📄 তা‘ওয়েল ও তাফওয়াযীদ নীতির খণ্ডন
আমরা আগেই জেনেছি যে, আশআরী ও মাতুরিদী আলেমগণ আল্লাহ তা'আলাকে তাঁর গুণশূন্য করতে দু'ধরনের ভুল ব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়ে থাকে।
এক. তা'ওয়ীল বা ব্যাখ্যা নামের অপব্যাখ্যা:
এটা জানা কথা যে, অপব্যাখ্যা যদি কোনো জাতিতে প্রবেশ করে এবং সেটা গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় তাহলে সে জাতির দীনে এমন কিছু প্রবেশ করে যার কারণে আর সে জাতিকে সহজে দীনের মূল ভাষ্যের দিকে ফিরিয়ে আনা যায় না। আমরা যদি এর নমুনা দেখতে চাই তাহলে নাসারাদের দিকে তাকালেই বুঝবো, তারা তাদের দীনের বিধানগুলো অপব্যাখ্যা করতে করতে ত্রিত্ববাদে গিয়ে শেষ হয়েছে, 'ঈসাকে রব বানিয়েছে, তাদের পোপ-পুরোহিতকে ক্ষমা করে দেয়ার অধিকারী বানিয়েছে। আরও কত কি করেছে। আর যদি কাছের মানুষদের দেখতে চাই, তাহলে শিয়া, খারেজী, মু'তাযিলা, জাবরিয়া, কাদরিয়া ইত্যাদি ফের্কার নজীর তো আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে। তারা সবাই সালাফদের নীতি না মানার জন্য কুরআন ও হাদীসের নতুন নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছে, ফলে পরিণতিতে উপদলে পরিণত হয়েছে। দীন থেকে দূরে সরে গিয়েছে।
আশা'য়েরা ও মাতুরিদী ফের্কার নেতারা যখন দেখল যে, তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করার জন্য বিশেষ বিশেষ পদ্ধতি তথা গ্রিকপ্রভাবিত দর্শন (ফালসাফা) ও অ্যারিস্টটলীয় যুক্তিবিদ্যা বা মানতিকের জ্ঞান থাকা জরুরী, আর তার কোনোটিই সকলের কাছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানা হচ্ছে না, একেক আলেম একেক রকম করে অপব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছে তখন তারা সাধারণ মানুষের ব্যাপারে ভয় পেয়ে গেল। বস্তুত সাধারণ মানুষ এত শত ব্যাখ্যা বুঝে না, তারা তো কুরআন ও হাদীসের সাধারণ অর্থই বুঝতে পারে, আর তা তাদের অন্তরে সমস্যা তৈরি করে না। তখন তারা সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দিল, এসব সিফাতের আয়াত ও হাদীস মুতাশাবিহ বা অস্পষ্ট। এগুলোর অর্থ নামের অপব্যাখ্যা কেবল আমরা আলেমরাই করব, তোমরা সাধারণ মানুষ এগুলো বুঝবে না। সেজন্য তারা অনেক সময় সাধারণ মানুষদেরকে আল্লাহর বাণী ও রাসূলের হাদীস বুঝার প্রচেষ্টা থেকে নিরুৎসাহিত করে। অথচ এ হচ্ছে চরম মিথ্যাচার; কারণ,
১- এ আয়াতগুলোকে সালাফে সালেহীন কখনও মুতাশাবিহ বা অস্পষ্ট আয়াত বলেননি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, সাহাবায়ে কেরাম বুঝতেন। সাহাবায়ে কেরাম বলতেন, তাবে'ঈগণ বুঝতেন। সালাফদের কেউই এসব আয়াত ও হাদীসকে বুঝা যায় না এমন কথা কোনোদিন বলেননি।
২- সালাফগণ এগুলো দিয়ে দলীল-প্রমাণ গ্রহণ করতেন। সাহাবায়ে কেরাম নির্দ্বিধায় আল্লাহ তা'আলাকে তাঁর 'আরশের উপর বলতেন, 'আরশের উপর উঠা সাব্যস্ত করতেন, তারা এটাকে কখনও দুর্বোধ্য কিংবা ধাঁধাঁ মনে করতেন না।
৩- আল্লাহ তা'আলা তাঁর বাণীর মাধ্যমে তাঁর পরিচয় দিয়েছেন, যারা আল্লাহ তা'আলার বাণী ও
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলাকে জেনেছে তারা সত্যিই তাঁকে চিনেছে, অপরদিকে যারা এ মাধ্যম থেকে আল্লাহকে চেনার চেষ্টা না করে ভীনদেশীয় দর্শন দিয়ে আল্লাহর পরিচয় লাভের চেষ্টা করেছে তারা পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত হয়েছে।
৪- সালাফ তথা সাহাবী ও তাদের সুন্দর অনুসারী তাবে'য়ী ও তাবে' তাবে'য়ীগণ সর্বদা এগুলোর অর্থ বুঝতেন, অর্থ করতেন এবং তাদের গ্রন্থসমূহে সেটা নির্দ্বিধায় আলোচনা করে গেছেন। উদাহরণস্বরূপ হাদীসের বিখ্যাত গ্রন্থকারগণের বই দেখলেই আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে। সুতরাং এগুলোর অপব্যাখ্যা করতে হবে এমন কথা মুসলিমদের নয়।
৫- কখনও কখনও তারা মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বর্ণনা সালাফদের থেকে বর্ণনা করে, সালাফদের সূর্যের মতো স্পষ্ট বর্ণনার সামনে চামচিকার মতো জিনিস নিয়ে দাঁড়ায়, যা নিজেই নিজেকে দাঁড় করাতে পারে না, তা তাদেরকে কীভাব দাঁড় করাবে? "ওয়ামান লাম ইয়াজ'আলিল্লাহু লাহু নূরান ফামা লাহু মিন নূর"। যেমন, জুওয়াইনী বলেন, অসম্ভব নয় 'ইস্তেওয়া আলাল আরশ' এর ইস্তেওয়া শব্দটির অর্থ হবে আল্লাহ 'আরশে কোনো কাজ করার ইচ্ছা করলেন। তারপর বলেন এটি হচ্ছে সুফিয়ান আস-সাওরীর ব্যাখ্যা। (৯৩৯) নাউযুবিল্লাহ, এটা শুধুমাত্র দাবি, সুফইয়ান আস-সাওরী কখনও এমন কথা বলেননি।
দুই. তাফওয়ীদ্ব বা অর্থ না বুঝে 'আল্লাহ জানে' বলে দেয়ার নীতি: আশায়েরা ও মাতুরিদীগণ দ্বিতীয় নীতি আবিষ্কার করেছেন সাধারণ মানুষের জন্য, আর তা হচ্ছে, এগুলোর অর্থ আমরা বুঝি না, বুঝার প্রয়োজনও নেই। আল্লাহই কেবল এগুলোর অর্থ জানেন। এ মতটিকে তারা সালাফে সালেহীনের মত হিসেবে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা করে। তারা এভাবে মুসলিম জাতিকে দু'টি মারাত্মক সমস্যায় নিপতিত করে,
১- তারা আল্লাহর এসব আয়াত ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের এসব বাণী থেকে হিদায়াত গ্রহণ করতে পারে না, অথচ এ আয়াত ও হাদীসের সংখ্যা অগণিত। কারণ কুরআনে কারীমের বহু আয়াতেই আল্লাহ তা'আলার গুণ বর্ণিত হয়েছে। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনেক হাদীসে আল্লাহ তা'আলার জন্য বেশ কিছু গুণ সাব্যস্ত করা হয়েছে। এভাবে এগুলোকে হিদায়াতশূন্য করা তাদেরই কাজ যারা আল্লাহ তা'আলার বাণী ও তাঁর রাসূলের ভাষ্য থেকে হিদায়াত নিতে চায় না।
২- বস্তুত এ গুণগুলোর অর্থ না করা, না বুঝা, অজ্ঞতায় থাকা, মূর্খতা প্রকাশ করাকে সাহাবায়ে কিরাম, তাবে'ঈনে 'ইযাম, ইমামগণের দিকে সম্পর্কযুক্ত করা মারাত্মক অপবাদ ছাড়া আর কিছুই নয়।
তাদের এ পদ্ধতিকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য কয়েকটি বক্তব্য পেশ করে থাকে, এক. এগুলোর প্রকাশ্য অর্থ নেয়া যাবে না। দুই. এগুলোর ভাষাগত প্রকাশ্য অর্থ স্বীকার করা যাবে না। তিন. তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলেন, সালাফে সালেহীন এগুলোর অর্থ করতেন না, বরং সালাফগণ হয় সেগুলোর ব্যাপারে পুরোপুরি নীরব ছিলেন, না হয় সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য থেকে
মুক্ত করে ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন। ইমাম বাইহাক্বী এ মতটির বড় প্রবক্তা। (৯৪০) ইমামুল হারামাইন আল-জুওয়াইনীও এ পদ্ধতিকে সালাফদের পদ্ধতি বলতেন। (৯৪১)
এ ভিত্তির উপরই পরবর্তী আশা'য়েরা ও মাতুরিদীয়া মতবাদের লোকগণ এ নীতিকে সালাফে সালেহীনের মত সাব্যস্ত করার জন্য মরিয়া হয়ে আছে। এমনকি ইমাম আব্দুল করীম আশ- শাহরাস্তানী বলেন, 'আহমাদ ইবন হাম্বল, দাউদ ইবন আলী আল-আসফাহানী এবং সালাফদের এক বিরাট গোষ্ঠী পূর্ববর্তী আসহাবুল হাদীসের মানহাজ অনুযায়ী চলেছেন, যেমন মালেক ইবন আনাস, মুক্বাতিল ইবন সুলাইমান। তারা নিরাপত্তার পথ বেছে নিয়েছেন; তারা বলে থাকেন, আমরা কুরআন ও সুন্নায় যা এসেছে সেগুলোর ওপর ঈমান আনয়ন করি, কোনো প্রকার তা'ওয়ীল করবো না, তবে অকাট্যভাবে জানি যে, মহান আল্লাহ সৃষ্টির কারো মতো নয়, ধারণাতে যা ধরা দেয় তা সবই তাঁর সৃষ্টি ও নির্ধারণ। (৯৪২)
মোটকথা: আশ'আরী ও মাতুরিদী মতবাদের পরবর্তী অনেক আলেম এটাকেই সালাফ ও ইমামগণের বক্তব্য মনে করে তা প্রচার-প্রসার করছে; যাতে তারা আল্লাহর গুণ সংক্রান্ত এসব ভাষ্যকে অর্থহীন করা সম্পন্ন করেছে।
'আল্লাহ তা'আলার আরশের উপর উঠা' এ গুণটির ক্ষেত্রেও আশায়েরা ও মাতুরিদী সম্প্রদায়ের লোকেরা একই নীতি অবলম্বন করে বলে, "আমাদের পূর্ববর্তীগণ এগুণটির তাফসীর করতেন না, এ গুণটি নিয়ে কথা বলতেন না; যেমনটি এরূপ অন্যান্য গুণের ব্যাপারে তাদের নীতি ছিল। (৯৪৩) ইবন জামা'আহ 'ইস্তেওয়া' শব্দের বিভিন্ন অর্থ উল্লেখ করার পর বলেন, 'সালাফগণ ও ব্যাখ্যাকারগণ একমত যে, এগুলো থেকে যা মহান আল্লাহর মর্যাদার সাথে উপযোগী নয় তা উদ্দেশ্য হবে না, যেমন বসা, সোজা হওয়া। তারপর তারা এর সম্ভাবনাময় অন্যান্য অর্থ নিয়ে মতভেদ করেছেন; যেমন, ইচ্ছা করা, অধিকার করা ইত্যাদি। কিন্তু সালাফগণ এ ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করেছেন আর তা'ওয়ীলকারীগণ এগুলোকে অধিকার করা, অধিনস্থ করার অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন; কারণ রবকে দেহের বিভিন্ন চিহ্ন যেমন জায়গা ও স্থান থেকে মুক্ত করতে হবে। (৯৪৪)
অনুরূপ বাইজুরী 'ইস্তেওয়া' এর ব্যাপারে সালাফদের অবস্থান তুলে ধরে বলেন, 'যখন কুরআন ও সুন্নাহয় এমন কোনো কিছু আসবে যাতে দিক, দেহ, সূরত অথবা অঙ্গ বুঝাবে তখনই মুজাসসিমা ও মুশাব্বিহা ব্যতীত আহলে হক ও অন্যান্যরা একমত হয়েছেন যে, সেটাকে তা'ওয়ীল করে নিতে হবে।' তারপর তিনি কিছু উদাহরণ পেশ করে বলেন, তন্মধ্যে রয়েছে, আল্লাহর বাণী 'রহমান তার 'আরশের উপর ইস্তেওয়া করেছেন'। সালাফগণ বলতেন, 'ইস্তেওয়া' কী তা আমরা জানি না। খালাফগণ বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, দখল করা বা মালিক হওয়া। (৯৪৫)
প্রাচীন ও আধুনিক আশ'আরী-মাতুরিদী সম্প্রদায়ের লোকেরা আল্লাহ তা'আলার 'ইস্তেওয়া' গুণটির অর্থ না করার জন্য 'তাফওয়ীদ্ব' ও তা'ওয়ীল নীতি গ্রহণ করে সেটাকে সালাফদের দিকে সম্পর্কযুক্ত করার জন্য যাবতীয় প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখে চলেছেন। [তারা ইমাম মালেকের বক্তব্যকে অপব্যাখ্যার নীতি অবলম্বন করেছে। ইমাম মালেকের ছাত্রগণ ও বড় বড় ইমামগণ যুগ যুগ ধরে যা বুঝেছেন তারা তার বিপরীত অপব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হয়েছে।] এ ব্যাপারে তাদের ভাষ্য অনেক। অনেকে এসব ভাষ্য সত্য মনে করেই মেনে নিচ্ছে, বস্তুত তা ইমামগণের বক্তব্যের অপব্যাখ্যা যা আমরা অচিরেই জানব ইনশাআল্লাহ।
আশ'আরী-মাতুরিদী আলিমগণের নিকট সালাফগণের বক্তব্য: "আল্লাহর 'আরশের উপর ইস্তেওয়া' ('আরশের উপর উঠা) এ গুণটি নিয়ে আশ'আরী-মাতুরিদী আলেমগণের সমস্যা হলো, তারা বিশ্বাস করে, এ গুণ ও অনুরূপ কর্মবাচক গুণাবলি দ্বারা বাতিল অর্থ সাব্যস্ত করা আবশ্যক হয়ে পড়ে, যা আল্লাহ তা'আলার দিকে সম্পৃক্ত করা বৈধ হবে না; কারণ এর দ্বারা শরীর/দেহ সাব্যস্ত হয়ে যায়, এর দ্বারা সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে যায়, তাই তারা এগুলোর প্রকাশ্য হিসেবে যা বুঝেছে তা নেয়া হারাম ঘোষণা করে, আর সেগুলোর অর্থ আল্লাহর দিকে সোপর্দ করে দেয়, এগুলোর অর্থ খোঁজ করা থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব মনে করে থাকে, এগুলো নিয়ে আলোচনা করা থেকে বিরত থাকা বরং নীরব থাকার নীতি আবশ্যক করে নেয়। আর যারাই এগুলো নিয়ে আলোচনা করে অথবা যারা এগুলোর প্রকাশ্য অর্থ যা পাঠক মাত্রই স্বাভাবিকভাবে বুঝতে পারে সে উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে তাদেরকে সঠিক পথবিচ্যুত গণ্য করে, তাদেরকেই মুশাব্বিহা, মুজাসসিমা, দেহবাদী, ইত্যাদি খারাপ গুণে গুণান্বিত করে।
"ইস্তেওয়া 'আলাল 'আরশ” ('আরশের উপর উঠা) এ গুণটি সম্পর্কে সালাফে সালেহীনের প্রকৃত অবস্থান: আশ'আরী-মাতুরিদী আলেমদের বক্তব্য তুলে ধরার আগে "ইস্তেওয়া 'আলাল 'আরশ" সম্পর্কে সালাফগণের প্রকৃত মত তুলে ধরা দরকার। বস্তুত সালাফে সালেহীন বিশেষ করে আমাদের পূর্ববর্তী সালাফগণ আল্লাহ তা'আলার এ গুণটি নিয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন; কারণ তখন জাহমিয়া সম্প্রদায়ের উৎপত্তি হয়েছিল, তারা এ গুণটিতে তাহরীফ তথা বক্রপথ ও তা'ত্বীল বা এটাকে অর্থশূন্য করার পিছনে ছুটেছিল। তখন সালাফে সালেহীন এ গুণটি সাব্যস্ত করা নিয়ে প্রচুর আলোচনা ও লেখালেখি করেন, এমনকি অনেকে এর ওপর আলাদা গ্রন্থও লিখেছেন [যেমন, যাহাবী, আল-উলু, আল-আরশ, আল-আরবা'ঈন, ইবনুল কাইয়েম, ইজতিমা'উল জুয়ুশিল ইসলামিয়্যাহ, ইবন আব্দুল হাদী, আলকালামু আলা মাসআলাতিল ইস্তেওয়া আলাল 'আরশ]। সেসব বক্তব্য, আলোচনা, লেখালেখি ও আলাদা গ্রন্থগুলোর পর্যালোচনা আমাদেরকে এ গুণ এবং অনুরূপ গুণের ব্যাপারে সালাফে সালেহীনের সঠিক অবস্থান জানতে সাহায্য করবে।
এসব বিষয়ে সালাফে সালেহীনের বক্তব্য এত বেশি যে, সেগুলোকে যদি পর্যালোচনা করি তাহলে আমাদের কাছে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, আশা'য়েরা ও মাতুরিদিয়ারা অনেকে যেভাবে এ গুণ ও এ জাতীয় গুণগুলোকে তাফওয়ীদ্ব এর নাম দিয়ে অর্থশূন্য করেছে, অর্থ নিয়ে আলোচনা নিষিদ্ধ করেছে, অর্থ নিয়ে নীরব থাকা জরুরী মনে করেছে, সালাফদের বক্তব্য সম্পূর্ণরূপে তার বিপরীত। বরং সালাফদের বক্তব্য থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, তাঁরা এসব গুণের প্রকাশ্য অর্থ সাব্যস্ত করতেন, মেনে নিতেন, সে অর্থ সাব্যস্ত করার জন্য সংগ্রাম করতেন।
সালাফে সালেহীন এ সিফাতগুলোর অর্থ সাব্যস্ত করতেন তার প্রমাণ: আলোচনার সুবিধার্থে আমরা সেটাকে চারভাগে বিভক্ত করতে পারি: এক. সালাফে সালেহীন 'ইস্তেওয়া' শব্দের অর্থ করেছেন এবং তারা সেটাকে আভিধানিক বাস্তব অর্থে ব্যাবহার করেছেন:
অনেক সালাফ থেকে আমরা পাই যে, তাঁরা 'ইস্তেওয়া' শব্দটিকে তার ভাষাগত অভিধান অনুযায়ী তাফসীর করেছেন, অভিধানের সূত্র ধরে তা দ্বারা কী কী বুঝায় তা মানার ব্যাপারে তাদের ঘোষণা, তা অপরের কাছে পৌঁছানো আর তার অর্থের দাবি গ্রহণ করে নেয়ার আবশ্যকতা তুলে ধরেছেন।
সালাফে সালেহীন থেকে 'ইস্তেওয়া' গুণটির যে অর্থ এসেছে, তা কয়েকটি শব্দে তারা ব্যক্ত করেছেন, তারা কখনো বলেছেন, ('উলু) বা সর্বোচ্চে উঠা, কখনো বলেছেন, (ইরতেফা') বা উপরে উঠা, কখনো বলেছেন, (সা'আদা) বা আরোহন করা, আবার কখনো বলেছেন, (ইস্তাকাররা) বা উপরে থাকা। নিম্নে আমরা তার কয়েকটি বর্ণনা করব:
ইমাম বাইহাক্বী ও অন্যান্যগণ ভাষাবিদ ফাররা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, ইবন আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা বলেছেন, "সুম্মাস্তাওয়া” এর অর্থ উপরে উঠলেন। (৯৪৬)
অপর বর্ণনায় ইবন 'আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে এসেছে, তিনি বলেছেন এর অর্থ সমুন্নত হলেন। (৯৪৭)
ইমাম বুখারী তা'লীক পদ্ধতিতে প্রখ্যাত তাবে'য়ী আবুল আলীয়া থেকে বর্ণনা করেন যে, 'ইস্তাওয়া ইলাস সামায়ি' এর অর্থ, (সা'আদা) উপরে উঠলেন।
আর তিনি প্রখ্যাত তাবে'য়ী মুজাহিদ ইবন জাবার থেকে বর্ণনা করলেন, 'ইস্তেওয়া' এর অর্থ, ('আলা) আরশের উপরে উঠলেন। (৯৪৮)
ইমাম ইবন জারীর আত-তাবারী রাহিমাহুল্লাহ প্রখ্যাত তাবে'য়ী রবী' ইবন আনাস থেকে বর্ণনা করেন, "সুম্মাস্তাওয়া ইলাস সামায়ি” এর অর্থ সম্পর্কে রবী' থেকে বর্ণিত হচ্ছে, ইরাতাফা'আ ইলাস সামায়ি' বা উপরের দিকে উঠলেন। (৯৪৯)
هُوَ الَّذِي خَلَقَ لَكُم مَّا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا ثُمَّ اسْتَوَى إِلَى السَّمَاءِ سَوَّاهُنَّ سَبْعَ سَمَوَاتٍ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ [البقرة: ٢٩] “তিনিই সেই সত্তা যিনি পৃথিবীর সবকিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন এবং সেগুলোকে সুবিন্যস্ত করে সাত আসমান বানালেন। আর তিনি সব বিষয়ে মহাজ্ঞানী।” [সূরা আল-বাকারা: ২৯] দলীল হিসেবে পেশ করেছেন।
ইমাম লালেকাঈ প্রখ্যাত আল-ইমাম, আস-সাবত, আল-হাফেয, ইমাম ইসহাক্ব ইবন রাহওয়াই এর উস্তাদ, হাদীসের ছয় কিতাবের হাদীস বর্ণনাকারী, বিশর ইবন 'উমার থেকে বর্ণনা করেন, 'আমি একাধিক মুফাসসিরকে বলতে শুনেছি, الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى [طه: ٥] এর অর্থ হচ্ছে,
৯৫০. শারহু উসূল ই'তিক্বাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ ৩/৩৯৭। ৯৫১. শারহু উসূল ই'তিক্বাদি আহلিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ ৩/৪৪২। ৯৫২. যাহাবী, আল-উলু, নং ৫২৮। ৯৫৩. মা'আলিমুত তানযীল ৩/২৩৫। ৯৫৪. শারহু উসূল ই'তিক্কাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ ২/৩৯৯। ৯৫৫. আযহারী, তাহযীবুল লুগাহ ১৩/১২৫।
(ইরাতাফা'আ) বা উপরে উঠলেন। (৯৫০)
অনুরূপ ইমাম লালেকাঈ ও অন্য অনেকেই বিখ্যাত আরবী ভাষাবিদ 'নিফতাওয়াইহ' এর মাধ্যমে ভাষাবিদ ইবনুল আ'রাবী থেকে বর্ণনা করেন, এক লোক তার কাছে এসে বললো, আল্লাহর বাণী ]الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى [طه: ٥ এর অর্থ কী? তিনি তখন বললেন, তিনি তাঁর 'আরশের উপর যেমনটি মহান আল্লাহ জানিয়েছেন। তখন লোকটি বললো, হে আবু আব্দুল্লাহ, এটা তো এর অর্থ নয়, এর অর্থ তো 'ইস্তাওলা' বা অধিকার করা, তখন ইবনুল আ'রাবী বলেন, চুপ কর, তুমি এটার কী বুঝ? কোনো কিছুর ওপর তখনই অধিকার করার কথা আসবে যখন তার বিপক্ষ থাকে, তারপর যখন কেউ সেটাতে জয়লাভ করে তখন বলে 'ইস্তাওলা' বা অধিকার করল। (১৫১)
এর মাধ্যমে ইবনুল আ'রাবী 'ইস্তেওয়া' শব্দটির ব্যাপারে প্রশ্ন করা যায় স্বীকার করলেন, সাথে সাথে তিনি সেটার উত্তরও দিলেন। যদি তার মত হতো 'তাফওয়ীদ্ব' বা অর্থ না করে ছেড়ে যাওয়া, তাহলে প্রশ্নের শুরুতেই অস্বীকার করতেন। তাছাড়া তিনি প্রশ্নকারীর ওপর ভুল অর্থ প্রদানকেই অস্বীকার করেছেন, প্রশ্ন করা ও অর্থ জানাকে অস্বীকার করেননি।
ইমাম ফকীহ, মুফাসসির আবুল ফাতহ সুলাইম ইবন আইয়্যুব ইবন সুলাইম আর-রাযী, আবু হামেদ আল-ইসফারায়ীনীর ছাত্র, খতীব আল-বাগদাদীর উস্তাদ, তিনি বলেন, الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ ]اسْتَوَى [طه: ٥ এর অর্থ সম্পর্কে আবু উবায়দা বলেন, ('আলা) 'উপরে উঠল'। অন্যরা বলেন, (ইস্তাকাররা) অবস্থান করলেন। (৯৫২)
আর ইমাম বাগাওয়ী বলেন, "সুম্মাস্তাওয়া আলাল আরশ" এর অর্থ কালবী ও মুকাতিল করেছেন, (ইস্তাকাররা) অবস্থান করলেন। আর আবু উবায়দা মা'মার ইবনুল মুসান্না বললেন, ('আলা) উপরে উঠলেন। (৯৫৩)
তাফসীরকার ও ভাষাবিদগণ কর্তৃক এসব অর্থ বর্ণনা প্রমাণ করে যে, তারা 'ইস্তেওয়া' এর অর্থ খোঁজতেন, খোঁজ করাকে নিষিদ্ধ মনে করতেন না, চুপ বা নীরবও থাকতেন না।
অনুরূপভাবে ইমাম লালেকাঈ আবুল আব্বাস সা'লাব নামক প্রখ্যাত ভাষাবিদ থেকে বর্ণনা করেন তিনি বলেছেন, "ইস্তাওয়া আলাল আরশ” এর অর্থ 'আরশের উপর উঠলেন, তারপর বলেন, এটাই আরবী ভাষা থেকে বুঝা যায়। (৯৫৪)
আর আখফাশ বলেন, ]الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى [طه: ٥ এর অর্থ, ('আলা) বা উপরে উঠলেন, যেমন বলা হয়, বাহনের উপর ইস্তেওয়া করলাম, ঘরের ছাদে ইস্তাওয়া করলাম, অর্থাৎ উপরে উঠলাম। (৯৫5)
ইমাম কাসসাব তার তাফসীরে বলেন, আল্লাহর বাণী ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ এটা জাহমিয়াদের বিরুদ্ধে প্রমাণ; কারণ এখানে 'ইস্তাওয়া' এর অর্থ (ইস্তেকরার) বা অবস্থান করা। সুতরাং
৯৫৬. নুকাতুল কুরআন, পৃ. ৪২৬। ৯৫৭. ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমূ'উল ফাতাওয়া ৫/৫১৯। ৯৫৮. ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমাউল জুয়ুশ, ১৬৬। ৯৫৯. তা'ওয়ীল মুখতালাফুল হাদীস পৃ. ২৭১। ৯৬০. দেখুন, যেমন ১৬/৩২৫। ৯৬১. আত-তামহীদ ৭/১৩১।
اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ এর অর্থ তারপর তিনি 'আরশের উপর অবস্থান করলেন। (৯৫৬)
অনুরূপভাবে ইবন তাইমিয়্যাহ ইমাম ইবনুল মুবারকসহ অনেকের থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তারা 'ইস্তাওয়া' শব্দটির ব্যাখ্যা করেছেন 'ইস্তাকাররা' দিয়ে। তাদের সংখ্যা অনেক। তারা সবাই বলেছেন, ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ এর অর্থ 'আরশের উপর অবস্থান করলেন। (৯৫৭)
ইমাম মুযানী রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহর গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, السميع البصير العليم الخبير الرفيع عال على عرشه وهو دان بعلمه "সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা, সর্বজ্ঞ, সর্বখবর রাখনে ওয়ালা, সর্বোচ্চ, তাঁর 'আরশের উপর আরোহনকারী, তিনি জ্ঞানে সবার নিকটে।” (৯৫৮)
ইমাম ইবন কুতাইবাহ রাহিমাহুল্লাহ জাহমিয়াদের বক্তব্যের প্রতিবাদ করতে গিয়ে বলেন, وكيف يسوغ لأحد أن يقول إنه بكل مكان على الحلول مع قوله: الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى أي: استقر، كما قال: فَإِذَا اسْتَوَيْتَ أَنتَ وَمَن مَّعَكَ عَلَى الْفُلْكِ [المؤمنون: ۲۸] أي: استقررت» অর্থাৎ কীভাবে কারও জন্য এটা বলা সম্ভব যে, তিনি সব জায়গায় সর্বস্থানে প্রবেশ করে আছেন, অথচ আল্লাহর বাণী রয়েছে الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى যার অর্থ, (রহমান 'আরশের উপর) অবস্থান করা। যেমন অন্যত্র আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, فَإِذَا اسْتَوَيْتَ أَنتَ وَمَن مَّعَكَ عَلَى الْفُلْكِ [المؤمنون: ۲۸ (অতঃপর যখন আপনি এবং আপনার সাথে যারা আছেন তারা জাহাজের উপর) অবস্থান করবেন”। (৯৫৯)
অনুরূপভাবে ইমাম ইবন জারীর আত-ত্বাবারী রাহিমাহুল্লাহ তার তাফসীরে কুরআনে কারীমের যত জায়গায় 'ইস্তেওয়া আলাল 'আরশ' এসেছে, সব জায়গায় অর্থ হিসেবে বাছাই করে নিয়েছেন, 'উলু ও ইরতিফা' (উপরে উঠা ও উর্ধ্বে উঠা) শব্দদ্বয়কে। (৯৬০)
ইমাম ইবন আব্দুল বার 'ইস্তেওয়া' এর তাফসীরে বলেন, ইস্তেওয়ার অর্থ ইস্তেকরার ফিল উলু বা উপরে অবস্থান। এটি দিয়েই আমাদেরকে আল্লাহ তা'আলা সম্বোধন করেছেন এবং বলেছেন, لِتَسْتَوُوا عَلَى ظُهُورِهِ ثُمَّ تَذْكُرُوا نِعْمَةَ رَبِّكُمْ إِذَا اسْتَوَيْتُمْ عَلَيْهِ [الزخرف: ١٣] "যাতে তোমরা এর পিঠে স্থির হয়ে বসতে পার, তারপর তোমাদের রবের অনুগ্রহ স্মরণ করবে যখন তোমরা এর উপর স্থির হয়ে বসবে।” [সূরা আয-যুখরূপ, আয়াত: ১৩] (৯৬১)
তারপর তিনি ভাষাবিদ ইমাম ও অন্যান্যদের থেকে বহু ভাষ্য বর্ণনা করেছেন। বস্তুত ইমাম ইবন আব্দুল বার উপরোক্ত কথা দিয়ে আমাদেরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক নীতিমালার দিকনির্দেশ করছেন, যার ওপর সালাফে সালেহীনের মানহাজ প্রতিষ্ঠিত, তা হচ্ছে, "নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে সম্বোধন করেছেন, এমন শব্দে যা আরবী ভাষায় আমরা বুঝতে সক্ষম”; সুতরাং
তাঁর কথা বুঝার জন্য আরবী ভাষার চাহিদা অনুযায়ীই আমাদের চলা জরুরী।
অনুরূপভাবে ইমাম কুরতুবী তার তাফসীরে এ বিষয়ে তাকীদ দিয়েছেন যে, সালাফে সালেহীন ইমামগণ বিশ্বাস করতেন যে, 'ইস্তেওয়া' বাস্তব একটি গুণ। তাই তিনি বলেন, "আর সালাফে সালেহীনের কেউ কোনোদিন আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর 'ইস্তেওয়া' বা উঠার বিষয়টি অস্বীকার করেননি। তবে 'আরশকে একান্তভাবে আল্লাহ তা'আলা উল্লেখ করার কারণ এটি তাঁর সর্ববৃহৎ সৃষ্টি। তবে তারা 'ইস্তেওয়া' বা আরশের উপরে উঠার ধরন জানেনি। কারণ এর প্রকৃত রূপ জানা যায় না। (৯৬২)
ইমাম আবু বকর ইবন মাওহাব আল-মালেকী, যিনি ইমাম ইবন আবী যায়েদ আল-কাইরোয়ানী' এর রিসালার ব্যাখ্যা করেছেন, তিনি সালাফে সালেহীন ইমামগণের আকীদাহ'র সংক্ষিপ্ত রূপ বর্ণনায় বলেন, “তাঁরা তাঁর আরশের উপরে উঠার গুণটি স্বীকার করে নিয়েছে আরও স্বীকার করেছে যে, এটা বাস্তব অর্থেই কোনো রূপক অর্থে নয়। (৯৬৩)
এ হচ্ছে সামান্য কিছু তাফসীর যা সালাফে সালেহীন আলেমগণ থেকে আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠা' এ গুণের ব্যাপারে এসেছে। আরও এমন বহু বর্ণনা আছে যা আমি এখানে উল্লেখ করিনি। এসব থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, 'আল্লাহ তা'আলার আরশের উপর উঠা' যা 'ইস্তেওয়া' গুণ নামে খ্যাত তার অর্থ করার বিষয়টি সালাফে সালেহীনের নিকট কোনো গোপন ব্যাপার ছিল না, বরং তা ছিল তখনকার সময় সর্বজন বিদিত বিষয়।
বস্তুত এ ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের আলেমগণের উপর্যুক্ত যে তাফসীর বর্ণনা করেছেন তাই প্রমাণ করে যে, তারাও এটাই বিশ্বাস করেন এবং এ তাফসীরের ওপর সন্তুষ্ট। কারণ যদি 'ইস্তেওয়া' এর এ তাফসীর তাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য হতো তবে আমাদের সালাফে সালেহীন ইমামগণ এর বিরুদ্ধে কথা বলতেন, যেমনটি তারা 'ইস্তেওয়া' শব্দের জাহমিয়াদের তাফসীর 'ইস্তাওলা' (অধিকার করা/দখল করা/মালিক হওয়া) এর প্রতিবাদ করেছেন। সুতরাং সালাফে সালেহীন ইমামগণ এটার তাফসীর (উপরে উঠা) অস্বীকার না করে বর্ণনা করা, বরং তা বর্ণনায় অগ্রণী হওয়া, এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করছে যে, সিফাত এর ভাষ্যসমূহের অর্থ বর্ণনা করা তাদের নিকট গ্রহণযোগ্য বিষয় ছিল বরং এটা তাদের মানহাজের মৌলিক বিষয় ছিল।
তারপরও একটি জিনিসের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা দরকার যে, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আর ইমামগণ কোনো কোনো ব্যাখ্যার বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু তারা শুদ্ধটি কী তা বলতে দ্বিধা করেননি। তারা তাফওয়ীদ্ব করতেন না, যেমনটি আশ'আরী-মাতুরিদী আলেমগণ করে থাকে, বরং সালাফগণ এর বিপরীতটিই করতেন।
সালাফে সালেহীনের থেকে আসা 'ইস্তেওয়া 'আলাল 'আরশ' ব্যাখ্যায় 'ইস্তেওয়া' এর অর্থ বর্ণনায় যা যা বর্ণিত হয়েছে, তা যে আশ'আরী-মাতুরিদী সম্প্রদায়ের তাফওয়ীদ্ব নীতির বিরোধী তার আরেকটি প্রমাণ হচ্ছে, তাদের বড় ব্যক্তিত্ব ইমাম রাযী সালাফে সালেহীনের থেকে আসা এসব তাফসীরকে তাশবীহ ও তাজসীম নাম দিয়েছেন। তিনি আল্লাহ তা'আলার জন্য 'ইস্তেওয়া' এর অর্থ অবস্থান করা, উপরে থাকা ইত্যাদি করাকে অসম্ভব বলেছেন। রাযী বলেন, “আল্লাহর বাণী ৯৬২. আহকামুল কুরআন ৭/২১৯। ৯৬৩. ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ুশ ১৮৯।
৫৩৪ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ এর ‘ইস্তেওয়া' এর অর্থ উপরে অবস্থান করা যাবে না।(৯৬৪)
দশম অধ্যায় অপর জায়গায় তিনি বলেন, আয়াতে 'ইস্তাওয়া' এসেছে, (সুতরাং সালাফ থেকে যারা উপরে অবস্থান করেছেন বলে অর্থ করেছেন তা বলা যাবে না, কারণ আয়াতে 'মুস্তাওয়িন' আসেনি, তাই সেটার শব্দ পরিবর্তন করে বলা যাবে না। (৯৬৫)
এর দ্বারা বুঝা গেল যে, সালাফ যা যা বলেছেন সেটা আশা'য়েরা-মাতুরিদিয়াদের নেতারা জানতো, কিন্তু মেনে নিতে পারেনি। তারা এটাও জেনেছে যে, সালাফগণ এটার অর্থ বর্ণনা করেছেন। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, অর্থ না করা, অর্থের ব্যাপারে চিন্তা না করা, যা তাফওয়ীদ্ব নামে খ্যাত তা সালাফের মানহাজ ছিল না।
আশ'আরী মতবাদের আরেক নেতা ইবন জামা'আহ বলেন, আল্লাহ তা'আলার বাণী 'ইস্তেওয়া' এর অর্থ দখল করা ও অধীনস্থ করা এটিই করতে হবে, 'উপরে উঠা' ও 'উপরে অবস্থান করা' করা যাবে না; কারণ এটা করলে তো আল্লাহ তা'আলাকে স্থান ও সময়ের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়, আর তাতে করে স্থান ও সময়কেও প্রাচীন বলতে হয়। (৯৬৬)
আশ'আরী মতবাদের অন্যান্য আলেম যেমন আমেদী, ইবন জাহবল, ইবনুত তিলমিসানী, সুবুকী (পিতা), হিসনী, কাওসারী এরা প্রত্যেকেই আল্লাহর সিফাত হিসেবে 'ইস্তাওয়া' উল্লেখ করার পর সেটার অর্থ করাকে অস্বীকার করেছেন। কারণ হিসেবে বলেছেন, এটা করলে তাজসীম হয়, আর তাজসীম বা দেহ সাব্যস্ত করা হারাম। এভাবে তারা সালাফের কাছ থেকে আসা অর্থকে অস্বীকার করে নিজেদের মন মত অর্থ সাব্যস্ত করে নিয়েছে। [বস্তুত সালাফ এগুলোকে কখনো দেহ বলেননি, তারাই নিজেরা প্রথমে দেহ সাব্যস্ত করে পরে তা অস্বীকার করেছে, সালাফ তো বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর উঠেছেন, এ উঠার বিষয়টি তেমন হবে যেভাবে হওয়া তাঁর জন্য উপযুক্ত]
দুই: সালাফে সালেহীন থেকে এমন সব বর্ণনা এসেছে যা প্রমাণ করে যে, তারা বাস্তব অর্থেই আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তাঁর 'আরশের উপর উঠা সাব্যস্ত করতেন:
সালাফে সালেহীন থেকে এমনসব ভাষ্য এসেছে যা দ্বারা সুস্পষ্টভাবে এটা প্রমাণিত হয় যে তারা 'ইস্তেওয়া' বা 'উপরে উঠা' এ অর্থটি বাস্তব অর্থেই আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করতেন। তারা কখনো তাফওয়ীদ্ব নামে অর্থহীন করে দিতেন না। এর অর্থ বর্ণনায় প্রবেশ করতে কেউ বিরত থাকতেন না। এ জন্যই আমরা দেখি তাঁরা কখনো সরাসরি সর্বোপরে, সর্বোচ্চে আছে বলতেন। আরশের উপরে উঠার বিষয়টি তাকীদ দেয়ার জন্য 'বি-যাতিহী', (সত্তাগতভাবে) কিংবা 'বি-নাফসিহী' (স্বয়ং) শব্দদ্বয় ব্যবহার করতেন। কখনো কখনো 'বায়িনুন মিন খালকিহী' (তাঁর সৃষ্টিকুল থেকে পৃথক) এ বাক্য ব্যবহার করতেন। এসব তাকীদপূর্ণ শব্দ ও বাক্যের ব্যবহার এটা প্রমাণ করে যে, সালাফে সালেহীন বাস্তব অর্থেই আল্লাহ তা'আলাকে তাঁর 'আরশের উপরে উঠা বিশ্বাস করতেন।
সালাফে সালেহীনের বিশ জনের বেশি আলেম থেকে এ রকম তাকীদপূর্ণ শব্দ ব্যবহার বর্ণিত
৯৬৪. আত-তাফসীরুল কাবীর ৫/২৬৯। ৯৬৫. আসাসুত তাক্বদীস ২৩৩। ৯৬৬. ঈদ্বাহুদ দলীল পৃ.১৩২।
হয়েছে। যেমন,
১- হিশাম ইবন উবাইদুল্লাহ আর-রাযী আল-হানাফী, যিনি ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান এর ছাত্র ছিলেন, তাঁর থেকে বর্ণিত, জাহমিয়্যাহ হওয়ার কারণে এক ব্যক্তিকে বন্দি করা হয়। সে তাওবা করলে তাকে পরীক্ষা করার জন্য হিশামের দরবারে আনা হয়। হিশাম তাকে বললেন, তুমি কি সাক্ষ্য দিচ্ছো যে, নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপরে, তার সৃষ্টির বিপরীতে?
সে বলল, তার সৃষ্টির বিপরীতে কী? তা আমি জানি না। তিনি বললেন, আবার তাকে বন্দি করো। সে এখনও তাওবা করেনি। (৯৬৭)
২- ইয়াহইয়া ইবন মু'আয আর-রাযী বলেন,
«إن الله على العرش بائن من الخلق، وقد أحاط بكل شيء علماً»
"নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপর, সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা, আর তিনি সবকিছু জ্ঞানে পরিবেষ্টন করে আছেন"। (৯৬৮)
৩- সালেহ ইবনুদ দুরাইস বলেন,
جعل عبد الله بن أبي جعفر الرازي يضرب قرابة له بالنعل على رأسه يرمى برأي جهم ويقول: «لا، حتى تقول الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى بائن من خلقه
'আব্দুল্লাহ ইবন আবূ জা'ফর আর-রাযী, জাহমিয়্যাহ হওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত- তার এক আত্মীয়ের মাথায় জুতা দিয়ে মারছিলেন আর বলছিলেন, ততক্ষণ ছাড়ব না যতক্ষণ না বলো: রহমান 'আরশের উপরে উঠেছেন, তিনি তাঁর সৃষ্টি থেকে আলাদা। (৯৬৯)
৪- ইমাম বুখারীর শিক্ষক আলী ইবন হাসান ইবন শাকীক থেকে প্রমাণিত, তিনি বলেন,
قلت لعبد الله بن المبارك: كيف نعرف ربنا عز وجل؟ قال: «بِأَنَّهُ فَوْقَ السَّمَاءِ السَّابِعَةِ عَلَى الْعَرْشِ، بَائِنٌ مِنْ خَلْقِهِ».
আমি 'আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারককে বললাম- আমাদের মহান রবকে আমরা কীভাবে চিনবো? তিনি বললেন: সপ্তম আসমানের ঊর্ধ্বে তাঁর 'আরশের উপরে, তাঁর সৃষ্টিকুল থেকে পৃথক।”(৯৭০)
৫- উসমান ইবন আবী শাইবাহ বলেন,
৯৭১. ইবন আবী শাইবাহ, কিতাবুল আরশ ২/২৭৮-২৯০; তাহকীক ড. মুহাম্মাদ ইবন খলীফা আত-তামীমী; ইবন আব্দুল হাদী, আল-কালাম আলা মাসআলাতিল ইস্তেওয়া 'আলাল আরশ পৃ.৬৭।
৯৭২. ইবন বাত্তাহ, আল-ইবানাহ, ৩/১৫৯/হা ১১৫; লালেকাঈ, শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাহ, ৩/৪০১-৪০২, নং ৬৭৪; ইবনু কুদামাহ, ইসবাতু সিফাতিল 'উলু, ১১৬, নং ৯৬; যাহাবী, আল-'উলু, ১২৯; ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ূশ, ২০০; ইবন আব্দুল হাদী, আল-কালাম আলা মাসআলাতিল ইস্তেওয়া আলাল আরশ পৃ. ৬৪।
৯৭৩. আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়া পৃ. ৬৩, নং ৯৮।
توافرت الأخبار أن الله خلق العرش فاستوى عليه بذاته، ... فهو فوق السموات وفوق العرش بذاته، متخلصا من خلقه باثنا منهم.
আল্লাহ 'আরশ সৃষ্টি করেছেন তারপর সত্তাগতভাবে তিনি তার উপরে উঠেছেন, এ মর্মে প্রচুর হাদীস আছে। সুতরাং তিনি আসমানসমূহের উপরে, তিনি সত্তাগতভাবে তাঁর 'আরশের উপরে, তাঁর সৃষ্টি থেকে আলাদা, তাদের থেকে আলাদা। (৯৭১)
৬- ইমাম আহমাদ থেকে ইউসুফ ইবন মূসা আল-কাত্তান বর্ণনা করেন,
وقيل لأبي عبد الله : الله فوق السماء السابعة على عرشه، بائن من خلقه، وعلمه وقدرته بكل مكان؟ قال: «نعم هو على عرشه ولا يخلو شيء من علمه
আহমাদ ইবন হাম্বলকে বলা হলো, আল্লাহ সাত আসমানের ঊর্ধ্বে তাঁর 'আরশের উপরে, তাঁর সৃষ্টি থেকে আলাদা, তাঁর জ্ঞান ও ক্ষমতা সর্বত্র? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি তাঁর 'আরশের উপর, কোনো কিছু তাঁর জ্ঞানের অগোচরে নয়।
এটি খাল্লাল ইউসুফ থেকে বর্ণনা করেছেন। (৯৭২)
৭- ইমাম উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী বলেন,
وَالْأَحَادِيثُ عَنْ رَسُولِ اللَّهَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَعَنْ أَصْحَابِهِ ، وَالتَّابِعِينَ، وَمَنْ بَعْدَهُمْ فِي هَذَا أَكْثَرُ مِنْ أَنْ يُحْصِيَهَا كِتَابُنَا هَذَا، غَيْرَ أَنَّا قَدِ اخْتَصَرْنَا مِنْ ذَلِكَ مَا يَسْتَدِلُّ بِهِ أُولُو الْأَلْبَابِ أَنَّ الْأُمَّةَ كُلُّهَا وَالْأُمَمَ السَّالِفَةَ قَبْلَهَا لَمْ يَكُونُوا يَشُكُونَ فِي مَعْرِفَةِ اللَّهَ تَعَالَى أَنَّهُ فَوْقَ السَّمَاءِ، بَائِنٌ مِنْ خَلْقِهِ
"রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস, সাহাবী, তাবে'য়ীগণ এবং তাদের পরের লোকদের এ বিষয়ের ভাষ্য এত বেশি যে তা আমাদের এ কিতাবে জায়গা হবে না। তবে আমরা কেবল সেটা তাতে সংক্ষেপ করেছি যা দিয়ে বিবেকবানরা দলীল নিতে পারে যে, পুরো উম্মত এমনকি পূর্ববর্তী উম্মতগণও আল্লাহকে চেনার ব্যাপারে কখনও সন্দেহ প্রকাশ করতেন না যে, তিনি আসমানের উপরে, তাঁর সৃষ্টি থেকে আলাদা।”(৯৭৩)
৮- ইমাম ইবন খুযাইমাহ বলেন,
من لم يقر أن الله على عرشه استوى فوق سبع سمواته، بائن من خلقه، فهو كافر يستتاب فإن تاب وإلا ضربت عنقه وألقي على مزبلة لئلا يتأذى برائحته أهل القبلة وأهل الذمة
৯৭৪. হাকিম, মা'রিফাতু উলূমিল হাদীস, ৮৪; ইবন তাইমিয়্যাহ, ফাতওয়া হামাবিয়াহ, ৩৫; তিনি সহীহ বলেছেন; যাহাবী, আল-'উলু, ১৫২; ইবন আব্দুল হাদী, আল-কালাম আলা মাসআলাতিল ইস্তেওয়া আলাল আরশ পৃ. ৭০।
"যে স্বীকার করে না, আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপরে, তাঁর সাত আসমানের উপরে উঠেছেন, তাঁর সৃষ্টি থেকে আলাদা" সে কাফির। তাকে তাওবা করতে বলা হবে। তাওবা করলে (ভালো) অন্যথায় তার গর্দান উড়িয়ে দিয়ে নর্দমায় নিক্ষেপ করতে হবে; যেন তার গন্ধে মুসলিমরা ও যিম্মীরা কষ্ট না পায়। (৯৭৪)
৯- ইমাম আবুল কাসেম আত-ত্বাবারানী বলেন,
باب ما جاء في استواء الله تعالى على عرشه، وأنه بائن من خلقه
আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপরে উঠেছেন এবং তার সৃষ্টি থেকে তিনি আলাদা সংক্রান্ত বিষয়ে যা বর্ণিত হয়েছে- তার আলোচনা। তারপর তিনি এ বিষয়ে বিভিন্ন হাদীস বর্ণনা করেন। (৯৭৫)
১০-ইমাম আবী যায়েদ আল-ক্বাইরোয়ানী বলেন,
وأنه فوق عرشه المجيد بذاته، وأنه في كل مكان بعلمه
আল্লাহ সত্তাগতভাবে তাঁর মহান 'আরশের উপরে আর তিনি সর্বত্র তাঁর ইলমের মাধ্যমে। (৯৭৬)
১১- হাফিয ইমাম আবু নাসর আস-সিজযী স্বীয় গ্রন্থ আল-ইবানাহতে বলেন,
وأئمتنا الثوري، ومالك، وابن عيينة، وحماد بن سلمة، وحماد بن زيد، وابن المبارك، وفضيل بن عياض، وأحمد، وإسحاق، متفقون على أن الله فوق عرشه بذاته، وأن علمه بكل مكان
আমাদের ইমাম সাওরী, মালিক, ইবন 'উয়াইনাহ, হাম্মাদ ইবন সালামাহ, হাম্মাদ ইবন যাইদ, ইবনুল মুবারক, ফুদ্বাইল ইবন 'ইয়াদ্ব ও আহমাদ ইবন ইসহাক একমত যে, আল্লাহ সত্তাগতভাবে তাঁর 'আরশের উপরে, আর তাঁর ইলম সর্বত্র। (৯৭৭)
১২- অনুরূপভাবে শাইখুল ইসলাম আবু ইসমা'ঈল আল-আনসারী বলেন,
في أخبار شتى إن الله في السماء السابعة، على العرش بنفسه
বিভিন্ন হাদীসে আছে, স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা সপ্তম আসমানের ঊর্ধ্বে 'আরশের উপর রয়েছেন।
১৩-ইমাম আবুল হাসান আল-কারজী আকীদাতু আসহাবিল হাদীস গ্রন্থে বলেন,
عقائدهم أن الإله بذاته ... على عرشه مع علمه بالغوائب
আসহাবুল হাদীসের আকীদাহ হচ্ছে, আল্লাহ সত্তাগতভাবে তাঁর 'আরশের উপর। সেখান থেকেই যাবতীয় গায়েবী বিষয় তাঁর ইলমের অন্তর্ভুক্ত।
১৪- শাইখুল ইসলাম, যার সুপথপ্রাপ্তির ব্যাপারে সবাই একমত এবং যিনি অসংখ্য কারামতের অধিকারী, শাইখ আব্দুল কাদের জীলানী। তিনি বলেন,
ولا يجوز وصفه بأنه في كل مكان، بل يقال إنه في السماء على العرش كما قال الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى، وينبغي إطلاق صفة الاستواء من غير تأويل، وأنه استواء الذات على العرش، وكونه سبحانه وتعالى على العرش مذكور في كل كتاب أنزل على كل نبي أرسل بلا كيف
তাঁর ক্ষেত্রে এই গুণের বর্ণনা দেয়া জায়িয নয় যে, তিনি সর্বত্র বিরাজমান। বরং বলতে হবে, তিনি আসমানের ঊর্ধ্বে 'আরশের উপরে। যেমন, তিনি বলেছেন-পরম করুণাময় 'আরশের উপর উঠেছেন। উচিৎ হচ্ছে উপরে উঠার গুণকে তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা ছাড়াই ব্যবহার করা। তাঁর সত্তা 'আরশের উপরে উঠা, আল্লাহ সুবহাল্লাহু ওয়া তা'আলার 'আরশের উপর থাকার বিষয়টি প্রত্যেক নবী ও রাসূলের কাছে অবতীর্ণ প্রত্যেক কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে ধরন অজানা। (৯৭৮)
১৫-ইসমাঈল ইবন ইয়াহইয়া আল-মুযানী তাঁর শারহুস সুন্নাহ গ্রন্থে বলেন,
الحمد الله أحق ما بدئ، وأولى من شكر، وعليه أثني، الواحد الصمد، ليس له صاحبة ولا ولد، جل عن المثل فلا شبيه له ولا عديل السميع البصير العليم الخبير المنيع الرفيع، عال على عرشه في مجده بذاته، وهو دان بعلمه من خلقه - إلى أن قال: والقرآن كلام الله ومن الله، ليس بمخلوق فيبيد، وكلمات الله وقدرة الله، ونعته وصفاته كلها كاملات غير مخلوقات دائمات أزليات ليست محدثات فتبيد، ولا كان ربنا ناقصاً فيزيد، جلت صفاته عن شبه المخلوقين ... عال على العرش، بائن من خلقه
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। যা দ্বারা শুরু করা হয়েছে তিনি তার হকদার। শুকরিয়া পাওয়ার অধিকারীদের মধ্যে সর্বাগ্রে। তাঁর গুণ বর্ণনা করছি। তিনি এক, অমুখাপেক্ষী। তাঁর কোনো স্ত্রী ও সন্তান নেই। তিনি দৃষ্টান্তের ঊর্ধ্বে। তাঁর সাদৃশ্য ও সমকক্ষ নেই। সর্বশ্রোতা, সবদ্রষ্টা, সর্বজ্ঞানী, সর্বখবর রাখনে ওয়ালা, সর্বোচ্চ, তাঁর 'আরশের উপর আরোহনকারী, তিনি জ্ঞানে সবার নিকটে।... তিনি আরও বলেন, কুরআন আল্লাহর কালাম। আল্লাহর থেকে এসেছে। মাখলুক নয় যে ধ্বংস হয়ে যাবে। আল্লাহর বাণী, তাঁর ক্ষমতা, প্রশংসা ও গুণাবলি পূর্ণাঙ্গ, মাখলুক নয়, চিরন্তন চিরস্থায়ী। মাখলুক নয় যে ধ্বংস হয়ে যাবে। আমাদের রব অপূর্ণাঙ্গ ছিলেন না যে বৃদ্ধি পেয়েছেন। মাখলুকের সাদৃশ্য থেকে তাঁর গুণাবলি ঊর্ধ্বে।... 'আরশের উপরে সমুন্নত, তাঁর সৃষ্টি থেকে আলাদা। এরপর তিনি বাকী আকীদাহ উল্লেখ করেন। (৯৭৯)
১৬-আব্দুর রহমান ইবন আবু হাতিম বলেন,
সألت أبي وأبا زرعة عن مذاهب أهل السنة في أصول الدين، وما أدركا عَلَيهِ العلماء في جميع الأمصار وما يعتقدان في ذلك ؟ فقالا :
أدركنا العلماء في جميع الأمصار - حجازًا وعراقا وشامًا ويَمَنًا - فكان من مذهبهم:
وأنَّ اللهَ عَزَّ وجلَّ عَلَى عَرْشِهِ بَائِنٌ مِنْ خَلْقِهِ كَما وصف نفسه في كتابه وعلى لسان رسوله صلى الله عليه وسلم بلا كيف، أحاط بكل شيء علما لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ [الشورى: ١١]).
আমি আবু হাতিম রাযী ও আবু যুর'আ রাযী রাহিমাহুমাল্লাহ'র কাছে দীনের মৌলিক বিষয়ে আহলে সুন্নাহ'র মানহাজ সম্পর্কে জানতে চাই এবং এও জানতে চাই যে, তারা উভয়ে সকল এলাকার আলেমদের কী আকীদায় পেয়েছেন এবং উভয়ে কী আকীদাহ পোষণ করেন?
উভয়েই বলেন, আমরা হিজায, ইরাক, মিসর, শাম, ইয়ামানসহ সকল এলাকার আলেমদের পেয়েছি এ মতের ওপর যে, আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপরে রয়েছেন, তিনি তাঁর সৃষ্টি থেকে আলাদা। যেমনটি স্বয়ং আল্লাহ নিজের ক্ষেত্রে বর্ণনা দিয়েছেন। কোনো ধরন নির্ধারণ ও জানা ছাড়াই। তিনি সকল কিছুকে জ্ঞানের মাধ্যমে বেষ্টন করে আছেন। (৯৮০)
১৭-ইমাম আবু 'উমার আত-ত্বালামাঙ্কী রাহিমাহুল্লাহ তাঁর 'আল-উসূল ইলা মা'রিফাতিল উসূল' যা দু খণ্ডে সমাপ্ত তাতে বলেন,
أجمع المسلمون من أهل السنة على أن معنى قولِهِ : وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ [الحديد: ٤]، ونحو ذلكَ مِنَ القرآنِ أَنَّهُ عِلْمُهُ، وأنَّ اللهَ تعالى فوقَ السَّماواتِ بِذَاتِهِ، مستو على عَرْشِهِ كَيْفَ شَاءَ.
وقال أهل السُّنَّةِ في قولِهِ : الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى [ طه : ٥]: إِنَّ الاستواء مِنَ الله عَلى عَرْشِهِ على الحَقِيقَةِ لا على المجاز».
"মুসলিমগণের মধ্যে আহলুস সুন্নাত এ ব্যাপারে ঐকমত্য করেছেন যে, আল্লাহর বাণী 'তিনি তোমাদের সাথে আছেন যেখানেই তোমরা থাক না কেন' [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ০৪], ও অনরূপ কুরআনের আয়াতগুলোর অর্থ, আল্লাহর ইলম বা জ্ঞান। তারা আরও একমত হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা সত্তাগতভাবে আসমানের উপরে, তাঁর 'আরশের উপর উঠেছেন, যেমনটি তিনি চেয়েছেন। আর আহলুস সুন্নাহ বলেন, মহান আল্লাহর বাণী, 'রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫] আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর আরশের উপর উঠা বাস্তব অর্থেই, কোনো রুপক অর্থে নয়”। (৯৮১)
১৮-ইমাম আবু বকর মুহাম্মাদ ইবন মাওহাব আল-মালেকী তার শারহু রিসালাতু ইবন আবী
যাইদ আল-ক্বাইরোয়ানীতে বলেন,
«أَمَّا قوله: (إِنَّهُ فَوْقَ عَرْشِهِ الْمَجِيدِ بِذَاتِهِ) فمعنى (فَوْقَ) و (على) عند جميع العرب واحد. وفي الكتاب والسنة تصديق ذلكَ، وَهُوَ قوله تَعَالَى : ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ [الأعراف: ٥٤]، وقال: الرَّحْمَانُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى [طه: ٥] , وقال : يَخَافُونَ رَبَّهُمْ مِنْ فَوْقِهِمْ [النحل : ٥٠].
وقد تأتي لفظة (في) في لغة العرب بمعنى فوق، كقولهِ تَعَالَى: فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا [الملك: ١٥] و فِي جُذُوعِ النَّخْلِ [طه: ۷۱] و أَأَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ [الملك: ١٦]. قَالَ أهل التأويل: يريدُ فوقهَا، وَهُوَ قول مالك ما فهمه عمَّنْ أدركَ مِنَ التَّابِعِينَ ممَّا فَهِمُوهُ عَنِ الصَّحابة، مما فهموهُ عَنِ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم أنَّ اللهَ في السَّماءِ، يعني فَوْقَهَا وَعَلَيْهَا، فلذلكَ قَالَ الشيخ أبو محمد: (إِنَّهُ فَوْقَ عَرْشِهِ) ثُمَّ بَيَّنَ أَنَّ عُلُوهُ فَوْقَ عَرشِهِ إِنَّمَا هُوَ بذاتهِ لأَنه تَعَالَى بائن عن جميع خلقه بلا كيف، وَهُوَ فِي كُلِّ مكانٍ بِعِلْمِهِ لَا بِذَاتِهِ، إِذْ لا تحويه الأماكن، لأنه أعظم منها».
"ইমাম ইবন আবী যায়েদ আল-ক্বাইরোয়ানীর কথা 'নিশ্চয় তিনি তাঁর সম্মানিত 'আরশের উপর সত্তাগতভাবে রয়েছেন' এখানে 'ফাওকা' (উপরে) ও 'আলা' (উপরে) সকল আরবদের নিকট একই। আর কুরআন ও সুন্নায় সেটার সত্যায়ন রয়েছে, আর তা হচ্ছে, আল্লাহর বাণী, (তারপর তিনি আরশের উপর উঠলেন) [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৫৪], (রহমান আরশের উপর উঠলেন) [ত্বা-হা, আয়াত: ৫], (তারা তাদের রবকে ভয় পায়, উপর থেকে) [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৫০] 'ফী' শব্দটি আরবী ভাষাতে কখনও কখনও 'উপরে' শব্দের অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন আল্লাহর বাণী, (সুতরাং তোমরা যমীনের ঘাড়ের উপর বিচরণ কর) [সূরা আল-মুলক, আয়াত: ১৫], (খেজুর গাছের উপরে), [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ৭১], (যিনি আসমানের উপর রয়েছেন তার ব্যাপারে কি তোমরা ভয়হীন হয়ে গেছ?), ব্যাখ্যাকারগণ বলেন, অর্থাৎ তার উপরে। আর এটাই ইমাম মালেক যেসব তাবে'য়ী পেয়েছেন তাদের কাছ থেকে বুঝে বলেছেন, সেসব তাবে'য়ীও যেসব সাহাবীকে পেয়েছেন তাদের থেকে বুঝে বলেছেন, আর সাহাবীগণও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে পেয়েছেন যে, 'আন্নাল্লাহা ফিস-সামায়ি' অর্থ 'আল্লাহ আলাস সামায়ি বা আল্লাহ আসমানের উপরে, আসমানের ঊর্ধ্বে। আর এজন্যই শাইখ আবু মুহাম্মাদ বলেন, 'নিশ্চয় তিনি তাঁর 'আরশের উপরে' তারপর তিনি বর্ণনা করলেন যে, তাঁর আরশের উপরে থাকা এটা কেবল সত্তাগতভাবে। কারণ তিনি তাঁর সকল সৃষ্টি থেকে আলাদা, কোনো প্রকার ধরন নির্ধারণ ছাড়াই। তিনি সকল স্থানেই তাঁর ইলম বা জ্ঞানের মাধ্যমে, সত্তাগতভাবে নন। কারণ কোনো স্থান তাকে পরিবেষ্টন করতে পারে না, কারণ তিনি তা থেকে অনেক বড়”। (৯৮২)
১৯-ইমাম আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবন 'আম্মার আস-সিজিস্তানী তার 'রেসালাহ'তে বলেন, لا نقول كما قال الجهمية، إنه مداخل للأمكنة، وممازج لكل شيء ولا نعلم أين هو، بل هو بذاته على العرش
৫৪১ দশম অধ্যায় وَعِلْمُهُ مُحِيطٌ بِكُلِّ شَيْءٍ، وَعِلْمُهُ، وَسَمْعُهُ، وَبَصَرُهُ، وَقُدْرَتُهُ، مُدْرِكَةً لِكُلِّ شَيْءٍ، وَهُوَ مَعْنَى قَوْلِهِ وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ ، وهو بذاته على عرشه كما قال سبحانه و كما قال رسوله
আমরা জাহমিয়্যাদের মতো বলবো না যে, আল্লাহ জায়গাসমূহে প্রবেশ করেছেন, বস্তুর সাথে মিশে গেছেন এবং তিনি কোথায় তাও জানি না।
বরং তিনি সত্তাগতভাবে 'আরশের উপরে এবং তাঁর ইলম সকল কিছুকে বেষ্টন করে আছে। তাঁর ইলম, তাঁর শ্রবণ, তাঁর দর্শন এবং তাঁর ক্ষমতা সকল কিছুকে আয়ত্তে রেখেছে। সে অর্থে আল্লাহর বাণী: "তিনি তো তোমাদের সঙ্গেই আছেন তোমরা যেখানেই থাকো না কেন।” তিনি তাঁর সত্তাগতভাবে তাঁর 'আরশের উপরে, যেমনটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেছেন এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন। (৯৮৩) ২০- ইমাম আবু 'আমর আদ-দানী তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আর-রিসালাতুল ওয়াফিয়াতে বলেন,
فصل: في استواء الله على عرشه وعلوه على خلقه ومن قولهم: أنه سبحانه فوق سماواته، مستو على عرشه، ومسئول على جميع خلقه، وبائن منهم بذاته، غير بائن بعلمه، بل علمه محيط بهم، يعلم سرهم وجهرهم، ويعلم ما يكسبون على ما ورد به خبره الصادق، وكتابه الناطق، فقال تعالى: الرحمن على العرش استوى واستواؤه عز وجل: علوه بغير كيفية، ولا تحديد.
“অধ্যায়: আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপরে উঠা এবং তাঁর সৃষ্টির উপর থাকা প্রসঙ্গে
আর আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের কথা হচ্ছে, নিশ্চয় মহান আল্লাহ তাঁর সকল আসমানের উপরে, তাঁর 'আরশের উপরে সমুন্নত। সকল সৃষ্টির উপর কর্তৃত্ববান, তাঁর সত্তাগতভাবে তাদের সকলের থেকে আলাদা, তবে তাঁর জ্ঞানে তাদের থেকে পৃথক নন। বরং তাঁর জ্ঞান সৃষ্টির সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছে, তিনি তাদের গোপন ও প্রকাশ্য সবই জানেন, জানেন তারা কী অর্জন করবে, যেমনটি তাঁর পক্ষ থেকে সত্য সংবাদে এসেছে এবং তাঁর বিবৃতি প্রদানকারী কিতাব বলেছে, তিনি বলেছেন, রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন। আর তার 'ইস্তেওয়া' হচ্ছে উপরে থাকা, কোনো প্রকার ধরন নির্ধারণ ছাড়া ও সীমা নির্ধারণ ছাড়া।” (৯৮৪)
বরং কোনো ইমাম 'সত্তাগতভাবে' বা 'স্বয়ং' এ কথা বলার ব্যাপারে সালাফে সালেহীন ইমামগণের ইজমা' বর্ণনা করেছেন। আশ্চর্য হতে হয় এ বিষয়ে যে, সালাফে সালেহীন থেকে তা ব্যাপকভাবে সাব্যস্ত হওয়ার পরও ইবনুল জাওযীর মত লোক বলতে পারে, 'সালাফরা সত্তাগতভাবে 'আরশের উপর উঠেছে তা বলেননি'। (৯৮৫)
সালাফে সালেহীন ইমামগণের এসব সুস্পষ্ট বিখ্যাত বর্ণনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, তাঁরা আল্লাহ তা'আলার ক্ষেত্রে 'ইস্তেওয়া' শব্দটির অর্থ ভালো করেই জানতেন, তবে তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই 'সত্তাগতভাবে' বা 'স্বয়ং' বা সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা' এগুলো বাড়িয়ে বলতেন মূল অর্থ 'আরশের উপর উঠাকে তাকীদ দেয়ার জন্য। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, জাহমিয়া সম্প্রদায়, যারা আল্লাহ তা'আলাকে 'আরশের উপর স্বীকার না করে সব জায়গায় বলছিল, তাদের প্রতিবাদ করা। যদিও এ শব্দগুলো কুরআন ও হাদীসের শব্দ নয়। কিন্তু প্রয়োজন তাদেরকে তা বলতে বাধ্য করেছে; যাতে করে কেউ আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপরে উঠা এবং সেখানে থাকার বিষয়টি অস্বীকার না করতে পারে।
বিষয়টি যেহেতু সালাফে সালেহীন ইমামগণের মত, তাই আমরা দেখতে পাই আশ'আরী-মাতুরিদীদের কেউ কেউ এটা বলাকেই তাশবীহ, তাজসীম বলতে আরম্ভ করেছে। অথচ এটা সালাফদের থেকে বর্ণিত। (৯৮৬)
তবে তাদের অস্বীকার করা দ্বারা এটা সাব্যস্ত হলো যে, তারা সালাফদেরকে এসব শব্দ ব্যবহার করতে দেখে তার বিরুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে; কারণ তাদের অন্তর আল্লাহ তা'আলার গুণ সাব্যস্ত করার মত জ্ঞানী হতে পারেনি। তাছাড়া আরও একটি বিষয় সাব্যস্ত হলো যে, সালাফে সালেহীন কখনও এসব গুণকে অর্থশূন্য করতেন না, যেটাকে তারা তাফওয়ীদ্ব নামকরণ করে থাকে। তবে আহলুস সুন্নাতের কোনো কোনো ইমাম এ শব্দগুলো ব্যবহার করতে আগ্রহ দেখাননি এমনটি দেখা যায়, তাদের উদ্দেশ্য ছিল এটা যেহেতু হাদীসে আসেনি সেহেতু ব্যবহার না করা। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য কখনও আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠা বা থাকাকে অস্বীকার করা নয়। কারণ তারা এ গুণ সাব্যস্ত করার জন্য আলাদা আলাদা গ্রন্থও রচনা করেছেন।
তিন. সালাফে সালেহীন আল্লাহ তা'আলার জন্য 'হদ্দ' বা 'সীমা' সাব্যস্ত করা হবে কি না, তা নিয়ে বক্তব্য রেখেছেন।
বিষয়টি অনেক সূক্ষ্ম হওয়ায় অনেকে হয়ত ধারণ করতে পারবে না। তাছাড়া কুরআন ও সুন্নায় সরাসরি 'হদ্দ' বা সীমা শব্দটি সাব্যস্ত করা হয়নি। কিন্তু আমরা বেশ কিছু সালাফে সালেহীনকে তা সাব্যস্ত করতে দেখি। আবার অপর কিছু সালাফকে তা সাব্যস্ত করতে নিষেধ করতে দেখি।
যারা সাব্যস্ত করেননি, তারা কুরআন ও সুন্নায় না আসার কারণে সেটা বলেননি। তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, ইমাম আবু হানীফা, ইমাম আবু নাসর আস-সাজযী ও এক বর্ণনায় ইমাম আহমাদ। কিন্তু তারা সবাই আল্লাহ তা'আলাকে 'আরশের উপর বিশ্বাস করতেন। যার প্রমাণ আমরা ইমাম যাহাবীর 'উলু, 'আরশ, আরবা'ঈন, ইবনুল কাইয়্যেমের ইজতিমা'উল জুয়ূশ, ইমাম ইবন আব্দুল হাদীর আল-কালাম আলা মাসআলাতিল ইস্তেওয়া গ্রন্থে পাই।
কিন্তু যারা সাব্যস্ত করেছেন, তারা একটি বিপরীতমূখী ঝড়ের কারণে সেটা বলতে বাধ্য হয়েছিলেন। তারা যখন দেখলেন, জাহমিয়ারা 'হদ্দ' নির্ধারণ না করার দোহাই দিয়ে আল্লাহর 'আরশের উপর থাকা, 'আরশের উপর উঠা অস্বীকার করে বসেছে, তখন তারা 'হদ্দ' সাব্যস্ত করে হলেও আল্লাহর 'আরশের উপর উঠা ও 'আরশের উপর অবস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত ৯৮৬. ঈদাহুদ দলীল, পৃ. ১০৭; দাফ'উ শুবাহি মান তামাররাদা পৃ. ১৯, ৩২।
করেন। সুতরাং সালাফদের মধ্যে যারা হদ্দ সাব্যস্ত করেছেন তাদের অন্যতম হচ্ছেন, ১- আমীরুল মুমিনীন, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক। ২- আব্দুল্লাহ ইবনুয যুবাইর আল-হুমাইদী। ৩- ইমাম সা'ঈদ ইবন মানসূর। ৪- ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল। ৫- ইমাম ইসহাক্ক ইবন রাহওয়াইহ। ৬- হারব ইবন ইসমাঈল আল-কিরমানী। ৭- উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী। ৮- আব্দুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদসহ আরও অনেকে। (৯৮৭)
সালাফদের এ বিপরীতমুখী বস্তুত কোনো বাস্তব মতভেদ নয়। এটা ছিল হদ্দ শব্দ দ্বারা কী উদ্দেশ্য নেওয়া হবে সেটার উপর নিভর্রশীল। কারণ শব্দটির দুটি অর্থ হতে পারে, যদি হদ্দ দ্বারা উদ্দেশ্য হয়, আল্লাহ তা'আলাকে কোনোভাবে পরিবেষ্টন করা জ্ঞানে কিংবা ধারণে, তাহলে তা অবশ্যই বাতিল কথা, যা সবার নিকটেই বাদ দিতে হবে। আর যদি হদ্দ দ্বারা উদ্দেশ্য হয়, কোনো কিছুকে অপর কিছু থেকে পৃথক করা, তাহলে তা অবশ্য সাব্যস্ত করতে হবে, আর সালাফগণের মধ্যে এ ব্যাপারে কোনো ভিন্ন মত ছিল না। (৯৮৮)
এভাবে সালাফে সালেহীন 'হদ্দ' সাব্যস্ত করা বা না করা নিয়ে যে বিতর্কে প্রবৃত্ত হয়েছিল তা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সালাফগণ কখনও আল্লাহ তা'আলার গুণসমূহকে তাফওয়ীদ্ব নামীয় অর্থশূন্য করার মতো ঘৃণিত কুফুরী কাজটি করতেন না।
আরও যে জিনিসটি প্রমাণ করবে যে, 'হদ্দ সাব্যস্ত করা' বা না করার বিষয়টি 'তাফওয়ীদ্ব নামীয় জাহমিয়াদের বাহনকে অস্বীকার করছে, আশায়েরা মতবাদের কেউ কেউ (যেমন ইমাম বাইহাক্বী) সালাফদের ব্যবহার করা 'হদ্দ' শব্দটির অপব্যাখ্যাও করেছে। (১৯৮৯) আর তারা তখনই সেটাকে অপব্যাখ্যা করেছিল যখন তারা স্পষ্ট সিফাত তথা আল্লাহর 'ইস্তেওয়া' গুণটির ব্যাপারে সালাফদেরকে তা সাব্যস্ত করতে দেখতে পেয়েছে। সুতরাং সালাফগণ তাফওয়ীদ্ব করেনি এটা আশা'য়েরাদের কথা ও কর্ম দ্বারাই সাব্যস্ত হয়ে গেল।
চার. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে 'আরশের উপর বসানো সংক্রান্ত বর্ণনার ব্যাপারে সালাফে সালেহীনের অবস্থান:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর সাথে আরশের উপর বসাবেন, এটি মূলত কুরআনে কারীমের আয়াত, عسى أن يبعثك ربك مقاماً محموداً এর ব্যাখ্যায় ইমাম মুজাহিদ ইবন জাবর বর্ণনা করেছেন। বর্ণনাটি মুজাহিদ ইবন জাবার রাহিমাহুল্লাহ থেকে
৯৯০. ইবন আবী শাইবাহ, আল-মুসান্নাফ ১১৬৯৮; আল-আজুররী, আশ-শরী'আহ ১১০১; ১১০২। ৯৯১. ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আররুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকলি ৫/২৩৭; যাহাবী, আল-উলু, ৭১৭।
৫৪৪ দশম অধ্যায় বিশুদ্ধ। (৯৯০)
কিন্তু এ ব্যাপারে বেশ কিছু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তার সবই বানোয়াট বলে মুহাদ্দিসগণ বলেছেন। (৯৯১)
এ ব্যাপারে বিপরীত মেরুতে ছিল জাহমিয়ারা। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য এ ফযীলতকে অস্বীকার করে। তাদের অস্বীকার করার কারণ হাদীস শুদ্ধ বা অশুদ্ধ হওয়া নয়। বরং তারা অস্বীকার করেছিল এজন্য যে, যদি তা সাব্যস্ত করা হয় তাহলে আল্লাহ তা'আলার জন্য 'আরশের উপর উঠা ও সেখানে থাকা সাব্যস্ত করতে হয়। তাই সালাফে সালেহীন তাদের গ্রন্থে, কবিতার ছন্দে এ আকীদাহ বারবার বর্ণনা করতেন। যাতে করে তা জাহমিয়াদের জন্য গলার কাঁটা হতে পারে। বরং সালাফদের কেউ কেউ এটার বিশ্বাস আছে কিনা তা দিয়ে জাহমিয়াদের চিনতে পারতেন। ইমাম আবু বকর আল-মারওয়াযী এ ব্যাপারে স্বতন্ত্র গ্রন্থও প্রণয়ন করেন।
যেসব আলেম মুজাহিদ ইবন জাবার রাহimhimullahর বক্তব্যকে সমর্থন করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন,
১- ইমাম আবু দাউদ, সুনান গ্রন্থকার।
২- আবু বকর ইবন আবী দাউদ।
৩- আব্দুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদ।
৪- ইবরাহীম আল-হারবী।
৫- ইয়াহইয়া ইবন আবী তালেব।
৬- আবু জা'ফার আদ-দাকীকী।
৭- মুহাম্মাদ ইবন ইসমা'ঈল আস-সুলামী আত-তিরমিযী।
৮- আব্বাস ইবন মুহাম্মাদ আদ-দূরী।
৯- মুহাম্মাদ ইবন বিশর ইবন শারীক ইবন আব্দুল্লাহ নাখা'য়ী। [যাহাবী, আল-আরশ ২১৮]
১০-আবু ক্বিলাবাহ আব্দুল মালিক ইবন মুহাম্মাদ আর-রাক্কাশী।
১১- আবু বকর ইবন হাম্মাদ আল-মুকরী।
১২-আলী ইবন দাউদ আল-ক্বানত্বারী।
১৩-মুহাম্মাদ ইবন ইমরান আল-ফারেসী আয-যাহিদ।
১৪- ইসমাঈল ইবন ইবরাহীম আল-হাশেমী।
১৫-মুহাম্মাদ ইবন ইউনুস আল-বসরী।
১৬-আহমাদ ইবন আসরাম আল-মুযানী।
১৭- মুহাম্মাদ ইবন আলী।
৯৯২. যাহাবী, আল-আরশ ২৬৫।
৯৯৩. 'ঈযাহুদ্দলীল পৃ. ২৭৮।
৯৯৪. ইবন ফুওরাক, তা'ওয়ীলে মুশকিলুল হাদীস পৃ. ৩৩৯।
১৮-আবু বকর ইবন সাদাক্কাহ।
১৯-আলী ইবন সাহাল।
২০-মুহাম্মাদ ইবন ইউনুস আল-বসরী।
২১- হাসান ইবনুল ফাদ্বল।
২২-হারুন ইবনুল আব্বাস আল-হাশেমী।
২৩-আবু আব্দুল্লাহ ইবন আব্দুন নূর।
২৪-ইবরাহীম আল-আসবাহানী।
এ ব্যাপারে একই মত পোষণকারীদের অন্যতম আরো রয়েছেন,
২৫-ইসহাক্ব ইবন রাহওয়িয়াহ।
২৬-আবু উবাইদ আল-ক্বাসেম ইবন সাল্লাম।
২৭-মুহাম্মাদ ইবন মুসআব আল-আবেদ।
২৮-বিশর আল-হাফী।
২৯-হারুন ইবন মারুফ।
তাছাড়া আরও অনেক সালাফে সালেহীনের অনুসারী আলেম। (৯৯২)
এখানে আমি বিষয়টি সাব্যস্ত কিংবা অসাব্যস্ত করছি না। শুধু উদ্দেশ্য এটাই প্রমাণ করা যে, সালাফে সালেহীন 'ইস্তেওয়া' এর অর্থ সাব্যস্ত করতেন। তারা তাফওয়ীদ্ব নামীয় 'জাহমিয়াদের গাধা' দিয়ে আল্লাহ তা'আলার গুণকে অর্থশূন্য, চিন্তাশূন্য, আলোচনাশূন্য করার মতো কাজ করেননি।
কারণ সালাফগণ বুঝেছিলেন এটা সাব্যস্ত হলে আল্লাহ তা'আলা যে তাঁর 'আরশের উপর উঠেছেন, তিনি যে তাঁর আরশের উপর রয়েছেন সেটা সাব্যস্ত করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। এখানে আরও একটি জিনিস প্রণিধানযোগ্য, তা হচ্ছে কোনো কোনো আশ'আরী মতবাদের আলেম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তা'আলার সাথে 'আরশে বসানোর বিরুদ্ধে বলেছেন এ যুক্তিতে যে, এর দ্বারা তাশবীহ কিংবা তাজসীম হয়। (৯৯০) তাদের বড় নেতা ইবন ফুওরাক রাহimhimullah তো স্পষ্ট বলে দিয়েছেন যে, মুজাহিদ রাহimhimullah থেকে যে ভাষ্যটি বর্ণিত হয়েছে তা তিনি নিতে পারছেন না। এটাকে অপব্যাখ্যা করে সাহায্য ও সহযোগিতার অর্থে নিতে হবে। (৯৯৪)
এভাবেই আশায়েরা-মাতুরিদিয়ারা স্বীকার করে নিল যে, সালাফে সালেহীন আল্লাহ তা'আলার ইস্তেওয়া গুণ নিয়ে চুপ থাকেননি, অর্থশূণ্য বলেননি। বরং সালাফগণ স্পষ্ট প্রকাশ্য শব্দ দিয়ে এগুলোর অর্থ করেছেন, যা তাদেরকে অপব্যাখ্যা করতে বাধ্য করেছে।
এখানে একটি দৃষ্টি আকর্ষণী দেয়া দরকার যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর আরশের উপর বসানোর বিষয়টি কোনো কোনো আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের ইমামও অস্বীকার করেছেন। তবে তাদের অস্বীকার এজন্য নয় যে, এর দ্বারা তাশবীহ কিংবা তাজসীম হয়, বরং এজন্য যে, তাদের নিকট হাদীসগুলো সাব্যস্ত হয়নি। অনুরূপভাবে মুজাহিদ রাহimhimullah'র ভাষ্যও তাদের কাছে সহীহ সনদে পৌঁছেনি অথবা মাকামে মাহমুদের ব্যাখ্যায় তার চেয়েও বিশুদ্ধ হাদীস এসেছে। (৯৯৫)
আর আমাদের উদ্দেশ্য এটা সাব্যস্ত করা কিংবা বাতিল করাও নয়। বরং উদ্দেশ্য 'তাফওয়ীদ্ব' নামক মিথ্যাচার থেকে সালাফে সালেহীনের আঁচলকে পবিত্র ঘোষণা করা।
সুতরাং উপরোক্ত চারটি অস্ত্রের মাধ্যমে আমরা তাফওয়ীদ্ব নামীয় জন্তুটিকে ধরাশায়ী করতে সক্ষম হলাম আলহামদুলিল্লাহ। এর মাধ্যমে এটাই প্রমাণিত হলো যে, ১- সালাফে সালেহীন আল্লাহ তা'আলার সকল গুণের অর্থ করতেন। ২- অর্থ নিয়ে সেটা দিয়ে আহকাম সাব্যস্ত করতেন। ৩- সালাফে সালেহীন আশায়েরা ও মাতুরিদিয়াদের চেয়ে কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্য বেশি বুঝতেন। ৪- সালাফে সালেহীন কখনো 'ইস্তেওয়া' এর অর্থ নিয়ে নীরব থাকেনি। ৫- সালাফে সালেহীন কখনো 'ইস্তেওয়া' এর অর্থ নিয়ে নির্লিপ্ততা দেখাননি। ৬- সালাফে সালেহীন কখনো 'ইস্তেওয়া' এর অর্থ বুঝে আসে না তা বলেননি। ৭- সালাফে সালেহীন কখনো 'ইস্তেওয়া' এর অর্থ করলে আল্লাহ তা'আলার জন্য দেহ সাব্যস্ত হয় তা বলেননি। ৮- সালাফে সালেহীন কখনো 'ইস্তেওয়া' শব্দকে মুতাশাবিহ বলেননি। ৯- সালাফে সালেহীন কখনো 'ইস্তেওয়া' শব্দকে ধাঁধাঁ জাতীয় কিছু বলেননি। ১০-সালাফে সালেহীন কখনো 'ইস্তেওয়া' শব্দের অর্থ বুঝার জন্য দীনকে সাধারণ মানুষ আর তথাকথিত বিশেষ মানুষের মধ্যে বিভক্ত করেননি। ১১- সালাফে সালেহীন 'ইস্তেওয়া' শব্দ বুঝার জন্য বহু প্রকার ভাষ্য ব্যবহার করেছেন, যার অনেকগুলো তাদের থেকে সহীহ সনদে সাব্যস্ত। ১২-সালাফে সালেহীন এটাই বিশ্বাস করতেন যে, আল্লাহ তা'আলা সত্তাগতভাবে তাঁর আরশের উপর উঠেছেন। ১৩-সালাফে সালেহীন এটাই বিশ্বাস করতেন যে, আল্লাহ তা'আলা সত্তাগতভাবে তাঁর আরশের উপর রয়েছেন। ১৪- সালাফে সালেহীন এটাই বিশ্বাস করতেন যে, আল্লাহ তা'আলার অন্যান্য গুণও এভাবে যে অর্থটি বাক্যের আগ-পিছ বিবেচনায় এবং অন্যান্য ভাষ্যের আলোকে বুঝা যাবে সেভাবে সাব্যস্ত করা হবে।
১৫-সালাফে সালেহীন বিশ্বাস করতেন যে, 'ইস্তেওয়া' একটি কর্মগত গুণ, যা আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত; এটি শুধু কর্ম নয়।
আশ'আরী-মাতুরিদীদের কি অন্য কোনো উপায় আছে?
উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমাদের কাছে স্পষ্ট হলো যে, ইস্তেওয়া শব্দের অর্থ 'তাফওয়ীত্ব' করা বা অর্থশূন্য করার নীতি কখনও সালাফ তথা সাহাবী, তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীন, আয়িম্মায়ে কুতুবে দীনের মধ্যে প্রচলিত ছিল না। তারা আল্লাহ তা'আলার গুণের ব্যাপারে হ-য-ব-র-ল অবস্থায় ছিলেন না, তারা সম্পূর্ণভাবে এগুলোর অর্থ বুঝতেন। তাই আশা'য়েরা ও মাতুরিদী আলেমগণের জন্য দু'টি অবস্থার যেকোনো একটি গ্রহণের কোনো গত্যন্তর নেই:
এক. আল্লাহ তা'আলার গুণ সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে অর্থের মধ্যে 'তাফওয়ীদ্ব' নীতি থেকে ফিরে আসা এবং সালাফদের নীতি গ্রহণ করা।
দুই. তাদের ভ্রান্ত মতের ওপর থাকা এবং সালাফদেরকে তাদের মতবাদ থেকে মুক্ত বলে ঘোষণা করা। তাদেরকে তাশবীহ, তাজসীম তথা দেহবাদী হওয়ার অপবাদ প্রদান থেকে বিরত থাকা।
আর যদি এখন যেভাবে আছেন সেভাবে থাকতে চান তবে অবশ্যই পরস্পর বিরোধী অসত্য একটি পথেই শুধু বিচরণ করবেন।
আল্লাহর কাছে রাতের এ শেষ প্রহরে দো'আ করি তিনি যেন আমাদেরকে হিদায়াত দেয়ার পর আমাদের অন্তরসমূহকে বক্র করে না দেন। আমীন।
সর্বশেষ আহ্বান: আসুন আমরা একটু চিন্তা করি,
১- কেন আমরা কুরআনে কারীম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস, সাহাবায়ে কিরাম, তাবে'য়ীনে 'ইযাম, আয়িম্মায়ে কিরামের বিরোধিতা করব?
২- কেন আমরা সাহাবায়ে কিরামকে আমাদের কথা দ্বারা কষ্ট দিব? যদি 'তাফওয়ীদ্ব' নীতি মানতে হয় তো সাহাবায়ে কেরামের চেয়ে পরবর্তীদেরকে বড় আলেম সাব্যস্ত করতে হয়। এমন নিকৃষ্টতম কাজটি আমরা কেন করব?
২- কেন আমরা আমাদের সালাফদের মত ছেড়ে দিয়ে এ মিথ্যা 'তাফওয়ীদ্ব' আশ্রয় নিয়ে আল্লাহ তা'আলার গুণকে অর্থশূন্য করে জাহমিয়াদের বাহনে সাওয়ার হব?
৩- কেন আমরা আমাদের হিদায়াতের ইমাম, আবু হানীফা, মালেক, শাফেয়ী, আহমদ ইবন হাম্বলের মতো লোকদের পদাঙ্ক অনুসরণ করব না?
৪- কেন আমরা বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসায়ী ও ইবন মাজাহ এর মতো ইমামগণের কথা বাদ দিয়ে, তাদের দিকনির্দেশনা না শুনে তথাকথিত গ্রীক দর্শনের অনুসারীদের বিবেকীয় সন্দেহের অনুসরণ করবো?
৫- কেন আমরা ইমামগণের স্পষ্ট বক্তব্য ছেড়ে মিথ্যা বা অস্পষ্ট দু'একটি বক্তব্যের পিছনে
দৌড়াব? হিদায়াতের পথ কি স্পষ্ট নয়?
৬- কেন আমরা সবসময় হিদায়াতের রাজপথ ছেড়ে পথভ্রষ্টতার চোরাগলিতে বিচরণ করব? যেখানে অহরহ আমাদের ঈমান বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আসুন! আমরা 'তাফওয়ীদ্ব' নামক সালাফের ওপর দিয়ে চালিয়ে দেয়া মিথ্যাচারকে চিরদিনের জন্য ত্যাগ করি।
আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর হিদায়াতের পথে পরিচালিত করুন, যে পথটি সোজা জান্নাতে চলে গেছে সে পথের পথিক বানান। আমীন।