📄 আল্লামা ইসলাম হাম্মাম ইবনুল ইমাদ আবদুল ওয়াহহাব (১২০৩ হিজরী)
শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ ইবন আবদুল ওয়াহহাব রাহimাহুল্লাহ সালাফে সালেহীনের পথের পথিক ছিলেন। তাকে আমরা ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ, ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম, ইমাম যাহাবী, ইমাম ইবন আবদুল হাদী, ইমাম ইবন কাসীর এর জ্ঞানের সঠিক উত্তরসূরী হিসেবে দেখতে পাই।
সুতরাং আল্লাহর নাম ও গুণের ক্ষেত্রে তিনি এক বিন্দুও পূর্বসূরীদের মত ও পথের বাইরে যাননি। তিনি আল্লাহ তা'আলার নাম ও গুণের ক্ষেত্রে কী আকীদাহ-বিশ্বাস পোষণ করেন তা তার গ্রন্থসমূহে তুলে ধরেছেন। তাঁর অধঃস্তন বংশধররাও সেটা তাদের গ্রন্থে ব্যক্ত করেছেন। উদাহরণস্বরূপ আমরা এখানে বেশ কিছু ভাষ্য তুলে ধরার চেষ্টা করব:
আল্লাহর নাম ও গুণের ক্ষেত্রে কী আকীদাহ তিনি পোষণ করেন তা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন,
ومن الإيمان بالله : الإيمان بما وصف به نفسه في كتابه على لسان رسوله صلى الله عليه وسلم من غير تحريف، ولا تعطيل، بل أعتقد أن الله سبحانه وتعالى ليس كمثله شيء وهو السميع البصير، فلا أنفي عنه ما وصف به نفسه ولا أحرف الكلم عن مواضعه، ولا ألحد في أسمائه وآياته، ولا أكيف، ولا أمثل صفاته تعالى بصفات خلقه، لأنه تعالى لا سمّي له ولا كفؤ له ، ولا ند له ولا يقاس بخلقه، فإنه سبحانه أعلم بنفسه وبغيره، وأصدق قيلاً وأحسن حديثاً، فنزه سبحانه عما وصفه به المخالفون من أهل التكييف والتمثيل، وعما نفاه عنه النافون من أهل التحريف والتعطيل . فقال : ﴿سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ وَسَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَ وَالْحَمْدُ لِلهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ﴾ [الصافات: ۱۸۰، ۱۸۲]
"আল্লাহর ওপর ঈমানের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর কিতাবে তাঁর নিজেকে যেসব গুণে গুণান্বিত করেছেন, অনুরূপ তাঁর নবীর যবানীতে যেসব গুণ দ্বারা ভূষিত করেছেন তার ওপর ঈমান আনা, কোনো প্রকার বিকৃতি, অর্থশূন্যতা না করে। বরং আমি বিশ্বাস করি যে, "আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর মতো কোনো কিছু নেই, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” সুতরাং আমি তাঁর কোনো গুণকে অস্বীকার করি না, যা দিয়ে তিনি নিজেকে গুণান্বিত করেছেন, আর সেসব বাক্যকে তার স্থানচ্যুত করি না। তাঁর নাম ও আয়াতসমূহে ইলহাদ তথা বক্রপথ অবলম্বন করি না। সেগুলোর ধরন নির্ধারণ করি না, তাঁর গুণসমূহকে সৃষ্টির কোনো গুণের সাথে উপমা প্রদান করি না; কারণ আল্লাহ তা'আলা তাঁর নেই কোনো সমনামের কেউ, নেই কোনো সমপর্যায়ের কেউ, নেই কোনো তাঁর সদৃশ কেউ, আর তাঁকে তার সৃষ্টির উপরও কিয়াস করা যাবে না। কারণ, আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজের ব্যাপারে ও অন্যদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি জানেন, সবচেয়ে সত্য কথা বলেন, সবচেয়ে উত্তম বক্তব্য প্রদান করেন। এভাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা স্বয়ং তাঁর বিরোধী ধরন নির্ধারণকারী এবং সাদৃশ্য স্থাপনকারীরা যেসব গুণে তাকে গুণান্বিত করে তা থেকে নিজেকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন। (কারণ তাঁর সম্পর্কে না জেনে খারাপ গুণে তাঁকে গুণান্বিত করে থাকে) অনুরূপ বিকৃতকারী ও অর্থশূন্যকারীদের দ্বারা তাদের গুণ অস্বীকার করা থেকেও তিনি নিজেকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন। তাই তিনি বলেন, "তারা যা আরোপ করে, তা থেকে পবিত্র ও মহান আপনার রব, সকল ক্ষমতার অধিকারী। আর শান্তি বর্ষিত হোক রাসূলদের প্রতি! আর সকল প্রশংসা সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহরই প্রাপ্য।” [সূরা আস-সাফফাত: ১৮০-১৮২]¹
অন্যত্র তার আকীদাহ বর্ণনায় তারই সুযোগ্য পুত্র আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন আবদুল ওয়াহহাব রাহimাহুল্লাহ বলেন,
مذهب السلف رحمة الله عليهم إثبات الصفات وإجراؤها على ظاهرها ونفي الكيفية عنها، لأن الكلام في الصفات فرع عن الكلام في الذات، وإثبات الذات إثبات وجود لا إثبات كيفية، وعلى هذا مضى السلف كلهم، ولو ذهبنا نذكر ما أطلعنا عليه من كلام السلف في ذلك لخرج بنا عن المقصود في هذا الجواب)
"সালাফে সালেহীন রাহিমাহুমুল্লাহ এর মাযহাব হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলার গুণ সাব্যস্ত করা, সেগুলোকে প্রকাশ্য অর্থে গ্রহণ করা, সেগুলো থেকে ধরন নির্ধারণ অস্বীকার করা; কারণ গুণের ব্যাপারে কথা বলার বিষয়টি সত্তার ব্যাপারে কথা বলার শাখা হিসেবে বিবেচিত। আর আল্লাহর সত্তা সাব্যস্ত করার বিষয়টিও আমরা তাঁর অস্তিত্ব সাব্যস্ত করি, ধরন সাব্যস্ত করি না। এ নীতির ওপরই সকল সালাফে সালেহীন চলে গেছেন। যদি আমরা এ ব্যাপারে সালাফে সালেহীনের এ সংক্রান্ত কথা বর্ণনা করতে যাই তবে এ উত্তরপত্রে আমরা আমাদের উদ্দেশ্যের বাইরে চলে যাব।”²
অন্যত্র শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ ইবন আবদুল ওয়াহহাব রাহimاهুল্লাহ'র আকীদাহ সম্পর্কে তার সন্তান ও ছাত্ররা বিস্তারিত বলেছেন,
وسئل أبناء الشيخ محمد بن عبد الوهاب والشيخ حمد بن ناصر بن معمر - رحمهم الله – عن آيات الصفات الواردة في الكتاب كقوله تعالى: ﴿الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى) وكذلك قوله: ﴿وَلِتُصْنَعَ عَلَى عَيْنِي) وقوله: ﴿أَسْمَعُ وَأَرَى) وقوله: ﴿بَلْ يَدَاهُ مَبْسُوطَتَانِ) وقوله : لِمَا خَلَقْتُ بِيَدَى) وقوله: ﴿وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفًّا ) وقوله: ﴿وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وغير ذلك في القرآن. ومن السنة قوله صلى الله عليه وسلم: (قلب العبد بين إصبعين من أصابع الرحمن) وكذلك النفس، وقوله: (إن ربكم ليضحك)، وقوله: (حتى يضع رجله فيها فتقول قط قط) وغير ذلك مما لا يحصره هذا القرطاس. على ما تحملون هذه الآيات وهذه الأحاديث في الصفات ؟ فكان من جوابهم أن قالوا: (الحمد لله رب العالمين، قولنا فيها : ما قال الله ورسوله، وما جمع عليه سلف الأمة وأئمتها من أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم، ومن اتبعهم بإحسان، وهو الإقرار بذلك، والإيمان من غير تحريف ولا تعطيل، ومن غير تكييف ولا تمثيل، كما قال الإمام مالك لما سئل عن قوله الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى كيف استوى ؟ فأطرق الإمام مالك، وعلته الرحضاء - يعني العرق ، وانتظر القوم ما يجيء منه، فرفع رأسه إليه، وقال الاستواء غير مجهول والكيف غير معقول والإيمان به واجب والسؤال عنه بدعة، وأحسبك رجل سوء، وأمر به فأخرج، ومن أول الاستواء بالاستيلاء فقد أجاب بغير ما أجاب به مالك، وسلك غير سبيله، وهذا الجواب من مالك في الاستواء شاف كاف. في جميع الصفات مثل النزول والمجيء واليد والوجه وغيرها فيقال في النزول النزول معلوم والكيف مجهول، والإيمان به واجب والسؤال عنه بدعة، وهذا يقال في سائر الصفات الواردة في الكتاب والسنة .....
"শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ ইবন আবদুল ওয়াহহাব রাহimاهুল্লাহ'র সন্তানদের ও শাইখ হামاد ইবন নাসের ইবন মু'আম্মার রাহimاهুমুল্লাহকে কুরআনে কারীমে আসা আল্লাহর সিফাত বা গুণ সম্বলিত আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, সে আয়াতগুলো হচ্ছে, "দয়াময় (আল্লাহ্) 'আরশের উপর উঠেছেন।" [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫] "আর যাতে আপনি আমার চোখের সামনে প্রতিপালিত হন।" [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ৩৯] "আমি শুনি ও দেখি।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ৪৬] “বরং আল্লাহর উভয় হাতই প্রসারিত।” [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৬৪] "আমি যাকে আমার দু'হাতে সৃষ্টি করেছি।” [সূরা সাদ, আয়াত: ৭৫] "আর যখন আপনার রব আগমন করবেন ও সারিবদ্ধভাবে ফিরিশতাগণও।" [সূরা আল-ফজর, আয়াত: ২২] "অথচ কিয়ামতের দিন সমস্ত যমীন থাকবে তাঁর হাতের মুঠিতে।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৬৭] ও অন্যান্য কুরআনের আয়াত সম্পর্কে। অনুরূপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী 'বান্দার কলব রহমানের আঙ্গুল সমূহের দু' আঙ্গুলের মাঝে অবস্থিত⁴, অনুরূপভাবে আল্লাহর নফস, অনুরূপ রাসূলের বাণী, "নিশ্চয় তোমাদের রব হাসেন..⁵, রাসূলের বাণী, যতক্ষণ না জাব্বার (আল্লাহ) তাঁর পা রাখছেন জাহান্নামের উপর⁶ এসব আয়াত ও হাদীস যা জমা করলে এ কাগজে জায়গা হবে না, সেসব সিফাতের আয়াত ও হাদীসকে আপনারা কী অর্থে গ্রহণ করেন? তখন তার জবাবে তারা বলেন,
আল-হামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন, এসব আয়াত ও হাদীসের ব্যাপারে আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল বলেছেন, যার ওপর উম্মতের সালাফ ও ইমামগণ তথা পূর্বসূরী যেমন সাহাবায়ে কেরাম ও তাদের সুন্দর অনুসারীগণ একমত হয়েছেন। আর তা হচ্ছে, এগুলোর অর্থের স্বীকৃতি, এগুলোর ওপর কোনো প্রকার বিকৃতি কিংবা অর্থশূন্য, কোনোরূপ ধরন নির্ধারণ কিংবা উপমা প্রদান করা ব্যতীতই ঈমান আনয়ন। যেমনটি ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, যখন তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল আল্লাহর বাণী, "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন” [সূরা-ত্বা-হা, আয়াত: ০৫] সম্পর্কে যে কীভাবে আল্লাহ 'আরশের উপর 'ইস্তেওয়া' হলেন? তখন ইমাম মালিক রাহimاهুল্লাহ মাথা নীচু করে রাখলেন, তার উপর ঘাম দেখা দিল, মানুষ অপেক্ষা করতে থাকলো তিনি কী বলে তা দেখার জন্য, অতঃপর ইমাম তাঁর মাথা উঠালেন এবং বললেন, 'ইস্তেওয়া' অজানা বিষয় নয়, তার ধরন বিবেকের যুক্তি দ্বারা প্রাপ্য জিনিস নয়, তার উপর ঈমান আনা ওয়াজিব, তার সম্পর্কে প্রশ্ন করা বিদ'আত। আমি তো তোমাকে খারাপ লোক মনে করছি। তারপর তাকে বের করে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হলো ফলে তারা তাকে তার মজলিস থেকে বের করে দিলেন। আর যে কেউ ইস্তেওয়া তথা 'আরশের উপর উঠাকে ইস্তীলা বা দখল করার অর্থ করবে সে তো ইমাম মালিক যে উত্তর দিয়েছে তার বাইরে ভিন্ন উত্তর দিল, তার পথের বাইরে ভিন্ন পথ অবলম্বন করল। ইমাম মালিকের এ উত্তর আল্লাহর সকল গুণাবলির ক্ষেত্রে পূর্ণ আরোগ্যকারী ও যথেষ্ট উত্তর, যেমন তাঁর অবতরণ, আসা, হাত, চেহারা ইত্যাদি। তখন বলা হবে তাঁর অবতরণের ব্যাপারে, অবতরণ করা তো জানা বিষয়, কিন্তু ধরন তো অজানা, তার ওপর ঈমান আনা ফরয, ধরন সম্পর্কে প্রশ্ন করা বিদ'আত। এভাবে কুরআন ও সুন্নাহ'য় আসা আল্লাহর সকল গুণাবলির ব্যাপারে একই নীতি অবলম্বন করা হবে।”⁷
শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ ইবন আবদুল ওয়াহহাব রাহimاهুল্লাহ'র ছাত্ররাও একই আকীদাহ পোষণ করতেন এবং তারা এ দিকেই দাওয়া করতেন। শাইখ হামাদ ইবন নাসের ইবন উসমান শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ ইবন আবদুল ওয়াহহাব রাহimাহুল্লাহ কর্তৃক আল্লাহর নাম ও গুণের ক্ষেত্রে আকীদাহ পোষণ করতেন তার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন,
والمقصود أن نصوص الكتاب والسنه قد نطقت بل قد تواترت بإثبات على الله على خلقه، وأنه فوق سماواته مستو على عرشه استواء يليق بجلاله لا يعلم كيفيته إلا هو.
فإن قال السائل: كيف استوى على عرشه؟
قيل له؛ كما قال ربيعة ومالك وغيرهما: الاستواء معلوم، والكيف مجهول، والإيمان به واجب، والسؤال عن الكيفية بدعة.
وكذلك إذا قال: كيف ينزل ربنا؟
قيل له : كيف هو؟ فإذا قال: أنا لا أعلم كيفيته. قيل: ونحن لا نعلم كيفية نزوله إذ العلم بكيفية الصفة يستلزم العلم بكيفية الموصوف، وهو فرع له، فكيف تطالبني بكيفية استوائه على عرشة وتكليمه ونزوله وأنت لا تعلم كيفية ذاته؟ وإذا كنت تقر بأن له ذاتا حقيقة ثابتة في نفس الأمر مستوجبة لصفات الكمال لا يماثلها شيء، فاستواؤه ونزوله وكلامه ثابت في نفس الأمر، ولا يشابهه فيها استواء المخلوقين وكلامهم ونزولهم، فإن الله تعالى ليس كمثله شيء، لا في ذاته ولا في صفاته ولا في أفعاله.
"উদ্দেশ্য, কুরআন ও হাদীসের ভাষ্য সুস্পষ্টভাব ব্যক্ত করেছে, বরং মুতাওয়াতির তথা অসংখ্য বর্ণনাকারী সন্দেহাতীতভাবে বর্ণনা করেছে আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টির উপর এবং তিনি তাঁর আসমানসমূহের উপর তাঁর 'আরশের উপর উঠেছেন যেভাবে তার সম্মান ও মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় সেভাবে, সে উঠার ধরন তিনি ব্যতীত আর কেউ জানে না। তারপর যদি প্রশ্নকারী বলে, কীভাবে তিনি তাঁর 'আরশের উপর উঠলেন?
তাকে বলা হবে, যেমনটি রবী'আহ, মালিক ও অন্যান্যরা বলেছেন, ইস্তেওয়া শব্দের অর্থ জানা আছে, তার ধরন জানা নেই, এর ওপর ঈমান রাখা ফরয, এর ধরন সম্পর্কে প্রশ্ন করা বিদ'আত।
অনুরূপ যদি প্রশ্ন করে বলে, আমাদের রব কীভাবে অবতরণ করেন?
তখন বলা হবে, তিনি কেমন? তারপর যদি বলে, আমি তাঁর ধরন জানি না, তাহলে বলা হবে, আর আমরাও তাঁর অবতরণ করার ধরন জানি না; কারণ গুণাবলির ধরণ জানা নির্ভর করছে যার গুণ বর্ণনা করা হচ্ছে তার ধরন জানার ওপর, সেটা তো এর শাখা, তাহলে তুমি আমাকে কীভাবে আল্লাহর 'আরশের উপর উঠা, তাঁর কথা বলা, তাঁর নাযিল হওয়ার ধরন জানতে চাইতে পার অথচ তুমি তার সত্তার ধরনই জান না।
আর যদি তুমি এটা স্বীকৃতি দাও যে, তাঁর একটি প্রকৃত সত্তা রয়েছে, যার বাস্তবতা প্রমাণিত, যার এমন সব পূর্ণ গুণাবলি থাকা আবশ্যক যেগুলোর সাথে অন্য কারও কোনো মিল হবে না, তাহলে তাঁর 'আরশের উপর উঠা, নিকটতম আসমানে অবতরণ করা, কথা বলাও বাস্তবতার সাথে সাব্যস্ত হবে, সেখানেও তাঁর 'আরশের উপর উঠা, নিকটতম আসমানে অবতরণ করা, কথা বলা এ গুণাবলি সৃষ্টির কারও গুণের সাথে মিল করে সাব্যস্ত হবে না। কারণ, আল্লাহ তা'আলা এমন সত্তা, যার মত কোনো কিছু নেই, না তাঁর সত্তাতে, না তাঁর গুণাবলিতে আর না তার কার্যাবলিতে।”⁸
শাইখ হামাদ ইবন নাসের অন্যত্র বলেন,
وهذا كتاب الله من أوله إلى آخره، وهذه سنة رسول الله صلى الله عليه وسلم وهذا كلام الصحابة والتابعين وسائر الأئمة.
قد دل ذلك بما هو نص أو ظاهر في أن الله سبحانه فوق العرش مستو على عرشه ونحن نذكر من ذلك بعضه قال الله سبحانه وتعالى: ﴿الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى - وقال تعالى: اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ﴾ وقد أخبر سبحانه باستوائه على عرشه في سبعة مواضع من كتابه، فذكر في سورة الأعراف ويونس والرعد وطه والفرقان وتنزيل السجدة والحديد إلى غير ذلك من الآيات الدالة على علو الله سبحانه وتعالى كقوله: ﴿إِذْ قَالَ اللهُ يَا عِيسَى إِنِّي مُتَوَفِّيكَ وَرَافِعُكَ إِلَيَّ﴾ وقوله : ﴿بَلْ رَفَعَهُ اللهُ إِلَيْهِ﴾ وإخباره عن فرعون أنه قال: ﴿يَا هَامَانُ ابْنِ لِي صَرْحًا لَعَلِّي أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ أَسْبَابَ السَّمَاوَاتِ فَأَطَّلِعَ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَاذِبًا﴾ ففرعون كذب موسى في قوله: إن الله في السماء وقوله : ﴿تَنْزِيلٌ مِنْ حَكِيمٍ حَمِيدٍ﴾ إلى غير ذلك.
"আর আল্লাহর কিতাব প্রথম থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরামের বাণী, তাবেয়ীনের বক্তব্য এবং ইমামগণের প্রদর্শিত পথ তো এটিই।
সেগুলোর সুস্পষ্ট বক্তব্য অথবা প্রকাশ্য বক্তব্য এ সবই প্রমাণ করছে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর, 'আরশের উপর উঠেছেন, আমরা সেসবের কিছু প্রমাণ বর্ণনা করব। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন, "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন" [সূরা-ত্বা-হা, আয়াত: ০৫], আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন "তিনি আসমানসমূহ, যমীন ও এ দু'য়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেন; তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠলেন।" [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৫৮] এভাবে আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর উঠার বিষয়টি তাঁর কিতাবের সাত জায়গায় বর্ণনা করেছেন। তিনি সেটা বর্ণনা করেছেন সূরা আল-আ'রাফে, ইউনুসে, রা'দে, ত্বা-হায়, ফুরকানে, তানযীল আস-সাজদাহ ও অনুরূপ আরও আয়াতসমূহে, যা আল্লাহ তা'আলার জন্য উপর বা ঊর্ধ্বে থাকা প্রমাণ করছে। যেমন আল্লাহর বাণী "স্মরণ করুন, যখন আল্লাহ বললেন, 'হে 'ঈসা! নিশ্চয় আমি আপনাকে পরিগ্রহণ করব, আমার নিকট আপনাকে উঠিয়ে নিব।" [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৫৫] অপর বাণী "বরং আল্লাহ্ তাকে তাঁর নিকট তুলে নিয়েছেন।" [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৫৮] অনুরূপ আল্লাহ তা'আলা ফির'আউন সম্পর্কে জানিয়েছেন যে, সে বলেছিল, "হে হামান! আমার জন্য তুমি নির্মাণ কর এক সুউচ্চ প্রাসাদ যাতে আমি অবলম্বন পাই-আসমানে আরোহনের অবলম্বন, যেন দেখতে পাই মূসার ইলাহকে; আর নিশ্চয় আমি তাকে মিথ্যাবাদী মনে করি।" [সূরা গাফির, আয়াত: ৩৬-৩৭] এভাবে ফির'আউন মূসা 'আলাইহিস সালামের উপর মিথ্যারোপ করেছিল যখন তিনি তাকে জানিয়েছিলেন যে, আমার রব তো আসমানের উপরে। তদ্রূপ অন্য আয়াত “এটা প্রজ্ঞাময়, চিরপ্রশংসিতের কাছ থেকে নাযিলকৃত।” [সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৪২] (এখানে আয়াত নাযিল করার কথা বলা হয়েছে, আর নাযিল করার বিষয়টি উপর থেকেই হয়ে থাকে।) এ ছাড়াও আরও বহু প্রমাণ রয়েছে।”⁹
• অন্যত্র শাইখ হামাদ ইবন নাসের বলেন,
وقوله تعالى: ﴿ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ﴾ يتضمن إبطال قول المعطلة الذين يقولون ليس على العرش سوى العدم وأن الله ليس مستوياً على العرش ولا ترفع إليه الأيدي حيث أخبر سبحانه أنه على عرشه وأنه يعلم ما يلج في الأرض وما يخرج منها وما ينزل من السماء وما يعرج فيها - ثم قال - ﴿ وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ ﴾ معناه أنه لا يخفى عليه خافية بعلمه، وليس معنى قوله تعالى: ﴿وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ أنه مختلط بالخلق فإن هذا لا توجبه اللغة، وهو خلاف ما أجمع عليه سلف الأمة وأئمتها وخلاف ما فطر الله عليه الخلق. وهو سبحانه فوق العرش، رقيب على خلقه، مهيمن عليهم، مطلع عليهم، إلى غير ذلك من معاني ربوبية. وأخبر أنه ذو المعارج، تعرج الملائكة والروح إليه، وأنه القاهر فوق عباده، وأن ملائكته يخافون ربهم من فوقهم، فكل هذا الكلام الذي ذكره الله من أنه فوق عباده على عرشه، وأنه معنا حق على حقيقته لا يحتاج إلى تحريف، ولكن يصان عن الظنون الكاذبة، وهو سبحانه قد أخبر أنه قريب من خلقه، كقوله تعالى: ﴿وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ ) الآية من سورة البقرة (رقم ١٨٦) وقوله: ﴿وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنْسَانَ وَنَعْلَمُ مَا تُوَسْوِسُ بِهِ نَفْسُهُ وَنَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ ، سورة ق آية (١٦) وقال النبي صلى الله عليه وسلم «إن الذي تدعونه أقرب إلى أحدكم من عنق راحلته
আর আল্লাহর বাণী, "তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠলেন" এ বাণীটি 'মু'আত্ত্বিলা' তথা যারা আল্লাহর গুণাবলিকে অসার করে দেয়, তাদের কথাকে বাতিল করে দেয়, যারা বলে, 'আরশের উপর 'না' ব্যতীত কিছু নেই, আরও বলে, আল্লাহ 'আরশের উপর সমুন্নত নন, আরও বলে, আল্লাহর দিকে হাত তোলা যাবে না; এ আয়াতে তাদের কথার খণ্ডন করা হয়েছে; কারণ আয়াত আমাদেরকে জানাচ্ছে যে, তিনি তাঁর 'আরশের উপর, তিনি জানেন যা যমীনে প্রবেশ করে, যমীন থেকে যা উত্থিত হয়, যা আসমান থেকে অবতরণ করে আর যা আসমানে উঠে আসে। তারপর তিনি বলেছেন, "তিনি তোমাদের সাথে আছেন যেখানেই তোমরা থাক না কেন" এর অর্থ, কোনো গোপন তাঁর কাছে গোপন থাকে না, তাঁর জ্ঞানের মাধ্যমে সেরে তিনি জানেন। এখানে "তিনি তোমাদের সাথে আছেন যেখানেই তোমরা থাক না কেন" এর অর্থ এটা নয় যে, তিনি সৃষ্টির সাথে মিশে আছেন; কারণ ভাষা তা বুঝতে বাধ্য করে না, আর তা উম্মতের সালাফ ও ইমামগণের ঐকমত্যের বুঝের বিপরীত, আর তা বিশুদ্ধ স্বাভাবিক প্রকৃতি বিরুদ্ধ কথাও। বস্তুত মহান আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপর, তাঁর সৃষ্টির উপর তীক্ষ্ম দৃষ্টিদাতা, তাদের সংরক্ষক, তাদের সবকিছু অবলোকন করছেন ইত্যাদি রবুবিয়াতের গুণে গুণান্বিত। তিনি (আল্লাহ) আমাদের জানিয়েছেন যে, তিনি "যুল মা'আরিজ” উপরওয়ালা, জিবরীল ও ফিরিশতাগণ তাঁর দিকেই উঠে যায়, তিনি তাঁর বান্দাদের ওপর দাপুটে সত্তা, তাঁর ফিরিশতারা তাদের রবকে তাদের উপর থেকে ভয় করেন। এসব কথায় আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেছেন যে, তিনি তাঁর বান্দাদের উপর, 'আরশের উপরে, আর তিনি আমাদের সাথে আছেন এসবই সত্য ও বাস্তব অর্থে, এগুলোতে কোনো বিকৃতি সাধন করার প্রয়োজন পড়ে না। তবে মিথ্যা ধারণা থেকে হিফাযত করতে হবে। (সে মিথ্যা ধারণা হচ্ছে, উপমা প্রদান বা ধরন নির্ধারণ অথবা অর্থশূন্য করণ) আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা জানিয়েছেন যে, তিনি তাঁর বান্দাদের নিকটে। যেমন তিনি বলেছেন, "আর আমার বান্দাগণ যখন আমার সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করে, (তখন বলে দিন যে) নিশ্চয় আমি অতি নিকটে।” [সূরা আল- বাক্বারাহ, আয়াত: ১৮৬] অনুরূপ অপর বাণী, "আর অবশ্যই আমরা মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয় তাও আমরা জানি। আর আমরা তার গ্রীবাস্থিত ধমনীর চেয়েও নিকটতর।” [সূরা ক্বাফ, আয়াত: ১৬] আর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "তোমরা যাকে ডাকছ তিনি তোমাদের কারও বাহনের ঘাড় থেকে বেশি নিকটে”। (এসবই হয় সাধারণভাবে জ্ঞান, ক্ষমতায় প্রতিদান প্রদানে নিকটে, নতুবা বিশেষ অর্থে সাড়া দানে নিকটে এ অর্থসমূহে নির্ধারিত হবে; যা বাক্যের আগ-পিছ থেকে জানা যায়)”¹⁰
অনুরূপ শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ ইবন আবদুল ওয়াহহাব রাহimاهুল্লাহ'র ছাত্ররাও যে একই আকীদাহ পোষণ করতেন তার আরও প্রমাণ পাই আমরা শাইখুল ইসলামের ছাত্র হামাদ ইবন আতীক কতৃক শাইখ সিদ্দিক হাসান খান আল-কিন্নাওজী এর কাছে লিখিত পত্রের মাধ্যমে, যেখানে তিনি 'ইস্তেওয়া' শব্দের অর্থ না জানাকে সালাফে সালেহীনের মাযহাব হওয়ার প্রতিবাদ করে বলেন,
ومن ذلك أنكم قلتم في سورة يونس أيضًا استوى على العرش استواء يليق بجلاله وهذه طريقة السلف المفوضين وقد تقدس الديان عن المكان والمعبود عن الحدود انتهى. فإن كان المراد بالتفويض ما يقوله بعض النفاة وينسبونه إلى السلف. وهو أنهم يمرون الألفاظ ويؤمنون بها من غير أن يعتقدوا لها معاني تليق بالله أو أنهم لا يعرفون معانيها فهذا أكذب على السلف من النفاة وإذا قال السلف كما جاءت بلا كيف فإنما ينفون علم الكيفية ولم ينفوا حقيقة الصفة.
ولو كانوا قد آمنوا باللفظ المجرد من غير فهم المعناه على ما يليق بالله لما قالوا الاستواء غير مجهول والكيف غير معقول وأمروها كما جاءت بلا كيف فالاستواء لا يكون حينئذ معلوما بل مجهولا بمنزلة حروف الجر. وأيضًا فإنه لا يحتاج إلى نفي علم الكيفية إذا لم يفهم من اللفظ معنى. وإنما يحتاج إلى نفي علم الكيفية إذا ثبتت الصفات. هذا كلام شيخ الإسلام ابن تيمية رحمه الله تعالى ولا نشك أن هذا اعتقادك ولكن المراد أنه دخل عليك بعض الألفاظ من كلام أهل البدع لم تتصور مرادهم فتنبه لمثل ذلك. وهو أنهم يمرون الألفاظ ويؤمنون بها من غير أن يعتقدوا لها معاني تليق بالله أو أنهم لا يعرفون معانيها فهذا أكذب على السلف من النفاة وإذا قال السلف كما جاءت بلا كيف فإنما ينفون علم الكيفية ولم ينفوا حقيقة الصفة.
ولو كانوا قد آمنوا باللفظ المجرد من غير فهم لمعناه على ما يليق بالله لما قالوا الاستواء غير مجهول والكيف غير معقول وأمروها كما جاءت بلا كيف فالاستواء لا يكون حينئذ معلوما بل مجهولا بمنزلة حروف الجر. وأيضًا فإنه لا يحتاج إلى نفي علم الكيفية إذا لم يفهم من اللفظ معنى. وإنما يحتاج إلى نفي علم الكيفية إذا ثبتت الصفات. هذا كلام شيخ الإسلام ابن تيمية رحمه الله تعالى ولا نشك أن هذا اعتقادك ولكن المراد أنه دخل عليك بعض الألفاظ من كلام أهل البدع لم تتصور مرادهم فتنبه لمثل ذلك|
"তন্মধ্যে (আপনার তাফসীরের সমস্যাসমূহের একটি হচ্ছে) আপনি সূরা ইউনুসের তাফসীরে বলেছেন, "ইস্তাওয়া 'আলাল 'আরশে” এমন 'ইস্তেওয়া' যা তাঁর সম্মান ও মর্যাদার জন্য উপযোগী। মহা বিচারকের কোনো স্থান নেই, মা'বুদের কোনো সীমা নেই।” বস্তুত আপনার এ কথা 'মুফাওয়িদ্বাহ' বা অর্থশূন্যকারীদের পদ্ধতি। 'মুফাওয়িদ্বা' সম্প্রদায় আল্লাহর গুণ সম্বলিত শব্দসমূহ পার হয়ে চলে যায়, সেগুলোর শব্দের ওপর ঈমান আনে, সেগুলোকে আল্লাহর সাথে উপযুক্ত করে কোনো অর্থ করা হবে তা বিশ্বাস করে না অথবা তারা সেগুলোর অর্থ জানে না। বস্তুত এদের এ কাজ যারা আল্লাহর গুণ অস্বীকার করতো তাদের থেকেও সালাফে সালেহীনের নামে বড় মিথ্যাচার। কারণ সালাফে সালেহীন যখন বলতেন, এগুলো পার করে দাও যেভাবে এসেছে সেভাবে ধরণ নির্ধারণ ব্যতীতই, তখন তারা শুধু ধরন বিদ্যাকে অস্বীকার করেন, তারা কখনো এ গুণাবলির প্রকৃত অর্থকে অস্বীকার করেননি।
যদি তারা এগুলো থেকে আল্লাহর জন্য উপযোগী অর্থ না বুঝে কেবল শব্দের ওপর ঈমান আনাই উদ্দেশ্য মনে করতেন তাহলে তারা কখনও বলতেন না, "*"ইস্তেওয়া' অজানা বিষয় নয়, ধরণ বিবেকের যুক্তি প্রসূত নয়, আর এগুলোকে চালিয়ে নাও যেভাবে এসেছে সেভাবে, কোনো প্রকার ধরণ নির্ধারণ ব্যতীতই"*। কারণ, (যদি এর অর্থ না জানা যেতো তবে) 'ইস্তেওয়া' তখন জানা বিষয় হতে পারতো না, বরং অজানা বিষয়ই হতো, হয়ে যেতো 'হরফে জার' এর মতো। অনুরূপ যদি সেটা 'ইস্তেওয়া' এর অর্থ না জানা হতো, তাহলে ধরন বিদ্যাকে নিষেধ করার কোনো প্রয়োজন হতো না; কেননা যখন শব্দ থেকেই কোনো অর্থ বুঝা যাবে না তখন ধরন জানা না যাওয়ার কথা বলা বাতুলতা মাত্র। বস্তুত তখনই ধরণ জানার বিষয়টি আসবে যখন গুণাবলিকে অর্থসহ সাব্যস্ত করা হবে। এ হচ্ছে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহimاهুল্লাহ'র কথা, আর আমার কোনো সন্দেহ নেই যে, এটা আপনারও বিশ্বাস, এখানে বলা উদ্দেশ্য হচ্ছে, আপনার কথার মধ্যে বিদ'আতপন্থীদের কিছু কথা ঢুকে গেছে আপনি হয়তো তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে চিন্তা করতে পারেননি। সুতরাং আপনি এ ধরনের বিষয়গুলোর ব্যাপারে সাবধান থাকবেন।”¹¹
টিকাঃ
১. মাজমূ' মুওয়াল্লাফাতিশ শাইখ (৫/৮)।
২. আলে আবদুল লতীফ, দা'আওয়াল মুনাওয়েয়ীন লি দা'ওয়াতিশ শাইখ, পৃ. ১১৭।
৩. আদ-দুরারুস সানিয়্যাহ ফিল আজওয়িবাতিন নাজদিয়্যাহ (৩/১৮৫)।
৪. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৫৪।
৫. সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম।
৬. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৮৫০।
৭. আদ-দুরারুস سانيय्यাহ ফিল আজওয়িবাতিন নাজদিয়্যাহ (৩/১৮৫)।
৮. আত-তুহফাতুল মাদানিয়्यাহ, ৪৮।
৯. আদ-দুরারুস সানিয়্যাহ ফিল আজওয়িবাতিন নাজদিয়्यাহ (৩/২১০)।
১০. আদ-দুরারুস সানিয়्यাহ (৩/২২১)।
১১. কাতফুস সামার ফী বায়ানি আক্বীদাতি আহলিল আসার এর ভূমিকা, পৃ. ১৬-১৭।
📄 শাইখ সালামুল্লাহ ইবন ফখরদ্দীন আদ-দেহলাভী (১২২৩ হিজরী)
শাইخ সালামুল্লাহ ইবন শাইখ ফাখরুদ্দীন আদ-দেহলাওয়ী রাহimাহুল্লাহ, যিনি সংক্ষিপ্ত অথচ অনবদ্য তাফসীর গ্রন্থ জালালাইনের টীকাগ্রন্থ 'আল-কামালাইন তাকমিলাতুল জালালাইন' লিখেছেন, তিনি সূরা আল-আ'রাফের আয়াতে "সুম্মাসতাওয়া 'আলাল 'আরش” (তারপর তিনি আল্লাহ 'আরশের উপর উঠেছেন) এর বর্ণনায় বলেন,
«عن أم سلمة، والإمام جعفر الصادق، والحسن، وأبي حنيفة ومالك: الاستواء معلوم، والكيف مجهول، والإيمان به واجب، والسؤال عنه بدعة».
"উম্মে সালামাহ, ইমাম জা'ফার আস-সাদেক, হাসান বসরী, আবু হানীফা, মালিক থেকে বর্ণিত হয়েছে, ইস্তেওয়া এর অর্থ জানা আছে, ধরন বিবেকের যুক্তিতে জানা যায় না, তার ওপর ঈমান আনা ওয়াজিব আর তার ধরন সম্পর্কে প্রশ্ন করা বিদ'আত।”¹ উল্লেখ্য যে, এটি একটি প্রশ্নের জবাবে ছিল, যেখানে প্রশ্নকারী 'ইস্তেওয়া' বা 'আরশের উপরে উঠার ধরন জানতে চেয়েছেন, অর্থ জানতে চাননি। তাই ধরন জানার ব্যাপারে প্রশ্ন করাকে বিদ'আত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। অর্থ জানতে চাওয়া কোনো অপরাধ নয়; কারণ আরবী ভাষাতে এ শব্দটি কোনো অস্পষ্ট শব্দ নয়। ভাষাবিদরা সবাই এর অর্থ জানে, যেমন তারা জানে 'নুযূল' (বা অবতরণ) এর অর্থ। 'ইয়াদ' (তথা হাত) এর অর্থ, 'দ্বিহক' (হাঁসা') এর অর্থ।
তারপর শাইখ সালামুল্লাহ রাহimাহুল্লাহ বলেন,
وروى البيهقي عن أبي حنيفة : إن الله في السماء دون الأرض، وعنه قال: من أنكر أن الله في السماء فقد كفر.
وقال الشافعي : إن الله على عرشه في سمائه، يقرب من خلقه كيف يشاء، وينزل كيف يشاء.
ومثل ذلك قال أحمد.
وقال إسحاق: إنه قد أجمع أهل العلم أنه فوق العرش استوى ويعلم كل شيء.
وهو قول المزني والبخاري، وأبو داود والترمذي وابن ماجة، وأبو يعلى، والبيهقي وغيرهم من أئمة الحديث.
وقال أبو نعيم في الحلية طريقتنا طريق السلف المتبعين للكتاب والسنة وإجماع الأمة، ومما اعتقدوه أن الله لم يزل كاملاً بجميع صفاته... إلى أن قال: وأن الأحاديث التي أثبتت كونه في العرش واستواء الله عليه يقولون بها، ويثبتونها من غير تكييف، ولا تمثيل، وأنه بائن من خلقه والخلق بائنون منه، لا يحل فيهم ولا يمتزج بهم، وهو مستو على عرشه في سمائه دون أرضه|
"আর বাইহাক্বী আবু হানীফা রাহimاهুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, 'নিশ্চয় আল্লাহ আসমানের উপর, যমীনে নন।' আবু হানীফা রাহimاهুল্লাহ থেকে আরও বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, যে কেউ আল্লাহর উপরে থাকাকে অস্বীকার করবে সে কাফির হয়ে যাবে। আর শাফে'য়ী বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপরে, তাঁর আসমানের উপরে, যেভাবে তিনি ইচ্ছা করেন সেভাবে তাঁর সৃষ্টির নিকটবর্তী হন, যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে অবতরণ করেন।” অনুরূপ বক্তব্য আহমাদও বলেছেন।
ইসহাক্ক ইবন রাহওয়াইহ বলেন, আলেমগণ একমত যে, আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপর উঠেছেন, আর তিনি সবকিছু জানেন। এ বক্তব্য ইমাম মুযানী, বুখারী, আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবন মাজাহ, আবু ইয়া'লা, বাইহাক্বী প্রমুখ হাদীসের ইমামগণের।
আর হিলইয়া গ্রন্থের লেখক আবু নু'আইم বলেন, আমাদের তরীকা হচ্ছে সালাফে সালেহীন যারা কুরআন, সুন্নাহ এবং ইজমায়ে উম্মাত এর ত্বরীকা। তারা যেসব আকীদাহ পোষণ করতো তা হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর সকল গুণ নিয়ে সর্বদা রয়েছেন... (অবশেষে বলেন), আর যেসব হাদীস দিয়ে আল্লাহ তা'আলাকে 'আরশের উপর সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং তাঁকে 'আরশের উপর উঠার কথা এসেছে, তারাও সেটা বলতেন, আর তারা সেটা সাব্যস্ত করে কোনো প্রকার ধরণ এবং উপমা প্রদান ব্যতীত। আর তিনি তাঁর সৃষ্টি থেকে আলাদা, তারাও তাঁর থেকে আলাদা।² [(তিনি তাদের ভেতরে প্রবেশ করেন না, তাদের মধ্যে মিশে যান না। তিনি তাঁর 'আরশের উপরে আসমানের উপরে, তাঁর যমীনের উপর নন।) এটুকু হিলইয়া গ্রন্থে অতিরিক্ত আছে যা গ্রন্থকার আনেননি। এর মাধ্যমে পূর্বের উক্তিসমূহের উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়]
টিকাঃ
১. কামালাইন শারহু জালালাইন, পৃ. ১৩২; সিদ্দিক হাসান খান ভূপালী, আল-ইস্তিক্বাদুর রাজীহ, পৃ. ৮৮-৮৯।
২. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩২।
📄 শাহ ইসমা‘ঈল ইবন আবদুল গনী ইবন ওয়ালীউল্লাহ আদ-দেহলাভী (১২৪৬ হিজরী)
শাহ ইসমা'ঈল ইবন আবদুল গনী ইবন ওয়ালিউল্লাহ আদ-দেহলাওয়ী রাহimাহুল্লাহ সহীহ আকীদাহ'র একজন মুজাহিদ ছিলেন। যিনি একাধারে কলম, মুখ ও হাত সবকিছু দিয়ে জিহাদ করেছেন আর এ পথেই ইনশাআল্লাহ শহীদ হিসেবে দুনিয়া থেকে চলে গিয়েছেন। তার জীবনের অধিকাংশ জিহাদ ইংরেজদের বিরুদ্ধে, উপমহাদেশের মানুষের শির্ক ও বিদ'আতের বিরুদ্ধে। তবে আল্লাহর নাম ও গুণের ক্ষেত্রেও তিনি অবদান রেখেছেন। নিম্নে আমরা অনুরূপ কয়েকটি ভাষ্য বর্ণনা করব। তিনি তাঁর 'তাযকীরুল ইখওয়ান' গ্রন্থে বলেন,
والمراد بالإيمان بالله أن يعتقد اعتقاداً جازماً بأن الله هو الخالق المالك الذي يقضي حوائجه، ويكشف غمومه ويرزقه، ويعتقد فيه جميع المحامد والمحاسن، وجميع أوصاف الكمال وينزهه من جميع العيوب ويتوجه إليه في كل حال، ويشكره في العسر واليسر .
"আল্লাহর ওপর ঈমানের উদ্দেশ্য, দৃঢ়ভাবে এ বিশ্বাস রাখা যে, আল্লাহ তা'আলা তিনিই স্রষ্টা, মালিক, যিনি তার প্রয়োজন পূরণ করেন, বিপদ থেকে উদ্ধার করেন, রিযিক দেন। আর এ বিশ্বাস করা যে, সে সত্তার জন্যই যাবতীয় হামদ ও যাবতীয় উত্তম সৌন্দর্য, যাবতীয় পূর্ণ গুণাবলি, তাঁকে যাবতীয় দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত ঘোষণা করা, তাঁর কাছেই সর্বাবস্থায় ধর্ণা দেয়া, কষ্ট ও আনন্দ সর্বাবস্থায় তাঁর শুকর করা।"¹ তিনি রাদ্দুল ইশরাক গ্রন্থে বলেন,
ومعنى الألوهية: أن يعتقد في حقه أنه بلغ في الاتصاف بصفات الكمال من العلم المحيط أو التصرف بمجرد القهر والإرادة مبلغاً جل عن المماثلة والمجانسة مع سائر المخلوقين».
"আর 'উলুহিয়াত' বা মা'বুদ বলা অর্থ হচ্ছে, যাকে ইলাহ মানছে তার ব্যাপারে এ বিশ্বাস করা যে, তিনি সর্বব্যাপী জ্ঞান অথবা ইচ্ছা ও দাপটে শক্তিতে গুণান্বিত হওয়ার মাধ্যমে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, সকল সৃষ্টিকুলের মাঝে তাঁর কোনো উপমা কিংবা সমপর্যায়ের হওয়া থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে।”² অন্যত্র তিনি বলেন,
وإعمال العقل في آيات الصفات لا يجوز كإعماله في مفهوم آية الرحمن على العرش استوى) [طه: ٥] فإني أعتقد أن لا يتدخل فيه العقل، وهذا أمر مشهور ومسلم بأن أئمة السلف كانوا يعتقدون هذا المعتقد، الاستواء معلوم والكيف مجهول، وهذا هو الثابت في باب الاستواء، وإني أتذكر الآن بأن المتأخرين أولوها في شرح عقائد نسفي .....
"আর আল্লাহর গুণাবলির ব্যাপারে বিবেকের যুক্তি খাটানো জায়েয নেই, যেমনটি জায়েয নেই "আর-রহমান 'আলাল 'আরশ ইস্তাওয়া”, রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন, [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫]; কারণ আমি বিশ্বাস করি এতে বিবেকের যুক্তি খাটানো যাবে না। আর এটি বিখ্যাত ও স্বীকৃত নিয়ম যে, সালাফগণ এ বিশ্বাসই পোষণ করতেন, ইস্তেওয়া এর অর্থ জানা, ধরন অজানা। আর এটাই 'ইস্তেওয়া' এর অধ্যায়ে সাব্যস্ত নীতি। আমার মনে পড়ে পরবর্তীরা 'শারহে আকায়েদে নাসাফী' তে এগুলোতে অপব্যাখ্যা করেছে"।³ এখানে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ইস্তেওয়া এর ধরণ নির্ধারণে বিবেকের যুক্তি খাটানো জায়েয নেই। তারপর তিনি সহীহ আকীদাহ-বিশ্বাসের প্রতিনিধিত্বকারী ইমাম মালিকের সেই ঐতিহাসিক উক্তিটি নিয়ে আসেন। অন্যত্র তিনি বলেন,
فجميع الأنبياء والأولياء إذا قيسوا بعظمة الله وجبروته، كانوا أقل من ذرة، وإن العرش الذي أحاط بالسماوات والأرضين كالقبة، لينط به أطيط الرحل بالراكب، فليس في طاقة مخلوق أن يشرح عظمته أو أن يتخيلها، فمن يجرؤ على أن يتدخل في مملكته، وينفذ فيها أمره، إنه يفعل ما يشاء ويحكم ما يريد، ولا يحتاج في ذلك إلى وزير أو مشير، يصرف أمورا لا يأتي عليها الإحصاء، ولا يبلغها الاستقصاء، في أقل من طرفة عين، فكيف يشفع عند غيره، ومن الذي يستبد بالأمور دونه ؟ .
يا للعجب إن محمدا صلى الله عليه وسلم الذي شرفه الله على جميع خلقه لا يكاد يسمع من أعرابي جلف كلمة تدل على جهله بالله، وقصور عقله، أن يملأه الخوف أو المهابة، فيفيض في بيان عظمة الله التي ملأت العالم من العرش إلى الفرش، وما بال أقوام طالت ألسنتهم، وحملهم الطيش والجرأة، فتشدقوا بكلام تكاد السماوات يتفطرن منه، وتنشق الأرض، وتخر الجبال هدا، وبدأوا يتكلمون عن الله جلت عظمته، كأن بينه وبينهم دالة أو قرابة، فقال بعضهم: إني اشتريت ربي بدانق، ومنهم من يقول: أنا أكبر من ربي بسنتين، ويقول الثالث: إذا تجلى ربي في صورة غير صورة شيخي، لم أرفع إليه بصري».
"আর সকল নবী-রাসূল, সকল ওলীগণ, যদি তাদেরকে আল্লাহর বড়ত্ব ও ক্ষমতার দিক থেকে কিয়াস করা হয় তবে তারা সবাই একটি সরিষা দানার চেয়ে ছোট বিবেচিত হবেন, আর তাঁর 'আরশ, যা আসমান ও যমীনকে পরিবেষ্টন করে আছে সেগুলোর উপরে গম্বুজের মতো হয়ে, তাকে নিয়ে এমন ভার জনিত শব্দ করে যা সাওয়ারী নিয়ে কোনো বাহন করে থাকে। তাহলে একজন সৃষ্টি কীভাবে তাঁর বড়ত্ব ব্যাখ্যা করতে পারে বা ধারণ করতে পারে? কে এমন আছে যে তাঁর রাজত্বে অনুপ্রবেশ করার দুঃসাহস দেখাতে পারে বা কে এমন আছে যে সে রাজত্বে তার নির্দেশ চালু করতে পারে? তিনিই তো কেবল যা ইচ্ছা করতে পারেন, যা ইরাদা করেন তা নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। তাঁর কোনো মন্ত্রী কিংবা পরামর্শদাতার প্রয়োজন পড়ে না। ক্ষণিকের মাঝে এত বেশি বিষয় তিনি পরিচালনা করেন যার ওপর কোনো পরিসংখ্যান অনুষ্ঠিত হয়নি, যা হিসেব করে শেষ করা যাবে না। তাহলে সে সত্তা কীভাবে অন্যের কাছে সুপারিশ করবে? আর তিনি ব্যতীত এমন কে আছে যে সকল কাজ যেভাবে ইচ্ছা করতে পারে?
আশ্চর্যের বিষয়, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আল্লাহ যাকে সকল সৃষ্টির উপর মর্যাদাবান করেছেন, বেদুঈন থেকে একটি বাক্য, যে বাক্যে বুঝা গিয়েছিল যে, সে আল্লাহ সম্পর্কে না জেনে-বুঝেই তা বলেছে, উক্ত বাক্য শোনা মাত্রই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তর আল্লাহর ভয়ে পূর্ণ হয়ে গেল, তখন তিনি আল্লাহর বড়ত্ব প্রকাশক বর্ণনা দিলেন, যিনি জানিয়ে দিলেন, তাঁর বড়ত্ব 'আরশ থেকে ফরাস পর্যন্ত সবকিছু থেকে বেশি, তাহলে কিছু মানুষের কী হলো যে, তারা তাদের জিহ্বা লম্বা করে আজেবাজে কথা বলে, তারা পাগলামীপূর্ণ বাক্য ও দুঃসাহস দেখিয়ে কথা বলছে, এর মাধ্যমে তারা এমনসব কথা বিনা বাধায় অনর্গল বলে চলেছে যার কারণে আসমান ফেটে পড়ার উপক্রম হয়, যমীন ফেটে চৌছির হয়ে যেতে চায়, পাহাড়সমূহ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়ার মতো হয়ে যায়, তারা মহান আল্লাহর ব্যাপারে এমনসব কথা বলে যাতে মনে হচ্ছে যেন আল্লাহর সাথে তাদের দুলালীপনা চলে অথবা আল্লাহর সাথে তাদের আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। তাদের কেউ কেউ বলে, আমি আমার রবকে এক পয়সার বিনিময়ে কিনে নিয়েছি, তাদের অপর কেউ বলে, আমি আমার রবের চেয়ে দু' বছরের বড়, তাদের তৃতীয়জন বলে, যদি আমার রব আমার পীর সাহেবের সূরত ছাড়া অন্য কোনো সূরতে প্রকাশ পায় তাহলে তার দিকে আমি চোখ তুলে তাকাবো না।"⁴... আল্লাহর কাছে তাঁর সাথে আদব ও শিষ্টাচার রক্ষার তাওফীক চাই; কারণ বেআদব আল্লাহর দয়া থেকে বঞ্চিত হয়।
অন্যত্র শাহ ইসমাঈল শহীদ রাহimاهুল্লাহ আল্লাহ তা'আলার সকল গুণাবলি সাব্যস্ত করে বলেন,
والعجب أن أرباب الشرائع صلوات الله عليهم لم ينصبوا قرينة على صرف الكلام عن الظاهر، ولم يذكروا مدة عمرهم قط من أن الرب تبارك وتعالى منزه عما نسند إليه، كيف ولم يثبت حديث صحيح ولا ضعيف يطابق ما يدعيه هؤلاء من نفي أمثال تلك الأحكام عنه، فكأنهم ينسبون الإضلال إلى أرباب الشرائع، نعوذ بالله، بل ينجر هذا إلى الاعتراض عليه تبارك وتعالى بأنه اختار لهداية الناس رجالاً لم يكشفوا لهم قط عما هو العمدة من أبواب الهداية، وهو الإلهيات، بل علموهم ما لا يطابق الواقع أصلاً ، سبحانك هذا بهتان عظيم، فأولئك قد خلعوا ربقة الشريعة من عنقهم فليسوا من أهل السنة في شيء، وإن يسم بعضهم نفسه به، بل أهل السنة في الحقيقة هم الصحابة وأتباعهم، فلسنا ننكص على أعقابنا بعد إذ سمعنا أن الرحمن على العرش استوى، وأنه ينزل كل ليلة إلى السماء الدنيا»، وأنه يحول بين المرء وقلبه، وأنه نادى من جانب الطور الأيمن من البقعة المباركة من الشجرة أن يا موسى، وأنه تجلى على الجبل فجعله دكا، وأنه رآه محمد صلى الله عليه وسلم فوضع يده بين كتفيه حتى وجد برد أنامله بين ثدييه وقال يا محمد فيم يختصم الملأ الأعلى؟ وأن العرش ينط به أطيط الرحل بالراكب»، وأنه «يضحك» و«يتبشبش» و «يحب» و «يعادي» و «يرضى» و«يسخط» و يتردد في قبض نفس عبده المؤمن، وأنه بين العبد وبين قبلته في الصلاة وأنه إذا حفظه عبده وجده تجاهه، وأن العبد لا يزال يتقرب إليه بالنوافل حتى يصير سمعه وبصره ويده ورجله وأنه سيتجلى غداً في المحشر ويكلم العبد ليس بينه وبينه ترجمان» وأنه سيظهر في صورة لا يعرفه المؤمنون بها ثم في أخرى يعرفونها، وأنه سيرونه عياناً رؤية القمر ليلة البدر .... وسيطلع عليهم في الجنة من فوق، فيقول: السلام عليكم وأمثال ذلك كثيرة لا تعد ولا تحصى، ربنا آمنا بما أنزلت واتبعنا الرسول فاكتبنا مع الشاهدين. وما ادعاه أولئك من سلب أمثال هذه الأحكام عنه فليس لهم عليه حجة إلا ما هو أوهن من نسج العنكبوت.
আশ্চর্যের বিষয়, শরী'আত প্রচারক নবী রাসূলগণ কখনও আল্লাহর বাণীকে প্রকাশ্য অর্থ থেকে ভিন্ন অর্থে পরিচালিত করার সামান্যতম প্রমাণও প্রতিষ্ঠা করেননি। তাদের সারা জীবনে কখনো বলেননি যে, মহান রবের দিকে আমরা যা সম্পর্কিত করছি তা থেকে তিনি পবিত্র। তাছাড়া এসব ভাষ্যের তা'ওয়ীলকারী তথা অপব্যাখ্যাকারীরা যেসব অপব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়ে এসব গুণাবলির বিধান আল্লাহ থেকে অস্বীকার করেছে সেসব দাবীর পক্ষে কোনো সহীহ হাদীস কিংবা কোনো দুর্বল হাদীস দিয়েও তারা প্রমাণ করতে পারেনি। বস্তুত এভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বাণীর অপব্যাখ্যা করার মাধ্যমে তারা শরী'আত প্রচারক নবী-রাসূলগণের দিকে পথভ্রষ্ট করার দোষ চাপাচ্ছে, 'আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই' বরং এদের এসব কর্মকাণ্ড মহান আল্লাহ তাবারকা ওয়া তা'আলার ওপর অভিযোগ-আপত্তি তোলারই নামান্তর; কারণ তাদের এসব কর্মকাণ্ডের অর্থ হচ্ছে তারা যেন বলতে চাচ্ছে আল্লাহর যেসব লোকদেরকে হিদায়াতের জন্য পছন্দ করে নিয়েছেন হিদায়াতের অধ্যায়সমূহের এ অধ্যায়, অর্থাৎ ইলাহিয়াত বা আল্লাহর সংক্রান্ত আকীদাহ কী হবে, যা শরীআতের প্রধান স্তম্ভরূপে বিবেচিত, তাতে তারা হক কথা প্রকাশ করেননি, বরং তাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন এমন কিছু যা বাস্তবের সাথে কোনো মিল নেই। 'আল্লাহ তোমার পবিত্রতা ঘোষণা করছি, এ তো প্রকাশ্য অপবাদ'। বরং এসব লোকেরা শরী'আতের বাঁধন তাদের ঘাঁড় থেকে খুলে ফেলেছে, তারা কোনো কিছুতেই আহলুস সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত নয়, যদিও তাদের কেউ কেউ নিজেদেরকে এ নামে ভূষিত করে থাকে। বরং সত্যিকারের আহলুস সুন্নাত হচ্ছে, সাহাবায়ে কেরাম ও তাদের সুন্দর অনুসারীগণ। সুতরাং আমরা কখনো আমাদের পিছনের দিকে প্রত্যাবর্তন করবো না, যখন আমরা শুনব,
১- রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন।
২- তিনি প্রতি রাতে নিকটতম আসমানে নেমে আসেন।
৩- তিনি বান্দা ও অন্তরের মাঝে বাধা হয়ে যান।
৪- তিনি মূসাকে ডেকেছেন ডান দিকের পাহাড় থেকে পবিত্র ভূমি থেকে, গাছ থেকে, হে মূসা!
৫- তিনি পাহাড়ের উপর তাজাল্লী বা নিজের আলো ফেলেছেন, তাতে পাহাড়কে তিনি চূর্ণ করে দিয়েছেন।
৬- তিনি এমন সত্তা, যাকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বপ্নে দেখেছেন, আল্লাহ তাঁর হাত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের দু' কাধের মাঝখানে রেখেছেন এমনকি তিনি তার দু' স্তনের মাঝখানে আল্লাহর আঙ্গুলসমূহের ঠাণ্ডার পরশ পেয়েছেন এবং বলেছেন, হে মুহাম্মাদ উপরস্থ সভাষদের লোকেরা কী নিয়ে বাক-বিতণ্ডা করছে?
৭- তাঁর 'আরশ ভারজনিত শব্দ করে, যেমন কোনো বাহন তার বাহককে নিয়ে ভারজনিত শব্দ করে।
৮- তিনি হাসেন।
৯- তিনি খুঁশিতে পূর্ণ হয়ে যান।
১০-তিনি ভালোবাসেন।
১১- তিনি শত্রুতা করেন (তাঁর শত্রুদের সাথে)।
১২-তিনি সন্তুষ্ট হোন।
১৩-তিনি ক্রোধান্বিত হন।
১৪- তিনি তাঁর ঈমানদার বান্দার জান কবজ করতে দ্বিধা করেন।
১৫-তিনি বান্দা ও তার কিবলার মাঝে সালাতের সময় থাকেন।
১৬-তিনি এমন এক সত্তা, যার (তাওহীদের) হিফাযত করলে, বান্দা তাঁকে তার কাছে পায়।
১৭- বান্দা নফল আমল দিয়ে তাঁর নৈকট্য অর্জন করতে করতে এমন হয় যে, তিনি তাঁর শোনা, দেখা, হাত, পা হয়ে যান। (সুতরাং বান্দা তখন এসব অঙ্গকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ব্যতীত পরিচালনা করে না।)
১৮-তিনি সে আগামী দিন হাশরের মাঠে নিজেকে প্রকাশ করবেন।
১৯-তিনি বান্দার সাথে কথা বলবেন, তাঁর ও বান্দার মাঝে কোনো অনুবাদক থাকবে না।
২০-তিনি হাশরের মাঠে ঈমানদারদের সামনে এমন সূরতে আসবেন যে সূরতে ঈমানদাররা তাঁকে চিনবে না, তারপর আবার এমন সূরতে আসবেন যে সূরতে তারা তাঁকে চিনবে।
২১- আর জান্নাতীরা রাব্বুল আলামীনকে চাক্ষুষ এমনভাবে দেখবে যেমন চাঁদকে পূর্ণিমার রাতে দেখা যায়।
২২-তিনি তাদের জন্য জান্নাতের উপর থেকে নিজেকে দেখাবেন এবং বলবেন, আসসালামু 'আলাইকুম।
অনুরূপ আরও বহু বর্ণনা, যা অগণিত, অসংখ্য। হে রব, আপনি যা নাযিল করেছেন তার ওপর ঈমান আনলাম। সুতরাং আমাদেরকে আপনি সাক্ষী হিসেবে লিখে নিন। এর বিপরীতে তারা (ঐসব অপব্যাখ্যাকারীরা) কুরআন ও হাদীসের এসব ভাষ্যের বিধানকে নিষেধ করছে তাদের মতের সপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই, যদি কিছু তারা বলেও থাকে তবে তা মাকড়শার জালের চেয়েও বেশি দুর্বল।”⁵
টিকাঃ
১. তাযকীরুল ইখওয়ান, পৃ. ৭৫।
২. রাদ্দুল ইশরাক, পৃ. ১৬।
৩. আব্দুস সালাম গাউস, জুহুদুশ শাহ ইসমা'ঈল আদ-দেহলাওয়ী ফিল আকীদাহ, পৃ. ২৭৩।
৪. তাক্বওয়িয়াতুল ঈমান, পৃ. ১৬১।
৫. 'আবাক্বাত: ৯০-৯১।
📄 আল্লামা মুহাম্মাদ ইবন আলী আশ-শাওকানী (১২৫০ হিজরী)
ইমাম শাওকানী থেকে আল্লাহর 'আরশের উপর উঠার গুণটি সুস্পষ্টভাবে সাব্যস্ত করার অনেক ভাষ্য দেখা যায়। এখানে এমন কয়েকটি ভাষ্য উল্লেখ করা হলো: তিনি তার তাফসীর গ্রন্থে বলেন, مَذْهَبُ السَّلَفِ الصَّالِحِ أنه استوى سبحانه عليه بلا كيف عَلَى الْوَجْهِ الَّذِي يَلِيقُ بِهِ مَعَ تَنَزَّهِهِ عَمَّا لَا يَجُوزُ عَلَيْهِ، وَالاسْتِوَاءُ فِي لُغَةِ الْعَرَبِ: هُوَ الْعُلُوُّ وَالِاسْتِقْرَارُ.
"সালাফে সালেহীনের মাযহাব হচ্ছে, আল্লাহু সুবাহানাহু ওয়া তা'আলা 'আরশের উপর উঠেছেন কোনো প্রকার ধরন নির্ধারণ ব্যতীত, যেভাবে তাঁর জন্য সেটা উপযোগী; তবে যা তাঁর জন্য উপযোগী নয় এমন কোনো কিছু থেকে তিনি পবিত্র। আর 'ইস্তেওয়া' শব্দটি আরবী ভাষার অভিধান অনুযায়ী অর্থ হচ্ছে, উপরে উঠা এবং অবস্থান করা।”¹ তিনি 'আত-তুহাফ ফী মাযাহিবিস সালাফ' গ্রন্থে বলেন,
ومن جملة الصفات التي أمرها السلف على ظاهرها وأجروها على مَا جَاءَ بِهِ الْقُرْآنِ وَالسِّنة من دون تكلّف وَلَا تَأْوِيل صفة الاستواء الَّتِي ذكرها السَّائِل يَقُولُونَ نَحن نثبت ما أثبته الله لنفسه من استوائه على عرشه على هَيْئَة لا يعلمها إِلَّا هُوَ وَكَيْفِيَّة لَا يُدْرِي بهَا سواهُ وَلَا نكلف أَنْفُسَنَا غير هَذَا فَلَيْسَ كمثله شَيْء لَا فِي ذَاتِهِ وَلَا فِي صِفَاتِهِ وَلَا يحيط عباده بِهِ علما وَهَكَذَا يَقُولُونَ فِي مَسْأَلَة الْجِهَةِ الَّتِي ذكرها السَّائِلِ وَأَشَارَ إِلَى بعض مَا فِيهِ دَلِيل عَلَيْهَا والأدلة فِي ذَلِكَ طَوِيلَة كَثِيرَة في الكتاب والسنة وقد جمع أهل العلم مِنْهَا لا سيما أهل الحديث مباحث طولوها بذكر آيات قرآنية وَأَحَادِيث صحيحة وقد وقفت من ذلك على مؤلف بسيط في مجلد جمعه مؤرخ الإسلام الحافِظُ الذَّهَبِيِّ رَحمه الله استوفى فِيهِ كل ما فيه دلالة على الجهة من كتاب أو سنة أو قول صاحب مَذْهَب وَالمُسْأَلَة أوضح من أَن تَلْتَبِس على عَارِف وَأبين من أن يحتاج فِيهَا إِلَى التَّطْوِيل ولكنها لما وقعت تلك القلاقل والزلازل الكائنة بين بعض الطوائف الإسلامية كثر الْكَلَام فِيهَا وَفِي مَسْأَلَة الاستواء وَطَالَ وسيما بين الحنابلة وغيرهم من أهل المذاهب فَلَهم فِي ذَلِكَ الْفِتَنِ الْكُبْرَى والملاحم الْعُظْمَى وَمَا زَالُوا هَكَذَا فِي عصر بعد عصر والحق هُوَ مَا عرفناك من مَذْهَب السلف الصالح فالاستواء على العرش والكون في تِلْكَ الجهة قد صرح بهِ الْقُرْآنِ الْكَرِيمِ فِي مَوَاطِن يكثر حصرها ويطول نشرها وَكَذَلِكَ صرح بِهِ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي غير حديث بل هَذَا مِمَّا يجده كل فرد من أفراد الناس في نفسه وتحسه في فطرته وتجذبه إِلَيْهِ طَبِيعَته كَمَا نَرَاهُ فِي كل من اسْتَغَاثَ بِاللَّهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى والتجأ إِلَيْهِ وَوجه أدعيته إلى جنابه الرفيع وعزه المنيع فَإِنَّهُ يُشِيرِ عِنْد ذَلِك بكفه أَو يَرْمِي إِلَى السَّمَاء بطرفه وَيَسْتَوِي فِي ذَلِكَ عِنْد عروض أَسبَابِ الدُّعَاء وحدوث بواعث الاستغاثة وَوُجُود مقتضيات الإزعاج وظهور دواعي الالتجاء عالم الناس وجاهلهم والماشي على طريقة السلف والمقتدي بِأَهْل التَّأْوِيل الْقَائِلِينَ بِأَن الاستواء هُوَ الِاسْتِيلاء كَمَا قَالَ جُمهور المتأولين والأقيال كما قَالَه أَحمد بن يحيى ثَعْلَب والزجاج والفراء وَغَيرهم أو كِنَايَة عَن الملك وَالسُّلْطَان كَمَا قَالَهُ آخَرُونَ فالسلامة والنجاة في إمرار ذلك على الظاهر والإذعان بأن الاستواء والكون على ما نطق به الكتاب والسنة من دون تكييف ولا تكلّف وَلَا قيل وَلَا قَالَ وَلَا قُصُورٍ فِي شَيْءٍ مِن الْمُقَالَ فَمَن جَاوز هَذَا الْمِقْدَار بإفراط أو تَفْرِيط فَهُوَ غير مقتد بالسلف وَلَا وَاقِف فِي طريق النجاة ولا معتصم عن الخطأ وَلَا سالك في طريق السلامة والاستقامة|
"সালাফে সালেহীন কুরআন ও সুন্নাহ'য় আসা আল্লাহ তা'আলার যেসব গুণাবলিকে কোনো প্রকার অপব্যাখ্যা ও কৃত্তিমতার আশ্রয় গ্রহণ ছাড়াই প্রকাশ্য অর্থে যেভাবে এসেছে সেভাবে পরিচালিত করার নীতি গ্রহণ করেছেন, তন্মধ্যে একটি হচ্ছে 'ইস্তেওয়া' ('আরশের উপর উঠা) গুণটি। যে ব্যাপারে প্রশ্নকর্তা প্রশ্ন করেছে, আমাদের সালাফগণ বলতেন, আমরা তা অবশ্যই সাব্যস্ত করি যা আল্লাহ তাঁর নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন, যেমন আল্লাহর 'আরশের উপর উঠা, এমনভাবে উঠা যা কেবল তিনি ব্যতীত কেউ জানে না, এমন ধরনের উঠা যা তিনি ব্যতীত কেউ অবগত নয়। আমরা আমাদের নিজেদেরকে এর চেয়ে বেশি দায়িত্বে ফেলবো না; কারণ তাঁর মতো কোনো সত্তা নেই, তাঁর সত্তাতেও নয়, গুণেও নয়। আর তাঁর বান্দাগণের কেউই তাঁকে জ্ঞানে পরিবেষ্টন করতে সক্ষম নন। ঠিক সালাফগণ একই নীতি অবলম্বন করেন 'দিক নির্ধারণের মাসআলায়' যে মাসআলাটি প্রশ্নকারীর প্রশ্নে এসেছে এবং সে এ বিষয়ে সেসব দলীল প্রমাণ এসেছে তার কিছু উল্লেখ করেছে। বস্তুত এর ওপর কুরআন ও সুন্নাহ'র প্রমাণ অনেক দীর্ঘ। বহু আলেম, বিশেষ করে হাদীসশাস্ত্রবিদগণ, এ বিষয়ে কুরআনের আয়াত ও সহীহ হাদীস দিয়ে অনেক দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। এ বিষয়ে আমি এক খণ্ডের একটি বিস্তৃত গ্রন্থ দেখেছি, যা ইসলামের ঐতিহাসিক হাফেয যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ একত্রিত করেছেন। সেখানে তিনি এ বিষয়ক সবকিছুই নিয়ে এসেছেন, যাতে 'দিক' সাব্যস্তকারী কুরআন, সুন্নাহ, মাযহাবের ইমামগণের মত জমা করেছেন। মূলত মাসআলাটি কোনো জ্ঞানী ব্যক্তির কাছে গোপন থাকবে সে রকম বিষয় নয়, আর সেটা এতোই স্পষ্ট যে, এটার জন্য লম্বা লেখার প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু বিভিন্ন ইসলামী উপদলের দ্বারা যখন এ (দিক সাব্যস্ত করার) মাসআলায় বিশৃঙ্খলা ও সমস্যা তৈরি করা শুরু করলো, অনুরূপভাবে তারা 'আল্লাহর 'আরশের উপর উঠার মাসআলাতেও বিশৃঙ্খলা তৈরি করলো ও বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ সময় ব্যয় করলো, বিশেষ করে হাম্বলী আলেমগণ ও অন্যান্য মাযহাবের আলেমগণের মাঝে টানাপোড়ন আরম্ভ হলো, বস্তুত এভাবে তাদের মাঝে এ সমস্যা যুগ যুগ ধরে হয়ে আসছে, তখন সত্যটি তুলে ধরতেই হলো, যাতে আমরা সালাফে সালেহীনের মত আপনাকে জানিয়েছি। আর সেটা হচ্ছে, 'আরশের উপর উঠা এবং ঐ দিকে হওয়ার বিষয়টি কুরআনে কারীম অগণিত অসংখ্য জায়গায় সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছে যা আলোচনায় সীমাবদ্ধ করা কঠিন আর যা প্রচার করতেও দীর্ঘ গ্রন্থ লাগবে। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামও বহু হাদীসে তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। বরং এটি এমন এক বিষয় যা সত্য হওয়ার বিষয়টি প্রত্যেক মানুষই তার নিজের অন্তরের কন্দরে, তার আবেগ-অনুভূতিতে, স্রষ্টা কর্তৃক প্রদত্ত প্রকৃতি দ্বারা অনুভব করতে পারে। তাই তো আমরা দেখতে পাই, কেউ যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার কাছে উদ্ধার কামনা করে, তাঁর দিকেই আশ্রয় নেয়, কেউ যখন তার দো'আ মহান উঁচু ও মর্যাদাবান সত্তা আল্লাহর জন্য নিবেদিত করে তখন সে তাঁর দিকে তার হাতের কব্জি তুলে নেয় অথবা আসমানের দিকে তাঁর চোখের কোণ নিবদ্ধ করে। এটা সবসময় সমানভাবে করতে থাকে যখন তার দো'আ করার কোনো কারণ সংঘটিত হয়, যখন উদ্ধার পাওয়ার ইচ্ছা জাগ্রত হয়, যখন সমস্যা সঙ্কুল অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে চায় অথবা মুক্তি পাওয়ার কারণ প্রকাশ পায়, তখন সে ব্যক্তি আলেম হোক কিংবা জাহেল, সালাফে সালেহীনের পথে বিচরণকারী হোক কিংবা তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যাকারীদের পদাঙ্ক অনুসরণকারী লোকই হোক। বস্তুত নিরাপত্তা ও নাজাতের পথ হচ্ছে, এ গুণটিকে তার প্রকাশ্য অর্থে পরিচালিত করা এবং এটার স্বীকৃতি প্রদান যে, 'আরশের উপর হওয়া এবং এ দিকে হওয়ার বিষয়টি মেনে নেয়া, যেমনটি কুরআন ও সুন্নাহ'য় এসেছে, তাতে কোনো প্রকার ধরন নির্ধারণ না করে, কোনো প্রকার কৃত্তিমতার আশ্রয় না নিয়ে, কোনো প্রকার আজে-বাজে কথা না বলে অথবা অবুজ কোনো কথা থেকে বিরত থেকে। যে কেউ এ সীমা অতিক্রম করবে বাড়াবাড়ি কিংবা ছাড়াছাড়ি দিয়ে, সে সালফে সালেহীনের পথে চলতে চলতে পারেনি। নাজাতপ্রাপ্তদের থেকেও অবস্থান করতে পারেনি। ভুল থেকেও নিরাপত্তা লাভ করতে পারেনি। নিরাপত্তা ও সরল-সহজ পথে চলতেও সক্ষম হয়নি।"²
টিকাঃ
১. ফাতহুল কাদীর (২/২৫৯-২৬০)।
২. আশ-শাওকানী, আত-তুহাফ ফী মাযাহিবিস সালাফ, পৃ. ২৮।