📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 আল্লামা মিয়া নযীর হুসাইন দেহলাওয়ী (১৩২০ হিজরী)

📄 আল্লামা মিয়া নযীর হুসাইন দেহলাওয়ী (১৩২০ হিজরী)


আল্লামা মিয়া নাযীর হুসাইন দেহলাওয়ী রাহিমাহুল্লাহ এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাকে পরিচয় করিয়ে দিতে হয় না। তাকে বলা হয় শাইখুল কুল ফিল কুল। কুরআন, হাদীস ও ফিকহ শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তির পাশাপাশি তিনি সকল মা'কুলাত বিষয়ে অনন্য জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলাওয়ীর (মেয়ের ঘরের) নাতি আল্লামা শাহ মুহাম্মাদ ইসহাক্ক ছিলেন মিয়া নাযীর হুসাইন এর প্রিয় উস্তাদ। তাঁরই জায়গায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। আর ছাত্রদের মধ্যে আরব ও আজমের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ববর্গ রয়েছেন, যেমন, শাইখ আব্দুল্লাহ গাযনাওয়ী, মুহাম্মাদ গাযনাওয়ী, আব্দুল জাব্বার গাযনাওয়ী, মুহাম্মাদ বশীর সাহসাওয়ানী, আব্দুল্লাহ গাযীপুরী, শামসুল হক্ক আযীমাবাদী, আব্দুর রহমান মুবারকপুরী, সানাউল্লাহ অমৃতসরী। আরবদের মাঝে, ইসহাক্ক ইবন আব্দুর রহমান আলুশ শাইখ, সা'দ ইবন হামাদ ইবন আতীক, আলী ইবন নাসের আবু ওয়াদী, আবু বকর খুওকীর, আব্দুল্লাহ ইদ্রীস আস-সামূমুসী আল-মাগরেবী প্রমুখ। এ মহান ব্যক্তিত্বের আল্লাহর 'আরশের উপর উঠা সংক্রান্ত আকীদা বর্ণনা করব। তিনি বলেন,
سوال: کیا فرماتی ہیں علمائی دین اس مسئلہ میں کہ ایک عالم کہتا ہے کہ جو شخص خداوند کریم کو بلا کیف عرش بر سمجھے یا جانے کافر ہے، بس اس عالم کا یہ قول غلط ہے یا صحیح؟ بینوا توجروا
الجواب: جو عالم یہ کہتا ہے وہ عالم نہیں ہے، بلکہ وہ جاہل ہے، اور اس کا یہ قول سراسر غلط و باطل ہے، کیونکہ قرآن مجید کی ایک نہیں، بلکہ بہت سے آیتوں سے اللہ تعالی کی عرش پر مستوی ہونا ثابت ہے، اور اسی طرح بہت سے احادیث سے بہی یہ بات ثابت ہے، مگر اللہ تعالی کی عرش پر مستوی ہونے کی کیفیت مجہول و نا معلوم ہے، تمام صحابہ اور تابعین و تبع تابعین اور ائمه مجتہدین رضوان اللہ علیہم اجمعین کا یہی قول واعتقاد تھا کہ اللہ تعالی عرش پر مستوی ہے، اور استواء علی العرش کی کیفیت
مجہول ونا معلوم ہے، اللہ تعالی کی عرش پر بلا کیف ہونے کی ثبوت میں آیات قرآنیہ اور احادیث نبویہ اور اقوال ائمہ دین کو بسط و تفصیل کی ساتھ دیکھنا ہو تو کتاب العلو للحافظ الذہبی کو مطالعہ کرنا چاہئے۔...
"প্রশ্ন: উলামায়ে দীন এ মাসআলার ব্যাপারে কী বলেন, এক আলেম বলেন, যে কেউ আল্লাহ তা'আলাকে আরশের উপর কোনো ধরন নির্ধারণ ব্যতীতই 'আরশের উপর বলবে বা জানবে সে কাফের হয়ে যাবে? এ আলেমের এ কথাটি ভুল নাকি শুদ্ধ? বিষয়টি বর্ণনা করুন এবং সাওয়াবের অধিকারী হউন।
উত্তর:
যে আলেম এমন কথা বলবে তিনি আলেমই নন, বরং তিনি জাহেল। আর এ কথা সম্পূর্ণ ভুল ও বাতিল; কেননা কুরআনে কারীমে এক নয় বরং বহু আয়াতে আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠা সাব্যস্ত হয়েছে। অনুরূপভাবে বহু হাদীসে এ কথা সাব্যস্ত হয়েছে। তবে এটা বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠার ধরন অজানা ও অজ্ঞাত। সকল সাহাবী, তাবে'য়ী, তাবে' তাবে'য়ীন, মুজতাহিদ ইমামগণ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুম সবারই এ আকীদাহ ও বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপর উঠেছেন, আর আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠার ধরন অজানা ও অজ্ঞাত। আল্লাহ তা'আলা কোনো ধরন নির্ধারণ ব্যতীত আরশের উপর হওয়া সাব্যস্ত করার ব্যাপারে কুরআনের আয়াত, রাসূলের হাদীস, দীনের ইমামগণের বক্তব্য বিস্তারিত ও বিশদ আকারে দেখতে হলে ইমাম যাহাবীর আল-উলু কিতাবটি অধ্যয়ন করা যেতে পারে।....."
তারপর তিনি কুরআন থেকে আল্লাহ তা'আলার আরশের উপরে উঠার দলীলসমূহ তুলে ধরেন। প্রথমেই সূরা আল-আ'রাফ, সূরা রা'দ, সূরা ত্বাহা থেকে তিনটি আয়াত নিয়ে আসেন। তারপর দুটি হাদীস নিয়ে আসেন; যাতে 'আরশের উপর তাঁর কাছে রাখা কিতাব, তারপর হাশরের মাঠে আল্লাহ তা'আলা মহান আল্লাহর অবস্থানে নিচে যাবেন, যখন তিনি 'আরশের উপর থাকবেন সংক্রান্ত হাদীস উদ্ধৃত করেন। তারপর চার ইমামের বক্তব্য তুলে ধরেন।

টিকাঃ
৭৫৩. ফাতাওয়া নাযীরীয়াহ, প্রথম খণ্ড, কিতাবুল ঈমান ওয়াল আকায়িদ, পৃ. ৫৭।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 আব্দুল জাব্বার আল-গাযানাওয়ী (১৩৩২ হিজরী)

📄 আব্দুল জাব্বার আল-গাযানাওয়ী (১৩৩২ হিজরী)


শাইখ আব্দুল জাব্বার ইবন আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ আ'যম আল-গাযনাওয়ী, তারপর অমৃতসরী, যার মর্যাদা ও সম্মানের ব্যাপারে আলেমগণ একমত পোষণ করেছেন। হিজরী ১২৬৮ সালে তাঁর জন্ম। পিতার কাছে প্রাথমিক পড়া শেষ করেন। তারপর আপন দু' ভাই মুহাম্মাদ ও আহমাদের কাছে আরবী পড়া সম্পন্ন করেন। তারপর দিল্লীতে প্রবেশ করে মিয়া নাযীর হুসাইন দেহলাওয়ী, যাকে শাইখুল কুল ফিল কুল, সকল বিষয়ে সকলের উস্তাদ বলা হয়, তাঁর দারসে মুলাযামাত করেন। বিশ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ইলমী জগতের সেরা ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তারপর অমৃতসরে বসবাস করতে থাকেন। সেখানেই দাওয়াত ও ইবাদতে বাকী সময় অতিবাহিত করেন। কোনো সুনির্দিষ্ট মাযহাবের অনুসরণ করতেন না। তাঁর ইজতিহাদের যোগ্যতা ছিল। ইমামদের সম্পর্কে ভালো কথা বলতেন। আকীদাহ'র ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ ধারার প্রবর্তকদের অন্যতম ছিলেন।
শাইখ সানাউল্লাহ অমৃতসরী রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপরে উঠার বিষয়ে ভুল করলে সেটার রদ করে শাইখ আব্দুল হক্ক গাযনাওয়ী যে গ্রন্থ লেখেন তিনি সেটার অনুমোদনকারী ৮০জন আলেমের অন্যতম ছিলেন। পরবর্তীতে সৌদি আরবের বাদশাহ আব্দুল আযীয তাদের মধ্যে মধ্যস্থতা করে দেন। শাইখ সানাউল্লাহ অমৃতসরী তার ভুল থেকে ফিরে আসার ঘোষণা প্রদান করেন।
এভাবেই শাইখ আব্দুল জাব্বার গাযানাওয়ী রাহিমাহুল্লাহ আকীদার মিশনকে চাঙ্গা করেন। তিনি আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা 'আরশের উপরে বিশ্বাস করতেন এবং এর ওপর গ্রন্থ রচনা করেছেন। যার নাম হচ্ছে, 'সাবীলুন নাজাত ফী মুবায়ানাতির রাব্বি আনিল মাখলুকাত'। এর মাধ্যমে ভারতবর্ষের মানুষের মাঝে আল্লাহর ব্যাপারে যেসব বিভ্রান্তি ছিল তা অপনোদন করে সঠিক আকীদাহ'র প্রচার প্রসার করেন। এখানে আল্লাহ তা'আলাকে 'আরশের উপরে থাকা সংক্রান্ত তার কিছু বক্তব্য তুলে ধরছি:
আকীদাহ বিষয়ক গ্রন্থ
অধ্যায়: আল্লাহ কর্তৃক তাঁর 'আরশের উপর উঠা এবং সৃষ্টিকুল থেকে পৃথক হওয়ার ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আহ এর আকীদাহ।
আল্লাহর নামে শুরু করছি, যিনি রহমান ও রহীম, হামদজাতীয় সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সর্বোচ্চ সত্তা, সর্বোপরে অবস্থানকারী, সালাত ও সালাম তাঁর সে সব বান্দাদের জন্য যাদের তিনি পছন্দ করেছেন, তারপর:
আমি আমাদের সমসাময়িক কারও কারও কিছু ছোট ছোট প্রবন্ধ দেখেছি, যাতে তিনি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের আকীদাহ-বিশ্বাস, 'আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টি থেকে পৃথক, তাঁর আরশের উপরে সত্তাগতভাবেই আছে, আর সবজায়গা তাঁর জ্ঞানের মাধ্যমে পরিবেষ্টন করে আছেন' এ নীতির বিরোধিতা করতে দেখেছি। তাকে দেখেছি এটা বলতে যে, তিনি সত্তাগতভাবে আমাদের সাথে এ যমীনেই রয়েছেন, যেমনটি তিনি আরশের উপর রয়েছেন। নিঃসন্দেহে তার এ কথাটি বানোয়াট, বিদ'আতী কথা, যা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের আকীদাহ-বিশ্বাস বিরোধী।
বস্তুত দু'টি কারণে তারা সহীহ আকীদা বিরোধী এসব কথা বলেছে, এক. সালাফে সালেহীনের অনুসরণ করতে ঘৃণা করা, দুই. তাদের নিজেদের মতকে অতিরিক্ত পছন্দ করার প্রবণতা। মূলত এ দু'টি জিনিস মারাত্মক ধ্বংসাত্মক রোগ। যারাই এ দু'টি রোগে আক্রান্ত হয়েছে তাদের বেশিরভাগই ধ্বংস হয়েছে।
আর তাদের ভুলের সুত্রপাত মূলত কয়েকটি জিনিস থেকে: ১- মহান আল্লাহর বাণী "তিনি তোমাদের সাথে রয়েছেন যেখানেই তোমরা থাক না কেন" সেখানে ( معه ) 'সাথে থাকা' এর অর্থকে মুতাশাবিহ বা কঠিন অস্পষ্টতা মনে করা। ২- অনুরূপ আল্লাহর বাণী "আর আমরা তোমাদের বেশি নিকটে রয়েছি তোমাদের গ্রীবার ধমনি থেকেও” এ আয়াতের ( قرب ) 'নিকটে থাকা' এর অর্থকে মুতাশাবিহ মনে করা। ৩- তদ্রূপ আল্লাহর বাণী, "অতঃপর তোমরা যেদিকেই তোমাদের চেহারা ফিরাও না কেন সে দিক তো তাঁরই দিক" এ আয়াতের ( وجه ) 'ওয়াজহ' বা চেহারা বা দিক এ শব্দটি মুতাশাবিহ মনে করা।
বস্তুত উপরের আয়াতে যেগুলোকে মুতাশাবিহাতের অন্তর্ভুক্ত বলা হচ্ছে তা মুতাশাবিহাতের অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে কোনো কোনো আলেম থেকে এগুলোকে মুতাশাবিহাতের অন্তর্ভুক্ত বলে মত প্রদান করা হলেও যারা সেটা তাদের থেকে বর্ণনা করেছে তারা সেসব আলেমের কথার উদ্দেশ্য, তাদের বক্তব্যের মূল কথা বুঝতে অসমর্থ হয়েছেন বা বেখবর থেকেছেন। কারণ যারা এসব শব্দ ও অর্থকে মুতাশাবিহাতের অন্তর্ভুক্ত বলেছেন তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, এগুলো এমন সাদৃশ্যপূর্ণ যে, তাতে কয়েকটি অর্থ করার সুযোগ রয়েছে, তাদের উদ্দেশ্য এটা নয় যে
এগুলো এমন মুতাশাবিহ বা অস্পষ্ট অর্থ বিশিষ্ট যার অর্থ বা ব্যাখ্যা করা যায় না। তারা যেখানে 'সম্ভাবনাময় অর্থ করার সুযোগ রয়েছে' সেটাকেই মুতাশাবিহ বা অস্পষ্টতার একটি প্রকার ধরে নিয়েছে। যেমনটি ত্বীবী, কাসত্বাল্লানী, বাগাওয়ীসহ অনেকেই স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন। মূলত এ প্রকার মুতাশাবিহ এর বিধান হচ্ছে, সেগুলোকে মুহকাম আয়াত, যার কেবল একটি অর্থই হয় এমন ভাষ্যসমূহের দিকে নিয়ে গিয়ে তার অর্থ নির্ধারণ করা। সে হিসেবেই তারা এসব আয়াতে আগত 'সাথে থাকা', 'নিকটে থাকা', 'চেহারা' বা দিককে মুতাশাবিহ আয়াত এর অন্তর্ভুক্ত করেছে। তারপর তারা 'সাথে থাকা'কে জ্ঞান, 'নিকটে থাকা'কে ফিরিশতাদের নিকটে থাকা অথবা জ্ঞানে নিকটে থাকা, আর ওয়াজহ বলে দিক বা সন্তুষ্টি বলে ব্যাখ্যা করেছেন।
আর যে জিনিস এ বিষয়টিকে স্পষ্ট করে দিবে তা হচ্ছে,
(৩) 'সাথে থাকা' এ শব্দটি দ্বারা দু'টি সত্তা নিকটবর্তী থাকা বুঝায় আবার অন্য অর্থও বুঝায়। যেমন, আল্লাহর বাণী, "আর যখন তারা তাদের শয়তানদের সাথে একান্ত হয়, তখন তারা বলে, নিশ্চয় আমরা তোমাদের সাথেই রয়েছি"। (এখানে সর্বসম্মত মত হচ্ছে যে এটা দু'টি সত্তার এক সাথে লেগে থাকা নয়, বরং) উদ্দেশ্য হচ্ছে, ধর্ম ও আকীদায় আমরা একসাথে আছি। অনুরূপ আল্লাহর বাণী, "নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন”। উদ্দেশ্য হচ্ছে, সাহায্য ও সহযোগিতায়। তদ্রূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাণী, "(তাবুকের যুদ্ধের জন্য বের হওয়ার পর) মদীনায় কিছু লোক রয়ে গেছে, তোমরা যে পথই অতিক্রম কর, যে উপত্যকাই পাড়ি দাও না কেন, তারা তোমাদের সাথে রয়েছেন"। অর্থাৎ কল্যাণকামিতায়, নিয়তে, দো'আয়। অনুরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী, "কুরআনে পারদর্শী ব্যক্তি সম্মানিত সৎ দূত 'মালায়িকা ও নবী'দের সাথে” অর্থাৎ মর্যাদা ও সাওয়াবের দিক থেকে। তাছাড়া (مع) 'সাথে থাকা' শব্দটি স্থান, কাল ও পাত্রভেদে আরও বিভিন্ন অর্থ প্রদান করে থাকে।
একইভাবে 'আমরা' সর্বনামটি কখনও কখনও নিজেকে সম্মানিত করার জন্য বহুবচন ব্যবহার করে থাকে। আবার কখনও কখনও তা এমন কেউ ব্যবহার করে থাকেন যিনি অপর কাউকে কোনো দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছেন তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি সে কাজটি করলেও প্রেরণকারী তা নিজের দিকে সম্পৃক্ত করার জন্য বহুবচনের সর্বনাম 'আমরা' ব্যবহার করে থাকেন। যেমন, আল্লাহর বাণী "নিশ্চয় আমরা যিকির (কুরআন ও সুন্নাহ) নাযিল করেছি"। অপর বাণী "নিশ্চয় আমরাই জীবিত করি ও মৃত্যু প্রদান করি"। অপর বাণী "আমরা আপনার কাছে বর্ণনা করব উত্তম কিসসা"। অপর বাণী "আমরা আপনার কাছে তিলাওয়াত করব মূসা ও ফির'আউনের সংবাদ”। অপর বাণী "অতঃপর যখন আমরা তা পাঠ করব তখন আপনি সে পাঠের অনুসরণ করুন"। অপর বাণী "আর আমরা লিখে রাখি যা তারা অগ্রে পেশ করছে এবং তাদের পদচিহ্নগুলোও”। এসব আয়াতে উল্লিখিত অবতরণ করা, জীবিত করা, মৃত্যু দেয়া, ঘটনা বলা, তিলাওয়াত করা, পড়া, লেখা যদিও বাহ্যিকভাবে ফিরিশতাদের কাজ তারপরও সেগুলোকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন; কারণ তিনিই তো সেগুলোর নির্দেশদাতা, হুকুমদাতা।
অনুরূপভাবে, )قرب( 'নিকটে থাকা' এ শব্দটিও বাক্যের আগ-পিছ দৃষ্টি দিয়ে অর্থ নির্ধারণ করতে হবে। যেমন, আল্লাহর বাণী, "আমরা তার গ্রীবার ধমনী থেকেও তার বেশি নিকটে" এখানে যদিও 'আমরা' বলে ফিরিশতাদের বুঝানো হয়েছে, কারণ পরের আয়াত সেটার ব্যাখ্যা
করে দিচ্ছে, যাতে আল্লাহ বলেছেন, "যখন গ্রহণ করে দু'দল ফিরিশতা, ডান দিক ও বাম দিকে বসে, সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তার কাছে সদা উপস্থিত সংরক্ষণকারী রয়েছে”। অনুরূপ আল্লাহর বাণী "আর আমরা তোমাদের চেয়ে তার বেশি নিকটে, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না।” এখানে 'নিকটে' বলে ফিরিশতারা মৃত ব্যক্তির নিকটে থাকা বুঝানো হয়েছে, যা আয়াতের পূর্বাপর থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়। (কারণ আয়াতের মধ্যেই বলা হয়েছে, 'কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না'। যা কেবল ফিরিশতাদের জন্যই প্রয়োগ হতে পারে।) তারপরও আল্লাহ তা'আলা উভয় আয়াতেই নিকটে থাকাকে নিজের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন, কারণ তিনিই তো সেটার নির্দেশদাতা ও হুকুমদাতা। আবার কোনো কোনো আলেম বলেছেন এখানেও আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক জ্ঞানের মাধ্যমে নিকটে থাকা বুঝানো হয়েছে। তবে প্রথম মতটিই বেশি বিশুদ্ধ।
আর যারা আল্লাহকে আহ্বান করে, যারা আল্লাহ তা'আলার যিকির করে, আল্লাহ তাদের নিকটে থাকা, যেমন কুরআন ও হাদীসের বাণীতে এসেছে, আল্লাহর বাণী "আর যখন আমার বান্দারা আমার ব্যাপারে আপনাকে প্রশ্ন করে তখন আপনি বলুন, নিশ্চয় আমি নিকটে, আহ্বানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে"। অনুরূপ আল্লাহর বাণী "সুতরাং তোমরা তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, তারপর তাঁর কাছে তাওবাহ করো, নিশ্চয় আমার রব অতি নিকটে ও অতিশয় দো'আ কবুলকারী”। তদ্রূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে এসেছে, তিনি বলেছেন, "নিশ্চয় যাকে তোমরা ডাকছ, তিনি তোমাদের কারও বাহনের ঘাড়ের চেয়েও নিকটে”, অনুরূপ আরও কিছু আয়াত ও হাদীসে যে নৈকট্যের কথা বলা হয়েছে, সেটা কখনও কখনও বিশেষ সত্তাগত নৈকট্য বুঝানো হতে পারে, যেমন নিকটতম আসমানে নেমে আসা, তিনি যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে নেমে আসেন, যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে নিকটে আসতে পারেন। আমরা এ সবের উপরই ঈমান আনি, আমরা বলি সবই আমাদের রবের পক্ষ থেকে এসেছে।
অনুরূপভাবে )الوجه( 'ওয়াজহ' শব্দেরও বিভিন্ন অর্থ রয়েছে। যেমন, কোনো কিছুর চেহারা বা সম্মুখভাগ, অথবা কোনো কিছু স্বয়ং, অথবা কোনো জাতির নেতা, অথবা দিক; যেমনটি ক্বামূস এবং মুখতারায় এসেছে। এই অর্থে আলেমগণ তাদের তাফসীরে আল্লাহ্ বাণী فثم وجه الله এর অর্থে বলেছেন, 'সে দিক, যার নির্দেশ আল্লাহ্ দিয়েছেন।' ...
আর যেহেতু উপরে বর্ণিত এসব আয়াত বিবিধ অর্থ প্রদান করে, তাই কেউ কেউ এ আয়াতগুলোকে মুতাশাবিহ এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তারপর আহলুস সুন্নাহ সেগুলোকে সে অর্থে গ্রহণ করেছেন যে অর্থ করা হলে তা সেসব ভাষ্যের বিরোধী হয় না, যাতে কেবল একটি অর্থই রয়েছে। যদি এগুলো সেসব মুতাশাবিহ এর অন্তর্ভুক্ত হতো যা ব্যাখ্যা করা যায় না, তাহলে তারা এগুলোর অর্থ করতেন না। আর যেসব ভাষ্য কেবল একটি অর্থই প্রদান করে, তা হচ্ছে, আল্লাহর বাণী, "উত্তম বাক্য তাঁর দিকেই উত্থিত হয়"। "ফিরিশতা ও জিবরীল তাঁর দিকেই উঠে আসেন"। "তিনি আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত যাবতীয় বিষয় পরিচালনা করেন, তারপর সবকিছুই তাঁর সমীপে উত্থিত হবে”। “নিশ্চয় আমি আপনাকে বয়সের পূর্ণতা দিব আর আপনাকে আমার দিকে তুলে আনব”। “বরং আল্লাহ তাঁকে তার দিকে তুলে নিয়েছেন।" "তোমরা কি আসমানের উপরে যিনি আছেন তার ব্যাপারে নিরাপদ হয়ে গেছ যে, তিনি যমীনকে তোমাদের নিয়ে ধ্বসিয়ে দিবেন না?" "অতঃপর যারা আপনার রবের নিকট রয়েছে তারা তাঁর ইবাদাত করার ব্যাপারে কোনো অহংকার করে না।” “তারা তাদের রবকে তাদের উপরে থেকে ভয় করে"। "আর ফির'আউন বলল, হে হামান, আমার জন্য একটি প্রাসাদ বানাও, যাতে করে আমি একটি অবলম্বন পাই,
আসমানে আরোহণের অবলম্বন, যাতে আমি মূসার ইলাহকে দেখতে পাই, আর আমি নিশ্চয় তাকে মিথ্যাবাদী মনে করি"। "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন"। অনুরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী, 'অতঃপর আমি তা নিয়ে মূসা 'আলাইহিস সালামের কাছ পর্যন্ত অবতরণ করলাম, তিনি বললেন, আপনার উম্মতের উপরে আপনার রব কী ফরয করেছেন? আমি বললাম, দিনে ও রাতে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত। তিনি বললেন, আপনি আপনার রবের কাছে যান, আপনার উম্মতের ওপর থেকে হাল্কা করার আহ্বান করুন, তারপর আমি আমার রব এবং মূসার মাঝে বারবার আসা যাওয়া করি, অবশেষে আল্লাহ বললেন, হে মুহাম্মাদ, এগুলো হচ্ছে দিনে রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত।" হাদীসের শেষ পর্যন্ত। অনুরূপ অন্য হাদীস, "নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টিকে অস্তিত্বে আনয়ন করলেন, তখন তাঁর কাছে 'আরশের উপর একটি গ্রন্থে লিখলেন, আমার রহমত আমার ক্রোধের ওপর প্রাধান্য পাবে।" (৭৫৪)
এরপর তিনি আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপরে থাকার ব্যাপারে বহু হাদীস নিয়ে আসেন, সাহাবায়ে কিরামের বাণী নিয়ে আসেন, তাবে'য়ীদের বক্তব্য উপস্থিত করেন, তাবে তাবে'ঈন ও ইমাগণের কথা তুলে ধরেন। যার অধিকাংশই তিনি ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম ও ইমাম যাহাবীর গ্রন্থসমূহ থেকে উদ্ধৃত করেন। (৭৫৫)

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 আল্লামা জামালুদ্দীন আল-কাসেমী (১৩৩২ হিজরী)

📄 আল্লামা জামালুদ্দীন আল-কাসেমী (১৩৩২ হিজরী)


আল্লামা জামালুদ্দীন আল-কাসেমী রাহিমাহুল্লাহ গত শতাব্দীর একজন বিখ্যাত আলেম, যিনি তাঁর তাফসীর গ্রন্থে আল্লাহ তা'আলার 'আরশে উঠার বিষয়ে সালাফে সালেহীনের নীতিকে পছন্দ করেছেন। তিনি বলেন,
"আর আল্লাহর বাণী, 'তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন' জেনে রাখুন, 'ইস্তেওয়া' শব্দটি কয়েকটি অর্থে এসেছে, যাতে তার শব্দমূল জড়িত।... আর তা উপরে বা ঊর্ধ্বে উঠার অর্থে আসে। এ অর্থেই এসেছে, 'অতঃপর যখন আপনি ও আপনার সাথীরা জাহাজের উপর উঠবেন' [সূরা আল-মুমিনূন, আয়াত: ২৮], তন্মধ্যে এ অর্থে আরও ব্যবহৃত হয়েছে উল্লিখিত আয়াতটি।
ইমাম বুখারী তার 'সহীহ' গ্রন্থের শেষে যে অধ্যায় বিন্যাস করেছেন 'আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যা' নামে, তার "আর তাঁর 'আরশ ছিল পানির উপরে" এ পরিচ্ছেদে বলেন, মুজাহিদ বলেছেন, 'ইস্তাওয়া' অর্থ 'আরশের উপর উঠেছেন'। (শেষ)
আর হাফেয যাহাবী এর 'আল-'উলু' কিতাবে এসেছে, ইসহাক ইবন রাহওয়াইহ বলেন, আমি একাধিক তাফসীরকারদেরকে বলতে শুনেছি, "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫] অর্থ, উপরে উঠেছেন। আর ইবন জারীর আত-ত্বাবারী রাহিমাহুল্লাহ রবী ইবন আনাস থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, 'ইস্তাওয়া' এর অর্থ উপরে উঠেছেন। তিনি আরও বলেন, 'ইস্তাওয়া' শব্দটি যত জায়গায় কুরআনে এসেছে সর্বত্রই উপরে উঠা ও ঊর্ধ্বে উঠার অর্থে এসেছে।
আমি বলি, এটিকে বেশি বাড়িয়ে বলার প্রয়োজন নেই। কারণ, ইস্তেওয়া এর অর্থ অজানা নয়, যদিও ধরণ অজানা। "(৭৫৬)
অন্যত্র তিনি বর্ণনা করেন, "আর বাধ্যতামূলক হচ্ছে, 'ইস্তেওয়া' গুণটিকে তার অর্থে বিনা শর্তে ব্যবহার করা, তা'ওয়ীল বা ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করার নীতি অবলম্বন না করা। আর তা হচ্ছে 'আরশের উপর সত্তার উঠা, তবে বসা বা স্পর্শ করে থাকার অর্থে নয়। যেমনটি মুজাসসিমা ও কাররামিয়্যাহ সম্প্রদায় বলে থাকে। অনুরূপ তা উচ্চ মর্যাদা ও উন্নত অর্থেও নয়, যেমনটি আশ'আরী মতবাদের লোকেরা বলে থাকে, অধিকার করা কিংবা জয়লাভ করার অর্থেও নয় যেমনটি মু'তাযিলা সম্প্রদায়ের লোকেরা বলেছে। কারণ শরী'আত এসব অর্থে আসেনি। আর না তা এসেছে কোনো সাহাবী, কোনো তাবে'য়ী থেকে, সালাফে সালেহীন থেকে, মুহাদ্দিসগণ থেকে। বরং তাদের কাছ থেকে কেবল স্বাভাবিক নিঃশর্ত অর্থেই তা বর্ণিত হয়েছে।” (৭৫৭)
অন্যত্র তিনি বলেন, "এখানে আমরা এ স্থানে ব্যাপক বিস্তারিত আলোচনা এ জন্য করলাম, কারণ এটি আমাদের দীনী আকীদাহ'র মূলনীতির অন্তর্ভুক্ত, তাওহীদের গুরুত্বপূর্ণ মাসআলার বিষয়। এতে মতযুদ্ধ ও প্রবৃত্তির দ্বন্ধ ব্যাপক আকারে বিস্তার লাভ করেছে। তা'ওয়ীল তথা অপব্যাখ্যা কিংবা দূরবর্তী ভিন্ন অর্থে পরিচালনাকারী কালামশাস্ত্রবিদরা এমন কিছু আনতে পারেনি যা সূতীক্ষ্ম বুদ্ধিমানদের অন্তরে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়। বরং তারা এমন সব বাহানার আশ্রয় নিয়েছে যা আল্লাহর দেয়া ফিত্বরাত বা সুস্থ স্বাভাবিক প্রকৃতি মানতে কঠিনভাবে অস্বীকার করে। ফলে সত্যনিষ্ঠ সুন্নাতের সাহায্যকারী অন্তরসমূহ কেবল তাদের সঠিক অবস্থানে অবশিষ্ট থাকলো, যারা সালাফে সালেহীনের মাযহাবের দিকে সর্বদা নিজেদেরকে নিবিষ্ট রাখে। কারণ, ইমামগণ তাদেরই সাথে, আর তাদের আকীদাহ-বিশ্বাস তা-ই, যা আমরা বর্ণনা করলাম। সুতরাং সন্দেহকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। আর সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সকল সৃষ্টিকুলের রব।” (৭৫৮)

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 শাইখ মুহাম্মাদ আশোয়ায়া শাহ আল-কানকীরী (১৩৩৬ হিজরী)

📄 শাইখ মুহাম্মাদ আশোয়ায়া শাহ আল-কানকীরী (১৩৩৬ হিজরী)


ভারতবর্ষের গর্ব ইমাম শাইখ মুহাম্মাদ আনোয়ার শাহ কাশমীরী রাহিমাহুল্লাহ হচ্ছেন এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি হক্ক বুঝতে পারলে তা বলতে দ্বিধা করতেন না। তিনি সাধারণ নিয়মেই মাতুরিদী আকীদাহ'র কথাই বলতেন এবং মাতুরিদী আলেমগণের অন্তর্ভুক্ত হিসেবেই গণ্য। কিন্তু বেশ কিছু মাসআলা তাঁর জীবনে রয়েছে, যাতে তিনি সালাফদের মানহাজের সত্যতা স্বীকার করেছেন। তন্মধ্যে সিফাতের ক্ষেত্রে তিনি সালাফদের মানহাজ কী ছিল তা সঠিকভাবে চিত্রায়িত করে তুলে ধরেছেন। (৭৫৯) এ ব্যাপারে তিনি ইনসাফপূর্ণ সঠিক আকীদাহ-বিশ্বাস পোষণ করতেন। সালাফদের মত হিসেবে যারা 'অর্থ না করা' (তাফউইদ্ব)-কে দাবি করে, তার বক্তব্যের মাধ্যমে তাদের সে দাবীর অসারতাও ফুটে উঠে। নিম্নে আমরা তার এ স্বীকৃতির বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরার প্রয়াস পাব। তিনি বলেন,
(واعلم) أن المشابهات مثل نزول الله إلى السماء الدنيا، واستواءه على العرش، فرأى السلف فيها الإيمان على ظاهره ما ورد إمهاله على ظاهره بلا تأويل وتكييف، ويفوض أمر الكيفية إلى الله تعالى، وأما ما نسب إلى بعض السلف مثل ابن عباس أنه يعلم معاني المقطعات القرآنية على تقدير صحته بيان محتملات، ويتوهم من جامع الفصولين وهو من معتبراتنا النهي عن الترجمة اللغوية أيضاً للمتشابهات، لكن قريحتي يحكم أن النهي عنه تفسيرها لا ترجمتها تحت الألفاظ من الحقو واليد والوجه وغيرها، وأما مذهب المتكلمين فهو التأويل في المتشابهات موافقاً للشرع، وقال المتكلمون: إن مذهب السلف التفويض وهو أسلم، ومذهبنا أي المتكلمين التأويل بالعقل وفاق الشرع وهو أحكم، ومعناه أن أصل مذهب أهل السنة التفويض، وأما التأويل فعند الضرورة والمقابلة مع الغير من مخالفي أهل
السنة، والمتكلمون إنما احتاجوا إلى التأويلات عند المناظرة مع معاندي الإسلام، فما قال بعض الناس من الألفاظ الركيكة في حقهم فبريؤون عنها.
وأما مذهب المبتدعين في المتشابهات فالتأويلات المخالفة للشريعة الغراء الموافقة لعقولهم القاصرة عياذاً بالله، ومذهب المشبهة أن الله جسم كالأجسام، ومذاهب آخر لا أذكرها.
وأما تفويض السلف فيحتمل المعنيين:
أحدهما: تفويض الأمر إلى الله وعدم الإنكار على من تأول كيف ما تأول بسبب إقرارهم بعدم العلم.
ثانيهما: تفويض التفصيل والتكييف إلى الله تعالى والإنكار على من تأول برأيه وعقله. ومرادهم هو الاحتمال الثاني لا الأول.
وأما المتأولون من أهل الحق فثلاث فرق: تأول أرباب اللغة بالاستعارة أو التشبيه، وتأول الصوفية مثلاً في نزول الله بالتجلي وهو ظهور الشيء في المرتبة الثانية، وتأول المتكلمون بنزول ملائكة الله أو رحمة الله الخاصة.
والمتكلمون طائفتان: الأشعرية هم المنسوبون إلى أبي الحسن الأشعري وتوابعه الشافعية والمالكية والطائفة الثانية الماتريدية: هم المنسوبون إلى أبي منصور الماتريدي وتوابعه الأحناف، وأبو الحسن وأبو منصور معاصران وأبو منصور أصغر سناً، وأما الحنابلة فلا ينتسبون إلى الماتريدي والأشعري.
واعلم أن لفظ الأشاعرة يطلق على جميع من الأشعريين والماتريديين، وأما الأشعرية فقالوا: إن الله تعالى صفات ذاتية أزلية قديمة وهذه سبعة : العلم، والسمع والبصر، والقدرة، والإرادة، والكلام، والحياة، وصفات فعلية وهذه حوادث ومخلوقات له تعالى وليس بقائمة بالباري، وأما الماتريدية فقالوا: إن الصفات الذاتية فسبع وقديمة، وأما الصفات الفعلية فقديمة أيضاً، وهي التي تكون صفات الله تعالى مع أضدادها، ولم أجد هذا التعريف في كتب الكلام، نعم موجود في كتاب الإيمان في الدر المختار، ومثال الصفات الفعلية فمثالها الإماتة والإحياء والغضب والرضا وغيرها
وأدمج الماتريدية جميع الأنواع تحت جنس واحد وسموها بالتكوين والبخاري أيضاً قائل بالتكوين، والتكوين صفة ثامنة الله تعالى وقال الأشاعرة في الصفات القديمة: إن التعلقات حوادث وقال الطحاوي: إن الله خالق قبل أن يخلق، ورازق قبل أن يرزق.
وأقول من جانب الماتريدية: إن شيئاً آخر من ما يتعلق بالباري ويسمى بالفعل، وهذه التسمية مني وهو مثل النزول إلى سماء الدنيا وغيره من الجزئيات التي تكون متعلقة بالباري، ولا يكون له نوع في الباري قديماً، وهذه
الأفعال حوادث ويقول الماتريدية: إنها ليست بقائمة بالباري بل من مخلوقاته، وأما مشرب الحافظ ابن تيمية في الصفات الحوادث أنها قائمة بالباري وحوادث وغير مخلوقة، ويدعى أنه يوافق السلف الصالحين، ويقول: إن الله تعالى يقوم به الحوادث باختياره ولكنه ليس ما لا يخلو من الحوادث بل قد يكون متصفاً بالحوادث وقد لا يكون متصفاً بها، وقال: إن بين الحادث والمخلوق عموماً وخصوصاً فإن الصفات الحادثة وسائر أشياء العالم حوادث، والصفات ليست بمخلوقة بخلاف سائر أشياء العالم الممكنة، وأما الأشاعرة فيقولون بأن الباري عز اسمه ليس بمحل للحوادث وقالوا لا فرق بين الحادث والمخلوق، وأقول: إن اللغة تساعد الحافظ ابن تيمية فإنه إذا كان زيد قائماً يقال: إن القيام متعلق بزيد، وإن زيداً متصف بالقيام، ولا يقال: إنه خالق القيام فكذلك لما كان الله موصوفاً بالنزول فلا بد من قيام النزول، وكون الباري عز برهانه متصفاً بالنزول لا خالقاً، له وبعين ما قال ابن تيمية قال البخاري بأن الله متصف بصفات حادثة، إلا أن الشارحين تأولوا في كلامه ومثله روي عن أبي حنيفة وأبي يوسف ومحمد بن حسن بسند صحيح في كتاب الأسماء والصفات، حيث قالوا: من قال: إن القرآن مخلوق كافر، أي من قال: بأن القرآن ليس صفة الباري وأنه بمعزل وبائن عن ذات الباري، وليسوا بقائلين بأن القرآن قديم أي الكلام اللفظي فالحاصل أنهم قائلون بحدوث الكلام اللفظي لا بخلقه، وصنف ابن تيمية في كون الباري يقوم به الأفعال الاختيارية مجلداً كاملاً، ودل ماروينا على رغم أنف من قال بأن أبا حنيفة جهمي عياذاً بالله، فإن أبا حنيفة قائل بها قال السلف الصالحون، فالحاصل أن نزول الباري إلى سماء الدنيا نزول حقيقة يحمل على ظاهره ويفوض تفصيله وتكييفه إلى الباري عز برهانه، وهو مذهب الأئمة الأربعة والسلف الصالحين كما نقله الحافظ في فتح الباري عنه، وذهب الأشاعرة المتكلمون إلى ما ذهبوا، ثم نقول: إن قول الأشعرية بأن الصفات الفعلية حوادث، لا دليل لهم عليه فإنها ليست بحادثة، وإن قيل: إن للصفات الفعلية التي تحت الأسماء الحسنى للباري تعلقاً بالحوادث فتكون حوادث، قلت: إن المقدرة والإرادة وغيرهما أيضاً تعلقاً بالحوادث ولا تقولون بحدوثها।
"জেনে রাখ, সাদৃশ্যপূর্ণ ভাষ্যসমূহ যেমন, আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক নিকটতম আসমানে নেমে আসা, 'আরশের উপর উঠা, এগুলোর ব্যাপারে-
সালাফে সালেহীনের মত হচ্ছে, এগুলোর প্রকাশ্য অর্থ যার ওপর বুঝায় তার ওপর ঈমান রাখা, এগুলোকে প্রকাশ্যের ওপর ছেড়ে দেয়া, কোনোরূপ তা'ওয়ীল (দূরবর্তী অপ্রাধান্যপ্রাপ্ত অর্থ গ্রহণ) না করা, অনুরূপ কোনোরূপ তাকয়ীফ (ধরন নির্ধারণ) না করা। এগুলোর ধরনের বিষয়টি আল্লাহর দিকে ন্যস্ত করা। আর সালাফে সালেহীনের দিকে যা সম্পৃক্ত করা হয়, যেমন, ইবন 'আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমার দিকে, যে তিনি কুরআনের মুকাত্তা'আত (বিভিন্ন সূরার শুরুতে আসা) শব্দগুলোর অর্থ জানেন, তা যদি তাঁর থেকে বিশুদ্ধ ধরে নেয়া হয় তবে তার অর্থ, তিনি সম্ভাব্য বিভিন্ন অর্থ জানা উদ্দেশ্য নিয়েছেন। জামে'উল ফুসূলাইন, যা আমাদের গ্রহণযোগ্য গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত, তা থেকে ধারণা করা হয় যে, মুতাশাবিহাত বা সাদৃশ্যপূর্ণ ভাষ্যসমূহের শাব্দিক অর্থ করা থেকে নিষেধ করা হবে। কিন্তু আমার স্বাভাবিক
জ্ঞান এ সিদ্ধান্ত দিচ্ছে যে, এগুলোর ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে নিষেধ করা হবে, বিভিন্ন শব্দে অনুবাদ বা অর্থ করতে নয়। যেমন, কোমর, হাত, চেহারা ইত্যাদি।
অন্যদিকে কালামশাস্ত্রবিদদের মত হচ্ছে, মুতাশাবিহাত বা সাদৃশ্যপূর্ণ বিষয়গুলোর শরী'আতের উপযোগী করে তা'ওয়ীল করা। কালামশাস্ত্রবিদরা বলে থাকেন, সালাফদের মাযহাব হচ্ছে তাফওয়ীদ্ব বা ন্যস্ত করা, সেটা নিরাপদ; আর আমাদের (অর্থাৎ কালামশাস্ত্রবিদদের) মত হচ্ছে, মুতাশাবিহাতের ক্ষেত্রে শরী'আত উপযোগী বিবেকের যুক্তি দিয়ে তা'ওয়ীল করা, আর এটি বেশি সুদৃঢ়। তাদের একথার অর্থ হচ্ছে আহলুস সুন্নাতের আসল মত হচ্ছে তাফওয়ীদ্ব করা; তবে তা'ওয়ীল তা শুধু অত্যাবশ্যক সময়ে ও আহলুস সুন্নাত বিরোধী কারও মুকাবিলা করার সময়। কালামশাস্ত্রবিদরা তা'ওয়ীল বা দূরবর্তী অপ্রাধান্য প্রাপ্ত অর্থের দ্বারস্থ হয়েছিল ইসলাম বিরোধীদের সাথে মুনাযারা করার সময়। সুতরাং কিছু মানুষ তাদের ব্যাপারে যেসব অপমানজনক কথা বলে তা থেকে তাদেরকে মুক্ত করা হবে।
আর মুতাশাবিহাতের ক্ষেত্রে বিদ'আতীদের মতবাদ হচ্ছে, সম্মানিত-স্পষ্ট শরী'আহ বিরোধী ব্যাখ্যা করা, যা তাদের অসম্পন্ন বিবেকের যুক্তির অনুযায়ী নির্ধারণ করে থাকে, আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। অনুরূপ সাদৃশ্যবাদীদের মতবাদ, তারা বলে থাকে, আল্লাহ তা'আলা দেহসমূহের মত দেহ। তাছাড়া আরও কিছু বিদ'আতী মাযহাব রয়েছে, যা আমি উল্লেখ করা না।
উক্ত সালাফদের 'তাফওয়ীদ্ব' বা ন্যস্ত করা দুটি অর্থের সম্ভাবনা রাখে। এক. পুরো বিষয়টিই আল্লাহর কাছে ন্যস্ত ও সোোপর্দ করা, আর যারা এগুলোর তা'ওয়ীল করে, যেভাবেই করুক না কেন, সেটাকে রদ না করা, কারণ তারা স্বীকার করে নিচ্ছি যে তারা জানেন না। দুই. বিশ্লেষণ ও ধরন-নির্ধারণকে আল্লাহর দিকে ন্যস্ত ও সোপর্দ করা, আর যারা তাদের মতামত ও বিবেকের যুক্তি দিয়ে সেগুলোর তা'ওয়ীল করে তাদের বিরোধিতা করা। বস্তুত: সালাফদের তাফওয়ীদ্ব বা ন্যস্ত করা বলতে দ্বিতীয় অর্থটি উদ্দেশ্য, প্রথমটি নয়।
আর যারা তা'ওয়ীলকারী হকপন্থী (দাবীদার) তারা তিন দলে বিভক্ত। তন্মধ্যে, যারা ভাষাবিদ তারা এগুলোকে 'ইস্তেআরাহ' বা ইঙ্গিতপূর্ণ কিংবা 'তাশবীহ' বা সাদৃশ্যপূর্ণ বলে তা'ওয়ীল করে। আর যারা সূফী তারা আল্লাহর অবতরণকে 'তাজাল্লী', বা কোনো কিছু তার দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রকাশ পাওয়া, এ অর্থে তা'ওয়ীল করে। আর যারা কালামশাস্ত্রবিদ, তারা আল্লাহ তা'আলার অবতরণকে আল্লাহর 'ফিরিশতাদের অবতরণ', অথবা আল্লাহ তা'আলার 'রহমতের অবতরণ' এ অর্থে তা'ওয়ীল করে।
আর কালামশাস্ত্রবিদরা দু' শ্রেণি। (প্রথমটি) আশ'আরিয়‍্যা সম্প্রদায়, যারা আবুল হাসান আল-আশ'আরীর দিকে নিজেদের সম্পৃক্ত করে, তাদের অনুসারীরা শাফেয়ী ও মালেকী মাযহাবের লোকেরা। দ্বিতীয়টি হলো মাতুরিদিয়‍্যাহ সম্প্রদায়, যারা আবু মানসূর আল-মাতুরিদীর দিকে সম্পৃক্ত; তাদের অনুসারীরা হচ্ছে হানাফীগণ। আবুল হাসান ও আবু মানসূর দু'জনই সমসাময়িক। তবে আবু মানসূর বয়সে নবীন। তবে হাম্বলী মাযহাবের লোকেরা তারা মাতুরিদী কিংবা আশ'আরী কারো দিকেই নিজেদেরক সম্পৃক্ত করে না।
আরও জেনে রাখ যে, আশা'য়েরা শব্দটি বললে সকল আশ'আরিয়‍্যা ও মাতুরিদিয়‍্যা সকলকেই বুঝায়। তন্মধ্যে আশ'আরী সম্প্রদায় বলে, আল্লাহ তা'আলার সত্তাগত গুণ আযালী বা অনাদি,
আর তা সাতটি। ইলম বা জ্ঞান, শোনা, দেখা, ক্ষমতা, ইচ্ছা, কথা বলা, জীবন; আর কিছু কর্মগত গুণ রয়েছে, যেগুলো 'হাওয়াদেস' বা অনিত্য (নতুনতর), এগুলো মহান আল্লাহর সৃষ্ট, এগুলো আল্লাহর সত্তায় ধারিত হয় না।
আর মাতুরিদী সম্প্রদায়ও বলে, আল্লাহ তা'আলার সত্তাগত গুণ সাতটি আর তা আদি। আর তাঁর কিছু কর্মগত গুণ রয়েছে তাও আদি। আর সেগুলো হচ্ছে তা-ই যা তার বিপરીতের সাথে একত্রিতভাবে আল্লাহ তা'আলার গুণ হয়। কর্মগত গুণের এ সংজ্ঞাটি আমি কালামশাস্ত্রের কিতাবসমূহের কোথাও পাইনি। হ্যাঁ, কেবল তা 'আদ-দুরুরুল মুখতার' কিতাবের কিতাবুল ঈমানে পাওয়া যায়। তাদের নিকট কর্মগত গুণের উদাহরণ হচ্ছে, মৃত্যু প্রদান ও জীবিত করণ; রাগ ও সন্তুষ্টি ইত্যাদি। মাতুরিদী সম্প্রদায় এসব (কর্মগত) গুণকে একটি গুণের অধীনে প্রবিষ্ট করে দেয়, তা হচ্ছে 'তাকওয়ীন' (হতে দেয়া) গুণ। বুখারীও 'তাকওয়ীন' গুণের কথা বলতেন। এতে করে 'তাকওয়ীন' গুণটি অষ্টম গুণ হিসেবে ধরা হবে। আশ'আরী সম্প্রদায় অনাদি গুণের সাথে আল্লাহ তা'আলার এসব কর্মের সম্পৃক্ততাকে 'হাওয়াদেস' বা অনিত্য বলে থাকে। (কিন্তু) ইমাম তাহাওয়ী বলেন, আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টি করার পূর্বেও স্রষ্টা, রিযিক দেয়ার পূর্বেও রাযেক।
আমি মাতুরিদীদের পক্ষ হতে বলি, বস্তুত মহান আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত একটা বিষয় আছে এখানে, আর তা হচ্ছে 'কর্ম'। এ নামটি আমার পক্ষ থেকে। আর তার উদাহরণ হচ্ছে যেমন নিকটতম আসমানে অবতরণ করা কিংবা অনুরূপ কিছু শাখা, যা রাব্বুল আলামীনের সাথে সম্পৃক্ত কিন্তু এরূপ প্রকরণ অনাদি থেকে রাব্বুল আলামীনের মধ্যে হয় না (অর্থাৎ অনাদি হতে বিদ্যমান সাত বা আট গুণের মধ্যে এর প্রকরণ নেই)। এরূপ কর্ম হাওয়াদিস বা অনিত্য। এগুলোর ব্যাপারে মাতুরিদী সম্প্রদায় বলে যে, এ কর্মগুলো তাঁর রাব্বুল আলামীনের মধ্যে ধারিত নয়, বরং তাঁর সৃষ্টি।
আর এসব হাওয়াদিস বা অনিত্যে অনুষ্ঠিত গুণাবলির ব্যাপারে হাফেয ইবন তাইমিয়্যার মত হচ্ছে এগুলো মহান আল্লাহ কর্তৃক ধারিত, অনিত্য, এবং অসৃষ্ট। তিনি দাবি করেন যে এটিই হচ্ছে সালাফে সালেহীনের মত। তিনি আরও বলেন, এরূপ অনিত্য কর্মবাচক গুণাবলি আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী ধারিত (অর্থাৎ তিনি স্বয়ং যখন ইচ্ছা তখন তা করেন)। তার মতে, স্রষ্টার জন্য এটা আবশ্যক নয় যে তিনি অনিত্য থেকে মুক্ত হবেন, বরং তাঁর অনিত্য গুণ থাকতে পারে নাও পারে। তিনি আরও বলেন, অনিত্য এবং সৃষ্ট-দুটির মধ্যে সম্পর্ক হলো 'আম-খাসের (অর্থাৎ অনিত্য শব্দটি ব্যাপকার্থবোধক, তার একটি বিশেষ প্রকার হলো সৃষ্টজগত)। অনিত্য গুণগুলো এবং সৃষ্টিজগতের সবকিছু-দুটিই অনিত্য। কিন্তু গুণাবলি সৃষ্ট নয়, কিন্তু সৃষ্টিজগতের সম্ভাব্য সবকিছুই সৃষ্ট। কিন্তু আশা'য়েরাগণ বলে থাকেন যে, সুমহান স্রষ্টা অনিত্যের পাত্র নন। আর তারা বলে থাকে অনিত্য আর সৃষ্টের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
আমি বলি, ভাষার বিবেচনা হাফেয ইবন তাইমিয়াকে সমর্থন করে। কেননা, যদি যায়েদ দাঁড়িয়ে থাকে, তখন বলা যায় দাঁড়ানোর কাজটি যায়েদের সাথে সম্পৃক্ত, আর যায়েদ দাঁড়ানোর গুণে গুণান্বিত; কিন্তু এটা বলা যায় না যে, যায়েদ দাঁড়ানো কাজটির স্রষ্টা। তেমনিভাবে আল্লাহ্ যেহেতু নেমে আসার গুণে গুণান্বিত, তাই এ (উপসংহার) ছাড়া উপায়
নেই যে, নেমে আসার গুণটি তাঁর কর্তৃক ধারিত এবং সুমহান স্রষ্টা নেমে আসার গুণে গুণান্বিত, নেমে আসার স্রষ্টা নন। ইবন তাইমিয়ার বক্তব্যটি আরও দৃঢ় হয় বুখারীর বক্তব্য দিয়ে, যেখানে তিনি বলেছেন যে আল্লাহ্ অনিত্য গুণে গুণান্বিত; যদিও ব্যাখ্যাকারগণ তাঁর এ বক্তব্যের তা'ওয়ীল করেছেন। একই রকম বর্ণনা পাওয়া যায় ইমাম আবু হানীফা, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ ইবন হাসান থেকে সহীহ সনদে যা আসমা ওয়াস সিফাত কিতাবে এসেছে, তারা বলেছেন, যে কেউ বলবে, 'কুরআন মাখলুক বা সৃষ্ট' সে কাফির। অর্থাৎ যে কেউ বলবে যে কুরআন আল্লাহর গুণ নয়, তা আলাদা কিছু, আল্লাহ থেকে তা পৃথক বস্তু (সে কাফের)। এর দ্বারা বুঝা গেল যে, তাঁরা (আবু হানীফা, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ) কুরআনকে অর্থাৎ আল্লাহ্র শব্দগত (বা শ্রুত) কথাকে কাদীম বা অনাদি বলতেন না।
মোটকথা এর দ্বারা বুঝা গেল যে, তাঁরা (আমাদের তিন ইমাম) শব্দগত কথার হুদুস বা অনিত্যতার প্রবক্তা ছিলেন, সেটাকে সৃষ্ট বলতেন না। আর ইবন তাইমিয়াহও মহান রব আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা কর্তৃক ঐচ্ছিক কর্ম ধারণ করার বিষয়ে পূর্ণ এক খণ্ড গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাই উপরে আমরা যা বর্ণনা করলাম তা প্রমাণ করে যে, যারা আবু হানীফাকে জাহমী বলে, আল্লাহর কাছে আমরা তা বলা থেকে আশ্রয় চাই, তাদের নাক ধূলি-ধুসরিত হয়েছে; কেননা এটা প্রমাণিত হচ্ছে যে, আবু হানীফা তা-ই বলতেন যা সালাফে সালেহীন বলতেন।
সুতরাং মোটকথা হচ্ছে, মহান রাব্বুল আলামীনের নিকটতম আসমানে অবতরণ করা প্রকৃত অর্থেই অবতরণ করা, যা তার প্রকাশ্য অর্থেই নেয়া হবে, তবে তার বিস্তারিত জ্ঞান ও ধরণ মহান স্রষ্টার কাছেই ন্যস্ত বা অর্পন করতে হবে। এটিই হচ্ছে চার ইমাম ও সালাফে সালেহীনের মাযহাব, যেমনটি হাফেয তার ফাতহুল বারীতে আবু হানীফা থেকে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে আশা'য়েরা কালামশাস্ত্রবিদরা যে মত গ্রহণ করার তা গ্রহণ করেছেন।
তারপর আমরা বলি, আশা'য়েরাগণ যে বলে থাকেন যাবতীয় কর্মগত গুণ হাদেস বা অনিত্য, তাদের এ কথার কোনো দলীল নাই। কারণ এগুলো অনিত্য নয়। আর যদি বলা হয়, আল্লাহর কর্মগত গুণগুলোর মধ্য থেকে যেগুলো তাঁর সুন্দর নামসমূহের অধীন সেগুলো তো অনিত্যের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার কারণে অনিত্য হয়ে যেতেই হচ্ছে, তাহলে আমি বলবো, আল্লাহর ক্ষমতা ও ইচ্ছা ইত্যাদি গুণের সম্পর্কও তো অনিত্যের সাথে হয়ে থাকে, সেখানে তো তোমরা সেগুলোকে অনিত্য বলো না। তাছাড়া কালামশাস্ত্রবিদদের মধ্যে প্রসিদ্ধ মত হচ্ছে যে ইচ্ছা প্রভৃতি আদিগুণ, কিন্তু সম্পৃক্ত অনিত্য বিষয়ের সাথে এর তা'আল্লুক বা সম্পর্কটি অনিত্য। আবার তাদের মধ্যে যারা দক্ষ, তারা বলেছেন, ইচ্ছা প্রভৃতি গুণ এবং এর তা'আল্লুক বা সম্পর্ক দুটিই আদি, কেবল সম্পৃক্ত বিষয়টিই অনিত্য; যেমনটি দাওওয়ানী বলেছেন তার 'রিসালাতু ইছবাতিল ওয়াজিব' কিতাবে।” (৭৬০)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00