📄 কিছু সন্দেহ ও তার অপনোদন
প্রশ্ন: কুরআনে কারীমের বেশ কিছু আয়াতে 'নিকটবর্তী' শব্দটি এসেছে, যেমন, وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ ]حَبْلِ الْوَرِيدِ ) ) [ق: ١٦ "আর আমরা তার গলার ধমনী হতেও অধিক নিকটবর্তী।” [সূরা কাফ, আয়াত: ১৬]
অনুরূপ অন্য আয়াতে এসেছে ﴿٨٥) ]وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنكُمْ) [الواقعة: “আর তোমাদের চাইতে আমরা তার অধিক নিকটবর্তী।" [সূরা আল ওয়াকিয়াহ, আয়াত: ৮৫] কোনো কোনো তাফসীর গ্রন্থসমূহে বলা হয়েছে, উল্লিখিত দু' আয়াতে 'অধিক কাছে' বলতে ফিরিশতাদের বুঝানো হয়েছে। এ তাফসীর কি আল্লাহর 'নিকটবর্তী হওয়া' গুণ বিরোধী, নাকি তা তা'ওয়ীল?
জওয়াব: উল্লিখিত দু' আয়াতে 'অধিক নিকটবর্তী' বলতে ফিরিশতারা অধিক নিকটবর্তী বলে যে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তাতে আল্লাহর বাণীকে তার বাহ্যিক অর্থ থেকে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে না। গভীরভাবে চিন্তা করলে এ বিষয়টি আমাদের বুঝে আসে।
প্রথম আয়াত: এখানে 'নিকটবর্তী থাকা'র বিষয়টি এমন কিছুর সঙ্গে যুক্ত করে উল্লেখ করা হয়েছে, যার দ্বারা বুঝা যায়, এখানে 'অধিক নিকটবর্তী' বলে ফিরিশতাদেরকেই উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। যেহেতু আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ إِذْ يَتَلَقَّى الْمُتَلَقِّيَانِ عَنِ الْيَمِينِ وَعَنِ الشِّمَالِ قَعِيدٌ مَّا يَلْفِظُ مِن قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ ]ق: ١٥-١٨[ )
"আর অবশ্যই আমরা মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয় তাও আমরা জানি। আর আমরা তার গলার ধমনী হতেও অধিক কাছে। যখন ডানে ও বামে বসা দু'জন লিপিবদ্ধকারী লিখতে থাকবে তার প্রত্যেক কর্ম ও কাজ সে যে কথাই উচ্চারণ করে তার কাছে সদা উপস্থিত সংরক্ষণকারী রয়েছে।” [সূরা কাফ, আয়াত: ১৬-১৮] এখানে إِذْ يَتَلَقَّى )যখন... গ্রহণ করবে) দ্বারা এটা বুঝা যাচ্ছে যে আগের আয়াতে ونحن أقرب এর 'অধিক নিকটবর্তী' বলা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আমলনামা লিপিবদ্ধকারী দুই ফিরিশতার নিকটবর্তী হওয়া।
দ্বিতীয় আয়াত: দ্বিতীয় আয়াতে যে 'নিকটবর্তী' থাকার কথা বলা হয়েছে, তা বান্দার মৃত্যুকালীন অবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর মৃত্যুকালে বান্দার কাছে যারা উপস্থিত হন তারা হলেন ফিরিশতা। আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র বলেন: ]حَتَّى إِذَا جَاءَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ تَوَفَّتْهُ رُسُلُنَا وَهُمْ لَا يُفَرِّطُونَ ﴾ [الانعام: ٦١
"অবশেষে যখন তোমাদের কারো কাছে মৃত্যু আসে, আমার প্রেরিত দূতগণ তার মৃত্যু ঘটায়। আর তারা কোনো ত্রুটি করে না।" [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৬১]
মানুষের মৃত্যুকালে ফিরিশতাই যে বান্দার নিকটে আসেন, এর আরেকটি প্রমাণ হলো আল্লাহ তা'আলার কথা: ﴿وَلَكِن لَّا تُبْصِرُونَ ﴾ [الواقعة: ٨٥﴿ "কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না।” [আল ওয়াকি'য়া, আয়াত: ৮৫]
কেননা এ আয়াত থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, যিনি নিকটবর্তী হন তিনি ঠিক ঐ জায়গাতেই নিকটবর্তী হন যে জায়গাতে মৃত্যুগামী ব্যক্তি রয়েছে। অথচ আমরা তাকে প্রত্যক্ষ করতে পারি না। এ বিষয়টি ফিরিশতা কর্তৃক নিকটতাকে নির্ধারণ করে দিচ্ছে; কেননা আল্লাহ তা'আলার ক্ষেত্রে এ প্রকৃতির নিকটবর্তী হওয়া অসম্ভব।
সার্বিকভাবে, সূরা কাফের উক্ত আয়াতটির অর্থ যদি আল্লাহ্ তা'আলার ক্ষেত্রেও নির্ধারণ করা হয়, তবে তার অর্থ তাঁর মর্যাদা ও শানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এমনভাবে তিনি বান্দার নিকটে থাকেন, সৃষ্টির মধ্যে প্রবিষ্ট হিসেবে নন, বরং এর প্রকৃত ধরন আমাদের অজানা-তবে এ অর্থটাও সঠিক হবে।
একটি প্রশ্ন:
এখানে একটি প্রশ্ন এভাবে উত্থাপিত হতে পারে যে, যদি ফিরিশতাই নিকটবর্তী হবেন তাহলে আল্লাহ তা'আলা কেন বললেন যে, 'আমরা তার নিকটে'? অর্থাৎ 'নিকটবর্তী হওয়া'-কে আল্লাহ তা'আলা নিজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে কেন উল্লেখ করলেন? এ প্রকৃতির অভিব্যক্তির উদাহরণ কি অন্য কোথাও পাওয়া যায়?
উত্তর:
আল্লাহ তা'আলা ফিরিশতাদের নিকটবর্তী হওয়াকে তাঁর নিজের নিকটবর্তী হওয়া বলে উল্লেখ করেছেন; কারণ ফিরিশতার নিকটবর্তী হওয়া আল্লাহ তা'আলার নির্দেশেই ঘটে থাকে। ফিরিশতারা হলেন তাঁর সৈন্য ও দূত।
ফিরিশতার নিকটবর্তী হওয়াকে আল্লাহ তা'আলা নিজের নিকটবর্তী হওয়া বলে ব্যক্ত করার উদাহরণ আল-কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় এসেছে, যেমন: ﴿فَإِذَا قَرَأْنَهُ فَأَتَّبِعْ قُرْءَانَهُ ﴾ [القيامة: ۱۸ “অতঃপর যখন আমরা তা পাঠ করি (জিবরীলের মাধ্যমে) তখন আপনি তার পাঠের অনুসরণ করুন।” [সূরা আল-কিয়ামাহ, আয়াত: ১৮]
উক্ত আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি কুরআন পাঠ মূলত ফিরিশতা জিবরীল 'আলাইহিস সালামের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা এ পাঠকে নিজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে বলেছেন, 'যখন আমরা তা পাঠ করি'। এটা এ হিসেবে যে, জিবরীল 'আলাইহিস সালাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আল্লাহর নির্দেশেই কুরআন পাঠ করেছেন। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলার বাণী- ﴿ فَلَمَّا ذَهَبَ عَنْ إِبْرَاهِيمَ الرَّوْعُ وَجَاءَتْهُ الْبُشْرَى يُجَادِلُنَا فِي قَوْمِ لُوطٍ ﴾ [هود: ٧٤] “অতঃপর যখন ইবরাহীম থেকে ভয় দূর হলো এবং তার কাছে সুসংবাদ এলো, তখন সে লুতের কওম সম্পর্কে আমাদের সাথে বাদানুবাদ করতে লাগল।” [সূরা হূদ, আয়াত: ৭৪]
এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, ইবরাহীম 'আলাইহিস সালাম লূত 'আলাইহিস সালামের কওম সম্পর্কে আল্লাহর সঙ্গে বাদানুবাদ করতে লাগলেন। অথচ আমরা জানি যে, তিনি ফিরিশতাদের সঙ্গে বাদানুবাদ করতে লাগলেন। কিন্তু যেহেতু ফিরিশতারা আল্লাহর দূত হিসেবে এসেছিলেন সে হিসেবে তাদের সঙ্গে বাদানুবাদ করা এক অর্থে আল্লাহর সঙ্গেই বাদানুবাদ করা।
তাছাড়া অন্য আয়াতেও এমনটি এসেছে, যেমন:
﴿أَمْ يَحْسَبُونَ أَنَّا لَا نَسْمَعُ سِرَّهُمْ وَنَجْوَنَهُمْ بَلَى وَرُسُلُنَا لَدَيْهِمْ يَكْتُبُونَ ﴾ [الزخرف: ٨٠]
"নাকি তারা মনে করে যে, আমরা তাদের গোপন বিষয় ও মন্ত্রণা শুনতে পাই না? অবশ্যই হ্যাঁ। আর আমাদের ফিরিশতাগণ তাদের কাছে থেকে সবকিছু লিখছে।” [সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ৮০]
আর যদি অন্য তাফসীরটি করা হয়, অর্থাৎ যদি বলা হয় যে, এসব আয়াতেও আমরা 'অধিক নিকটবর্তী' হওয়া দ্বারা মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার নিকটবর্তী হওয়াকে বুঝানো হয়, তাহলে আয়াতের অর্থ হবে ইলমের মাধ্যমে নিকটবর্তী থাকা। (৮৯২)