📄 তোমরা ফিতনার ক্ষেত্র থেকে দূরত্ব বজায় রাখো
(৩৭) হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান বলেন,
“শুনে রাখো, তোমাদের কেউ যেন শাসকের উদ্দেশে এক বিঘত পরিমাণ পদক্ষেপও না ফেলে।”⁴³
(৩৮) হুযাইফা থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন,
“তোমরা ফিতনার জায়গাগুলো থেকে দূরে থাকো। জিজ্ঞাসা করা হলো, ফিতনার জায়গাগুলো কী? তিনি বললেন, শাসক এবং নেতাদের দুয়ার—তোমাদের কোনো ব্যক্তি আমিরের দরবারে গমন করে, তার মিথ্যাকে সত্য বলে স্বীকৃতি দেয় এবং তার ব্যাপারে এমনসব কথা বলে, যা তার ভেতর নেই।”⁴⁴
(৩৯) আবু উমামা আল-বাহেলি থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেন,
“আল্লাহর কাছে সৃষ্টজীবের মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণিত হলো এমন ব্যক্তি, যে আমিরদের সঙ্গে ওঠাবসা করে। আমিররা যেসব অত্যাচার ও অন্যায়মূলক কথা বলে, সে তাদের সে সকল বিষয়কে সত্যায়ন করে।”⁴⁵
টিকাঃ
৪৩. আলমুসান্নাফ, ইবনু আবি শায়বা: ১৯৫৭৯; হিলয়াতুল আওলিয়া, আবু নুয়াইম: ১/২৭৭
৪৪. হিলয়াতুল আওলিয়া, আবু নুয়াইম: ১/২৭৭; জামি'উ বায়ানিল ইলম, ইবনু আব্দিল বার: ১/২৬০; তাম্বিহুল গাফিলিন: ৪১৩; তাখরিজু আহাদিসিল 'আদিলিন, সাখাবি: ৯৭
৪৫. মুসনাদুল ফিরদাউস: ১৪৫৬; কানযুল 'উম্মাল: ৪৩৭৬১; ইতহাফুস সাদাহ: ৬/১২৭।
📄 আতা (রহ.)-এর উদ্দেশে ওয়াহব ইবনু মুনাব্বিহ (রহ.)-এর নাসিহাহ
(৪০) ওয়াহব ইবনু মুনাব্বিহ বলেন,
“হে আতা, তুমি শাসকের দুয়ার থেকে দূরে থাকো। কেননা, শাসকের দুয়ারে উটের বসার জায়গার মতো অনেক ফিতনা থাকে। তুমি তাদের দুনিয়ার কিছু অংশ লাভ করলে পরিণামে শাসকরা তোমার দ্বীনের সমপরিমাণ অংশ লাভ করে বসবে।"⁴⁶
(৪১) সালামাহ ইবনু কায়স থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু যর এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। তখন তিনি বললেন,
"হে সালামাহ ইবনু কায়স, তিনটি বিষয় স্মরণ রেখো-তুমি সতিনদের মাঝে সম্মিলন কোরো না; কারণ আগ্রহ থাকলেও তুমি ইনসাফ করতে পারবে না। তুমি সাদাকাহ উশুলের কাজ কোরো না; কেননা সাদাকাহ উশুলকারীর বেশ-কম হয়ে থাকে। কোনো শাসকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হোয়ো না; কেননা তুমি তার দুনিয়ার কিছু অংশ লাভ করবে আর সে তার বিনিময়ে তোমার সমপরিমাণ দ্বীনকে-যা তার থেকে অনেক উত্তম-আক্রান্ত করবে।"⁴⁷
(৪২) আইয়ুব আসসাখতিয়ানি থেকে বর্ণিত, আবু কিলাবাহ বলেন,
"তুমি আমার থেকে তিনটি অভ্যাসের কথা মুখস্থ করে রাখো। শাসকের দুয়ার থেকে দূরে থাকো, প্রবৃত্তিপূজারিদের থেকে দূরত্ব অবলম্বন করো, আর সাধারণ মানুষদের সঙ্গ আঁকড়ে থাকো; কারণ অমুখাপেক্ষিতা আসে নিরুপদ্রব থেকে।"⁴⁸
টিকাঃ
৪৬. হিলয়াতুল আওলিয়া: ৪/৯৩
৪৭. আলমুসান্নাফ, ইবনু আবি শায়বা: ১৯৫৭৮
৪৮. জামি'উ বায়ানিল ইলম, ইবনু 'আব্দিল বার: ২৫৭; হিলয়াতুল আওলিয়া, আবু নুয়াইম: ২/২৮৬-২৮৭; সুনানুদ দারিমি: ১/১০৮
📄 তুমি কোনো বিদআতির সঙ্গে ওঠাবসা কোরো না
(৪৩) ইউনুস ইবনু উবায়দ বলেন,
"তুমি কোনো বিদআতির সঙ্গে এবং কোনো ক্ষমতাধর ব্যক্তির সঙ্গে ওঠাবসা কোরো না। আর কোনো নারীর সঙ্গে নিভৃতে একান্ত হোয়ো না।"⁴⁹
(৪৪) ফাযল ইবনু আব্বাস বলেন,
"আমরা শাসককে পরিহার করে চলার শিক্ষা নিতাম ঠিক সেভাবে, যেভাবে কুরআনের শিক্ষা নিয়ে থাকি।"⁵⁰
(৪৫) ইউসুফ ইবনু আসবাত থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সুফয়ান সাওরি আমাকে বললেন,
"তুমি যখন কোনো আলিমকে শাসকের সাথে লেগে থাকতে দেখবে, তখন তুমি জেনে রেখো যে, সে একটা চোর। আর যখন তুমি কোনো আলিমকে বিত্তশালী লোকদের দুয়ারে দুয়ারে ফিরতে দেখবে, তখন তুমি জেনে রেখো যে, সে একজন লৌকিকতা প্রদর্শনকারী। প্রবঞ্চিত হওয়া থেকে বেঁচে থাকো। তোমাকে বলা হবে যে, তুমি জুলম প্রতিহত করছ অথবা কোনো অত্যাচারীর অত্যাচার দূর করছ। নিশ্চয়ই এটা ইবলিসের ধোঁকা, যা সে আলিমদের জন্য ধাপ হিসাবে ব্যবহার করে থাকে।”⁵¹
(৪৬) আবু শিহাব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি সুফয়ান সাওরি কে এক ব্যক্তির উদ্দেশে বলতে শুনেছি,
"তারা যদি তোমাকে 'কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ' পড়ার জন্য আহ্বান করে, তাহলে তুমি তাদের কাছে গমন কোরো না।" আবু শিহাব কে বলা হলো, "আপনি কাকে বোঝাচ্ছেন?” তিনি বললেন, "শাসক।"⁵²
(৪৭) ইমাম মালিক ইবনু আনাস বলেন,
"আমি প্রায় গোটা বিশেক তাবেয়িকে এমন পেয়েছি, যারা বলেন, 'তোমরা তাদের কাছে গমন কোরো না এবং তাদের কোনো নির্দেশ কোরো না।" তিনি এখানে শাসকের কথা বোঝাচ্ছেন।⁵³
টিকাঃ
৪৯. হিলয়াতুল আওলিয়া, আবু নুয়াইম: ৩/২১; আসসিয়ার, যাহাবি: ৬/২৯৩; সিফাতুস সাফওয়াহ, ইবনুল জাওযি: ৩/৩০৭
৫০. শু'আবুল ইমান, বায়হাকি: ৮৭৯৭
৫১. হিলয়াতুল আওলিয়া: ৬/৩৮৭
৫২. হিলয়াতুল আওলিয়া: ৬/৩৭৬
৫৩. সুনানুল বায়হাকি
📄 তুমি খেয়ালখুশি এবং বিবাদ-বিসংবাদ থেকে দূরে থাকো
(৪৮) আহমাদ ইবনু উবায়দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একজন লোককে সুফয়ান সাওরি কে সম্বোধন করে বলতে শুনলাম যে, আমাকে নসিহত করুন। তখন তিনি বললেন, “তুমি প্রবৃত্তি থেকে সাবধান থাকো। তুমি শাসকের থেকে দূরে থাকো।”⁵⁴
(৪৯) বাকর ইবনু মুহাম্মাদ আল-'আবিদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি সুফয়ান সাওরি কে বলতে শুনেছি,
“নিশ্চয়ই জাহান্নামে একটি উপত্যকা রয়েছে, জাহান্নাম যার থেকে প্রতিদিন সত্তর বার আশ্রয় প্রার্থনা করে। আল্লাহ তাআলা সেই জাহান্নামকে শাসকদের সাথে সাক্ষাৎকারী আলিমদের জন্য প্রস্তুত করেছেন।”⁵⁵
(৫০) হিশাম ইবনু 'আব্বাদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জাফর ইবনু মুহাম্মাদ কে বলতে শুনেছি,
“ফকিহরা রাসুলগণের কর্মসম্পাদক। যখন তুমি ফকিহদের শাসকদের প্রতি ঝুঁকে যেতে দেখবে, তখন তাদের অভিযুক্ত করবে।”⁵⁶
(৫১) জাবির ইবনু হাইয়ান থেকে বর্ণিত, তাকে বলা হলো, “কী হয়েছে আপনার? আপনি শাসকের দরবারে যান না কেন?” তিনি বললেন,
“আমি যে জিনিসের জন্য তাদের ত্যাগ করেছি, তা-ই আমার জন্য যথেষ্ট।”⁵⁷
(৫২) কা'নাবি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, ঈসা ইবনু মুসা (তিনি তখন কুফার আমির) ইবনু শুবরামা কে লক্ষ্য করে বললেন,
“কী হয়েছে তোমার? আমাদের কাছে আসো না কেন?” তিনি বললেন, “আল্লাহ আপনার ইসলাহ করুন। যদি আমি আপনার কাছে আসি, অনন্তর আপনি আমাকে আপনার নিকটবর্তী করেন, তা হলে আপনি আমাকে ফিতনায় ফেলে দিলেন। আর যদি আমাকে দূরে সরিয়ে দেন, তা হলে আমাকে কষ্টে ফেললেন। আমার কাছে এমন কিছু নেই, যার ব্যাপারে আমি শঙ্কাবোধ করি। আর আপনার কাছে এমন কিছু নেই, আমি যার প্রত্যাশা করতে পারি।” তখন তিনি এর প্রত্যুত্তরে আর কিছু বললেন না।⁵⁸
(৫৩) আব্দুল্লাহ ইবনুস্ সুদ্দি থেকে বর্ণিত, আবু বকর ইবনু আইয়াশ আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারাক এর উদ্দেশে পত্র লিখলেন,
"ফাযল ইবনু মুসা আশশাইবানি যদি শাসকদের দরবারে যাতায়াত না করে থাকে, তা হলে আমার পক্ষ থেকে তাকে সালাম বলো।”⁵৯
(৫৪) অনুচ্ছেদ: সালাফ এবং খালাফ আস্সালিহিনের জুমহুর (অধিকাংশ) আলিমগণের অভিমত হলো, এ সকল হাদিস এবং আসার তার ব্যাপকতার ওপর প্রযোজ্য। শাসকগোষ্ঠী আলিমদের নিমন্ত্রণ জানাক কিংবা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আলিমরা আগমন করুক-সবই সমান। তেমনই শাসকগোষ্ঠী দ্বীনি প্রয়োজনে আহ্বান জানাক কিংবা পার্থিব কোনো স্বার্থে-সবগুলোর একই বিধান।
(৫৫) সুফয়ান সাওরি বলেন, "তারা যদি তোমাকে 'কুল হুওয়াল্লাহ' এর কেরাত পাঠ করার জন্য আহ্বান জানায়, তা হলে তুমি তাদের কাছে গমন কোরো না।”⁶¹
টিকাঃ
৫৪. হিলয়াতুল আওলিয়া: ৭/২৮
৫৫. জামি'উ বায়ানিল ইলম, ইবনু আব্দিল বার: ২৫৭
৫৬. হিলয়াতুল আওলিয়া: ৩/১৯৪
৫৭. আততারিখ, ইবনু নাজ্জার
৫৮. তাম্বিহুল গাফিলিন: ৪১৬
৫৯. তারিখে কাযওয়িন, রাফিয়ি
৬০. হাফিজ ইবনু আব্দিল বার বলেন, "এ অধ্যায়ের পুরো আলোচনা পাপিষ্ঠ অত্যাচারী (মুসলিম) শাসকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ইনসাফকারী ন্যায়নিষ্ঠ আদর্শ শাসকের মজলিসে গমন করা, তার দর্শন লাভ করা, তাকে সততার পথে সার্বিকভাবে সহযোগিতা প্রদান করা শ্রেষ্ঠতম পুণ্যকর্মের অন্তর্ভুক্ত। তুমি কি দেখো না যে, উমর ইবনু আব্দিল আযিয এর সঙ্গ দিতেন মহান শ্রেষ্ঠ আলিমগণ-উরওয়াহ ইবনুয যুবায়র এবং তার সমস্তরের আলিমগণ, ইবনু শিহাব এবং তার সমপর্যায়ের ফকিহগণ। আলিম যখন শাসকের মজলিসে উপস্থিত হয়ে উত্তম কথা বলে, জ্ঞানের কথা বলে, তখন তা কল্যাণকর ও উপকারী হিসাবে প্রতিভাত হয়। যেদিন সে আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে, সেদিন আশা করা যায়, এই আমলের কারণে তিনি তার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন। কিন্তু শাসকদের মজলিসগুলো এমন, যাতে ফিতনার দিকটিই প্রবল। ফিতনা থেকে নিজেকে বাঁচানোর পন্থা হলো, এ সকল মজলিস বর্জন করা।" (দ্রষ্টব্য-জামি 'উ বায়ানিল ইলম: ২৬২-২৬৩)
৬১. সুনানুল বায়হাকি