📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 আল্লামা সিদ্দিক হাসান খান কুনার্জী আল-কিল্লাওয়ী (১৩০৭ হিজরী)

📄 আল্লামা সিদ্দিক হাসান খান কুনার্জী আল-কিল্লাওয়ী (১৩০৭ হিজরী)


উপমহাদেশের সহীহ আকীদাহ'র একজন দিকপাল আল্লামা শাইখ সিদ্দীক হাসান খান ভূপালী রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠার আকীদাহটি স্পষ্টভাবে তার তাফসীরে বর্ণনা করে বলেন,
(ثم استوى على العرش) قد اختلف العلماء في معنى هذا على أربعة عشر قولاً وأحقها وأولاها بالصواب مذهب السلف الصالح أنه استوى سبحانه عليه بلا كيف بل على الوجه الذي يليق به مع تنزهه عما لا يجوز عليه.
والاستواء في لغة العرب هو العلو والاستقرار، قال الجوهري : استوى على ظهر دابته أي استقر واستوى إلى السماء أي صعد، واستوى أي استولى وظهر وبه قال المعتزلة وجماعة من المتكلمين.
وحكي عن أبي عبيدة أن معنى استوى هنا علا وارتفع، وللشوكاني رسالة مستقلة في إثبات إجراء الصفات على ظواهرها منها صفة الاستواء، ولشيخ الإسلام أحمد بن عبد الحليم بن تيمية الحراني والحافظ الإمام محمد بن أبي بكر بن القيم الجوزي إلمام تام بمسألة الاستواء هذه وإثبات الفوقية والعلو له تعالى على خلقه ولهما في ذلك رسائل مستقلة ما بين مطولة منها ومختصرة، وكتاب العلو للحافظ الذهبي فيه جميع ما ورد في ذلك من الآيات والأحاديث وغيرها، وقد أوضحت هذا المقام في كتابي الانتقاد الرجيح في شرح الاعتقاد الصحيح.
وعن أم سلمة قالت: الاستواء غير مجهول والكيف غير معقول والإقرار به إيمان والجحود له كفر، أخرجه ابن مردويه وعن مالك بن أنس نحوه وزاد والسؤال عنه بدعة، قال النسفي وتفسير العرش بالسرير والاستواء بالاستقرار كما تقوله المشبهة باطل انتهى. وأقول يا مسكين أما شعرت أن العرش في اللغة هو السرير، والاستواء هو الاستقرار وبه فسره حبر الأمة وترجمان القرآن ابن عباس كما في البخاري، وليس في ذلك تشبيه أصلاً إنما
التشبيه في بيان الكيفية بل الإنكار عن ذلك تعطيل يخالف مذهب سلف الأمة وأئمتها، وهو إمرار الصفات كما جاءت وإجراؤها على ظواهرها بلا تكييف ولا تأويل ولا تعطيل ولا تشبيه، ويعالج التشبيه بكلمة إجمالية ليس كمثله شيء.
"তারপর তিনি (আল্লাহ) 'আরশের উপর উঠেছেন" আলেমগণ এর ব্যাখ্যায় চৌদ্দটি বক্তব্য দিয়েছেন, তবে যা হক্ক-সত্য ও বিশুদ্ধ হিসেবে স্বীকৃত তা হচ্ছে সালাফে সালেহীনের মাযহাব। তারা বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর উঠেছেন কোনো প্রকার ধরন নির্ধারণ ছাড়াই, বরং যে পদ্ধতি তাঁর সাথে উপযুক্ত হবে সেভাবে, তবে সাথে সাথে তাঁর জন্য যা অসম্ভব সেটা থেকে তিনি পবিত্র।
আর আরবী ভাষাতে 'ইস্তেওয়া' এর অর্থ হলো- উপরে উঠা ও উপরে থাকা। জাওহারী বলেন, বলা হয়, 'ইস্তাওয়া 'আলা যাহরি দাব্বাতিহী' অর্থাৎ বাহনের উপরে অবস্থান নিলেন। আর 'ইস্তাওয়া ইলাস সামায়ি' এর অর্থ উপরে উঠলেন। আর ইস্তাওয়া অর্থ ইস্তাওলা বা অধিকার করল ও জয়ী হলো এটা মু'তাযিলা একদল কালামশাস্ত্রবিদদের কথা।...
আবু উবাইদাহ থেকে বর্ণিত, এখানে 'ইস্তাওয়া' অর্থ 'আলা (উপর উঠলেন) ও 'ইরতাফা'আ' বা ঊর্ধ্বে উঠলেন। ইমাম শাওকানীর এ ব্যাপারে একটি আলাদা পুস্তিকা রয়েছে, সেখানে তিনি আল্লাহর গুণসমূহকে প্রকাশ্য অর্থের উপর নিতে হবে বলেছেন, তন্মধ্যে তিনি 'ইস্তেওয়া' আল্লাহর 'আরশের উপর উঠা' এ গুণটি বর্ণনা করেছেন। শাইখুল ইসলাম আহমাদ ইবন আবদুল হালীম ইবন তাইমিয়্যাহ আল-হাররানী, হাফেয ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আবী বকর ইবন কাইয়্যেমিল জাওযিয়্যাহ 'ইস্তেওয়া' বা 'আল্লাহ কর্তৃক তাঁর 'আরশের উপর উঠা'র বিষয়ে, তাঁর জন্য উপর দিক সাব্যস্ত করা, তাঁর জন্য সৃষ্টির উপরে সর্বোচ্চে থাকার গুণটি প্রমাণ করার বিষয়টি পূর্ণ দখলে ছিল, তারা দু'জন এ ব্যাপারে বেশ কিছু গ্রন্থ লিখেছেন, যার কোনোটি ছোট কোনোটি বড়। অনুরূপভাবে হাফেয যাহাবী রাহিমাহুল্লাহর কিতাবুল উলু নামক গ্রন্থে এ বিষয়ে কুরআনের আয়াত, হাদীস ও অন্যান্য দলীল প্রমাণাদি একত্রিত করেছেন। আর আমিও এ বিষয়টি আমার রচিত গ্রন্থ 'আল-ইন্তিক্কাদুর রাজীহ ফী শারহিল ই'তিক্কাদ আস-সহীহ' গ্রন্থে বিস্তারিত তুলে ধরেছি।
উম্মে সালামাহ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ইস্তেওয়া' এর অর্থ অজানা নয়, ধরণ বিবেকের যুক্তি দিয়ে পাওয়া যাবে না। তা স্বীকার করে নেয়ার নাম ঈমান, আর তা অস্বীকার করার নাম কুফুরী যা ইমাম ইবন মারদুওইয়াহ বর্ণনা করেছেন। ইমাম মালিক ইবন আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকেও অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে। সেখানে বাড়তি এসেছে, আর এর ধরন সম্পর্কে প্রশ্ন করা বিদ'আত।
অন্যদিকে আমরা দেখতে পাই যে, নাসাফী বলেছেন, 'আরশের তাফসীর খাট আর ইস্তেওয়া এর অর্থ ('আরশের উপর) অবস্থান করা যেমনটি সাদৃশ্য স্থাপনকারীরা বলে তা বাতিল। শেষ।
আমি বলবো, ওহে মিসকীন, তুমি কি জান না যে, ভাষায় 'আরশ বলে খাটকেই বুঝায় আর ইস্তেওয়া বলে অবস্থানকেই বুঝায়। এ তাফসীর উম্মতের বড় আলেম, কুরআনের তাফসীরকার আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস থেকেই এসেছে, যেমনটি ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন। এভাবে সাব্যস্ত করার মধ্যে সাদৃশ্য স্থাপন করা হয় না, সাদৃশ্য স্থাপন তো কেবল ধরণ নির্ধারণ দ্বারাই
হয়ে থাকে। বরং এর অর্থ সাব্যস্ত করাকে অস্বীকার করাই হচ্ছে তা'তীল বা অর্থশূন্যকরণ যা উম্মতের সালাফে সালেহীন ও উম্মাতের ইমামদের মতের বিপরীত। তাদের মত ছিল এসব গুণকে যেভাবে এসেছে সেভাবে পরিচালনা করা, কোনোরূপ ধরন নির্ধারণ না করে এগুলোকে প্রকাশ্য অর্থে ব্যবহার করা, তবে তারা তাতে ধরন নির্ধারণ করতেন না, অপব্যাখ্যা করতেন না, অর্থহীন করতেন না এবং সাদৃশ্যও স্থাপন করতেন না। আর সাদৃশ্য স্থাপন রোধ করার জন্য একটি সংক্ষিপ্ত বাক্য ব্যবহার করা হবে, আর তা হচ্ছে, 'লাইসা কামিসলিহী শাইয়্যুন' তাঁর মতো কোনো কিছু নেই।”
তাছাড়া তিনি আল্লামা শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলাওয়ী এর 'আকীদাহ হাসানা' এর في جهة এর ব্যাখ্যায় বলেন, এর দ্বারা শাহ রাহিমাহুল্লাহ'র উদ্দেশ্য হচ্ছে এমন কোনো দিক অস্বীকার করা যার প্রতি আল্লাহর প্রয়োজনীয়তা বুঝাবে। কারণ, 'দিক' বলতে সাধারণত কোনো জায়গায় সীমাবদ্ধতার নির্দেশ করে আর আল্লাহ তা'আলা তো কোনো প্রকার সীমাবদ্ধ কিছুর অভ্যন্তরে থাকা থেকে মুক্ত। তারপর তিনি আল্লাহর জন্য 'আরশের উপর উঠার বিষয়টি আবদুল কাদের জীলানী, আবুল হাসান আল-আশ'আরী, ইমাম বাইহাকী কর্তৃক আনয়ন করা আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ'র বর্ণনা, ইবন কুতাইবাহ আদ-দীনাওয়ারী, আল্লামা শাওকানী, ইবন রুশদ আল-কুরতুবী, ইবন তাইমিয়‍্যাহ, ইবনুল কাইয়্যেম থেকে বর্ণনা এনে আল্লাহ তা'আলার জন্য উপর দিক সাব্যস্ত করেন।
তারপর তিনি যারা আল্লাহ তা'আলার গুণাবলি সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীসগুলোকে মুতাশাবিহ বলে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম থেকে প্রচুর পরিমাণ ভাষ্য বর্ণনা করেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে,
'ইমাম আহমাদ বলেন, যারা সহীহ হাদীসের ওপর আমল করতে চায় না, তারা সাধারণত দু'টি নীতিতে থাকে, এক. হাদীসকে কুরআনের বিপরীতে দাঁড় করানো। দুই. যদি সেটা সম্ভব না হয় তখন তারা কুরআন ও হাদীসের মুহকাম বা সম্পূর্ণ স্পষ্ট অর্থ বিশিষ্ট ভাষ্যসমূহকে মুতাশাবিহ বলে পার পেতে চায়। যেমন, আল্লাহর 'আরশের ওপর উঠার ভাষ্যটি মুহকাম হওয়ার পরও সেটাকে মুতাশাবিh দাবী করা।'
তারপর তিনি আল্লাহর 'আরশের উপর থাকার ওপর উপমহাদেশের আলেমগণের মত নিয়ে আসেন। সেখানে তিনি আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর উঠেছেন বলে উপমহাদেশের বিভিন্ন আলেমদের মত নিয়ে এসেছেন। সবশেষে তিনি বলেন,
والحاصل أن كلام العلماء في هذا الباب أكثر من أن تحصى، وأوفر من أن تستقصى، ومن لم يستشف بالقليل لم يقنع بالكثير، ومن أنكر الإجمال هان عليه التفصيل والله يقول الحق وهو يهدي السبيل (كما وصف الله به نفسه) في كتابه العزيز الرحمن على العرش استوى في سورة طه، وقال في الأعراف: إن ربكم الله الذي خلق السموات والأرض في ستة أيام ثم استوى على العرش وقال في يونس: إن ربكم الله الذي خلق السموات والأرض في
( ستة أيام ثم استوى على العرش يدبر الأمر )
"মোটকথা, এ অধ্যায়ে আলেমগণের কথা অনেক, অসংখ্য; গুণে শেষ করা যাবে না। যে কেউ স্বল্পতে যথেষ্ট হবে না তাকে বেশি দিয়েও তুষ্ট করা যাবে না। যে কেউ সংক্ষিপ্ত কথা বুঝবে না, তার কাছে বিস্তারিত বলা মূল্যহীন। আল্লাহ তা'আলা তিনি সত্য বলেন আর তিনি সঠিক পথের দিশা দেন। তিনি তেমনি যেমনটি নিজে তাঁর সম্মানিত কিতাবের সূরা ত্বা-হায় নিজেকে গুণান্বিত করে বলেছেন, "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন" অনুরূপ সূরা আল-আ'রাফে বলেছেন, "নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ্ যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন।" [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৫৪] অনুরূপ সূরা ইউনুসে বলেন, "তোমাদের রব তো আল্লাহ্, যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠলেন। তিনি সব বিষয় পরিচালনা করেন।" [সূরা ইউনুস, আয়াত: ০৩]"

টিকাঃ
৭৪৯. ফাতহুল বায়ান ফী মাকাসিদিল কুরআন (৪/৩৭৪-৩৭৫)।
৭৫০. আল-ইন্তিকাদুর রাজীহ ফী শারহিল ই'তিক্বাদিস সহীহ, ৬০-৬৮।
৭৫১. আল-ইন্তিক্বাদুর রাজীহ ফী শারহির ই'তিক্বাদিস সহীহ, ৭৩-৭৪।
৭৫২. আল-ইস্তিক্বাদুর রাজীহ ফী শারহিল ই'তিক্বাদিস সহীহ, ৯৩-৯৪।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 আল্লামা মিয়া নযীর হুসাইন দেহলাওয়ী (১৩২০ হিজরী)

📄 আল্লামা মিয়া নযীর হুসাইন দেহলাওয়ী (১৩২০ হিজরী)


আল্লামা মিয়া নাযীর হুসাইন দেহলাওয়ী রাহিমাহুল্লাহ এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাকে পরিচয় করিয়ে দিতে হয় না। তাকে বলা হয় শাইখুল কুল ফিল কুল। কুরআন, হাদীস ও ফিকহ শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তির পাশাপাশি তিনি সকল মা'কুলাত বিষয়ে অনন্য জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলাওয়ীর (মেয়ের ঘরের) নাতি আল্লামা শাহ মুহাম্মাদ ইসহাক্ক ছিলেন মিয়া নাযীর হুসাইন এর প্রিয় উস্তাদ। তাঁরই জায়গায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। আর ছাত্রদের মধ্যে আরব ও আজমের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ববর্গ রয়েছেন, যেমন, শাইখ আব্দুল্লাহ গাযনাওয়ী, মুহাম্মাদ গাযনাওয়ী, আব্দুল জাব্বার গাযনাওয়ী, মুহাম্মাদ বশীর সাহসাওয়ানী, আব্দুল্লাহ গাযীপুরী, শামসুল হক্ক আযীমাবাদী, আব্দুর রহমান মুবারকপুরী, সানাউল্লাহ অমৃতসরী। আরবদের মাঝে, ইসহাক্ক ইবন আব্দুর রহমান আলুশ শাইখ, সা'দ ইবন হামাদ ইবন আতীক, আলী ইবন নাসের আবু ওয়াদী, আবু বকর খুওকীর, আব্দুল্লাহ ইদ্রীস আস-সামূমুসী আল-মাগরেবী প্রমুখ। এ মহান ব্যক্তিত্বের আল্লাহর 'আরশের উপর উঠা সংক্রান্ত আকীদা বর্ণনা করব। তিনি বলেন,
سوال: کیا فرماتی ہیں علمائی دین اس مسئلہ میں کہ ایک عالم کہتا ہے کہ جو شخص خداوند کریم کو بلا کیف عرش بر سمجھے یا جانے کافر ہے، بس اس عالم کا یہ قول غلط ہے یا صحیح؟ بینوا توجروا
الجواب: جو عالم یہ کہتا ہے وہ عالم نہیں ہے، بلکہ وہ جاہل ہے، اور اس کا یہ قول سراسر غلط و باطل ہے، کیونکہ قرآن مجید کی ایک نہیں، بلکہ بہت سے آیتوں سے اللہ تعالی کی عرش پر مستوی ہونا ثابت ہے، اور اسی طرح بہت سے احادیث سے بہی یہ بات ثابت ہے، مگر اللہ تعالی کی عرش پر مستوی ہونے کی کیفیت مجہول و نا معلوم ہے، تمام صحابہ اور تابعین و تبع تابعین اور ائمه مجتہدین رضوان اللہ علیہم اجمعین کا یہی قول واعتقاد تھا کہ اللہ تعالی عرش پر مستوی ہے، اور استواء علی العرش کی کیفیت
مجہول ونا معلوم ہے، اللہ تعالی کی عرش پر بلا کیف ہونے کی ثبوت میں آیات قرآنیہ اور احادیث نبویہ اور اقوال ائمہ دین کو بسط و تفصیل کی ساتھ دیکھنا ہو تو کتاب العلو للحافظ الذہبی کو مطالعہ کرنا چاہئے۔...
"প্রশ্ন: উলামায়ে দীন এ মাসআলার ব্যাপারে কী বলেন, এক আলেম বলেন, যে কেউ আল্লাহ তা'আলাকে আরশের উপর কোনো ধরন নির্ধারণ ব্যতীতই 'আরশের উপর বলবে বা জানবে সে কাফের হয়ে যাবে? এ আলেমের এ কথাটি ভুল নাকি শুদ্ধ? বিষয়টি বর্ণনা করুন এবং সাওয়াবের অধিকারী হউন।
উত্তর:
যে আলেম এমন কথা বলবে তিনি আলেমই নন, বরং তিনি জাহেল। আর এ কথা সম্পূর্ণ ভুল ও বাতিল; কেননা কুরআনে কারীমে এক নয় বরং বহু আয়াতে আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠা সাব্যস্ত হয়েছে। অনুরূপভাবে বহু হাদীসে এ কথা সাব্যস্ত হয়েছে। তবে এটা বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠার ধরন অজানা ও অজ্ঞাত। সকল সাহাবী, তাবে'য়ী, তাবে' তাবে'য়ীন, মুজতাহিদ ইমামগণ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুম সবারই এ আকীদাহ ও বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপর উঠেছেন, আর আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠার ধরন অজানা ও অজ্ঞাত। আল্লাহ তা'আলা কোনো ধরন নির্ধারণ ব্যতীত আরশের উপর হওয়া সাব্যস্ত করার ব্যাপারে কুরআনের আয়াত, রাসূলের হাদীস, দীনের ইমামগণের বক্তব্য বিস্তারিত ও বিশদ আকারে দেখতে হলে ইমাম যাহাবীর আল-উলু কিতাবটি অধ্যয়ন করা যেতে পারে।....."
তারপর তিনি কুরআন থেকে আল্লাহ তা'আলার আরশের উপরে উঠার দলীলসমূহ তুলে ধরেন। প্রথমেই সূরা আল-আ'রাফ, সূরা রা'দ, সূরা ত্বাহা থেকে তিনটি আয়াত নিয়ে আসেন। তারপর দুটি হাদীস নিয়ে আসেন; যাতে 'আরশের উপর তাঁর কাছে রাখা কিতাব, তারপর হাশরের মাঠে আল্লাহ তা'আলা মহান আল্লাহর অবস্থানে নিচে যাবেন, যখন তিনি 'আরশের উপর থাকবেন সংক্রান্ত হাদীস উদ্ধৃত করেন। তারপর চার ইমামের বক্তব্য তুলে ধরেন।

টিকাঃ
৭৫৩. ফাতাওয়া নাযীরীয়াহ, প্রথম খণ্ড, কিতাবুল ঈমান ওয়াল আকায়িদ, পৃ. ৫৭।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 আব্দুল জাব্বার আল-গাযানাওয়ী (১৩৩২ হিজরী)

📄 আব্দুল জাব্বার আল-গাযানাওয়ী (১৩৩২ হিজরী)


শাইখ আব্দুল জাব্বার ইবন আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ আ'যম আল-গাযনাওয়ী, তারপর অমৃতসরী, যার মর্যাদা ও সম্মানের ব্যাপারে আলেমগণ একমত পোষণ করেছেন। হিজরী ১২৬৮ সালে তাঁর জন্ম। পিতার কাছে প্রাথমিক পড়া শেষ করেন। তারপর আপন দু' ভাই মুহাম্মাদ ও আহমাদের কাছে আরবী পড়া সম্পন্ন করেন। তারপর দিল্লীতে প্রবেশ করে মিয়া নাযীর হুসাইন দেহলাওয়ী, যাকে শাইখুল কুল ফিল কুল, সকল বিষয়ে সকলের উস্তাদ বলা হয়, তাঁর দারসে মুলাযামাত করেন। বিশ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ইলমী জগতের সেরা ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তারপর অমৃতসরে বসবাস করতে থাকেন। সেখানেই দাওয়াত ও ইবাদতে বাকী সময় অতিবাহিত করেন। কোনো সুনির্দিষ্ট মাযহাবের অনুসরণ করতেন না। তাঁর ইজতিহাদের যোগ্যতা ছিল। ইমামদের সম্পর্কে ভালো কথা বলতেন। আকীদাহ'র ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ ধারার প্রবর্তকদের অন্যতম ছিলেন।
শাইখ সানাউল্লাহ অমৃতসরী রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপরে উঠার বিষয়ে ভুল করলে সেটার রদ করে শাইখ আব্দুল হক্ক গাযনাওয়ী যে গ্রন্থ লেখেন তিনি সেটার অনুমোদনকারী ৮০জন আলেমের অন্যতম ছিলেন। পরবর্তীতে সৌদি আরবের বাদশাহ আব্দুল আযীয তাদের মধ্যে মধ্যস্থতা করে দেন। শাইখ সানাউল্লাহ অমৃতসরী তার ভুল থেকে ফিরে আসার ঘোষণা প্রদান করেন।
এভাবেই শাইখ আব্দুল জাব্বার গাযানাওয়ী রাহিমাহুল্লাহ আকীদার মিশনকে চাঙ্গা করেন। তিনি আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা 'আরশের উপরে বিশ্বাস করতেন এবং এর ওপর গ্রন্থ রচনা করেছেন। যার নাম হচ্ছে, 'সাবীলুন নাজাত ফী মুবায়ানাতির রাব্বি আনিল মাখলুকাত'। এর মাধ্যমে ভারতবর্ষের মানুষের মাঝে আল্লাহর ব্যাপারে যেসব বিভ্রান্তি ছিল তা অপনোদন করে সঠিক আকীদাহ'র প্রচার প্রসার করেন। এখানে আল্লাহ তা'আলাকে 'আরশের উপরে থাকা সংক্রান্ত তার কিছু বক্তব্য তুলে ধরছি:
আকীদাহ বিষয়ক গ্রন্থ
অধ্যায়: আল্লাহ কর্তৃক তাঁর 'আরশের উপর উঠা এবং সৃষ্টিকুল থেকে পৃথক হওয়ার ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আহ এর আকীদাহ।
আল্লাহর নামে শুরু করছি, যিনি রহমান ও রহীম, হামদজাতীয় সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সর্বোচ্চ সত্তা, সর্বোপরে অবস্থানকারী, সালাত ও সালাম তাঁর সে সব বান্দাদের জন্য যাদের তিনি পছন্দ করেছেন, তারপর:
আমি আমাদের সমসাময়িক কারও কারও কিছু ছোট ছোট প্রবন্ধ দেখেছি, যাতে তিনি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের আকীদাহ-বিশ্বাস, 'আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টি থেকে পৃথক, তাঁর আরশের উপরে সত্তাগতভাবেই আছে, আর সবজায়গা তাঁর জ্ঞানের মাধ্যমে পরিবেষ্টন করে আছেন' এ নীতির বিরোধিতা করতে দেখেছি। তাকে দেখেছি এটা বলতে যে, তিনি সত্তাগতভাবে আমাদের সাথে এ যমীনেই রয়েছেন, যেমনটি তিনি আরশের উপর রয়েছেন। নিঃসন্দেহে তার এ কথাটি বানোয়াট, বিদ'আতী কথা, যা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের আকীদাহ-বিশ্বাস বিরোধী।
বস্তুত দু'টি কারণে তারা সহীহ আকীদা বিরোধী এসব কথা বলেছে, এক. সালাফে সালেহীনের অনুসরণ করতে ঘৃণা করা, দুই. তাদের নিজেদের মতকে অতিরিক্ত পছন্দ করার প্রবণতা। মূলত এ দু'টি জিনিস মারাত্মক ধ্বংসাত্মক রোগ। যারাই এ দু'টি রোগে আক্রান্ত হয়েছে তাদের বেশিরভাগই ধ্বংস হয়েছে।
আর তাদের ভুলের সুত্রপাত মূলত কয়েকটি জিনিস থেকে: ১- মহান আল্লাহর বাণী "তিনি তোমাদের সাথে রয়েছেন যেখানেই তোমরা থাক না কেন" সেখানে ( معه ) 'সাথে থাকা' এর অর্থকে মুতাশাবিহ বা কঠিন অস্পষ্টতা মনে করা। ২- অনুরূপ আল্লাহর বাণী "আর আমরা তোমাদের বেশি নিকটে রয়েছি তোমাদের গ্রীবার ধমনি থেকেও” এ আয়াতের ( قرب ) 'নিকটে থাকা' এর অর্থকে মুতাশাবিহ মনে করা। ৩- তদ্রূপ আল্লাহর বাণী, "অতঃপর তোমরা যেদিকেই তোমাদের চেহারা ফিরাও না কেন সে দিক তো তাঁরই দিক" এ আয়াতের ( وجه ) 'ওয়াজহ' বা চেহারা বা দিক এ শব্দটি মুতাশাবিহ মনে করা।
বস্তুত উপরের আয়াতে যেগুলোকে মুতাশাবিহাতের অন্তর্ভুক্ত বলা হচ্ছে তা মুতাশাবিহাতের অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে কোনো কোনো আলেম থেকে এগুলোকে মুতাশাবিহাতের অন্তর্ভুক্ত বলে মত প্রদান করা হলেও যারা সেটা তাদের থেকে বর্ণনা করেছে তারা সেসব আলেমের কথার উদ্দেশ্য, তাদের বক্তব্যের মূল কথা বুঝতে অসমর্থ হয়েছেন বা বেখবর থেকেছেন। কারণ যারা এসব শব্দ ও অর্থকে মুতাশাবিহাতের অন্তর্ভুক্ত বলেছেন তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, এগুলো এমন সাদৃশ্যপূর্ণ যে, তাতে কয়েকটি অর্থ করার সুযোগ রয়েছে, তাদের উদ্দেশ্য এটা নয় যে
এগুলো এমন মুতাশাবিহ বা অস্পষ্ট অর্থ বিশিষ্ট যার অর্থ বা ব্যাখ্যা করা যায় না। তারা যেখানে 'সম্ভাবনাময় অর্থ করার সুযোগ রয়েছে' সেটাকেই মুতাশাবিহ বা অস্পষ্টতার একটি প্রকার ধরে নিয়েছে। যেমনটি ত্বীবী, কাসত্বাল্লানী, বাগাওয়ীসহ অনেকেই স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন। মূলত এ প্রকার মুতাশাবিহ এর বিধান হচ্ছে, সেগুলোকে মুহকাম আয়াত, যার কেবল একটি অর্থই হয় এমন ভাষ্যসমূহের দিকে নিয়ে গিয়ে তার অর্থ নির্ধারণ করা। সে হিসেবেই তারা এসব আয়াতে আগত 'সাথে থাকা', 'নিকটে থাকা', 'চেহারা' বা দিককে মুতাশাবিহ আয়াত এর অন্তর্ভুক্ত করেছে। তারপর তারা 'সাথে থাকা'কে জ্ঞান, 'নিকটে থাকা'কে ফিরিশতাদের নিকটে থাকা অথবা জ্ঞানে নিকটে থাকা, আর ওয়াজহ বলে দিক বা সন্তুষ্টি বলে ব্যাখ্যা করেছেন।
আর যে জিনিস এ বিষয়টিকে স্পষ্ট করে দিবে তা হচ্ছে,
(৩) 'সাথে থাকা' এ শব্দটি দ্বারা দু'টি সত্তা নিকটবর্তী থাকা বুঝায় আবার অন্য অর্থও বুঝায়। যেমন, আল্লাহর বাণী, "আর যখন তারা তাদের শয়তানদের সাথে একান্ত হয়, তখন তারা বলে, নিশ্চয় আমরা তোমাদের সাথেই রয়েছি"। (এখানে সর্বসম্মত মত হচ্ছে যে এটা দু'টি সত্তার এক সাথে লেগে থাকা নয়, বরং) উদ্দেশ্য হচ্ছে, ধর্ম ও আকীদায় আমরা একসাথে আছি। অনুরূপ আল্লাহর বাণী, "নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন”। উদ্দেশ্য হচ্ছে, সাহায্য ও সহযোগিতায়। তদ্রূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাণী, "(তাবুকের যুদ্ধের জন্য বের হওয়ার পর) মদীনায় কিছু লোক রয়ে গেছে, তোমরা যে পথই অতিক্রম কর, যে উপত্যকাই পাড়ি দাও না কেন, তারা তোমাদের সাথে রয়েছেন"। অর্থাৎ কল্যাণকামিতায়, নিয়তে, দো'আয়। অনুরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী, "কুরআনে পারদর্শী ব্যক্তি সম্মানিত সৎ দূত 'মালায়িকা ও নবী'দের সাথে” অর্থাৎ মর্যাদা ও সাওয়াবের দিক থেকে। তাছাড়া (مع) 'সাথে থাকা' শব্দটি স্থান, কাল ও পাত্রভেদে আরও বিভিন্ন অর্থ প্রদান করে থাকে।
একইভাবে 'আমরা' সর্বনামটি কখনও কখনও নিজেকে সম্মানিত করার জন্য বহুবচন ব্যবহার করে থাকে। আবার কখনও কখনও তা এমন কেউ ব্যবহার করে থাকেন যিনি অপর কাউকে কোনো দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছেন তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি সে কাজটি করলেও প্রেরণকারী তা নিজের দিকে সম্পৃক্ত করার জন্য বহুবচনের সর্বনাম 'আমরা' ব্যবহার করে থাকেন। যেমন, আল্লাহর বাণী "নিশ্চয় আমরা যিকির (কুরআন ও সুন্নাহ) নাযিল করেছি"। অপর বাণী "নিশ্চয় আমরাই জীবিত করি ও মৃত্যু প্রদান করি"। অপর বাণী "আমরা আপনার কাছে বর্ণনা করব উত্তম কিসসা"। অপর বাণী "আমরা আপনার কাছে তিলাওয়াত করব মূসা ও ফির'আউনের সংবাদ”। অপর বাণী "অতঃপর যখন আমরা তা পাঠ করব তখন আপনি সে পাঠের অনুসরণ করুন"। অপর বাণী "আর আমরা লিখে রাখি যা তারা অগ্রে পেশ করছে এবং তাদের পদচিহ্নগুলোও”। এসব আয়াতে উল্লিখিত অবতরণ করা, জীবিত করা, মৃত্যু দেয়া, ঘটনা বলা, তিলাওয়াত করা, পড়া, লেখা যদিও বাহ্যিকভাবে ফিরিশতাদের কাজ তারপরও সেগুলোকে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন; কারণ তিনিই তো সেগুলোর নির্দেশদাতা, হুকুমদাতা।
অনুরূপভাবে, )قرب( 'নিকটে থাকা' এ শব্দটিও বাক্যের আগ-পিছ দৃষ্টি দিয়ে অর্থ নির্ধারণ করতে হবে। যেমন, আল্লাহর বাণী, "আমরা তার গ্রীবার ধমনী থেকেও তার বেশি নিকটে" এখানে যদিও 'আমরা' বলে ফিরিশতাদের বুঝানো হয়েছে, কারণ পরের আয়াত সেটার ব্যাখ্যা
করে দিচ্ছে, যাতে আল্লাহ বলেছেন, "যখন গ্রহণ করে দু'দল ফিরিশতা, ডান দিক ও বাম দিকে বসে, সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তার কাছে সদা উপস্থিত সংরক্ষণকারী রয়েছে”। অনুরূপ আল্লাহর বাণী "আর আমরা তোমাদের চেয়ে তার বেশি নিকটে, কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না।” এখানে 'নিকটে' বলে ফিরিশতারা মৃত ব্যক্তির নিকটে থাকা বুঝানো হয়েছে, যা আয়াতের পূর্বাপর থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়। (কারণ আয়াতের মধ্যেই বলা হয়েছে, 'কিন্তু তোমরা দেখতে পাও না'। যা কেবল ফিরিশতাদের জন্যই প্রয়োগ হতে পারে।) তারপরও আল্লাহ তা'আলা উভয় আয়াতেই নিকটে থাকাকে নিজের দিকে সম্পৃক্ত করেছেন, কারণ তিনিই তো সেটার নির্দেশদাতা ও হুকুমদাতা। আবার কোনো কোনো আলেম বলেছেন এখানেও আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক জ্ঞানের মাধ্যমে নিকটে থাকা বুঝানো হয়েছে। তবে প্রথম মতটিই বেশি বিশুদ্ধ।
আর যারা আল্লাহকে আহ্বান করে, যারা আল্লাহ তা'আলার যিকির করে, আল্লাহ তাদের নিকটে থাকা, যেমন কুরআন ও হাদীসের বাণীতে এসেছে, আল্লাহর বাণী "আর যখন আমার বান্দারা আমার ব্যাপারে আপনাকে প্রশ্ন করে তখন আপনি বলুন, নিশ্চয় আমি নিকটে, আহ্বানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে"। অনুরূপ আল্লাহর বাণী "সুতরাং তোমরা তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, তারপর তাঁর কাছে তাওবাহ করো, নিশ্চয় আমার রব অতি নিকটে ও অতিশয় দো'আ কবুলকারী”। তদ্রূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসে এসেছে, তিনি বলেছেন, "নিশ্চয় যাকে তোমরা ডাকছ, তিনি তোমাদের কারও বাহনের ঘাড়ের চেয়েও নিকটে”, অনুরূপ আরও কিছু আয়াত ও হাদীসে যে নৈকট্যের কথা বলা হয়েছে, সেটা কখনও কখনও বিশেষ সত্তাগত নৈকট্য বুঝানো হতে পারে, যেমন নিকটতম আসমানে নেমে আসা, তিনি যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে নেমে আসেন, যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে নিকটে আসতে পারেন। আমরা এ সবের উপরই ঈমান আনি, আমরা বলি সবই আমাদের রবের পক্ষ থেকে এসেছে।
অনুরূপভাবে )الوجه( 'ওয়াজহ' শব্দেরও বিভিন্ন অর্থ রয়েছে। যেমন, কোনো কিছুর চেহারা বা সম্মুখভাগ, অথবা কোনো কিছু স্বয়ং, অথবা কোনো জাতির নেতা, অথবা দিক; যেমনটি ক্বামূস এবং মুখতারায় এসেছে। এই অর্থে আলেমগণ তাদের তাফসীরে আল্লাহ্ বাণী فثم وجه الله এর অর্থে বলেছেন, 'সে দিক, যার নির্দেশ আল্লাহ্ দিয়েছেন।' ...
আর যেহেতু উপরে বর্ণিত এসব আয়াত বিবিধ অর্থ প্রদান করে, তাই কেউ কেউ এ আয়াতগুলোকে মুতাশাবিহ এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তারপর আহলুস সুন্নাহ সেগুলোকে সে অর্থে গ্রহণ করেছেন যে অর্থ করা হলে তা সেসব ভাষ্যের বিরোধী হয় না, যাতে কেবল একটি অর্থই রয়েছে। যদি এগুলো সেসব মুতাশাবিহ এর অন্তর্ভুক্ত হতো যা ব্যাখ্যা করা যায় না, তাহলে তারা এগুলোর অর্থ করতেন না। আর যেসব ভাষ্য কেবল একটি অর্থই প্রদান করে, তা হচ্ছে, আল্লাহর বাণী, "উত্তম বাক্য তাঁর দিকেই উত্থিত হয়"। "ফিরিশতা ও জিবরীল তাঁর দিকেই উঠে আসেন"। "তিনি আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত যাবতীয় বিষয় পরিচালনা করেন, তারপর সবকিছুই তাঁর সমীপে উত্থিত হবে”। “নিশ্চয় আমি আপনাকে বয়সের পূর্ণতা দিব আর আপনাকে আমার দিকে তুলে আনব”। “বরং আল্লাহ তাঁকে তার দিকে তুলে নিয়েছেন।" "তোমরা কি আসমানের উপরে যিনি আছেন তার ব্যাপারে নিরাপদ হয়ে গেছ যে, তিনি যমীনকে তোমাদের নিয়ে ধ্বসিয়ে দিবেন না?" "অতঃপর যারা আপনার রবের নিকট রয়েছে তারা তাঁর ইবাদাত করার ব্যাপারে কোনো অহংকার করে না।” “তারা তাদের রবকে তাদের উপরে থেকে ভয় করে"। "আর ফির'আউন বলল, হে হামান, আমার জন্য একটি প্রাসাদ বানাও, যাতে করে আমি একটি অবলম্বন পাই,
আসমানে আরোহণের অবলম্বন, যাতে আমি মূসার ইলাহকে দেখতে পাই, আর আমি নিশ্চয় তাকে মিথ্যাবাদী মনে করি"। "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন"। অনুরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী, 'অতঃপর আমি তা নিয়ে মূসা 'আলাইহিস সালামের কাছ পর্যন্ত অবতরণ করলাম, তিনি বললেন, আপনার উম্মতের উপরে আপনার রব কী ফরয করেছেন? আমি বললাম, দিনে ও রাতে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত। তিনি বললেন, আপনি আপনার রবের কাছে যান, আপনার উম্মতের ওপর থেকে হাল্কা করার আহ্বান করুন, তারপর আমি আমার রব এবং মূসার মাঝে বারবার আসা যাওয়া করি, অবশেষে আল্লাহ বললেন, হে মুহাম্মাদ, এগুলো হচ্ছে দিনে রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত।" হাদীসের শেষ পর্যন্ত। অনুরূপ অন্য হাদীস, "নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টিকে অস্তিত্বে আনয়ন করলেন, তখন তাঁর কাছে 'আরশের উপর একটি গ্রন্থে লিখলেন, আমার রহমত আমার ক্রোধের ওপর প্রাধান্য পাবে।" (৭৫৪)
এরপর তিনি আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপরে থাকার ব্যাপারে বহু হাদীস নিয়ে আসেন, সাহাবায়ে কিরামের বাণী নিয়ে আসেন, তাবে'য়ীদের বক্তব্য উপস্থিত করেন, তাবে তাবে'ঈন ও ইমাগণের কথা তুলে ধরেন। যার অধিকাংশই তিনি ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম ও ইমাম যাহাবীর গ্রন্থসমূহ থেকে উদ্ধৃত করেন। (৭৫৫)

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 আল্লামা জামালুদ্দীন আল-কাসেমী (১৩৩২ হিজরী)

📄 আল্লামা জামালুদ্দীন আল-কাসেমী (১৩৩২ হিজরী)


আল্লামা জামালুদ্দীন আল-কাসেমী রাহিমাহুল্লাহ গত শতাব্দীর একজন বিখ্যাত আলেম, যিনি তাঁর তাফসীর গ্রন্থে আল্লাহ তা'আলার 'আরশে উঠার বিষয়ে সালাফে সালেহীনের নীতিকে পছন্দ করেছেন। তিনি বলেন,
"আর আল্লাহর বাণী, 'তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন' জেনে রাখুন, 'ইস্তেওয়া' শব্দটি কয়েকটি অর্থে এসেছে, যাতে তার শব্দমূল জড়িত।... আর তা উপরে বা ঊর্ধ্বে উঠার অর্থে আসে। এ অর্থেই এসেছে, 'অতঃপর যখন আপনি ও আপনার সাথীরা জাহাজের উপর উঠবেন' [সূরা আল-মুমিনূন, আয়াত: ২৮], তন্মধ্যে এ অর্থে আরও ব্যবহৃত হয়েছে উল্লিখিত আয়াতটি।
ইমাম বুখারী তার 'সহীহ' গ্রন্থের শেষে যে অধ্যায় বিন্যাস করেছেন 'আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যা' নামে, তার "আর তাঁর 'আরশ ছিল পানির উপরে" এ পরিচ্ছেদে বলেন, মুজাহিদ বলেছেন, 'ইস্তাওয়া' অর্থ 'আরশের উপর উঠেছেন'। (শেষ)
আর হাফেয যাহাবী এর 'আল-'উলু' কিতাবে এসেছে, ইসহাক ইবন রাহওয়াইহ বলেন, আমি একাধিক তাফসীরকারদেরকে বলতে শুনেছি, "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫] অর্থ, উপরে উঠেছেন। আর ইবন জারীর আত-ত্বাবারী রাহিমাহুল্লাহ রবী ইবন আনাস থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, 'ইস্তাওয়া' এর অর্থ উপরে উঠেছেন। তিনি আরও বলেন, 'ইস্তাওয়া' শব্দটি যত জায়গায় কুরআনে এসেছে সর্বত্রই উপরে উঠা ও ঊর্ধ্বে উঠার অর্থে এসেছে।
আমি বলি, এটিকে বেশি বাড়িয়ে বলার প্রয়োজন নেই। কারণ, ইস্তেওয়া এর অর্থ অজানা নয়, যদিও ধরণ অজানা। "(৭৫৬)
অন্যত্র তিনি বর্ণনা করেন, "আর বাধ্যতামূলক হচ্ছে, 'ইস্তেওয়া' গুণটিকে তার অর্থে বিনা শর্তে ব্যবহার করা, তা'ওয়ীল বা ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করার নীতি অবলম্বন না করা। আর তা হচ্ছে 'আরশের উপর সত্তার উঠা, তবে বসা বা স্পর্শ করে থাকার অর্থে নয়। যেমনটি মুজাসসিমা ও কাররামিয়্যাহ সম্প্রদায় বলে থাকে। অনুরূপ তা উচ্চ মর্যাদা ও উন্নত অর্থেও নয়, যেমনটি আশ'আরী মতবাদের লোকেরা বলে থাকে, অধিকার করা কিংবা জয়লাভ করার অর্থেও নয় যেমনটি মু'তাযিলা সম্প্রদায়ের লোকেরা বলেছে। কারণ শরী'আত এসব অর্থে আসেনি। আর না তা এসেছে কোনো সাহাবী, কোনো তাবে'য়ী থেকে, সালাফে সালেহীন থেকে, মুহাদ্দিসগণ থেকে। বরং তাদের কাছ থেকে কেবল স্বাভাবিক নিঃশর্ত অর্থেই তা বর্ণিত হয়েছে।” (৭৫৭)
অন্যত্র তিনি বলেন, "এখানে আমরা এ স্থানে ব্যাপক বিস্তারিত আলোচনা এ জন্য করলাম, কারণ এটি আমাদের দীনী আকীদাহ'র মূলনীতির অন্তর্ভুক্ত, তাওহীদের গুরুত্বপূর্ণ মাসআলার বিষয়। এতে মতযুদ্ধ ও প্রবৃত্তির দ্বন্ধ ব্যাপক আকারে বিস্তার লাভ করেছে। তা'ওয়ীল তথা অপব্যাখ্যা কিংবা দূরবর্তী ভিন্ন অর্থে পরিচালনাকারী কালামশাস্ত্রবিদরা এমন কিছু আনতে পারেনি যা সূতীক্ষ্ম বুদ্ধিমানদের অন্তরে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়। বরং তারা এমন সব বাহানার আশ্রয় নিয়েছে যা আল্লাহর দেয়া ফিত্বরাত বা সুস্থ স্বাভাবিক প্রকৃতি মানতে কঠিনভাবে অস্বীকার করে। ফলে সত্যনিষ্ঠ সুন্নাতের সাহায্যকারী অন্তরসমূহ কেবল তাদের সঠিক অবস্থানে অবশিষ্ট থাকলো, যারা সালাফে সালেহীনের মাযহাবের দিকে সর্বদা নিজেদেরকে নিবিষ্ট রাখে। কারণ, ইমামগণ তাদেরই সাথে, আর তাদের আকীদাহ-বিশ্বাস তা-ই, যা আমরা বর্ণনা করলাম। সুতরাং সন্দেহকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। আর সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সকল সৃষ্টিকুলের রব।” (৭৫৮)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00