📄 আহলুল ইলম ইলমের সুরক্ষায় প্রতিষ্ঠিত থাকার ফাজিলত
(৭২) আম্মার ইবনু সাইফ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি সুফয়ান সাওরি -কে বলতে শুনেছি, "শাসকের দিকে তাকানো গুনাহ।"⁷⁵
(৭৩) ফুযাইল ইবনু ইয়াজ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আহলুল ইলম যদি নিজেদের মর্যাদাবান রাখে, নিজেদের দ্বীনের ব্যাপারে কার্পণ্য করে, ইলমকে সম্মানিত ও সুরক্ষিত রাখে এবং তাকে সেই অবস্থানে রাখে, যে অবস্থানে আল্লাহ তাকে রেখেছেন, তা হলে প্রতাপশালীদের ঘাড় তাদের সামনে নত থাকবে, মানুষেরা তাদের জন্য অনুগত হয়ে যাবে, তারা ব্যস্ত হতে পারবে এমন বিষয় নিয়ে, যা ইসলাম এবং মুসলিম উম্মাহর মর্যাদা বৃদ্ধিতে তাদের জন্য সহায়ক হবে। কিন্তু তারা নিজেদের হেয় প্রতিপন্ন করেছে এবং যখন দুনিয়া তাদের জন্য নিরাপদ হয়েছে, তখন তাদের দ্বীনে কি হ্রাস-কমতি ঘটেছে—তারা এর কোনো পরোয়া করেননি। তারা দুনিয়াদারদের জন্য নিজেদের ইলমকে বিকিয়েছে, যাতে তারা তাদের অধিকারভুক্ত কিছু সম্পদ অর্জন করতে পারে। এভাবে তারা মানুষদের চোখে হীন ও লাঞ্ছিত হয়েছে।”⁷⁶
(৭৪) আবুল আব্বাস বলেন, "তাহির ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনি তাহির তার বাবার জীবদ্দশায় হজপালনের উদ্দেশ্যে খোরাসান থেকে আগমন করলেন। তখন তিনি ইসহাক ইবনু ইবরাহিমের ঘরে অবস্থান করলেন। ইসহাক তখন আলিমদের দূত মারফত ডেকে পাঠালেন। উদ্দেশ্য ছিল, আলিমদের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে তাহিরকে সাক্ষাৎ করানো এবং তাদের থেকে তাহিরের হাদিস বর্ণনার ইজাযতগ্রহণের সুব্যবস্থা করা। তার দাওয়াতে দ্বীনদার মুহাদ্দিস ও ফকিহগণ সমবেত হলেন। উপস্থিতদের মধ্যে ছিলেন ইবনুল আরাবি, আসমায়ি এর শাগরিদ আবু নাসর-সহ প্রমুখ বিদগ্ধ আলিমগণ। তিনি দূত মারফত আবু উবায়দ কাসিম ইবনু সাল্লাম কে ডেকে পাঠালেন। আবু উবায়দ কাসিম ইবনু সাল্লাম তখন দরবারে উপস্থিত হতে অস্বীকৃতি জানালেন এবং সাফ বলে দিলেন, "ইলমকে উদ্দেশ্য করে আসা হয়। (ইলম কারও দরবারে যায় না।)" ইসহাক তার কথা এবং তার বার্তা শুনে ক্রোধান্বিত হলেন। আব্দুল্লাহ ইবনু তাহির প্রতিমাসে তাকে দু-হাজার দিরহাম ভাতা দিতেন। ইসহাক আবু উবায়দ কাসিম ইবনু সাল্লাম এর কাছে পুনরায় সংবাদ না পাঠিয়েই তার ভাতা বন্ধ করে দিলেন আর বিষয়টি আব্দুল্লাহ ইবনু তাহিরের কাছে লিখে পাঠালেন। আব্দুল্লাহ তাকে লিখলেন, “হে কল্যাণপ্রদানকারী, যিনি কল্যাণের বিশেষণে আদৃত ও পরিচিত।” তিনি বললেন, "আবু উবায়দ তার কথায় সত্য বলেছে আমি তার আচরণের কারণে তার ভাতা শিথিল করে দিয়েছি।" এরপর তিনি ভাতা প্রদান করে বললেন, "তুমি তাকে এটা দেবে এবং এরপর থেকে সে যে জিনিসের উপযুক্ত, তাকে তা প্রদান করবে।”⁷⁷
টিকাঃ
৭৫. হিলয়াতুল আওলিয়া: ৭/৪৬
৭৬. হিলয়াতুল আওলিয়া: ৮/৯২
৭৭. মু'জামুল উদাবা: ১৬/২৬০-২৬১
(৭২) আম্মার ইবনু সাইফ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি সুফয়ান সাওরি -কে বলতে শুনেছি, "শাসকের দিকে তাকানো গুনাহ।"⁷⁵
(৭৩) ফুযাইল ইবনু ইয়াজ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আহলুল ইলম যদি নিজেদের মর্যাদাবান রাখে, নিজেদের দ্বীনের ব্যাপারে কার্পণ্য করে, ইলমকে সম্মানিত ও সুরক্ষিত রাখে এবং তাকে সেই অবস্থানে রাখে, যে অবস্থানে আল্লাহ তাকে রেখেছেন, তা হলে প্রতাপশালীদের ঘাড় তাদের সামনে নত থাকবে, মানুষেরা তাদের জন্য অনুগত হয়ে যাবে, তারা ব্যস্ত হতে পারবে এমন বিষয় নিয়ে, যা ইসলাম এবং মুসলিম উম্মাহর মর্যাদা বৃদ্ধিতে তাদের জন্য সহায়ক হবে। কিন্তু তারা নিজেদের হেয় প্রতিপন্ন করেছে এবং যখন দুনিয়া তাদের জন্য নিরাপদ হয়েছে, তখন তাদের দ্বীনে কি হ্রাস-কমতি ঘটেছে—তারা এর কোনো পরোয়া করেননি। তারা দুনিয়াদারদের জন্য নিজেদের ইলমকে বিকিয়েছে, যাতে তারা তাদের অধিকারভুক্ত কিছু সম্পদ অর্জন করতে পারে। এভাবে তারা মানুষদের চোখে হীন ও লাঞ্ছিত হয়েছে।”⁷⁶
(৭৪) আবুল আব্বাস বলেন, "তাহির ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনি তাহির তার বাবার জীবদ্দশায় হজপালনের উদ্দেশ্যে খোরাসান থেকে আগমন করলেন। তখন তিনি ইসহাক ইবনু ইবরাহিমের ঘরে অবস্থান করলেন। ইসহাক তখন আলিমদের দূত মারফত ডেকে পাঠালেন। উদ্দেশ্য ছিল, আলিমদের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে তাহিরকে সাক্ষাৎ করানো এবং তাদের থেকে তাহিরের হাদিস বর্ণনার ইজাযতগ্রহণের সুব্যবস্থা করা। তার দাওয়াতে দ্বীনদার মুহাদ্দিস ও ফকিহগণ সমবেত হলেন। উপস্থিতদের মধ্যে ছিলেন ইবনুল আরাবি, আসমায়ি এর শাগরিদ আবু নাসর-সহ প্রমুখ বিদগ্ধ আলিমগণ। তিনি দূত মারফত আবু উবায়দ কাসিম ইবনু সাল্লাম কে ডেকে পাঠালেন। আবু উবায়দ কাসিম ইবনু সাল্লাম তখন দরবারে উপস্থিত হতে অস্বীকৃতি জানালেন এবং সাফ বলে দিলেন, "ইলমকে উদ্দেশ্য করে আসা হয়। (ইলম কারও দরবারে যায় না।)" ইসহাক তার কথা এবং তার বার্তা শুনে ক্রোধান্বিত হলেন। আব্দুল্লাহ ইবনু তাহির প্রতিমাসে তাকে দু-হাজার দিরহাম ভাতা দিতেন। ইসহাক আবু উবায়দ কাসিম ইবনু সাল্লাম এর কাছে পুনরায় সংবাদ না পাঠিয়েই তার ভাতা বন্ধ করে দিলেন আর বিষয়টি আব্দুল্লাহ ইবনু তাহিরের কাছে লিখে পাঠালেন। আব্দুল্লাহ তাকে লিখলেন, “হে কল্যাণপ্রদানকারী, যিনি কল্যাণের বিশেষণে আদৃত ও পরিচিত।” তিনি বললেন, "আবু উবায়দ তার কথায় সত্য বলেছে আমি তার আচরণের কারণে তার ভাতা শিথিল করে দিয়েছি।" এরপর তিনি ভাতা প্রদান করে বললেন, "তুমি তাকে এটা দেবে এবং এরপর থেকে সে যে জিনিসের উপযুক্ত, তাকে তা প্রদান করবে।”⁷⁷
টিকাঃ
৭৫. হিলয়াতুল আওলিয়া: ৭/৪৬
৭৬. হিলয়াতুল আওলিয়া: ৮/৯২
৭৭. মু'জামুল উদাবা: ১৬/২৬০-২৬১
📄 যাহিদ আবু হাযিম (রহ.) এবং বনু উমাইয়ার আমিরগণ
(৭৫) আবু হাযিম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "সুলায়মান ইবনু হিশাম ইবনি আব্দিল মালিক মদিনায় আসলেন। তিনি আমাকে দূত মারফত ডেকে পাঠালেন। অনন্তর আমি তার দরবারে উপস্থিত হলাম। দরবারে পৌঁছে আমি তাকে সালাম দিলাম। আমি তখন আমার লাঠির ওপর ভর করা অবস্থায় ছিলাম। তখন সুলায়মান ইবনু হিশাম বললেন, "আপনি কি কিছু বলবেন না?” আবু হাযিম জবাব দিলেন, "আমার তো কোনো প্রয়োজন নেই, যা আমি আপনাকে বলব। আমি তো এসেছি আপনার প্রয়োজনে, যার জন্য আপনি দূত মারফত আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। যে-ই আমার কাছে দূত মারফত সংবাদ পাঠায়, তার কাছেই আমি উপস্থিত হই না। আপনাদের অনিষ্টের আশঙ্কা যদি না থাকত, তা হলে আমি আপনাদের কাছে আসতাম না। আমি দুনিয়াবাসীকে দেখেছি আলিমদের অনুসারীরূপে—যেখানেই তারা থাকুন না কেন। আহলুল ইলম দুনিয়াবাসীকে জন্য তাদের দুনিয়া এবং আখিরাতের প্রয়োজনসমূহ পূরণ করে থাকেন। দুনিয়াবাসী জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে আলিমগণের থেকে অমুখাপেক্ষী হতে পারে না। এরপর যামানা আবর্তিত হয়েছে এবং অবস্থা এ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আলিমগণ যেখানেই থাকুন না কেন—তারা দুনিয়াবাসীদের অনুসারী হয়ে গেছেন। তাই উভয় ফরিকের ওপরই বিপদ আপতিত হয়েছে। দুনিয়াবাসীরা যে ইলমকে ধারণ করে রাখত, তারা তা ছেড়ে দিলো—যখন তারা দেখল, আহলুল ইলম তাদের দুয়ারে এসে গেছে। আর আহলুল ইলম মহান স্রষ্টার পক্ষ থেকে তাদের বণ্টনে যে জ্ঞান লাভ করছিল-তার বড় অংশই দুনিয়াবাসীদের অনুসরণের মাধ্যমে নষ্ট করে ফেলল।”⁷⁸
(৭৬) যামাআহ ইবনু সালিহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "বানু উমাইয়ার জনৈক শাসক আবু হাযিম এর কাছে তার প্রয়োজন তুলে ধরার কথা লিখে পাঠালেন। তখন তিনি তার উদ্দেশে লিখলেন, "হামদ ও সালাতের পর কথা হলো, আমার কাছে আপনার পত্র পৌঁছেছে-এ মর্মে যে, "আপনি আমার কাছে আপনার প্রয়োজন তুলে ধরুন।” এটা তো একেবারেই অসম্ভব! আমি আমার প্রয়োজনগুলোকে আমার মাওলার কাছে তুলে ধরেছি। তিনি আমাকে যা কিছু দেন, আমি তা গ্রহণ করে নেই। আর তিনি যা কিছু আমার থেকে নিবারণ করেন, আমি তা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিই।"⁷⁹
(৭৭) আবু হাযিম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "সুলায়মান ইবনু আব্দিল মালিক মদিনায় প্রবেশ করে তিন দিন অবস্থান করলেন। তখন তিনি বললেন, "মুহাম্মাদ এর সাহাবিদের পেয়েছে—এমন কেউ কি আছে, যে আমাদের হাদিস বর্ণনা করে শোনাবে?" তখন তাকে বলা হলো, “অবশ্যই, এখানে একজন লোক রয়েছেন, যিনি আবু হাযিম নামে পরিচিত।” তখন তিনি তার কাছে খবর পাঠালেন। অনন্তর আবু হাযিম উপস্থিত হলেন। তখন সুলায়মান তাকে বললেন, “হে আবু হাযেম, এই দুর্ব্যবহারের হেতু কী? আমার কাছে মদিনার সকল বিশিষ্ট ব্যক্তি এল, অথচ তুমি এলে না!” আবু হাযিম বললেন, “মানুষেরা যখন সত্যের ওপর ছিল, তখন আমিররা আলিমগণের দিকে মুখাপেক্ষী ছিল। আর আলিমরা নিজেদের দ্বীন নিয়ে আমিরদের থেকে দূরে সরে থাকত। যখন নিম্নশ্রেনীর একদল মানুষ এ অবস্থা দেখল, তখন তারা ইলম শিক্ষা করল এবং তা নিয়ে শাসকদের দরবারে উপস্থিত হলো। এর মাধ্যমে শাসকেরা আলিমদের থেকে অমুখাপেক্ষী হয়ে গেল এবং কাওম গুনাহের ওপর ঐক্যবদ্ধ হলো। এভাবে তারা স্খলিত হলো, দুর্দশাগ্রস্থ হলো, অধঃপতিত হলো। আমাদের এ সকল আলিমরা যদি তাদের ইলমের সুরক্ষা করত, তা হলে আমিররা তাদের ভয় করে চলত।”⁸⁰
(৭৮) যামাআহ ইবনু সালিহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “যুহরি সুলায়মান অথবা হিশামকে বললেন, “আপনি কি আবু হাযিমকে জিজ্ঞাসা করবেন না যে, সে আলিমদের ব্যাপারে কী বলে?” তিনি বললেন, “আমি আলিমদের ব্যাপারে উত্তম কথা ছাড়া ভিন্ন কিছু বলিনি। আমি আলিমদের এ অবস্থায় পেয়েছি যে, তারা তাদের কর্মের মাধ্যমে দুনিয়াবাসীর থেকে অমুখাপেক্ষী ছিলেন। আর দুনিয়াবাসী তাদের দুনিয়া নিয়ে আলিমদের ইলম থেকে অমুখাপেক্ষী হতে পারেনি। এই অবস্থা যখন সে এবং তার সঙ্গীরা দেখল, তখন তারা নিজেরাও ইলম শিক্ষা করল, অনন্তর তারা এর দ্বারা অমুখাপেক্ষিতা অর্জন করতে পারল না, অপরদিকে দুনিয়াবাসী নিজেদের দুনিয়া নিয়ে তাদের ইলম থেকে অমুখাপেক্ষী থাকল। তারা যখন এই পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করল, তখন তারা দুনিয়াবাসীর সামনে নিজেদের ইলম ছুড়ে ফেলল। আর দুনিয়াবাসী তাদের দুনিয়ার কোনো অংশ এই আলিমশ্রেণিকে প্রদান করল না। নিঃসন্দেহে সে এবং তার সঙ্গীরা আলিম নয়—নিশ্চয়ই তারা বর্ণনাকারী।"⁸¹
(৭৯) ইউসুফ ইবনু আসবাত বলেন, আমাকে একজন সংবাদ প্রদানকারী অবগত করলেন, "জনৈক শাসক আবু হাযিম এর কাছে দূত পাঠালেন। অনন্তর তিনি তার কাছে উপস্থিত হলেন। তার কাছে তখন ইফরিকি, যুহরি এবং আরও অন্যান্যরা ছিলেন। তখন শাসক বললেন, "হে আবু হাযিম, আপনি আলোচনা করুন।" তিনি বললেন, "নিশ্চয়ই সর্বোত্তম আমির সে, যে আলিমদের ভালোবাসে আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট আলিম সে, যে আমিরদের ভালোবাসে। ইতিপূর্বে আমিররা তাদের কাছে লোক পাঠালে তারা তাদের দরবারে উপস্থিত হতেন না। আর যখন আমিররা তাদের কোনো কিছু প্রদান করার সুযোগ চাইত, তখন তারা কোনো কিছু প্রদানের সুযোগ দিতেন না। আমিররা আলিমগণের ঘরে এসে তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করতেন। আর এর মাঝে আমির এবং আলিম-উভয় শ্রেণির কল্যাণ নিহিত ছিল। যখন একদল মানুষ এটা দেখল, তখন তারা বলল, আমাদের কী হলো যে, আমরা ইলম শিক্ষা করে এদের মতো হই না! অনন্তর তারা ইলম শিক্ষা করে আমিরদের দরবারে উপস্থিত হলো। এভাবে আলিমরা আমিরদের ধ্বংসের কারণ হলো আর আমিররা আলিমদের দুর্দশাগ্রস্ততার উপলক্ষ হলো।”⁸²
(৮০) সুফয়ান থেকে বর্ণিত, "জনৈক আমির আবু হাযিম কে জিজ্ঞাসা করলেন, "আপনি আমার কাছে আপনার প্রয়োজন তুলে ধরুন।” তিনি বললেন, "অসম্ভব! অসম্ভব!! আমি তো প্রয়োজনগুলোকে এমন সত্তার সামনে তুলে ধরেছি, যার কাছে সকল প্রয়োজন সংরক্ষিত হয়। তিনি তার ধনভান্ডার থেকে আমাকে যা কিছু দেন, আমি তাতেই সন্তুষ্ট। আর তিনি যা থেকে আমাকে বিরত রাখেন, আমি তাতে তুষ্ট।" পূর্বের যামানায় শাসকরা আলিমদের সন্ধান করত, আর আলিমরা তাদের থেকে পালিয়ে বেড়াতেন। আর বর্তমানে আলিমরা ইলম তলব করে। একপর্যায়ে তারা যখন ইলমকে পূর্ণরূপে নিজের ভেতর ধারণ করে, তখন তারা তা নিয়ে শাসকদের দুয়ারে আসে। শাসকরা তাদের থেকে পালিয়ে বেড়ায় আর আলিমরা তাদের অনুসন্ধান করে ফেরে।⁸³
(৮১) মুহাম্মাদ ইবনু আজলান আলমাদিনি বলেন, "সুলায়মান ইবনু হিশাম আবু হাযিম এর কাছে দূত পাঠালেন। তিনি তাকে বললেন, "আপনি কিছু বলুন।" তিনি বললেন, "আমার কোনো প্রয়োজন নেই যে, আমি আপনাকে তার কথা বলব। আপনাদের অনিষ্টের আশঙ্কা যদি না থাকত, তা হলে আমি আপনাদের কাছে আসতাম না। আমাদের কাছে এমন এক সময় এসেছে, যখন আমিররা আলিমদের তলব করত। তারা সাধ্যমতো আলিমদের থেকে ইলম গ্রহণ করত এবং এর মাধ্যমে উপকৃত হতো। এতে উভয় ফরিকের কল্যাণ ছিল। অধুনা আলিমরা শাসকদের সন্ধানে নেমেছে এবং তাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। আর তাদের হাতে যে পার্থিব সম্পদ রয়েছে-তার দিকে আকৃষ্ট হয়েছে। শাসকরা বলল, এরা আমাদের হাতে যা কিছু রয়েছে, তা তলব করেছে। সুতরাং আমাদের হাতে যা কিছু রয়েছে, তা ওই জিনিসের থেকে উত্তম, যা তাদের হাতে রয়েছে। এতে উভয় ফরিকের অকল্যাণ হয়েছে। সুলায়মান ইবনু হিশাম বললেন, "আপনি সত্য বলেছেন।”⁸⁴
(৮২) আবুযায্যনাদ নিজ পিতা থেকে বর্ণনা করেন, "মদিনার ফকিহগণ উমর ইবনু আব্দিল আযিয এর কাছে আসতেন। তবে সাইদ ইবনুল মুসাইয়িব আসতেন না। কেননা, উমর ইবনু আব্দিল আযিয এটা পছন্দ করতেন যে, তাদের দুজনের মধ্যে কোনো দূত থাকবে। আর আমি ছিলাম তাদের উভয়ের মাঝের দূত।"⁸⁵
(৮৩) আওযায়ি থেকে বর্ণিত, "আতা আল-খুরাসানি হিশাম ইবনু আব্দিল মালিকের দরবারে গমনাগমন করতেন। সে সময়ে তিনি মাকহুল এর ঘরে অবস্থান করতেন। একদিন আতা মাকহুল কে বললেন, এখানে কি এমন কেউ আছে, যে আমাদের আন্দোলিত করবে, অর্থাৎ আমাদের উপদেশ দেবে?" তিনি বললেন, “হাঁ, ইয়াযিদ ইবনু মাইসারা।” তখন তারা ইয়াযিদ ইবনু মাইসারা এর কাছে আগমন করলেন। আতা তাঁকে বললেন, আমাদের আন্দোলিত করুন। আল্লাহ আপনাকে রহম করুন।" "তিনি বললেন, হাঁ, আলিমরা যখন ইলম অর্জন করতেন, তখন কর্মের অঙ্গনে আসতেন। যখন তারা কর্মের অঙ্গনে আসতেন, তখন ব্যস্ততায় জড়িয়ে যেতেন। যখন তারা ব্যস্ততায় জড়িয়ে যেতেন, তখন হারিয়ে যেতেন। যখন তারা হারিয়ে যেতেন, তখন দুনিয়ার সন্ধানে রত হতেন। যখন তারা দুনিয়া সন্ধানে রত হতেন, তখন দ্বীন থেকে পালিয়ে বেড়াতেন।” তিনি বললেন, “আপনি কথাগুলো আরেকবার পুনরাবৃত্তি করুন।” তখন তিনি কথাগুলো পুনরাবৃত্তি করলেন। অনন্তর আতা ফিরে গেলেন। হিশামের সাথেও আর সাক্ষাৎ করলেন না।⁸⁶
টিকাঃ
৭৮. হিলয়াতুল আওলিয়া : ৩/২৩৪-২৩৫; সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/১৫৮-১৫৯; ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন: ২/১৪৫
৭৯. হিলয়াতুল আওলিয়া: ৩/২৩৭
৮০. হিলয়াতুল আওলিয়া: ৩/২৩৩; সুনানুল বায়হাকি; তারিখু ইবনি আসাকির
৮১. হিলয়াতুল আওলিয়া: ৩/২৩৩; সুনানুল বায়হাকি; তারিখু ইবনি আসাকির
৮২. হিলয়াতুল আওলিয়া: ৩/২৪৫
৮৩. হিলয়াতুল আওলিয়া: ৩/২৩৭; আযযুহদ, বায়হাকি
৮৪. তারিখু ইবনি আসাকির
৮৫. আততাবাকাতুল কুবরা, ইবনু সা'দ: ৫/১২২; আসসিয়ার, যাহাবি: ৪/২২৫
৮৬. হিলয়াতুল আওলিয়া: ৫/২৩৪; তারিখু ইবনি আসাকির
(৭৫) আবু হাযিম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "সুলায়মান ইবনু হিশাম ইবনি আব্দিল মালিক মদিনায় আসলেন। তিনি আমাকে দূত মারফত ডেকে পাঠালেন। অনন্তর আমি তার দরবারে উপস্থিত হলাম। দরবারে পৌঁছে আমি তাকে সালাম দিলাম। আমি তখন আমার লাঠির ওপর ভর করা অবস্থায় ছিলাম। তখন সুলায়মান ইবনু হিশাম বললেন, "আপনি কি কিছু বলবেন না?” আবু হাযিম জবাব দিলেন, "আমার তো কোনো প্রয়োজন নেই, যা আমি আপনাকে বলব। আমি তো এসেছি আপনার প্রয়োজনে, যার জন্য আপনি দূত মারফত আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। যে-ই আমার কাছে দূত মারফত সংবাদ পাঠায়, তার কাছেই আমি উপস্থিত হই না। আপনাদের অনিষ্টের আশঙ্কা যদি না থাকত, তা হলে আমি আপনাদের কাছে আসতাম না। আমি দুনিয়াবাসীকে দেখেছি আলিমদের অনুসারীরূপে—যেখানেই তারা থাকুন না কেন। আহলুল ইলম দুনিয়াবাসীকে জন্য তাদের দুনিয়া এবং আখিরাতের প্রয়োজনসমূহ পূরণ করে থাকেন। দুনিয়াবাসী জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে আলিমগণের থেকে অমুখাপেক্ষী হতে পারে না। এরপর যামানা আবর্তিত হয়েছে এবং অবস্থা এ পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আলিমগণ যেখানেই থাকুন না কেন—তারা দুনিয়াবাসীদের অনুসারী হয়ে গেছেন। তাই উভয় ফরিকের ওপরই বিপদ আপতিত হয়েছে। দুনিয়াবাসীরা যে ইলমকে ধারণ করে রাখত, তারা তা ছেড়ে দিলো—যখন তারা দেখল, আহলুল ইলম তাদের দুয়ারে এসে গেছে। আর আহলুল ইলম মহান স্রষ্টার পক্ষ থেকে তাদের বণ্টনে যে জ্ঞান লাভ করছিল-তার বড় অংশই দুনিয়াবাসীদের অনুসরণের মাধ্যমে নষ্ট করে ফেলল।”⁷⁸
(৭৬) যামাআহ ইবনু সালিহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "বানু উমাইয়ার জনৈক শাসক আবু হাযিম এর কাছে তার প্রয়োজন তুলে ধরার কথা লিখে পাঠালেন। তখন তিনি তার উদ্দেশে লিখলেন, "হামদ ও সালাতের পর কথা হলো, আমার কাছে আপনার পত্র পৌঁছেছে-এ মর্মে যে, "আপনি আমার কাছে আপনার প্রয়োজন তুলে ধরুন।” এটা তো একেবারেই অসম্ভব! আমি আমার প্রয়োজনগুলোকে আমার মাওলার কাছে তুলে ধরেছি। তিনি আমাকে যা কিছু দেন, আমি তা গ্রহণ করে নেই। আর তিনি যা কিছু আমার থেকে নিবারণ করেন, আমি তা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিই।"⁷⁹
(৭৭) আবু হাযিম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "সুলায়মান ইবনু আব্দিল মালিক মদিনায় প্রবেশ করে তিন দিন অবস্থান করলেন। তখন তিনি বললেন, "মুহাম্মাদ এর সাহাবিদের পেয়েছে—এমন কেউ কি আছে, যে আমাদের হাদিস বর্ণনা করে শোনাবে?" তখন তাকে বলা হলো, “অবশ্যই, এখানে একজন লোক রয়েছেন, যিনি আবু হাযিম নামে পরিচিত।” তখন তিনি তার কাছে খবর পাঠালেন। অনন্তর আবু হাযিম উপস্থিত হলেন। তখন সুলায়মান তাকে বললেন, “হে আবু হাযেম, এই দুর্ব্যবহারের হেতু কী? আমার কাছে মদিনার সকল বিশিষ্ট ব্যক্তি এল, অথচ তুমি এলে না!” আবু হাযিম বললেন, “মানুষেরা যখন সত্যের ওপর ছিল, তখন আমিররা আলিমগণের দিকে মুখাপেক্ষী ছিল। আর আলিমরা নিজেদের দ্বীন নিয়ে আমিরদের থেকে দূরে সরে থাকত। যখন নিম্নশ্রেনীর একদল মানুষ এ অবস্থা দেখল, তখন তারা ইলম শিক্ষা করল এবং তা নিয়ে শাসকদের দরবারে উপস্থিত হলো। এর মাধ্যমে শাসকেরা আলিমদের থেকে অমুখাপেক্ষী হয়ে গেল এবং কাওম গুনাহের ওপর ঐক্যবদ্ধ হলো। এভাবে তারা স্খলিত হলো, দুর্দশাগ্রস্থ হলো, অধঃপতিত হলো। আমাদের এ সকল আলিমরা যদি তাদের ইলমের সুরক্ষা করত, তা হলে আমিররা তাদের ভয় করে চলত।”⁸⁰
(৭৮) যামাআহ ইবনু সালিহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “যুহরি সুলায়মান অথবা হিশামকে বললেন, “আপনি কি আবু হাযিমকে জিজ্ঞাসা করবেন না যে, সে আলিমদের ব্যাপারে কী বলে?” তিনি বললেন, “আমি আলিমদের ব্যাপারে উত্তম কথা ছাড়া ভিন্ন কিছু বলিনি। আমি আলিমদের এ অবস্থায় পেয়েছি যে, তারা তাদের কর্মের মাধ্যমে দুনিয়াবাসীর থেকে অমুখাপেক্ষী ছিলেন। আর দুনিয়াবাসী তাদের দুনিয়া নিয়ে আলিমদের ইলম থেকে অমুখাপেক্ষী হতে পারেনি। এই অবস্থা যখন সে এবং তার সঙ্গীরা দেখল, তখন তারা নিজেরাও ইলম শিক্ষা করল, অনন্তর তারা এর দ্বারা অমুখাপেক্ষিতা অর্জন করতে পারল না, অপরদিকে দুনিয়াবাসী নিজেদের দুনিয়া নিয়ে তাদের ইলম থেকে অমুখাপেক্ষী থাকল। তারা যখন এই পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করল, তখন তারা দুনিয়াবাসীর সামনে নিজেদের ইলম ছুড়ে ফেলল। আর দুনিয়াবাসী তাদের দুনিয়ার কোনো অংশ এই আলিমশ্রেণিকে প্রদান করল না। নিঃসন্দেহে সে এবং তার সঙ্গীরা আলিম নয়—নিশ্চয়ই তারা বর্ণনাকারী।"⁸¹
(৭৯) ইউসুফ ইবনু আসবাত বলেন, আমাকে একজন সংবাদ প্রদানকারী অবগত করলেন, "জনৈক শাসক আবু হাযিম এর কাছে দূত পাঠালেন। অনন্তর তিনি তার কাছে উপস্থিত হলেন। তার কাছে তখন ইফরিকি, যুহরি এবং আরও অন্যান্যরা ছিলেন। তখন শাসক বললেন, "হে আবু হাযিম, আপনি আলোচনা করুন।" তিনি বললেন, "নিশ্চয়ই সর্বোত্তম আমির সে, যে আলিমদের ভালোবাসে আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট আলিম সে, যে আমিরদের ভালোবাসে। ইতিপূর্বে আমিররা তাদের কাছে লোক পাঠালে তারা তাদের দরবারে উপস্থিত হতেন না। আর যখন আমিররা তাদের কোনো কিছু প্রদান করার সুযোগ চাইত, তখন তারা কোনো কিছু প্রদানের সুযোগ দিতেন না। আমিররা আলিমগণের ঘরে এসে তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করতেন। আর এর মাঝে আমির এবং আলিম-উভয় শ্রেণির কল্যাণ নিহিত ছিল। যখন একদল মানুষ এটা দেখল, তখন তারা বলল, আমাদের কী হলো যে, আমরা ইলম শিক্ষা করে এদের মতো হই না! অনন্তর তারা ইলম শিক্ষা করে আমিরদের দরবারে উপস্থিত হলো। এভাবে আলিমরা আমিরদের ধ্বংসের কারণ হলো আর আমিররা আলিমদের দুর্দশাগ্রস্ততার উপলক্ষ হলো।”⁸²
(৮০) সুফয়ান থেকে বর্ণিত, "জনৈক আমির আবু হাযিম কে জিজ্ঞাসা করলেন, "আপনি আমার কাছে আপনার প্রয়োজন তুলে ধরুন।” তিনি বললেন, "অসম্ভব! অসম্ভব!! আমি তো প্রয়োজনগুলোকে এমন সত্তার সামনে তুলে ধরেছি, যার কাছে সকল প্রয়োজন সংরক্ষিত হয়। তিনি তার ধনভান্ডার থেকে আমাকে যা কিছু দেন, আমি তাতেই সন্তুষ্ট। আর তিনি যা থেকে আমাকে বিরত রাখেন, আমি তাতে তুষ্ট।" পূর্বের যামানায় শাসকরা আলিমদের সন্ধান করত, আর আলিমরা তাদের থেকে পালিয়ে বেড়াতেন। আর বর্তমানে আলিমরা ইলম তলব করে। একপর্যায়ে তারা যখন ইলমকে পূর্ণরূপে নিজের ভেতর ধারণ করে, তখন তারা তা নিয়ে শাসকদের দুয়ারে আসে। শাসকরা তাদের থেকে পালিয়ে বেড়ায় আর আলিমরা তাদের অনুসন্ধান করে ফেরে।⁸³
(৮১) মুহাম্মাদ ইবনু আজলান আলমাদিনি বলেন, "সুলায়মান ইবনু হিশাম আবু হাযিম এর কাছে দূত পাঠালেন। তিনি তাকে বললেন, "আপনি কিছু বলুন।" তিনি বললেন, "আমার কোনো প্রয়োজন নেই যে, আমি আপনাকে তার কথা বলব। আপনাদের অনিষ্টের আশঙ্কা যদি না থাকত, তা হলে আমি আপনাদের কাছে আসতাম না। আমাদের কাছে এমন এক সময় এসেছে, যখন আমিররা আলিমদের তলব করত। তারা সাধ্যমতো আলিমদের থেকে ইলম গ্রহণ করত এবং এর মাধ্যমে উপকৃত হতো। এতে উভয় ফরিকের কল্যাণ ছিল। অধুনা আলিমরা শাসকদের সন্ধানে নেমেছে এবং তাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। আর তাদের হাতে যে পার্থিব সম্পদ রয়েছে-তার দিকে আকৃষ্ট হয়েছে। শাসকরা বলল, এরা আমাদের হাতে যা কিছু রয়েছে, তা তলব করেছে। সুতরাং আমাদের হাতে যা কিছু রয়েছে, তা ওই জিনিসের থেকে উত্তম, যা তাদের হাতে রয়েছে। এতে উভয় ফরিকের অকল্যাণ হয়েছে। সুলায়মান ইবনু হিশাম বললেন, "আপনি সত্য বলেছেন।”⁸⁴
(৮২) আবুযায্যনাদ নিজ পিতা থেকে বর্ণনা করেন, "মদিনার ফকিহগণ উমর ইবনু আব্দিল আযিয এর কাছে আসতেন। তবে সাইদ ইবনুল মুসাইয়িব আসতেন না। কেননা, উমর ইবনু আব্দিল আযিয এটা পছন্দ করতেন যে, তাদের দুজনের মধ্যে কোনো দূত থাকবে। আর আমি ছিলাম তাদের উভয়ের মাঝের দূত।"⁸⁵
(৮৩) আওযায়ি থেকে বর্ণিত, "আতা আল-খুরাসানি হিশাম ইবনু আব্দিল মালিকের দরবারে গমনাগমন করতেন। সে সময়ে তিনি মাকহুল এর ঘরে অবস্থান করতেন। একদিন আতা মাকহুল কে বললেন, এখানে কি এমন কেউ আছে, যে আমাদের আন্দোলিত করবে, অর্থাৎ আমাদের উপদেশ দেবে?" তিনি বললেন, “হাঁ, ইয়াযিদ ইবনু মাইসারা।” তখন তারা ইয়াযিদ ইবনু মাইসারা এর কাছে আগমন করলেন। আতা তাঁকে বললেন, আমাদের আন্দোলিত করুন। আল্লাহ আপনাকে রহম করুন।" "তিনি বললেন, হাঁ, আলিমরা যখন ইলম অর্জন করতেন, তখন কর্মের অঙ্গনে আসতেন। যখন তারা কর্মের অঙ্গনে আসতেন, তখন ব্যস্ততায় জড়িয়ে যেতেন। যখন তারা ব্যস্ততায় জড়িয়ে যেতেন, তখন হারিয়ে যেতেন। যখন তারা হারিয়ে যেতেন, তখন দুনিয়ার সন্ধানে রত হতেন। যখন তারা দুনিয়া সন্ধানে রত হতেন, তখন দ্বীন থেকে পালিয়ে বেড়াতেন।” তিনি বললেন, “আপনি কথাগুলো আরেকবার পুনরাবৃত্তি করুন।” তখন তিনি কথাগুলো পুনরাবৃত্তি করলেন। অনন্তর আতা ফিরে গেলেন। হিশামের সাথেও আর সাক্ষাৎ করলেন না।⁸⁶
টিকাঃ
৭৮. হিলয়াতুল আওলিয়া : ৩/২৩৪-২৩৫; সিফাতুস সাফওয়াহ: ২/১৫৮-১৫৯; ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন: ২/১৪৫
৭৯. হিলয়াতুল আওলিয়া: ৩/২৩৭
৮০. হিলয়াতুল আওলিয়া: ৩/২৩৩; সুনানুল বায়হাকি; তারিখু ইবনি আসাকির
৮১. হিলয়াতুল আওলিয়া: ৩/২৩৩; সুনানুল বায়হাকি; তারিখু ইবনি আসাকির
৮২. হিলয়াতুল আওলিয়া: ৩/২৪৫
৮৩. হিলয়াতুল আওলিয়া: ৩/২৩৭; আযযুহদ, বায়হাকি
৮৪. তারিখু ইবনি আসাকির
৮৫. আততাবাকাতুল কুবরা, ইবনু সা'দ: ৫/১২২; আসসিয়ার, যাহাবি: ৪/২২৫
৮৬. হিলয়াতুল আওলিয়া: ৫/২৩৪; তারিখু ইবনি আসাকির
📄 হাম্মাদ ইবনু সালামাহ (রহ.) এবং ইরাকের আমির
(৮৪) মুকাতিল ইবনু সালিহ আল-খুরাসানি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আমি হাম্মাদ ইবনু সালামাহ্ এর কাছে গেলাম। আমি তার কাছে বসা ছিলাম, ইত্যবসরে একজন আগন্তুক দরজায় কড়া নাড়ল। তখন তিনি বললেন, "খুকি, বেরিয়ে দেখো তো, কে এখানে?" সে দেখে জানাল, "বসরা এবং কুফার আমির মুহাম্মাদ ইবনু সুলায়মান আল-হাশেমির পক্ষ থেকে প্রেরিত দূত।” তিনি বললেন, "তুমি তাকে বলো, সে যেন ভেতরে একাকী প্রবেশ করে।" অনন্তর সে প্রবেশ করে সালাম দিলো। এরপর আমিরের চিঠি অর্পণ করল। তখন তিনি তাকে বললেন, "তুমি এটা পাঠ করো।” তখন চিঠির পাতায় যা দেখা গেল, "পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। সুলায়মানের পক্ষ থেকে হাম্মাদ ইবনু সালামাহর উদ্দেশে। পর সমাচার হলো, আল্লাহ আপনাকে প্রাণবন্ত করুন, যেভাবে তিনি তার ওলি এবং আনুগত্যপরায়ণ বান্দাদের প্রাণবন্ত করেন। একটি মাসআলা দেখা দিয়েছে, তাই আমরা তার সমাধান জানার জন্য আপনার দ্বারস্থ হয়েছি।" তখন তিনি বললেন, "খুকি, তুমি দোয়াত নিয়ে আসো।" এরপর তিনি আমাকে বললেন, "চিঠিটা উল্টাও।” তারপর তিনি লিখলেন, "হামদ ও সালাতের পর, আল্লাহ আপনাকে প্রাণবন্ত করুন, যেভাবে তিনি তার ওলি এবং আনুগত্যপরায়ণ বান্দাদের প্রাণবন্ত করেন। আমরা আলিমদের এমতাবস্থায় পেয়েছি যে, তারা কারও কাছে গমনাগমন করতেন না। যদি কোনো মাসআলা দেখা দিয়ে থাকে, তা হলে আমাদের কাছে এসে আপনার সামনে যা কিছু দেখা দিয়েছে, তা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। আর হাঁ, যদি আমার কাছে আসেন, তা হলে একাকী আসবেন। আপনি আপনার অশ্বারোহী এবং পদাতিকদের নিয়ে আসবেন না। এর ব্যত্যয় হলে আমি আপনাকে নাসিহাহ করব না, আমার নিজেকেও কোনোপ্রকার নাসিহাহ করব না। ওয়াসসালাম।" একদিন আমি তার কাছে ছিলাম, এমতাবস্থায় জনৈক আগন্তুক দরজায় করাঘাত করল। তখন তিনি বললেন, "খুকি, বের হয়ে দেখো, এখানে কে?" সে বলল, "এখানে মুহাম্মাদ ইবনু সুলায়মান।” তিনি বললেন, "তুমি তাকে বলো, তিনি যেন একাকী প্রবেশ করেন।” মুহাম্মাদ ইবনু সুলায়মান তখন প্রবেশ করে সালাম দিলেন, এরপর তার সামনে উপবিষ্ট হলেন। তিনি বললেন, "আমার কী হলো যে, আমি যখন আপনার দিকে দৃষ্টিপাত করি, তখন সারা শরীর একধরনের আতঙ্কে শিহরিত হয়ে ওঠে!" তখন হাম্মাদ বললেন, “আমি সাবিত আল-বুনানি কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আনাস ইবনু মালিক বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ কে বলতে শুনেছি, “আলিম যখন তার ইলমের দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য নিয়ে থাকে, তখন সকল কিছু তাকে ভয় করে। আর যদি এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য হয়, সম্পদ বৃদ্ধি, তখন সে সবকিছুকে ভয় করে।” এরপর তিনি বাকি ঘটনা উল্লেখ করলেন।”⁸⁷
(৮৫) মুফলিহ ইবনুল আসওয়াদ বলেন, “মামুন ইয়াহইয়া ইবনু আকসাম কে বলেন, আমি বিশর ইবনুল হারিসকে দেখতে চাই। তিনি বললেন, “তা হলে আমি তার সঙ্গে আপনার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করি—যখন আপনি ইচ্ছা করেন, হে আমিরুল মুমিনিন!” এক রাতে তারা বিশর এর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে বের হলেন। তারা তাদের বাহনে আরোহণ করে বিশর এর ঘরে পৌঁছে গেলেন। সেখানে পৌঁছে বাহন থেকে অবতরণ করে ইয়াহইয়া বিশর এর দরজায় করাঘাত করলেন। বিশর বললেন, “কে এখানে?” ইয়াহইয়া উত্তর দিলেন, “তোমার ওপর যার আনুগত্য অপরিহার্য।” তিনি বললেন, “আপনি কী চাচ্ছেন?” তিনি বললেন, “আমি তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাচ্ছি।” বিশর বললেন, “স্বতঃস্ফূর্তভাবে নাকি বলপ্রয়োগ করে?” বর্ণনাকারী বলেন, তখন মামুন বুঝে ফেললেন। তিনি তখন ইয়াহইয়াকে বললেন, “বাহনে চড়ো।” তারা সেখান থেকে ফিরছিলেন। পথিমধ্যে তারা ইশার সালাত আদায়রত এক ব্যক্তির দেখা পেলেন। তখন তারাও সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে বাহন থেকে নেমে মসজিদে প্রবেশ করলেন। সেই ইমামের তিলাওয়াত তাদের অত্যন্ত মুগ্ধ করল, তাদের অন্তরাত্মাকে একেবারে ছুঁয়ে গেল। সকালবেলা মামুন সেই পাঠকারীর কাছে দূত পাঠালেন। দূত গিয়ে তাকে নিয়ে এল। সেই পাঠকারী দরবারে আসার পর মামুন তার সাথে ফিকহি আলোচনা-পর্যালোচনার ধারাপাত করলেন। তখন দেখা গেল, সেই পাঠকারী একের পর এক মামুনের থেকে বিপরীত মতামত প্রদান করেই যাচ্ছে এবং বলছে, “এই মাসআলার হুকুম আপনি যা বলছেন, তা নয়; বরং বক্তব্য এর বিপরীত।” একপর্যায়ে মামুন রেগে গেল। যখন সেই পাঠকারীর বিরোধিতার পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেল, তখন মামুন বলল, “তোমার প্রতি আমার ধারণা হলো, যখন তুমি তোমার সঙ্গীদের কাছে ফিরে যাবে, তখন তুমি এ কথা বলে বেড়াবে যে, তুমি আমিরুল মুমিনিনকে ভুল প্রমাণিত করেছ।” তখন সে বলল, “আল্লাহর কসম! হে আমিরুল মুমিনিন! আমি এতে লজ্জাবোধ করি যে, আমার সঙ্গীরা জানুক—আমি আপনার কাছে এসেছি।” তখন মামুন বলল, “সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি আমার প্রজাদের মধ্যে এমন ব্যক্তিকে রেখেছেন, যে আমার কাছে আসতে লজ্জাবোধ করে।” এরপর তিনি শুকরিয়া আদায়ের জন্য আল্লাহ তাআলাকে সিজদা করেন। সেই পাঠকারী ছিলেন ইবরাহিম ইবনু ইসহাক আলহারবি।⁸⁸
(৮৬) সুফয়ান সাওরি বলেন, “ইলম সম্মানিত একটি বস্তু ছিল। কিন্তু তারা যখন ইলমকে রাজাদের দুয়ারে বয়ে নিয়ে গেল এবং এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করল, তখন আল্লাহ তাদের অন্তর থেকে ইলমের মিষ্টতা উঠিয়ে নিলেন এবং তাদের তার ইলম থেকে বিরত করলেন।”
(৮৭) বিশর আল-হাফি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “কতই-না নিকৃষ্ট অবস্থা এই যে, যখন কোনো আলিমকে তলব করা হয়, তখন জবাব আসে, তিনি আমিরের দুয়ারে।”
(৮৮) ফুযায়ল ইবনু ইয়াজ বলেন, "কারীদের আপদ হলো আত্মগরিমা। তোমরা রাজা-বাদশাহর দুয়ার থেকে দূরে থাকো। কেননা, তা আল্লাহপ্রদত্ত নিয়ামত বিলুপ্ত করে দেয়। তখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, "কীভাবে?” তিনি বললেন, "কোনো ব্যক্তির ওপর যখন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নিয়ামত বর্ষিত হয়ে থাকে, তখন সৃষ্টজীবের কাছে তার আর কোনো প্রয়োজনীয়তা বাকি থাকে না। যখন সে এ সকল শাসক-প্রশাসকের দরবারে অনুপ্রবেশ করে, তখন তাদের উন্নত প্রাসাদ এবং সেবক-সেবিকাদের হালত-অবস্থা দেখে সে মোহিত হয়ে পড়ে, অনন্তর সে তার মাঝে যে কল্যাণ নিহিত রয়েছে তাকে তুচ্ছ দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে। এভাবে তার থেকে নিয়ামতসমূহ বিলুপ্ত হয়ে যায়।”
টিকাঃ
৮৭. কানযুল 'উম্মাল: ৪৬১৩১; ইতহাফুস সাদাহ : ৬/১৩৬; তাযকিরাতুল মাওযু'আত : ২০; আলফাওয়ায়িদুল মাজমু'আ: ২৮৬
৮৮. তারিখু ইবনিন নাজ্জার
(৮৪) মুকাতিল ইবনু সালিহ আল-খুরাসানি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আমি হাম্মাদ ইবনু সালামাহ্ এর কাছে গেলাম। আমি তার কাছে বসা ছিলাম, ইত্যবসরে একজন আগন্তুক দরজায় কড়া নাড়ল। তখন তিনি বললেন, "খুকি, বেরিয়ে দেখো তো, কে এখানে?" সে দেখে জানাল, "বসরা এবং কুফার আমির মুহাম্মাদ ইবনু সুলায়মান আল-হাশেমির পক্ষ থেকে প্রেরিত দূত।” তিনি বললেন, "তুমি তাকে বলো, সে যেন ভেতরে একাকী প্রবেশ করে।" অনন্তর সে প্রবেশ করে সালাম দিলো। এরপর আমিরের চিঠি অর্পণ করল। তখন তিনি তাকে বললেন, "তুমি এটা পাঠ করো।” তখন চিঠির পাতায় যা দেখা গেল, "পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। সুলায়মানের পক্ষ থেকে হাম্মাদ ইবনু সালামাহর উদ্দেশে। পর সমাচার হলো, আল্লাহ আপনাকে প্রাণবন্ত করুন, যেভাবে তিনি তার ওলি এবং আনুগত্যপরায়ণ বান্দাদের প্রাণবন্ত করেন। একটি মাসআলা দেখা দিয়েছে, তাই আমরা তার সমাধান জানার জন্য আপনার দ্বারস্থ হয়েছি।" তখন তিনি বললেন, "খুকি, তুমি দোয়াত নিয়ে আসো।" এরপর তিনি আমাকে বললেন, "চিঠিটা উল্টাও।” তারপর তিনি লিখলেন, "হামদ ও সালাতের পর, আল্লাহ আপনাকে প্রাণবন্ত করুন, যেভাবে তিনি তার ওলি এবং আনুগত্যপরায়ণ বান্দাদের প্রাণবন্ত করেন। আমরা আলিমদের এমতাবস্থায় পেয়েছি যে, তারা কারও কাছে গমনাগমন করতেন না। যদি কোনো মাসআলা দেখা দিয়ে থাকে, তা হলে আমাদের কাছে এসে আপনার সামনে যা কিছু দেখা দিয়েছে, তা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। আর হাঁ, যদি আমার কাছে আসেন, তা হলে একাকী আসবেন। আপনি আপনার অশ্বারোহী এবং পদাতিকদের নিয়ে আসবেন না। এর ব্যত্যয় হলে আমি আপনাকে নাসিহাহ করব না, আমার নিজেকেও কোনোপ্রকার নাসিহাহ করব না। ওয়াসসালাম।" একদিন আমি তার কাছে ছিলাম, এমতাবস্থায় জনৈক আগন্তুক দরজায় করাঘাত করল। তখন তিনি বললেন, "খুকি, বের হয়ে দেখো, এখানে কে?" সে বলল, "এখানে মুহাম্মাদ ইবনু সুলায়মান।” তিনি বললেন, "তুমি তাকে বলো, তিনি যেন একাকী প্রবেশ করেন।” মুহাম্মাদ ইবনু সুলায়মান তখন প্রবেশ করে সালাম দিলেন, এরপর তার সামনে উপবিষ্ট হলেন। তিনি বললেন, "আমার কী হলো যে, আমি যখন আপনার দিকে দৃষ্টিপাত করি, তখন সারা শরীর একধরনের আতঙ্কে শিহরিত হয়ে ওঠে!" তখন হাম্মাদ বললেন, “আমি সাবিত আল-বুনানি কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, আনাস ইবনু মালিক বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ কে বলতে শুনেছি, “আলিম যখন তার ইলমের দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য নিয়ে থাকে, তখন সকল কিছু তাকে ভয় করে। আর যদি এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য হয়, সম্পদ বৃদ্ধি, তখন সে সবকিছুকে ভয় করে।” এরপর তিনি বাকি ঘটনা উল্লেখ করলেন।”⁸⁷
(৮৫) মুফলিহ ইবনুল আসওয়াদ বলেন, “মামুন ইয়াহইয়া ইবনু আকসাম কে বলেন, আমি বিশর ইবনুল হারিসকে দেখতে চাই। তিনি বললেন, “তা হলে আমি তার সঙ্গে আপনার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করি—যখন আপনি ইচ্ছা করেন, হে আমিরুল মুমিনিন!” এক রাতে তারা বিশর এর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে বের হলেন। তারা তাদের বাহনে আরোহণ করে বিশর এর ঘরে পৌঁছে গেলেন। সেখানে পৌঁছে বাহন থেকে অবতরণ করে ইয়াহইয়া বিশর এর দরজায় করাঘাত করলেন। বিশর বললেন, “কে এখানে?” ইয়াহইয়া উত্তর দিলেন, “তোমার ওপর যার আনুগত্য অপরিহার্য।” তিনি বললেন, “আপনি কী চাচ্ছেন?” তিনি বললেন, “আমি তোমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাচ্ছি।” বিশর বললেন, “স্বতঃস্ফূর্তভাবে নাকি বলপ্রয়োগ করে?” বর্ণনাকারী বলেন, তখন মামুন বুঝে ফেললেন। তিনি তখন ইয়াহইয়াকে বললেন, “বাহনে চড়ো।” তারা সেখান থেকে ফিরছিলেন। পথিমধ্যে তারা ইশার সালাত আদায়রত এক ব্যক্তির দেখা পেলেন। তখন তারাও সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে বাহন থেকে নেমে মসজিদে প্রবেশ করলেন। সেই ইমামের তিলাওয়াত তাদের অত্যন্ত মুগ্ধ করল, তাদের অন্তরাত্মাকে একেবারে ছুঁয়ে গেল। সকালবেলা মামুন সেই পাঠকারীর কাছে দূত পাঠালেন। দূত গিয়ে তাকে নিয়ে এল। সেই পাঠকারী দরবারে আসার পর মামুন তার সাথে ফিকহি আলোচনা-পর্যালোচনার ধারাপাত করলেন। তখন দেখা গেল, সেই পাঠকারী একের পর এক মামুনের থেকে বিপরীত মতামত প্রদান করেই যাচ্ছে এবং বলছে, “এই মাসআলার হুকুম আপনি যা বলছেন, তা নয়; বরং বক্তব্য এর বিপরীত।” একপর্যায়ে মামুন রেগে গেল। যখন সেই পাঠকারীর বিরোধিতার পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেল, তখন মামুন বলল, “তোমার প্রতি আমার ধারণা হলো, যখন তুমি তোমার সঙ্গীদের কাছে ফিরে যাবে, তখন তুমি এ কথা বলে বেড়াবে যে, তুমি আমিরুল মুমিনিনকে ভুল প্রমাণিত করেছ।” তখন সে বলল, “আল্লাহর কসম! হে আমিরুল মুমিনিন! আমি এতে লজ্জাবোধ করি যে, আমার সঙ্গীরা জানুক—আমি আপনার কাছে এসেছি।” তখন মামুন বলল, “সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর, যিনি আমার প্রজাদের মধ্যে এমন ব্যক্তিকে রেখেছেন, যে আমার কাছে আসতে লজ্জাবোধ করে।” এরপর তিনি শুকরিয়া আদায়ের জন্য আল্লাহ তাআলাকে সিজদা করেন। সেই পাঠকারী ছিলেন ইবরাহিম ইবনু ইসহাক আলহারবি।⁸⁸
(৮৬) সুফয়ান সাওরি বলেন, “ইলম সম্মানিত একটি বস্তু ছিল। কিন্তু তারা যখন ইলমকে রাজাদের দুয়ারে বয়ে নিয়ে গেল এবং এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করল, তখন আল্লাহ তাদের অন্তর থেকে ইলমের মিষ্টতা উঠিয়ে নিলেন এবং তাদের তার ইলম থেকে বিরত করলেন।”
(৮৭) বিশর আল-হাফি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “কতই-না নিকৃষ্ট অবস্থা এই যে, যখন কোনো আলিমকে তলব করা হয়, তখন জবাব আসে, তিনি আমিরের দুয়ারে।”
(৮৮) ফুযায়ল ইবনু ইয়াজ বলেন, "কারীদের আপদ হলো আত্মগরিমা। তোমরা রাজা-বাদশাহর দুয়ার থেকে দূরে থাকো। কেননা, তা আল্লাহপ্রদত্ত নিয়ামত বিলুপ্ত করে দেয়। তখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, "কীভাবে?” তিনি বললেন, "কোনো ব্যক্তির ওপর যখন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নিয়ামত বর্ষিত হয়ে থাকে, তখন সৃষ্টজীবের কাছে তার আর কোনো প্রয়োজনীয়তা বাকি থাকে না। যখন সে এ সকল শাসক-প্রশাসকের দরবারে অনুপ্রবেশ করে, তখন তাদের উন্নত প্রাসাদ এবং সেবক-সেবিকাদের হালত-অবস্থা দেখে সে মোহিত হয়ে পড়ে, অনন্তর সে তার মাঝে যে কল্যাণ নিহিত রয়েছে তাকে তুচ্ছ দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে। এভাবে তার থেকে নিয়ামতসমূহ বিলুপ্ত হয়ে যায়।”
টিকাঃ
৮৭. কানযুল 'উম্মাল: ৪৬১৩১; ইতহাফুস সাদাহ : ৬/১৩৬; তাযকিরাতুল মাওযু'আত : ২০; আলফাওয়ায়িদুল মাজমু'আ: ২৮৬
৮৮. তারিখু ইবনিন নাজ্জার
📄 শাসকদের সঙ্গে মেলামেশার অবস্থাসমূহ
(৮৯) ইমাম গাযালি তার ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন গ্রন্থে শাসকদের বিরুদ্ধাচরণ, তাদের মজলিসে গমনাগমন এবং তাদের দরবারে উপস্থিত হওয়া প্রসঙ্গে একটি স্বতন্ত্র পরিচ্ছেদ রচনা করেছেন। তিনি তাতে লেখেন, "জেনে রেখো, শাসকদের সঙ্গে তোমাদের তিন অবস্থা: ক) শাসকদের দরবারে যাতায়াত করা। আর এটাই সবচেয়ে নিকৃষ্ট অবস্থা। খ) শাসকবর্গ তোমার দুয়ারে উপস্থিত হওয়া। এটা ভয়াবহতার দিক থেকে পূর্বেরটার থেকে কিছুটা নিম্নস্তরের। গ) তুমি তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে। তুমিও তাদের দেখবে না আর তারাও তোমাকে দেখবে না। আর এটাই সবচেয়ে নিরাপদ হালত।"
প্রথমটি, অর্থাৎ তাদের দরবারে গমন করা শরিয়াহর দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিন্দনীয়। এ ব্যাপারে অনেক কঠোর ও অনমনীয় নুসুস বর্ণিত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বর্ণিত হাদিস এবং আসার 'মুতাওয়াতির' এর স্তরে উপনীত। তাই আমরা সেগুলো উদ্ধৃত করছি, যাতে তুমি এই কর্মের নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে শরিয়াহর স্বচ্ছ অবস্থান জানতে পারো। এরপর আমরা এর প্রকারগুলো-হারাম, মুবাহ এবং মাকরুহ সম্পর্কে আলোকপাত করব, ইলমের দৃশ্যমান বিশ্লেষণও ফাতওয়া যা দাবি করে, তার আলোকে।”
এরপর ইমাম গাযালি অসংখ্য হাদিস এবং আসার উদ্ধৃত করেন, যার অনেকগুলোর বিবরণ ওপরে আলোচনাপ্রসঙ্গে অতিক্রান্ত হয়েছে। তিনি যেসব বিষয় উল্লেখ করেছেন, কিন্তু পূর্বে আমাদের আলোচনায় উল্লেখিত হয়নি, এমন যা যা রয়েছে, তা নিম্নে উদ্ধৃত হলো:
(৯০) সুফয়ান বলেন, "জাহান্নামে একটি উপত্যকা রয়েছে যাতে শুধু সে সকল কারীরা অবস্থান করবে, যারা রাজা-বাদশাহদের দরবারে অধিক যাতায়াত করে।”
(৯১) আওযায়ি বলেন, "আল্লাহর কাছে সেই আলিমের থেকে অধিক ঘৃণ্য কিছু নেই, যে কোনো গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।"
(৯২) ইসহাক বলেন, "আমি সেই আলিমকে আলিম হিসাবেই স্বীকৃতি দিই না, যার মজলিসে উপস্থিত হয়ে তাকে পাওয়া যায় না, অনন্তর তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে জবাব আসে-'তিনি তো আমিরের দরবারে।'
এককালে আমরা শুনতাম, বলা হতো যে, “যখন তোমরা কোনো আলিমকে শাসকের দরবারে গমন করতে দেখো, তখন তোমরা তাকে তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে অভিযুক্ত করো। আমি শাসকের দরবারে যখনই গমন করেছি, তখনই বের হয়ে এসে অন্তরের মুহাসাবা করেছি। শাসকদের খেয়ালখুশির প্রচণ্ড বিরোধিতা এবং তাদের সাথে রূঢ় আচরণ করার কারণে আমি যে অবস্থার সম্মুখীন হতাম-তার জন্য নফসের ওপর একধরনের পুরস্কার ছুড়ে দেওয়ার আদত গড়েছি।”
(৯৩) সাইদ ইবনুল মুসাইয়িব তেলের ব্যবসা করতেন আর বলতেন, “নিশ্চয়ই এতে রয়েছে এ সকল শাসকদের থেকে অমুখাপেক্ষী থাকার উপকরণ।”
(৯৪) ওয়াহব বলেন, “নিশ্চয়ই এ সকল আলিমরা—যারা শাসকদের দরবারে গমন করে—উম্মাহর জন্য জুয়াড়িদের থেকেও অধিক ভয়ানক।”
(৯৫) মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ বলেন, “পায়খানার ওপরের মাছি শাসকদের দুয়ারের এ সকল কারীদের থেকে শ্রেষ্ঠ।”
(৯৬) যুহরি যখন সুলতানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করলেন, তখন তার উদ্দেশে তার এক দ্বীনী ভাই লিখলেন, “আল্লাহ আমাদের এবং আপনাকে—হে আবু বকর!—সকল প্রকার ফিতনা থেকে রক্ষা করুন। আপনি এমন এক অবস্থায় এসে উপনীত হয়েছেন, যারা আপনাকে চেনে, তাদের জন্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, আপনার কল্যাণের জন্য দুয়া করা এবং রহমত প্রার্থনা করা। আপনি বয়োবৃদ্ধ হয়ে গেছেন; অপরদিকে আল্লাহ তাআলার নিয়ামতসমূহ—তিনি আপনাকে তার কিতাবের যে উপলব্ধি দান করেছেন এবং তার নবি এর সুন্নাহর যে ইলম শিক্ষা দান করেছেন—আপনার পিঠকে ভারাক্রান্ত করে রেখেছে। আল্লাহ আলিমদের থেকে এমনটা অঙ্গীকার নেননি।
জেনে রাখুন, আপনি যে পাপ করেছেন এবং যে দুঃসাহসিকতা নিজের মাঝে ধারণ করেছেন তার সবচেয়ে সরল ও সাধারণ সমীকরণ হলো—আপনি জালিমের নিঃসঙ্গতার সাথে ঘনিষ্ঠ হয়েছেন এবং ভ্রষ্টতার পথ সহজ করেছেন। আপনি এসব মানুষদের কাছে ভেড়ার মাধ্যমে অন্যায়ের দুয়ার উন্মোচিত করেছেন। তারা আপনাকে নৈকট্য প্রদান করার সময়ও কোনো হক আদায় করেনি আর কোনো অন্যায় পরিহার করেনি। তারা আপনাকে গ্রহণ করেছে জাঁতাকলের চাকার এক অক্ষ হিসাবে, তাই আপনাকে কেন্দ্র করে তাদের জুলমের চাকা আবর্তিত হবে; গ্রহণ করেছে একটি সাঁকো হিসাবে, ফলে আপনার ওপর দিয়ে পাড়ি দিয়ে তারা পৌঁছবে তাদের দুর্যোগের দিকে; গ্রহণ করেছে একটি সিঁড়িরূপে, যাতে চড়ে তারা আরোহণ করবে তাদের গোমরাহির দিকে। তারা আপনাকে প্রদর্শন করে আলিমদের মাঝে সংশয় ও দোদুল্যমানতার অনুপ্রবেশ ঘটাবেন। আর আপনাকে ব্যবহার করে অজ্ঞ শ্রেণির আন্তরিক সমর্থন ছিনিয়ে নেবে। তারা আপনার জন্য যা কিছু ব্যয় করেছে তা ওই জিনিসের তুলনায় অতি স্বল্প, যা আপনার থেকে উজাড় করে নিয়েছে। তারা আপনার থেকে যা কিছু লাভ করে নিয়েছে-তা বাস্তবে কতইনা বেশি, কারণ তারা আপনার জন্য আপনার দ্বীনকে বরবাদ করে ছেড়েছে। আপনাকে যেন এ বিষয়টি নির্ভয় না করে যে, আপনি তাদের অন্তর্ভুক্ত হবেন, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন: "তাদের পর তাদের স্থলাভিস্থিক্ত হলো এমন উত্তরসূরিরা, যারা নামাজ বরবাদ করল এবং ইন্দ্রিয়-চাহিদার অনুগামী হলো।”⁹³
আপনি এমন সত্তার সাথে লেনদেন করছেন, যিনি কোনো কিছু বিস্মৃত হন না। উদাসীনতা যাদের কখনোই ছুঁতে পারে না-এমন ফিরেশতাগণ আপনার সব কার্যকলাপ হুবহু সংরক্ষণ করছেন। সুতরাং আপনি আপনার দ্বীনের চিকিৎসা করুন। কারণ, তাতে রোগের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। আর আপনার পাথেয় প্রস্তুত করুন। কারণ, দূরবর্তী সফর ঘনিয়ে এসেছে। পৃথিবী কিংবা আকাশের কোনো কিছুই আল্লাহর কাছে গোপন থাকে না। ওয়াসসালাম।"
(৯৭) সুফয়ান সাওরি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু জাফরের মজলিসে প্রবেশ করলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, "আপনি আপনার প্রয়োজন তুলে ধরুন।" তখন আমি তাকে বললাম, "আপনি আল্লাহকে ভয় করুন। সারাটা পৃথিবীকে জুলম এবং অত্যাচারে ভরে ফেলেছেন!" সুফয়ান বলেন, আবু জাফর তখন তার মাথা ঝোঁকালেন। এরপর তিনি মাথা উঠিয়ে বললেন, "আপনার প্রয়োজন তুলে ধরুন।" তখন আমি বললাম, নিশ্চয়ই এই জায়গা মুসলিমদের কবজায় এসেছে মুহাজির এবং আনসার সাহাবিদের তরবারির মাধ্যমে আর তাদের সন্তানেরা আজ ক্ষুধার তাড়নায় মৃত্যু-পথযাত্রী। আপনি আল্লাহকে ভয় করুন এবং তাদের সমীপে তাদের হক পৌঁছে দিন। সুফয়ান বলেন, এরপর তিনি মাথা ঝোঁকালেন। এরপর মাথা তুলে বললেন, “আমাদের সামনে আপনার প্রয়োজন তুলে ধরুন।” তখন আমি বললাম, “উমর ইবনুল খাত্তাব হজ করেছেন। হজ আদায়কালে তিনি তার হিসাবরক্ষককে জিজ্ঞাসা করলেন, “কত খরচ করেছ?” সে বলল, “তেরো দিরহামের চেয়ে একটু বেশি।” অথচ আমি আপনাদের এখানে এত সব জিনিস দেখছি, উটও যা বহন করার সাধ্য রাখে না। এ কথাগুলো বলে সুফয়ান বেরিয়ে গেলেন।
টিকাঃ
৮৯. দ্বিতীয় খণ্ড, ১৪০-১৪৫ পৃষ্ঠা। আলোচনাপ্রসঙ্গে উল্লিখিত বর্ণনাসমূহও ইহইয়া থেকে গৃহীত।
৯০. সুনানুল বায়হাকি
৯১. হিলয়াতুল আওলিয়া
৯২. হিলয়াতুল আওলিয়া
৯৩. সুরা মারয়াম (১৯): ৫৯
৯৪. আসসামত, ইবনু আবিদ-দুনয়া: ২১৮-২১৯; আলকামিল, ইবনু 'আদি: ৫/১৯১৭; আসসিলসিলাতুয যায়িফা: ১৩৯৯
৯৫. তাবাকাতুশ শাফি'ইয়্যাহ আলকুবরা, সুবকি: ৬/৩১৪
(৮৯) ইমাম গাযালি তার ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন গ্রন্থে শাসকদের বিরুদ্ধাচরণ, তাদের মজলিসে গমনাগমন এবং তাদের দরবারে উপস্থিত হওয়া প্রসঙ্গে একটি স্বতন্ত্র পরিচ্ছেদ রচনা করেছেন। তিনি তাতে লেখেন, "জেনে রেখো, শাসকদের সঙ্গে তোমাদের তিন অবস্থা: ক) শাসকদের দরবারে যাতায়াত করা। আর এটাই সবচেয়ে নিকৃষ্ট অবস্থা। খ) শাসকবর্গ তোমার দুয়ারে উপস্থিত হওয়া। এটা ভয়াবহতার দিক থেকে পূর্বেরটার থেকে কিছুটা নিম্নস্তরের। গ) তুমি তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে। তুমিও তাদের দেখবে না আর তারাও তোমাকে দেখবে না। আর এটাই সবচেয়ে নিরাপদ হালত।"
প্রথমটি, অর্থাৎ তাদের দরবারে গমন করা শরিয়াহর দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিন্দনীয়। এ ব্যাপারে অনেক কঠোর ও অনমনীয় নুসুস বর্ণিত রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বর্ণিত হাদিস এবং আসার 'মুতাওয়াতির' এর স্তরে উপনীত। তাই আমরা সেগুলো উদ্ধৃত করছি, যাতে তুমি এই কর্মের নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে শরিয়াহর স্বচ্ছ অবস্থান জানতে পারো। এরপর আমরা এর প্রকারগুলো-হারাম, মুবাহ এবং মাকরুহ সম্পর্কে আলোকপাত করব, ইলমের দৃশ্যমান বিশ্লেষণও ফাতওয়া যা দাবি করে, তার আলোকে।”
এরপর ইমাম গাযালি অসংখ্য হাদিস এবং আসার উদ্ধৃত করেন, যার অনেকগুলোর বিবরণ ওপরে আলোচনাপ্রসঙ্গে অতিক্রান্ত হয়েছে। তিনি যেসব বিষয় উল্লেখ করেছেন, কিন্তু পূর্বে আমাদের আলোচনায় উল্লেখিত হয়নি, এমন যা যা রয়েছে, তা নিম্নে উদ্ধৃত হলো:
(৯০) সুফয়ান বলেন, "জাহান্নামে একটি উপত্যকা রয়েছে যাতে শুধু সে সকল কারীরা অবস্থান করবে, যারা রাজা-বাদশাহদের দরবারে অধিক যাতায়াত করে।”
(৯১) আওযায়ি বলেন, "আল্লাহর কাছে সেই আলিমের থেকে অধিক ঘৃণ্য কিছু নেই, যে কোনো গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।"
(৯২) ইসহাক বলেন, "আমি সেই আলিমকে আলিম হিসাবেই স্বীকৃতি দিই না, যার মজলিসে উপস্থিত হয়ে তাকে পাওয়া যায় না, অনন্তর তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে জবাব আসে-'তিনি তো আমিরের দরবারে।'
এককালে আমরা শুনতাম, বলা হতো যে, “যখন তোমরা কোনো আলিমকে শাসকের দরবারে গমন করতে দেখো, তখন তোমরা তাকে তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে অভিযুক্ত করো। আমি শাসকের দরবারে যখনই গমন করেছি, তখনই বের হয়ে এসে অন্তরের মুহাসাবা করেছি। শাসকদের খেয়ালখুশির প্রচণ্ড বিরোধিতা এবং তাদের সাথে রূঢ় আচরণ করার কারণে আমি যে অবস্থার সম্মুখীন হতাম-তার জন্য নফসের ওপর একধরনের পুরস্কার ছুড়ে দেওয়ার আদত গড়েছি।”
(৯৩) সাইদ ইবনুল মুসাইয়িব তেলের ব্যবসা করতেন আর বলতেন, “নিশ্চয়ই এতে রয়েছে এ সকল শাসকদের থেকে অমুখাপেক্ষী থাকার উপকরণ।”
(৯৪) ওয়াহব বলেন, “নিশ্চয়ই এ সকল আলিমরা—যারা শাসকদের দরবারে গমন করে—উম্মাহর জন্য জুয়াড়িদের থেকেও অধিক ভয়ানক।”
(৯৫) মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ বলেন, “পায়খানার ওপরের মাছি শাসকদের দুয়ারের এ সকল কারীদের থেকে শ্রেষ্ঠ।”
(৯৬) যুহরি যখন সুলতানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করলেন, তখন তার উদ্দেশে তার এক দ্বীনী ভাই লিখলেন, “আল্লাহ আমাদের এবং আপনাকে—হে আবু বকর!—সকল প্রকার ফিতনা থেকে রক্ষা করুন। আপনি এমন এক অবস্থায় এসে উপনীত হয়েছেন, যারা আপনাকে চেনে, তাদের জন্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, আপনার কল্যাণের জন্য দুয়া করা এবং রহমত প্রার্থনা করা। আপনি বয়োবৃদ্ধ হয়ে গেছেন; অপরদিকে আল্লাহ তাআলার নিয়ামতসমূহ—তিনি আপনাকে তার কিতাবের যে উপলব্ধি দান করেছেন এবং তার নবি এর সুন্নাহর যে ইলম শিক্ষা দান করেছেন—আপনার পিঠকে ভারাক্রান্ত করে রেখেছে। আল্লাহ আলিমদের থেকে এমনটা অঙ্গীকার নেননি।
জেনে রাখুন, আপনি যে পাপ করেছেন এবং যে দুঃসাহসিকতা নিজের মাঝে ধারণ করেছেন তার সবচেয়ে সরল ও সাধারণ সমীকরণ হলো—আপনি জালিমের নিঃসঙ্গতার সাথে ঘনিষ্ঠ হয়েছেন এবং ভ্রষ্টতার পথ সহজ করেছেন। আপনি এসব মানুষদের কাছে ভেড়ার মাধ্যমে অন্যায়ের দুয়ার উন্মোচিত করেছেন। তারা আপনাকে নৈকট্য প্রদান করার সময়ও কোনো হক আদায় করেনি আর কোনো অন্যায় পরিহার করেনি। তারা আপনাকে গ্রহণ করেছে জাঁতাকলের চাকার এক অক্ষ হিসাবে, তাই আপনাকে কেন্দ্র করে তাদের জুলমের চাকা আবর্তিত হবে; গ্রহণ করেছে একটি সাঁকো হিসাবে, ফলে আপনার ওপর দিয়ে পাড়ি দিয়ে তারা পৌঁছবে তাদের দুর্যোগের দিকে; গ্রহণ করেছে একটি সিঁড়িরূপে, যাতে চড়ে তারা আরোহণ করবে তাদের গোমরাহির দিকে। তারা আপনাকে প্রদর্শন করে আলিমদের মাঝে সংশয় ও দোদুল্যমানতার অনুপ্রবেশ ঘটাবেন। আর আপনাকে ব্যবহার করে অজ্ঞ শ্রেণির আন্তরিক সমর্থন ছিনিয়ে নেবে। তারা আপনার জন্য যা কিছু ব্যয় করেছে তা ওই জিনিসের তুলনায় অতি স্বল্প, যা আপনার থেকে উজাড় করে নিয়েছে। তারা আপনার থেকে যা কিছু লাভ করে নিয়েছে-তা বাস্তবে কতইনা বেশি, কারণ তারা আপনার জন্য আপনার দ্বীনকে বরবাদ করে ছেড়েছে। আপনাকে যেন এ বিষয়টি নির্ভয় না করে যে, আপনি তাদের অন্তর্ভুক্ত হবেন, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন: "তাদের পর তাদের স্থলাভিস্থিক্ত হলো এমন উত্তরসূরিরা, যারা নামাজ বরবাদ করল এবং ইন্দ্রিয়-চাহিদার অনুগামী হলো।”⁹³
আপনি এমন সত্তার সাথে লেনদেন করছেন, যিনি কোনো কিছু বিস্মৃত হন না। উদাসীনতা যাদের কখনোই ছুঁতে পারে না-এমন ফিরেশতাগণ আপনার সব কার্যকলাপ হুবহু সংরক্ষণ করছেন। সুতরাং আপনি আপনার দ্বীনের চিকিৎসা করুন। কারণ, তাতে রোগের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। আর আপনার পাথেয় প্রস্তুত করুন। কারণ, দূরবর্তী সফর ঘনিয়ে এসেছে। পৃথিবী কিংবা আকাশের কোনো কিছুই আল্লাহর কাছে গোপন থাকে না। ওয়াসসালাম।"
(৯৭) সুফয়ান সাওরি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু জাফরের মজলিসে প্রবেশ করলাম। তখন তিনি আমাকে বললেন, "আপনি আপনার প্রয়োজন তুলে ধরুন।" তখন আমি তাকে বললাম, "আপনি আল্লাহকে ভয় করুন। সারাটা পৃথিবীকে জুলম এবং অত্যাচারে ভরে ফেলেছেন!" সুফয়ান বলেন, আবু জাফর তখন তার মাথা ঝোঁকালেন। এরপর তিনি মাথা উঠিয়ে বললেন, "আপনার প্রয়োজন তুলে ধরুন।" তখন আমি বললাম, নিশ্চয়ই এই জায়গা মুসলিমদের কবজায় এসেছে মুহাজির এবং আনসার সাহাবিদের তরবারির মাধ্যমে আর তাদের সন্তানেরা আজ ক্ষুধার তাড়নায় মৃত্যু-পথযাত্রী। আপনি আল্লাহকে ভয় করুন এবং তাদের সমীপে তাদের হক পৌঁছে দিন। সুফয়ান বলেন, এরপর তিনি মাথা ঝোঁকালেন। এরপর মাথা তুলে বললেন, “আমাদের সামনে আপনার প্রয়োজন তুলে ধরুন।” তখন আমি বললাম, “উমর ইবনুল খাত্তাব হজ করেছেন। হজ আদায়কালে তিনি তার হিসাবরক্ষককে জিজ্ঞাসা করলেন, “কত খরচ করেছ?” সে বলল, “তেরো দিরহামের চেয়ে একটু বেশি।” অথচ আমি আপনাদের এখানে এত সব জিনিস দেখছি, উটও যা বহন করার সাধ্য রাখে না। এ কথাগুলো বলে সুফয়ান বেরিয়ে গেলেন।
টিকাঃ
৮৯. দ্বিতীয় খণ্ড, ১৪০-১৪৫ পৃষ্ঠা। আলোচনাপ্রসঙ্গে উল্লিখিত বর্ণনাসমূহও ইহইয়া থেকে গৃহীত।
৯০. সুনানুল বায়হাকি
৯১. হিলয়াতুল আওলিয়া
৯২. হিলয়াতুল আওলিয়া
৯৩. সুরা মারয়াম (১৯): ৫৯
৯৪. আসসামত, ইবনু আবিদ-দুনয়া: ২১৮-২১৯; আলকামিল, ইবনু 'আদি: ৫/১৯১৭; আসসিলসিলাতুয যায়িফা: ১৩৯৯
৯৫. তাবাকাতুশ শাফি'ইয়্যাহ আলকুবরা, সুবকি: ৬/৩১৪