📄 শাইখ আবুল হাসান আলী আন-নাদওয়ী (১৪২০ হিজরী)
প্রখ্যাত আলেমে দীন শাইখ সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী আন-নাদওয়ী রাহিমাহুল্লাহ অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি শাইখ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলাওয়ীর সঠিক উত্তরসূরী ছিলেন। শাহ সাহেবের মত তিনিও ইলমুল কালামের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, আকীদাহ'র উৎস নির্ধারণে ভুল হওয়ার কারণেই যত খারাপ ও অশুদ্ধ আকীদাহ মুসলিমদের মাঝে প্রচার-প্রসার লাভ করে। যদি তারা নবীদেরকে আকীদাহ'র উৎস মনে করত তাহলে আর এত সন্দেহ ও ভুলে পতিত হতো না। যদি কুরআন ও সুন্নাহ'র আকীদাহ গ্রহণ করা হয়, তাহলে আল্লাহ তা'আলাকে 'আরশের উপরে বলতেই হয়। যেমন তিনি বলেন,
إن أجل علم أخذ عن الأنبياء عليهم صلوات الله وسلامه معرفة الله تعالى وعلم ذاته وصفاته وأفعاله، وذلك علم يختص بالأنبياء عليهم الصلاة والسلام؛ إذ هو علم ليست له وسائل وآلات، ومعلومات أولية وتجارب عند البشر، ولا يتناوله القياس ولا يفيد فيه الذكاء والفطنة، لفقدان أساس القياس، وتعالى الله عن الأشباه والنظائر، وسموه وتقدسه عن التشبه والتمثل، ولبعده عن كل ما عرفه البشر وألفه وجربه في عالم الحس والمادة ....
وكان الناس فى ذلك فريقين: فريق اعتمد فى ذلك على الأنبياء والرسل وعلومهم صلى الله عليهم، الذين أكرمهم الله بالنبوة وخصهم بمعرفته وتكليمه ورسالاته، وجعلهم واسطة بين الحق والخلق، في معرفة ذاته وصفاته وطرق مرضاته، أفردهم باليقين الذي ليس فوقه يقين، ونور ليس بعده نور....
وفريق اعتمد في ذلك على ذكائه وعلمه وتجاربه ومواهبه، وأطلق عنان العقل وأرخض جواد القياس، وتناول ذات الله وصفاته بالدراسة والبحث والتحليل والتجربة كهيئة كيمياوية، أو قوة طبيعية أو طاقة نباتية، وقالوا: هو كذا، وليس كذا، وكان قولهم ليس كذا أكثر من قولهم هو كذا، والنفى دائماً إذا فقد اليقين وعدم النور، أسهل من الإثبات والتقرير، وجاءت نتائج بحثهم وتقريرهم، أكثرها سلوب.... فجاءت فلسفتهم الإلهية، كما سموها.. آراء متضاربة، وتخمينات ما أنزل الله بها من سلطان، ولم يقم عليها دليل أو برهان، ولم تؤيدها تجربة أو وجدان.
وكان في مقدمة هذا الفريق وعلى رأسه، اليونان، لم يكن علم الإلهيات بجاهلهم، فجاهدوا في غير جهاد ومشوا بين شوك وقتاد، ففى بحر لجى يغشاه موج من فوقه موج من فوقه سحاب ظلمات بعضها فوق بعض ليس معهم نور يهديهم أو دليل يرشدهم، أو مقدمات ومعلومات أولية يتوصلون بها إلى المجهول.
وكان ضغثا على إبالة، أنهم كانوا أصحاب وثنية عتيقة عميقة عريقة، وأصحاب أساطير وخرافات، تغلغلت في فلسفتهم وشعورهم وأدبهم ودياناتهم، لهم فلسفة وثنية خاصة عن الأفلاك والعقول، توارثوها جيل بعد جيل، فجاءت فلسفتهم الإلهية مزيجاً من الفلسفة والوثنية....
وقد قلدهم عامة النظار والباحثين من الأمم.... وهذا داء البشر القديم....
ولا يستغرب ذلك عن الأمم التي أفلست في ثروتها الدينية من القديم وضيعت الهدى والنور، ولكنه غريب من علماء المسلمين الذين أكرمهم الله بالرسالة المحمدية على صاحبها الصلاة والسلام، والكتاب الذي لا يأتيه الباطل من بين يديه ولا من خلفه تنزيل من حكيم حميد، فخضع كثير منهم هذه الفلسفة.... وأخضع كثير منهم الآيات القرآنية أو أولوها تأويلاً شديداً وفسروها تفسيراً يطابق ما ثبت وتقرر في الفلسفة اليونانية الإلهية....
وكان أكثر ما دهوا به وأوتوا من قبله هو «اللوازم الفاسدة»،... ففروا من إثبات كثير من الصفات والأفعال؛ لأنها يلزم منها ما يختص بالحدث، ويثبت ما به الجسم وما يتنزه عنه (القديم)، كل ذلك قياساً على الإنسان وعلى تجاربهم المحدودة؛ إذ لا يتصور ولم يجرب وجود هذه الصفات إلا بهذه اللوازم، وفاتهم أنها صفات إلهية، يمكن وجودها بغير هذه اللوازم، وهكذا مال فريق منهم إلى نفي الصفات، وكان أحسنهم حالاً من تأولها أو فسرها تفسيرها كاد يؤدي إلى التعطيل، وفاتت أو كادت تفوت حكمة الصفات....
وكان المسلمون في حاجة إلى نوابغ مستقلين في التفكير، مجتهدين متمسكين، ثائرين مؤمنين هدامين بنائين، يجمعون
بين العلم الواسع العميق للكتاب والسنة، والنظر الدقيق والعلم الغزير للمناهج الكلامية والمذاهب الفلسفية. ويواجهون الفلسفة وآراء الفلاسفة القدماء وجها لوجه، يؤمنون بالقرآن كما أنزل، ويؤمنون بالله كما وصف نفسه من غير تحريف ولا تأويل، ويفسرون ذلك كله تفسيراً يقره العقل والمنطق ويؤيده العلم والبرهان...
وكان منهم ومن أشهرهم شيخ الإسلام الحافظ ابن تيمية الحراني الدمشقي في القرن الثامن، فقد جمع - كما شهد به أعلام هذه الأمة ونطق به كتبه - بين الإيمان القوي بكل ما جاء به الرسول ونطق به الكتاب، والاقتناع بعقيدة السلف الصالح، والاطلاع الواسع، الذي لا يرام فوقه، على ما دون في صحائف هذه الأمة في الماضي، والعلم الدقيق العميق بفلسفة اليونان ومنطقهم، والمذاهب التي نشأت في الإسلام بتأثير الفلسفة اليونانية في قليل أو كثير، والنقد القوي الحر الجريء لمناهجها وبحوثها....
"আম্বিয়ায়ে কিরামের মারফত মানুষ যেসব বিদ্যা ও মর্মজ্ঞান পেয়েছে তন্মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, শ্রেষ্ঠ ও জরুরী জ্ঞান হলো আল্লাহ তা'আলার যাত, সিফাত ও আফ'আল তথা তাঁর সত্তা, গুণাবলি ও কর্মসমূহের ব্যাপারে জ্ঞান। এ জ্ঞানের উৎস ও কেন্দ্রস্থল হচ্ছেন আম্বিয়ায়ে কিরামই। এ জ্ঞানের উপায়-উপকরণ, এর প্রাথমিক জ্ঞাতব্য বিষয় ও অভিজ্ঞতা সবকিছুই মানবীয় আওতার ঊর্ধ্বে। কিয়াস ও বুদ্ধিবৃত্তির কোনো ভিত্তি নেই এখানে।
আল্লাহর কোনো নজীর নেই, তাঁর মতো বলতেও কিছু নেই। তিনি সব ধরনের উদাহরণ ও সাদৃশ্য হতে মুক্ত ও পবিত্র। সবকিছু থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে। মানুষ যা ধারণা করতে পারে, যা প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম এবং যা সে অনুভব করতে সামর্থ, যেগুলোকে সে বস্তুগত ও অনুভবময় পৃথিবীতে কাজে লাগায় সেই সব ধরনের ধারণা, দেখা ও অনুভবেরও ঊর্ধ্বে। এখানে বুদ্ধি, যুক্তি, মেধা ও ধীশক্তি কিছুই সাহায্য করতে পারে না। বুদ্ধির ঘোড়া দাবড়ানোর ময়দান এ নয়। যুক্তি ও অভিজ্ঞতার ঘুড্ডি উড়ানোর আকাশও নয়।
এ জ্ঞানকে সবচেয়ে মহান এবং শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। কারণ মানুষের সর্বকালের কল্যাণ ও সৌভাগ্য এর ওপরই নির্ভরশীল। আমল ও আকীদাহ, আখলাক ও তামাদ্দুন, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির মূল বুনিয়াদ এ-ই। এরই মাধ্যমে মানুষ নিজের হাকীকত ও মূল সম্পর্কে অবহিত হতে পারে, বিশ্বজগতের কুহেলিকার জট খুলতে পারে, জীবনের রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারে, বিশ্বপ্রকৃতিতে নিজের মর্যাদা ও অবস্থান নির্ণয় করতে পারে। এরই আলোকে স্বজাতিয়দের সাথে নিজের সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়, স্বীয় জীবন পথ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে এবং সম্পূর্ণ আস্থা, অন্তর্দৃষ্টি ও পরিষ্কার ধারণার সাথে নিজের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নির্ণয় করতে সে সক্ষম হয়ে ওঠে।
আর তাই সকল জাতি ও গোষ্ঠির, সর্বযুগে ও সর্বশ্রেণিতে এই জ্ঞানকে সর্বোচ্চ স্থান দেয়া হয়েছে। জীবনকে যারা উদ্দেশ্যহীন বলে মনে করে না, পরিণাম সম্পর্কে যারা সচেতন, যারা মুখলেস ও আন্তরিক, এই ধরনের সমস্ত মানুষই এই জ্ঞানের প্রতি গভীর আগ্রহ ও অনুরাগ পোষণ করেন। ইচ্ছা-অনিচ্ছা, চেতন বা অচেতন যেভাবেই হোক না কেন, এই জ্ঞান থেকে বঞ্চিত থাকা এমন এক বঞ্চনা যার পর বঞ্চনা বলতে আর কিছুই থাকে না। এ এমন এক ধ্বংস ও বরবাদী যার থেকে বড় ধ্বংস ও বড় বরবাদী বলতে আর কিছুই নেই।
এ বিষয়ে মানুষের শ্রেণি দু'টি:
এক. একটি শ্রেণি, যারা এ জ্ঞানার্জনের পথে মাধ্যম হিসেবে সেসব পয়গাম বাহক সত্তাদের ওপর নির্ভর করেছে, যাদরকে মহান আল্লাহ নবুওয়াত, বাণী ও রিসালাতের সুমহান দায়িত্ব ও মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন, যাদের দিয়েছিলেন তাঁর নিজের সত্তার সঠিক মারিফাত ও পরিচয়। স্বীয় সন্তুষ্টির কাজগুলো সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করার জন্য তাঁদেরকে তিনি মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, সুদৃঢ় বিশ্বাস ও ইয়াকীনের বিপুল সম্পদ তিনি তাদের দান করেছিলেন যার বেশির কোনো কল্পনাও করা যায় না। সে নূর ও অন্তর্জোতি তিনি তাদের দিয়েছিলেন, যার চেয়ে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ও আস্থাভাজন জ্যোতি আর হতে পারে না কখনো।
দুই. অপর শ্রেণি হলো তারা, যারা আপন মেধা ও জ্ঞানের ওপরই পুরোপুরি নির্ভরশীল, এ গণ্ডির মধ্যেই তাদের চিন্তাধারা সীমাবদ্ধ। নিজের বিবেক বুদ্ধিকে তারা লাগামহীন করে ছেড়ে দিয়েছে। সব জায়গায় তারা যুক্তি ও অনুমানের ঘোড়া দাবড়িয়ে বেড়ায়। আল্লাহর সত্তা, গুণাবলি, তাঁর সত্তা ও গুণাবলির অধ্যয়ন ও গবেষণার ক্ষেত্রেও তারা সব নিষ্ফল ও অনর্থক বিশ্লেষণ ও ব্যবচ্ছেদ করতে লেগে যায়, যেমনভাবে কোনো রাসায়নিক ল্যাবরেটরিতে প্রকৃতিজ বা উদ্ভিজ্জ কোনো বস্তুর করা হয়ে থাকে। আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কেও এরা 'তিনি এমন' বা 'তিনি এমন নন' জাতীয় কথা বেধড়কভাবে বলতে শুরু করে। আবার এদের কাছে 'তিনি এমন' জাতীয় কথার তুলনায় 'তিনি এমন নন' জাতীয় কথার পরিমাণ অনেক বেশি। এটি একটি বাস্তব সত্য, বিশ্বাস ও সত্যের জ্যোতি থেকে যখন কোনো মানুষ বঞ্চিত হয়ে যায় তার কাছে কোনো কিছুর 'না' করা তা 'হ্যাঁ' ও প্রমাণ করার তুলনায় অধিকতর সহজ হয়ে যায়। আর তাই দেখা যায়, গ্রীক দার্শনিকদের আল্লাহতত্ত্বে অধিকাংশ পর্যালোচনা ও গবেষণার পরিণাম নেতিবাচক। কিন্তু কোনো ধর্ম ও আদর্শ, কোনো তাহযীব ও তামাদ্দুন এবং কোনো জীবনব্যবস্থা অনর্থক বুনিয়াদের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে না। আম্বিয়ায়ে কিরামের অভ্যাস তা নয়। এ তাঁদের শান ও মর্যাদা থেকে অনেক দূরের। তাঁরা তো অনুভূতি, বুদ্ধির অগম্য হাকীকত ও সত্যসমূহ সম্পর্কেও রাখেন প্রত্যক্ষশীল দর্শনেন্দ্রিয় ও শোনার মতো শ্রবণেন্দ্রিয়।
গ্রীক দার্শনিকদের ইলাহতাত্ত্বিক দর্শন পরস্পরবিরোধী চিন্তাধারা, ধারণা ও অনুমানের নিশ্চিদ্র এক কণ্টকাকীর্ণ জঙ্গল বলেই প্রতীয়মান হয়। মানুষকে এ বনে পথ হারিয়ে কেবলই চক্কর কাটতে হয়। এ যেন এক বিরাট গোলকধাঁধাঁ, যাতে একবার ঢুকলে আর বেরুবার পথ পাওয়া যায় না। মেধা, প্রজ্ঞা, দার্শনিক রহস্যপ্রিয়তা, কাব্যচর্চা, জ্ঞান ও কৌশলে যেসব দার্শনিক ছিলেন অধিক প্রসিদ্ধ, এ শ্রেণির মধ্যে তাদেরকেই বেশি আগুয়ান বলে পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু ইলাহ তত্ত্বে মেধা, প্রজ্ঞা ইত্যাদি কোনোটিরই বিন্দুমাত্র দখল নেই। তাদের সকল প্রয়াস ও শ্রম নিষ্ফল ও পাহাড় কেটে কুয়া খননের নামান্তর বৈ অন্য কোনো পরিণাম বয়ে আনেনি। অন্তহীন সমুদ্রের বিপুল আঁধারে এর ডুবে সারা হচ্ছে। কুরআনের এ আয়াতটিতে এদের যে চিত্রটি আঁকা হয়েছে এর চেয়ে যথার্থ ও সুন্দর আর কিছু হতে পারে না। আল্লাহর বাণীটি হচ্ছে, “গহীন সমুদ্রের আঁধার, ছেয়ে রেখেছে তা ঢেউ, তার উপর আরেক ঢেউ, ঢেউয়ের উপরে আবার মেঘ। বিপুল আঁধার, এক আঁধারের পরতে আরেক আঁধার। যদি বের করে নিজের হাত তবে তা-ও যেন দেখা যায় না! আল্লাহ যার জন্য নির্ধারণ করেননি কোনো আলো তখন তার আর আলো কোথায়?” [সূরা আন-নূর: ৪০]
এদের কাছে হিদায়াতের কোনা আলো ছিল না, যথার্থ জ্ঞান ও মা'রিফাতেরও কোনো রৌশনী
ছিল না। এতদসম্পর্কে তাদের কোনোরূপ পূর্ব অভিজ্ঞতা, অনুভূতি ও উপলব্ধি, এর প্রাথমিক পূর্বশর্তসমূহের পরিচয় বা বুনিয়াদী জ্ঞান যেগুলোর মাধ্যমে লাভ হয় অজানা বিষয়টির জ্ঞান – কোনো কিছুরই আশ্রয় তাদের ঘটেনি।
অধিকন্তু এরা ছিল পুরোনো ঝুরঝুরে শির্ক ও বিদ'আতের শিকার। এদের ধমনীতে ছিল শির্ক ও বিদ'আতের প্রবাহ। ভিত্তিহীন ও বাজে কিসসা-কাহিনী ও কিংবদন্তির ওপর ভিত্তি করে গঠিত বিশ্বাস ছিল তাদের সবকিছুর বুনিয়াদ।
তাদের দর্শন, তাদের কাব্য ও কবিতা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি, ধর্ম ও রীতিনীতি সর্বক্ষেত্রে এ শির্ক ও পৌত্তলিকতার ছিল সুস্পষ্ট প্রভাব। তাদের দেহ ও মনে সর্বত্রই ছিল এর জোরালো মিশ্রণ। সৌরচক্র ও তথাকথিত দশটি আকল সম্পর্কে তাদের ছিল এক শির্কী আকীদামূলক দর্শন। এ ছিল গ্রীক প্রতীমা-দর্শন ও মিথলজির এক মিকশ্চার। তারা নিজেদের চিন্তা-ভাবনা ও কাল্পনিক ধ্যান-ধারণা ও কুসংস্কারগুলোকে গালভরা ও ভারিক্কী নামে অভিহিত করে পেশ করত এবং দার্শনিক ও শাস্ত্রীয় পোশাকের ছদ্মাবরণে তা ঢেকে রাখত।
সাধারণভাবে পৃথিবীর প্রায় সকল সম্প্রদায়ের চিন্তাবিদ, ধর্মতাত্ত্বিক ও দার্শনিকরা গ্রীক দার্শনিকদেরই অনুসরণ করেছে। তাদের প্রভাবে অন্যান্য সকল জাতির প্রায় সকলেই হীনমন্যতা ও পরাজিত মানসিকতার শিকারে পরিণত হয়ে পড়েছিল এবং চোখ বুজে তাদের সবকিছুর ওপর আস্থাশীল হয়ে ওঠে। এরা তাদের গবেষণাপ্রসূত সকল ধারণাকে একটা স্বীকৃত সত্য বলে বিশ্বাস করে বসে। এগুলো সম্পর্কে আর কোনো রূপ আলোচনা ও প্রশ্নের কোনো অবকাশ নেই বলে ধারণা করতে থাকে। আর কেউ যদি এগুলো সম্পর্কে আলোচনা করে বা প্রশ্ন তোলে তবে তাকে তারা অকাট্য মূর্খ ও গোঁড়া ও জেদী বলে মনে করতে থাকে।
যে সকল সম্প্রদায় ও দল সুদূর অতীত থেকেই সঠিক ধর্মীয় পুঁজি হারিয়ে ফেলেছে, হিদায়াত থেকে ও আল্লাহর নূর তথা জ্যোতি থেকে বঞ্চিত যারা, তাদের বেলায় তো এ ধরনের হীনমন্যতার শিকার হওয়া ততটা বিস্ময়ের নয়। বিস্ময় ও আশ্চর্য্য হলো, সেসব তথাকথিত মুসলিম পণ্ডিত ও চিন্তাবিদদের জন্য, যাদের আল্লাহ দান করেছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতের মতো বিরাট নি'আমত এবং আল্লাহর কালামের মতো গৌরবজনক সম্পদ। এতদসত্ত্বেও তারা শিকার হলো এ মানসিকতার। এ মহান কিতাব ও এ মহান আদর্শের অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হলো, "বাতিল এতে পারে না আসতে, না সামনে থেকে আর না পেছন থেকে; এ তো মহাপ্রাজ্ঞ ও প্রশংসিত সত্তার নিকট থেকে অবতীর্ণ।” [সূরা হা-মীম- আস-সাজদাহ: ৪২]
পরবর্তীতে মুসলিম জাহানের বেশ কিছু একাডেমী ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র এ গ্রীক দর্শনকে পুরোপুরি মেনে নেয় এবং এর ওপর এমনভাবে আলোচনা ও গবেষণায় লিপ্ত হয়ে পড়ে, এ যেন কিছু স্বীকৃত সত্য ও পরীক্ষিত কতিপয় বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ বিষয়। কল্পনাশক্তি ধারণা ও সংস্কারগুলোকে এরা সঠিক বলে ধারণা করে নেয়। এদের অনেকেই এগুলোর সমর্থনে কুরআনের আয়াতও ব্যবহার শুরু করে এবং মনগড়া ও অর্থহীন ব্যাখ্যা দিতে থাকে এবং এমন সব তাফসীর এরা করে যাতে তাদের তথাকথিত 'স্বীকৃত দর্শন' ও 'প্রমাণিত সত্য' গুলোর সাথে কুরআনের সাযুজ্য প্রকাশ পায়।
তাদের চিন্তার মূলনীতি ছিল 'ওয়াজিবুল উজুদ' বা 'অবশ্যম্ভাবী অস্তিত্বশীল সত্তা' যিনি হবেন, তাঁকে এ ধারণার জন্য ক্ষতিকর বিষয়াদি থেকে অবশ্যই পবিত্র হতে হবে। এরূপ চিন্তাধারার
কারণেই মূলত এদের অধিকাংশ ভুলত্রুটি সংঘটিত হয়েছে। কারণ অবশ্যম্ভাবী অস্তিত্বশীলতার জন্য ক্ষতিকর ধারণা বলতে তারা যে বিষয়গুলোকে বুঝিয়েছে এর অধিকাংশই ছিল তাদের উর্বর মস্তিষ্কপ্রসূত কতক উদ্ভট ধারণা। আর কেবল এর ওপরই ভিত্তি করে তারা আল্লাহর বহু গুণবাচক নাম, গুণ ও কর্মকে স্বীকৃতি দেয়নি। এদের ধারণায় এগুলো দ্বারা আল্লাহর সাথে 'হুদুছ' বা অনিত্যতা ও অনাদিত্বতার আরোপ ঘটে বা কোনোটি দ্বারা আল্লাহর 'দেহশীল' হওয়া বুঝায় কিংবা অনাদি ও অবশ্যম্ভাবী সত্তা যেসব বিষয় থেকে পবিত্র হতে হবে, সেগুলো আরোপিত হয় ইত্যাদি। এসব নুকতা আবিষ্কারের বুনিয়াদ হলো, মূলত এরা আল্লাহকেও মানুষের মতো এবং তাঁকে নিজেদের সীমাবদ্ধ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে ধারণা করে বসে। কেননা এদের একজন কল্পনাও করতে পারে না বা একজনের এ অভিজ্ঞতা লাভও কখনো হয় না যে, সংশ্লিষ্ট অবস্থায় সংযোজন ছাড়াও এ গুণাবলির অস্তিত্ব লাভ সম্ভব। এরা ভুলে গিয়েছিল, এগুলো হচ্ছে আল্লাহর গুণ; এগুলো কোনো অবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়ার মুখাপেক্ষী নয়; কোনো কিছুর পাবন্দী এগুলোর জন্য জরুরী নয়। এদের মধ্যে অনেকে আল্লাহর সিফাত ও গুণাবলির সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বসে। আবার তাদের মধ্যে অনেকেই এ সিফাতগুলোর রূপক অর্থ করে বা এর মধ্যে নানা অপব্যাখ্যার আশ্রয় নেয়, চূড়ান্ত বিশ্লেষণে এর ধরনের দূরবর্তী ব্যাখ্যাও অস্বীকারেরই নামান্তর। এতে আল্লাহর সিফাতসমূহের হিকমত বিনষ্ট হয়ে যায়।
রুচি ও প্রবণতার তারতম্য অনুসারে অনেকেই উক্ত পথে যাত্রা শুরু করে এবং ক্রমে ক্রমে 'ইলমে কালাম' নামে এক শাস্ত্রের উদ্ভব হয় এবং এতদসংক্রান্ত আলোচনা-পর্যালোচনাও বিস্তৃত থেকে বিস্তৃততর হতে থাকে।
তখন মুসলিম সমাজে একজন প্রাজ্ঞ জ্ঞানীর প্রয়োজন তীব্রভাবে অনুভূত হতে থাকে, যিনি কুরআন, সুন্নাহ এবং সালাফ ও মহান পূর্বসূরীদের অনুসৃত আকীদা ও নীতির ওপর বুনিয়াদ রাখবেন স্বীয় আকীদাহ ও চিন্তাধারার, ঐগুলোকেই যিনি গ্রহণ করবেন মূল ভিত্তি হিসেবে; সাধারণ বিজ্ঞান, দর্শন ও এর ওপর ভিত্তি করে উদ্ভাবিত কালামশাস্ত্র ভক্তের দৃষ্টিতে নয়, বরং সমালোচকের নিরাসক্ত দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করবেন, যিনি দেখবেন এ এমন একটি বিষয়, যার কিছু অংশ গ্রহণ করা যায় আর কিছু অংশ প্রত্যাখ্যানও করা যায়। তিনি স্বাধীনভাবে এর একাডেমিক ও শাস্ত্রীয় বিশ্লেষণ করবেন, হীনমন্যতা ও পরাজিত মানসিকতার লেশমাত্র চিহ্ন থাকবে না এতে। কুরআনের ওপর তার ঈমান হবে তদ্রূপ যেরূপ তা নাযিল হয়েছিল। আল্লাহর সিফাত ও কার্যাবলী সম্পর্কে কোনোরূপ তা'ওয়ীল (রূপক ব্যাখ্যা) এবং তাহরীফ বা বিকৃতি সাধন ব্যতিরেকেই তিনি ঠিক তেমনিভাবে তা স্বীকার করে নেবেন যেমন স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা সেগুলো সম্পর্কে বলেছেন। ...
এমন একজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন, নেতৃস্থানীয় উলামায়ে কিরামের সাক্ষ্যানুযায়ী অষ্টম হিজরী শতকের সুপ্রসিদ্ধ আলিম শাইখুল ইসলাম হাফিয ইবন তাইমিয়্যাহ আল-হাররানী (মৃত্যু ৭২৮ হিজরী) অন্যতম। তাঁর রচনাবলি তাঁর এ মর্যাদার জ্বলন্ত সাক্ষী। যে সত্য ও মূল্যবোধসমূহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়ে এসেছিলেন, আল্লাহর কালামে যেসব মূল্যবোধ ব্যক্ত করা হয়েছে, এসব কিছুর ওপর যেমন তার পরিপূর্ণ ও দ্বিধাহীন ঈমান ও সুদৃঢ় প্রত্যয় ছিল, ইসলামের প্রথম যুগে প্রচলিত এবং সালাফে সালেহীন ও সুমহান মর্যাদার অধিকারী পূর্বসূরীদের অনুসৃত আকীদাহ সম্পর্কে যেমন তিনি ছিলেন সশ্রদ্ধ আস্থা ও স্বতৃপ্ত উপলব্ধির অধিকারী; তেমনি ছিলেন তখন পর্যন্ত মুসলিম উম্মার মধ্যে দর্শন ও কালামশাস্ত্রের যতটুকু চর্চা
ছিল সে দরিয়ার একজন সুকৌশলী ও সুদক্ষ সাঁতারু।
তিনি গ্রীক দর্শন, তর্কশাস্ত্র ও চিন্তাধারার সুগভীর, বিস্তৃত ও তুলনামূলক অধ্যয়ন করেছিলেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে দর্শন চিন্তা মুসলিমদের পরাজিত মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে রেখেছিল, সেসব কিছু তিনি একজন তীক্ষ্ণধী সমালোচকের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। যেসব দর্শন অনেকের কাছেই স্বীকৃত হয়ে আসছিল তিনি সেসবের স্বাধীন ও শক্তিশালী সমালোচক ছিলেন।"(৭৮২)
তিনি আরও বলেন, إن للعالم صانعاً قديماً، لم يزل ولا يزال... وهو الكبير المتعال، متصفاً بجميع صفات الكمال، منزها من جميع صفات النقص والزوال، وهو خالق الجميع المخلوقات .... لا يحل في غيره، ولا يتحد بغيره .. وهو فوق العرش، مرئي للمؤمنين يوم القيامة ....
"নিশ্চয় জগতের একজন স্রষ্টা রয়েছেন, যিনি সর্বপ্রথম, সর্বদা আছেন ও সর্বদা থাকবেন... তিনি সবকিছুর চেয়ে বড়, সবকিছুর উপরে, যাবতীয় পূর্ণতার গুণে গুণান্বিত, যাবতীয় ত্রুটিযুক্ত গুণ ও বিনষ্ট হওয়ার গুণ থেকে পবিত্র। তিনি সকল সৃষ্টিকুলের স্রষ্টা... তিনি কখনও কারও অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন না, কারও সাথে একাকার হয়ে যান না।... তিনি 'আরশের উপর, কিয়ামতের দিন তিনি ঈমানদারদের জন্য দৃশ্যমান হবেন”। (৭৮৩)
📄 শাইখ মুহাম্মাদ নাসেরউদ্দীন আল-আলবানী (১৪২০ হিজরী)
শাইখ আল-মুহাদ্দিস আবু আবদুর রহমান মুহাম্মাদ নাসেরুদ্দীন আল-আলবানী রাহimhimullah হচ্ছেন বর্তমান সময়ের জন্য ঊর্ধ্ব আকাশের ধ্রুব তারার মতো। যিনি হাদীসের খেদমতে প্রসিদ্ধ হলেও দীনী ইলমের কোনো ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান কম ছিল না। আকীদাহ বিশুদ্ধকরণ, প্রচার-প্রসার ক্ষেত্রে তাঁর ব্যাপক অবদান ছিল। তিনি আল্লাহ সম্পর্কে সহীহ আকীদাহ'র বিষয়টি তাঁর অনেক গ্রন্থে তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে আল্লাহর নাম ও গুণের বিষয়টিকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন।
তন্মধ্যে আল্লাহ সর্বোচ্চ পবিত্র সত্তা হওয়া, 'আরশের উপর হওয়া, 'আরশের উপর উঠা এ বিষয়ে তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন এবং তার অনেক গ্রন্থে এ ব্যাপারে বিস্তারিত লিখেছেন। এ সব লেখা পরবর্তীকালে একত্রিত করার পর তা ৩০০ পৃষ্ঠা ছাড়িয়ে গেছে। (৭৮৪) তাছাড়া তিনি এ বিষয়ে লিখিত ইমাম যাহাবীর অনবদ্য গ্রন্থ 'আল-'উলূ লিল আলিয়্যিল আযীম' গ্রন্থের শুদ্ধাশুদ্ধি নির্ণয় করে সংক্ষিপ্তাকারে বের করেন। আমরা এখানে নমুনাস্বরূপ কিছু ভাষ্য তুলে ধরব।
আল্লাহর 'আরশের উপর উঠা এবং কুরআন ও হাদীসে আসা আল্লাহ তা'আলাকে 'আসমানে' বলতে কী বুঝানো হয়েছে, তার ব্যাখ্যা করে বলেন,
ولا يكفي أن يعتقد المسلم فقط معنى ﴿الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى ) (طه: (٥) ، ومعنى: «ارحموا من في الأرض يرحمكم من في السماء»، دون أن يعرف أن في هنا «ارحموا من في الأرض يرحمكم من في السماء» في هذه الظرفية في هذا الحديث هي كـ «في» في قوله تعالى: ﴿أَأَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ ) (الملك : ١٦) أي: من على السماء، حتى إذا جاء ذلك المعتزلي أو الأشعري ووسوس إليه وقال له: أنتم تجعلون ربكم في ظرف في السماء، فيكون الجواب عنده: لا لا منافاة بين قوله تعالى: ﴿الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى ) (طه: ٥) ، وبين قوله: ﴿أَأَمِنتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ ) (الملك : ١٦)؛ لأن «في» هنا بمعنى «على» هناك، والدليل كثير وكثير جداً، من هذا الحديث المتداول على ألسنة الناس، وهو بمجموع طرقه والحمد لله حديث صحيح: ارحموا من في الأرض لا يعني الحشرات والديدان التي هي في الأرض، وإنما من على الأرض من الإنسان والحيوان، يرحمكم من في السماء» أي من على السماء، فمثل هذا التفصيل لا بد أن يكون المستجيبون لدعوة الحق على بينة من الأمر.
"আর মুসলিমের আকীদাহ'র জন্য শুধু "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন” এটার অর্থ বুঝাই যথেষ্ট নয়।” অনুরূপ "যমীনে যারা আছে তাদের ওপর দয়া কর, আসমানে যিনি আছেন, তিনি তোমাদের ওপর রহম করবেন"। এগুলোর শুধু অর্থ জানলেই হবে না, তার জানা লাগবে যে, "ارحموا من في الأرض يرحمكم من في السماء এ হাদীসে 'ফী' বলে সেটাই বুঝানো হয়েছে যা কুরআনের ﴿أَأَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ﴾ (الملك : ٦١ উক্ত আয়াতে 'ফী' দ্বারা বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ এগুলোতে 'ফী' বলে 'আলা' বুঝানো হয়েছে। তখন অর্থ হবে, যিনি আসমানের উপরে আছেন। এটা এজন্য বলেছি, যাতে করে কোনো মু'তাযিলী বা আশ'আরী তার কাছে এসে যদি কুমন্ত্রণা দেয় যে, তোমরা তো আল্লাহকে আসমানের ভিতরে রাখছ, তখন যেন তার কাছে উত্তর প্রস্তুত থাকে যে, না, রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন এবং আসমানের উপর যিনি আছেন এ দু'য়ের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই; কারণ দ্বিতীয় আয়াতে আসা 'ফী' এর অর্থ 'আলা' বা উপরে, 'মধ্যে' অর্থ নয়। এর ওপর প্রমাণ অনেক অনেক যে 'ফী' হরফটি 'আলা' এর অর্থে ব্যবহৃত হয়। ارحموا من في الأرض يرحمكم من في السماء এ হাদীসটি মানুষের মুখে খুব প্রচলিত, যা তার অনেক বর্ণনার কারণে আলহামদুলিল্লাহ সহীহ। হাদীসে ارحموا من في الأرض : কখনো যমীনের মধ্যে বলে যমীনের ভিতরের পোকামাকড় বুঝানো হয়নি। বরং বুঝানো হয়েছে, যারা যমীনের উপরে আছে, মানুষ ও জীবজন্তু। তেমনিভাবে يرحمكم من في السماء বলে যিনি আসমানের উপরে আছেন তাঁকে বুঝানো হয়েছে। যারা সহীহ হক আকীদাহ'র দাওয়াতে সাড়া দিবে তাদের জন্য এ ধরনের বিস্তারিত জ্ঞান থাকা আবশ্যক; যাতে তারা বিষয়টির ব্যাপারে স্পষ্ট প্রমাণের ওপর থাকে। ” (৭৮৫)
অন্যত্র তিনি আল্লাহর নাম ও গুণের বিষয়টি বিস্তারিত কেন জানতে হবে তা ব্যাখ্যা করে বলেন,
باب في أهمية جعل العقيدة بما في ذلك توحيد الأسماء والصفات أولى الأولويات في الدعوة، مع بيان أهمية فهم
السلف وخطورة التنكب عنه.
كل مسلم يعلم أصول الإيمان آمنت بالله وملائكته وإلى آخره، وبالقدر خيره وشره، لكن هناك إيمان بهذه الأصول إيمان مجمل وهذا هو الأصل الذي لا يعذر أحد بجهله به .. الإيمان مجملاً بالله وملائكته إلى آخره، لكن هذا الإيمان المجمل لا يكفي، لا بد من أن يقترن به الإيمان المفصل الذي جاء بيانه في كتاب الله وفي حديث رسول الله - صلى الله عليه وآله وسلم - أو سنته، وعلى منهج سلفنا الصالح، ولا بدأ الآن البيان للفرق بين الإيمان المجمل الذي هو الأصل الذي لا بد منه لكل مسلم ثم لا بد أن يقترن معه التفصيل، الإيمان بالله أصل الإيمانات .. ، كل أهل الأديان يشتركون في هذا الإيمان المجمل .. فاليهود يؤمنون بالله والنصارى يؤمنون بالله والصابئة يؤمنون بالله ... فإذا هذا الإيمان المجمل لا يكفي، لا بد من أن يكون إيماناً مبيناً مفصلاً، وكما قلت آنفاً على ما جاء في الكتاب والسنة، والآن لنضرب مثلاً من واقع حياتنا ومن جهل شبابنا المتحزب المتكتل على غير هدى من الله، إنهم جميعاً لا يعلمون أن الله عز وجل يجب أيضاً هذا الكلام مجمل لا بد من التفصيل .. لا بد من الإيمان بالله كما وصف نفسه في الكتاب والسنة .. الآن المسلمون وفيهم من أشرنا إليهم آنفاً يصدق فيهم كلمة لأحد الأمراء القدامى الأذكياء حينما سمع بعض المشائخ ... قالوا: الله عز وجل لا يوصف بأنه فوق ولا تحت ولا يمين ولا يسار ولا أمام ولا خلف ولا يقال هو داخل العالم ولا يقال هو أيضاً خارج العالم، فماذا قال ذلك الأمير الكيس الفطن الذكي قال : هؤلاء قوم أضاعوا ربهم، هذه حقيقة، المسلمون اليوم هذه عقيدتهم وهناك عقيدة أخرى قد تكون دونها شراً لكنها هي في الشر تحيا، وهي مسموعة دائماً في كل المجالس حينما يريد أحدهم أن يذكر ربه ماذا يقول الله موجود في كل الوجود، هذا ذكرهم الله موجود في كل مكان، وهذا هو الكفر بعينه، ما هو السبب انصراف المسلمين عن الكتاب والسنة، وعن منهج أرجو أن تتذكر هذه الإضافة لأنها ضرورية جداً، وعن منهج السلف الصالح؛ لما ذا؟ لأن أولئك المتكلمين أو الفلاسفة الضالين الذين وصفهم ذلك الأمير الكيس بأنهم أضاعوا ربهم، أو هؤلاء المتأخرون الضالون الذين حشروا ربهم في كل مكان، حتى القاذورات، حتى المجاري حتى المجاري حتى الكنف إلى آخره ... هؤلاء لا ينكرون كلام الله ولا ينكرون سنة رسول الله صلى الله عليه وسلم، بل قد يتحدون المخالفين لهم بأنهم يقولون نحن على الكتاب والسنة....
"অধ্যায়: দাওয়াতের ক্ষেত্রে তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাত তথা আল্লাহর নাম ও গুণের তাওহীদের বিষয়টি দাওয়াত প্রদানকারীর প্রথমের প্রথমে থাকার গুরুত্ব, সাথে সাথে তার কাছে থাকতে হবে সালফে সালেহীনের বুঝ, আর এটা থেকে ভিন্ন পথে থাকার ঝুকি বা বিপদ। প্রত্যেক মুসলিমই ঈমানের মূলনীতিগুলো ভালো করে জানে, যেমন আল্লাহর উপর ঈমান, ফিরিশতাদের উপর ঈমান.... তাকদীরে ভালো ও মন্দ লেখা থাকার ওপর ঈমান, কিন্তু এ
ধরনের ঈমানের দু'টি দিক রয়েছে। এক. ঈমান মুজমাল বা সংক্ষিপ্ত ঈমান, যা না জানার ক্ষেত্রে কারও ওযর গ্রহণযোগ্য নয়। সে ঈমানে মুজমাল হচ্ছে আল্লাহর ওপর, ফিরিশতাদের ওপর.... সংক্ষিপ্ত ঈমান। কিন্তু এ ঈমানই যথেষ্ট নয়, তার সাথে অবশ্যই যুক্ত হতে হবে, ঈমানে মুফাসসাল বা আল্লাহর কুরআন ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে অথবা তাঁর সুন্নাতে সে ঈমানের যে বিস্তারিত বর্ণনা এসেছে তা সম্পৃক্ত থাকতে হবে। আর সেটা বুঝতে হবে আমাদের সালাফে সালেহীনের বুঝ মোতাবেক। এখন আমি শুরু করতে চাই সে ঈমানে মুজমালের বর্ণনা যা প্রতিটি মুসলিমের থাকতে হবে, তারপর তার সাথে যুক্ত হতে হবে বিস্তারিত বর্ণনা। ঈমান বিল্লাহ বা আল্লাহর ওপর ঈমান হচ্ছে সকল ঈমানের মূল।... দুনিয়াতে যত দীন প্রচলিত আছে তারা সবাই ঈমানে মুজমাল বা সংক্ষিপ্ত ঈমানে তোমার সাথে শরীক হতে পারে... ইয়াহূদীরা আল্লাহর ওপর ঈমান রাখে, খ্রিষ্টানরাও আল্লাহর ওপর ঈমান রাখে, সাবেঈরাও আল্লাহর উপর ঈমান রাখে... তাহলে বুঝা গেল যে, আল্লাহর ওপর এরকম সংক্ষিপ্ত ঈমান যথেষ্ট নয়। বরং ঈমান অবশ্যই বিস্তারিত বর্ণিত থাকতে হবে। তবে যেটা বলেছি ইতোপূর্বে যে, অবশ্যই কুরআন ও সুন্নাহ'র ওপর হতে হবে। এখন আমরা বাস্তব জীবন থেকে একটি উদাহরণ দিতে পারি, আমাদের যুবকরাও বিভিন্ন দলীয় ব্যানারে ভাগ হয়ে পড়েছে, কিন্তু তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত আদর্শের ওপর নেই, তারা সবাই জানে না যে ঈমানে মুজমাল যথেষ্ট নয়, ঈমানে মুফাসসাল লাগবে। কুরআন ও সুন্নাহ'য় যেভাবে এসেছে সেভাবে আল্লাহর ওপর ঈমান আনতে হবে। কুরআন ও সুন্নাহ'য় যেভাবে আল্লাহ নিজেকে গুণান্বিত করেছেন সেভাবে ঈমান আনতে হবে।... বর্তমানে মুসলিমদের অবস্থা এমন হয়েছে যে, একবার কোনো এক বুদ্ধিমান শাসক এক বড় আলেমকে বলতে শুনলেন যে,.. আল্লাহ তা'আলাকে উপরে আছে বলে গুণান্বিত করা যাবে না, অনুরূপ তাকে নিচে, ডানে, বামে, সামনে, পিছনে এগুলোও বলা যাবে না। তাকে জগতের ভেতরে, জগতের বাইরে কোনোটিই বলা যাবে না, উক্ত বুদ্ধিমান শাসক তখন বলেছিলেন, 'এরা তো দেখি তাদের রবকে হারিয়ে বসে আছে।' এটাই হচ্ছে মুসলিমদের বাস্তবতা, মুসলিমদের বিশ্বাস আজ এ রকমই। তাছাড়া আকীদাতে এর থেকেও আকীদাহ রয়েছে, যা আমরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন আলোচনা সভায় শুনতে পাই, তারা যখন তার রবকে স্মরণ করে তখন বলে, কী বলে? বলে, আল্লাহ সব জায়গায়। তাদের যিকিরও তাই বুঝায়। বস্তুত এটাই প্রকৃত কুফুরী। এর কারণ কী? কারণ হচ্ছে মুসলিমরা কুরআন ও সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে আরও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে সালাফে সালেহীনের মানহাজ থেকে। এ শেষের অংশটুকু জুড়ে দেয়া জরুরী। কারণ; কারণ পূর্ববর্তী পথভ্রষ্ট দার্শনিক কিংবা কালামশাস্ত্রবিদ, যাদেরকে উক্ত বুদ্ধিমান শাসক বলেছিলেন যে, 'এরা তো দেখি তাদের রবকে হারিয়ে ফেলেছে' অথবা তাদের পরবর্তী পথভ্রষ্ট অনুসারী গোষ্ঠী, যারা রাব্বুল আলামীনকে সব জায়গায় জমা করেছে, এমনকি ময়লার ডিপোতে, পানির লাইনে, ময়লার ড্রেনে, অনুরূপ নিকৃষ্টতম জায়গায়, তারাও কিন্তু আল্লাহর বাণী অস্বীকার করে না, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত অস্বীকার করে না, বরং তারা তাদের বিরোধীদের চ্যালেঞ্জ করে বলে, আমরা তো কুরআন ও সুন্নাহ'র ওপরই চলি....।”(৭৮৬)
যারা বলে থাকে যে, আল্লাহর নাম ও গুণের বিষয়টি সাধারণ মানুষের সামনে আলোচনা
করা ঠিক নয়, অন্যত্র শাইখ তাঁদের প্রশ্নের উত্তর প্রদান করেন,
প্রশ্নঃ هل ينبغي على الدعاة أن يتجنبوا الكلام على الأسماء والصفات أمام العامة؟ জিজ্ঞাসা: আমাদের জন্য দোয়া করুন।
الجواب: جزاكم الله خيراً. بمناسبة ذكر الأسماء والصفات يقول بعض الناس: بأنه يجب على الدعاة إلى الله ألا يتحدثوا في هذا الباب أمام عامة الناس وغوغائهم؛ لأن الخوض في هذا يؤدي إلى وقوع الشك في نفوسهم، فما هو مدى صحة هذا الكلام؟ এই কথার কতটুকু সত্যতা আছে?
الشيخ: نعم. أولاً: نقول لهؤلاء: تحدثوا أنتم أمام العامة بخير من هذا الكلام, تحدثوا أنتم بخير من هذا الكلام, فإذا كان لا يعجبكم هذا الكلام فواجبكم أن تتحدثوا بما يعجبكم من غير هذا الكلام، وإن لم تفعلوا ولن تفعلوا فستستمعون ما لا يرضيكم، وهذا الذي لا يرضيكم المهم أنه يرضي ربكم، وهذا الذي وصلنا من علم السلف وندين الله به، والعامة – كما قلنا لكم آنفاً – هم على الفطرة، إذا قيل لهم: لا فوق، لا تحت استنكرته قلوبهم، لكن إذا قيل لهم: الله فوق المخلوقات كلها وليس فوقه أي مخلوق فهذا هو الذي يلتقي مع الفطر السليمة (فِطْرَةَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ) (الروم: ৩০)
"আল্লাহর পথের দাঈগণের কি আল্লাহর নাম ও গুণাবলির আলোচনা সাধারণ জনসমক্ষে করা উচিত?
প্রশ্ন: আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান প্রদান করুন, আল্লাহর নাম ও গুণের কথা আলোচনা উপলক্ষ্যে আমার প্রশ্ন হচ্ছে, কিছু লোক বলেন, আল্লাহর পথের দাঈদের কর্তব্য হচ্ছে, এ অধ্যায়ের আলোচনা সাধারণ জনসমুখে না করা; কারণ এসব বিষয়ে প্রবৃত্ত হওয়া তাঁদের অন্তরে সন্দেহের উদ্রেক ঘটাতে পারে, এ কথাটি কতটুকু বিশুদ্ধ?
উত্তর: হ্যাঁ, প্রথমে আমরা বলবো, তোমরাও সাধারণ মানুষের সামনে তোমাদের উত্তম কথাগুলো বলো। তোমরা তোমাদের উত্তম কথাগুলো সাধারণ মানুষের সামনে বলতে থাকো। যদি তোমাদের কাছে আল্লাহর নাম ও গুণাবলি নিয়ে কথা বলা ভালো না লাগে তবে তোমাদের ওপর কর্তব্য হচ্ছে যা তোমাদের কাছে ভালো লাগে সেটা তাঁদের কাছে বলো। তোমরা যদি সেটা না করো, আর তোমরা কখনো করবে না, তাহলে তোমরা তা শুনবে যা তোমরা অপছন্দ করো। এই যে জিনিসটি তোমাদের কাছে অপছন্দের সেটাই তোমাদের রব্বকে খুশি করবে, সন্তুষ্ট করবে, আর এটাই তো আমাদের কাছে এসেছে আমাদের সালাফে সালেহীনদের জ্ঞানের অংশ হিসেবে, আর আমরা এটাকেই আল্লাহর ইবাদতের জন্য দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করেছি। সাধারণ মানুষ, যেভাবে তোমাদেরকে আমরা বলেছি, তারা সুস্থ স্বাভাবিক প্রকৃতির ওপর আছে, তাদেরকে যদি বলা হয়, আল্লাহ উপরেও নয়, নিচেও নয়, তখন সেটা তাঁদের অন্তর মেনে নেয় না। কিন্তু যদি তাদেরকে বলা হয় যে, আল্লাহ তা'আলা সকল সৃষ্টির উপরে, তাঁর উপরে কোনো সৃষ্টি নেই, তখন সেটা তাঁদের সুস্থ স্বাভাবিক প্রকৃতির সাথে খাপ খায়। “আল্লাহর সেই ফিতরাত বা সুস্থ স্বভাবিক প্রকৃতি, যার ওপর তিনি মানুষদেরকে সৃষ্টি করেছেন, আল্লাহর সৃষ্টির এ ফিতরাতের পরিবর্তন নেই।” [সূরা
আর-রূম: ৩০]” (৭৮৭)
যারা বলে থাকেন আল্লাহর গুণ সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীস মুতাশাবিহাত এর অন্তর্ভুক্ত; শাইখ তাদের সন্দেহের অপনোদন করে বলেন,
باب هل آيات الصفات وأحاديثها من المتشابهات أم من المحكمات؟ سؤال: هنا يسأل سائل: هل آيات الصفات والأحاديث من المتشابهات أم من المحكمات كما قال شيخ الإسلام ابن تيمية ...
الشيخ: هي من جهة من المتشابهات، وذلك فيما يتعلق بالكيفيات، وليست من المتشابهات من حيث أن لها معنى ظاهرا كما قلنا آنفًا في قول السلف: أمروها كما جاءت يعني بالمفهوم العربي والمثال عن مالك سابقا ذكرناه أيضًا، فهي بهذا الاعتبار أي بمعنى أن هذه الآيات لها معاني معروفة في اللغة العربية فهي غير متشابهة
أما باعتبار الكيفية فهي متشابهة لأنه لا يمكن أن نعرف كيفية ذات الله فبالتالي لا يمكن أن نعرف كيفية صفات الله عز وجل، ولذلك قال بعض أئمة الحديث وهو أبو بكر الخطيب صاحب التاريخ المعروف بتاريخ بغداد: يقال في الصفات ما يقال في الذات سلبًا وإيجابًا، يقال في الصفات ما يقال في الذات، فكما أننا نثبت الذات ولا ننفيها فإن هذا النفي هو الجحد المطلق، كذلك نقول في الصفات نثبتها ولا ننفيها ولكننا كما لا نكيف الذات لا نكيف الصفات، هذا جواب هذا السؤال.
أقول: إن التأويل المنفي بنص القرآن الكريم: ﴿وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيلَهُ إِلَّا الله) (آل عمران:۷) ليس المقصود به مطلقاً والبتة: لا يعلم معناه إلا الله. وهنا يظهر خطأ الذين ينتحون ناحية التفويض في آيات الصفات وأحاديث الصفات، فيقولون: نكل معانيها إلى الله عز وجل ولا نخوض فيها، ليس لهم حجة في مثل هذه الآية ولا حجة لهم سواها، وإذا كانت حجتهم هي هذه فكما تسمعون، ربنا يقول: لا يعلم تأويلها ولم يقل: لا يعلم معانيها إلا الله، وتأويل الشيء هو معرفة عاقبة أمره وحقيقة أمره... ما يؤول إليه وينتهي إليه، نعم. فنحن حينما نقرأ بعض آيات الصفات أو أحاديث الصفات لا شك ولا ريب نفهم معانيها، كمثل قوله تبارك وتعالى في الآية المذكورة في أماكن عديدة: (الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى) (طه:٥) كما نفهم حديثه عليه السلام المتواتر عنه: ينزل الله كل ليلة إلى سماء الدنيا فنفهم معنى الاستواء ونفهم معنى النزول، ولكن حقيقة ذاك الاستواء وذاك النزول لا يعلمه إلا الله، هذا هو المقصود بهذه الآية، وليس المقصود ما يزعم أهل التفويض أننا لا نعرف معاني هذه الآيات. كيف يكون ذلك معقولاً فضلاً عن أن يكون مشروعاً؟
"অধ্যায়, আল্লাহর গুণবাচক আয়াত ও হাদীস কী মুতাশাবিহ (অস্পষ্ট) নাকি সেগুলো মুহকাম (স্পষ্ট) আয়াত ধরা হবে?
প্রশ্ন: কোনো এক প্রশ্নকারী বলেন, আল্লাহর গুণবাচক আয়াত ও হাদীসগুলো কী মুতাশাবিহ বা অস্পষ্ট, নাকি মুহকাম বা স্পষ্ট অর্থজ্ঞাপক, যেমনটি শাইখুল ইসলাম বলেছেন?
শাইখ উত্তরে বলেন: এগুলোকে একদিক থেকে মুতাশাবিহাতের অন্তর্ভুক্ত ধরা যেতে পারে, আর তা হচ্ছে সেগুলার ধরন নির্ধারণ। তবে এগুলোর প্রকাশ্য অর্থ থাকার বিষয়ে এগুলোকে মুতাশাবিহাত আয়াতসমূহের অন্তর্ভুক্ত বলা যাবে না। যেমনটি আমরা আগে বলেছি, সালাফদের কথা 'এগুলোকে যেভাবে এসেছে সেভাবে চালিয়ে নাও' এর ব্যাখ্যায়। সালাফদের কথা, 'যেভাবে এসেছে সেভাবে চালিয়ে নাও' এর অর্থ আরবী বুঝ অনুযায়ী চালিয়ে নাও, যার উদাহরণ আমরা ইমাম মালিকের বক্তব্য থেকে ইতোপূর্বে তোমাদেরকে জানিয়েছি। তাহলে সে হিসেবে অর্থাৎ এ আয়াতসমূহের জানা অর্থ রয়েছে আরবী ভাষায়, সে হিসেবে এগুলো মুতাশাবিহ বা অস্পষ্ট আয়াত বলা যাবে না।
তবে ধরন নির্ধারণের দিক থেকে এগুলো মুতাশাবিহ বা অস্পষ্ট; কারণ আমরা আল্লাহর সত্তার ধরন জানতে সক্ষম নই, তাই আমরা আল্লাহর গুণাবলির ধরনও জানতে অক্ষম। আর সেজন্যই হাদীসের ইমামগণের কেউ কেউ বলেছেন, তিনি হচ্ছেন, ইমাম আবু বকর আল-খত্বীব, বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থের লেখক, যা তারীখে বাগদাদ নামে খ্যাত, তিনি বলেন, "আল্লাহর গুণের ব্যাপারে সেটাই বলা হবে, যা তাঁর সত্তার ব্যাপারে বলা হবে, সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে ও সাব্যস্ত না করার ক্ষেত্রে। গুণের ক্ষেত্রে তাই বলা হবে যা সত্তার ব্যাপারে বলা হয়। যেভাবে আমরা তাঁর সত্তাকে সাব্যস্ত করি, সত্তার অস্তিত্বকে না বলি না; কারণ এটাকে না বলা তো মূলত তাঁকে অস্বীকার করাই হয়ে যায়। সে রকম আমরা আল্লাহর গুণাবলির ব্যাপারেও বলি, আমরা সেগুলোকে সাব্যস্ত করি, না করি না। তবে আমরা যেভাবে সত্তার ধরণ নির্ধারণ করি না, তেমনি গুণাবলিরও ধরণ নির্ধারণ করি না। এটিই হচ্ছে এ প্রশ্নকারীর প্রশ্নের উত্তর।
আর আমরা বলি, কুরআনে কারীমের ভাষ্য (آل عمران﴿:۷) وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيلَهُ إِلَّا اللَّهُ 'এর তা'ওয়ীল আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানে না' [সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ০৭] এ আয়াত থেকে সরাসরি যে তা'ওয়ীলকে নিষেধ করা হয়েছে তার অর্থ কখনো ও কস্মিনকালেও এটা নয় যে, আল্লাহ ব্যতীত এর অর্থ কেউ জানে না। এখানেই স্পষ্ট হয়ে যাবে কিছু মানুষের ভুল, যারা তথাকথিত 'তাফওয়ীদ্ব' বা আল্লাহর গুণাবলি বুঝাতে আসা আয়াতসমূহ ও হাদীসসমূহের শব্দাবলির অর্থ না করার নীতি অবলম্বন করেছে, তারা বলে থাকে, আমরা এগুলোর অর্থ মহান আল্লাহর দিকে সোপর্দ করছি, আমরা এগুলোর অর্থ খুঁজবো না। বস্তুত তাদের এ বক্তব্য ভুল, তাদের আয়াতাংশের ভুল ব্যাখ্যা ব্যতীত তাদের মতের সপক্ষে তারা আর কোনো দলীল-প্রমাণ পেশ করতে পারবে না। আর যদি তাদের এ 'অর্থ না করার' নীতির সপক্ষে একমাত্র এ আয়াতাংশই দলীল হয়ে থাকে, যেমনটি তোমরা শুনে থাক, তবে তাদের জানা উচিত, আমাদের রব বলেছেন, 'এগুলোর তা'ওয়ীল বা বিস্তৃত ব্যাখ্যা আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানে না', কখনও বলেননি, 'এগুলোর অর্থ আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না'। আর এটা জানা কথা যে, তা'ওয়ীল হচ্ছে, কোনো কিছুর সর্বশেষ পরিণাম ও কোনো কিছুর প্রকৃত অবস্থা, যার দিকে তা প্রত্যাবর্তন করবে বা যেখানে এসে শেষ হবে। হ্যা, এটাই তা'ওয়ীলের অর্থ। আমরা যখন আল্লাহর গুণ সংক্রান্ত কোনো আয়াত বা হাদীস পড়ি,
তখন নিঃসন্দেহে ও কোনো প্রকার সমস্যা ছাড়াই এগুলোর অর্থ বুঝি, যেমন আল্লাহর বাণী (الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى) (طه:٥ "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন" [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫], এর মধ্যে আসা 'ইস্তেওয়া' গুণটি, যা তিনি কুরআনের কারীমের অনেক জায়গায় বলেছেন, অনুরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুতাওয়াতির পর্যায়ের হাদীসে আসা 'আল্লাহ অবতরন করেন প্রতি রাতে নিকটতম আসমানে'। এ আয়াত ও হাদীস দু'টিতে আসা ইস্তেওয়া ও নুযুল এর অর্থ আমরা সহজেই বুঝতে পারি। কিন্তু এ ইস্তেওয়া বা উপরে উঠা ও নুযূল বা অবতরণের প্রকৃত ধরণ আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানে না। এ প্রকৃত ধরন না জানার বিষয়টিই উক্ত (সূরা আলে ইমরানের ৭ নং) আয়াতের উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্য সেটা নয় যা তাফওয়ীদ্ব বা অর্থশূন্যকারী গোষ্ঠী বলে থাকে যে, এ (সূরা আলে ইমরানের ৭ নং) আয়াতের উদ্দেশ্য আমরা এগুলোর অর্থ জানি না। এ ধরনের কথা-বার্তা বিবেক কীভাবে মেনে নিতে পারে? শরী'আত মেনে নেয়ার তো প্রশ্নই আসে না।"(৭৮৮)
যারা সালাফে সালেহীনের দিকে আল্লাহর গুণাবলি বর্ণনায় আসা আয়াত ও হাদীসের অর্থ না করার নীতি তথা তাফওয়ীদ্ব অবলম্বন করে তাদের নীতি খণ্ডন করে শাইখ বলেন, قول الأمام أحمد أمروها كما جاءت أي افهموها كما جاءت دون أن تتعمقوا في محاولة معرفة الكيفية والذين يقولون إن مذهب السلف هو التفويض أولاً يلزمهم أمران اثنان وكما يقال أحلاهما مر يلزمهم أن الآيات التي وصف الله عز وجل نفسه بها فضلاً عن الأحاديث الكثيرة التي وصف النبي - صلى الله عليه وآله وسلم - ربه فيها كل هذه النصوص معناها على مذهب التفويض أننا لا نفهم هذه النصوص بل ولا ندري لماذا ربنا عز وجل أنزلها في كتابه ولا ندري لماذا نبيه وصف ربه بهذه الصفات والواجب علينا أن لا نفهم هذه الصفات المذكورة في القرآن والسنة علماً أن الله عز وجل نعى على قوم أنهم لا يهتمون بفهم القرآن الكريم حينما قال رب العالمين: ﴿أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا) (محمد: ٢٤).
بلا شك أن أعظم شيء يتعلق بهذا الإسلام هو معرفة الرب الذي شرع هذا الدين وعلى لسان نبيه عليه الصلاة والسلام فحينما يقال في آيات الصفات وفي أحاديث الصفات لا نفهم منها شيئاً إذا هم لم يعتبروا بمثل قوله في الآية السابقة (أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا) (محمد : ٢٤) ويشملهم أيضاً: ﴿هُمْ قُلُوبٌ يَعْقِلُونَ بِهَا ) (الحج : ٤٦) ، وَمَا يَعْقِلُهَا إِلَّا الْعَالِمُونَ) (العنكبوت: ٤٣). والآيات كلها إنما أنزلت لتعقل وتفهم عن الله عز وجل فإن كانت متعلقة بالعقيدة تبناها عقيدة وأن كانت متعلقة بالأحكام تبناها وعمل بها.
إذا إذا كانت الآيات المتعلقة بصفة الله عز وجل لا تفهم فإذا نحن لا ندري عن ربنا شيئاً إلا أن له وجوداً وعلى هذا هناك صفات مجمع عليها بين العلماء حتى علماء الخلف مثلاً: لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ)
(الشورى: ۱۱). هل نفهم من السميع أن نُفَوِّض فنقول: لا ندري ما هي صفة السمع البصير لا ندري ما هي صفة البصر والقدير والحكيم والعليم إلى آخره معنى ذلك التفويض المزعوم أننا لا نفهم شيئاً من هذه الصفات إذا آمنا برب موجود لكن لا نعرف له صفة من الصفات وحينئذ كفرنا برب العباد حينما أنكرنا الصفات بزعم التفويض هذا هو الذي يرد أولاً على أولئك المفوضة زعموا.
الشيء الثاني: إذا قال الإمام أحمد أو غيره أمروها كما جاءت ترى قبل الإمام أحمد إمام دار الهجرة وهو الإمام مالك رحمه الله تعالى هل كان على هذا المذهب حينما جاءه ذاك السائل فقال له: يا مالك يا مالك الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى، كيف استوى؟ قال: الاستواء معلوم فالاستواء معلوم لا يعني الاستواء مفوض معناه لا قال الاستواء معلوم، وهو العلو، ولكن الكيف مجهول، وهذا هو مذهب السلف ولذلك تمام كلام الإمام مالك رحمه الله أن قال: أخرجوا الرجل فإنه مبتدع لم يكن هذا الرجل السائل مبتدعاً لأنه سأل عن معنى خفي عليه من قوله تعالى: ﴿الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى ) (طه : ٥) . وإنما أخرج وبدع؛ لأنه سأل عن كيفية الاستواء فكان قول الإمام مالك هذا هو الذي يمثل منهج السلف الصالح والمتبعين لهم بإحسان إلى يوم الدين.
وهو أن معاني آيات الصفات وأحاديث الصفات مفهومة لغة لكن كيفياتها مجهولة تماماً. فلا يعرف كيفية الذات إلا صاحب الذات ولا يعرف كيفية الصفات إلا الذات نفسها لكن الاستواء والسمع معلوم والبصر معلوم
ইমাম আহমাদের বক্তব্য 'তোমরা এগুলোকে পরিচালিত করো যেভাবে এসেছে সেভাবে। এর অর্থ হচ্ছে, এগুলোকে যেভাবে এসেছে সেভাবে বুঝ, এগুলোর গভীরে গিয়ে ধরন জানার প্রচেষ্টা চালানো ব্যতীতই। আর যারা বলে, সালাফে সালেহীনের মাযহাব ছিল তাফওয়ীদ্ব বা অর্থশূন্য করে শুধু শব্দের ওপর ঈমান আনা, প্রথমেই তাদের ওপর দু'টি বিষয় আপতিত হবে। আর যেমনটি প্রবাদে আছে, দু'টি জিনিসের মধ্যে যেটি সবচেয়ে বেশি মিষ্ট সেটিই তিতা।
সে দু'টি জিনিসের প্রথমটি হচ্ছে, এটা বলা যে, যেসব আয়াতে মহান আল্লাহ তাঁর নিজের গুণ বর্ণনা করেছেন সেসব আয়াত, যদিও সেসব অগণিত অসংখ্য হাদীসকে আলোচনার বাইরেও রাখি, যাতে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রবের গুণাবলি বর্ণনা করেছেন, সেসব যাবতীয় ভাষ্যের অর্থ তাফওয়ীদ্ব নীতি অবলম্বনের কারণে বলা হয় যে, আমরা এগুলোর অর্থ মোটেই বুঝি না, বরং আমরা জানি না কেন আমাদের মহান রব এগুলো তাঁর কিতাবে নাযিল করেছেন, আমরা তাও জানি না, কেন তাঁর নবী সেগুলো দিয়ে তার রবকে গুণান্বিত করেছেন, আমাদের কর্তব্য হচ্ছে আমরা কুরআন ও সুন্নাহ'য় আসা এসব গুণাবলির অর্থ না বুঝা ও না জানা, তাহলে আমাদের জানা উচিত আল্লাহ তা'আলা কিছু গোষ্ঠীর ব্যাপারে মারাত্মক অখুশী প্রকাশ করেছেন, যারা কুরআনে কারীম বুঝার
ব্যাপারে গুরুত্ব দেয় না, যখন রাব্বুল আলামীন বলেন, ﴾أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا) (محمد: ٢٤). 'তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা গবেষণা করবে না? নাকি তাদের অন্তরে তালা আছে?' [সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ২৪]
সন্দেহ নেই, ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত সবচেয়ে বড় জিনিস হচ্ছে সেই রব সম্পর্কে জানা, যিনি এ দীন প্রবর্তন করেছেন, আর তা করেছেন তাঁর নবীর যবানীতে, তাহলে যখন আল্লাহর গুণাবলি সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীসের ক্ষেত্রে বলা হয় যে, আমরা এগুলো থেকে কিছুই বুঝি না, তাহলে তো তারা আল্লাহর আয়াত ও রাসূলের হাদীস থেকে মোটেই কোনো শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেনি। তারা তো তখন সে আয়াতের অধীন হয়ে যাবে, যাদের সম্পর্কে পূর্বোক্ত আয়াতে বলা হয়েছে, ﴾أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا) (محمد : ٢٤) 'তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা গবেষণা করবে না? নাকি তাঁদের অন্তরে তালা আছে?' [সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ২৪] অনুরূপ তারা সে আয়াতেরও অন্তর্ভুক্ত হবে, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, ﴾أَمْ قُلُوبُ يَعْقِلُونَ بِهَا ) (الحج : ٤٦) (তাদের রয়েছে এমন কিছু হৃদয় যার দ্বারা তারা কিছু বুঝে না' [সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৪৬] আরও বলেছেন, ﴾وَمَا يَعْقِلُهَا إِلَّا الْعَالِمُونَ) (العنكبوت: ٤٣). 'আর কুরআনের এসব উদাহরণ কেবল আলেমগণই বুঝতে পারে।' [সূরা আল-আনকাবূত, আয়াত: ৪৩]
আর আল্লাহর আয়াতসমূহ আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল করা হয়েছে কেবল তা বুঝার জন্য, তা অনুধাবন করার জন্য, যদি সেটা আকীদাহ সম্পর্কিত হয় তাহলে সেগুলোকে আকীদাহ হিসেবে গ্রহণ করবে, আর যদি সেটি বিধি-বিধান সম্বলিত হয় তবে সেটাকে বিধান হিসেবে গ্রহণ করবে ও তার ওপর আমল করবে।
তাহলে তা যখন মহান আল্লাহর গুণাবলি সংক্রান্ত হবে আর তা বুঝা না যায় তখন তো আমরা আমাদের রব সম্পর্কে কিছুই জানতে পারলাম না, কেবল বুঝলাম যে, তাঁর একটা অস্তিত্ব আছে।
(বস্তুত এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কিছু নয় যে, আল্লাহর সৃষ্টি হয়েও তাঁর ব্যাপারে কিছুই জানতে পারিনি, তবে বাস্তব কথা হচ্ছে তারা সকল গুণের ব্যাপারে সেটা বলে না।)
যদি তাদের কথা যে 'এসব গুণাবলির আয়াত থেকে কিছুই বুঝা যায় না' এটা সত্য হয়, তাহলে সেসব আয়াতের ব্যাপারে কী বলবে, যেসব গুণ সাব্যস্তের ব্যাপারে তারা সবাই একমত, এমনকি তাদের পরবর্তী আলেমগণও, যেমন, ﴾لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ) (الشورى: ۱۱). 'তাঁর মতো কোনো কিছু নেই, তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা'। [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১] তাদের পূর্বোক্ত নীতি যদি এখানে কার্যকর করা হয় তাহলে সেটার দাবী হচ্ছে তারা এখানে আসা আল্লাহর গুণ 'আস-সামী' শব্দটিকে তাফওয়ীদ্ব করে বলা যে, এর অর্থ জানা যায় না। তাহলে সেটা অনুযায়ী আমরা কি বলবো, আমরা জানি না আস-সামী' থেকে সাম' নামক সিফাতের অর্থ কী? আর আল-বাসীর থেকে 'বাসার' নামক সিফাত এর অর্থ কী? অনুরূপ কথাই কি বলা হবে, ক্বাদীর, হাকীম, আলীম ইত্যাদি সিফাতসমূহের ব্যাপারে? বস্তুত এ তথাকথিত 'তাফওয়ীদ্ব' বা অর্থ না করার নীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে আমরা এসব গুণের গুণটির অর্থই জানি না, তখন অর্থ দাঁড়াবে, আমরা একজন রবের অস্তিত্বের ওপর ঈমান আনলাম, কিন্তু তাঁর গুণসমূহের কোনো গুণ সম্পর্কে আমরা কিছু জানি না। এভাবে বললে
তো আমরা বান্দাদের রব আল্লাহর সাথেই কুফুরী করলাম, যখন তথাকথিত তাফওয়ীদ্ব নীতির মাধ্যমে তাঁর গুণাবলিকে অস্বীকার করলাম। এভাবেই যারা তথাকথিত তাফওয়ীদ্ব নীতি অবলম্বন করে তাদের রদ্দ করা হবে।
দ্বিতীয় জিনিস হচ্ছে, তাদেরকে বলা যে, যদি ইমাম আহমাদ ও অন্যান্যরা বলে থাকেন যে, 'এ গুণবাচক আয়াতগুলোকে যেভাবে এসেছে সেভাবে চালিয়ে নিয়ে যাও' (যার অর্থ তোমাদের ধারণা অনুযায়ী, অর্থ না বুঝে পার হয়ে যাওয়া) তাহলে ইমাম আহমাদের পূর্বে দারুল হিজরাত মদীনার ইমাম মালিক ইবন আনাস রাহিমাহুল্লাহ তিনিও কি একই মাযহাব পোষণ করতেন? যখন তার কাছে সেই প্রশ্নকারী এসে জিজ্ঞেস করেছিল, হে মালিক, 'রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন' কীভাবে উঠলেন? তিনি জবাবে বলেছিলেন, ইস্তেওয়া বা 'উপরে উঠা' জানা কথা। তিনি বলেছেন, 'ইস্তেওয়া মা'লুমুন' বা ইস্তেওয়া জানা কথা। এ কথা বলেননি যে, 'ইস্তেওয়া' এর অর্থ তাফওয়ীদ্ব কর। বরং বলেছেন, 'ইস্তেওয়া মা'লুমূন' বা ইস্তেওয়া জানা কথা আর সেটা হচ্ছে উপরে থাকা, ঊর্ধ্বে উঠা। তবে সেটার ধরন অজানা। এটাই হচ্ছে সালাফে সালেহীনের মত। আর এজন্যই ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ'র কথার বাকী অংশ হচ্ছে, এ লোকটিকে বের করে দাও; কেননা সে বিদ'আতী লোক। এ প্রশ্নকারী লোকটিকে কেবল আল্লাহর বাণী (الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى) [طه: 5] এ আয়াতে তাঁর কাছে কোনো শব্দের অর্থ গোপন থাকায় সেটা জিজ্ঞেস করার কারণে বের করে দেয়া হয়নি, বিদ'আতী বলা হয়নি, বরং তাকে তো বের করে দেয়া হয়েছে ও বিদ'আতী বলা হয়েছে এ কারণে যে, সে 'ইস্তেওয়া' এর ধরন জানতে চেয়েছে। আর সে জন্যই ইমাম মালিকের এ বাণী সালাফে সালেহীন ও তাদের সুন্দর অনুসারীদের প্রতিনিধিত্ব করেছে। যার মূল কথা হলো, আল্লাহর গুণাবলি সংক্রান্ত আসা যাবতীয় আয়াত ও সকল হাদীসের অর্থ আভিধানিকভাবে আমরা বুঝি; কিন্তু তার ধরন আমাদের সম্পূর্ণ আজানা। সুতরাং সে সত্তা ব্যতীত তাঁর সত্তার ধরন অন্য কেউ জানে না, অনুরূপ সে সত্তা ব্যতীত অন্য কেউ তাঁর গুণাবলির ধরন জানে না। কিন্তু 'ইস্তেওয়া', সাম', বাছার এগুলোর অর্থ জ্ঞাত জিনিস।”(৭৮৯)
অন্যত্র তিনি আল্লাহ তা'আলার গুণাবলি সম্পর্কে বলেন, وصفاته عند العلماء تنقسم إلى قسمين: صفة فعل وصفة ذات، فـ الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى) (طه:٥) صفة فعل، نزوله ينزل الله كل ليلة إلى السماء الدنيا صفة فعل أيضاً، لكن نزوله ليس كنزول الناس، واستواؤه ليس كاستوائنا
"আর আল্লাহর গুণাবলি দু'ভাগে বিভক্ত: কর্মগত গুণ ও সত্তাগত গুণ। সুতরাং "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫] এটি কর্মগত গুণ। অনুরূপ তাঁর অবতরণ, “প্রতি রাতে আল্লাহ তা'আলা নিকটতম আসমানে নেমে আসেন" এটাও কর্মগত গুণ। কিন্তু তাঁর অবতরণ মানুষের অবতরণের মতো নয়, আর তাঁর উপরে উঠা আমাদের উপরে উঠার মতো নয়।” (৭৯০)
অন্যত্র তিনি 'আরশের উপরে বলতে কি কোনো স্থান বুঝাচ্ছে? সেটার জবাব দিয়ে বলেন,
[قال الذهبي في العلو : ]
و [ مما] يدل على أن الباري تبارك وتعالى عال على الأشياء فوق عرشه المجيد، غير حال في الأمكنة؛ قوله تعالى: وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ وَلَا يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ ) .
[قال الإمام معلقا ]:
تأمل هذه الكلمة، فإنها من الحق الذي حمل الجهل به الجماهير على جحد ما دلت عليه هذه الأدلة الكثيرة من الكتاب والسنة من علوه تعالى على عرشه، وعلى الطعن بالسلفيين المؤمنين به زاعمين أن السلفيين بإيمانهم هذا جعلوا الله عز وجل مكاناً فوق العرش، تعالى الله عما يقول الظالمون علواً كبيراً ، فهذا هو المؤلف، وهو من كبار أئمتهم يصرح بتنزيهه تعالى عن الحلول في الأمكنة كلها। وما يحمل أولئك الجماهير على ذلك إلا توهمهم. أن الإيمان بعلوه عز وجل على خلقه; يستلزم أن يكون حالا في مكان، قالوا: وهذا باطل، وما لزم منه باطل فهو باطل, وجهلوا أو تجاهلوا أن المكان أمر وجودي، وأنه ليس فوق العرش وجود حادث، وبالتالي فليس ثمة مكان إطلاقاً, فالله تبارك وتعالى فوق عرشه, وليس في مكان أصلاً।
ومن العجيب أن هؤلاء الذي لم يؤمنوا بعد بعلوه عز وجل على عرشه فراراً من الإيمان بالمكان المزعوم, قد وقعوا على أم رأسهم في الإيمان بأن الله في الأمكنة حقيقة, وذلك بقولهم: الله موجود في كل مكان।
[ইমাম যাহাবী তার আল-'উলু গ্রন্থে বলেন]
আর যা প্রমাণ করে যে, মহান আল্লাহ সবকিছুর উপরে, তাঁর সম্মানিত 'আরশের উপরে, তবে সেটা পরিচিত কোনো জায়গায় প্রবেশ করা নয়, তার দলীল আল্লাহর বাণী “তাঁর 'কুরসী' আসমানসমূহ ও যমীনকে পরিব্যাপ্ত করে আছে; আর এ দু'টোর রক্ষণাবেক্ষণ তাঁর জন্য বোঝা হয় না। আর তিনি সুউচ্চ সুমহান।” [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ২৫৫]
শাইখ আবু আব্দির রহমান মুহাম্মাদ নাসেরুদ্দীন আল-আলবানী বলেন, এ বাক্যটি নিয়ে চিন্তা কর, এটি এমন এক সত্য ও সঠিক বক্তব্য, যা না জানার কারণে অনেক মানুষকে দেখা যায় কুরআন ও সুন্নাহ'র এসব বহুবিধ প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তারা আল্লাহ তা'আলাকে তাঁর 'আরশের উপরে থাকাকে অস্বীকার করে যাচ্ছে। তাছাড়া তারা সালাফে সালেহীনের অনুসারীদের ওপর দোষারোপ করছে যারা এর ওপর ঈমান রাখে। এ মানুষগুলো মনে করছে যে, সালাফে সালেহীনের অনুসারীরা মহান আল্লাহর জন্য 'আরশের উপরে একটি স্থান নির্ধারণ করে নিয়েছে [যে রকম স্থান তারা দুনিয়াতে সৃষ্টিকুলের জন্য নির্ধারণ করে], যালিমরা যা বলে তা থেকে আল্লাহ অনেক ঊর্ধ্বে। এই যে গ্রন্থকার [ইমাম যাহাবী] তিনি সালাফে সালেহীনের অনুসারী একজন বড় ইমাম, তিনি এভাবে স্থান নির্ধারণ থেকে আল্লাহকে পবিত্র ঘোষণা করছেন। আল্লাহ তা'আলা কোনো প্রকার স্থানে প্রবেশ করার থেকে অনেক ঊর্ধ্বে। এসব মানুষ যারা সালাফে সালেহীনের অনুসারীদেরকে এরকম দোষ দিচ্ছে, তারা যে কারণে এটা করছে তা হচ্ছে, তারা মনে করছে, মহান আল্লাহকে তাঁর
সকল সৃষ্টির উপরে বলা এটা বলা বাধ্য করে যে, তিনি কোনো স্থানে প্রবেশ করে আছেন, তারা বলে, এটা তো বাতিল, আর যা বাতিল কিছু আনতে বাধ্য করে তাও বাতিল। এ লোকগুলো জানতে পারেনি কিংবা না জানার ভান করেছে যে, স্থান তো একটি অস্তিত্ব প্রদানকৃত জিনিসের নাম, 'আরশের উপর কোনো অস্তিত্ব প্রদানকৃত জিনিস নেই। সুতরাং সেখানে এমন কোনো স্থান নেই যা মানুষের ধারণার মধ্যে আসে। সুতরাং মহান আল্লাহ তাবারকা ওয়া তা'আলা 'আরশের উপর, তিনি কোনো স্থানের অভ্যন্তরে নন।
আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, যারা মহান আল্লাহ তা'আলাকে এখনও 'আরশের উপর থাকার উপর ঈমান আনেনি, এ তথাকথিত স্থান নির্ধারণ থেকে বাঁচার জন্য তারাই আবার পুরোপুরিভাবে এ ঈমান পোষণ করে থাকে যে, আল্লাহ তা'আলা বহু জায়গায়। আর তা তাদের সে কথার মাধ্যমে, যখন তারা বলে, আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান।” (৭৯১)
অনুরূপভাবে, তিনি 'আরশের উপর উঠা এবং 'আরশের উপর থাকার বিষয়ে সালাফে সালেহীনের বক্তব্য বর্ণনা করার পর বলেন,
واعلم أن لفظة (بائن) كَثُرَ ورودُهَا فِي عقيدة السلف في قولهم: «هَوَ تَعَالَى عَلَى عَرْشِهِ، بِائِنٌ مِن خَلْقِهِ وحكاها أبو زرعة وأبو حاتم الرازيان عَنِ العلماء في جميع الأمصار ، وإنَّما نطق العلماء بهاتين اللفظتين: «بذاته» و «بائن» - بعد أن لم تكونا معروفتين في عهد الصحابة رضي الله عنهم - لما ابتدع الجهم وأتباعه القول بأنَّ الله في كل مكان، فاقتضت ضرورة البيان أن يتلفظ هؤلاء الأئمة الأعلام بلفظ «بائن» دون أن ينكره أحد منهم».
"জেনে রাখ, আল্লাহ তা'আলার জন্য "সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা” বাক্যটি সালাফে সালেহীনের আকীদায় প্রচুর পরিমাণে ব্যবহৃত হয়েছে, যখন তারা আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে বলেন, "মহান আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপরে, সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা" আর তা বিখ্যাত আলেমগণ থেকে ইমাম আবু যুর'আহ আর-রাযী ও ইমাম আবু হাতেম আর-রাযী বর্ণনা করেছেন। বস্তুত আলেমগণ এ দু'টি বাক্য, 'সত্তাগতভাবে' ও 'আলাদা' ব্যবহার করেছেন, কিন্তু সাহাবায়ে কেরামের যুগে এভাবে ব্যবহার করা দেখা যায়নি। তার কারণ হচ্ছে, জাহম ও তার অনুসারী লোকদের এটা বলা যে, আল্লাহ তা'আলা সব জায়গায় বিরাজমান। তখন অবস্থার চাহিদা অনুযায়ী এ ইমামগণ কর্তৃক 'আলাদা' শব্দটি ব্যবহার করা জরুরী হয়ে পড়েছিল, তখন কেউ সেটার বিরোধিতা করেনি।" (৭৯২)
ইমাম আবু আব্দির রহমান মুহাম্মাদ নাসেরুদ্দীন আল-আলবানী রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক সকল সৃষ্টির উপরে থাকার বিষয়ে আলোচনা করে বলেন,
يجب أن نعلم في هذا الصدد أن الله تبارك وتعالى له كل صفات الكمال، وهو منزه عن جميع صفات النقصان، وأن صفات الكمال منها ما هو معلوم بمجرد العقل والفطرة السليمة، وهذا قليل، مثل كون الله عز وجل فوق المخلوقات كلها، فهذا يعرف بمجرد العلم بأن الله عز وجل يليق به كل صفات الكمال، كأن يكون الله عز وجل فوق المخلوقات ولا عكس فهو مما يُعْرَفُ ببديهة العقل، ومع ذلك فقد جاءت النصوص الكثيرة
في الكتاب والسنة تصرح تصريحاً ليس بعده تصريح بأن الله عز وجل فوق المخلوقات كلها، وبعض هذه النصوص تبين بأنه فوق العرش بصورة خاصة، كآية (الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى) (طه:٥) التي تكررت في عديد من الآيات الكريمة أشهر من أن تذكر، فالعرش خلق من خلق الله عز وجل، بل هو أعظم مخلوقات الله تبارك وتعالى، فتنصيص رب العالمين على أنه فوق العرش العظيم هو من العقائد التي يجب على المسلم أن يتبناها ولا يجوز له أن ينحرف عن دلالتها الظاهرة إلى المعاني المخترعة المبتدعة والتي يذهب إليها كثير من علماء الكلام المعروفين بانحرافهم عما كان عليه السلف الصالح من الإيمان بآيات الصفات كلها وأحاديث الصفات كلها، دون أي تحريف أو تأويل.
وقد تواتر أو على الأقل اشتهر عن الإمام مالك رحمه الله أنه جاءه رجل فقال: يا مالك الرحمن على العرش استوى، كيف استوى؟ ، فكان جوابه رحمه الله أن قال: الاستواء معلوم، يعني: لغة، وهو العلو، الاستواء لغة معناه العلو، هكذا يعني الإمام مالك بقوله: الاستواء معلوم، والكيف مجهول، والسؤال عنه بدعة، والسؤال عنه أي: عن الكيف بدعة، فالإمام مالك رحمه الله يقرر في جوابه هذا للسائل العقيدة السلفية الجامعة لكل صفات الله عز وجل، فهي تثبت كما جاءت وبالمعنى الثابت لغة ولكن لا يجوز] تمثيلها وتشبيهها؛ لأن الله عز وجل يقول في القرآن الكريم: لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ) (الشورى: ١١) ففي الآية نفي وهو تنزيه (ليس كمثله شيء) وفي الآية إثبات لصفتين من صفات الله عز وجل وهو أنه سميع بصير، فسمعه لا يشبه الأسماع، وبصره لا يشبه الأبصار ، لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ).
"আমাদেরকে এ বিষয়ে এটা জানা আবশ্যক যে, মহান আল্লাহ তাবারকা ও তা'আলার রয়েছে যাবতীয় পূর্ণতা প্রকাশক গুণাবলি, তিনি সকল প্রকার ত্রুটিযুক্ত গুণ থেকে মুক্ত। আর পূর্ণতা প্রকাশক গুণের মধ্যে কিছু আছে যা বিবেকের যুক্তি, সুস্থ স্বাভাবিক প্রকৃতির মাধ্যমে মানুষ জানতে পারে। তবে এর সংখ্যা কম। যেমন, আল্লাহ তা'আলা সকল সৃষ্টির উপরে থাকবেন। যে কেউ এটা জানবে যে, আল্লাহর জন্য সেসব গুণাবলি উপযুক্ত যা পূর্ণতা প্রকাশক, যেমন তিনি সকল সৃষ্টিকুলের উপরে থাকবেন, বিপরীতটি নয়, তার বিবেকের একেবারে সামান্যতম ব্যবহারেই সে এর সত্যতা বুঝতে পারে। তারপরও কুরআন ও সুন্নাহ'য় এত বেশি ভাষ্যে এ বিষয়টিকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর সকল সৃষ্টির উপরে রয়েছেন, এর পরে আর স্পষ্ট করে বর্ণনা করার কিছু নেই। এসব ভাষ্যের মধ্যে কিছু ভাষ্য এটা প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তা'আলা বিশেষভাবে 'আরশের উপর রয়েছেন, যেমন (الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى) [طهঃ৫] রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন' [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫] এ আয়াতটি, যা বেশ কয়েকটি আয়াতে বারবার বর্ণনা করা হয়েছে। বস্তুত 'আরশ মহান আল্লাহর সৃষ্টিসমূহের মধ্যে একটি সৃষ্টি। বরং তা আল্লাহর সৃষ্টিকুলের মধ্যে [আমাদের জানা মতে] সবচেয়ে বড় সৃষ্টি। তাই রব্বুল আলামীন যেখানে সরাসরি নির্দিষ্টভাবে বলেছেন যে, তিনি সে মহা 'আরশের উপর, তাহলে সে আকীদাহ প্রত্যেক মুসলিমের গ্রহণ করা ফরয, কোনো মুসলিমের জন্য
এর প্রকাশ্য নির্দেশনা থেকে নতুন করে বানানো অর্থের দিকে নিজেকে নিয়ে যাওয়া কখনো জায়েয হবে না। যে দিকে সেসব কালামশাস্ত্রবিদ আলেমগণ গিয়েছেন যারা সালাফে সালেহীনের মত ও পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছেন। কারণ, সালাফে সালেহীন আল্লাহর গুণাবলি সংক্রান্ত সকল আয়াত ও হাদীসের ওপর কোনো ধরনের বিকৃতি কিংবা অপব্যাখ্যা ব্যতীতই ঈমান আনতেন।
মুতাওয়াতির পদ্ধতি (সন্দেহাতীতভাবে) অথবা বলবো প্রসিদ্ধ পদ্ধতিতে ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তার কাছে এক লোক এসে বললো, হে মালিক, 'রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন' কীভাবে উঠলেন? তখন মালিক রাহিমাহুল্লাহ'র জবাব ছিল, 'ইস্তেওয়া' শব্দের অর্থ জানা, অর্থাৎ আভিধানিকভাবে, তা হচ্ছে উপরে থাকা, এটাই ইমাম মালিক তার 'ইস্তেওয়া শব্দের অর্থ জানা' এ কথা দ্বারা বুঝিয়েছেন। তারপর তিনি বলেছেন, 'তবে ধরন অজানা, সেটা সম্পর্কে অর্থাৎ ধরণ সম্পর্কে প্রশ্ন করা বিদ'আত।' এভাবে তিনি তার উত্তরে সালাফে সালেহীনের নীতি দিয়ে উত্তর দিয়েছেন যা মহান আল্লাহর সকল গুণের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য। সুতরাং সেসব গুণাবলিকে যেভাবে এসেছে সেভাবে সাব্যস্ত করা হবে, অভিধানে তার যে অর্থটি সুসাব্যস্ত সেটা অনুযায়ী, কিন্তু সাথে সাথে কোনো প্রকার উপমা কিংবা সাদৃশ্য নির্ধারণ করাও জায়েয হবে না। কারণ, আল্লাহ তা'আলা কুরআনে কারীমে বলেছেন, "তাঁর মতো কোনো কিছু নেই আর তিনি সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা।" [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১] এ আয়াতে যখন বলা হয়েছে 'তার মতো কোনো কিছু নেই' তখন কিছু জিনিস 'না' করা হয়েছে, যা দ্বারা আল্লাহকে পবিত্র ঘোষণা করা উদ্দেশ্য। আর আয়াতে 'হ্যাঁ' করা হয়েছে মহান আল্লাহর গুণসমূহ থেকে দু'টি গুণকে, তা হচ্ছে, সাম' ও বাসার অর্থাৎ শোনা ও দেখাকে। তাই বলা হবে, তাঁর শোনা অন্য কারও শোনার মতো নয়, তাঁর দেখাও অন্য কারও দেখার মতো নয়, "তাঁর মতো কোনো কিছু নেই আর তিনি সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা।" (৭৯৩)
📄 শাইখুল আযীয় ইবন আবদুল্লাহ ইবন বায (১৪২০ হিজরী)
শাইখ আবদুল আযীয ইবন আবদুল্লাহ ইবন বায রাহimhimullah, যিনি ছিলেন সালাফে সালেহীনের নমুনা। তিনি তার অধিকাংশ আলোচনায় আল্লাহ সম্পর্কিত সালফে সালেহীনের সহীহ আকীদাহ তুলে ধরতেন। সেগুলো একত্র করলে আরেকটি গ্রন্থ হয়ে যাবে। এখানে শুধু নমুনাস্বরূপ কিছু ভাষ্য বর্ণনা করা হলো:
শাইখ ইবন বায রাহimhimullahকে তিনি কোন আকীদাহ পোষণ করেন সেটা জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি যা বলেন তা হচ্ছে, عقيدتي التي أدين الله بها وأسأله سبحانه أن يتوفاني عليها هي: الإيمان بأنه سبحانه هو الإله الحق المستحق للعبادة، وأنه سبحانه فوق العرش قد استوى عليه استواء يليق بجلاله وعظمته بلا كيف، وأنه سبحانه يوصف بالعلو فوق جميع الخلق، كما قال سبحانه: ﴿الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى ) (۱) وقال عز وجل: {إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ) (۲) الآية، وقال عز وجل في
آخر آية الكرسي: ﴿وَلَا يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ) (۳) وقال عز وجل: ﴿فَالْحُكْمُ اللَّهِ الْعَلِيُّ الْكَبِيرِ) ( ٤ ) وقال سبحانه: ﴿إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ ) (٥) والآيات في هذا المعنى كثيرة.
"আমার আকীদাহ-বিশ্বাস যার মাধ্যমে আমি আল্লাহর আনুগত্য করি আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাকে এর ওপরই মৃত্যু দেন, তা হচ্ছে, এ ঈমান পোষণ করা যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তিনিই হচ্ছেন হক্ক মা'বুদ, ইবাদাত পাওয়ার অধিকারী, আরও ঈমান আনি যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর, তিনি সেটার উপর উঠেছেন, যেভাবে উপরে উঠা তাঁর সম্মান, মর্যাদার সাথে উপযুক্ত কোনো প্রকার ধরণ নির্ধারণ ব্যতীতই। আরও ঈমান আনি যে, তিনি সকল সৃষ্টির উপর রয়েছেন এ গুণে তাঁকে গুণান্বিত করতে হবে, যেমনটি আল্লাহ বলেছেন, "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫], মহান আল্লাহ আরও বলেছেন, “নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ্ যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন।” [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৫৪], মহান আল্লাহ আয়াতুল কুরসীর শেষে বলেছেন, "আর এ দু'টোর রক্ষণাবেক্ষণ তাঁর জন্য বোঝা হয় না। আর তিনি সুউচ্চ সুমহান।” [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ২৫৫], মহান আল্লাহ আরও বলেন, "সুতরাং যাবতীয় কর্তৃত্ব সমুচ্চ, মহান আল্লাহরই।” [সূরা গাফির, আয়াত: ১২] মহান আল্লাহ আরও বলেছেন, "তাঁরই দিকে পবিত্র বাণীসমূহ হয় সমুত্থিত এবং সৎকাজ, তিনি তা করেন উন্নীত।” [সূরা ফাত্বির, আয়াত: ১০] এ অর্থে আরও বহু আয়াত এসেছে।”(৭৯৪)
অন্যত্র তিনি বলেন,
أنه جل وعلا موصوف بصفات الكمال منزه عن صفات النقص والعيب، فهو كما أخبر عنه الرسول محمد عليه الصلاة والسلام له الأسماء الحسنى وله الصفات العلا.
فواجب على المؤمن أن يؤمن بكل ما أخبر الله عنه ورسوله من أسماء الله وصفاته، ويعرفها كما جاءت؛ لا يغير ولا يبدل ولا يزيد ولا ينقص، بل يعرفها كما جاءت من غير تحريف ولا تعطيل ولا تكييف ولا تمثيل، بل تثبت كما أثبتها السلف الصالح.
فمن ذلك الاستواء، والنزول، والوجه واليد والرحمة، والعلم، والغضب، والإرادة وغير ذلك من صفات الله عز وجل؛ فتثبت له سبحانه كما جاء في الكتاب العزيز وكما جاء في السنة الصحيحة، نثبتها له كما أثبتها السلف الصالح من أهل السنة والجماعة، كما أثبتتها الرسل عليهم الصلاة والسلام.
فنقول: استوى على العرش استواء يليق بجلاله وعظمته، ليس كما تقول الجهمية استولى؛ فانه ليس في موقف المغالب جل وعلا، فلا أحد يغالبه؛ فهو مستول على كل شيء جل وعلا، ولكن الاستواء صفة خاصة بالعرش، معناه العلو والارتفاع؛ فهو عال فوق خلقه مرتفع فوق عرشه استواء يليق به سبحانه لا يشابه خلقه
في شيء من صفاته جل وعلا؛ فاستواؤه أمر معروف كما قال مالك رحمه الله: «الاستواء معلوم والكيف، مجهول، والإيمان به واجب، والسؤال عنه بدعة، وكما قال ربيعة شيخ الإمام مالك رحمهما الله، وكما قالته أم سلمه رضي الله عنها، وكما قاله أهل السنة والجماعة، فالصفات معلومة وكيفها مجهول والإيمان بها واجب.
هذا طريق الصفات كلها العلم، والرحمة، والغضب، والوجه واليد، والقدم، والأصابع وغير ذلك مما جاءت به الآيات والسنة الصحيحة طريقها واحد، وهكذا حديث النزول؛ نؤمن به ونثبت معناه الله على الوجه اللائق به ولا يعلم كيفيته سواه؛ فنقول: ينزل بلا كيف كما يشاء سبحانه وتعالى نزولا يليق بجلاله وعظمته، لا ينافي علوه وفوقيته سبحانه وتعالى، ولا يشابه نزول المخلوقين.
وهكذا استواؤه على العرش لا ينافي علمه بالأشياء وإحاطته بها، وأنه مع عباده ومع أهل طاعته، مع عباده بعلمه واطلاعه سبحانه وتعالى، كما قال عز وجل: ﴿وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ﴾ ؛ فهذا لا ينافي علوه واستواءه على عرشه؛ فهو معنا بعلمه واطلاعه، وهو فوق العرش سبحانه وتعالى كما يشاء، وكما أخبر جل وعلا، من غير تحريف ولا تكييف، وهو مع أوليائه وأهل طاعته بعلمه وتأييده أيضا وعنايته بهم، وكلاءته لهم ونصره إياهم، فهما معيّتان: معية عامه تقتضي العلم والإحاطة ورؤية العباد، وأنه لا تخفى عليه
"আর মহান আল্লাহ সকল প্রকার পূর্ণতাজ্ঞাপক গুণে গুণান্বিত, সকল প্রকার দোষ-ত্রুটি প্রকাশক গুণ থেকে মুক্ত ও পবিত্র। তিনি তেমনি, যেমনটি তাঁর ব্যাপারে তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়েছেন, তাঁর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম ও সুউচ্চ গুণাবলি।
সুতরাং মুমিনের ওপর কর্তব্য হচ্ছে, আল্লাহর নাম ও গুণের ব্যাপারে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা যা সংবাদ দিয়েছেন তার ওপর যথাযথ ঈমান আনয়ন করা, সেগুলোকে যেভাবে এসেছে সেভাবে চেনা, বিগড়ে ফেলা যাবে না, পরিবর্তন সাধন করা যাবে না, পরিবর্ধন করা যাবে না, সংকুচিত করা যাবে না। বরং যেভাবে এসেছে সেভাবে কোনো প্রকার বিকৃতি সাধন, অর্থহীন করণ, ধরণ নির্ধারণ ও উপমা প্রদান ব্যতীতই তা জানতে হবে। বরং সেগুলোকে সালফে সালেহীন যেভাবে সাব্যস্ত করেছেন সেভাবে সাব্যস্ত করতে হবে।
তন্মধ্যে অন্যতম গুণ হচ্ছে, 'আরশের উপর উঠা, নিকটতম আসমানে অবতরণ করা, চেহারা, হাত, দয়া, জ্ঞান, ক্রোধ, ইচ্ছা ইত্যাদি গুণসমূহ। সুতরাং এগুলোকে মহান আল্লাহর কিতাব ও সহীহ সুন্নাহ'য় যেভাবে এসেছে সেভাবে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা হবে। আমরা সেগুলোকে আল্লাহর জন্য সেভাবে সাব্যস্ত করবো যেভাবে আমাদের সালাফে সালেহীন আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আত সাব্যস্ত করেছেন। যেভাবে রাসূলগণ 'আলাইহিমুস সালাম সাব্যস্ত করেছেন।
তাই আমরা বলবো, আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপর উঠেছেন, যেভাবে উঠা তাঁর সম্মান ও মহত্বের সাথে উপযুক্ত। সেটা নয় যা জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায় বলে থাকে যে, তিনি অধিকার করেছেন বা মালিক হয়েছেন। কারণ মহান আল্লাহ বিপরীত কাউকে পরাজয়কারীর অবস্থানে
নন; কারণ কেউ তাঁকে পরাজিত করার ভূমিকায় যেতে পারে না। তিনি সবকিছুর উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রক। বস্তুত 'ইস্তেওয়া' 'আরশের সাথে সম্পৃক্ত আল্লাহ তা'আলার বিশেষ গুণ। যার অর্থ উপরে উঠা ও ঊর্ধ্বে উঠা। তিনি সুউচ্চে রয়েছেন, তাঁর সৃষ্টির উপরে, ঊর্ধ্বে, 'আরশের উপরে, তাতে সেভাবে উঠেছেন যেভাবে উঠা তাঁর সাথে উপযোগী, মহান আল্লাহর এসব গুণে তাঁর কোনো সৃষ্টি তাঁর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়। সুতরাং তাঁর 'আরশের উপর 'ইস্তেওয়া' করা জানা জিনিস (যার অর্থ, উপরে উঠা।) যেমনটি ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, "ইস্তেওয়া' বা উপরে উঠার বিষয়টি জানা জিনিস, তার ধরন অজানা, তার উপর ঈমান আনয়ন করা ওয়াজিব, তার (ধরণ) সম্পর্কে প্রশ্ন করা বিদ'আত। এরকমই বলেছেন রবী'আহ, যিনি ইমাম মালিকের উস্তাদ ছিলেন। আর এ কথাই বলেছেন, উম্মে সালামাহ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহা। আর এটাই বলে থাকেন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আত। সুতরাং এ গুণাবলির অর্থ জানা জিনিস, কিন্তু এগুলোর ধরন অজানা। সেগুলোর ওপর ঈমান আনা ওয়াজিব।
সকল গুণের ক্ষেত্রে এই একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। জ্ঞান, দয়া, ক্রোধ, চেহারা, হাত, পা, আঙ্গুল ইত্যাদি যা আল্লাহর কুরআনের আয়াতে এসেছে, আর যা সহীহ সুন্নাহ'য় এসেছে, এসবের ব্যাপারে একই নীতি কার্যকর হবে। অনুরূপ নিয়মেই আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক নিকটতম আসমানে অবতরণ করার গুণটি বুঝতে হবে। আমরা অবতরণ করার অর্থ বুঝি, সেটার অর্থকে যেভাবে তাঁর জন্য উপযুক্ত সেভাবে সাব্যস্ত করি, তিনি ব্যতীত সেটার ধরন আর কেউ জানে না। তাই আমরা বলবো, তিনি যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে অবতরণ করেন, কোনো ধরন নির্ধারণ করবো না, এমনভাবে তিনি অবতরণ করেন যেভাবে অবতরণ করা তাঁর সম্মান ও বড়ত্বের সাথে উপযোগী। এ অবতরণ তাঁর উপরে, সর্বোচ্চে থাকাকে নিষেধ করে না। তাঁর অবতরণ কোনো সৃষ্টিকুলের অবতরণের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়।
ঠিক একইভাবে বলা হবে, আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক 'আরশের উপর উঠা বস্তুনিচয় সম্পর্কে তাঁর জানা এবং সেগুলোকে জ্ঞানের মাধ্যমে পরিবেষ্টন করার বিরোধী নয়। আবার তিনি তাঁর বান্দাদের সাথে রয়েছেন, তাঁর আনুগত্যকারী বান্দাদের সঙ্গে রয়েছেন, তাঁর বান্দাদের সাথে তিনি তাঁর জ্ঞান ও দেখার মাধ্যমে সাথে আছেন, যেমনটি তিনি বলেছেন, "তিনি তোমাদের সাথে রয়েছেন যেখানেই তোমরা থাক না কেন।" [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ০৪] এ সাথে থাকা তাঁর উপরে থাকা ও 'আরশের উপর উঠার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। তিনি আমাদের সাথে রয়েছেন তাঁর জ্ঞান ও দেখার মাধ্যমে, অথচ তিনি 'আরশের উপরে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে, আর যেমনটি তিনি জানিয়েছেন, কোনো প্রকার বিকৃতি, ধরন নির্ধারণ করা যাবে না। আবার তিনি তাঁর বন্ধুদের সাথে, আনুগত্যকারীদের সাথে রয়েছেন তাঁর জ্ঞানের মাধ্যমে, সাহায্য সহযোগিতার মাধ্যমে, তাদের যথাযথ তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে, তাদের যথাযথ হিফাযত করার মাধ্যমে, তাদেরকে সাহায্য করার মাধ্যমে। তাহলে এখানে দু' ধরনের সাথে থাকা রয়েছে। একটি হচ্ছে, সর্বব্যাপী 'সাথে থাকা' যা জ্ঞান ও পরিবেষ্টন করাকে বুঝায়, আর বান্দাদেরকে দেখা এবং তারা কেউ যে তাঁর কাছে গোপন থাকে না। [অপর 'সাথে থাকা' হচ্ছে বিশেষভাবে সাথে থাকা, যা তার বিশেষ বান্দাদের সাথে, তার দ্বারা জানা ও দেখার সাথে সাথে তাদের সাহায্য করাও অন্তর্ভুক্ত যা পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে।]" (৭৯৫)
অন্যত্র তিনি বলেন,
الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ). أي ثم ارتفع على العرش وعلا فوقه سبحانه وتعالى. فعلمه في كل مكان وهو فوق العرش فوق جميع المخلوقات والعرش سقف المخلوقات وهو أعلى المخلوقات والله فوقه جل وعلا. استوى عليه استواء يليق بجلاله لا يشابه خلقه في شيء من صفاته.
"যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন।" [সূরা আল- আ'রাফ, আয়াত: ৫৪] এখানে (সুম্মা ইস্তাওয়া 'আলাল 'আরশ) এর অর্থ, তারপর তিনি 'আরশের উপরে উঠলেন, তার ঊর্ধ্বে উঠলেন। সুতরাং সকল জায়গায় তাঁর জ্ঞান, কিন্তু তিনি 'আরশের উপর, সকল সৃষ্টিকুলের উপর। আর 'আরশ হচ্ছে সকল সৃষ্টির ছাদ। তা সবচেয়ে উপরের সৃষ্টি আর মহান আল্লাহ তার উপরে'। তিনি সে 'আরশের উপর উঠেছেন যেভাবে উঠা তাঁর সম্মান ও মর্যাদার সাথে উপযোগী, তাঁর গুণের সাথে তাঁর কোনো সৃষ্টির কোনো সাদৃশ্য নেই।"(৭৯৬)
অন্যত্র তিনি বলেন,
ولهذا قال: ﴿إِنِّي مُنَزِّلُها عَلَيْكُمْ﴾ [المائدة: ١١٥].
فدل ذلك على : أن ربنا جل وعلا يطلب من أعلى، وأنه في العلو سبحانه وتعالى فوق السماوات، وفوق جميع الخلائق وفوق العرش، قد استوى عليه استواء يليق بجلاله وعظمته، لا يشابه خلقه في شيء من صفاته جل وعلا.
وقد دل على هذا المعنى آيات كثيرات مصرحة بعلو الله سبحانه وتعالى على خلقه، ومن ذلك آيات الاستواء السبع المعروفة التي فيها قوله سبحانه في سورة الأعراف: ﴿إِنَّ رَبَّكُمُ اللهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يُغْشِي اللَّيْلَ النَّهَارَ يَطْلُبُهُ حَثِيثًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومَ مُسَخَّرَاتٍ بِأَمْرِهِ أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ تَبَارَكَ اللهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ ﴾ [الأعراف: ٥٤] وفي هذه الآية يبين علوه، وأنه الخلاق الرزاق، وأنه صاحب الخلق والأمر سبحانه وتعالى، وأنه الذي يغشي الليل النهار، وأنه خالق الشمس والقمر، وخالق النجوم ليعلم العباد عظيم شأنه، وكمال قدرته، وكمال علمه سبحانه، وأنه العالي فوق جميع خلقه المستحق لأن يعبد سبحانه وتعالى.
"আর এজন্য আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, “নিশ্চয় আমি তা (খাবার ভর্তি প্লেট) তোমাদের ওপর নাযিল করব।” [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ১১৫]
এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, আমাদের রব তাঁর কাছে উপরের দিকে চাইতে হবে, আর তিনি উপরে আসমানসমূহের উপরে রয়েছেন। সকল সৃষ্টির উপরে, 'আরশের উপরে, তিনি সে 'আরশের উপর এমনভাবে উঠেছেন যেভাবে উঠা তাঁর মহত্ব, সম্মান-মর্যাদার সাথে উপযোগী। তাঁর কোনো গুণের সাথে তাঁর সৃষ্টির কোনো সাদৃশ্য নেই।
এ অর্থটি অন্যান্য বহু আয়াতেও সাব্যস্ত হয়েছে, যা আল্লাহ তা'আলাকে তাঁর সৃষ্টির উপরে থাকা প্রমাণ করা হয়েছে। তন্মধ্যে রয়েছে 'ইস্তেওয়া' বা 'আরশের উপরে উঠা সাব্যস্তকারী
সাতটি বিখ্যাত আয়াত; যার অন্যতম হচ্ছে, আল্লাহর বাণী, "নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ্ যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন। তিনিই দিনকে রাত দিয়ে ঢেকে দেন, তাদের একে অন্যকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে। আর সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্ররাজি, যা তাঁরই হুকুমের অনুগত, তা তিনিই সৃষ্টি করেছেন। জেনে রাখ, সৃজন ও আদেশ তাঁরই। সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ্ কত বরকতময়!” [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৫৪]
এ আয়াতে তিনি সাব্যস্ত করছেন, তাঁর উপরে থাকা, তিনিই মহাস্রষ্টা, মহা রিযিকদাতা, তিনিই সৃষ্টি ও বিধান প্রদান করার মালিক। তিনিই রাতকে দিন দিয়ে ঢেকে দেন, তিনিই সূর্য ও চন্দ্রের সৃষ্টা, তিনিই তারকারাজি সৃষ্টি করেছেন, যাতে করে মানুষ জানতে ও বুঝতে পারে তাঁর মহান অবস্থা, পূর্ণ ক্ষমতা, পরিপূর্ণ জ্ঞান। আরও বুঝতে পারে যে, তিনি সকল সৃষ্টির উপরে রয়েছেন, তিনিই শুধু ইবাদাত পাওয়ার যোগ্য।” (৭৯৭)
📄 শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমীন (১৪২১ হিজরী)
আমাদের শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল-উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ সারা জীবন যত আকীদাহ'র বইয়ের ব্যাখ্যা করেছেন সবগুলোতেই আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠার বিষয়টির আলোচনা এনেছেন, তাঁর যেসব গ্রন্থে এসব আলোচনা এসেছে, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, ১) শারহুল আকীদাতিস সাফারীনীয়্যাহ। ২) শারহু উসূলিল ঈমান ৩) শারহু লুম'আতিল ই'তিক্বাদ ৪) তালখীসু আকীদাতিল হামাওয়িয়্যাহ
আমরা এখানে একটি গ্রন্থের আলোচনা পেশ করব যেখানে তিনি এ বিষয়টিকে খুব সুন্দর ও সহজ করে তুলে ধরেছেন। তিনি শারহুল আকীদাতিল ওয়াসিত্বিয়্যাহ গ্রন্থে বলেন, وقوله : {ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ : ثَمَّ : للترتيب. و الْعَرْشِ : هو ذلك السقف المحيط بالمخلوقات، ولا نعلم مادة هذا العرش، لأنه لم يرد عن النبي صلى الله عليه وسلم حديث صحيح يبين من أين خلق هذا العرش، لكننا نعلم أنه أكبر المخلوقات التي نعرفها. وأصل العرش في اللغة: السرير الذي يختص به الملك، ومعلوم أن السرير الذي يختص به الملك سيكون سريراً عظيماً فخماً لا نظير له.
وفي هذه الآية من صفات الله تعالى عدة صفات، لكن المؤلف ساقها لإثبات صفة واحدة، وهي الاستواء على العرش.
وأهل السنة والجماعة يؤمنون بأن الله تعالى مستوى على عرشه استواء يليق بجلاله ولا يماثل استواء المخلوقين.
فإن سألت: ما معنى الاستواء عندهم؟ فمعناه العلو والاستقرار.
وقد ورد عن السلف في تفسيره أربعة معاني الأول: علا، والثاني : ارتفع، والثالث: صعد. والرابع: استقر. لكن (علا) و (ارتفع) و (صعد) معناها واحد، وأما (استقر)، فهو يختلف عنها.
ودليلهم في ذلك: أنها في جميع مواردها في اللغة العربية لم تأت إلا لهذا المعنى إذا كانت متعدية بـ (على): قال الله تعالى: ﴿فَإِذَا اسْتَوَيْتَ أَنْتَ وَمَنْ مَعَكَ عَلَى الْفُلْكِ﴾ [المؤمنون: ۲۸] . وقال تعالى: ﴿وَجَعَلَ لَكُمْ مِنَ الْفُلْكِ وَالأَنْعَامِ مَا تَرْكَبُونَ لِتَسْتَوُوا عَلَى ظُهُورِهِ ثُمَّ تَذْكُرُوا نِعْمَةَ رَبِّكُمْ إِذَا اسْتَوَيْتُمْ عَلَيْهِ﴾ [الزخرف: ١٢ - ١٣].
وفسره أهل التعطيل بأن المراد به الاستيلاء، وقالوا: معنى : أَثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ) [الأعراف: ٥٤]، يعني: ثم استولى عليه.
واستدلوا لتحريفهم هذا بدليل موجب وبدليل سالب - أما الدليل الموجب، فقالوا : إننا نستدل بقول الشاعر : قد استوى بشر على العراق ... من غير سيف أو دم مهراق (بشر) ابن مروان (استوى) يعني: استولى على العراق.
قالوا: وهذا بيت بن رجل عربي، ولا يمكن أن يكون المراد به استوى على العراق، يعني علا على العراق! لا سيما أنه في ذلك الوقت لا طائرات يمكن أن يعلو على العراق بها.
أما الدليل السلبي، فقالوا لو أثبتنا أن الله عز وجل مستو على عرشه بالمعنى الذي تقولون، وهو العلو والاستقرار، لزم من ذلك أن يكون محتاجاً إلى العرش، وهذا مستحيل، واستحالة اللازم تدل على إستحالة الملزوم. ولزم من ذلك أن يكون جسماً، لأن استواء شيء على شيء بمعنى علوه عليه يعني أنه . جسم ولزم أن يكون محدوداً، لأن المستوي على الشيء يكون محدودا، وإذا استويت على البعير، فأنت محدود في منطقة معينة محصور بها وعلى محدود أيضاً.
هذه الأشياء الثلاثة التي زعموا أنها تلزم من إثبات أن الاستواء بمعنى العلو والارتفاع. والرد عليهم من وجوه
أولاً: تفسيركم هذا مخالف لتفسير السلف الذي أجمعوا عليه، والدليل على إجماعهم أنه لم ينقل عنهم أنهم قالوا به وخالفوا الظاهر، ولو كانوا يرون خلاف ظاهره، لنقل إلينا، فما منهم أحد قال: إن استوى) بمعنى (استولى) أبداً.
ثانياً: أنه مخالف لظاهر اللفظ، لأن مادة الاستواء إذا تعدت بـ (على)، فهي بمعنى العلو والاستقرار، هذا ظاهر اللفظ، وهذه مواردها في القرآن وفي كلام العرب.
ثالثاً: أنه يلزم عليه لوازم باطلة: ۱ - يلزم أن يكون الله عز وجل حين خلق السماوات والأرض ليس مستولياً على عرشه، لأن الله يقول: خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ ﴾ [الأعراف: ٥٤]، و ثُمَّ) تفيد الترتيب، فيلزم أن يكون
العرش قبل تمام خلق السماوات والأرض لغير الله. ১- أن الغالب من كلمة (استولى) أنها لا تكون إلا بعد مغالبة! ولا أحد يغالب الله. ২ - من اللوازم الباطلة أنه يصح أن نقول: إن الله استوى على الأرض والشجر والجبال، لأنه مسئول عليها. وهذه لوازم باطلة، وبطلان اللازم يدل على بطلان الملزوم. وأما استدلالهم بالبيت، فنقول: ১ - أثبتوا لنا سند هذا البيت وثقة رجاله، ولن يجدوا إلى ذلك سبيلاً. ২ - من هذا القائل ؟ أفلا يمكن أن يكون قاله بعد تغير اللسان ؟ لأنه كل قول يستدل به على اللغة العربية بعد تغير اللغة العربية فإنه ليس بدليل، لأن العربية بدأت تتغير حين اتسعت الفتوح ودخل العجم مع العرب فاختلف اللسان، وهذا فيه احتمال أنه بعد تغير اللسان. ۳ - أن تفسيركم «استوى بشر على العراق» بـ (استولى) تفسير تعضده القرينة، لأنه من المعتذر أن بشراً يسعد فوق العراق فيستوى عليه كما يستوي على السرير أو على ظهر الدابة فلهذا نلجأ إلى تفسيره بـ (استولى). هذا نقوله من باب التنزل، وإلا، فعندنا في هذا جواب آخر : أن نقول: الاستواء في البيت بمعنى العلو، لأن العلو نوعان: ১ - علو حسي، كاستوائنا على السرير. ২ - وعلو معنوي، بمعنى السيطرة والغلبة. فيكون معنى استوى بشر على العراق يعني : علا علو غلبة وقهر. وأما قولكم: إنه يلزم من تفسير الاستواء بالعلو أن يكون الله جسماً. فجوابه : كل شيء يلزم من كتاب الله وسنة رسوله صلى الله عليه وسلم، فهو حق، ويجب علينا أن نلتزم به، ولكن الشأن كل الشأن أن يكون هذا من لازم كلام الله ورسوله، لأنه قد يمنع أن يكون لازماً، فإذا ثبت أنه لازم، فليكن، ولا حرج علينا إذا قلنا به.
ثم نقول: ماذا تعنون بالجسم الممتنع ؟ إن أردتم به أنه ليس الله ذات تتصف بالصفات اللازمة لها اللائقة بها ، فقولكم باطل، لأن الله ذاتاً حقيقية متصفة بالصفات، وأن له وجهاً ويداً وعيناً وقدماً، وقولوا ما شئتم من اللوازم التي هي لازم حق. وأن أردتم بالجسم الذي قلتم يمتنع أن يكون الله جسم : الجسم المركب من العظام واللحم والدم وما أشبه ذلك، فهذا ممتنع على الله، وليس بلازم من القول بأن استواء الله على العرش علوه عليه.
وأما قولهم: إنه يلزم أن يكون محدوداً. فجوابه أن نقول بالتفصيل: ماذا تعنون بالحد ؟ إن أردتم أن يكون محدوداً، أي: يكون مبايناً للخلق منفصلاً عنهم، كما تكون أرض لزيد وأرض لعمر، فهذه محدودة منفصلة عن هذه، فهذا حق ليس فيه شيء من النقص.
وإن أردتم بكونه محدوداً: أن العرش محيط به، فهذا باطل، وليس بلازم، فإن الله تعالى مستوى على العرش، وإن كان عز وجل أكبر من العرش ومن غير العرش، ولا يلزم أن يكون العرش محيطاً به بل لا يمكن أن يكون محيطاً به، لأن الله سبحانه وتعالى أعظم من كل شيء وأكبر من كل شيء والأرض جميعاً قبضته يوم القيامة، والسماوات مطويات بیمینه.
وأما قولهم: يلزم أن يكون محتاجاً إلى العرش. فنقول: لا يلزم، لأن معنى كونه مستوياً على العرش أنه فوق العرش، لكنه علو خالص، وليس معناه أن العرش يقله أبداً، فالعرش لا يقله، والسماء لا تقله، وهذا اللازم الذي ادعيتموه ممتنع، لأنه نقص بالنسبة إلى الله عز وجل، وليس بلازم من الاستواء الحقيقي، لأننا لسنا نقول: إن معنى اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ)، يعني: أن العرش يقله ويحمله، فالعرش محمول: ﴿ وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَئِذٍ ثَمَانِيَةٌ ﴾ [الحاقة: ١٧]، وتحمله الملائكة الآن، لكنه ليس حاملاً لله عز وجل، لأن الله سبحانه وتعالى ليس محتاجاً إليه، ولا مفتقراً إليه، وبهذا تبطل حججهم السلبية. وخلاصة ردنا لكلامهم من عدة أوجه: الأول: أن قولهم هذا مخالف لظاهر النص. ثانياً: مخالف لإجماع الصحابة وإجماع السلف قاطبة. ثالثاً: أنه لم يرد في اللغة العربية أن (استوى) بمعنى (استولى)، والبيت الذي احتجوا به على ذلك لا يتم به الاستدلال. رابعاً: أنه يلزم عليه لوازم باطلة:
۱ - أن يكون العرش قبل خلق السماوات والأرض، ملكاً لغير الله. ٢ - أن كلمة (استولى) تعطي في الغالب أن هناك مغالبة بين الله وبين غيره، فاستولى عليه وغلبه. ٣ - أنه يصح أن نقول - على زعمكم: أن الله استوى على الأرض والشجر والجبال والإنسان والبعير، لأنه (استولى) على هذه الأشياء، فإذا صح أن نطلق كلمة (استولى) على شيء، صح أن نطلق كلمة (استولى) على شيء، صح أن نطلق (استوى) على ذلك الشيء، لأنهما مترادفان على زعمكم. فبهذه الأوجه يتبين أن تفسيرهم باطل.
"আর আল্লাহর বাণী, "সুম্মা ইস্তাওয়া 'আলাল 'আরশ” (তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠলেন) এখানে 'সুম্মা' শব্দটি ধারাবাহিকতা বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।
আর 'আরশ' অর্থ সে ছাদ, যা সকল সৃষ্টিকে পরিবেষ্টন করে আছে, আমরা 'আরশের মূল উপাদান জানি না; কারণ নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এমন কোনো সহীহ হাদীস আসেনি যাতে 'আরশ কিসের তৈরি তা বর্ণনা করেছে, তবে আমরা অবশ্যই জানি যে, যত সৃষ্টি আমরা জানি তন্মধ্যে 'আরশ হচ্ছে সর্ববৃহৎ সৃষ্টি।
আর 'আরশ' শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, এমন খাট যা বাদশাহ'র জন্য বিশেষভাবে নির্দিষ্ট। আর জানা কথা যে, বাদশাহ'র জন্য যে খাটটি নির্ধারিত, সেটি হবে অনেক বৃহৎ বিশাল, নজীরবিহীন।
এ আয়াতে আল্লাহর গুণাবলির মধ্যে অনেকগুলো গুণের বর্ণনা এসেছে, কিন্তু গ্রন্থকার (ইবন
তাইমিয়্যাহ) শুধু একটি গুণ সাব্যস্ত করার জন্য তা নিয়ে এসেছেন। আর তা হচ্ছে, 'আরশের উপর উঠার গুণ সাব্যস্ত করা।
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আহ ঈমান আনে যে, আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপরে সমুন্নত, তিনি 'আরশের উপরে এমনভাবে উঠেছেন যেভাবে উঠা তাঁর মর্যাদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, তাঁর সে উঠা সৃষ্টিকুলের উঠার মতো নয়।
যদি প্রশ্ন কর যে, আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের নিকট 'ইস্তিওয়া' এর অর্থ কী? উত্তর হবে, তাদের নিকট এর অর্থ, উপরে উঠা এবং উপরে অবস্থান করা।
সালফে সালেহীন থেকে 'ইস্তিওয়া' এর অর্থ বুঝাতে চারটি শব্দ এসেছে, এক, 'আলা' (علا) বা উপরে উঠা, দুই. 'ইরতাফা'আ' (ارتفع) বা উপরে উঠা, তিন, 'স্বা'আদা' (صعد) বা উপরে আরোহন করা, চার, 'ইস্তাকাররা' (استقر) বা উপরে অবস্থান করা।
তন্মধ্যে 'আলা', 'ইরতাফা'আ' ও স্বা'আদা এর অর্থ একই। শুধু শব্দগত পার্থক্য। কিন্তু 'ইস্তাকাররা' এ শব্দটি উপরোক্ত শব্দসমূহ থেকে অর্থের দিক থেকে একটু ভিন্নতর।
সালাফে সালেহীন তাদের বক্তব্যের সপক্ষে দলীল দিয়েছেন যে, আরবী ভাষার সকল অভিধানে এ অর্থেই এসেছে, যখন সেটার 'আলা' (alā) অব্যয় যুক্ত হয়ে ব্যবহৃত হয়। যেমন,
আল্লাহর বাণী, "অতঃপর যখন আপনি ও আপনার সঙ্গীরা নৌযানের উপরে স্থির হবে।" [সূরা আল-মুমিনূন, আয়াত: ২৮]
যেমন অপর বাণী, "যিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন এমন নৌযান ও গৃহপালিত জন্তু যাতে তোমরা আরোহণ কর, যাতে তোমরা এর পিঠে স্থির হয়ে বসতে পার, তারপর তোমাদের রবের অনুগ্রহ স্মরণ করবে যখন তোমরা এর উপর স্থির হয়ে বসবে।” [সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ১২-১৩]
এর বিপরীতে আমরা দেখি, তা'ত্বীল (বা এগুলোকে) আল্লাহর গুণাবলি সাব্যস্ত করতে অস্বীকারকারীরা 'ইস্তিওয়া' শব্দের অর্থ করেছেন 'ইস্তীলা' বা অধিকার করা। অধীনস্থ করা। তারা বলে, এখানে "সুম্মা ইস্তাওয়া আলাল 'আরশ” [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৫৪] এর অর্থ হচ্ছে, তারপর তিনি 'আরশ অধিকার করলেন।
আর তারা সে বিকৃতি সাধনের জন্য পজেটিভ দলীল ও নেগেটিভ দলীল নিয়ে এসেছে।
তন্মধ্যে পজেটিভ বা ইতিবাচক দলীল হচ্ছে, তারা বলে, আমরা কবির কবিতা দিয়ে দলীল পেশ করছি, কবি বলেন, قد استوى بشر على العراق ... من غير سيف أو دم مهراق
অর্থাৎ, বিশর (ইবন মারওয়ান) ইস্তাওয়া (অধিকার করে নিয়েছে) ইরাককে।
তারা বলে, এটি তো এক আরবী লোকের কবিতা। সেখানে ইরাকের উপর উঠেছেন বলা সম্ভব নয়, কারণ, তখন তো আর কোনো বিমান ও এ জাতীয় জিনিস ছিল না যে, আমরা বলবো তিনি এগুলো দিয়ে ইরাকের আকাশে উঠেছেন।
আর তাদের নেগেটিভ বা নেতিবাচক দলীল হচ্ছে এটা বলা যে, আমরা যদি মহান আল্লাহর জন্য 'আরশের উপর উঠা সাব্যস্ত করি, যেমনটি তোমরা বলে থাক, আর যা উপরে উঠা ও উপরে
অবস্থান করা বুঝায়,
তাহলে তো এর দ্বারা আবশ্যক হয়ে যায় যে আল্লাহ তা'আলা 'আরশের মুখাপেক্ষী, যা অসম্ভব; আর আবশ্যক হওয়া জিনিস অসম্ভব হওয়ায় যা অসম্ভবকে আবশ্যক করে তোলে তাও অসম্ভব হওয়া প্রমাণিত হচ্ছে।
তাছাড়া আরেকটি জিনিসও বাধ্যতামূলকভাবে এসে যায়, তা হচ্ছে আল্লাহর জন্য দেহ সাব্যস্ত করা। কারণ কোনো কিছুর উপর কোনো কিছু উঠা অর্থই তার উপরে থাকা, তার অর্থ হচ্ছে সেটা দেহ।
অনুরূপ আরেকটি বিষয়ও এসে যায়, তা হচ্ছে আল্লাহকে সীমাবদ্ধ করা; কারণ কোনো কিছুর উপরে কোনো কিছু উঠার অর্থই হচ্ছে সেটাকে সীমাবদ্ধ বলা। কেননা, তুমি যখন কোনো উটের উপর উঠবে তার অর্থ দাঁড়ায় তুমি উটের উপরের যে নির্ধারিত জায়গা বা অংশ রয়েছে তাতে সীমাবদ্ধ করা ও নির্ধারিত করা।
আর এ তিনটি বিষয়, তাদের ধারণা মতে, আবশ্যক হয়ে পড়ে, যখন কেউ ইস্তেওয়া এর অর্থ উপরে উঠা বা ঊর্ধ্বে উঠা বলে।
সন্দেহের অপনোদন:
তাদের এসব সন্দেহের অপনোদন কয়েকভাবে করা যায়:
প্রথমত: তাদেরকে বলা হবে, তোমাদের এ ব্যাখ্যা সালাফে সালেহীনের ঐকমত্যের ব্যাখ্যার বিপরীত। তাদের এ ব্যাপারে ঐকমত্য ছিল যে, এর দ্বারা 'উপরে উঠা' অর্থই করা হবে; কারণ তাদের থেকে তোমাদের দাবি করা 'অধিকার করা' অর্থ কখনো বর্ণিত হয়নি। তাদের থেকে প্রকাশ্য অর্থের বিপরীত যাওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যদি তারা এর প্রকাশ্য অর্থের বিপরীত মত নিতেন তবে অবশ্যই তার বিপরীতটি আমাদের কাছে বর্ণিত হয়ে আসত। তাদের মধ্য থেকে কেউ কোনোদিন বলেননি যে, 'ইস্তাওয়া' এর অর্থ 'ইস্তাওলা' বা অধিকার করা।
দ্বিতীয়ত: এখানে 'ইস্তাওয়া' এর 'ইস্তাওলা' বা অধিকার অর্থ করা শব্দের প্রকাশ্য অর্থের বিপরীত কথা; কারণ 'ইস্তাওয়া' মূলধাতু যখন 'আলা (alā) অব্যয় যুক্ত হয়ে ব্যবহৃত হয়, তখন তার অর্থ হয়, উপরে উঠা, উপরে অবস্থান করা। এটাই হচ্ছে এ 'ইস্তাওয়া' শব্দের প্রকাশ্য অর্থ, কুরআনে কারীম ও আরবদের ভাষায় যেখানেই এভাবে এসেছে সেখানেই তার অর্থ হয়েছে উপরে উঠা ও উপরে অবস্থান করা।
তৃতীয়ত: 'ইস্তাওয়া' শব্দটিকে 'ইস্তাওলা' বা অধিকার করা অর্থ করা হলে বেশ কিছু বাতিল জিনিস এসে যায়:
১- 'অধিকার করা' অর্থ করার দ্বারা আবশ্যক হয়ে যায় যে, আল্লাহ তা'আলা যখন তিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন তখন তিনি 'আরশের উপরে অধিকার সৃষ্টি করতে পারেননি। কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, [الأعراف: ٤٥] ﴿خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ "আল্লাহ্ যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন।” [সূরা আল-আ'রাফ: ৫৪] এখানে (ثُمَّ) বা 'তারপর' শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা ধারাবাহিকতা বুঝায়। তখন এটা বুঝা আবশ্যক হয়ে পড়ে যে, আসমান ও যমীন সৃষ্টি পূর্ণ করার আগে 'আরশ আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও ছিল।
২- আরবী ভাষায় সাধারণ নিয়ম হচ্ছে ‘ইস্তাওলা’ বা অধিকার করা তখনই বলা হয়, যখন কেউ দ্বন্দ্বের পরে কোনো কিছুর কর্তৃত্ব লাভ করে। আর আল্লাহর বিপরীতে কেউ কোনোদিন দ্বন্দ্ব করতে আসেনি।
৩- ‘ইস্তাওয়া’ এর অর্থ ‘ইস্তাওলা’ করলে অপর আরেকটি বাতিল মেনে নেয়া আবশ্যক হয়ে পড়ে, সেটা হচ্ছে, এভাবে বলা শুদ্ধ হওয়া যে, আল্লাহ যমীন, গাছ, পাহাড়-পর্বত ইত্যাদির উপর ‘ইস্তেওয়া’ করেছেন। কারণ, এগুলোও তাঁরই অধিকারে। আর এগুলো অনেকগুলো বাতিলকে মেনে নিতে বাধ্য করে, আর যা বাতিল মেনে নেয়া আবশ্যক করে তা প্রমাণ করে যে, সে জিনিসও বাতিল যা এ বাতিলকে মেনে নেয়ার দিকে নিয়ে যায়। আর আরবী কবিতা দিয়ে প্রদত্ত তাদের দলীলের খণ্ডনে আমরা বলবো:
১- তোমরা এ কবিতাটির সনদ প্রদান করো, এর বর্ণনাকারীরা কতটুকু নির্ভরযোগ্য তাও দেখাও, তারা কখনও তা প্রমাণ করার কোনো পথ খুঁজে পাবে না।
২- এ কবিতার কবি কে? এটা কি সম্ভব নয় যে, এটি তখন বলা হয়েছিল যখন আরবদের ভাষায় বিকৃতি প্রবেশ করেছে? কারণ, আরবী ভাষার মৌলিকত্বে পরিবর্তন সাধিত হওয়ার পরে আসা কোনো কথা দিয়ে প্রমাণ দিলে তো তা প্রমাণ বলে বিবেচিত হবে না। কেননা যখন যুদ্ধে বিজয় লাভ করে তখন মুসলিম বিশ্বের সীমানা বর্ধিত হতে থাকে আর অনারবগণ আরবগণের সাথে মেলামেশা বেড়ে যায় তখন আর আরবদের ভাষার বিশুদ্ধতা অবশিষ্ট থাকেনি। তাই সম্ভাবনা প্রচুর যে, এ কবিতা তখন বলা হয়েছিল যখন ভাষা পরিবর্তন সাধিত হয়ে গিয়েছিল।
৩- ‘ইস্তাওয়া বিশরুন আলাল ইরাক’ এখানে যদি কবিতাটি শুদ্ধ ধরেও নেয়া হয়, তখন বুঝতে হবে যে, বাক্যের সাথে লাগানো বিশেষ কারণ ‘ইস্তাওয়া’ শব্দটিকে ‘ইস্তাওলা’ বা দখল করার অর্থে নেয়া বৈধ করে, কেননা এটা বলা সম্ভব নয় যে বিশর ইরাকের উপরে উঠে সেখানে অবস্থান নিয়েছে যেভাবে কেউ খাট বা বাহনের পিঠে উঠে অবস্থান নিয়ে থাকে। সুতরাং বাধ্য হয়েই যেহেতু ‘ইস্তাওয়া’ অর্থ উপরে উঠা করা যাচ্ছে না সেহেতু ‘ইস্তাওলা’ বা দখল করার অর্থ গ্রহণ করা ছাড়া অন্য কোনো পথ ছিল না। (কিন্তু কুরআনের আয়াতে বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে সে রকম কোনো ‘কারীনাহ’ বা বাক্য সংশ্লিষ্ট বিশেষ কারণ যার ফলে আল্লাহ তা‘আলাকে ‘আরশ দখলকারী অর্থ করা হবে।) বস্তুত এ উত্তর হচ্ছে কবিতাটি বিশুদ্ধ ধরে নেয়ার পর, যদিও তা বিশুদ্ধ নয় এটিই আমাদের মত। তারপরও যদি দাবি করা হয় যে, তা বিশুদ্ধ তাহলে আমরা বলবো, এ কবিতাটিতেও ‘ইস্তেওয়া’ শব্দের অর্থ ‘উপরে উঠা’ করা সম্ভব; কারণ উপরে উঠা দুই প্রকার:
১- ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য উপরে থাকা, যেমন আমরা খাটের উপরে উঠি।
২- মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে উপরে থাকা, যেমন কোনো কিছুর ওপর প্রভাব বিস্তার করে দখল করে ফেলা বা জয়লাভ করা। সে হিসেবে ‘ইস্তাওয়া বিশরুন আলাল ইরাকি’ অর্থ হবে বিশর ইরাকের ওপর ক্ষমতার ও অধীন করার মাধ্যমে উপরে উঠেছে। (তাহলে তো আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, এখানেও উপরে উঠা অর্থ করা সম্ভব। আর এটা তখনই হয়েছে যখন প্রথম অর্থটি নেয়া সম্ভব না হবে। আল্লাহ তা‘আলার ব্যাপারে এ বিষয়টি মোটেই প্রযোজ্য হবে না। কারণ যারা "আল্লাহ কর্তৃক তাঁর ‘আরশের উপরে উঠা” অর্থ করে তারা প্রথম অর্থটি অসম্ভব মনে করে না।)
আর তাদের পরবর্তী সন্দেহ হচ্ছে 'ইস্তেওয়া' এর অর্থ 'উপরে উঠা' বললে আল্লাহকে দেহ বলা আবশ্যক হয়ে যায়। তার উত্তর হচ্ছে,
- আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত যা যা আবশ্যক করে তা অবশ্যই সত্য, তার আবশ্যকতা আমরা মেনে নেয়া জরুরী মনে করি। তবে সত্যি সত্যিই তা আল্লাহ ও রাসূলের কথা দ্বারা আবশ্যক হওয়া লাগবে। তাই যদি কোথাও এটা সাব্যস্ত হয়ে যায় যে, এটা প্রকৃতপক্ষেই আবশ্যক হয়ে পড়েছে তাহলে সেটা বলাতে আমরা কোনো দোষ দেখি না।
- তারপর আমরা বলবো, তোমরা নিষিদ্ধ দেহ সাব্যস্ত করা বলতে কী উদ্দেশ্য নিয়ে থাক?
যদি এর দ্বারা তোমরা উদ্দেশ্য এটা নিয়ে থাক যে, আল্লাহর এমন কোনো সত্তা সাব্যস্ত হবে না যার জন্য তাঁর উপযোগী আবশ্যক গুণাবলি সাব্যস্ত করা লাগবে, তাহলে তোমাদের কথা বাতিল। কারণ আল্লাহর এমন এক প্রকৃত সত্তা রয়েছে যা বহু গুণে গুণান্বিত। তাঁর রয়েছে চেহারা, হাত, চোখ, পা। এগুলো সাব্যস্ত করা সত্য ও সঠিক। তার জন্য যদি তোমাদের নিকট বিভিন্ন জিনিসের বাধ্য-বাধকতা এসেও যায় তাতে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। সেসব সাব্যস্ত করতে গেলে তোমাদের দৃষ্টিতে সমস্যা হিসেবে তোমরা যা ইচ্ছা তা বলতে পার, আমরা সেটাকে কোনো সমস্যা মনে করি না।
আর যদি 'নিষিদ্ধ দেহ' যা তোমরা আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করাকে অস্বীকার করে থাক, তা দ্বারা উদ্দেশ্য নিয়ে থাক এমন কোনো দেহ যা হাঁড়, গোশত, রক্ত ইত্যাদি জিনিস দিয়ে গঠিত, তাহলে তা অবশ্যই আল্লাহর জন্য হওয়া অসম্ভব। আর এটি 'আল্লাহর 'আরশের উপর উঠা' গুণ সাব্যস্ত করা দ্বারা আবশ্যকও হয় না।
আর তাদের পরবর্তী সন্দেহ হচ্ছে, 'ইস্তেওয়া' অর্থ 'উপরে উঠা' সাব্যস্ত করলে আল্লাহ তা'আলাকে সীমাবদ্ধ করা হয়ে যায়, তার বিস্তারিত উত্তর হচ্ছে,
- তোমরা সীমা বলতে কী বুঝাচ্ছ?
যদি সীমাবদ্ধ বলতে এটা বুঝাতে চাও যে, সৃষ্টি থেকে আলাদা, যেমন পৃথিবীতে এটা যায়েদের যমীন, ওটা 'উমারের যমীন, একের যমীন থেকে অন্যের যমীন আলাদা করা, যদি সীমা বলে আল্লাহ তা'আলাকে 'আরশের উপর থাকার কারণে এমন 'আলাদা সত্তা' বুঝাতে চাও তবে অবশ্যই জেনে রাখ, এ আলাদা করার সীমা নির্ধারণ অবশ্যই সত্য। এতে কোনো ত্রুটি নেই।
আর যদি সীমা দ্বারা উদ্দেশ্য হয়, 'আরশ আল্লাহ তা'আলাকে পরিবেষ্টন করে আছে, তাহলে এটা বাতিল। 'আরশের উপর উঠা' বলা দ্বারা এটা আবশ্যক করে না। কারণ, আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপর উঠেছেন, যদিও আল্লাহ তা'আলা 'আরশ ও 'আরশ ব্যতীত অন্য সবকিছুর চেয়ে অনেক বড়। 'আরশের উপর উঠা, 'আরশের উপর থাকা এ কথার দ্বারা 'আরশ আল্লাহকে ঘিরে আছে এমনটি বুঝা আবশ্যক নয়। বরং 'আরশ কোনোভাবেই আল্লাহ তা'আলাকে পরিবেষ্টন করতে পারে না; কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা সবকিছুর চেয়ে বড় এবং কিছুর চেয়ে মহৎ। সকল যমীন কিয়ামতের দিন তাঁর হাতের মুষ্ঠির ভেতরে, সকল আসমান তাঁর ডান হাতে ভাঁজ করা অবস্থায় রয়েছে।
আর তাদের কথা, “আল্লাহ 'আরশের উপর আছেন" বললে আল্লাহকে 'আরশের প্রতি মুখাপেক্ষী সাব্যস্ত করা হয়, এর উত্তরে আমরা বলবো,
কখনো নয়, এটা বাধ্য করে না। কারণ আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর থাকার অর্থ হচ্ছে, 'আরশের ঊর্ধ্বে, এ এক বিশেষ উপরে থাকা। এর অর্থ কখনো এটা নয় যে, 'আরশ তাঁকে বহন করে, কখনো নয়। 'আরশ তাঁকে বহন করে না, আসমান তাঁকে বহন করে না, তোমরা যে জিনিসটির বাধ্যবাধকতার দাবি করছ সেটা নিষিদ্ধ; কারণ এর মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি ত্রুটিযুক্ত গুণের সম্পর্ক করা হচ্ছে। আল্লাহর জন্য 'আরশের উপর উঠা' যা ইস্তেওয়া শব্দের প্রকৃত অর্থ তা সাব্যস্ত করলে কখনো এমন ত্রুটিপূর্ণ কিছু সাব্যস্ত করা আবশ্যক করে না। কারণ, আমরা কখনো বলি না, 'আল্লাহ 'আরশের উপর উঠেছেন' এর অর্থ 'আরশ তাঁকে বহন করে; বরং 'আরশ স্বয়ং বহনকৃত বস্তু; তাকে বহন করা হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন, "আর আপনার রবের 'আরশ সেদিন তাদের উপরে বহন করবে আটজন" [সূরা আল-হাক্কাহ, আয়াত: ১৭], ফিরিশতাগণ এখনও 'আরশ বহন করে চলছে, কিন্তু তারা মহান আল্লাহকে বহন করছে না। কারণ, আল্লাহ তা'আলা এর মুখাপেক্ষী নন। সুতরাং এভাবেই যাবতীয় নেগেটিভ বা না সূচক যুক্তি বাতিল হয়ে গেল।
মোটকথা, যারা বলে, 'আল্লাহ 'আরশের উপর উঠেছেন' বলা যাবে না, সংক্ষিপ্তভাবে আমরা তাদের কথার উত্তর কয়েকভাবে দিতে পারি:
এক- তাদের এ কথা কুরআন ও হাদীসের প্রকাশ্য বক্তব্য বিরোধী।
দুই- তাদের এ কথা সাহাবায়ে কেরাম ও সকল সালাফে সালেহীনের ইজমা' বিরোধী।
তিন- আরবী ভাষায় 'ইস্তাওয়া' এর অর্থ 'ইস্তাওলা' (অধিকার করা) আসেনি। যে কবিতা দিয়ে 'ইস্তাওলা' সাব্যস্ত করার জন্য তারা প্রমাণ পেশ করেছে তা দিয়ে দলীল গ্রহণ সম্পন্ন করা যায় না।
চার- 'ইস্তাওয়া' দ্বারা 'ইস্তাওলা' (অধিকার করা) সাব্যস্ত করলে বেশ কিছু বাতিল জিনিস মেনে নেয়ার বাধ্যবাধকতা এসে যায়,
১- 'আরশ আসমান ও যমীন সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অন্য কারও মালিকানায় থাকা আবশ্যক করে।
২- 'ইস্তাওলা' বাক্যটি সাধারণভাবে এই অর্থ প্রকাশ করে যে, সেখানে আল্লাহ ও অন্য কারও সাথে জয়-পরাজয়ের ব্যাপারে জড়িত, তারপর আল্লাহ 'আরশ অধিকার করলেন এবং বিপক্ষের উপর জয়লাভ করলেন। [নাউযুবিল্লাহ]
৩- যদি ইস্তেওয়া অর্থ তোমাদের ধারণা অনুযায়ী 'অধিকার করা' বলা হয়, তবে এটা বলাও জায়েয হবে যে, আল্লাহ যমীনের উপর ইস্তাওলা করেছেন, অনুরূপ গাছের উপর, পাহাড়ের উপর, মানুষের উপর, উটের উপরও ইস্তাওলা করেছেন। কারণ, এগুলোও তো আল্লাহ তা'আলার অধিকারে। কারণ, কোথাও যদি আল্লাহ তা'আলার জন্য 'অধিকার করা' বলা জায়েয হয় তাহলে অন্য জায়গাতেও সেটি বলা জায়েয মেনে নিতে হবে। সে হিসেবে 'ইস্তাওয়া' এমন সকল কিছুর উপরই ব্যবহার করা যাবে যেখানে 'ইস্তাওলা' ব্যবহার করা যায়, কারণ তোমাদের নিকট তো দু'টো সমার্থবোধক।
এসব উত্তর প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, 'ইস্তেওয়া' এর ব্যাখ্যা 'ইস্তাওলা' দ্বারা করা সম্পূর্ণরূপে বাতিল।” (৭৯৮)