📄 আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক ‘প্রকৃত’ অর্থে সাথে থাকা
ইমাম ইবন আবদুল বার বলেছেন, 'আহলে সুন্নত কুরআন-সুন্নাহ'য় উল্লিখিত সকল সিফাতের ওপর ঈমান আনা এবং সেগুলোকে রূপক অর্থে নয় বরং প্রকৃত অর্থে বহন করার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন। তবে তারা এ সিফাতসমূহের কোনোটারই ধরণ-ধারণ কি বা বাস্তবতা কি তা উল্লেখ করেন না। (৮৬৭)
উপরোক্ত নীতি অনুযায়ী সালাফে সালেহীনের দৃষ্টিতে আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক বান্দার সাথে থাকা দু'ভাগে বিভক্ত:
এক. 'মা'য়িয়্যাতু 'আম্মাহ' অর্থাৎ ব্যাপকভাবে সাথে থাকা: আর তা হচ্ছে, জ্ঞান, ক্ষমতা, শোনা, দেখা, কর্তৃত্ব, নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদিতে তিনি বান্দাকে পরিবেষ্টন করে আছেন। আর তা আল্লাহর সকল সৃষ্টিকুলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ঈমানদার, কাফির, নেককার, বদকার, ব্যাপকভাবে সবার সাথেই তিনি রয়েছেন। যেমন আল্লাহ বলেন,
﴿يَسْتَخْفُونَ مِنَ النَّاسِ وَلَا يَسْتَخْفُونَ مِنَ اللَّهِ وَهُوَ مَعَهُمْ إِذْ يُبَيِّتُونَ مَا لَا يَرْضَى مِنَ الْقَوْلِ وَكَانَ اللَّهُ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطًا ﴾ [النساء: ١٠٨]
"তারা মানুষ থেকে গোপন করতে চায় কিন্তু আল্লাহর থেকে গোপন করে না, অথচ তিনি
তাদের সংগেই আছেন রাতে যখন তারা, তিনি যা পছন্দ করেন না- এমন বিষয়ে পরামর্শ করে এবং তারা যা করে আল্লাহ্ তা পরিবেষ্টন করে আছেন।" [সূরা নিসা, আয়াত: ১০৮]
আরও বলেন, هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ ) ) [الحديد: ٤]
"তিনি ঐ সত্তা যিনি ছয়দিনে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন। তিনি জানেন যা কিছু যমীনে প্রবেশ করে এবং যা কিছু তা থেকে বের হয়, আর আসমান থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উত্থিত হয়। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, আর তোমরা যা কর আল্লাহ্ তার সম্যক দ্রষ্টা।” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ০৪]
অনুরূপ আরও বলেন, أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ مَا يَكُونُ مِن نَّجْوَى ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ وَلَا أَدْنَى مِن ذَلِكَ وَلَا أَكْثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا عَمِلُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ ﴾ [المجادلة: ٧]
"আপনি কি লক্ষ্য করেন না যে, আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে আল্লাহ্ তা জানেন? তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোনো গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থজন হিসেবে তিনি থাকেন না এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যেও হয় না যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি থাকেন না। তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশি হোক তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন তারা যেখানেই থাকুক না কেন। তারপর তারা যা করে, তিনি তাদেরকে কিয়ামতের দিন তা জানিয়ে দিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।” [সূরা আল-মুজাদালাহ, আয়াত: ০৯]
দুই. 'মা'য়িয়্যাতু খাসসাহ' বিশেষভাবে সাথে থাকা: আর তা হচ্ছে, সাহায্য-সহযোগিতা করা, হিফাযত করা, বিশেষ যত্ন নেয়া, রক্ষা করা, দেখাশুনা করা, ভালোবাসা, তাওফীক দেয়া, যথেষ্ট করে দেয়া, নৈকট্য প্রদান, সঠিক কাজটির দিক নির্দেশনা, হিদায়াত প্রদান ইত্যাদি। আলেমগণ এটাকে আল্লাহর কর্মগত গুণ হিসেবে গণ্য করেছেন।
এটি আবার দু' প্রকার:
১- ব্যক্তির সাথে বিশেষভাবে থাকা। যেমন, আল্লাহর বাণী: إِلَّا تَنصُرُوهُ فَقَدْ نَصَرَهُ اللَّهُ إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِينَ كَفَرُوا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ، لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا فَأَنزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَيْهِ وَأَيَّدَهُ بِجُنُودٍ لَّمْ تَرَوْهَا وَجَعَلَ كَلِمَةَ الَّذِينَ كَفَرُوا السُّفْلَى وَكَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ الْعُلْيَا وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ ﴾ [التوبة: ٤٠]
"যদি তোমরা তাঁকে সাহায্য না কর, তবে আল্লাহ তো তাঁকে সাহায্য করেছিলেন যখন
কাফিররা তাঁকে বহিস্কার করেছিল এবং তিনি ছিলেন দুজনের দ্বিতীয়জন, যখন তারা উভয়ে গুহার মধ্যে ছিল; তিনি তখন তাঁর সংগীকে বলেছিলেন, 'বিষণ্ণ হয়ো না, আল্লাহ্ তো আমাদের সাথে আছেন।' অতঃপর আল্লাহ্ তার উপর তাঁর প্রশান্তি নাযিল করেন এবং তাঁকে শক্তিশালী করেন এমন এক সৈন্যবাহিনী দ্বারা যা তোমরা দেখনি এবং তিনি কাফিরদের কথা হেয় করেন। আর আল্লাহর কথাই সমুন্নত এবং আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৪০] অনুরূপ আল্লাহর বাণী,
قَالَ لَا تَخَافَا إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى ) [طه: ٤٦] "তিনি বললেন, আপনারা ভয় করবেন না, আমি তো আপনাদের সাথেই আছি। আমি সবকিছু শুনি ও দেখি।" [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ৪৬]
قَالَ كَلَّا إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ ﴾ [الشعراء : ٦٢] "মূসা বললেন, কখনই নয়! আমার সঙ্গে আছেন আমার রব; সত্বর তিনি আমাকে পথনির্দেশ করবেন।” [সূরা আশ-শু'আরা, আয়াত: ৬২] ২- কোনো গুণ ও গুণওয়ালাদের সাথে থাকা। যেমন, আল্লাহর বাণী:
إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَواْ وَالَّذِينَ هُم تُحْسِنُونَ ﴾ [النحل: ١٢٨] "নিশ্চয় আল্লাহ্ তাদের সঙ্গে আছেন যারা তাওয়া অবলম্বন করে এবং যারা মুহসিন।" [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১২৮] অনুরূপ আল্লাহর বাণী:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ ﴾ [البقرة: ١٥٣] “হে ঈমানদারগণ! তোমরা সাহায্য চাও সবর ও সালাতের মাধ্যমে। নিশ্চয় আল্লাহ্ সবরকারীদের সাথে আছেন।” [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ১৫৩] অনুরূপ আল্লাহর বাণী:
وَمِنْ حَيْثُ خَرَجْتَ فَوَلِّ وَجْهَكَ شَطْرَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَإِنَّهُ لَلْحَقُّ مِن رَّبِّكَ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ ) [البقرة: ١٤٩] "আর যেখান থেকেই আপনি বের হন না কেন মসজিদুল হারামের দিকে চেহারা ফিরান। নিশ্চয় এটা আপনার রবের কাছ থেকে পাঠানো সত্য। আর তোমরা যা কর সে সম্পর্কে আল্লাহ্ গাফেল নন।" [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ১৪৯] অনুরূপ আল্লাহর বাণী,
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا وَإِنَّ اللَّهَ لَمَعَ الْمُحْسِنِينَ ﴾ [العنكبوت: ٦٩] "আর যারা আমাদের পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, আমরা তাদেরকে অবশ্যই আমাদের পথসমূহের হিদায়াত দিব। আর নিশ্চয় আল্লাহ মুহসিনদের সঙ্গে আছেন।” [সূরা আল-
'আনকাবুত, আয়াত: ৬৯] অনুরূপ আল্লাহর বাণী,
الشَّهْرُ الْحَرَامُ بِالشَّهْرِ الْحَرَامِ وَالْحُرُمَاتُ قِصَاصٌ فَمَنِ اعْتَدَى عَلَيْكُمْ فَاعْتَدُوا عَلَيْهِ بِمِثْلِ مَا اعْتَدَى عَلَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ ﴾ [البقرة: ١٩٤] "পবিত্র মাস পবিত্র মাসের বিনিময়ে। যার পবিত্রতা অলংঘনীয় তার অবমাননা কিসাসের অন্তর্ভুক্ত। কাজেই যে কেউ তোমাদেরকে আক্রমণ করবে তোমরাও তাকে অনুরূপ আক্রমণ করবে এবং তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করবে। আর জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ্ মুত্তাকীদের সাথে রয়েছেন।" [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ১৯৪] তদ্রূপ আল্লাহর বাণী:
وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ ﴾ [البقرة: ١٨٦] "আর আমার বান্দাগণ যখন আমার সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করে, (তখন বলে দিন যে) নিশ্চয় আমি অতি নিকটে। আহ্বানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে আমি তার আহবানে সাড়া দেই। কাজেই তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক, যাতে তারা সঠিক পথে চলতে পারে।” [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ১৮৬] অনুরূপ আল্লাহর বাণী:
وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا وَادْعُوهُ خَوْفًا وَطَمَعًا إِنَّ رَحْمَتَ اللَّهِ قَرِيبٌ مِّنَ الْمُحْسِنِينَ ﴾ [الأعراف: ٥٦] "আর যমীনে শান্তি স্থাপনের পর তোমরা সেখানে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না। আর আল্লাহকে ভয় ও আশার সাথে ডাক। নিশ্চয় আল্লাহর অনুগ্রহ মুহসিনদের খুব নিকটে।” [সূরা আল- আ'রাফ, আয়াত: ৫৬] অনুরূপ আল্লাহর বাণী:
إِن تَسْتَفْتِحُوا فَقَدْ جَاءَكُمُ الْفَتْحُ وَإِن تَنتَهُوا فَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَإِن تَعُودُوا نَعُدْ وَلَن تُغْنِيَ عَنكُمْ فِئَتُكُمْ شَيْئًا وَلَوْ كَثُرَتْ وَأَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُؤْمِنِينَ ﴾ [الأنفال: ١٩] "যদি তোমরা মীমাংসা চেয়ে থাক, তাহলে তা তো তোমাদের কাছে এসেছে; আর যদি তোমরা বিরত হও তবে তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর, কিন্তু যদি তোমরা আবার যুদ্ধ করতে করতে আস তবে আমরাও আবার শাস্তি নিয়ে আসব। আর তোমাদের দল সংখ্যায় বেশি হলেও তোমাদের কোনো কাজে আসবে না। আর নিশ্চয় আল্লাহ্ মুমিনদের সাথে আছেন।” [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ১৯] অনুরূপ যারা আল্লাহ তা'আলার শরী'আত বাস্তবায়ন করে তাদের সাথেও আল্লাহ রয়েছেন,
আল্লাহ বলেন,
(وَلَقَدْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ بَنِي إِسْرَاءِيلَ وَبَعَثْنَا مِنْهُمُ اثْنَى عَشَرَ نَقِيباً وَقَالَ اللَّهُ إِنِّي مَعَكُمْ لَئِنْ أَقَمْتُمُ الصَّلَاةَ وَعَاتَيْتُمُ الزَّكَوٰةَ وَءَامَنتُم بِرُسُلِي وَعَزَرْتُمُوهُمْ وَأَقْرَضْتُمُ اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا لَّأُكَفِّرَنَّ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَلَأُدْخِلَنَّكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ فَمَن كَفَرَ بَعْدَ ذَلِكَ مِنكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيلِ ) [المائدة: ١٢] "আর অবশ্যই আল্লাহ্ বনী ইসরাঈলের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন এবং আমরা তাদের মধ্য থেকে বারজন দলনেতা পাঠিয়েছিলাম। আর আল্লাহ্ বলেছিলেন, 'নিশ্চয় আমি তোমাদের সঙ্গে আছি; তোমরা যদি সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও, আমার রাসূলগণের প্রতি ঈমান আন, তাঁদেরকে সম্মান-সহযোগিতা কর এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান কর, তবে আমি তোমাদের পাপ অবশ্যই মোচন করব এবং অবশ্যই তোমাদেরকে প্রবেশ করাব জান্নাতসমূহে, যার পাদদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত।' এর পরও কেউ কুফুরী করলে সে অবশ্যই সরল পথ হারাবে।” [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ১২] তাছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে এসেছে,
أَخْرَجَ الْبُخَارِيُّ وَمُسْلِمٌ فِي ((صَحِيحَيْهِمَا )) عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ - قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ : ((إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ - يَقُولُ : أَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِي بِي وَأَنَا مَعَهُ إِذَا دَعَانِي - أَوْ قَالَ: إِذَا ذَكَرَنِي)). "বুখারী ও মুসলিম তাদের সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেন, আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন, "রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা বলেন, আমি আমার ব্যাপারে আমার বান্দার ধারণার নিকটে, আমি তার সাথে থাকি যখন সে আমাকে ডাকে অথবা বলেছেন, যখন সে আমাকে স্মরণ করে”। (৮৬৮) আরও এসেছে,
وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِي اللَّهُ عَنْهُ - قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ: (( قال الله تعالى: أَنَا مَعَ عَبْدِي إِذَا ذَكَرَنِي وَتَحَرَّكَتْ بِي شَفَتَاهُ)) . أَخْرَجَهُ الْبُخَارِيُّ مُعَلَّقًا مَجْزُومًا بِهِ ، وَأَخْرَجَهُ ابْنُ مَاجَهْ مَوْصُولًا، وَصَحَّحَهُ لِغَيْرِهِ الْأَلْبَانِيُّ. “আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "মহান আল্লাহ বলেন, আমি আমার বান্দার সাথে আছি যখন সে আমাকে স্মরণ করে আর দু'টি ঠোট আমাকে নিয়ে নাড়াচাড়া করে”। (৮৬৯)
📄 আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক ‘প্রকৃত’ এমবে বান্দার সাথে থাকা ও আরশের উপর থাকা সাংঘর্ষিক নয়
আল্লাহ তা'আলার শানের জন্য যেভাবে উপযোগী সেভাবে তিনি বান্দার সঙ্গে থাকেন, এ কথার সঙ্গে, আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপরে আছেন, এর কোনো সংঘর্ষ নেই। বিষয়টি আমরা কয়েকভাবে বুঝতে পারি:
এক: আল্লাহ তা'আলা এ উভয় বিষয়কে তাঁর কিতাবে একত্র করেছেন। যে কিতাব সকল বৈপরীত্ব থেকে মুক্ত। আর যে দু'টি বিষয়কে আল্লাহ তা'আলা একত্র করেছেন সে দু'টির মাঝে কোনো বৈপরীত্ব থাকতে পারে না।
আল কুরআনের কোনো বিষয়ে বৈপরীত্য আছে বলে যদি ধারণা হয়, তাহলে আপনার উচিত হবে গভীরভাবে অধ্যয়ন করা যাতে প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ পায় (অবৈপরীত্য বুঝা যায়)। কেননা أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْءَانَ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا ( ) আল্লাহ তা'আলা বলেছেন ]النساء: ৮২[ "তারা কি কুরআন নিয়ে গবেষণা করে না? আর যদি তা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে হত, তবে অবশ্যই তারা এতে অনেক বৈপরীত্য দেখতে পেত।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৮২]
যদি গভীরভাবে অধ্যয়নের পরও বিষয়টি স্পষ্ট না হয়, তাহলে যারা পাকাপোক্ত জ্ঞানের অধিকারী তাদের পথ অবলম্বন করতে হবে, যারা বলেন, ءَامَنَّا بِهِ، كُلِّ مِّنْ عِندِ رَبَّنَا وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُوْلُوا ]۷ :الْأَلْبَابِ ﴾ [ال عمران “আমরা এগুলোর প্রতি ঈমান আনলাম, সবগুলো আমাদের রবের পক্ষ থেকে।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ০৭]
অতএব, বিষয়টিকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করতে হবে যিনি এ ব্যাপারে সুপরিজ্ঞাত। জেনে রাখবেন, যদি কোনো ত্রুটি থাকে তবে তা আপনার জ্ঞান ও বুঝের মধ্যে রয়েছে। পক্ষান্তরে আল-কুরআন সকল বৈপরীত্য থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, সঙ্গে-থাকার দাবি এটা নয় যে, আল্লাহ তা'আলার সত্তা মাখলুকের সঙ্গে মিশে থাকে। এর দলীল হলো, আল্লাহ তা'আলা সূরায়ে মুজাদালার আয়াতের শুরুতে এবং শেষে তাঁর সর্বব্যাপী ইলমের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন:
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ مَا يَكُونُ مِن نَّجْوَى ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ وَلَا أَدْنَى مِن ذَلِكَ وَلَا أَكْثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا عَمِلُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ ﴾ [المجادلة: ٧]
“তুমি কি লক্ষ্য করনি যে, আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে নিশ্চয় আল্লাহ তা জানেন? তিন জনের কোন গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থজন হিসেবে আল্লাহ থাকেন না, আর পাঁচ
জনেরও হয় না, যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি থাকেন না। এর চেয়ে কম হোক কিংবা বেশি হোক, তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন, তারা যেখানেই থাকুক না কেন। তারপর কিয়ামতের দিনে তিনি তাদেরকে তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে জানিয়ে দিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সব বিষয়ে সম্যক অবগত।” [সূরা আল-মুজাদালাহ, আয়াত: ০৭]
উক্ত আয়াতের বাহ্যিক অর্থানুযায়ী, এখানে বান্দাদের 'সঙ্গে-থাকা'র দাবি হলো- আল্লাহ তা'আলা তাদের সম্পর্কে পূর্ণ ইলম রাখেন এবং তাদের আমল ও কর্মের কোনো কিছুই তাঁর কাছে গোপন নয়। এখানে অর্থ এটা নয় যে, আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের সঙ্গে মিশে আছেন অথবা তিনি তাদের সঙ্গে যমীনের উপর আছেন।
অনুরূপভাবে সূরায়ে হাদীদের আয়াতে আল্লাহ তা'আলা প্রথমে 'আরশের উপরে উঠার কথা, তাঁর ব্যাপক ইলমের কথা বলেছেন এরপর তিনি বান্দাদের সঙ্গে থাকার কথা উল্লেখ করেছেন এবং পরিশেষে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, বান্দারা যা আমল করে সে সম্পর্কে তিনি সর্বদ্রষ্টা। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ ﴾ [الحديد: ٤]
"তিনিই আসমানসমূহ ও যমীন ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনি 'আরশে উঠেছেন। তিনি জানেন যমীনে যা কিছু প্রবেশ করে এবং তা থেকে যা কিছু বের হয়; আর আসমান থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উত্থিত হয়। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথেই আছেন। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ০৪]
এ আয়াতের বাহ্যিক অর্থ এটা যে, আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের সঙ্গে আছেন। তবে এ সঙ্গে থাকার অর্থ বান্দাদের বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখা, বান্দাদের সকল আমল দেখা, কারণ তিনি সর্বোচ্চ 'আরশের উপরে আছেন। আয়াতের অর্থ এটা নয় যে, আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের সঙ্গে মিশে আছেন অথবা তাদের সঙ্গে যমীনে আছেন; কেননা এরূপ অর্থ হলে আয়াতের শুরুর অংশে আল্লাহ তা'আলার সর্বোচ্চতা ও 'আরশের উপরে থাকার যে কথা রয়েছে তার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে যাবে। (৮৭০)
অতএব, আমরা বুঝতে পারলাম যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের সঙ্গে আছেন এর দাবি হলো আল্লাহ তা'আলা তাদের অবস্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞাত, তিনি তাদের কথাবার্তার সর্বশ্রোতা, তিনি তাদের আমলসমূহের সর্বদ্রষ্টা, তিনি তাদের সকল বিষয় নিয়ন্ত্রণকারী। তিনি তাদের জীবনদানকারী, মৃত্যুদাতা, ধনাঢ্য দাতা ও দরিদ্রকারী। তিনি তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা রাজত্ব থেকে বঞ্চিত করেন, তিনি যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন, ইত্যাদি ইত্যাদি যা আল্লাহ তা'আলার রুবুবিয়াত ও তাঁর পরিপূর্ণ ক্ষমতা দাবী করে। সৃষ্টিজগতে হস্তক্ষেপ থেকে কোনো কিছুই আল্লাহ তা'আলাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে না। যার এই শান তিনি প্রকৃত অর্থেই তাঁর সৃষ্টির সাথে, যদিও তিনি তাদের ঊর্ধ্বে 'আরশের উপরে প্রকৃত অর্থে। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ 'আল আকীদাহ আল
ওয়াসেতিয়া'য় আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক বান্দার সাথে থাকার ব্যাপারে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন- 'আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপরে থাকা এবং একই মুহূর্তে আমাদের সঙ্গে থাকার ব্যাপারে যা কিছু বললেন, তা প্রকৃত অর্থেই। এ ক্ষেত্রে কোনো অর্থবিকৃতির প্রয়োজন নেই। তবে অবশ্যই মিথ্যা ধারণা থেকে আল্লাহ তা'আলার প্রতি আমাদের বিশ্বাসকে বাঁচাতে হবে। (৮৭১)
তিনি আল-ফাতওয়া আল-হামাওয়িয়্যাহ (৮৭২)-তে বলেন, 'এ ক্ষেত্রে সারকথা হলো, যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহ গভীরভাবে অধ্যায়ন করবে সে পরিপূর্ণ হিদায়াত ও আলো লাভ করতে সক্ষম হবে, যদি সে সত্যের অনুসরণকে উদ্দেশ্য বানায়, তাহরীফ ও বিকৃতি থেকে বেঁচে থাকে এবং আল্লাহ তা'আলার নাম ও সিফাতের ক্ষেত্রে ইলহাদ ও বিকৃতির আশ্রয় নেয়া থেকে বিরত থাকে।'
আর কোনো ধারণাকারী এ ধারণা করবে না যে, উল্লিখিত বিষয়ের একটি অন্যটির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যেমন কেউ বলল যে, 'আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপরে আছেন এ ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহ'য় যে বক্তব্য এসেছে তার বিপরীত বক্তব্য রয়েছে নিম্নবর্ণিত আয়াত ও হাদীসে। আয়াতটি হলো, 'আর তিনি তোমাদের সাথেই আছেন', আর হাদীসটি হলো, 'যখন তোমাদের কেউ সালাতে দাঁড়ায় তখন আল্লাহ তা'আলা নিশ্চয় তাঁর সম্মুখেই থাকেন'। (৮৭৩) এ জাতীয় ধারণা অর্থাৎ (আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর উঠা সংক্রান্ত) উল্লিখিত বক্তব্যের সঙ্গে উক্ত আয়াত ও হাদীসটি সাংঘর্ষিক, এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
আর তা এ জন্যে যে, আল্লাহ তা'আলা প্রকৃত অর্থেই আমাদের সঙ্গে আছেন, যেমন তিনি প্রকৃত অর্থেই 'আরশের উপরে আছেন। এক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা এ উভয় বিষয়কে একত্র করে বলেছেন: ﴿هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ ﴾ [الحديد: ٤]
"তিনিই আসমানসমূহ ও যমীন ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনি 'আরশে উঠেছেন। তিনি জানেন যমীনে যা কিছু প্রবেশ করে এবং তা থেকে যা কিছু বের হয়; আর আসমান থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উত্থিত হয়। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথেই আছেন। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।” [সূরা আল হাদীদ, আয়াত: ০৪]
আল্লাহ তা'আলা এ আয়াতে আমাদের এ সংবাদ দিয়েছেন যে তিনি 'আরশের উপরে আছেন। তিনি সকল বিষয়ে সুপরিজ্ঞাত এবং আমরা যেখানেই থাকি না কেন তিনি আমাদের সঙ্গেই আছেন। যেমন, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীসে বলেছেন : (والله فوق العرش، وهو يعلم ما أنتم عليه )আর আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপরে, তোমরা যে অবস্থায় আছ, আল্লাহ তা'আলা তা জানেন।)
ইমাম ইবনুল কাইয়েম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি তাঁর সৃষ্টির সাথে আছেন যদিও তিনি 'আরশের উপরে আছেন। আর আল্লাহ তা'আলা এ দু'টিকে একত্র করে উল্লেখ করেছেন। যেমন, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: এখানে তিনি সূরা আল-হাদীদ এর আয়াতটি উল্লেখ করেছেন, এরপর তিনি বলেছেন: অতঃপর আল্লাহ তা'আলা সংবাদ দিয়েছেন যে তিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি তাঁর 'আরশের উপরে উঠেছেন। তিনি তাঁর বান্দাদের সাথে আছেন এ অর্থে যে তিনি 'আরশের উপর থেকেই তাদের আমল দেখছেন, যেমন হাদীসে এসেছে: 'আর আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপরে, তোমরা যে অবস্থায় আছ তিনি তা জানেন।'(৮৭৪) অতএব আল্লাহ তা'আলার ঊর্ধ্বতা এবং মাখলুকের সঙ্গে থাকা, এ দু'টির মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই। আর মাখলুকের সঙ্গে থাকা আল্লাহ তা'আলার ঊর্ধ্বতাকে বাতিল করে দেয় না। বরং উভয়টিই সত্য।'(৮৭৫)
দুই. 'সঙ্গে থাকা'র প্রকৃত অর্থ তাঁর ঊর্ধ্বে থাকার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। বরং এ উভয় বিষয় সৃষ্টিবস্তুর ক্ষেত্রেও একত্র হতে পারে। উদাহরণত যদি কেউ বলে যে 'আমরা এখনও এ অবস্থায় চলছি যে চাঁদ আমাদের সাথে।' তাহলে এ কথার দ্বারা কোনো বৈপরীত্য বুঝা যাবে না। কেউ এরূপ বুঝবে না যে, চাঁদ মাটিতে নেমে এসেছে এবং আমাদের সঙ্গে চলতে শুরু করেছে। যদি সৃষ্টিবস্তুর ক্ষেত্রে এরূপ সম্ভব হয়, তাহলে সৃষ্টিকর্তা, যিনি সকল বিষয়কে পরিবেষ্টিত করে আছে, তিনি ঊর্ধ্বে থাকা সত্ত্বেও মাখলুকের সঙ্গে অবশ্যই থাকতে পারেন। এটা এ কারণে যে 'সঙ্গে থাকার প্রকৃত অর্থ এক জায়গায় একত্র হওয়াকে আবশ্যক করে না।
এ দিকে ইঙ্গিত করেই ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, আরবীতে مَعَ (সঙ্গে) শব্দটি যখন ব্যবহৃত হয় তখন এর বাহ্যিক অর্থ হয় সাধারণভাবে তুলনা করা, যা আবশ্যিকভাবে পরস্পর পরস্পরকে স্পর্শ অথবা একে অন্যের ডানে বা বামে থাকাকে দাবী করে না। যদি 'সঙ্গে থাকা'র অর্থকে বিশেষ কোনো বস্তু বা ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে উল্লেখ হয়, তবে তা সে বিশেষ অর্থ-কেন্দ্রিক তুলনাকে বুঝাবে। বলা হয় যে, আমরা এখনও চলছি আর চাঁদ আমাদের সঙ্গে অথবা তারকা আমাদের সঙ্গে। আরও বলা হয় যে 'এ বস্তুটি আমার সঙ্গে' যদিও তা আপনার মাথার উপরে। কেননা আপনার উদ্দেশ্য হলো এ বস্তুর সঙ্গে আপনার সম্পৃক্ততা বর্ণনা করা। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলাও প্রকৃত অর্থেই তাঁর মাখলুকের সঙ্গে আছেন যদিও তিনি প্রকৃত অর্থেই তাঁর 'আরশের উপরে আছেন।'(৮৭৬)
তিন, যদি মেনেও নিই যে, 'সঙ্গে থাকা' এবং ঊর্ধ্বতা এ দু'টি বিষয় কোনো সৃষ্টিবস্তুর ক্ষেত্রে একত্র হতে পারে না, তবুও বলব যে আল্লাহ তা'আলার ক্ষেত্রে এ দুটি বিষয় একত্র হওয়া নিষিদ্ধ নয়। কেননা তিনি নিজেই এ দুটি বিষয়কে একত্র করেছেন। কারণ, আল্লাহ তা'আলা অতুলনীয়, তাঁর সঙ্গে কোনো মাখলুকের তুলনা হয় না। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ ﴾ [الشورى: ١١] "তাঁর মতো কোনো জিনিস নেই, আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১]
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ এ দিকে ইঙ্গিত করেই 'আল-আকীদাহ আল-ওয়াসেতিয়া' গ্রন্থে বলেছেন, 'কুরআন-সুন্নাহ'য় আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অথবা সঙ্গে থাকার যে কথা বলা হয়েছে তা আল্লাহ তা'আলার ঊর্ধ্বতা ও সর্বোচ্চতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। কেননা আল্লাহ তা'আলার গুণসমগ্রের কোনোটির ক্ষেত্রেই তাঁর তুল্য কোনো বিষয় নেই। তিনি শীর্ষে থেকেও কাছে এবং নিকটে থেকেও ঊর্ধ্বে। ' (৮৭৭)
এর ব্যাখ্যায় বলা যায় যে, আরবী ভাষায় مَع (সঙ্গে) শব্দটি যখন ব্যবহৃত হয় তখন এর বাহ্যিক অর্থ হয় সাধারণভাবে তুলনা করা, যা আবশ্যিকভাবে পরস্পর পরস্পরকে স্পর্শ অথবা একে অন্যের ডানে বা বামে থাকাকে দাবি করে না। যদি 'সঙ্গে থাকা'র অর্থকে বিশেষ কোনো অর্থে সীমিত করে উল্লেখ করা হয়, তবে তা সে বিশেষ অর্থ-কেন্দ্রিক তুলনাকে বুঝাবে। বলা হয় যে, আমরা এখনও চলছি আর চাঁদ আমাদের সঙ্গে অথবা তারকা আমাদের সঙ্গে। আরও বলা হয় যে 'এ বস্তুটি আমার সঙ্গে' যদিও তা আপনার মাথার উপরে। কেননা আপনার উদ্দেশ্য হলো এ বস্তুর সঙ্গে আপনার স্পৃক্ততা বয়ান করা। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলাও প্রকৃত অর্থেই তাঁর মাখলুকের সঙ্গে আছেন যদিও তিনি প্রকৃত অর্থেই তাঁর 'আরশের উপরে আছেন। (৮৭৮)
সে হিসেবে আল্লাহ কর্তৃক মাখলুকের সঙ্গে থাকার দাবী হলো, তিনি তাঁর ইলম ও ক্ষমতায়, শ্রবণ ও দর্শনে, আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণে এবং রুবুবিয়াতের অন্যান্য অর্থে মাখলুককে পরিবেষ্টন করে আছেন। যদি 'সঙ্গে থাকা' বিশেষ কোনো ব্যক্তি বা গুণকে কেন্দ্র করে উল্লেখ না হয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴾وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ ﴿ [الحديد: ٤] “আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথেই আছেন।” [সূরা আল হাদীদ, আয়াত: ০৪] আরও বলেন, ﴾مَا يَكُونُ مِن نَّجْوَى ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ وَلَا أَدْنَى مِن ذَلِكَ وَلَا أَكْثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا ﴿ [المجادلة: ٧] "তিনজনের কোনো গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থজন হিসেবে আল্লাহ থাকেন না, আর পাঁচ জনেরও হয় না, যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি থাকেন না। এর চেয়ে কম হোক কিংবা বেশি হোক, তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন।" [সূরা আল-মুজাদালা, আয়াত: ০৭] আর যদি 'সঙ্গে থাকা'র বিষয়টি বিশেষ কোনো ব্যক্তি বা গুণকে কেন্দ্র করে উল্লেখ হয়, তখন উল্লিখিত অর্থগুলোর সঙ্গে যোগ হবে- সাহায্য সহযোগিতা করা, তাওফীক দেয়া এবং সঠিক পথ দেখানো।
আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক বিশেষ কোনো ব্যক্তির সঙ্গে থাকার উদাহরণ হলো মূসা ও হারূন 'আলাইহিমাস্ সালামকে লক্ষ্য করে আল্লাহ তা'আলার কথা: ﴾ لَا تَخَافَا إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى ﴿ [طه: ٤٦] "নিশ্চয় আমি তোমাদের সাথেই আছি। আমি সবকিছু শুনি ও দেখি।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ৪৬] আরও বলেন, ﴾ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا ﴿ [التوبة: ٤٠ "তুমি পেরেশান হয়ো না, নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।" [সূরা আত-তাওবা, আয়াত: ৪০]
বিশেষ কোনো গুণের সঙ্গে থাকার আরেকটি উদাহরণ হলো, আল্লাহ তা'আলার বাণী: ﴾وَأَصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ ﴿ [الأنفال: ٤٦] "আর তোমরা ধৈর্য ধর, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" [সূরা আল আনফাল, আয়াত: ৪৬] আল কুরআনে এ জাতীয় আরও বহু উদাহরণ রয়েছে।
শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহimhimullah 'ফাতওয়া আল হামাওয়িয়ায় বলেন, 'প্রসঙ্গের ভিন্নতা অনুযায়ী 'সঙ্গে থাকা'র ভিন্ন ভিন্ন হুকুম হয়ে থাকে। অতএব, আল্লাহ তা'আলা যখন يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ وَاللَّهُ ﴿ : 177 بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ ﴾ [الحديد: ٤] "তিনি জানেন যমীনে যা কিছু প্রবেশ করে এবং তা থেকে যা কিছু বের হয়; আর আসমান থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উত্থিত হয়। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথেই আছেন। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা। [সূরা আল হাদীদ, আয়াত: ০৪]
এই বাণীর বাহ্যিক অর্থ যা নির্দেশ করছে তা হলো, এই 'সঙ্গে থাকা'র হুকুম ও দাবি হলো, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের ব্যাপারে সম্যক অবহিত, তিনি তোমাদের ওপর সাক্ষী এবং তিনি তোমাদের ওপর আধিপত্যকারী ও তোমাদের ব্যাপারে জ্ঞানী। এটাই হলো সালাফদের কথার অর্থ যে, তিনি তাঁর জ্ঞানের মাধ্যমে তোমাদের সঙ্গে আছেন। আর এটাই হলো উল্লিখিত বাণীর বাহ্যিক ও প্রকৃত অর্থ।
ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহimhimullah বলেন, যখন নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাহাড়ের গুহায় তাঁর সাথীকে বললেন: 'তুমি পেরেশান হয়ো না, নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন' তখন এটাও তার বাহ্যিক অর্থেই এবং অবস্থার পারিপার্শ্বিকতা থেকে বুঝা যায় যে, এখানে 'সঙ্গে থাকা'র অর্থ সম্যকভাবে অবহিত থাকা, সাহায্য-সহযোগিতা করা। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ١٢٨﴿ ﴾ ]إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَواْ وَالَّذِينَ هُم تُحْسِنُونَ [النحل: “নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১২৮]
অনুরূপভাবে মূসা ও হারূন 'আলাইহিমাস সালামকে লক্ষ্য করে আল্লাহ তা'আলার বাণী: قَالَ لَا ﴿ تَخَافَةٌ إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى ﴾ [طه: ٤٦] "ভয় করো না, আমি তো তোমাদের সাথেই আছি। আমি সবকিছু শুনি ও দেখি।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ৪৬]
এখানে 'সঙ্গে থাকা' বাহ্যিক অর্থেই। আর এসব স্থলে সঙ্গে থাকার অর্থ হলো: সাহায্য-সহযোগিতা। পরিশেষে ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেছেন, 'সঙ্গে থাকা' এর অর্থ ও তার চাহিদার মধ্যে পার্থক্য আছে। আর হতে পারে যে, যা সঙ্গে থাকার চাহিদা তাই তার অর্থ, যা স্থানভেদে ভিন্ন হয়। (৮৭৯)
ইবনুল কাইয়্যেম রাহimhimullah বলেন, مع )সঙ্গে) শব্দটি যে অর্থ বুঝায় তা হলো সঙ্গ দেয়া, সম্মতি জ্ঞাপন করা। অতএব, যদি সাধারণভাবে বলা হয় যে, আল্লাহ তাঁর মাখলুকের সঙ্গে আছেন, তবে এর দাবীগত আবশ্যিক অর্থ হবে, তিনি তাঁর মাখলুক বিষয়ে সম্যক অবহিত, তিনি তাদের রক্ষণা-বেক্ষণ করছেন এবং তিনি তাদের ওপর ক্ষমতাবান। আর যদি বিশেষভাবে বলা হয়, যেমন নিম্নোক্ত আয়াতে: إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَواْ وَالَّذِينَ هُم تُحْسِنُونَ ﴾ [النحل: ۱۲۸﴿ “নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১২৮]
তাহলে তার দাবীগত আবশ্যিক অর্থ হবে, আল্লাহ তা'আলা সাহায্য- সহযোগিতা ও সমর্থনদানের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে আছেন।
অতএব আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তাঁর বান্দার সঙ্গে থাকা দুই প্রকার: সাধারণভাবে সঙ্গে থাকা
এবং বিশেষভাবে সঙ্গে থাকা। আর আল-কুরআনে উভয় প্রকারের কথাই উল্লেখ রয়েছে। (৮৮০)
ইমাম নাওয়াওয়ী রচিত 'চল্লিশ হাদীস' গ্রন্থের ঊনিশ নম্বর হাদীসের ব্যাখ্যায় ইবন রজব রাহimhimullah বলেন, 'বিশেষভাবে সঙ্গে থাকার দাবী হলো, আল্লাহ তা'আলা সাহায্য, সমর্থন, সুরক্ষা এবং সহযোগিতার মাধ্যমে সঙ্গে থাকেন। আর সাধারণভাবে সঙ্গে থাকার অর্থ আল্লাহ তা'আলা তাঁর জ্ঞান, অবগত থাকা এবং তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে থাকেন।'
ইমাম ইবন কাসীর রাহimhimullah সূরায়ে মুজাদালায় 'সঙ্গে থাকা বিষয়ক' আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, 'এ কারণেই একাধিক আলেম এ ব্যাপারে ইজমা'র কথা উল্লেখ করেছেন যে, এখানে সঙ্গে থাকার অর্থ 'জ্ঞানের মাধ্যমে সঙ্গে থাকা'। এ অর্থ নেয়ার বিষয়টি সন্দেহাতীত। তবে জ্ঞান ও দৃষ্টির মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা তার মাখলুকের সঙ্গে থাকার পাশাপাশি তিনি শ্রবণের মাধ্যমেও তাদের পরিবেষ্টন করে আছেন। অতএব, আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টিকুল সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত এবং তাদের কোনো কিছুই তাঁর কাছে অদৃশ্য নয়।'
চার. মা'য়িয়্যাত বা 'সাথে থাকা' এর অর্থ কয়েকটি হতে পারে: * সাথে থাকা মানে, মিশে যাওয়া, মিশ্রিত হওয়া। যেমন কেউ বলে, পানির সাথে দুধ মিশিয়ে পান করেছে। কুরআনে কারীমে এসেছে,
﴿هُوَ الَّذِي أَنزَلَ السَّكِينَةَ فِي قُلُوبِ الْمُؤْمِنِينَ لِيَزْدَادُوا إِيمَانًا مَّعَ إِيمَانِهِمْ وَلِلهِ جُنُودُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَكَانَ اللهُ عَلِيمًا حَكِيمًا ﴾ [الفتح: ٤]
"তিনিই মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি নাযিল করেছেন যেন তারা তাদের ঈমানের সাথে ঈমান বৃদ্ধি করে নেয়। আর আসমানসমূহ ও যমীনের বাহিনীসমূহ আল্লাহরই এবং আল্লাহ হলেন সর্বজ্ঞ, হিকমতওয়ালা।” [সূরা আল-ফাতহ, আয়াত: ০৪] * 'সাথে থাকা' মানে, একই স্থানে থাকা। যেমন কেউ বলে, আমি দুজনকে দেখেছি একসাথে চলতে। কুরআনে কারীমে এ অর্থে এসেছে, যেমন,
১- আল্লাহর বাণী: ﴿وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَوٰةَ وَارْكَعُوا مَعَ الرَّاكِعِينَ ﴾ [البقرة: ٤٣]
"আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর ও যাকাত দাও এবং রুকূ'কারীদের সাথে রুকূ' কর।" [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ৪৩]
২- অনুরূপ আল্লাহর বাণী: ﴿وَكُنَّا نَخُوضُ مَعَ الْخَائِضِينَ ﴾ [المدثر: ٤٥]
“এবং আমরা অনর্থক আলাপকারীদের সাথে বেহুদা আলাপে মগ্ন থাকতাম।” [সূরা আল-মুদ্দাসসির, আয়াত: ৪৫]
৩- অনুরূপ আল্লাহ বাণী:
﴿وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ ﴾ [النساء : ١٤٠]
“কিতাবে তোমাদের প্রতি তিনি তো নাযিল করেছেন যে, যখন তোমরা শুনবে, আল্লাহর আয়াত প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে এবং তা নিয়ে বিদ্রূপ করা হচ্ছে, তখন যে পর্যন্ত তারা অন্য প্রসংগে লিপ্ত না হবে তোমরা তাদের সাথে বসো না।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৪০] ৪- অনুরূপ আল্লাহর বাণী:
﴿وَمَا لَنَا لَا نُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَمَا جَاءَنَا مِنَ الْحَقِّ وَنَطْمَعُ أَن يُدْخِلَنَا رَبُّنَا مَعَ الْقَوْمِ الصَّالِحِينَ ﴾ [المائدة: ٨٤]
"আর আল্লাহর প্রতি ও আমাদের কাছে আসা সত্যের প্রতি ঈমান না আনার কি কারণ থাকতে পারে যখন আমরা প্রত্যাশা করি যে, আমাদের রব আমাদেরকে নেককার সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত করবেন?” [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৮৪] ৫- আল্লাহর বাণী,
﴿وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُوْلَبِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِم مِّنَ النَّبِيِّنَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ وَحَسُنَ أُوْلَبِكَ رَفِيقًا ﴾ [النساء : ٦٩]
"আর কেউ আল্লাহ্ এবং রাসূলের আনুগত্য করলে সে নবী, সিদ্দীক (সত্যনিষ্ঠ), শহীদ ও সৎকর্মপরায়ণ- যাদের প্রতি আল্লাহ্ অনুগ্রহ করেছেন- তাদের সঙ্গী হবে এবং তারা কত উত্তম সঙ্গী!” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৬৯] ৬- আল্লাহর বাণী,
﴿وَلَوْ أَرَادُوا الْخُرُوجَ لَأَعَدُّوا لَهُ عُدَّةً وَلَكِن كَرِهَ اللَّهُ انْبِعَاثَهُمْ فَقَبَّطَهُمْ وَقِيلَ اقْعُدُوا مَعَ الْقَاعِدِينَ ﴾ [التوبة: ٤٦]
"আর যদি তারা বের হতে চাইত তবে অবশ্যই তারা সে জন্য প্রস্তুতির ব্যবস্থা করত, কিন্তু তাদের অভিযাত্রা আল্লাহ্ অপছন্দ করলেন। কাজেই তিনি তাদেরকে অলসতার মাধ্যমে বিরত রাখেন এবং তাদেরকে বলা হল, 'যারা বসে আছে তাদের সাথে বসে থাক।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৪৬]
'সাথে থাকা' মানে মিশে যাওয়াও নয় আবার একই স্থানে থাকাও নয়, বরং অবস্থা অনুসারে অর্থ নির্ধারণ করা। কুরআনে কারীমে বহু জায়গায় মা'আ ('সাথে') ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলোকে কেউ কোনোদিন লেগে থাকার অর্থে ব্যবহার করেনি, আর তা সম্ভবও নয়। যেমন, ১- আল্লাহর বাণী,
﴿مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ ﴾ [الفتح: ٢٩]
"মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল; আর তার সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর, তাদের পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল।” [সূরা আল-ফাতহ, আয়াত: ২৯] এখানে (مع) 'সাথে' মানে লেগে থাকা নয়।
২- আল্লাহর বাণী: ﴿ يَمَرْيَمُ اقْنُتِي لِرَبِّكِ وَاسْجُدِى وَأَرْكَعِي مَعَ الرَّاكِعِينَ ﴾ [ال عمران: ٤٣] "হে মারইয়াম! আপনার রবের অনুগত হন এবং সাজদাহ করুন আর রুকূ'কারীদের সাথে রুকূ' করুন।" [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৪৩]
৩- আল্লাহর বাণী: ﴿ رَبَّنَا ءَامَنَّا بِمَا أَنزَلْتَ وَاتَّبَعْنَا الرَّسُولَ فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّهِدِينَ ﴾ [ال عمران: ٥٣] "হে আমাদের রব! আপনি যা নাযিল করেছেন তার প্রতি আমরা ঈমান এনেছি এবং আমরা এ রাসূলের অনুসরণ করেছি। কাজেই আমাদেরকে সাক্ষ্যদানকারীদের তালিকাভুক্ত করে নিন।" [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৫৩]
৪- আল্লাহর বাণী: ﴿ رَّبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُنَادِي لِلْإِيمَانِ أَنْ ءَامِنُوا بِرَبِّكُمْ فَقَامَنَا رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ ﴾ [ال عمران: ١٩٣] “হে আমাদের রব, আমরা এক আহ্বায়ককে ঈমানের দিকে আহ্বান করতে শুনেছি, 'তোমরা তোমাদের রবের উপর ঈমান আন।' কাজেই আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের রব! আপনি আমাদের পাপরাশি ক্ষমা করুন, আমাদের মন্দ কাজগুলো দূরীভূত করুন এবং আমাদেরকে সৎকর্মপরায়ণদের সহগামী করে মৃত্যু দিন।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯৩]
৫- আল্লাহর বাণী: ﴿ إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا وَأَصْلَحُوا وَاعْتَصَمُوا بِاللَّهِ وَأَخْلَصُوا دِينَهُمْ لِلهِ فَأُوْلَبِكَ مَعَ الْمُؤْمِنِينَ وَسَوْفَ يُؤْتِ اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ أَجْرًا عَظِيمًا ﴾ [النساء : ١٤٦] "কিন্তু যারা তাওবাহ্ করে, নিজেদেরকে সংশোধন করে, আল্লাহকে দৃঢ়ভাবে অবলম্বন করে এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে তাদের দ্বীনকে একনিষ্ট করে, তারা মুমিনদের সঙ্গে থাকবে এবং মুমিনদেরকে আল্লাহ্ অবশ্যই মহাপুরস্কার দিবেন।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৪৬]
৬- আল্লাহর বাণী: ﴿ وَإِذَا سَمِعُوا مَا أُنزِلَ إِلَى الرَّسُولِ تَرَى أَعْيُنَهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ مِمَّا عَرَفُوا مِنَ الْحَقِّ يَقُولُونَ رَبَّنَا ءَامَنَّا فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّهِدِينَ ﴾ [المائدة: ٨٣] "আর রাসূলের প্রতি যা নাযিল হয়েছে তা যখন তারা শুনে, তখন তারা যে সত্য উপলব্ধি করে তার জন্য আপনি তাদের চোখ অশ্রু বিগলিত দেখবেন। তারা বলে, 'হে আমাদের রব! আমরা ঈমান এনেছি; কাজেই আপনি আমাদেরকে সাক্ষ্যবহদের তালিকাভুক্ত করুন।” [সূরা মায়েদাহ, আয়াত: ৮৩]
أَبِنَّكُمْ لَتَشْهَدُونَ أَنَّ مَعَ اللَّهِ وَالِهَةً أُخْرَى قُل لَّا أَشْهَذْ قُلْ إِنَّمَا هُوَ إِلَهُ وَاحِدٌ وَإِنَّنِي بَرِيءٌ مِّمَّا تُشْرِكُونَ )[الانعام: ١٩]
"তোমরা কি এ সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহ্ আছে? বলুন, 'আমি সে সাক্ষ্য দেই না'। বলুন, 'তিনি তো একমাত্র প্রকৃত ইলাহ্ এবং তোমরা যা শরীক কর তা থেকে আমি অবশ্যই বিমুক্ত।” [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ১৯] নিঃসন্দেহে কোনো ব্যক্তি এটা মনে করে না যে, আল্লাহর সাথে অন্য কোনো ইলাহ তাঁর স্থানের সঙ্গী হিসেবে থাকে।
الَّذِينَ يَجْعَلُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهَا ءَاخَرَ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ ﴾ [الحجر: ٩٦]
"যারা আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্য সাব্যস্ত করে। অতএব অতিসত্তর তারা জেনে নিবে।" [সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৯৬]
لَّا تَجْعَلْ مَعَ اللَّهِ إِلَيْهَا ءَاخَرَ فَتَقْعُدَ مَذْمُومًا تَخْذُولًا ﴾ [الاسراء: ٢٢]
"আল্লাহর সাথে অন্য কোনো ইলাহ্ সাব্যস্ত করো না; করলে নিন্দিত ও লাঞ্ছিত হয়ে বসে পড়বে।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২২]
وَلَا تَجْعَلْ مَعَ اللَّهِ إِلَيْهَا ءَاخَرَ فَتُلْقَى فِي جَهَنَّمَ مَلُومًا مَّدْحُورًا ﴾ [الاسراء: ٣٩]
"আর আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহ স্থির করো না, করলে নিন্দিত ও বিতাড়িত অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩৯]
فَفَهَّمْنَهَا سُلَيْمَانَ وَكُلًّا ءَاتَيْنَا حُكْمًا وَعِلْمًا وَسَخَّرْنَا مَعَ دَاوُودَ الْجِبَالَ يُسَبِّحْنَ وَالطَّيْرِ وَكُنَّا فَاعِلِينَ * [الانبياء: ٧٩]
"অতঃপর আমরা সুলায়মানকে এ বিষয়ের মীমাংসা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম এবং তাদের প্রত্যেককে আমরা দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ও জ্ঞান। আর আমরা পর্বত ও পাখিদেরকে দাউদের অনুগত করে দিয়েছিলাম, তারা তার সাথে পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করত, আর আমরাই ছিলাম এ সবের কর্তা।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৭৯]
وَمَن يَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَيْهَا ءَاخَرَ لَا بُرْهَانَ لَهُ بِهِ، فَإِنَّمَا حِسَابُهُ عِندَ رَبِّهِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ ) [المؤمنون : ۱۱۷]
"আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহকে ডাকে, এ বিষয়ে তার নিকট কোনো প্রমাণ নেই; তার হিসাব তো তার রব-এর নিকটই আছে; নিশ্চয় কাফিররা সফলকাম হবে না।” [সূরা আল-মুমিনূন, আয়াত: ১১৭]
১৩- আল্লাহর বাণী: وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهَا ءَاخَرَ ) [الفرقان: ٦٨]
"এবং তারা আল্লাহর সাথে কোনো ইলাহকে ডাকে না।" [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৬৮]
১৪- আল্লাহর বাণী: الَّذِي جَعَلَ مَعَ اللَّهِ إِلَيْهَا ءَاخَرَ فَأَلْقِيَاهُ فِي الْعَذَابِ الشَّدِيدِ ) [ق: ٢٦]
"যে আল্লাহর সঙ্গে অন্য ইলাহ্ গ্রহণ করেছিল, তোমরা তাকে কঠিন শাস্তিতে নিক্ষেপ কর।" [সূরা ক্বাফ, আয়াত: ২৬]
১৫- আল্লাহর বাণী: فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا ﴾ [الشرح: ٥]
"সুতরাং কষ্টের সাথেই তো স্বস্তি আছে।” [সূরা আল-ইনশিরাহ, আয়াত: ০৫]
এ সকল আল্লাহর বাণীতে 'সাথে' শব্দটি এসেছে, কিন্তু কোথাও এগুলো দ্বারা লেগে থাকা বা মিলে-মিশে যাওয়া বুঝানো হয়নি।
এখানে এটাই বলা উদ্দেশ্য যে, মা'য়িয়্যাহ বা 'সাথে' শব্দটি বিভিন্ন অর্থ প্রদান করে, এটি একটি, মুশতারাক শব্দ। যার মধ্যে দু'টি দিক থাকে, যার দু'টি দিকের মধ্যে কোনো একটি বাঁধন থাকে, কখনও সে বাঁধন স্থান হতে পারে, আবার কখনও গুণ হতে পারে। আবার কখনও কখনও অবস্থাও হতে পারে। আবার কখনও কখনও সাহায্যও হতে পারে। তাহলে 'মা'আ', মা'য়িয়্যাহ বা 'সাথে' এ শব্দটি অভিধান অনুযায়ী কোনো বিষয়ে সামান্যতম এককে শরীক হওয়াই বুঝায়। সত্তাগতভাবে শরীক হওয়া বুঝায় না। আর এজন্যই যারা আমাদের সাথে মনের দিক থেকে মিল থাকে আমরা তাদেরকে বলে থাকি, 'আমরা তোমার সাথে আছি' অথবা বলি, 'তোমার সাথে একমত'। অনুরূপ যদি কাউকে আমরা ব্যবসায় শরীক করতে চাই তাহলে বলি, 'আমরা তোমার সাথে আছি'। এসব বাক্যের উদ্দেশ্য কখনও এটা থাকে না যে, আমরা তোমার স্থানে শরীক রয়েছি। এসবই প্রমাণ করে যে, 'মা'য়িয়্যাহ' বস্তুত কোনো একটি কমন মিলকে বুঝায়, তারপর বাক্যের অবস্থা অনুযায়ী নির্ধারিত হবে কোথায় কী অর্থ উদ্দেশ্য। তাই আল্লাহর বাণী, أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ مَا يَكُونُ مِن نَّجْوَى ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ وَلَا أَدْنَى مِن ذَلِكَ وَلَا أَكْثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا عَمِلُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ ﴾ [المجادلة: ٧]
"আপনি কি লক্ষ্য করেন না যে, আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে আল্লাহ্ তা জানেন? তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোন গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থজন হিসেবে তিনি থাকেন না এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যেও হয় না যাতে ষষ্টজন হিসেবে তিনি থাকেন না। তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশি হোক তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন তারা যেখানেই থাকুক না কেন। তারপর তারা যা করে, তিনি তাদেরকে কিয়ামতের দিন তা জানিয়ে দিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সব কিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।” [সূরা আল-মুজাদালাহ, আয়াত: ০৭] এখানে বাক্যের শুরুতে ইলম বা জ্ঞানের কথা বলা হয়েছে, অনুরূপ বাক্যের শেষেও ইলম বা জ্ঞানের কথা বলা হয়েছে, যা প্রমাণ করছে
যে, মাঝখানে 'সাথে' থাকার যে কথাটি বর্ণিত হয়েছে তা অবশ্যই 'ইলম' এর মাধ্যমে সাথে থাকাকেই বুঝানো হয়েছে।
পঞ্চমত: এই 'সঙ্গে থাকা' আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তাঁর মাখলুকের ঊর্ধ্বে থাকা এবং 'আরশের ওপরে থাকার সাথে সাংঘর্ষিক নয়; কেননা আল্লাহ তাআলার জন্যে নিরঙ্কুশ ঊর্ধ্বতা প্রমাণিত, সত্তাগতভাবে ও গুণগতভাবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, ﴿ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ ﴾ [البقرة: ٢٥٥] “আর তিনি সুউচ্চ, মহান। [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ২৫৫] তিনি অন্যত্র বলেন: ﴿ سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى ﴾ [الأعلى: ١] “তুমি তোমার সুমহান রবের নামের তাসবীহ পাঠ কর।” [সূরা আল-আ'লা, আয়াত: ০১] অন্য এক আয়াতে বলেন, ﴿ وَلِلَّهِ الْمَثَلُ الْأَعْلَى وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ ﴾ [النحل : ٦٠] “আল্লাহর জন্য রয়েছে মহান উদাহরণ। আর তিনিই পরাক্রমশালী, মহাজ্ঞানী।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৬০]
আর কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা', আক্কল এবং ফিতরতের দলীল এ ব্যাপারে একত্র হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা সর্বোর্ধ্বে। এ ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর দলীল তো গুণে শেষ করার মতো নয়। অকাট্য দলীলের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার জন্য প্রমাণিত এই ঊর্ধ্বতার সাথে আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক মাখলুকের সঙ্গে থাকার কোনো সংঘর্ষ নেই। আর তা কয়েক কারণে:
এক. আল্লাহ তা'আলা তাঁর কিতাবে- যা বৈপরীত্য থেকে মুক্ত -এ দুটি বিষয়কে নিজের জন্য একত্র করে উল্লেখ করেছেন। অতএব, এ দুটি যদি সাংঘর্ষিক হতো তবে আল-কুরআন এ দুটোকে একত্র করে উল্লেখ করত না। আর আল কুরআনের কোনো বিষয় যদি আপনার কাছে বৈপরীত্যপূর্ণ বলে মনে হয়, তাহলে তা বারবার ঘেঁটে দেখুন, যতক্ষণ না আপনার কাছে বিষয়টি পরিস্কার হয়ে না যায়। আল্লাহ তা'আলা বলেন : ﴿ أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا ﴾ [النساء: ٨٢] “তারা কি কুরআন নিয়ে গবেষণা করে না? আর যদি তা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে হত, তবে অবশ্যই তারা এতে অনেক বৈপরীত্য দেখতে পেত।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৮২]
দুই: 'সঙ্গে থাকা' এবং উচুতে থাকা সৃষ্টিবস্তুর জন্যেও সম্ভব। যেমন চাঁদ। অতএব, কেউ যদি রাতের বেলায় পথ চলার সময় বলে আমরা এ অবস্থায় চলছি যে, এখনো চাঁদ আমাদের সঙ্গেই আছে, তবে এটাকে বিপরীতমুখী কথা হিসেবে আখ্যা দেয়া হবে না। আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, যারা পথ চলে তারা যমীনে, আর চাদ হলো আকাশে। অতএব, যদি একটি মাখলুখের ক্ষেত্রে এরূপ সম্ভব হয় তবে যিনি সৃষ্টিকর্তা তাঁর ক্ষেত্রে এরূপ কেন সম্ভব হবে না।
'বরং চাঁদ আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি নিদর্শন, সে আল্লাহর ছোট্ট মাখলুকের মধ্যে একটি। সে মুসাফির এবং অমুসাফিরের সঙ্গে আছে তারা যেখানেই থাক না কেন।'
ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ'র এ কথার ব্যাখ্যায় শাইখ মুহাম্মদ খালীল আল-হাররাস বলেন, 'তিনি চাঁদের উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বুঝিয়েছেন যা আকাশে স্থাপিত। চাঁদ মুসাফির ও অমুসাফির সবার সঙ্গেই আছে, তারা যেখানেই থাক না কেন। যদি এটা চাঁদের বেলায় সম্ভব হয় যা আল্লাহ তা'আলার ছোট্ট মাখলুকের মধ্যে একটি, তাহলে যিনি সূক্ষাতিসূক্ষ বিষয় সম্পর্কে সম্যক অবহিত, যিনি তাঁর বান্দাদের সকল বিষয় জানেন এবং তাদের সকল বিষয়ের উপর ক্ষমতাবান, যার হাতে আকাশ ও পৃথিবী ও সমগ্র মহাবিশ্ব ঠিক আমাদের হাতে থাকা ছোট্ট
একটি গুটির মতো, তাঁর ব্যাপারে কি এটা বলা ঠিক হবে না যে, তিনি তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে আছেন যদিও তিনি তাদের ঊর্ধ্বে, তাদের থেকে আলাদা এবং 'আরশের ওপরে?'(৮৮১)
তিন: যদি মেনেও নিই যে, 'সঙ্গে থাকা' এবং ঊর্ধ্বতা এ দু'টি বিষয় কোনো মাখলুকের ক্ষেত্রে একত্র হওয়া সম্ভব নয়, তবুও বলব যে আল্লাহ তা'আলার ক্ষেত্রে এ দুটি বিষয় একত্র হওয়া নিষিদ্ধ নয়। কেননা তিনি নিজেই এ দুটি বিষয়কে একত্র করেছেন। কারণ, আল্লাহ তা'আলা অতুলনীয়, তাঁর সঙ্গে কোনো মাখলুকের তুলনা হয় না। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴿لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ ﴾ [الشورى: ١١] "তাঁর মত কিছু নেই, আর তিনি হলেন সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১]
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রাহimhimullah আল আকীদাহ আল ওয়াসিতিয়া গ্রন্থে বলেছেন, 'আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক মাখলুকের নিকটতা ও সঙ্গে থাকার ব্যাপারে কুরআন-সুন্নায় যা এসেছে তা আল্লাহর সর্বোদ্ধতা ও সর্বোপরে থাকার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়; কারণ সকল গুণের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলা হলেন উদাহরণবিহীন। তিনি শীর্ষে থেকেও কাছে এবং নিকটে থেকেও ঊর্ধ্বে। ' (৮৭৭)
এর ব্যাখ্যায় বলা যায় যে, আরবী ভাষায় مَع (সঙ্গে) শব্দটি যখন ব্যবহৃত হয় তখন এর বাহ্যিক অর্থ হয় সাধারণভাবে তুলনা করা, যা আবশ্যিকভাবে পরস্পর পরস্পরকে স্পর্শ অথবা একে অন্যের ডানে বা বামে থাকাকে দাবি করে না। যদি 'সঙ্গে থাকা'র অর্থকে বিশেষ কোনো অর্থে সীমিত করে উল্লেখ করা হয়, তবে তা সে বিশেষ অর্থ-কেন্দ্রিক তুলনাকে বুঝাবে। বলা হয় যে, আমরা এখনও চলছি আর চাঁদ আমাদের সঙ্গে অথবা তারকা আমাদের সঙ্গে। আরও বলা হয় যে 'এ বস্তুটি আমার সঙ্গে' যদিও তা আপনার মাথার উপরে। কেননা আপনার উদ্দেশ্য হলো এ বস্তুর সঙ্গে আপনার স্পৃক্ততা বয়ান করা। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলাও প্রকৃত অর্থেই তাঁর মাখলুকের সঙ্গে আছেন যদিও তিনি প্রকৃত অর্থেই তাঁর 'আরশের উপরে আছেন। (৮৭৮)
সে হিসেবে আল্লাহ কর্তৃক মাখলুকের সঙ্গে থাকার দাবী হলো, তিনি তাঁর ইলম ও ক্ষমতায়, শ্রবণ ও দর্শনে, আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণে এবং রুবুবিয়াতের অন্যান্য অর্থে মাখলুককে পরিবেষ্টন করে আছেন। যদি 'সঙ্গে থাকা' বিশেষ কোনো ব্যক্তি বা গুণকে কেন্দ্র করে উল্লেখ না হয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ﴾وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ ﴿ [الحديد: ٤] “আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথেই আছেন।” [সূরা আল হাদীদ, আয়াত: ০৪] আরও বলেন, ﴾مَا يَكُونُ مِن نَّجْوَى ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ وَلَا أَدْنَى مِن ذَلِكَ وَلَا أَكْثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا ﴿ [المجادلة: ٧] "তিনজনের কোনো গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থজন হিসেবে আল্লাহ থাকেন না, আর পাঁচ জনেরও হয় না, যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি থাকেন না। এর চেয়ে কম হোক কিংবা বেশি হোক, তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন।" [সূরা আল-মুজাদালা, আয়াত: ০৭] আর যদি 'সঙ্গে থাকা'র বিষয়টি বিশেষ কোনো ব্যক্তি বা গুণকে কেন্দ্র করে উল্লেখ হয়, তখন উল্লিখিত অর্থগুলোর সঙ্গে যোগ হবে- সাহায্য সহযোগিতা করা, তাওফীক দেয়া এবং সঠিক পথ দেখানো।
আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক বিশেষ কোনো ব্যক্তির সঙ্গে থাকার উদাহরণ হলো মূসা ও হারূন 'আলাইহিমাস্ সালামকে লক্ষ্য করে আল্লাহ তা'আলার কথা: ﴾ لَا تَخَافَا إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى ﴿ [طه: ٤٦] "নিশ্চয় আমি তোমাদের সাথেই আছি। আমি সবকিছু শুনি ও দেখি।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ৪৬] আরও বলেন, ﴾ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا ﴿ [التوبة: ٤٠ "তুমি পেরেশান হয়ো না, নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।" [সূরা আত-তাওবা, আয়াত: ৪০]
বিশেষ কোনো গুণের সঙ্গে থাকার আরেকটি উদাহরণ হলো, আল্লাহ তা'আলার বাণী: ﴾وَأَصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ ﴿ [الأنفال: ٤٦] "আর তোমরা ধৈর্য ধর, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" [সূরা আল আনফাল, আয়াত: ৪৬] আল কুরআনে এ জাতীয় আরও বহু উদাহরণ রয়েছে।
শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহimhimullah 'ফাতওয়া আল হামাওয়িয়ায় বলেন, 'প্রসঙ্গের ভিন্নতা অনুযায়ী 'সঙ্গে থাকা'র ভিন্ন ভিন্ন হুকুম হয়ে থাকে। অতএব, আল্লাহ তা'আলা যখন يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ وَاللَّهُ ﴿ : 177 بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ ﴾ [الحديد: ٤] "তিনি জানেন যমীনে যা কিছু প্রবেশ করে এবং তা থেকে যা কিছু বের হয়; আর আসমান থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উত্থিত হয়। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথেই আছেন। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা। [সূরা আল হাদীদ, আয়াত: ০৪]
এই বাণীর বাহ্যিক অর্থ যা নির্দেশ করছে তা হলো, এই 'সঙ্গে থাকা'র হুকুম ও দাবি হলো, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের ব্যাপারে সম্যক অবহিত, তিনি তোমাদের ওপর সাক্ষী এবং তিনি তোমাদের ওপর আধিপত্যকারী ও তোমাদের ব্যাপারে জ্ঞানী। এটাই হলো সালাফদের কথার অর্থ যে, তিনি তাঁর জ্ঞানের মাধ্যমে তোমাদের সঙ্গে আছেন। আর এটাই হলো উল্লিখিত বাণীর বাহ্যিক ও প্রকৃত অর্থ।
ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহimhimullah বলেন, যখন নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাহাড়ের গুহায় তাঁর সাথীকে বললেন: 'তুমি পেরেশান হয়ো না, নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন' তখন এটাও তার বাহ্যিক অর্থেই এবং অবস্থার পারিপার্শ্বিকতা থেকে বুঝা যায় যে, এখানে 'সঙ্গে থাকা'র অর্থ সম্যকভাবে অবহিত থাকা, সাহায্য-সহযোগিতা করা। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: ١٢٨﴿ ﴾ ]إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَواْ وَالَّذِينَ هُم تُحْسِنُونَ [النحل: “নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১২৮]
অনুরূপভাবে মূসা ও হারূন 'আলাইহিমাস সালামকে লক্ষ্য করে আল্লাহ তা'আলার বাণী: قَالَ لَا ﴿ تَخَافَةٌ إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى ﴾ [طه: ٤٦] "ভয় করো না, আমি তো তোমাদের সাথেই আছি। আমি সবকিছু শুনি ও দেখি।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ৪৬]
এখানে 'সঙ্গে থাকা' বাহ্যিক অর্থেই। আর এসব স্থলে সঙ্গে থাকার অর্থ হলো: সাহায্য-সহযোগিতা। পরিশেষে ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেছেন, 'সঙ্গে থাকা' এর অর্থ ও তার চাহিদার মধ্যে পার্থক্য আছে। আর হতে পারে যে, যা সঙ্গে থাকার চাহিদা তাই তার অর্থ, যা স্থানভেদে ভিন্ন হয়। (৮৭৯)
ইবনুল কাইয়্যেম রাহimhimullah বলেন, مع )সঙ্গে) শব্দটি যে অর্থ বুঝায় তা হলো সঙ্গ দেয়া, সম্মতি জ্ঞাপন করা। অতএব, যদি সাধারণভাবে বলা হয় যে, আল্লাহ তাঁর মাখলুকের সঙ্গে আছেন, তবে এর দাবীগত আবশ্যিক অর্থ হবে, তিনি তাঁর মাখলুক বিষয়ে সম্যক অবহিত, তিনি তাদের রক্ষণা-বেক্ষণ করছেন এবং তিনি তাদের ওপর ক্ষমতাবান। আর যদি বিশেষভাবে বলা হয়, যেমন নিম্নোক্ত আয়াতে: إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَواْ وَالَّذِينَ هُم تُحْسِنُونَ ﴾ [النحل: ۱۲۸﴿ “নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১২৮]
তাহলে তার দাবীগত আবশ্যিক অর্থ হবে, আল্লাহ তা'আলা সাহায্য- সহযোগিতা ও সমর্থনদানের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে আছেন।
অতএব আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তাঁর বান্দার সঙ্গে থাকা দুই প্রকার: সাধারণভাবে সঙ্গে থাকা
এবং বিশেষভাবে সঙ্গে থাকা। আর আল-কুরআনে উভয় প্রকারের কথাই উল্লেখ রয়েছে। (৮৮০)
ইমাম নাওয়াওয়ী রচিত 'চল্লিশ হাদীস' গ্রন্থের ঊনিশ নম্বর হাদীসের ব্যাখ্যায় ইবন রজব রাহimhimullah বলেন, 'বিশেষভাবে সঙ্গে থাকার দাবী হলো, আল্লাহ তা'আলা সাহায্য, সমর্থন, সুরক্ষা এবং সহযোগিতার মাধ্যমে সঙ্গে থাকেন। আর সাধারণভাবে সঙ্গে থাকার অর্থ আল্লাহ তা'আলা তাঁর জ্ঞান, অবগত থাকা এবং তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে থাকেন।'
ইমাম ইবন কাসীর রাহimhimullah সূরায়ে মুজাদালায় 'সঙ্গে থাকা বিষয়ক' আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, 'এ কারণেই একাধিক আলেম এ ব্যাপারে ইজমা'র কথা উল্লেখ করেছেন যে, এখানে সঙ্গে থাকার অর্থ 'জ্ঞানের মাধ্যমে সঙ্গে থাকা'। এ অর্থ নেয়ার বিষয়টি সন্দেহাতীত। তবে জ্ঞান ও দৃষ্টির মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা তার মাখলুকের সঙ্গে থাকার পাশাপাশি তিনি শ্রবণের মাধ্যমেও তাদের পরিবেষ্টন করে আছেন। অতএব, আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টিকুল সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত এবং তাদের কোনো কিছুই তাঁর কাছে অদৃশ্য নয়।'
চার. মা'য়িয়্যাত বা 'সাথে থাকা' এর অর্থ কয়েকটি হতে পারে: * সাথে থাকা মানে, মিশে যাওয়া, মিশ্রিত হওয়া। যেমন কেউ বলে, পানির সাথে দুধ মিশিয়ে পান করেছে। কুরআনে কারীমে এসেছে,
﴿هُوَ الَّذِي أَنزَلَ السَّكِينَةَ فِي قُلُوبِ الْمُؤْمِنِينَ لِيَزْدَادُوا إِيمَانًا مَّعَ إِيمَانِهِمْ وَلِلهِ جُنُودُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَكَانَ اللهُ عَلِيمًا حَكِيمًا ﴾ [الفتح: ٤]
"তিনিই মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি নাযিল করেছেন যেন তারা তাদের ঈমানের সাথে ঈমান বৃদ্ধি করে নেয়। আর আসমানসমূহ ও যমীনের বাহিনীসমূহ আল্লাহরই এবং আল্লাহ হলেন সর্বজ্ঞ, হিকমতওয়ালা।” [সূরা আল-ফাতহ, আয়াত: ০৪] * 'সাথে থাকা' মানে, একই স্থানে থাকা। যেমন কেউ বলে, আমি দুজনকে দেখেছি একসাথে চলতে। কুরআনে কারীমে এ অর্থে এসেছে, যেমন,
১- আল্লাহর বাণী: ﴿وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَوٰةَ وَارْكَعُوا مَعَ الرَّاكِعِينَ ﴾ [البقرة: ٤٣]
"আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর ও যাকাত দাও এবং রুকূ'কারীদের সাথে রুকূ' কর।" [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ৪৩]
২- অনুরূপ আল্লাহর বাণী: ﴿وَكُنَّا نَخُوضُ مَعَ الْخَائِضِينَ ﴾ [المدثر: ٤٥]
“এবং আমরা অনর্থক আলাপকারীদের সাথে বেহুদা আলাপে মগ্ন থাকতাম।” [সূরা আল-মুদ্দাসসির, আয়াত: ৪৫]
৩- অনুরূপ আল্লাহ বাণী:
﴿وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ ﴾ [النساء : ١٤٠]
“কিতাবে তোমাদের প্রতি তিনি তো নাযিল করেছেন যে, যখন তোমরা শুনবে, আল্লাহর আয়াত প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে এবং তা নিয়ে বিদ্রূপ করা হচ্ছে, তখন যে পর্যন্ত তারা অন্য প্রসংগে লিপ্ত না হবে তোমরা তাদের সাথে বসো না।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৪০] ৪- অনুরূপ আল্লাহর বাণী:
﴿وَمَا لَنَا لَا نُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَمَا جَاءَنَا مِنَ الْحَقِّ وَنَطْمَعُ أَن يُدْخِلَنَا رَبُّنَا مَعَ الْقَوْمِ الصَّالِحِينَ ﴾ [المائدة: ٨٤]
"আর আল্লাহর প্রতি ও আমাদের কাছে আসা সত্যের প্রতি ঈমান না আনার কি কারণ থাকতে পারে যখন আমরা প্রত্যাশা করি যে, আমাদের রব আমাদেরকে নেককার সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত করবেন?” [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৮৪] ৫- আল্লাহর বাণী,
﴿وَمَن يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُوْلَبِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِم مِّنَ النَّبِيِّنَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ وَحَسُنَ أُوْلَبِكَ رَفِيقًا ﴾ [النساء : ٦٩]
"আর কেউ আল্লাহ্ এবং রাসূলের আনুগত্য করলে সে নবী, সিদ্দীক (সত্যনিষ্ঠ), শহীদ ও সৎকর্মপরায়ণ- যাদের প্রতি আল্লাহ্ অনুগ্রহ করেছেন- তাদের সঙ্গী হবে এবং তারা কত উত্তম সঙ্গী!” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৬৯] ৬- আল্লাহর বাণী,
﴿وَلَوْ أَرَادُوا الْخُرُوجَ لَأَعَدُّوا لَهُ عُدَّةً وَلَكِن كَرِهَ اللَّهُ انْبِعَاثَهُمْ فَقَبَّطَهُمْ وَقِيلَ اقْعُدُوا مَعَ الْقَاعِدِينَ ﴾ [التوبة: ٤٦]
"আর যদি তারা বের হতে চাইত তবে অবশ্যই তারা সে জন্য প্রস্তুতির ব্যবস্থা করত, কিন্তু তাদের অভিযাত্রা আল্লাহ্ অপছন্দ করলেন। কাজেই তিনি তাদেরকে অলসতার মাধ্যমে বিরত রাখেন এবং তাদেরকে বলা হল, 'যারা বসে আছে তাদের সাথে বসে থাক।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৪৬]
'সাথে থাকা' মানে মিশে যাওয়াও নয় আবার একই স্থানে থাকাও নয়, বরং অবস্থা অনুসারে অর্থ নির্ধারণ করা। কুরআনে কারীমে বহু জায়গায় মা'আ ('সাথে') ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলোকে কেউ কোনোদিন লেগে থাকার অর্থে ব্যবহার করেনি, আর তা সম্ভবও নয়। যেমন, ১- আল্লাহর বাণী,
﴿مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ ﴾ [الفتح: ٢٩]
"মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল; আর তার সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর, তাদের পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল।” [সূরা আল-ফাতহ, আয়াত: ২৯] এখানে (مع) 'সাথে' মানে লেগে থাকা নয়।
২- আল্লাহর বাণী: ﴿ يَمَرْيَمُ اقْنُتِي لِرَبِّكِ وَاسْجُدِى وَأَرْكَعِي مَعَ الرَّاكِعِينَ ﴾ [ال عمران: ٤٣] "হে মারইয়াম! আপনার রবের অনুগত হন এবং সাজদাহ করুন আর রুকূ'কারীদের সাথে রুকূ' করুন।" [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৪৩]
৩- আল্লাহর বাণী: ﴿ رَبَّنَا ءَامَنَّا بِمَا أَنزَلْتَ وَاتَّبَعْنَا الرَّسُولَ فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّهِدِينَ ﴾ [ال عمران: ٥٣] "হে আমাদের রব! আপনি যা নাযিল করেছেন তার প্রতি আমরা ঈমান এনেছি এবং আমরা এ রাসূলের অনুসরণ করেছি। কাজেই আমাদেরকে সাক্ষ্যদানকারীদের তালিকাভুক্ত করে নিন।" [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৫৩]
৪- আল্লাহর বাণী: ﴿ رَّبَّنَا إِنَّنَا سَمِعْنَا مُنَادِيًا يُنَادِي لِلْإِيمَانِ أَنْ ءَامِنُوا بِرَبِّكُمْ فَقَامَنَا رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ ﴾ [ال عمران: ١٩٣] “হে আমাদের রব, আমরা এক আহ্বায়ককে ঈমানের দিকে আহ্বান করতে শুনেছি, 'তোমরা তোমাদের রবের উপর ঈমান আন।' কাজেই আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের রব! আপনি আমাদের পাপরাশি ক্ষমা করুন, আমাদের মন্দ কাজগুলো দূরীভূত করুন এবং আমাদেরকে সৎকর্মপরায়ণদের সহগামী করে মৃত্যু দিন।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯৩]
৫- আল্লাহর বাণী: ﴿ إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا وَأَصْلَحُوا وَاعْتَصَمُوا بِاللَّهِ وَأَخْلَصُوا دِينَهُمْ لِلهِ فَأُوْلَبِكَ مَعَ الْمُؤْمِنِينَ وَسَوْفَ يُؤْتِ اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ أَجْرًا عَظِيمًا ﴾ [النساء : ١٤٦] "কিন্তু যারা তাওবাহ্ করে, নিজেদেরকে সংশোধন করে, আল্লাহকে দৃঢ়ভাবে অবলম্বন করে এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে তাদের দ্বীনকে একনিষ্ট করে, তারা মুমিনদের সঙ্গে থাকবে এবং মুমিনদেরকে আল্লাহ্ অবশ্যই মহাপুরস্কার দিবেন।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৪৬]
৬- আল্লাহর বাণী: ﴿ وَإِذَا سَمِعُوا مَا أُنزِلَ إِلَى الرَّسُولِ تَرَى أَعْيُنَهُمْ تَفِيضُ مِنَ الدَّمْعِ مِمَّا عَرَفُوا مِنَ الْحَقِّ يَقُولُونَ رَبَّنَا ءَامَنَّا فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّهِدِينَ ﴾ [المائدة: ٨٣] "আর রাসূলের প্রতি যা নাযিল হয়েছে তা যখন তারা শুনে, তখন তারা যে সত্য উপলব্ধি করে তার জন্য আপনি তাদের চোখ অশ্রু বিগলিত দেখবেন। তারা বলে, 'হে আমাদের রব! আমরা ঈমান এনেছি; কাজেই আপনি আমাদেরকে সাক্ষ্যবহদের তালিকাভুক্ত করুন।” [সূরা মায়েদাহ, আয়াত: ৮৩]
أَبِنَّكُمْ لَتَشْهَدُونَ أَنَّ مَعَ اللَّهِ وَالِهَةً أُخْرَى قُل لَّا أَشْهَذْ قُلْ إِنَّمَا هُوَ إِلَهُ وَاحِدٌ وَإِنَّنِي بَرِيءٌ مِّمَّا تُشْرِكُونَ )[الانعام: ١٩]
"তোমরা কি এ সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহ্ আছে? বলুন, 'আমি সে সাক্ষ্য দেই না'। বলুন, 'তিনি তো একমাত্র প্রকৃত ইলাহ্ এবং তোমরা যা শরীক কর তা থেকে আমি অবশ্যই বিমুক্ত।” [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ১৯] নিঃসন্দেহে কোনো ব্যক্তি এটা মনে করে না যে, আল্লাহর সাথে অন্য কোনো ইলাহ তাঁর স্থানের সঙ্গী হিসেবে থাকে।
الَّذِينَ يَجْعَلُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهَا ءَاخَرَ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ ﴾ [الحجر: ٩٦]
"যারা আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্য সাব্যস্ত করে। অতএব অতিসত্তর তারা জেনে নিবে।" [সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৯৬]
لَّا تَجْعَلْ مَعَ اللَّهِ إِلَيْهَا ءَاخَرَ فَتَقْعُدَ مَذْمُومًا تَخْذُولًا ﴾ [الاسراء: ٢٢]
"আল্লাহর সাথে অন্য কোনো ইলাহ্ সাব্যস্ত করো না; করলে নিন্দিত ও লাঞ্ছিত হয়ে বসে পড়বে।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২২]
وَلَا تَجْعَلْ مَعَ اللَّهِ إِلَيْهَا ءَاخَرَ فَتُلْقَى فِي جَهَنَّمَ مَلُومًا مَّدْحُورًا ﴾ [الاسراء: ٣٩]
"আর আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহ স্থির করো না, করলে নিন্দিত ও বিতাড়িত অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩৯]
فَفَهَّمْنَهَا سُلَيْمَانَ وَكُلًّا ءَاتَيْنَا حُكْمًا وَعِلْمًا وَسَخَّرْنَا مَعَ دَاوُودَ الْجِبَالَ يُسَبِّحْنَ وَالطَّيْرِ وَكُنَّا فَاعِلِينَ * [الانبياء: ٧٩]
"অতঃপর আমরা সুলায়মানকে এ বিষয়ের মীমাংসা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম এবং তাদের প্রত্যেককে আমরা দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ও জ্ঞান। আর আমরা পর্বত ও পাখিদেরকে দাউদের অনুগত করে দিয়েছিলাম, তারা তার সাথে পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করত, আর আমরাই ছিলাম এ সবের কর্তা।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৭৯]
وَمَن يَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَيْهَا ءَاخَرَ لَا بُرْهَانَ لَهُ بِهِ، فَإِنَّمَا حِسَابُهُ عِندَ رَبِّهِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ ) [المؤمنون : ۱۱۷]
"আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহকে ডাকে, এ বিষয়ে তার নিকট কোনো প্রমাণ নেই; তার হিসাব তো তার রব-এর নিকটই আছে; নিশ্চয় কাফিররা সফলকাম হবে না।” [সূরা আল-মুমিনূন, আয়াত: ১১৭]
১৩- আল্লাহর বাণী: وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهَا ءَاخَرَ ) [الفرقان: ٦٨]
"এবং তারা আল্লাহর সাথে কোনো ইলাহকে ডাকে না।" [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৬৮]
১৪- আল্লাহর বাণী: الَّذِي جَعَلَ مَعَ اللَّهِ إِلَيْهَا ءَاخَرَ فَأَلْقِيَاهُ فِي الْعَذَابِ الشَّدِيدِ ) [ق: ٢٦]
"যে আল্লাহর সঙ্গে অন্য ইলাহ্ গ্রহণ করেছিল, তোমরা তাকে কঠিন শাস্তিতে নিক্ষেপ কর।" [সূরা ক্বাফ, আয়াত: ২৬]
১৫- আল্লাহর বাণী: فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا ﴾ [الشرح: ٥]
"সুতরাং কষ্টের সাথেই তো স্বস্তি আছে।” [সূরা আল-ইনশিরাহ, আয়াত: ০৫]
এ সকল আল্লাহর বাণীতে 'সাথে' শব্দটি এসেছে, কিন্তু কোথাও এগুলো দ্বারা লেগে থাকা বা মিলে-মিশে যাওয়া বুঝানো হয়নি।
এখানে এটাই বলা উদ্দেশ্য যে, মা'য়িয়্যাহ বা 'সাথে' শব্দটি বিভিন্ন অর্থ প্রদান করে, এটি একটি, মুশতারাক শব্দ। যার মধ্যে দু'টি দিক থাকে, যার দু'টি দিকের মধ্যে কোনো একটি বাঁধন থাকে, কখনও সে বাঁধন স্থান হতে পারে, আবার কখনও গুণ হতে পারে। আবার কখনও কখনও অবস্থাও হতে পারে। আবার কখনও কখনও সাহায্যও হতে পারে। তাহলে 'মা'আ', মা'য়িয়্যাহ বা 'সাথে' এ শব্দটি অভিধান অনুযায়ী কোনো বিষয়ে সামান্যতম এককে শরীক হওয়াই বুঝায়। সত্তাগতভাবে শরীক হওয়া বুঝায় না। আর এজন্যই যারা আমাদের সাথে মনের দিক থেকে মিল থাকে আমরা তাদেরকে বলে থাকি, 'আমরা তোমার সাথে আছি' অথবা বলি, 'তোমার সাথে একমত'। অনুরূপ যদি কাউকে আমরা ব্যবসায় শরীক করতে চাই তাহলে বলি, 'আমরা তোমার সাথে আছি'। এসব বাক্যের উদ্দেশ্য কখনও এটা থাকে না যে, আমরা তোমার স্থানে শরীক রয়েছি। এসবই প্রমাণ করে যে, 'মা'য়িয়্যাহ' বস্তুত কোনো একটি কমন মিলকে বুঝায়, তারপর বাক্যের অবস্থা অনুযায়ী নির্ধারিত হবে কোথায় কী অর্থ উদ্দেশ্য। তাই আল্লাহর বাণী, أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ مَا يَكُونُ مِن نَّجْوَى ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ وَلَا أَدْنَى مِن ذَلِكَ وَلَا أَكْثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا عَمِلُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ ﴾ [المجادلة: ٧]
"আপনি কি লক্ষ্য করেন না যে, আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে আল্লাহ্ তা জানেন? তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোন গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থজন হিসেবে তিনি থাকেন না এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যেও হয় না যাতে ষষ্টজন হিসেবে তিনি থাকেন না। তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশি হোক তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন তারা যেখানেই থাকুক না কেন। তারপর তারা যা করে, তিনি তাদেরকে কিয়ামতের দিন তা জানিয়ে দিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সব কিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।” [সূরা আল-মুজাদালাহ, আয়াত: ০৭] এখানে বাক্যের শুরুতে ইলম বা জ্ঞানের কথা বলা হয়েছে, অনুরূপ বাক্যের শেষেও ইলم বা জ্ঞানের কথা বলা হয়েছে, যা প্রমাণ করছে
যে, মাঝখানে 'সাথে' থাকার যে কথাটি বর্ণিত হয়েছে তা অবশ্যই 'ইলম' এর মাধ্যমে সাথে থাকাকেই বুঝানো হয়েছে।
📄 কিছু সন্দেহ ও তার অপনোদন
প্রশ্ন: কুরআনে কারীমের বেশ কিছু আয়াতে 'নিকটবর্তী' শব্দটি এসেছে, যেমন, وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ ]حَبْلِ الْوَرِيدِ ) ) [ق: ١٦ "আর আমরা তার গলার ধমনী হতেও অধিক নিকটবর্তী।” [সূরা কাফ, আয়াত: ১৬]
অনুরূপ অন্য আয়াতে এসেছে ﴿٨٥) ]وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنكُمْ) [الواقعة: “আর তোমাদের চাইতে আমরা তার অধিক নিকটবর্তী।" [সূরা আল ওয়াকিয়াহ, আয়াত: ৮৫] কোনো কোনো তাফসীর গ্রন্থসমূহে বলা হয়েছে, উল্লিখিত দু' আয়াতে 'অধিক কাছে' বলতে ফিরিশতাদের বুঝানো হয়েছে। এ তাফসীর কি আল্লাহর 'নিকটবর্তী হওয়া' গুণ বিরোধী, নাকি তা তা'ওয়ীল?
জওয়াব: উল্লিখিত দু' আয়াতে 'অধিক নিকটবর্তী' বলতে ফিরিশতারা অধিক নিকটবর্তী বলে যে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তাতে আল্লাহর বাণীকে তার বাহ্যিক অর্থ থেকে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে না। গভীরভাবে চিন্তা করলে এ বিষয়টি আমাদের বুঝে আসে।
প্রথম আয়াত: এখানে 'নিকটবর্তী থাকা'র বিষয়টি এমন কিছুর সঙ্গে যুক্ত করে উল্লেখ করা হয়েছে, যার দ্বারা বুঝা যায়, এখানে 'অধিক নিকটবর্তী' বলে ফিরিশতাদেরকেই উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। যেহেতু আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ إِذْ يَتَلَقَّى الْمُتَلَقِّيَانِ عَنِ الْيَمِينِ وَعَنِ الشِّمَالِ قَعِيدٌ مَّا يَلْفِظُ مِن قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيدٌ ]ق: ١٥-١٨[ )
"আর অবশ্যই আমরা মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয় তাও আমরা জানি। আর আমরা তার গলার ধমনী হতেও অধিক কাছে। যখন ডানে ও বামে বসা দু'জন লিপিবদ্ধকারী লিখতে থাকবে তার প্রত্যেক কর্ম ও কাজ সে যে কথাই উচ্চারণ করে তার কাছে সদা উপস্থিত সংরক্ষণকারী রয়েছে।” [সূরা কাফ, আয়াত: ১৬-১৮] এখানে إِذْ يَتَلَقَّى )যখন... গ্রহণ করবে) দ্বারা এটা বুঝা যাচ্ছে যে আগের আয়াতে ونحن أقرب এর 'অধিক নিকটবর্তী' বলা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আমলনামা লিপিবদ্ধকারী দুই ফিরিশতার নিকটবর্তী হওয়া।
দ্বিতীয় আয়াত: দ্বিতীয় আয়াতে যে 'নিকটবর্তী' থাকার কথা বলা হয়েছে, তা বান্দার মৃত্যুকালীন অবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর মৃত্যুকালে বান্দার কাছে যারা উপস্থিত হন তারা হলেন ফিরিশতা। আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র বলেন: ]حَتَّى إِذَا جَاءَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ تَوَفَّتْهُ رُسُلُنَا وَهُمْ لَا يُفَرِّطُونَ ﴾ [الانعام: ٦١
"অবশেষে যখন তোমাদের কারো কাছে মৃত্যু আসে, আমার প্রেরিত দূতগণ তার মৃত্যু ঘটায়। আর তারা কোনো ত্রুটি করে না।" [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৬১]
মানুষের মৃত্যুকালে ফিরিশতাই যে বান্দার নিকটে আসেন, এর আরেকটি প্রমাণ হলো আল্লাহ তা'আলার কথা: ﴿وَلَكِن لَّا تُبْصِرُونَ ﴾ [الواقعة: ٨٥﴿ "কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না।” [আল ওয়াকি'য়া, আয়াত: ৮৫]
কেননা এ আয়াত থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, যিনি নিকটবর্তী হন তিনি ঠিক ঐ জায়গাতেই নিকটবর্তী হন যে জায়গাতে মৃত্যুগামী ব্যক্তি রয়েছে। অথচ আমরা তাকে প্রত্যক্ষ করতে পারি না। এ বিষয়টি ফিরিশতা কর্তৃক নিকটতাকে নির্ধারণ করে দিচ্ছে; কেননা আল্লাহ তা'আলার ক্ষেত্রে এ প্রকৃতির নিকটবর্তী হওয়া অসম্ভব।
সার্বিকভাবে, সূরা কাফের উক্ত আয়াতটির অর্থ যদি আল্লাহ্ তা'আলার ক্ষেত্রেও নির্ধারণ করা হয়, তবে তার অর্থ তাঁর মর্যাদা ও শানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এমনভাবে তিনি বান্দার নিকটে থাকেন, সৃষ্টির মধ্যে প্রবিষ্ট হিসেবে নন, বরং এর প্রকৃত ধরন আমাদের অজানা-তবে এ অর্থটাও সঠিক হবে।
একটি প্রশ্ন:
এখানে একটি প্রশ্ন এভাবে উত্থাপিত হতে পারে যে, যদি ফিরিশতাই নিকটবর্তী হবেন তাহলে আল্লাহ তা'আলা কেন বললেন যে, 'আমরা তার নিকটে'? অর্থাৎ 'নিকটবর্তী হওয়া'-কে আল্লাহ তা'আলা নিজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে কেন উল্লেখ করলেন? এ প্রকৃতির অভিব্যক্তির উদাহরণ কি অন্য কোথাও পাওয়া যায়?
উত্তর:
আল্লাহ তা'আলা ফিরিশতাদের নিকটবর্তী হওয়াকে তাঁর নিজের নিকটবর্তী হওয়া বলে উল্লেখ করেছেন; কারণ ফিরিশতার নিকটবর্তী হওয়া আল্লাহ তা'আলার নির্দেশেই ঘটে থাকে। ফিরিশতারা হলেন তাঁর সৈন্য ও দূত।
ফিরিশতার নিকটবর্তী হওয়াকে আল্লাহ তা'আলা নিজের নিকটবর্তী হওয়া বলে ব্যক্ত করার উদাহরণ আল-কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় এসেছে, যেমন: ﴿فَإِذَا قَرَأْنَهُ فَأَتَّبِعْ قُرْءَانَهُ ﴾ [القيامة: ۱۸ “অতঃপর যখন আমরা তা পাঠ করি (জিবরীলের মাধ্যমে) তখন আপনি তার পাঠের অনুসরণ করুন।” [সূরা আল-কিয়ামাহ, আয়াত: ১৮]
উক্ত আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি কুরআন পাঠ মূলত ফিরিশতা জিবরীল 'আলাইহিস সালামের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা এ পাঠকে নিজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে বলেছেন, 'যখন আমরা তা পাঠ করি'। এটা এ হিসেবে যে, জিবরীল 'আলাইহিস সালাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আল্লাহর নির্দেশেই কুরআন পাঠ করেছেন। অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলার বাণী- ﴿ فَلَمَّا ذَهَبَ عَنْ إِبْرَاهِيمَ الرَّوْعُ وَجَاءَتْهُ الْبُشْرَى يُجَادِلُنَا فِي قَوْمِ لُوطٍ ﴾ [هود: ٧٤] “অতঃপর যখন ইবরাহীম থেকে ভয় দূর হলো এবং তার কাছে সুসংবাদ এলো, তখন সে লুতের কওম সম্পর্কে আমাদের সাথে বাদানুবাদ করতে লাগল।” [সূরা হূদ, আয়াত: ৭৪]
এ আয়াতে বলা হয়েছে যে, ইবরাহীম 'আলাইহিস সালাম লূত 'আলাইহিস সালামের কওম সম্পর্কে আল্লাহর সঙ্গে বাদানুবাদ করতে লাগলেন। অথচ আমরা জানি যে, তিনি ফিরিশতাদের সঙ্গে বাদানুবাদ করতে লাগলেন। কিন্তু যেহেতু ফিরিশতারা আল্লাহর দূত হিসেবে এসেছিলেন সে হিসেবে তাদের সঙ্গে বাদানুবাদ করা এক অর্থে আল্লাহর সঙ্গেই বাদানুবাদ করা।
তাছাড়া অন্য আয়াতেও এমনটি এসেছে, যেমন:
﴿أَمْ يَحْسَبُونَ أَنَّا لَا نَسْمَعُ سِرَّهُمْ وَنَجْوَنَهُمْ بَلَى وَرُسُلُنَا لَدَيْهِمْ يَكْتُبُونَ ﴾ [الزخرف: ٨٠]
"নাকি তারা মনে করে যে, আমরা তাদের গোপন বিষয় ও মন্ত্রণা শুনতে পাই না? অবশ্যই হ্যাঁ। আর আমাদের ফিরিশতাগণ তাদের কাছে থেকে সবকিছু লিখছে।” [সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ৮০]
আর যদি অন্য তাফসীরটি করা হয়, অর্থাৎ যদি বলা হয় যে, এসব আয়াতেও আমরা 'অধিক নিকটবর্তী' হওয়া দ্বারা মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার নিকটবর্তী হওয়াকে বুঝানো হয়, তাহলে আয়াতের অর্থ হবে ইলমের মাধ্যমে নিকটবর্তী থাকা। (৮৯২)