দুঃসাহসিকতা নিজের মাঝে ধারণ করেছেন তার সবচেয়ে সরল ও সাধারণ সমীকরণ হলো—আপনি জালিমের নিঃসঙ্গতার সাথে ঘনিষ্ঠ হয়েছেন এবং ভ্রষ্টতার পথ সহজ করেছেন। আপনি এসব মানুষদের কাছে ভেড়ার মাধ্যমে অন্যায়ের দুয়ার উন্মোচিত করেছেন। তারা আপনাকে নৈকট্য প্রদান করার সময়ও কোনো হক আদায় করেনি আর কোনো অন্যায় পরিহার করেনি। তারা আপনাকে গ্রহণ করেছে জাঁতাকলের চাকার এক অক্ষ হিসাবে, তাই আপনাকে কেন্দ্র করে তাদের জুলমের চাকা আবর্তিত হবে; গ্রহণ করেছে একটি সাঁকো হিসাবে, ফলে আপনার ওপর দিয়ে পাড়ি দিয়ে তারা পৌঁছবে তাদের দুর্যোগের দিকে; গ্রহণ করেছে একটি সিঁড়িরূপে, যাতে চড়ে তারা আরোহণ করবে তাদের গোমরাহির দিকে। তারা আপনাকে প্রদর্শন করে আলিমদের মাঝে সংশয় ও দোদুল্যমানতার অনুপ্রবেশ ঘটাবেন। আর আপনাকে ব্যবহার করে অজ্ঞ শ্রেণির আন্তরিক সমর্থন ছিনিয়ে নেবে। তারা আপনার জন্য যা কিছু ব্যয় করেছে তা ওই জিনিসের তুলনায় অতি স্বল্প, যা আপনার থেকে উজাড় করে নিয়েছে। তারা আপনার থেকে যা কিছু লাভ করে নিয়েছে-তা বাস্তবে কতইনা বেশি, কারণ তারা আপনার জন্য আপনার দ্বীনকে বরবাদ করে ছেড়েছে। আপনাকে যেন এ বিষয়টি নির্ভয় না করে যে, আপনি তাদের অন্তর্ভুক্ত হবেন, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন: "তাদের পর তাদের স্থলাভিস্থিক্ত হলো এমন উত্তরসূরিরা, যারা নামাজ বরবাদ করল এবং ইন্দ্রিয়-চাহিদার অনুগামী হলো।”⁹³

আপনি এমন সত্তার সাথে লেনদেন করছেন, যিনি কোনো কিছু বিস্মৃত হন না। উদাসীনতা যাদের কখনোই ছুঁতে পারে না-এমন ফিরেশতাগণ আপনার সব কার্যকলাপ হুবহু সংরক্ষণ করছেন। সুতরাং আপনি আপনার দ্বীনের চিকিৎসা করুন। কারণ, তাতে রোগের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। আর আপনার পাথেয় প্রস্তুত করুন। কারণ, দূরবর্তী সফর ঘনিয়ে এসেছে। পৃথিবী কিংবা আকাশের কোনো কিছুই আল্লাহর কাছে গোপন থাকে না। ওয়াসসালাম।"

(৯৭) সুফয়ান সাওরি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু জাফরের মজলিসে প্রবেশ করলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, "আপনি আপনার প্রয়োজন তুলে ধরুন।" তখন আমি তাকে বললাম, "আপনি আল্লাহকে ভয় করুন। সারাটা পৃথিবীকে জুলম এবং অত্যাচারে ভরে ফেলেছেন!" সুফয়ান বলেন, আবু জাফর তখন তার মাথা ঝোঁকালেন। এরপর তিনি মাথা উঠিয়ে বললেন, "আপনার প্রয়োজন তুলে ধরুন।" তখন আমি বললাম, নিশ্চয়ই এই জায়গা মুসলিমদের কবজায় এসেছে মুহাজির এবং আনসার সাহাবিদের তরবারির মাধ্যমে আর তাদের সন্তানেরা আজ ক্ষুধার তাড়নায় মৃত্যু-পথযাত্রী। আপনি আল্লাহকে ভয় করুন এবং তাদের সমীপে তাদের হক পৌঁছে দিন। সুফয়ান বলেন, এরপর তিনি মাথা ঝোঁকালেন। এরপর মাথা তুলে বললেন, “আমাদের সামনে আপনার প্রয়োজন তুলে ধরুন।” তখন আমি বললাম, “উমর ইবনুল খাত্তাব হজ করেছেন। হজ আদায়কালে তিনি তার হিসাবরক্ষককে জিজ্ঞাসা করলেন, “কত খরচ করেছ?” সে বলল, “তেরো দিরহামের চেয়ে একটু বেশি।” অথচ আমি আপনাদের এখানে এত সব জিনিস দেখছি, উটও যা বহন করার সাধ্য রাখে না। এ কথাগুলো বলে সুফয়ান বেরিয়ে গেলেন।

টিকাঃ
৮৯. দ্বিতীয় খণ্ড, ১৪০-১৪৫ পৃষ্ঠা। আলোচনাপ্রসঙ্গে উল্লিখিত বর্ণনাসমূহও ইহইয়া থেকে গৃহীত।
৯০. সুনানুল বায়হাকি
৯১. হিলয়াতুল আওলিয়া
৯২. হিলয়াতুল আওলিয়া
৯৩. সুরা মারয়াম (১৯): ৫৯
৯৪. আসসামত, ইবনু আবিদ-দুনয়া: ২১৮-২১৯; আলকামিল, ইবনু 'আদি: ৫/১৯১৭; আসসিলসিলাতুয যায়িফা: ১৩৯৯
৯৫. তাবাকাতুশ শাফি'ইয়্যাহ আলকুবরা, সুবকি: ৬/৩১৪

(৮৯) ইমাম গাযালি তার ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন গ্রন্থে শাসকদের বিরুদ্ধাচরণ, তাদের মজলিসে গমনাগমন এবং তাদের দরবারে উপস্থিত হওয়া প্রসঙ্গে একটি স্বতন্ত্র পরিচ্ছেদ রচনা করেছেন। তিনি তাতে লেখেন, "জেনে রেখো, শাসকদের সঙ্গে তোমাদের তিন অবস্থা: ক) শাসকদের দরবারে যাতায়াত করা। আর এটাই সবচেয়ে নিকৃষ্ট অবস্থা। খ) শাসকবর্গ তোমার দুয়ারে উপস্থিত হওয়া। এটা ভয়াবহতার দিক থেকে পূর্বেরটার থেকে কিছুটা নিম্নস্তরের। গ) তুমি তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে। তুমিও তাদের দেখবে না আর তারাও তোমাকে দেখবে না। আর এটাই সবচেয়ে নিরাপদ হালত।"

প্রথমটি, অর্থাৎ তাদের দরবারে গমন করা শরিয়াহর দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিন্দনীয়। এ ব্যাপারে অনেক কঠোর ও অনমনীয় নুসুস বর্ণিত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বর্ণিত হাদিস এবং আসার 'মুতাওয়াতির' এর স্তরে উপনীত। তাই আমরা সেগুলো উদ্ধৃত করছি, যাতে তুমি এই কর্মের নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে শরিয়াহর স্বচ্ছ অবস্থান জানতে পারো। এরপর আমরা এর প্রকারগুলো-হারাম, মুবাহ এবং মাকরুহ সম্পর্কে আলোকপাত করব, ইলমের দৃশ্যমান বিশ্লেষণও ফাতওয়া যা দাবি করে, তার আলোকে।”

এরপর ইমাম গাযালি অসংখ্য হাদিস এবং আসার উদ্ধৃত করেন, যার অনেকগুলোর বিবরণ ওপরে আলোচনাপ্রসঙ্গে অতিক্রান্ত হয়েছে। তিনি যেসব বিষয় উল্লেখ করেছেন, কিন্তু পূর্বে আমাদের আলোচনায় উল্লেখিত হয়নি, এমন যা যা রয়েছে, তা নিম্নে উদ্ধৃত হলো:

(৯০) সুফয়ান বলেন, "জাহান্নামে একটি উপত্যকা রয়েছে যাতে শুধু সে সকল কারীরা অবস্থান করবে, যারা রাজা-বাদশাহদের দরবারে অধিক যাতায়াত করে।”

(৯১) আওযায়ি বলেন, "আল্লাহর কাছে সেই আলিমের থেকে অধিক ঘৃণ্য কিছু নেই, যে কোনো গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।"

(৯২) ইসহাক বলেন, "আমি সেই আলিমকে আলিম হিসাবেই স্বীকৃতি দিই না, যার মজলিসে উপস্থিত হয়ে তাকে পাওয়া যায় না, অনন্তর তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে জবাব আসে-'তিনি তো আমিরের দরবারে।'
এককালে আমরা শুনতাম, বলা হতো যে, “যখন তোমরা কোনো আলিমকে শাসকের দরবারে গমন করতে দেখো, তখন তোমরা তাকে তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে অভিযুক্ত করো। আমি শাসকের দরবারে যখনই গমন করেছি, তখনই বের হয়ে এসে অন্তরের মুহাসাবা করেছি। শাসকদের খেয়ালখুশির প্রচণ্ড বিরোধিতা এবং তাদের সাথে রূঢ় আচরণ করার কারণে আমি যে অবস্থার সম্মুখীন হতাম-তার জন্য নফসের ওপর একধরনের পুরস্কার ছুড়ে দেওয়ার আদত গড়েছি।”

(৯৩) সাইদ ইবনুল মুসাইয়িব তেলের ব্যবসা করতেন আর বলতেন, “নিশ্চয়ই এতে রয়েছে এ সকল শাসকদের থেকে অমুখাপেক্ষী থাকার উপকরণ।”

(৯৪) ওয়াহব বলেন, “নিশ্চয়ই এ সকল আলিমরা—যারা শাসকদের দরবারে গমন করে—উম্মাহর জন্য জুয়াড়িদের থেকেও অধিক ভয়ানক।”

(৯৫) মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ বলেন, “পায়খানার ওপরের মাছি শাসকদের দুয়ারের এ সকল কারীদের থেকে শ্রেষ্ঠ।”

(৯৬) যুহরি যখন সুলতানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করলেন, তখন তার উদ্দেশে তার এক দ্বীনী ভাই লিখলেন, “আল্লাহ আমাদের এবং আপনাকে—হে আবু বকর!—সকল প্রকার ফিতনা থেকে রক্ষা করুন। আপনি এমন এক অবস্থায় এসে উপনীত হয়েছেন, যারা আপনাকে চেনে, তাদের জন্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, আপনার কল্যাণের জন্য দুয়া করা এবং রহমত প্রার্থনা করা। আপনি বয়োবৃদ্ধ হয়ে গেছেন; অপরদিকে আল্লাহ তাআলার নিয়ামতসমূহ—তিনি আপনাকে তার কিতাবের যে উপলব্ধি দান করেছেন এবং তার নবি এর সুন্নাহর যে ইলম শিক্ষা দান করেছেন—আপনার পিঠকে ভারাক্রান্ত করে রেখেছে। আল্লাহ আলিমদের থেকে এমনটা অঙ্গীকার নেননি।

জেনে রাখুন, আপনি যে পাপ করেছেন এবং যে দুঃসাহসিকতা নিজের মাঝে ধারণ করেছেন তার সবচেয়ে সরল ও সাধারণ সমীকরণ হলো—আপনি জালিমের নিঃসঙ্গতার সাথে ঘনিষ্ঠ হয়েছেন এবং ভ্রষ্টতার পথ সহজ করেছেন। আপনি এসব মানুষদের কাছে ভেড়ার মাধ্যমে অন্যায়ের দুয়ার উন্মোচিত করেছেন। তারা আপনাকে নৈকট্য প্রদান করার সময়ও কোনো হক আদায় করেনি আর কোনো অন্যায় পরিহার করেনি। তারা আপনাকে গ্রহণ করেছে জাঁতাকলের চাকার এক অক্ষ হিসাবে, তাই আপনাকে কেন্দ্র করে তাদের জুলমের চাকা আবর্তিত হবে; গ্রহণ করেছে একটি সাঁকো হিসাবে, ফলে আপনার ওপর দিয়ে পাড়ি দিয়ে তারা পৌঁছবে তাদের দুর্যোগের দিকে; গ্রহণ করেছে একটি সিঁড়িরূপে, যাতে চড়ে তারা আরোহণ করবে তাদের গোমরাহির দিকে। তারা আপনাকে প্রদর্শন করে আলিমদের মাঝে সংশয় ও দোদুল্যমানতার অনুপ্রবেশ ঘটাবেন। আর আপনাকে ব্যবহার করে অজ্ঞ শ্রেণির আন্তরিক সমর্থন ছিনিয়ে নেবে। তারা আপনার জন্য যা কিছু ব্যয় করেছে তা ওই জিনিসের তুলনায় অতি স্বল্প, যা আপনার থেকে উজাড় করে নিয়েছে। তারা আপনার থেকে যা কিছু লাভ করে নিয়েছে-তা বাস্তবে কতইনা বেশি, কারণ তারা আপনার জন্য আপনার দ্বীনকে বরবাদ করে ছেড়েছে। আপনাকে যেন এ বিষয়টি নির্ভয় না করে যে, আপনি তাদের অন্তর্ভুক্ত হবেন, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন: "তাদের পর তাদের স্থলাভিস্থিক্ত হলো এমন উত্তরসূরিরা, যারা নামাজ বরবাদ করল এবং ইন্দ্রিয়-চাহিদার অনুগামী হলো।”⁹³

আপনি এমন সত্তার সাথে লেনদেন করছেন, যিনি কোনো কিছু বিস্মৃত হন না। উদাসীনতা যাদের কখনোই ছুঁতে পারে না-এমন ফিরেশতাগণ আপনার সব কার্যকলাপ হুবহু সংরক্ষণ করছেন। সুতরাং আপনি আপনার দ্বীনের চিকিৎসা করুন। কারণ, তাতে রোগের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। আর আপনার পাথেয় প্রস্তুত করুন। কারণ, দূরবর্তী সফর ঘনিয়ে এসেছে। পৃথিবী কিংবা আকাশের কোনো কিছুই আল্লাহর কাছে গোপন থাকে না। ওয়াসসালাম।"

(৯৭) সুফয়ান সাওরি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু জাফরের মজলিসে প্রবেশ করলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, "আপনি আপনার প্রয়োজন তুলে ধরুন।" তখন আমি তাকে বললাম, "আপনি আল্লাহকে ভয় করুন। সারাটা পৃথিবীকে জুলম এবং অত্যাচারে ভরে ফেলেছেন!" সুফয়ান বলেন, আবু জাফর তখন তার মাথা ঝোঁকালেন। এরপর তিনি মাথা উঠিয়ে বললেন, "আপনার প্রয়োজন তুলে ধরুন।" তখন আমি বললাম, নিশ্চয়ই এই জায়গা মুসলিমদের কবজায় এসেছে মুহাজির এবং আনসার সাহাবিদের তরবারির মাধ্যমে আর তাদের সন্তানেরা আজ ক্ষুধার তাড়নায় মৃত্যু-পথযাত্রী। আপনি আল্লাহকে ভয় করুন এবং তাদের সমীপে তাদের হক পৌঁছে দিন। সুফয়ান বলেন, এরপর তিনি মাথা ঝোঁকালেন। এরপর মাথা তুলে বললেন, “আমাদের সামনে আপনার প্রয়োজন তুলে ধরুন।” তখন আমি বললাম, “উমর ইবনুল খাত্তাব হজ করেছেন। হজ আদায়কালে তিনি তার হিসাবরক্ষককে জিজ্ঞাসা করলেন, “কত খরচ করেছ?” সে বলল, “তেরো দিরহামের চেয়ে একটু বেশি।” অথচ আমি আপনাদের এখানে এত সব জিনিস দেখছি, উটও যা বহন করার সাধ্য রাখে না। এ কথাগুলো বলে সুফয়ান বেরিয়ে গেলেন।

টিকাঃ
৮৯. দ্বিতীয় খণ্ড, ১৪০-১৪৫ পৃষ্ঠা। আলোচনাপ্রসঙ্গে উল্লিখিত বর্ণনাসমূহও ইহইয়া থেকে গৃহীত।
৯০. সুনানুল বায়হাকি
৯১. হিলয়াতুল আওলিয়া
৯২. হিলয়াতুল আওলিয়া
৯৩. সুরা মারয়াম (১৯): ৫৯
৯৪. আসসামত, ইবনু আবিদ-দুনয়া: ২১৮-২১৯; আলকামিল, ইবনু 'আদি: ৫/১৯১৭; আসসিলসিলাতুয যায়িফা: ১৩৯৯
৯৫. তাবাকাতুশ শাফি'ইয়্যাহ আলকুবরা, সুবকি: ৬/৩১৪

📘 রাজদরবারে আলিমদের গমন একটি সতর্কবার্তা > 📄 আলিমের জন্য যেসব বৈশিষ্ট্য ধারণ করা উচিত

📄 আলিমের জন্য যেসব বৈশিষ্ট্য ধারণ করা উচিত


(৯৮) শায়খ ইযযুদ্দীন ইবনু আব্দিস সালাম এর একটি ঘটনা আলআমালি গ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে। গ্রন্থটি তার থেকে তার ছাত্র বিদগ্ধ মালেকি ইমাম শায়খ শিহাবুদ্দীন আলকারাফি গ্রন্থনা করেছেন। ঘটনাটি হলো, তার কাছে রাষ্ট্রের জনৈক কর্ণধার পত্র লেখেন। পত্রে তাকে তাদের সময়ের রাজার দরবারে একত্র হওয়ার এবং নিয়মিত রাজদরবারে যাতায়াত অব্যাহত রাখার জন্য উৎসাহ দেন—যাতে এর মাধ্যমে রাজার প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটা তার শত্রুশ্রেণির জন্য ঈর্ষার কারণ হয়। তখন তিনি বললেন, “আমি ইলম অধ্যয়ন করেছি যাতে আমি আল্লাহ এবং তার সৃষ্টির মাঝে মধ্যস্থতাকারী হতে পারি। আর আমি কিনা এদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে বেড়াব? কারাফি বলেন, “তিনি এর দ্বারা এদিকে ইঙ্গিত করলেন যে, যে ব্যক্তি ইলমের ধারক হয়, সে এ পর্যায়ে উপনীত হয় যে, সে আল্লাহ এর পক্ষ থেকে তার বান্দাদের দিকে ফরমান উদ্ধৃত করে। সে বার্তাবাহকের স্তরে থাকে। যার মর্যাদা এমন, তার জন্য এসব শোভন নয়।

(৯৯) ইবনুল হাজ আলমাদখাল গ্রন্থে বলেন, “আলিমের জন্য উচিত হলো, বরং তার জন্য আবশ্যিক কর্তব্য, সে কখনো কোনো দুনিয়াদারের দ্বারস্থ হবে না। কারণ, আলিমের শান হলো, মানুষেরা তার দুয়ারে থাকবে। অবস্থা উল্টে যাওয়া, অর্থাৎ আলিম সাধারণ মানুষদের দুয়ারে পড়ে থাকা কিছুতেই সংগত নয়। যে আলিম দুনিয়াদারদের দুয়ারে দুয়ারে পড়ে থাকে, সে কখনোই তার এই কাজের বৈধতা প্রমাণ করতে পারবে না। সে এ কথা বলতে পারবে না যে, “আমি শত্রু, হিংসুটে বা এ ধরনের কারও শঙ্কা করছিলাম, যে কোনো গণ্ডগোল-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে।” অথবা এ কথাও বলতে পারবে না যে, “আমার তো প্রত্যাশা ছিল, আমি এমন কোনো কিছু রোধ করতে পারব, যা সকলের জন্য শঙ্কার কারণ।” তার এ কথা বলারও অবকাশ নেই যে, “আমি তো ভেবেছিলাম, শাসকের দরবারে আমার এই যাতায়াত হবে মুসলমানদের বিপদাপদ ও প্রয়োজন পূরণের জন্য একটি অনন্য উপকরণ। আমার এ যাতায়াতের মাধ্যমে তাদের কোনো উপকার সাধিত হবে অথবা এর মাধ্যমে তাদের কোনো আপদ দূর হবে।” বস্তুত তার এমন কোনো অজুহাত নেই, যা তার পক্ষে ইতিবাচক কিছু নির্দেশ করবে।

আল্লাহ ই সেই মহান সত্তা, যিনি বান্দার সকল প্রয়োজন পূরণ করেন, তার শঙ্কাসমূহকে রোধ করেন, সৃষ্টিকুলের অন্তরসমূহকে অনুগত করেন এবং যার দিকে চান ও যেভাবে চান অন্তরসমূহকে ফিরিয়ে দেন। আল্লাহ সৃষ্টজীবের নেতাকে সম্বোধন করে বলছেন, "পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে, আপনি যদি তার সবটুকু ব্যয় করতেন, তবুও তাদের অন্তরসমূহের মাঝে সম্প্রীতি সৃষ্টি করতে পারতেন না। কিন্তু আল্লাহ তাদের অন্তরসমূহের মাঝে সম্প্রীতি সৃষ্টি করেছেন।”⁹⁶ তো আল্লাহ তাঁর নবি এর ওপর অনুগ্রহ বর্ণনার স্থানে এটাকে উল্লেখ করেছেন। আলিম যখন তাঁর অনুসারী হবে, বিশেষত সর্বক্ষেত্রে মাখলুককে পরিহার করে আল্লাহ এর ওপর ভরসা এবং নির্ভর করার ক্ষেত্রে, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ এই অনুসরণের বরকতে তার সঙ্গে সেরূপ সহৃদয় আচরণ করবেন, যেমনটি তাঁর নবি এর সঙ্গে করেছেন।

নিয়ামত পাওয়া বা না-পাওয়ার ব্যাপারে মহান আল্লাহর ওপর যারা আস্থা রাখে, আলিমগণ তাদের মধ্যে প্রণিধানযোগ্য। আলিম দুনিয়ার পেছনে ছোটার কারণ হিসাবে পরিবারের ভরণপোষণ সন্ধানের ওজর পেশ করতে পারে না। কারণ, আলিম যদি এই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানের ব্যাপারে শঙ্কাবোধ করে তা পরিহার করে, তা হলে নিশ্চয়ই মহামহিম আল্লাহ তার সদিচ্ছাকে নষ্ট করবেন না। আল্লাহ তার রিযিকের ব্যবস্থা করবেন, তার জন্য গাইবের দরজা খুলে দেবেন, নিশ্চয়ই যা পার্থিব লোভনীয় বস্তুর চেয়ে অনেক উত্তম, তাকে সাহায্য করবেন, তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে পূর্ণতা দান করবেন—যার জন্য চান, যেভাবে চান। আল্লাহ প্রদত্ত রিযিক নির্দিষ্ট কোনো উপায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

(১০০) তাবাকাতুল হানাফিয়্যাহ গ্রন্থে আলি ইবনু হাসান আস্সানদালি এর জীবনীতে রয়েছে, "সুলতান মালিক শাহ একজন আলিমকে বললেন, তুমি কেন আমার কাছে আসো না? তিনি বললেন, আমি চেয়েছি, আপনি শ্রেষ্ঠ আমিরদের একজন হন, যিনি আলিমদের যিয়ারত করেন। আমি সবচেয়ে নিকৃষ্ট আলিম হতে চাইনি, যে আমিরদের সাথে সাক্ষাৎ করে।"

(১০১) ইবনু আদি আলকামিল গ্রন্থে বলেন, আমি আবুল হুসাইন মুহাম্মাদ ইবনুল মুযাফফার কে বলতে শুনেছি, আমি মিসরে অবস্থানরত আমার শাইখদের শুনেছি, তারা আবু আব্দির রহমান আননাসায়ি এর শ্রেষ্ঠত্ব এবং ইমামাহর স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন, তার রাতভর নিয়মতান্ত্রিক ইবাদত এবং নিরবচ্ছিন্ন অধ্যবসায়ের স্তুতি বর্ণনা করেন। একবার তিনি মিসরের গভর্নরের সঙ্গে যুদ্ধে বের হলেন। তখন তার বিচক্ষণতা, রাসুলুল্লাহ এর প্রমাণিত সুন্নাহর প্রতিষ্ঠা এবং যে শাসনক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তির সঙ্গে তিনি বেরিয়েছেন, সযত্নে তার মজলিস থেকেও দূরে দূরে থাকার বৈশিষ্ট্যের কথা আলোচিত হলো। এটাই ছিল তার স্বভাব-বৈশিষ্ট্য, যাবৎ না তিনি শাহাদাতবরণ করেছেন।

(১০২) মিযযি এর তাহযিবুল কামাল গ্রন্থে বুখারি এর শায়খ আবু ইয়াহইয়া আহমাদ ইবনু আব্দিল মালিক আলহাররানি এর জীবনীতে বর্ণিত রয়েছে, তার হুবহু ভাষ্য হলো, "আবুল হাসান আল-মাইমুনি বলেন, আমি আহমদ ইবনু হাম্বল কে তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তখন তিনি বললেন, সে আমাদের এখানে ছিল। আমি তাকে বুদ্ধিমানই দেখেছি। তার মাঝে কোনো দোষ বা সমস্যা দেখিনি। আমার দেখামতে সে হাদিসের হাফিজ। আমি তার মাঝে শুধু উৎকৃষ্টতাই প্রত্যক্ষ করেছি।” আহমদ বলেন, “আমি একদল লোককে দেখেছি তার ব্যাপারে মন্দ কথা বলে।” তিনি বলেন, “সে শাসকের কাছে যাতায়াত করত তার একখণ্ড জমির কারণে।”

টিকাঃ
৯৬. সুরা আনফাল (০৮): ৬৩
৯৭. বর্ণনাটি ভিত্তিহীন। আলখাতিব বর্ণনাটি উদ্ধৃত করেছেন (৩/১৮০)। এর বর্ণনাসূত্রে ইউনুস ইবনু 'আতা এবং জাদ্দুস সাওরি নামক দুজন বর্ণনাকারী রয়েছেন। এ দুজন সম্পর্কে ইমামগণের বক্তব্য জানতে দ্রষ্টব্য-আলমিযান: ৪/৪৮২; লিসান: ৬/৩৩৩

(৯৮) শায়খ ইযযুদ্দীন ইবনু আব্দিস সালাম এর একটি ঘটনা আলআমালি গ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে। গ্রন্থটি তার থেকে তার ছাত্র বিদগ্ধ মালেকি ইমাম শায়খ শিহাবুদ্দীন আলকারাফি গ্রন্থনা করেছেন। ঘটনাটি হলো, তার কাছে রাষ্ট্রের জনৈক কর্ণধার পত্র লেখেন। পত্রে তাকে তাদের সময়ের রাজার দরবারে একত্র হওয়ার এবং নিয়মিত রাজদরবারে যাতায়াত অব্যাহত রাখার জন্য উৎসাহ দেন—যাতে এর মাধ্যমে রাজার প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটা তার শত্রুশ্রেণির জন্য ঈর্ষার কারণ হয়। তখন তিনি বললেন, “আমি ইলম অধ্যয়ন করেছি যাতে আমি আল্লাহ এবং তার সৃষ্টির মাঝে মধ্যস্থতাকারী হতে পারি। আর আমি কিনা এদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে বেড়াব? কারাফি বলেন, “তিনি এর দ্বারা এদিকে ইঙ্গিত করলেন যে, যে ব্যক্তি ইলমের ধারক হয়, সে এ পর্যায়ে উপনীত হয় যে, সে আল্লাহ এর পক্ষ থেকে তার বান্দাদের দিকে ফরমান উদ্ধৃত করে। সে বার্তাবাহকের স্তরে থাকে। যার মর্যাদা এমন, তার জন্য এসব শোভন নয়।

(৯৯) ইবনুল হাজ আলমাদখাল গ্রন্থে বলেন, “আলিমের জন্য উচিত হলো, বরং তার জন্য আবশ্যিক কর্তব্য, সে কখনো কোনো দুনিয়াদারের দ্বারস্থ হবে না। কারণ, আলিমের শান হলো, মানুষেরা তার দুয়ারে থাকবে। অবস্থা উল্টে যাওয়া, অর্থাৎ আলিম সাধারণ মানুষদের দুয়ারে পড়ে থাকা কিছুতেই সংগত নয়। যে আলিম দুনিয়াদারদের দুয়ারে দুয়ারে পড়ে থাকে, সে কখনোই তার এই কাজের বৈধতা প্রমাণ করতে পারবে না। সে এ কথা বলতে পারবে না যে, “আমি শত্রু, হিংসুটে বা এ ধরনের কারও শঙ্কা করছিলাম, যে কোনো গণ্ডগোল-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে।” অথবা এ কথাও বলতে পারবে না যে, “আমার তো প্রত্যাশা ছিল, আমি এমন কোনো কিছু রোধ করতে পারব, যা সকলের জন্য শঙ্কার কারণ।” তার এ কথা বলারও অবকাশ নেই যে, “আমি তো ভেবেছিলাম, শাসকের দরবারে আমার এই যাতায়াত হবে মুসলমানদের বিপদাপদ ও প্রয়োজন পূরণের জন্য একটি অনন্য উপকরণ। আমার এ যাতায়াতের মাধ্যমে তাদের কোনো উপকার সাধিত হবে অথবা এর মাধ্যমে তাদের কোনো আপদ দূর হবে।” বস্তুত তার এমন কোনো অজুহাত নেই, যা তার পক্ষে ইতিবাচক কিছু নির্দেশ করবে।

আল্লাহ ই সেই মহান সত্তা, যিনি বান্দার সকল প্রয়োজন পূরণ করেন, তার শঙ্কাসমূহকে রোধ করেন, সৃষ্টিকুলের অন্তরসমূহকে অনুগত করেন এবং যার দিকে চান ও যেভাবে চান অন্তরসমূহকে ফিরিয়ে দেন। আল্লাহ সৃষ্টজীবের নেতাকে সম্বোধন করে বলছেন, "পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে, আপনি যদি তার সবটুকু ব্যয় করতেন, তবুও তাদের অন্তরসমূহের মাঝে সম্প্রীতি সৃষ্টি করতে পারতেন না। কিন্তু আল্লাহ তাদের অন্তরসমূহের মাঝে সম্প্রীতি সৃষ্টি করেছেন।”⁹⁶ তো আল্লাহ তাঁর নবি এর ওপর অনুগ্রহ বর্ণনার স্থানে এটাকে উল্লেখ করেছেন। আলিম যখন তাঁর অনুসারী হবে, বিশেষত সর্বক্ষেত্রে মাখলুককে পরিহার করে আল্লাহ এর ওপর ভরসা এবং নির্ভর করার ক্ষেত্রে, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ এই অনুসরণের বরকতে তার সঙ্গে সেরূপ সহৃদয় আচরণ করবেন, যেমনটি তাঁর নবি এর সঙ্গে করেছেন।

নিয়ামত পাওয়া বা না-পাওয়ার ব্যাপারে মহান আল্লাহর ওপর যারা আস্থা রাখে, আলিমগণ তাদের মধ্যে প্রণিধানযোগ্য। আলিম দুনিয়ার পেছনে ছোটার কারণ হিসাবে পরিবারের ভরণপোষণ সন্ধানের ওজর পেশ করতে পারে না। কারণ, আলিম যদি এই মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানের ব্যাপারে শঙ্কাবোধ করে তা পরিহার করে, তা হলে নিশ্চয়ই মহামহিম আল্লাহ তার সদিচ্ছাকে নষ্ট করবেন না। আল্লাহ তার রিযিকের ব্যবস্থা করবেন, তার জন্য গাইবের দরজা খুলে দেবেন, নিশ্চয়ই যা পার্থিব লোভনীয় বস্তুর চেয়ে অনেক উত্তম, তাকে সাহায্য করবেন, তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে পূর্ণতা দান করবেন—যার জন্য চান, যেভাবে চান। আল্লাহ প্রদত্ত রিযিক নির্দিষ্ট কোনো উপায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

(১০০) তাবাকাতুল হানাফিয়্যাহ গ্রন্থে আলি ইবনু হাসান আস্সানদালি এর জীবনীতে রয়েছে, "সুলতান মালিক শাহ একজন আলিমকে বললেন, তুমি কেন আমার কাছে আসো না? তিনি বললেন, আমি চেয়েছি, আপনি শ্রেষ্ঠ আমিরদের একজন হন, যিনি আলিমদের যিয়ারত করেন। আমি সবচেয়ে নিকৃষ্ট আলিম হতে চাইনি, যে আমিরদের সাথে সাক্ষাৎ করে।"

(১০১) ইবনু আদি আলকামিল গ্রন্থে বলেন, আমি আবুল হুসাইন মুহাম্মাদ ইবনুল মুযাফফার কে বলতে শুনেছি, আমি মিসরে অবস্থানরত আমার শাইখদের শুনেছি, তারা আবু আব্দির রহমান আননাসায়ি এর শ্রেষ্ঠত্ব এবং ইমামাহর স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন, তার রাতভর নিয়মতান্ত্রিক ইবাদত এবং নিরবচ্ছিন্ন অধ্যবসায়ের স্তুতি বর্ণনা করেন। একবার তিনি মিসরের গভর্নরের সঙ্গে যুদ্ধে বের হলেন। তখন তার বিচক্ষণতা, রাসুলুল্লাহ এর প্রমাণিত সুন্নাহর প্রতিষ্ঠা এবং যে শাসনক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তির সঙ্গে তিনি বেরিয়েছেন, সযত্নে তার মজলিস থেকেও দূরে দূরে থাকার বৈশিষ্ট্যের কথা আলোচিত হলো। এটাই ছিল তার স্বভাব-বৈশিষ্ট্য, যাবৎ না তিনি শাহাদাতবরণ করেছেন।

(১০২) মিযযি এর তাহযিবুল কামাল গ্রন্থে বুখারি এর শায়খ আবু ইয়াহইয়া আহমাদ ইবনু আব্দিল মালিক আলহাররানি এর জীবনীতে বর্ণিত রয়েছে, তার হুবহু ভাষ্য হলো, "আবুল হাসান আল-মাইমুনি বলেন, আমি আহমদ ইবনু হাম্বল কে তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তখন তিনি বললেন, সে আমাদের এখানে ছিল। আমি তাকে বুদ্ধিমানই দেখেছি। তার মাঝে কোনো দোষ বা সমস্যা দেখিনি। আমার দেখামতে সে হাদিসের হাফিজ। আমি তার মাঝে শুধু উৎকৃষ্টতাই প্রত্যক্ষ করেছি।” আহমদ বলেন, “আমি একদল লোককে দেখেছি তার ব্যাপারে মন্দ কথা বলে।” তিনি বলেন, “সে শাসকের কাছে যাতায়াত করত তার একখণ্ড জমির কারণে।”

টিকাঃ
৯৬. সুরা আনফাল (০৮): ৬৩
৯৭. বর্ণনাটি ভিত্তিহীন। আলখাতিব বর্ণনাটি উদ্ধৃত করেছেন (৩/১৮০)। এর বর্ণনাসূত্রে ইউনুস ইবনু 'আতা এবং জাদ্দুস সাওরি নামক দুজন বর্ণনাকারী রয়েছেন। এ দুজন সম্পর্কে ইমামগণের বক্তব্য জানতে দ্রষ্টব্য-আলমিযান: ৪/৪৮২; লিসান: ৬/৩৩৩

📘 রাজদরবারে আলিমদের গমন একটি সতর্কবার্তা > 📄 শেষ যামানায় সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস

📄 শেষ যামানায় সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস


(১০৩) তাহযিবুল কামাল গ্রন্থে রিশদিন ইবনু সা'দ থেকে আরও বর্ণিত রয়েছে, তিনি বলেন, আমি ইবরাহিম ইবনু আদহাম কে বলতে শুনেছি, আমি শুনেছি, “শেষ যামানায় সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস হবে তিনটি— দ্বীনি ভাই, যার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়া যায়; হালাল পন্থায় রৌপ্যমুদ্রা উপার্জন এবং শাসকের সামনে সত্য কথা।”

টিকাঃ
৯৮. তাহযিবুল কামাল, মিযযি: ১/৩০
৯৯. তাহযিবুল কামাল, মিযযি: ১/৪৯

(১০৩) তাহযিবুল কামাল গ্রন্থে রিশদিন ইবনু সা'দ থেকে আরও বর্ণিত রয়েছে, তিনি বলেন, আমি ইবরাহিম ইবনু আদহাম কে বলতে শুনেছি, আমি শুনেছি, “শেষ যামানায় সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস হবে তিনটি— দ্বীনি ভাই, যার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়া যায়; হালাল পন্থায় রৌপ্যমুদ্রা উপার্জন এবং শাসকের সামনে সত্য কথা।”

টিকাঃ
৯৮. তাহযিবুল কামাল, মিযযি: ১/৩০
৯৯. তাহযিবুল কামাল, মিযযি: ১/৪৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00