📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 শেষকথা

📄 শেষকথা


আল্লাহর হামদ ও শুকরিয়া আদায় করছি, যাঁর নি'আমতেই সকল সৎকাজ সুসম্পন্ন হয়। যিনি তাঁর আরশের উপর উঠার বিষয়টি আমাদের সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, 'আরশের উপরে থেকেও তিনি বান্দার নিকটে, তাদের ডাকে সাড়া দেন, তাদের অবস্থা জানেন, তাদের পর্যবেক্ষণ করেন, তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করেন। সালাত ও সালাম পেশ করছি, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর, যিনি আমাদেরকে আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে যা আমাদের ঈমান আনতে হবে তা জানিয়েছেন, বুঝিয়েছেন, উদাহরণ দিয়ে স্পষ্ট করেছেন। এ ব্যাপারে কোনো প্রকার ধোঁয়াশা বা অস্বচ্চতা রাখেননি। রিসালাতের কর্তব্য পালন করেছেন, প্রচার করেছেন, আমানত উম্মতের কাছে অর্পণ করেছেন। উম্মতকে রেখে গেছেন এমন এক পথে যা শুভ্র সাদা দিনের মত, যাতে রাত ও দিন সমান। আল্লাহ তা'আলার কাছে দো'আ করি, তিনি যেন এমন প্রিয়নবীকে এমন প্রতিদান প্রদান করুন, যা একজন নবীর জন্য তাঁর উম্মতের পক্ষ থেকে উপযুক্ত।
পরবর্তী কথা হলো, “রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন” এ কথার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা তাঁর পরিচয় দিয়েছেন। এ পরিচয় তুলে ধরার জন্য কয়েকটি মাসের প্রচেষ্টায় এ পৃষ্ঠাগুলো লেখার তাওফীক আল্লাহ তা'আলা দিয়েছেন। এর মাধ্যমে যা আমাদের কাছে স্পষ্ট হলো তা হচ্ছে,
১- আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজের সত্তা, নাম, গুণ ও কর্ম সম্পর্কে যথার্থ পরিচয় তাঁর কিতাবে তুলে ধরেছেন। কুরআনের প্রতিটি আয়াতই তাঁর পরিচয়ের কোনো না কোনো দিক বর্ণনা করছে। সবচেয়ে দূর্ভাগা ঐ ব্যক্তি যে এসব আয়াত থেকে হিদায়াত গ্রহণ করতে পারেনি বা এগুলোকে হিদায়াতের আকর হিসেবে গ্রহণ করতে পারেনি।
২- আল্লাহ তা'আলার প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে আমাদেরকে ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়ে আল্লাহ তা'আলার সত্তা, নাম, গুণ ও কর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন যা অসংখ্য হাদীস দ্বারা আমাদের কাছে আমাদের নবী তুলে ধরেছেন।
৩- আল্লাহর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কিত জ্ঞান সবচেয়ে স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন। সেখানে কোনো অস্পষ্টতা রাখেননি।
৪- আল্লাহ তা'আলার প্রিয় নবীর সাহাবীগণ আল্লাহ তা'আলার সত্তা, নাম, গুণ ও কর্ম সম্পর্কে উম্মতের সকলের চেয়ে সবচেয়ে ভালো বুঝতেন। এমনকি একজন বেদুঈনও তা বুঝতেন ও তা থেকে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করতেন।
৫- সাহাবায়ে কেরাম কখনও কুরআন ও হাদীসের ভাষ্য না বুঝে পার হওয়া কিংবা আল্লাহ তা'আলার সত্তা, নাম, গুণ ও কর্ম সম্পর্কিত আয়াত ও হাদীসের ক্ষেত্রে কোনো রকমে না বুঝে অন্ধভাবে পালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা পোষণ করতেন না, যা তাদের ব্যাপারে কোনো কোনো দুর্ভাগাদের মন্তব্য থেকে প্রকাশ পায়।
৬- সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে বেশি জানতেন বলেই তারা উম্মতের সবচেয়ে
উত্তম প্রজন্ম বিবেচিত হয়েছেন। আল্লাহ তা'আলাকে বেশি ভয় করতেন। আল্লাহ সম্পর্কে তাঁদের ইলমের সাথে পরবর্তীদের ইলমের কেনো তুলনা চলে না। যখনই ফিতনা বের হয়েছে তখনই তারা আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কিত তাদের বিদ্যা জনসমক্ষে প্রচার করেছেন। তাদের বক্তব্যের মাধ্যমেই আমরা আল্লাহ তা'আলার নাম, গুণ, ও কর্ম সম্পর্কে সঠিক পরিচয় লাভ করতে পারি।
৭- সাহাবায়ে কেরামের ভাষ্য থেকেই আল্লাহ তা'আলাকে আমরা 'আরশের উপর উঠা ও সেখানে থাকার বিষয়টি আরও যথাযথভাবে জানতে পেরেছি।
৮- সাহাবায়ে কেরামের অবর্তমানে তাদের সুযোগ্য উত্তরসূরীরা আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কিত সে জ্ঞানের ওয়ারিস হিসেবে উম্মতের সামনে তা প্রচার প্রসার করেছেন। তাদের মধ্যে গ্রহণযোগ্য কারও থেকে আল্লাহ তা'আলার নাম, গুণ, কর্ম অস্বীকার করা কিংবা তা'ওয়ীল নামক অপব্যাখ্যা সাব্যস্ত হয়নি।
৯- তাবেয়ীগণের পরে তাদের পরবর্তী উত্তরসূরী ইমামগণ আল্লাহ তা'আলার পরিচিতি তুলে ধরার এ মহান ঝাণ্ডা উড্ডীন করার দায়িত্ব স্বতৎস্ফূর্তভাবে পালন করেছেন। তাই আমরা দেখতে পাই, চার প্রখ্যাত ইমামসহ হিদায়াতের সকল ইমামের কেউই আল্লাহ তা'আলার উপরে থাকা, তাঁর 'আরশের উপরে উঠা ও এ জাতীয় কোনো গুণ সাব্যস্ত করার ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেননি।
১০- হিদায়াতের ইমামগণ তাদের সময়কার পথভ্রষ্টদের সামনে পর্বতসম দাঁড়িয়েছেন, আল্লাহ তা'আলার নাম, গুণ ও কর্ম অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে তারা বক্তব্য, লেখনি ইত্যাদির মাধ্যমে হক্ক কথা তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে জাহমিয়্যা ও মু'তাযিলাদের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান সাধারণ ও বিশেষ সকলের কাছেই জানা রয়েছে।
১১- হিদায়াতের বিখ্যাত ইমাম আবু হানীফা, মালেক, শাফেয়ী, আহমদ ইবন হাম্বল, সুফইয়ন ইবন 'উয়াইনাহ, সুফইয়ান আস-সাওরী, আওযা'ঈ, লাইস ইবন সা'দ তারা সবাই আল্লাহ তা'আলাকে 'আরশের উপর বলেই বিশ্বাস করতেন।
১২-উক্ত ইমামগণ পরবর্তী যথাযোগ্য উত্তরসূরী হাদীস বিশারদগণ সে ঝাণ্ডা তুলে নিয়েছিলেন। তারা আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে সঠিক আকীদাহ ও মানহাজের ধারক হিসেবে মুসলিম মিল্লাতকে জাহমিয়্যাহ, মু'তাযিলা, শিয়া, খারেজী ইত্যাদিদের ভুল ও বিভ্রান্তিমূলক মতবাদ থেকে সাবধান করে শত শত গ্রন্থ রচনা করেছেন। সেসব গ্রন্থে সুস্পষ্টভাবে আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠার বিষয়টি দলীল প্রমাণসহ সন্নিবেশিত হয়েছে।
১৩-হিজরী চতুর্থ শতকে এসে আশা'য়েরা ও মাতুরিদী ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। তখন থেকেই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের ইমামগণ আল্লাহ তা'আলার সত্তা, নাম, গুণ ও কর্ম সম্পর্কিত বিশুদ্ধ আকীদাহ'র গ্রন্থ রচনা করেন, তাতে বিরুদ্ধবাদীদের আকীদাহ'র সমস্যাগুলো তারা তুলে ধরেন।
১৪- এসময় পথভ্রষ্টতা চরম আকার ধারণ করে, তার কারণ হিসেবে, অনারব দর্শনের প্রতি আসক্তি, অনারবদের দ্বারা কুরআন ও হাদীসের ভাষ্য বুঝার ক্ষেত্রে বিবেকের যুক্তিকে প্রাধান্য প্রদান নীতি, কিছু হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে অসম্মতি ইত্যাদি অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত
কারণকে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে।
১৫-যুগ যুগ ধরে সত্যনিষ্ঠ আলেমগণ আকীদাহ'র বিষয়ে সঠিক ধারা সম্পর্কে বিস্তারিত লিখে গেছেন। তাদের সেসব কথা ও বচনই ছিল আমাদের এ গ্রন্থের উপজীব্য। যেকোনো সত্যান্বেষী মানুষ এসব আলেমের বক্তব্য পড়ার পর আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপরে থাকার বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ সংশয়মুক্ত হবেন এটাই আমরা আশা করি।
পরিশেষে আল্লাহর কাছে দো'আ করি, তিনি যেন এ গ্রন্থটিকে কবুল করেন, এটাকে হিদায়াতের অসীলা বানান, এটাকে আমার জন্য, পাঠকের জন্য আখেরাতে মুক্তির মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে নেন। আমীন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00