📄 আল্লাহ তা‘আলার নিকটতম আসমানে নেমে আসা তাঁর একটি মহৎ গুণ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহীহ হাদীসে তিনটি শব্দ এসেছে যার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার নিকটতম আসমানে নেমে আসার বিষয়টি প্রমাণিত। সে শব্দগুলো হচ্ছে, ১- আন-নুযূল। ২- আল-হুবুত্ব। ৩- আত-তাদাল্লী।
এগুলো আল্লাহ কর্তৃক জানিয়ে দেয়া তাঁর কিছু কর্মগত গুণ। সহীহ হাদীসে আমরা তার প্রমাণ পাই। ইমাম দারাকুতনী তাঁর আন-নুযূল গ্রন্থে আঠারো জন সাহাবী থেকে তা বর্ণনা করেছেন। তন্মধ্যে কয়েকটি বর্ণনা হচ্ছে, ১- অবতরণ সংক্রান্ত বিখ্যাত হাদীসে এসেছে, عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ : أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ يَقُولُ : مَنْ يَدْعُونِي، فَأَسْتَجِيبَ لَهُ مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ، مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ "আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমাদের মহান ও কল্যাণপূর্ণ রব প্রতি রাতে নিকটতম আসমানে নেমে আসেন, যখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে, তিনি বলতে থাকেন, কে আমাকে ডাকবে, ফলে আমি তার ডাকে সাড়া দিব? কে আমার কাছে চাইবে, ফলে আমি তাকে প্রদান করব? কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে ফলে আমি তাকে ক্ষমা করব?” (৮৯৩)
২- অপর হাদীসে এসেছে, আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: لَوْلا أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي، لَأَمَرْتُهُمْ بِالسَّوَاكِ عِنْدَ كُلِّ صَلاةِ، وَلَأَخَّرْتُ عِشَاءَ الْآخِرَةِ إِلَى ثُلُثِ اللَّيْلِ الْأَوَّلِ، فَإِنَّهُ إِذَا مَضَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الْأَوَّلُ هَبَطَ اللَّهُ تَعَالَى إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا، فَلَمْ يَزَلْ هُنَاكَ حَتَّى يَطْلُعَ الْفَجْرُ، فَيَقُولَ قَائِلٌ : أَلا سَائِلٌ يُعْطَى، أَلا دَاعِ يُجَابُ، أَلا سَقِيمٌ يَسْتَشْفِي فَيُشْفَى، أَلَا مُذْنِبٌ يَسْتَغْفِرُ فَيُغْفَرَ لَهُ؟» "যদি আমার উম্মতের ওপর কষ্টকর না হতো তবে আমি তাদেরকে প্রতি সালাতের সময় মিসওয়াক করতে নির্দেশ দিতাম আর ইশার সালাতকে রাতের প্রথম এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত দেরীতে নিয়ে যেতাম; কারণ যখন রাতের প্রথম এক-তৃতীয়াংশ পার হয়ে যায় তখন আল্লাহ
তা'আলা নিকটতম আসমানে নেমে আসেন, সুবহে সাদিক উদিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি সেখানে থাকেন, তিনি বলতে থাকেন, কোনে যাচঞাকারী কি আছে, যাকে আমি প্রদান করব? কোনো আহ্বানকারী কি আছে, যার ডাকে আমি সাড়া দিব? কোনো রোগী কি রোগ মুক্তি কামনা করার আছে, যাকে আমি রোগমুক্ত করব? কোনো গুনাহগার কি ক্ষমাপ্রার্থনা করার আছে, যাকে আমি ক্ষমা করব?”(৮৯৪)
অনুরূপ ইবন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, إِذَا كَانَ ثُلُثُ اللَّيْلِ الْبَاقِي، يَهْبِطُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا ، ثُمَّ تُفْتَحُ أَبْوَابُ السَّمَاءِ، ثُمَّ يَبْسُطُ يَدَهُ، فَيَقُولُ: هَلْ مِنْ سَائِلٍ يُعْطَى سُؤْلَهُ ؟ فَلَا يَزَالُ كَذَلِكَ، حَتَّى يَطْلُعَ الْفَجْرُ»
"যখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশ আসে, আল্লাহ তা'আলা নেমে আসেন নিকটতম আসমানে, তারপর আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়, তারপর তিনি তাঁর হাত প্রসারিত করেন, বলতে থাকেন, এমন কি কোনো যাচজ্ঞাকারী আছে, যাকে আমি তার প্রার্থিত জিনিস দিব? এভাবে তিনি বলতে থাকেন, যতক্ষণ না সুবহে সাদিক উদিত হচ্ছে।”(৮৯৫)
৩- আর ইসরা ও মি'রাজের হাদীসে এসেছে, আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ... حتى جاء سدرة المنتهى ودنا الجبار ربُّ العِزَّةِ فَتَدَلَّى حتى كان منه قاب قوسين أو أدنى ... ».
"... অতঃপর রাসূল সিদরাতুল মুস্তাহায় আসলেন, জাব্বার রব্বুল ইয্যত তখন নেমে আসলেন এমনকি তিনি রাসূলের থেকে দু' দণ্ড দূরত্বে অথবা তার থেকেও নিকটে হলেন.......।”(৮৯৬)
এ হাদীসগুলো থেকে স্পষ্টভাবে সাব্যস্ত হলো যে, রাব্বুল আলামীন আল্লাহ তা'আলা রাতের বেলায় নিকটতম আসমানে নেমে আসেন।
তাছাড়া এ বিষয়টির ঈমানের ব্যাপারে সালাফে সালেহীনের ইজমা' বা ঐকমত্য বর্ণনা করেছেন যথাক্রমে ইবন আবদুল বার (৮৯৭), আবু আমর আত-ত্বালামাঙ্কী (৮৯৮), ইবন তাইমিয়্যাহ (৮১১), ইবন আবদুল হাদী(৯০০), ইমাম যাহাবী (৯০১) ও ইবনুল কাইয়্যেমসহ প্রমুখ।
📄 আল্লাহ তা‘আলার নিকটতম আসমানে নেমে আসার ব্যাপারে সালাফে সালেহীনের আকীদাহ-বিশ্বাস
ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আল্লাহর রয়েছে নাম ও গুণাবলি, যার বর্ণনা কুরআনে কারীমে এসেছে, অনুরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে তার সংবাদ দিয়েছেন।... তিনি প্রতি রাতে নিকটতম আসমানে নেমে আসেন, এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রদত্ত সংবাদ। (৯০২)
ইমাম আবু সা'ঈদ উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী বলেন, এসব হাদীস যাতে আল্লাহ তা'আলার নিকটতম আসমানে অবতরণ করার কথা এসেছে, আমি ফিকহের জ্ঞানে জ্ঞানী, সঠিক জ্ঞানসম্পন্ন আলেমগণকে পেয়েছি তারা এগুলো বিশ্বাস করতেন, এগুলো অস্বীকার করতেন না। এগুলো বর্ণনা করতে পিছপা হতেন না। (৯০৩)
মুহাদ্দিসগণ এই হাদীসকে আল্লাহ তা'আলার সিফাত (গুণ/বিশেষণ) বিষয়ক হাদীস হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। এ প্রসঙ্গে ইমাম তিরমিযী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "... এই হাদীস এবং আরও এই ধরনের যে সমস্ত হাদিসে আল্লাহর সিফাত বা প্রত্যেক রাতে পৃথিবীর নিকটবর্তী আকাশে আল্লাহ তা'আলার অবতরণ সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে। সে সকল হাদীস সম্পর্কে একাধিক বিশেষজ্ঞ আলিমের বক্তব্য হলো যে, এই ধরনের রিওয়ায়াতসমূহ সুপ্রতিষ্ঠিত। এগুলোর ওপর ঈমান রাখতে হবে। এসব বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করা যাবে না এবং তা কী ধরনের সে সম্পর্কেও প্রশ্ন করা যাবে না। ইমাম মালিক ইবন আনাস, সুফিয়ান ইবন 'উয়াইনা, আবদুল্লাহ ইবন মুবারক রাহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখ ইমামদের থেকে এই ধরনের বক্তব্য বর্ণিত আছে। এই ধরনের হাদীসগুলো সম্পর্কে তারা বলেন, "কী ধরনের?” - সে প্রশ্ন না তুলে যেভাবে উল্লেখ হয়েছে সেভাবেই তা মেনে নাও। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আলেমগণ এ অভিমতই পোষণ করেন। কিন্তু জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায় এই সমস্ত রিওয়ায়াত অস্বীকার করে; তারা বলে, এগুলো তা হলো উপমাবোধক।... এটি এমন, যেমন আল্লাহ তা'আলা তাঁর কিতাবে বলেছেন, "কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়; তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১] (৯০৪)
ইমাম ইবন জারীর আত-ত্বাবারী বলেন, “অধ্যায়: স্রষ্টার সেসব গুণের বর্ণনায় যা কুরআন ও হাদীসের সংবাদের মাধ্যমে পাওয়া গেছে, তা যুক্তিতে নয়। "সেটা হচ্ছে, যেমন আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক আমাদের জানানো যে, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা, আর তাঁর রয়েছে, দু'টি হাত, তাঁর বাণীতে তিনি বলেছেন, 'বরং তাঁর দুটি হাত সুপ্রশস্ত'। (৯০৫)
ইমাম ইবন খুযাইমাহ বলেন, “অধ্যায়: সে সকল হাদীস যা সহীহ সনদে সাব্যস্ত হয়েছে, যা হিজায ও ইরাকের আলেমগণ নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আল্লাহ তা'আলার প্রতি রাতে প্রথম আসমানে অবতরণের ব্যাপারে বর্ণনা করেছেন। সেগুলোর ব্যাপারে আমরা
মুখের স্বীকৃতি, অন্তরের সত্যায়নের মাধ্যমে সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এ হাদীসগুলোতে যে সংবাদ আমরা পাই তার সত্যায়ন করি, তবে কোনো প্রকার ধরন নির্ধারণ না করেই। কারণ, আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের স্রষ্টার অবতরণ করার ধরন বর্ণনা করেননি। তিনি আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি অবতরণ করেন। আর মহান আল্লাহ স্বয়ং এবং তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমগণ তাদের দীনের জন্য যা প্রয়োজন হবে তা বর্ণনা করা ছাড়েননি। সুতরাং আমরা এসব হাদীসে আসা অবতরণের কথার স্বীকৃতি দিই, তবে তার ধরন নির্ধারণে কথা না বলি; কারণ নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে সেটার ধরন জানাননি। এ হাদীসগুলোতে এটা স্পষ্ট হলো, প্রমাণিত হলো ও বিশুদ্ধভাবে আসলো যে, মহান আল্লাহ নিকটতম আসমানে অবতরণ করেন, যা আমাদেরকে আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়েছেন। কারণ, আরবী ভাষার অভিধানে কোথাও আসেনি, নিচ থেকে উপরে এসেছে। বরং সকল ভাষার দাবিই হচ্ছে, উপর থেকে নিচে অবতরণ করা হয়।” (৯০৬)
ইমাম আবুল কাসেম আল-লালেকাঈ বলেন, "নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মহান রবের নিকটতম আসমানে অবতরণ করার বিষয়ে যা এসেছে তার আলোচনা, যা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশজন বর্ণনা করেছেন।”(৯০৭)
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আল্লাহ তা'আলার গুণাবলির ব্যাপারে তাই বলা হবে যা তাঁর সত্তার ব্যাপারে বলা হবে। কারণ তাঁর মতো কোনো কিছু নেই, সত্তাতেও নয়, গুণেও নয়, অনুরূপ কর্মেও নয়। সুতরাং যদি তাঁর এমন প্রকৃত সত্তা আপনি সাব্যস্ত করেন যা অন্যান্য সত্তার মতো নয় তাহলে সে সত্তারও রয়েছে বাস্তব গুণাবলি যা অন্য কারও গুণাবলির অনুরূপ নয়।... তারপর যদি আপনাকে প্রশ্ন করে, আমাদের রব নিকটতম আসমানে কীভাবে অবতরণ করেন? তাকে বলা হবে, তিনি কেমন? যদি বলে, তাঁর সত্তার ধরন তো জানি না। তখন তাকে বলা হবে, আমরাও তাঁর ধরণ জানি না। কারণ, গুণ জানার বিষয়টি নির্ভর করবে গুণান্বিত সত্তাকে জানার ওপর, যা তারই শাখা ও অনুগামী বিষয়। সুতরাং আপনি আমাকে কীভাবে তাঁর শোনা, দেখা, কথা বলার ধরণ জিজ্ঞেস করেন যেখানে আপনি তাঁর সত্তার ধরন সম্পর্কেই জানেন না। (৯০৮)
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহimhimullah বলেন, তিনি সেটা ইমাম কারজী থেকে বর্ণনা করে সেটার পক্ষে কথা বলছেন, "ইমাম আবু হানীফা রাহimhimullah'র ছাত্র ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান থেকে বর্ণিত, তিনি সেসব হাদীস যাতে এসেছে যে, আল্লাহ তা'আলা নিকটতম আসমানে নেমে আসেন, এ জাতীয় হাদীসসমূহ যা নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিবর্গ বর্ণনা করেছেন, সেগুলো আমরাও বর্ণনা করব, সেগুলোতে যা বলা হয়েছে তার ওপর ঈমান রাখব, সেগুলোর ব্যাখ্যা দাঁড় করাব না।” (৯০৯)
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহimhimullah অন্যত্র বলেন, "সুতরাং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা যখন তাঁকে তাঁর রাসূল এ গুণে গুণান্বিত করেছেন যে, প্রতি রাতে আল্লাহ তা'আলা নিকটতম আসমানে নেমে আসেন, আর তিনি 'আরাফার দিন বিকাল বেলা হাজীদের নিকটে হন, আর
তিনি মূসা 'আলাইহিস সালামের সাথে পবিত্র ভূমির ডান উপত্যকা এর গাছ থেকে কথা বলেছেন, আর তিনি আসমানের দিকে উঠলেন যখন তা ধোঁয়া ছিল, তারপর তিনি সেটাকে বললেন, আস স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায়', এসব কর্মকাণ্ড সে রকম জরুরী নয় যা আমরা সাধারণত দৃশ্যমান কোনো কিছুকে নামতে দেখি; যাতে কেউ এটা না বলে যে, তিনি যদি অবতরণ করেন তো সেটার জন্য এক স্থান ছেড়ে আরেক স্থান ব্যস্ত রাখতে হয়।” (৯১০)
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহimhimullah আরও বলেন, "সুন্নাহ ও হাদীসের দিকে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করা কিছু গোষ্ঠী 'আল্লাহ তা'আলার অবতরণ করার হাদীসের তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করে। অনুরূপ তারা কুরআন ও হাদীসের আরও কিছু ভাষ্যকে অপব্যাখ্যা করে থাকে, যাতে আল্লাহ তা'আলার কোনো কর্মগত গুণ সাব্যস্ত করা হয়েছে, আর যেগুলো কেবল তাঁর সাথেই সম্পৃক্ত, যেমন আসা, আগমন করা, নিচে নামা ইত্যাদি।” (৯১১)
অন্য স্থানে তিনি ইমাম ইবন মানদাহ কর্তৃক আনীত আল্লাহ তা'আলার অবতরণের হাদীসগুলো উল্লেখ করার পর, যারা এগুলোর তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করে, তাদের বক্তব্য খণ্ডন করতে গিয়ে বলেন, "এ হচ্ছে আবদুর রহমান ইবন মানদাহ যা উল্লেখ করেছেন তার সংক্ষিপ্তরূপ, যদিও তিনি এ হাদীসের সকল বর্ণনা-রীতিকে একসাথ করতে সমর্থ হয়েছেন, সে হাদীসের শব্দগুলোও জমা করেছেন, যেমন, হাদীস,
ينزل ربنا كل ليلة إلى السماء الدنيا إذا مضى ثلث الليل الأول فيقول: أنا الملك من ذا الذي يسألني فأعطيه، من ذا الذي يدعوني فأستجيب له، من ذا الذي يستغفرني فأغفر له، فلا يزال كذلك إلى الفجر».
"আমাদের রব প্রতি রাতে নিকটতম আসমানে নেমে আসেন, যখন তার প্রথম এক-তৃতীয়াংশ গত হয়, তখন তিনি বলেন, আমিই বাদশাহ, কে এমন আছে যে আমার কাছে চাইবে, ফলে আমি তাকে দিব? কে এমন আছে যে আমাকে ডাকবে, ফলে আমি তার ডাকে সাড়া দিব? কে এমন আছে যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, ফলে আমি তাকে ক্ষমা করব? এভাবেই তিনি বলতে থাকেন যতক্ষণ না সুবহে সাদিক উদিত হয়"।
অপর শব্দে হাদীসটি হচ্ছে إذا بقي من الليل ثلثاه يهبط الرب إلى السماء الدنيا« "যখন রাতের দুই-তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে, তখন রব নিকটতম আসমানে নেমে আসেন।” অপর বর্ণনায় এসেছে, »يقول لا أسأل عن عبادي غيري، من ذا الذي يسألني فأعطيه "আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমার বান্দাদের ব্যাপারে আমি নিজে ছাড়া কেউ জিজ্ঞেস করবে না, কে আছো যে আমার কাছে চাইবে, আর আমি তাকে তা দিব?"
আর 'আমর ইবন 'আবাসার বর্ণনায় এসেছে, أن الرب يتدلى في جوف الليل إلي السماء الدنيا "নিশ্চয় মহান রব নেমে আসেন রাতের মাঝামাঝি সময়ে নিকটতম আসমানে।” (৯১২) তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক প্রথম আসমানে নেমে আসার ব্যাপারে যেসব হাদীস এসেছে তাতে তিন প্রকার শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, ১- النزول - الهبوط - التدلي - এসব শব্দের অর্থ হচ্ছে অবতরণ করা। বিভিন্ন শব্দে একই বিষয়ের বর্ণনা সে বিষয়ের বাস্তবতাকে আরও শক্তিশালী করে। এ ব্যাপারে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ'র একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রয়েছে, যার নাম "শারহু হাদীসিন নুযূল"। বিস্তারিত জানার জন্য তা দেখা যেতে পারে।
📄 আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক নিকটতম আসমানে নেমে আসা তাঁর ‘আরশের উপরে থাকার সাথে সাংঘর্ষিক নয়-
সাহাবায়ে কেরাম, তাবে'য়ীনে 'ইযাম, আয়িম্মায়ে মুজতাহিদীন, ফুকাহা, মুহাদ্দিসীন যুগ যুগ ধরে বিশ্বাস করে এসেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর উঠেছেন, তিনি 'আরশের উপর সমুন্নত। তিনি 'আরশের উপর যেমন সত্য, তেমনি তিনি নিকটতম আসমানে নেমে আসেন এটাও সত্য। এর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।
কিন্তু দেখা যায় যুগ যুগ ধরে কিছু মানুষ আল্লাহ তা'আলার এ গুণটিকে অস্বীকার করে থাকে, তাদের কেউ বলে, স্থান পরিবর্তন আল্লাহর অতুলনীয়ত্বের সাথে সাংঘর্ষিক। কেউ কেউ বলেন, তিনি 'আরশ থেকে অবতরণ করলে 'আরশ কি শূন্য থাকে? তারা সাধারণত দু'ভাগে তা অস্বীকার করে থাকে:
এক. তা'ত্নীল বা অর্থহীন করার মাধ্যমে। এ বিশেষণটিকে প্রাচীনকালে কিছু পথভ্রষ্ট ফির্কা জাহমিয়্যাহ ও মু'তাযিলারা অস্বীকার করতো। এখনো আশায়েরা ও মাতুরিদিয়াদের একটি গোষ্ঠী এটাকে নিজেদের মত হিসেবে ব্যক্ত করে, তবে সরাসরি না বলে এগুলোকে মুতাশাবিহ আয়াত বা হাদীস বলে অর্থ কেবল আল্লাহ জানে, এটা বলে তথাকথিত তাফওয়ীদ্ব নীতি অবলম্বন করে থাকে।
দুই. বিভিন্নভাবে তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যার মাধ্যমে তার মূল স্পষ্ট অর্থকে পরিবর্তন করার মাধ্যমে। এ কাজটি সবচেয়ে বেশি করে পরবর্তী আশায়েরা ও মাতুরিদী সম্প্রদায়ের লোকেরা। (৯১৩) তাদের এসব অপব্যাখ্যার নীতিকে তারা নিম্নোক্তভাবে ব্যক্ত করে:
১- কেউ কেউ বলেন, অবতরণ অর্থ নৈকট্য লাভ করা। (৯১৪)
২- কেউ কেউ বলে, অবতরণ করার অর্থ বিশেষ করুণা। (৯১৫)
৩- কারও কারও মতে, এর অর্থ ফিরিশতা অবতরণ করা। (৯১৬)
৪- কারও কারও মতে, অবতরণ করা অর্থ, তাদের দিকে নজর দেয়া। (৯১৭)
তাদের এসব বক্তব্য সম্পূর্ণরূপে পূর্বে বর্ণিত সহীহ সুন্নাহ'র ভাষ্য বিরোধী। এভাবে হাদীসের অর্থ বিকৃত করার এ নীতি তারা জাহমিয়্যাহ ও মু'তাযিলাদের থেকেই নিয়েছে। মূল কারণ হচ্ছে স্রষ্টার গুণকে সৃষ্টির গুণের সাথে তুলনা করা। তারপর সে গুণগুলোকে অস্বীকার কিংবা অপব্যাখ্যা করা। (৯১৮)
প্রকৃতপক্ষে মহান স্রষ্টা আল্লাহ তা'আলাকে সৃষ্টির সাথে তুলনা করে চিন্তা করাটাই একটা ভুল চিন্তা। স্রষ্টা আর সৃষ্টি কখনো এক নয়, স্রষ্টা ও সৃষ্টির ক্ষেত্রে একই স্ট্যান্ডার্ড দিয়ে চিন্তা করাটা একটা ত্রুটিপূর্ণ ও দূষিত চিন্তা। আল্লাহ তা'আলার গুণাবলি সম্পর্কে ইমাম আবু জাফর ত্বাহাবী বলেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মানবীয় কোনো গুণ আরোপ করবে, সে কাফির হয়ে যাবে। অতএব, যে ব্যক্তি এতে অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করবে সে শিক্ষা নিতে সক্ষম হবে। আর (আল্লাহ সম্পর্কে) কাফিরদের মতো নিরর্থক কথা বলা হতে বিরত থাকবে এবং সে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর গুণাবলিতে মানুষের মতো নন।”
কাজেই আল্লাহ তা'আলাকে মানুষ বা সৃষ্টিজগতের মাত্রা বা dimension থেকে চিন্তা করাটা কোনো ইসলামী বিশ্বাস নয়। এখানেই যত বিভ্রান্তি লুকায়িত।
আহলুস সুন্নাতের ইমামগণ অন্যান্য গুণের মত আল্লাহ তা'আলার 'অবতরণ' সিফাতটিকেও তুলনামুক্তভাবে মেনে নেন। তিনি যখন এবং যেভাবে ইচ্ছা অবতরণ করেন। তাঁর অবতরণ কোনোভাবেই কোনো সৃষ্টির অবতরণের মতো নয়। তাঁর অবতরণের স্বরূপ ও প্রকৃতি কি তা আমরা জানি না এবং জানার চেষ্টাও করি না। ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহকে মহান আল্লাহর অবতরণ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। তিনি উত্তরে বলেন: ينزل بلا كيف “[মহান আল্লাহ] অবতরণ করেন, কোনোরূপ পদ্ধতি বা স্বরূপ ব্যতিরেকে।” (৯১৯)
সহীহ বুখারীতে সিফাত-সংক্রান্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল রাহিমাহুল্লাহ এর বক্তব্য উল্লেখ করেছেন ইবন রজব আল-হাম্বলী রাহিমাহুল্লাহ। তাতে এসেছে,
"...আমি আবু আবদুল্লাহকে [আহমাদ ইবন হাম্বল] বললাম, "আল্লাহ কি দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন? তিনি বললেন, “হ্যাঁ”। আমি বললাম, "তাঁর অবতরণ কি ইলম (জ্ঞান) দিয়ে অথবা কী দিয়ে?” তিনি বললেন, "এই বিষয়ে চুপ করো। তোমার কী দরকার এ বিষয়ে? হাদীসে যেভাবে 'কীভাবে' বা সীমা ছাড়া বর্ণিত হয়েছে সেভাবে মেনে নাও। তবে কোনো আছার বা হাদীস যদি বর্ণিত হয়, তাহলে ভিন্ন কথা অথবা যদি কিতাবে বর্ণিত হয়। মহান আল্লাহ বলেন, "অতএব, আল্লাহর কোনো সদৃশ সাব্যস্ত করো না।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৭৪] এর পরে ইবন রজব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "[আল্লাহর] 'অবতরণ' বিষয়ে যা বর্ণিত হয়েছে, তার উপর নড়াচড়া, স্থানান্তর, 'আরশ থেকে খালি হওয়া, না থাকা এ সকল কিছু সাব্যস্ত করা বিদ'আত। এ ব্যাপারে গভীরে অনুসন্ধান করা কোনো প্রশংসনীয় কাজ নয়।” (৯২০)
ইমাম আবু জাফর আত-ত্বাহাওয়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, "আর 'আরশ এবং কুরসী সত্য। আর আল্লাহ তা'আলা 'আরশ ও অন্যান্য বস্তু থেকে অমুখাপেক্ষী। তিনি সমস্ত বস্তুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং তিনি সবকিছুরই ঊর্ধ্বে। সৃষ্টিজগত তাঁকে পূর্ণভাবে আয়ত্ব করতে অক্ষম।” আরও বলেন, "আল্লাহ তা'আলা স্থান ও সময়ের স্রষ্টা।”
আল্লাহ তা'আলা ব্যক্তি, বস্তু, সময় বা স্থান কোনো কিছুরই মুখাপেক্ষী নন এবং তিনি এগুলোর ওপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। কাজেই আল্লাহ তা'আলার জন্য এটা খুবই সহজ যে, আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপরে থাকবেন এবং শেষ রাতে নিকটতম আসমানে অবতরণ করবেন। পৃথিবীর কোথাও না কোথাও সব সময়ে শেষ রাত থাকলেও আল্লাহ তা'আলার জন্য তা কঠিন কিছু নয়।
আল্লাহ তা'আলার 'আরশের ঊর্ধ্বারোহন কিংবা শেষ আসমানে অবতরণ মোটেও মানুষ বা অন্য কোনো সৃষ্টির মতো নয়। পথভ্রষ্ট বিদ'আতী আকীদাহ'র মানুষেরা সৃষ্টির সাথে আল্লাহ তা'আলার গুণাবলিকে মিলিয়ে ফেলে ত্রুটিপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে পথভ্রষ্টতায় নিপতিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা'আলার সিফাত সংক্রান্ত হাদীসে কোনো প্রকারের অসঙ্গতি বা অযৌক্তিক কিছু নেই।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহimhimullah বলেন,
"এখানে সালাফগণের সে কথাটিই বিশুদ্ধ, যাতে বলা হয়েছে, আল্লাহ তা'আলা নিকটতম আসমানে অবতরণ করেন আর 'আরশ তার থেকে খালি হয় না। একজন মানুষের রূহ তার শরীরে থাকে, রাত-দিন আমৃত্যু তার সাথে থাকে, ঘুমের সময় উপরে উঠে যায়, 'আরশের নিচে সাজদাহ করে, অথচ সেটা তার শরীর ছেড়ে একেবারে চলে যায়নি। অনুরূপভাবে মানুষ যখন সাজদায় থাকে তখন সে তার রবের সবচেয়ে নিকটে থাকে অথচ তার রূহ তার শরীরেই রয়েছে। আর রূহের বিধান শরীরের বিধানের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তাহলে ফিরিশতাদের অবস্থা তো আরও ব্যতিক্রম। আর রাব্বুল আলামীনের অবস্থা যে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম হবে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর রাতেরও রয়েছে বিভিন্ন অবস্থা, প্রাচ্যে যখন রাতের এক- তৃতীয়াংশ হয় তখন সেটা পাশ্চাত্যের এক-তৃতীয়াংশের আগে হবেই, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর অবতরণ করার জন্য যে সময় প্রাচ্যের লোকদের জন্য তাদের আসমানে ঘোষণা করেছেন তা অবশ্যই পাশ্চাত্যের লোকদের আসমানের সময় থেকে ভিন্ন হবেই। বস্তুত আল্লাহ তা'আলা এমন এক সত্তা, যাঁর কোনো অবস্থা অপর কোনো অবস্থার জন্য বাঁধা হয় না। অনুরূপভাবে কারও কথা শোনা অপর কারও শোনা থেকে বাঁধা হয় না। অনবরত অসংখ্য একই সাথে করা চাওয়া তাঁর কোনো সমস্যা তৈরি করে না। বরং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর বান্দাদের সাথে কিয়ামতের দিন কথা বলবেন, তাদের হিসাব নিবেন, একটি করতে অপরটি তার জন্য বাঁধা হবে না। ইবন 'আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন সবার সাথে একই সময় কীভাবে কথা বলবেন? তখন তিনি বলেন, যেমন তিনি সবাইকে একই সময় রিযিক দিচ্ছেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে আহ্বানকারীদের আহ্বান, তাঁর কাছে যাচঞাকারীদের প্রার্থিত জিনিস প্রদান করেন, যদিও তাদের ভাষা হয় বিবিধ, তাদের প্রয়োজনও বহুবিধ। তাছাড়া মানুষের মাঝেও কারও কারও শ্রবণশক্তি এমন ক্ষুরধার হয় যে, এক সাথে কয়েকজনের কথা শুনতে সক্ষম হন, যেমনটি দেখা যায় কোনো কোনো কারী সাহেব একাধিক ছাত্রের পড়া একসময় শুনেন, তবে সেটা খুব স্বল্প সংখ্যক লোকের মাঝেই তা হতে পারে। অনুরূপ কাউকে কাউকে দেখা যায় তার অন্তরে সে উপস্থিত অনুপস্থিত কারও প্রতি টান, নৈকট্য ও ঝোঁক অনুভব করে, সে সময়েই তিনি অপরের জন্য তা অনুভব করেন না। এ যদি হয় মানুষের অবস্থা, তাহলে মহান রব তো অনেক বেশি প্রশস্ত জ্ঞানী, যাঁর শোনা যাবতীয় আওয়াজকে একই সাথে ধারণ করতে পারে, তাঁর দান তো সকল প্রয়োজন পূরণের জন্য যথেষ্ট। মানুষের মাঝে কেউ কেউ এ জায়গায় ভুল করে, সে মনে করে থাকে আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য মানুষের নড়াচড়া জাতীয় কিছু বুঝি, যখন সে কোনো দিকে ঝুঁকে তখন সে অন্য দিক থেকে প্রত্যাবর্তন করেই তা করতে হয়, সে তার অন্তরের কর্মকে দেখতে পায় যে, তা তার শরীরের কর্মের বিপরীত করে চলেছে। তারপরও সে দেখতে পায় তার অন্তর অনেক মানুষের নৈকট্য লাভ করেছে অথচ তাদের কারও নৈকট্য লাভ করতে তাকে অপর কারও কাছ থেকে সরে আসতে হয়নি।”(৯২১)
📄 আল্লাহ তা‘আলার নিকটতম আসমানে অবতরণ সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন ও তার উত্তর
প্রশ্ন: এটা কি বলা যাবে যে, আল্লাহ তা'আলা সত্তাগতভাবে অবতরণ করেন?
উত্তর: এ ব্যাপারে তিনটি মত পরিলক্ষিত হয়,
এক. প্রথম গোষ্ঠী বলেন, তিনি সত্তাগতভাবে অবতরণ করেন এটা বলা যাবে। এ মতটি আবুল কাসেম আল-আসবাহানীর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়। ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, এটি একদল আহলুল হাদীস ও আহলুস সুন্নাহ'র মত।
দুই. দ্বিতীয় গোষ্ঠী বলেন, তিনি সত্তাগতভাবে অবতরণ করেন না।
তিন. তৃতীয় গোষ্ঠী বলেন, বলা হবে তিনি অবতরণ করেন, কিন্তু সত্তাগত কিংবা সত্তাগতভাবে নয় কোনোটিই বলা যাবে না, সেভাবেই বলতে হবে যেভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আর যা হতে চুপ ছিলেন তা থেকে চুপ থাকতে হবে। (৯২২) এখানে বিশুদ্ধ মত হচ্ছে তৃতীয়টি।
প্রশ্ন: আল্লাহ তা'আলার অবতরণ কি নড়াচড়া সহ নাকি নড়াচড়া ব্যতীত?
উত্তর: এখানে চারটি মত রয়েছে।
এক. প্রথম গোষ্ঠী বলেন, অবতরণ আবার নড়াচড়া ও স্থানচ্যুত হওয়া ব্যতীত হয় নাকি, তাই নড়াচড়া ও স্থানচ্যুত হওয়া বলা যাবে। এমতটি ইমাম উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী, আবু আবদুল্লাহ ইবন হামেদ, হারব ইবন ইসমা'ঈল আল-কিরমানীর।
দুই. দ্বিতীয় গোষ্ঠী বলেন, অবতরণ নড়াচড়া ও স্থান পরিবর্তন বলা যাবে না। এটি ইমাম আবু সুলাইমান আল-খাত্তাবী, আবুল হাসান আত-তামীমী, তার দুই ছেলে আবদুল ওয়াহেদ ও আবদুল ওয়াহহাব ও ইবনুয যাগ্নীর মত।
তিন. তৃতীয় গোষ্ঠী বলেন, এ অর্থটি সাব্যস্ত হবে, তখন শব্দটি বলা যাবে না; কারণ তা কোনো হাদীসে আসেনি। এটি কোনো কোনো আহলুল হাদীসের মত, অনুরূপ তা ইবন আবদুল বার এরও মত। (৯২৩)
চার, চতুর্থ গোষ্ঠী বলেন, এ ব্যাপারটিতে কিছু না বলে চুপ থাকতে হবে। এ মতটি ইমাম ইবন বাত্তাহ, আবু বকর আবদুল আযীয ইবন জা'ফর, (খাল্লালের ছাত্র) এটি অনেক আহলুল হাদীস ও ফকীহগণের মত।
বস্তুত এ চতুর্থ মতটিই বিশুদ্ধ। এটি বলা যাবে না, অস্বীকারও করা যাবে না। কারণ, তা মুজমাল বা ব্যাখ্যা সাপেক্ষ্য বাক্য। (৯২৪)
প্রশ্ন: আল্লাহ তা'আলা যখন অবতরণ করেন, তখন কি 'আরশ শূন্য হয়ে যায়? উত্তর: এ ব্যাপারে আলেমগণের মধ্যে তিনটি মত রয়েছে (৯২৫):
এক. প্রথম গোষ্ঠী বলেন, খালি হয়ে যায়, এমতটি ইমাম আবদুর রহমান ইবন মুহাম্মাদ ইবন মানদাহ রাহিমাহুল্লাহ পোষণ করতেন।
দুই. এ ব্যাপারে কোনো কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। এটি ইমাম আবদুল গনী আল-মাক্কদেসী ও কোনো কোনো আহলে হাদীসের মত।
তিন, 'আরশ তাঁর থেকে খালি হয় না। এটি অধিকাংশ আহলুস সুন্নাতের মত। এটি ইমাম আহমাদ, ইসহাক্ব ইবন রাহওয়াইহ, হাম্মাদ ইবন যায়েদ, উবাইদুল্লাহ ইবন বাত্ত্বাহ প্রমুখ আলেমগণের।
বস্তুত তৃতীয় মতটিই বিশুদ্ধ।(৯২৬)
প্রশ্ন: আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠা, 'আরশের উপর অবস্থান, নিকটতম আসমানে নেমে আসার বিষয়ে হাদ্দ বা 'পার্থক্যকারী সীমা আছে' বলা যাবে? উত্তর: এ ব্যাপারে তিনটি মত রয়েছে:
এক. প্রথম গোষ্ঠী বলেন, হাদ্দ বা সীমা আছে বলা যাবে, এ মতের সপক্ষে ছিলেন, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, ইমাম উসমান ইবন সা'ঈদ আদ-দারেমী, ইসহাক্ব ইবন ইবরাহীম ইবন রাহওয়িয়াহ, হারব ইবন ইসমা'ঈল আল-কিরমানী, ইয়াহইয়া ইবন আম্মার, কাদ্বী আবু ইয়া'লা, আদ-দিশতী। আর তা ইমাম আহমাদ থেকেও একটি বর্ণনা।
দুই. দ্বিতীয় গোষ্ঠী বলেন, হাদ্দ বা সীমা আছে বলা যাবে না। এ মতের প্রবক্তাদের অন্যতম হচ্ছেন ইবন হিব্বান, আবু সালামাহ ইবনুল মাজেশূন, আবু নসর আত-তাম্মার, আবু হাতেম আল-বুসতী, আত্ব-ত্বাহাওয়ী, ইয়াহইয়া ইবন মা'ঈন। আর এটি ইমাম আহমাদের একটি মত।
তিন. তৃতীয় গোষ্ঠী বলেন, হাদ্দ আছে বা নেই সরাসরি বলা যাবে না, অস্বীকারও করা যাবে না। কারণ, তা মুজমাল বা ব্যাখ্যা সাপেক্ষ্য বাক্য। জিজ্ঞাসা করা হবে, হদ্দ বা সীমা বলতে কী বুঝ? যদি বলে যে, তা দ্বারা উদ্দেশ্য সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা অর্থে, তাহলে তা সত্য ও সঠিক, ইমামগণের মধ্যে যারা হদ্দ সাব্যস্ত করেছেন, তারা এ অর্থেই সাব্যস্ত করেছেন। আর যদি বলে হদ্দ দ্বারা উদ্দেশ্য সীমাবদ্ধ বুঝানো, তাহলে তা অস্বীকার করতে হবে। ইমামগণের মধ্যে যারা অস্বীকার করেছেন, তারা এ অর্থেই অস্বীকার করেছেন। (৯২৭)