📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 আবুল হাসান নূরুদ্দীন ইবন আবূল হাদী, আস-সিনফী (১১০৮ হিজরী)

📄 আবুল হাসান নূরুদ্দীন ইবন আবূল হাদী, আস-সিনফী (১১০৮ হিজরী)


ইমাম নূরুদ্দীন আস-সিন্দী আল-হানাফী রাহিমাহুল্লাহ অধিকাংশ হাদীস গ্রন্থের ওপর হাশিয়া বা টীকা সংযোজন করেছেন। তিনি বিভিন্ন জায়গায় তা'ওয়ীল করলেও এক জায়গায় যখন তা'ওয়ীলের অসারতা তার কাছে স্পষ্ট হয় তখন বলেন,
وَالْحَقُّ فِي هَذَا الْحَدِيثِ وَكَذَا فِيمَا قَبْلَهُ وَبَعْدَهُ مَا ذَكَرَهُ الْمُحَقِّقُونَ قَالَ الْبَغَوِيُّ فِي شَرْحِ السُّنَّةِ كُلُّ مَا جَاءَ فِي الْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ مِنْ هَذَا الْقَبِيلِ فِي صِفَاتِهِ تَعَالَى كَالنَّفْسِ وَالْوَجْهِ وَالْعَيْنِ وَالْأُصْبُعِ وَالْيَدِ وَالرِّجْلِ وَالْإِنْيَانِ وَالْمَجِيءِ وَالنُّزُولِ إِلَى السَّمَاءِ وَالِاسْتِوَاءِ عَلَى الْعَرْشِ وَالضَّحِكِ وَالْفَرَحِ فَهَذِهِ وَنَظَائِرُهَا صِفَاتُ اللَّهِ تَعَالَى عَزَّ وَجَلَّ وَرَدَ بِهَا السَّمْعُ فَيَجِبُ الْإِيمَانُ بِهَا وَإِبْقَاؤُهَا عَلَى ظَاهِرِهَا مُعْرِضًا فِيهَا عَنِ التَّأْوِيلِ مُجْتَنِبًا عَنِ التَّشْبِيهِ مُعْتَقِدًا أَنَّ الْبَارِيَ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى لَا يُشْبِهُ مِنْ صِفَاتِهِ صِفَاتُ الْخَلْقِ كَمَا لَا تُشْبِهُ ذَاتُهُ ذَوَاتِ الْخُلْقِ قَالَ تَعَالَى لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ [الشورى: ١١] وَعَلَى هَذَا مَضَى سَلَفُ الْأُمَّةِ وَعُلَمَاءُ السُّنَّةِ تَلَقَّوْهَا جَمِيعًا بِالْقَبُولِ وَتَجَنَّبُوا فِيهَا عَنِ التَّمْثِيلِ وَالتَّأْوِيلِ وَوَكَّلُوا الْعِلْمَ فِيهَا إِلَى اللَّهِ تَعَالَى كَمَا أَخْبَرَ سُبْحَانَهُ عَنِ الرَّاسِخِينَ فِي الْعِلْمِ فَقَالَ عَزَّ وَجَلَّ وَالرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ يَقُولُونَ آمَنَّا بِهِ كُلٌّ مِنْ عِنْدِ رَبِّنَا [آل عمران: ٧] قَالَ سُفْيَانُ بْنُ عُيَيْنَةَ كُلُّ مَا وَصَفَ اللَّهُ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى بِهِ نَفْسَهُ فِي كِتَابِهِ فَتَفْسِيرُهُ قِرَاءَتُهُ وَالسُّكُوتُ عَلَيْهِ لَيْسَ لِأَحَدٍ أَنْ يُفَسَّرَهُ إِلَّا اللهُ عَزَّ وَجَلَّ وَرُسُلُهُ وَسَأَلَ رَجُلٌ مَالِكَ بْنَ أَنَسٍ عَنْ قَوْلِهِ تَعَالَى الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى [ طه : ٥] كَيْفَ اسْتَوَى فَقَالَ الاسْتِوَاءُ غَيْرُ مَجْهُولٍ وَالْكَيْفُ غَيْرُ مَعْقُولٍ وَالْإِيمَانُ بِهِ وَاجِبٌ وَالسُّؤَالُ عَنْهُ بِدْعَةٌ وَمَا أَرَاكَ إِلَّا ضَالَّا وَأُمِرَ بِهِ أَنْ يُخْرَجَ مِنَ الْمُجْلِسِ وَقَالَ الْوَلِيدُ بْنُ مُسْلِمٍ سَأَلْتُ الْأَوْزَاعِيَّ وَسُفْيَانَ بْنَ عُيَيْنَةَ وَمَالِكًا عَنْ هَذِهِ الْأَحَادِيثِ فِي الصَّفَاتِ وَالرُّؤْيَةِ فَقَالَ أَمِرُّوهَا كَمَا جَاءَتْ بِلَا كَيْفِ وَقَالَ الزُّهْرِيُّ عَلَى اللَّهِ الْبَيَانُ وَمَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ [النور: ٥٤] وَعَلَيْنَا التَّسْلِيمُ وَقَالَ بَعْضُ السَّلَفِ قَدْمُ الْإِسْلَامِ لَا تَثْبُتُ إِلَّا عَلَى قَنْطَرَةِ التَّسْلِيمِ انْتَهَى وَبِنَحْوِ هَذَا صَرَّحَ كَثِيرٌ مِنَ الْمُحَقِّقِينَ فَعَلَيْكَ بِهِ وَاللَّهُ الْمُوَفِّقُ.
"আর সত্য ও সঠিক কথা হচ্ছে, এ হাদীস, অনুরূপ যা এর আগে এসেছে এবং যা এর পরে আসছে সেসব হাদীসের ক্ষেত্রে তাই গ্রহণ করতে হবে যা মুহাক্কিক বা সত্যনিষ্ঠ আলেমগণ বলেছেন, ইমাম বাগাওয়ী তাঁর শারহুস সুন্নাহ গ্রন্থে বলেন, কুরআন ও সুন্নায় আল্লাহ তা'আলার এ রকম যত গুণ এসেছে যেমন, নফস, চেহারা, চোখ, হাত পা, আসা, আগমন করা, নিকটতম আসমানে অবতরণ করা, 'আরশের উপরে উঠা, হাসা ও খুশি হওয়া, এগুলো এবং অনুরূপ আরও যা এসেছে, সবই আল্লাহর গুণাবলি। কুরআন ও সুন্নায় যা এসেছে, সেগুলোর অর্থের ওপর ঈমান আনতে হবে, সেগুলোকে তার প্রকাশ্য অর্থে পরিচালিত করতে হবে, তা'ওয়ীল বা অপব্যখ্যা করে দূরবর্তী অর্থ গ্রহণ করা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকতে হবে। তাশবীহ থেকে বেঁচে থাকতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে যে, মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর কোনো গুণ সৃষ্টির কোনো গুণের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়। যেমন তাঁর সত্তা সৃষ্টির কোনো সত্তার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়। মহান আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন, "তাঁর মতো কোনো কিছু নেই, আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা”। [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১]
আর এ নীতির ওপরই উম্মতের সালাফে সালেহীন, সুন্নাহর ইমামগণ সবাই গত হয়েছেন। তারা এগুলোর ওপর ঈমান এনেছেন এগুলোকে গ্রহণ করে নিয়েছেন। এগুলো থেকে তামছীল (সৃষ্টির কারও অনুরূপ বলা) ও তা'ওয়ীল (অপব্যাখ্যা) করা থেকে দূরে থেকেছেন। তারা এগুলোর প্রকৃত জ্ঞান মহান আল্লাহ তা'আলার কাছে সোপর্দ করেছেন। যেমন মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ইলমে সুদৃঢ় লোকদের সম্পর্কে বলেছেন, "আর যারা ইলমে সুদৃঢ় তারা বলে, আমরা এগুলোর ওপর ঈমান আনলাম, এসবই আমাদের রবের পক্ষ থেকে এসেছে। [সূরা আলে ইমরান: ০৭]
ইমাম সুফইয়ান ইবন 'উয়াইনাহ বলেন, "মহান আল্লাহ তাঁর কুরআনে যা দিয়ে নিজেকে গুণান্বিত করেছেন সেগুলোর ব্যাখ্যা হচ্ছে, সেগুলো পাঠ করে বুঝে নিয়ে চুপ থাকা, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ব্যতীত কারও জন্য সেগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা করার অধিকার নেই"।
এক ব্যক্তি ইমাম মালেক ইবন আনাস রাহিমাহুল্লাহকে মহান আল্লাহর বাণী "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন" [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫] এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে উঠলেন? তিনি জবাবে বললেন, "উপরে উঠার বিষয়টি অজানা নয়, এর ধরন বিবেকের যুক্তি দ্বারা প্রাপ্য বিষয় নয়, আর এর উপর ঈমান আনা ফরয, এর ধরণ সম্পর্কে প্রশ্ন করা বিদ'আত। আর আমি তো তোমাকে একজন পথভ্রষ্ট লোকই দেখতে পাচ্ছি, আর তাকে মজলিস থেকে বের করে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হলো।"
ইমাম ওয়ালীদ ইবন মুসলিম বলেন, আমি ইমাম আওযা'ঈ, সুফইয়ান ইবন 'উয়াইনাহ, মালেক ইবন আনাসকে আল্লাহ তা'আলার গুণাবলি ও আল্লাহ তা'আলাকে দেখার ব্যাপারে আসা হাদীসসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি, তারা সবাই বলেছেন, "এগুলোকে যেভাবে এসেছে সেভাবে বুঝে চালু করে দাও, তবে ধরন নির্ধারণ করো না।"
ইমাম যুহরী বলেন, "আল্লাহর পক্ষ থেকে বর্ণনা এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে সেটা পৌঁছানোই দায়িত্ব [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৫৪] আর আমাদের ওপর কর্তব্য হচ্ছে সেটা মেনে নেয়া।"
সালাফদের কেউ কেউ বলেছেন, ইসলামে কারও পা দৃঢ় ততক্ষণ হবে না, যতক্ষণ না মেনে নেয়ার সাঁকোতে আরোহণ করবে।" এতটুকু ইমাম বাগাওয়ী বলেছেন। বস্তুত এমন কথাই স্পষ্ট করে বহু সত্যনিষ্ঠ আলেম বলেছেন। সুতরাং তোমার ওপর কর্তব্য হচ্ছে এটা গ্রহণ করে নেয়া। আল্লাহই তাওফীক্বদাতা।"¹
এর দ্বারা বুঝা গেল, এ বিখ্যাত হানাফী আলেম তাঁর জীবনের ইলমী অভিজ্ঞতায় এ সত্যকেই বিশ্বাস করে নিয়েছেন যে, আল্লাহ তা'আলার গুণাবলিকে অপব্যাখ্যা কিংবা অর্থহীন করা যাবে না। আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠার বিষয়টিও স্বীকার করে নিতে হবে। আর তাই তিনি সেটাকে গ্রহণ করে নেয়ার জন্য সকলকে আহ্বান জানিয়েছেন।
টিকাঃ
১. সিন্দী, হাশিয়াতুস সিন্দী, কিফায়াতুল হাজাহ ফী শারহি সুনani ইবন মাজাহ ১/৮৮-৮৯।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 আশ-শাইখ আল-মুহাদ্দিস মুহাম্মাদ কাছের ইদাহবাদী (১১৮৪ হিজরী)

📄 আশ-শাইখ আল-মুহাদ্দিস মুহাম্মাদ কাছের ইদাহবাদী (১১৮৪ হিজরী)


মদীনার বিখ্যাত শাইখ মুহাম্মাদ হায়াত সিন্ধী রাহিমাহুল্লাহ'র সুযোগ্য ছাত্র, আশ-শাইখ আল-মুহাদ্দিস মুহাম্মাদ ফাখের ইবন মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া ইবন মুহাম্মাদ আমীন আল-আব্বাসী, আল-ইলাহাবাদী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
وهو فوق العرش وفوق السموات، والعرش وما حواه في يده كخردلة في يد أحدنا، وعلمه محيط بالكائنات السفلية والعلوية، فما كان وما يكون محاط له، كما قال: الرحمن على العرش استوى) [طه: 5] وأحاط بكل شيء علماً، وهذا الاستواء في سبع مواضع من القرآن الكريم، والأصل أن يعتقد ما ورد به القرآن ولا يأوله، ولا يصرفه عن وجهه، ... ثم قال بعد سرد الأدلة من القرآن وأدلة علو العلي الأعلى في القرآن تزيد على ذلك وهو نص أو ظاهر في أن الله تعالى فوق الخلق فوق العرش، بائن من المخلوقات بالمعنى الذي يليق بجنابه الأقدس، وتأويله إخراج النص أو الظاهر عن معناه، وذلك لا يجوز قطعاً، إلا عند معارضة المثل ووجدانه ودونه خرط القتاد، وقوله ليس كمثله شيء﴾ [الشورى: ۱۱] لا ينافي ذلك؛ لأن المراد إما مماثلة بجميع الوجوه، كما يقول أهل السنة، أو في أخص الأوصاف كما يقوله المعتزلة، وكلاهما مفقودان في هذا المقام، وهكذا حكم الأحاديث الشريفة النبوية على صاحبها الصلاة والسلام أن يؤمن بها، بما ورد فيها، ويعلم أن الصرف وتأويل العقول الضعيفة حلقة خارج الباب، ... ثم سرد الأحاديث وقال في آخرها وفي الباب أحاديث كثيرة عسيرة الاستقصاء في هذه المقدمة في غاية الكثرة، والآيات والأحاديث تغني عن إيرادها. انتهى.
"আর তিনি (আল্লাহ) 'আরশের উপর, আসমানসমূহের উপর, 'আরশ ও এর চারপাশে যা আছে সবই তাঁর হাতে আমাদের কারও হাতে অবস্থিত যেমন শর্ষে দানার মতো। আর তাঁর জ্ঞান নিচ ও উপরের যাবতীয় সৃষ্টিকে পরিবেষ্টন করে আছে। সুতরাং যা হয়েছে আর যা হবে সবই তাঁর জ্ঞানে পরিবেষ্টিত। যেমন তিনি বলেন, "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫], আর তিনি সবকিছুকে জ্ঞানে পরিবেষ্টন করে আছেন। এই যে ইস্তেওয়া ('আরশের উপর উঠা) গুণটি কুরআনে কারীমের সাত জায়গায় এসেছে। এ ব্যাপারে মূলনীতি হলো, কুরআনে কারীমে যা এসেছে তাতে বিশ্বাস স্থাপন করা, কোনো প্রকার অপব্যাখ্যার আশ্রয় না নেয়া আর সেগুলোকে তাঁর দিক থেকে অন্যদিকে প্রত্যাবর্তন না করানো। ..... তারপর তিনি কুরআনের দলীল উল্লেখের পর বলেন, মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির উপর থাকার বিষয়ে কুরআনে কারীমে এর চেয়েও বেশি প্রমাণাদি রয়েছে, যা সুস্পষ্টভাবে বা প্রকাশ্যভাবে এটা প্রমাণ করছে যে, মহান আল্লাহ সৃষ্টির উপর, 'আরশের উপর, সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা, যেভাবে তাঁর পবিত্র সত্তার জন্য উপযোগী। এটার তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করার অর্থ হচ্ছে সুস্পষ্ট বা প্রকাশ্য ভাষ্যসমূহকে তার অর্থ থেকে বের করা আর তা অকাট্যভাবে নাজায়েয। তবে যদি কোনো সমপর্যায়ের সাথে বিরোধিতা দেখা দেয়, আর যদি তেমন কিছু পাওয়া যায়; কিন্তু যদি তা না পাওয়া যায়, তাহলে অপব্যাখ্যার আশ্রয় নেয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আর আল্লাহর বাণী, "তাঁর মতো কোনো কিছু নেই।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১] এ আয়াত আল্লাহর 'আরশের উপর থাকা বিরোধী নয়। কারণ, (নিষিদ্ধ হওয়ার জন্য) কোনো কিছু আল্লাহর মত হওয়ার বিষয়টি হয় সর্বদিক থেকে হতে হবে যেমনটি আহলুস সুন্নাহ বলে থাকে, নতুবা কোনো বিশেষ গুণের মতো হলেই নিষিদ্ধ হবে যেমন মু'তাযিলারা বলে থাকে, এখানে উভয়টির কোনোটিই পাওয়া যায়নি।
অনুরূপভাবে হাদীসের ক্ষেত্রেও বিধান হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল হাদীসে যা এসেছে তার ওপর ঈমান আনয়ন করা, এটা জেনে নেয়া যে, অন্যদিকে সেগুলোর অর্থকে ফিরানো বা দুর্বল বিবেকের যুক্তি দিয়ে সেগুলোর তা'ওয়ীল করা এ অধ্যায়ের বাইরের জিনিস। তারপর তিনি অনেক হাদীস উল্লেখ করেছেন, তারপর শেষে বলেন আর এ অধ্যায়ে অনেক হাদীস রয়েছে যার সবগুলো এ ভূমিকাতে জমা করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার, কারণ তা অনেক বেশি। বস্তুত যে আয়াত ও হাদীসসমূহ উল্লেখ করা হলো তা বাকী হাদীস উল্লেখ করা থেকে অমুখাপেক্ষী করে দিবে।" (শেষ)।¹
টিকাঃ
১. সিদ্দিক হাসান খান, আল-ইস্তিক্বাদুর রাজীহ ফী শারহিল ই'তিকাদিস সহীহ, পৃ. ৯০।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 শাইখ মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফ আল-বিন্নড়লী (১১৯৩ হিজরী)

📄 শাইখ মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফ আল-বিন্নড়লী (১১৯৩ হিজরী)


শাইখ মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফ আল-বিলগ্রামী রাহimাহুল্লাহ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ (আল-ফার'উন নাবিত মিনাল আসলিস সাবিত) গ্রন্থে বলেন,
«قد علم من هذه الآية يعني أأمنتم من في السماء وهذا الحديث يعني أنا أمين من في السماء» رواه الشيخان، أنه تعالى في السماء، وهو بائن من مخلوقاته كما يليق بشأنه الأقدس، فلا يصح تعيين كيفية هذا العلو الذي نطقت به الآية الكريمة الرحمن على العرش استوى على ما في صحيح البخاري، قال أبو العالية: استوى على العرش: ارتفع، وقال مجاهد: استوى علا على العرش، يعلمها الكيفية إلا هو، لأن المعنى التشبيهي مسلوب عن ذاته تعالى بدليل قوله: ليس كمثله شيء، والدليل على أن المراد بالاستواء الارتفاع الحقيقي، أعني أنه تعالى فوق العرش كما ذهب إليه جمهور المحدثين لا التأويل بأن الاستواء هو الاستيلاء - هذه الآية: ﴿فَإِذَا اسْتَوَيْتَ أَنتَ وَمَن مَّعَكَ عَلَى الْفُلْكِ) وهذه الآية: ﴿وَاسْتَوَتْ عَلَى الْجُودِي ، وهذه الآية : ﴿ لِتَسْتَوُوا عَلَى ظُهُورِهِ، والآيات والأحاديث الدالة على كون ذاته تعالى من حيث هو على علوه، وكونه فوق السماء ......
"এ আয়াত অর্থাৎ “তোমরা কি নির্ভয় হয়ে গেছ তার থেকে, যিনি আসমানের উপর আছেন।” [সূরা আল-মুলক, আয়াত: ১৬] অনুরূপ এ হাদীস অর্থাৎ “আমি তাঁর পক্ষ থেকে আমানতদার, যিনি আসমানের উপর আছেন।”¹ থেকে জানা গেল যে, আল্লাহ তা'আলা আসমানের উপরে, তাঁর সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা, যেমনটি তাঁর পবিত্র সত্তার জন্য থাকা উপযোগী। সুতরাং সে উপরে থাকার কোনো ধরন নির্ধারণ করা যাবে না, যার কথা কুরআনের এ আয়াত বলেছে, “রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫], বরং সেটাই বলা হবে যা সহীহ বুখারীতে এসেছে, আবুল 'আলীয়া বলেন, ইস্তাওয়া 'আলাল 'আরش অর্থ 'আরশের উপর উঠেছেন। মুজাহিদ বলেন, ইস্তাওয়া অর্থ, 'আরশের উপর উঠলেন, তার ধরন সম্পর্কে তিনি ব্যতীত কেই জানে না। কারণ সাদৃশ্য সাব্যস্তকৃত অর্থ মহান আল্লাহর সত্তা থেকে নিষিদ্ধ থাকবে, কারণ আল্লাহ বলেছেন, "তাঁর মতো কোনো কিছু নেই।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১] আর 'ইস্তেওয়া' শব্দের হাকীকী বা বাস্তব অর্থ যে উপরে উঠা তার প্রমাণ, অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপর, যেমনটি অধিকাংশ মুহাদ্দিস বলেছেন, ইস্তাওয়া এর অর্থ 'ইস্তাওলা' (অধিকার করা) দিয়ে তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করা নয়, তার প্রমাণ হচ্ছে, আল্লাহর বাণী, “অতঃপর যখন আপনি ও আপনার সংগীরা নৌযানের উপরে স্থির হবেন”, অনুরূপ আল্লাহর বাণী, "আর নৌকা জুদী পর্বতের উপর স্থির হলো” তদ্রূপ আল্লাহর বাণী "যাতে তোমরা এর পিঠে স্থির হয়ে বসতে পার"। বস্তুত এর উপর প্রমাণবাহী অনেক আয়াত ও হাদীস রয়েছে যা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে, মহান আল্লাহ তা'আলা সর্বোপরে, আসমানের উপরে..."।²
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৩৫১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৪৪।
২. সিদ্দীক হাসান খান, আল-ইস্তিক্কাদুর রাজীহ ফী শারহিল ই'তিকাদিস সহীহ, পৃ. ৯০-৯১।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিস আদ-দেহলাভী (১১৯৬ হিজরী)

📄 শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিস আদ-দেহলাভী (১১৯৬ হিজরী)


আকীদাহ'র ক্ষেত্রে আমাদের সবার প্রিয় ব্যক্তিত্ব শাইখ শাহ ওয়ালীউল্লাহ আদ-দেহলাওয়ী রাহিমাহুল্লাহ বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করেছেন। এর কারণ ছিল চারটি। প্রথমত: ভারতবর্ষ কেন্দ্রিক সহীহ আকীদাহ'র জ্ঞানের গুরুত্বহীনতা, দ্বিতীয়ত: ভারতবর্ষে যাদের কাছে তিনি আকীদাহ ও ইলম শিক্ষা অর্জন করেছেন তাদের অধিকাংশের মধ্যেই সহীহ আকীদাহ'র শূন্যতা বিরাজমান থাকা, তৃতীয়ত: আকীদাহ বলতে তখন ইলমুল কালাম নামক মহামারীর ব্যাপক সয়লাব, চতুর্থত: তখনকার ভারতবর্ষ সূফীবাদে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থাকা। এসব কারণে তিনি যতদিন ভারতবর্ষে ছিলেন ততদিন তার গ্রন্থসমূহ থেকে সহীহ আকীদাহ'র কিছু আমরা খুঁজে পাই না। তারপর তিনি যখন আরব দেশে ইলম ও হাদীসের জ্ঞান লাভের জন্য সেখানে অবস্থান করেন তখনও তিনি শুরুতে যেসব গ্রন্থ লিখেছেন সেগুলোতে সূফীবাদের ব্যাপক চাপ পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু সর্বশেষ যখন তিনি শাইখ আবু তাহের আল-মাদানী আশ-শাফে'য়ীর কাছে বিভিন্ন ইলমের সঠিক সবক লাভ করেন তখন তার যেসব গ্রন্থ রচিত হয় সেগুলোতে তিনি সহীহ আকীদাহ বিশ্বাসের কথা ব্যক্ত করেছেন। তন্মধ্যে বিখ্যাত হয়েছে দু'টি গ্রন্থ আল-ফাওযুল কাবীর ও হুজ্জাতিল্লাহিল বালিগাহ। এ দু'টি গ্রন্থই প্রকৃতপক্ষে তাঁর সর্বশেষ আকীদাহ-বিশ্বাসের প্রতিনিধিত্ব করে। সেজন্য আমরা দেখতে পাই শাইখ আবুল হাসান আলী আন-নাদওয়ী রাহিমাহুল্লাহকে বলতে যে, তিনি আকীদাহ'র ক্ষেত্রে ইমাম আহমাদের আকীদাকেই নিজের আকীদাহ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। যদিও তখনকার আশ'আরীদের দৌরাত্মের কারণে অনেক সময় বিশুদ্ধ আকীদাহ'র কথা না বলে তিনি আশ'আরী বলতে স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন। এ ব্যাপারে আমরা তার জন্য সেটাই মনে করব যেটা ইমাম ইবন কাসীর বলতেন। ইমাম ইবন কাসীর অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বলতেন, আমি আশ'আরী, তাঁর উদ্দেশ্য ইমাম আশ'আরীর সর্বশেষ অবস্থা বর্ণনা করা; যাতে তিনি সালাফে সালেহীনের মত গ্রহণ করেছিলেন।
• শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলাওয়ী রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহ তা'আলার জন্য দিক সাব্যস্ত করে এবং তাঁর 'আরশের উপরে উঠার আকীদাহ প্রমাণ করতে গিয়ে সেটিকে কুরআন ও সুন্নাহ থেকে স্বাভাবিকভাবে প্রাপ্ত আকীদাহ হিসেবে উল্লেখ করেন, তিনি বলেন, এ আকীদাহ ফিত্বরী বা স্বভাবজাত, যা জানার জন্য মানতেক ও হিকমত পড়া লাগে না। তিনি বলেন,
وَمِنْهَا أَن الشارع لم يخاطبهم إلا على ميزان العقل المودع في أصل خلقتهم قبل أن يتعانوا دقائق الحكمة والكلام وَالْأُصُولِ، فَأَثْبت لِنَفْسِهِ جِهَةً فَقَالَ: الرَّحْمَن عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى . وَقَالَ النَّبِي صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا مرأة سَوْدَاء : « أَيْنِ اللهِ فَأَشَارَتْ إِلَى السَّمَاءِ فَقَالَ هِيَ مُؤْمِنَةٌ.
"ইসলাম যে সহজ-সরল ও স্বাভাবিক দীন তার একটি প্রমাণ হচ্ছে, শরী'আত প্রবর্তক তথা আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূল মানুষদেরকে তাদের মূল সৃষ্টিতে নিহিত আমানত রাখা স্বাভাবিক বিবেকের মানদণ্ড অনুযায়ীই কেবল সম্বোধন করেছেন, অর্থাৎ তথাকথিত হিকমত কালাম ও মানতেকের মূলনীতি জানার মত বিপদে আক্রান্ত হওয়ার আগেই যা মানুষের বিবেকের মধ্যে আল্লাহ তা'আলা দিয়ে দিয়েছেন সে জ্ঞানে যা বুঝতে পারে সেটা অনুযায়ীই তাদেরকে সম্বোধন করেছেন। সুতরাং তিনি তাঁর নিজের জন্য ‘জিহাত' বা দিক সাব্যস্ত করে বলেছেন, “রহমান ‘আরশের উপরে উঠেছেন”, আর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম কালো দাসীকে বলেছেন, “আল্লাহ কোথায়?” তখন সে মহিলা আসমানের দিকে ইঙ্গিত করেন, ফলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “সে তো ঈমানদার”।¹ তার আকীদাহ আলোচনা করতে গিয়ে হাফেয সানাউল্লাহ আল-মাদানী বলেন,
وأما في الإجمال فإنه وإن انتسب للأشعرية في بعض كتاباته فقد قيده في الفضل المبين (رقم (۱۱) بقوله عن نفسه ومختاره في العقيدة مذهب المتقدمين من الأشاعرة»، وفصل مفهومه لذلك بأن أبا الحسن الأشعري رحمه الله استقر على مذهب الإمام أحمد وأهل الحديث في الاعتقاد، وأنه لا يؤؤول الصفات، وقال في رسالته في مناقب شيخ الإسلام ابن تيمية: وهذا الذي حققناه هو مذهب الشيخ أبي الحسن الأشعري. أقر أني أبو طاهر المدني رضي الله عنه بخط أبيه، أن الشيخ أبا الحسن قال في كتابه: إني على مذهب أحمد في مسألة الصفات، وإن الله فوق العرش.
"মোটের উপর তিনি যদিও তার কোনো কোনো কিতাব আশ'আরী মতবাদের দিকে নিজেকে সম্পৃক্ত করতেন, যেমনটি তিনি তার ‘আল-ফাদ্বলুল মুবীন' গ্রন্থে (পৃ. ১১) বলেছেন, ‘আকীদাতে তার পছন্দনীয় মত হচ্ছে পূর্ববর্তী আশা'য়েরাদের মত।' তারপর তিনি সেটার ব্যাখ্যা করে বলেছেন, বস্তুত আবুল হাসান আল-আশ'আরী রাহিমাহুল্লাহ সবশেষে আকীদাহ'র ক্ষেত্রে ইমাম আহমাদের মত ও আহলুল হাদীসের মতের ওপর স্থিরভাবে অবস্থান করেছিলেন। তিনি শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ'র মর্যাদা বর্ণনায় যে প্রবন্ধটি লিখেছিলেন সেটাতে বলেছেন, ‘এতক্ষণ যা আমি বিশুদ্ধ বলে ঠিক করলাম সেটাই হচ্ছে আবুল হাসান আল-আশ'আরীর মত; আমাকে তা আবু ত্বাহের আল-মাদানী তার পিতা (ইবরাহীম কৃওরানী) এর হস্তাক্ষর থেকে পড়ে শুনিয়েছেন যে, আমি আল্লাহর গুণের ক্ষেত্রে আহমাদ ইবন হাম্বলের মাযহাবে, আর আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপর রয়েছেন'।”²
তাছাড়া তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ হুজ্জাতিল্লাহিল বালিগাহ গ্রন্থে আল্লাহর সিফাতের উপর একটি অধ্যায় রচনা করেছেন (১/১৩২-১৩৪), সেখানে তিনি আল্লাহ তা'আলার গুণাবলির ক্ষেত্রে সালাফদের নীতি অর্থাৎ এসব শব্দের অর্থের উপর ঈমান আনয়ন করে ধরন নির্ধারণ না করার কথাই বলেছেন। (যদিও অনেকে সেটাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেছে।) তিনি বলেন,
والصفات ليست بمخلوقات محدثات، والتفكر فيها إنما هو أن الحق كيف اتصف بها، فكان تفكرا في الخالق
قال الترمذي في حديث يد الله ملأى وهذا الحديث قال الأئمة نؤمن كما جاء من غير أن يُفسر أو يتوهم هكذا قال غير واحد من الأئمة، منهم سفيان الثوري، ومالك بن أنس، وابن عيينة، وابن المبارك: إنه تروى هذه الأشياء ويؤمن بها، ولا يقال كيف.
"আল্লাহর গুণাবলিকে সৃষ্ট কিংবা নবসৃষ্ট বলা যাবে না। এর মধ্যে যত চিন্তা নিবদ্ধ হয়, কীভাবে আল্লাহ তা'আলা এসব গুণে গুণান্বিত হলেন। এর মাধ্যমেই মানুষ স্রষ্টার ব্যাপারে চিন্তায় পড়ে যায়। তিরমিযী 'আল্লাহর হাত পরিপূর্ণ' এর হাদীসের ব্যাপারে বলেন, এ হাদীসটির ব্যাপারে ইমামগণ বলেছেন, আমরা এর উপর যেভাবে এসেছে সেভাবে ঈমান আনব, সেটার কোনো ব্যাখ্যা দাঁড় করাবো না অথবা ধারণা নিয়ে অগ্রসর হবো না। এ রকমই বলেছেন একাধিক ইমাম, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, সুফইয়ান আস-সাওরী, মালিক ইবন আনাস, ইবন 'উয়াইনাহ, ইবনুল মুবারক যে, এগুলো বর্ণনা করা হবে, এগুলোতে যা বলা হয়েছে সেটার ওপর ঈমান আনা হবে কিন্তু বলা যাবে না, তার ধরন কী?" শাহ ওয়ালীউল্লাহ আরও বলেন, অন্যত্র ইমাম তিরমিযী আরও বলেন, এ গুণাবলিকে যেভাবে এসেছে সেভাবে বুঝার মাধ্যমে চালিয়ে নেয়া তাশবীহ বা সাদৃশ্য স্থাপন নয়। সাদৃশ্য স্থাপন তো কেবল এটা বলা যে, সৃষ্টির শোনার মতো তাঁর শোনা, সৃষ্টির দেখার মতো তাঁর দেখা।"³
এভাবে ইমাম শাহ ওয়ালীউল্লাহ আদ-দেহলাওয়ী রাহিমাহুল্লাহ স্পষ্ট করে ইমাম তিরমিযীর উল্লিখিত মতটি বর্ণনা করা ও তার বিরুদ্ধে কিছু না বলা এটাই প্রমাণ করে যে, তিনি সালফে সালেহীন ও ইমামগণের মতই তার মত নির্ধারণ করেছেন। কারণ, আমরা ইতোপূর্বে বিস্তারিত জেনেছি যে, ইমাম তিরমিযী সালাফদের পথের পথিক ছিলেন। তিনি এসব গুণের অর্থ সাব্যস্ত করতেন কিন্তু ধরন নির্ধারণ করতেন না।
আরও যে জিনিসটি আমাদেরকে আমাদের শাইখ শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলাওয়ী রাহিমাহুল্লাহর আল্লাহ তা'আলার নাম ও গুণ সম্পর্কিত বিশুদ্ধ নীতির পরিচয় করে দিবে তা হচ্ছে, শাইখ নিজে হাফেয ইবন হাজার আল-আসকালানী রাহিমাহুল্লাহ'র ফাতহুল বারী থেকে কেবল সে অংশটুকুই এনে দলীল হিসেবে পেশ করেছেন যা একেবারেই বিশুদ্ধ। তিনি বলেন,
وَقَالَ الحافظ ابن حجر : لم ينقل عن النَّبِي صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَلَا عَن أحد من الصَّحَابَة من طَرِيق صَحِيح التَّصْرِيح بِوُجُوب تَأْوِيل شَيْء من ذلِك وَلَا المنع من ذكره ومن المحال أَن يَأْمر الله نبيه بتبليغ مَا أُنزِلَ إِلَيْهِ من ربه، وينزل عَلَيْهِ : الْيَوْم أكملت لكم دينكُمْ . ثمَّ يترك هَذَا الْبَابِ فَلَا يُمَيِّز مَا يجوز نسبته إِلَيْهِ تَعَالَى مِمَّا لَا يجوز مَعَ حثه على التبليغ عنه بقوله: « ليبلغ الشَّاهِدِ الْغَائِب ) حَتَّى نقلوا أقواله وأفعاله وأحواله وما فعل بِحَضْرَتِهِ، فَدلَّ على أَنهم اتَّفَقُوا على الْإِيمَانِ بِهِ عَلَى الْوَجْهِ الَّذِي أَرَادَ الله تَعَالَى مِنْهَا، وَأوجب تنزيهه عن مشابهات المُخْلُوقَات بقوله: (لَيْسَ كمثله شَيْء). فمن أوجب خلاف ذلك بعدهم، فقد خالف سبيلهم.
"আর হাফেয ইবন হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে, তাঁর কোনো একজন সাহাবী থেকে, বিশুদ্ধভাষায় সুস্পষ্টভাবে এসব গুণাবলির ব্যাখ্যা করা ওয়াজিব হওয়ার কোনো কিছু বর্ণিত হয়নি। অনুরূপভাবে তাদের থেকে এসব ভাষ্য বর্ণনা করতেও নিষেধ করা হয়নি। আর এটা অসম্ভব যে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীকে তাঁর ওপর যা নাযিল করা হয়েছে তা বর্ণনা করার নির্দেশ দিবেন, তাঁর ওপর নাযিল হচ্ছে, "আজকের দিনে আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করে দিলাম", তারপর তিনি এ অধ্যায়টি বর্ণনা ও প্রচার না করে ছেড়ে দিবেন, তিনি আল্লাহর দিকে কী সম্পর্কযুক্ত করা জায়েয হবে আর কী সম্পর্কযুক্ত করা জায়েয হবে না সেটার মধ্যে পার্থক্য করে দিবেন না (এটা হতে পারে না)। অথচ তিনিই বলেছেন, তোমাদেরে মধ্যে যারা উপস্থিত তারা যেন অনুপস্থিত যারা তাদেরকে তা পৌঁছিয়ে দেয়। সে কারণে সাহাবায়ে কেরাম তাঁর যাবতীয় কথা, কাজ, অবস্থা ও তাঁর সামনে সংঘটিত হওয়া বিষয়াদি এসবই যথাযথভাবে বর্ণনা করেছেন, এসবই প্রমাণ করে যে, তাঁরা সবাই একমত হয়েছেন যে, (গুণাবলি সংক্রান্ত) এসব ভাষ্যের অর্থের ওপর ঈমান আনতে হবে, তবে এটা বলতে হবে যে, এর প্রকৃত অবস্থা কেবল আল্লাহ তা'আলা যেভাবে চেয়েছেন সেভাবেই; সাথে সাথে তারা এ বিষয়েও একমত হয়েছেন যে, আল্লাহ তা'আলাকে তাঁর সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য সাব্যস্ত করা থেকে পবিত্র করা বাধ্যতামূলক; কারণ আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, "তাঁর মতো কোনো কিছু নেই"। সুতরাং তাদের (নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কিরাম, তাবে'য়ীনে 'ইযাম, আয়িম্মায়ে মুজতাহিদীনের) পরে যে কারও ওপর নতুন করে কোনো কিছু বাধ্য করবে সে তাদের মত ও পথের বিরোধী হলো। "⁴
সুতরাং আমরা দেখতে পেলাম কত সুন্দর করে তিনি সালাফে সালেহীনের অনুসরণ করার জন্য সালাফে সালেহীনের সঠিক পথ কোনটি, কেন তা তা'ওয়ীল নয়, কেন তাফওয়ীদ্ব নয়, তা তুলে ধরেছেন। আর কত সুন্দর করে সে মূল্যবান কথাটিকেই নিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছেন যা ইমাম ইবন হাজার রাহিমাহুল্লাহ'র কথার মধ্যে বালিরাশি থেকে মূল্যবান মুক্তো আলাদা করে আনার মতো। কারণ আমরা জানি যে, ইমাম ইবন হাজার আল-আসকালানী রাহিমাহুল্লাহ তার ফাতহুল বারীতে জাহমিয়্যাহ, মু'তাযিলা, আশ'আরিয়া সকল শ্রেণির কথাই তুলে ধরেছেন এবং নিজে বিভিন্ন অবস্থানে ছিলেন। কিন্তু তাঁর সে গ্রন্থ থেকে আমাদের ইমাম শাহ ওয়ালীউল্লাহ আদ-দেহলাওয়ী রাহিমাহুল্লাহ যখন কেবল সালাফে সালেহীনের কথাটুকুই নিয়ে আসেন, তখন বুঝতে হবে ইমাম দেওলাওয়ী সঠিক কথাটিকে সমুদ্র সিঞ্চন করে মুক্তা আনার কাজটি করেছেন। না হলে ইবন হাজারের নিয়ে আসা অন্য বক্তব্য না এনে কেবল বাছাই করে সালাফে সালেহীনের আকীদাহ'র অংশটুকু কেন আনবেন?
তারপরই শাহ সাহেব রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
أَقول لا فرق بين السمع والبصر والقدرة والضحك والكلام والاستواء فَإِن المفهوم عِند أهل اللسان من كل ذلك غير ما يليق بجناب القدس، وهل في الضحك اسْتِحَالَة إِلَّا من جِهَةِ أَنه يَسْتَدْعِي الْفَمِ، وَكَذَلِكَ الْكَلَامِ؟ وَهَل فِي الْبَطْسُ وَالنُّزُولَ اسْتِحَالَة إِلَّا من جهة أَنَّهُما يستدعيان اليد والرجل؟ وَكَذَلِكَ السَّمَع وَالْبَصَرِ
يستدعيان الأذن والعين، والله أعلم।
واستطال هَؤُلَاءِ الخائضون على معشر أهل الحديث، وسموهم مجسمة ومشبهة، وَقَالُوا هم المتسترون بالبلكفة، وقد وضح علي وضوحا بينا أن استطالتهم هذه ليست بِشَيْء وانهم مخطئون في مقالتهم رواية ودراية و خاطئون في طعنهم أئمة الهدى.
وتفصيل ذلك أَن هَهُنَا مقامين : أَحدهما أَن الله تبارك وَتَعَالَى كَيفَ اتصف بِهَذِهِ الصِّفَاتِ، وَهَل هِيَ زَائِدَة على ذاته أو عين ذَاتِهِ ؟ وَمَا حَقِيقَةِ السَّمع وَالْبَصَرِ وَالْكَلَامِ وَغَيْرِهَا؟ فَإِن المفهوم مِن هَذِهِ الْأَلْفَاظِ بَادِي الرَّأْي غير لائق بجناب القدس.
وَالْحَقِّ فِي هَذَا الْمُقَامِ أَن النَّبِي صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لم يتكَلَّم فِيهِ بِشَيْء، بل حجر أمته عن التَّكَلُّم فيه والبحث عَنهُ فَلَيْسَ لأحد أن يقدم على ما حجره، وَالثَّانِي أَنه أَي شَيْء يجوز في الشَّرْعِ أَن نصفه تَعَالَى بِهِ وَأَي شَيْءٍ لَا يجوز أن نصفه بِهِ، وَالحق أن صفاته وأسماءه توقيفيه بِمَعْنى أَنا وَإِن عرفنَا الْقَوَاعِدَ الَّتِي بَنِي الشَّرْعِ بَيَانِ صِفَاته تَعَالَى عَلَيْهَا كَما حررنا في صدر الباب، لكن كثيرا من النَّاسِ لَو أُبيح لهم الخوض في الصفات لضلوا، وأضلوا، وكثير من الصفات وَإِن كَانَ الْوَصْف بهَا جَائِزا في الأصل، لكن قوما من الكفَّار حملوا تِلْكَ الْأَلْفَاظ على غير محملها. وشاع ذلك فيما بينهم، فَكَانَ حكم الشرع النَّهْي عَن اسْتِعْمالها دفعا لتلك المفسدة، وكثير من الصفات يوهم استعمالها على ظواهرها خلاف المُرَاد ، فَوَجَبَ الاحْتِرَاز عَنْهَا فلهذه الحكم جعلها الشرع توقيفية، ولم يبح الْخُوْضِ فِيهَا بِالرَّأْيِ.
"আমি বলব, আল্লাহ তা'আলার গুণ শোনা, দেখা, ক্ষমতা, হাসা, কথা বলা, 'আরশের উপর উঠা এগুলো সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য নেই। কারণ সাধারণ ভাষাভাষীরা এসব শব্দ থেকে কেবল যা আল্লাহর সাথে উপযুক্ত নয় তা-ই বুঝে নেয়। (অর্থাৎ যদি তারা যা তাঁর জন্য উপযুক্ত সেভাবে তাঁর জন্য এ গুণাবলি সাব্যস্ত হবে বলতো, তবে তো কোনো সমস্যা হতো না)। (তাদের জন্য যা উপযোগী তার ওপর আল্লাহকে কিয়াস করার কারণে) তাদের কাছে আল্লাহর হাসা এজন্যই কি সমস্যা নয় যে, এটার জন্য তো মুখ লাগে? অনুরূপভাবে কথা বলার বিষয়টিও? অনুরূপ আল্লাহর পাকড়াও করা, অনুরূপ আল্লাহর অবতরণ করা এগুলো কি তাদের কাছে এজন্য অসম্ভব নয় যে, এগুলো সাব্যস্ত করতে গেলে হাত বা পা লাগে? অনুরূপ শোনা ও দেখার জন্যও তো কান ও চোখ লাগে। (যদি সৃষ্টির ওপর কিয়াস না করে তারা সেটাকে যেভাবে আল্লাহর জন্য উপযোগী সেভাবে সাব্যস্ত করতো তাহলে তো সমস্যা ছিল না।) আল্লাহই ভালো জানেন।
(আল্লাহর গুণ অস্বীকারকারী) এসব অনর্থক বাড়তি আলাপ-আলোচনাকারী গোষ্ঠী হাদীস শাস্ত্রবিদ মুহাদ্দিসদের ওপর তাদের আক্রমণ শানিত করেছে, তাদেরকে দেহবাদী ও সাদৃশ্যবাদী নামে নামকরণ করেছে। আরও বলেছে, এরা 'বালকাফাহ'র মাধ্যমে নিজেদেরকে আচ্ছাদিত করে রেখেছে। আমার কাছে সুস্পষ্টভাবে এটা প্রকাশ হয়েছে যে, আহলুল হাদীস বা হাদীসের অনুসারীদের ওপর এ গোষ্ঠীর অযাচিত এসব আক্রমণ কিছুই না (একেবারেই অগ্রহণযোগ্য)। বস্তুত হাদীস বিশারদদের বিরুদ্ধে এ গোষ্ঠীর বলা কথাগুলো সবই ভুল, বর্ণনার দিক থেকেও তারা ভুলে নিমজ্জিত, আর বুঝের দিক থেকেও দৈন্যতায় নিপতিত। আর হিদায়াতের ইমামগণের ওপর যেসব দোষ দিচ্ছে, সেসবে এসব অনর্থক বাড়তি আলোচনাকারী লোকেরাই ভুলের ওপর রয়েছে।
এর বিস্তারিত বর্ণনা হচ্ছে, এখানে দু'টি স্থান রয়েছে: (যেখানে এসব বাড়তি আলোচনাকারী লোকেরা ভুল করেছে)
প্রথমটি হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা এসব গুণে কীভাবে গুণান্বিত হলেন তার ধরন নির্ধারণ, এ গুণাবলি তাঁর সত্তার চেয়ে বাড়তি কিছু কিনা? আল্লাহর শোনা, দেখা ও কথা বলা ইত্যাদির হাকীকত কী? কারণ এসব গুণের বুঝ বাহ্যিক দৃষ্টিতে পবিত্রতম সত্তার মর্যাদার সাথে উপযোগী নয়। এখানে সত্য কথা হচ্ছে, নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ গুণের ধরন সম্পর্কে কোনো কথা বলেননি। বরং উম্মতকে এসবের ধরন খোঁজার ব্যাপারে কথা বলতে, গবেষণা করতে নিষেধই করেছেন। সুতরাং যা রাসূল নিষেধ করেছেন কারও জন্য সেটা খুঁজতে অগ্রণী হওয়ার অনুমতি নেই।
আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, কোন জিনিসটি দিয়ে শরী'আত মোতাবেক আমরা আল্লাহকে গুণান্বিত করা জায়েয হবে, আর কোন জিনিস দিয়ে আল্লাহকে গুণান্বিত করা জায়েয হবে না, তা নির্ধারণ করা। এখানে সত্য কথা হচ্ছে, আল্লাহর গুণসমূহ ও নামসমূহ তাওক্বীফী বা (আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জানানো নির্ভর), অর্থাৎ আমরা যদিও শরী'আতে এগুলোর বর্ণনা করার জন্য যে নীতিমালা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে তা জানতে পেরেছি, যেমনটি আমরা এ অধ্যায়ের শুরুতে আলোচনা করেছি। কিন্তু এমন বহু মানুষ আছে তাদেরকে যদি এসব গুণ (যা কুরআন-হাদীস নির্ভর নয়) তা চিন্তা করে সাব্যস্ত করতে বলা হয়, তবে তারা পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে অপরকেও পথভ্রষ্ট করবে; যদিও এসব গুণ (যা কুরআন ও হাদীসে আসেনি তা) দিয়ে গুণান্বিত করা মৌলিকভাবে জায়েয। কিন্তু কাফিরদের কিছু লোক এ শব্দগুলোকে (অপব্যাখ্যা করে) এমন অর্থে নিয়ে গেছে যা কখনও এগুলোর সঠিক অর্থ নয়, আর তাদের মধ্যে এসব ভুল গুণাবলি প্রচুর প্রসারও পেয়েছে। তাই শরী'আতের বিধান হলো তাদের দ্বারা (কুরআন ও হাদীসে যা আসেনি) তা ব্যবহার করা থেকে নিষেধ করা; সেটা ব্যবহারের সমূহ ফাসাদ থেকে মুক্ত থাকার জন্য। তাছাড়া (তাদের দ্বারা প্রদান করা) সেসব গুণের প্রকাশ্য অর্থের ব্যবহার কখনও কখনও তার উদ্দিষ্ট অর্থের বিপরীতও মনে হতে পারে, তাই সেসব (নিজেদের দেয়া গুণাবলি) থেকে অবশ্যই বেঁচে থাকতে হবে। এসব হিকমতের কারণেই শরী'আত সেসব গুণাবলিকে তাওক্বীফী অর্থাৎ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জানিয়ে দেয়ার ওপর নির্ভর জিনিস হিসেবে ঘোষণা করেছে, সেগুলোতে (নিজেদের) মত দিয়ে সাব্যস্ত করার নীতিকে জায়েয করেনি।”⁵
সুবহানাল্লাহ! শাইখ যেন বর্তমান যামানার আশ'আরী মাতুরিদীদের দ্বারা সঠিক আকীদাহ'র অনুসারী, আহলুস সুন্নাহ, আসহাবুল হাদীসের ওপর যেসব আক্রমণ হয় সেটাই বর্ণনা করছেন। তারা সঠিক আকীদাহ'র অনুসারীদেরকে দেহবাদী, সাদৃশ্যবাদী বলতে মোটেও পিছপা হয় না। আরেকটি বিষয় খুবই প্রণিধানযোগ্য, তা হচ্ছে, সহীহ আকীদাহ'র লোকেরা আল্লাহর গুণের ব্যাপারে সবসময় বলে আসছে একটি নীতির কথা, তা হচ্ছে অর্থ জানি, ধরণ জানি না। এটা আরবী নাম “বিলা কাইফ”। এটাকে আশ’আরী, মাতুরিদী ও এ জাতীয় লোকেরা বিকৃত করে বলে ‘বালকাইফা’। শাইখ এখানে সহীহ আকীদার পক্ষ নিয়ে তাদের দ্বারা সহীহ আকীদার লোকদের উপর যে মিথ্যা ও অযাচিত আচরণ করা হয় সেটার সমুচিত উত্তর দিয়েছেন।
* তাছাড়া ইমাম অন্যত্র বলেছেন,
والتشبيه عبارة عن إثبات الصفات البشرية (أو أي صفة من صفات المخلوقين) الله – تعالى – فكانوا يقولون مثلا: إن الملائكة بنات الله، وأن يقبل شفاعة عباده ولو لم يرض بها كما يفعل الملوك – أحيانا – مع الأمراء الكبار وحكام الولايات، وإنهم – لا يستطيعوا إدراك السمع والبصر حسبما يليق بشأن الألوهية – قاسوهما على أسماعهم وأبصارهم، ووقعوا في التجسيم.
"সাদৃশ্য নির্ধারণ বলতে বুঝায়, মানষীয় কোনো গুণ আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা, যেমন বলা, ফিরিশতাগণ আল্লাহর কন্যা এবং তিনি বান্দাদের শাফা’আত কবুল করবেন যদিও সে শাফা’আতে তিনি সন্তুষ্ট নন, যেমনটি রাজা-বাদশাহ্‌রা কখনও কখনও করে থাকে বড় বড় আমীরদের সাথে এবং বিভিন্ন প্রদেশের শাসকদের সাথে, অনুরূপ যখন তারা আল্লাহর শোনা ও দেখাকে ‘আল্লাহর উলুহিয়্যাতের সাথে যেভাবে উপযুক্ত সেভাবে’ সাব্যস্ত না করে সে গুণ দুটোকে তাদের নিজেদের শোনা ও দেখার ওপর কিয়াস করে নেয়, আর এভাবেই তারা আল্লাহর জন্য দেহ সাব্যস্ত করার মধ্যে পড়ে গেল।”⁶ এখানে তিনি বুঝিয়েছেন যে, তাশবীহ বা সাদৃশ্য স্থাপন তখনই হয় যখন কেউ আল্লাহর শোনা ও দেখাকে নিজেদের শোনা ও দেখার সাথে তুলনা করে, আল্লাহ তা’আলার শানের সাথে উপযোগী করে সাব্যস্ত না করে। আর এটাই সালাফদের বক্তব্য, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
* ইমাম দেহলবী রাহিমাহুল্লাহ ‘আল-ফাউযুল কাবীর’ গ্রন্থের অন্যত্র আল্লাহর গুণসমূহ বুঝা যে অত্যন্ত সহজ, তা যে বেদুইন ও সাধারণ লোক হতে শুরু করে সবাই বুঝতে পারত, আর তা বুঝতে যে ইলমুল কালাম ও দর্শনশাস্ত্র পড়া লাগে না তা বর্ণনা করে বলেন,
وضوح القرآن الكريم في بيان الصفات من المعلوم أن نزول القرآن الكريم إنما كان إصلاح النفوس البشرية، وتهذيب معاشر الناس سواء كانوا عرباً أو عجماً، بدواً أو حضراً، ولذلك اقتضت الحكمة الإلهية أن لا يخاطب الناس في «التذكير بآلاء الله» إلا ما تسمه معلوماتهم، وتحيط به مداركهم، وأن لا يخوض في البحوث الدقيقة والتحقيقات النادرة، فقد تعرض القرآن الكريم للأسماء والصفات الإلهية بطريقة واضحة سهلة، يدركها جميع أفراد البشر بفطرتهم، وبمداركهم التي أودعت في أصل خلقتهم من دون حاجة إلى ممارسة الفلسفة الإلهية، أو علم الإلهيات وعلم الكلام.
"আল-কুরআনুল কারীম আল্লাহ তা’আলার গুণ বর্ণনায় স্পষ্ট পদ্ধতি অবলম্বন করেছে।
জানা কথা যে, আল-কুরআনুল কারীম মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার জন্য এবং সব রকমের মানুষ, আরব, অনারব, বেদুইন ও শহরে সকলকে পরিশুদ্ধ-পরি পরিপাটি করার জন্য অবতরণ করা হয়েছে। তাই আল্লাহর প্রজ্ঞার চাহিদা হচ্ছে মানুষদেরকে তাঁর নি’আমত স্মরণ করাবার ব্যাপারে সম্বোধন কেবল সেটা দিয়েই করবেন যা তাদের জ্ঞান ধারণ করতে পারে আর যা তাদের জ্ঞানের পরিধির পরিসীমায় থাকবে। সেখানে যেন কোনো প্রকার সূক্ষ্ম গবেষণা কিংবা বিরল ব্যাখ্যার প্রতি তারা প্রবিষ্ট না হয়। সে জন্যই কুরআনুল কারীম আল্লাহর নাম ও গুণের ব্যাপারে প্রকাশ্য, সহজ ও সরল পদ্ধতির দিকে তাদেরকে পথনির্দেশ করেছে যা প্রতিটি মানুষ তাঁর স্বভাবজাত প্রকৃতি দিয়ে বুঝতে পারে, আর সে জ্ঞানের মাধ্যমেই বুঝতে পারে যা মহান রব তাদের সৃষ্টির সময় তাদের মধ্যে আমানত হিসেবে দিয়েছেন। তা বুঝার জন্য কোনো ফালসাফা ইলাহিয়্যাহ অথবা ইলমুল ইলাহিয়্যাহ কিংবা ইলমুল কালামের দ্বারস্থ করেননি।"⁷
* আল-ফাওযুল কাবীর গ্রন্থের অন্যত্র তিনি আল্লাহর গুণাবলির ক্ষেত্রে কুরআনুল কারীমের বর্ণনাশৈলী উল্লেখ করতে গিয়ে কেন সেটাকে সহজ করে বুঝের মধ্যে রাখা হয়েছে, কিন্তু সেটাতে কেন অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেয়ার ওপর নির্ভর করতে হবে তা বর্ণনা করেন,
الصفات الإلهية في القرآن:
ثم لما كان إثبات الصفات الإلهية يذكر كنهها وحقائقها ودقيق مسائلها مستحيلاً مستحيلاً، وكان تركهم من دون إطلاع على هذه الصفات الإلهية يحرمهم من معرفة الربوبية - التي هي أنفع وسيلة في تهذيب النفوس البشرية - كان حكمة الله - تعالى - وهو أحكم الحاكمين - أن يختار من الصفات البشرية التي نعهدها ونشاهدها والتي نتباحث بها، وصفات كريمة عديدة تستعمل لأداء معان غامضة دقيقة لا تبلغ جلالها وعظمتها عقول البشر، ثم يجعل قوله الفصل: لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ ترياقاً لداء الجهل العضال، وعلاجاً لقلة البصر والإدراك، وينهى عن استعمال تلك الصفات البشرية التي يخشى منها جموح الأوهام والظنون نحو العقائد الباطلة كإثبات الولد، والبكاء، والجزع وما إلى ذلك.
خطر الخوض في الصفات بدون توقيف:
وإذا أنعمت النظر وتأملت مسألة الصفات الإلهية بدقة تجلى لك أن خطوات الإنسان على درب علمه الفطري غير المكتسب، وتمييزه للصفات التي يجوز أن تنسب إلى الله - تعالى - ولا يقع فيها خلل، عن الصفات التي يؤدي استعمالها إلى الأوهام الباطلة والعقائد المنحرفة، أمر دقيق خطير للغاية لا يصل غوره ولا يكتنهه كنهه جمهور الناس، ولذلك قرر أن يكون علم الصفات الإلهية توقيفياً، ولا يسمح بالبحث والكلام بحرية وإطلاق.
"কুরআনে আল্লাহর গুণাবলি: তারপর যখন আল্লাহর গুণাবলি সাব্যস্ত করা, সেগুলোর প্রকৃত তথ্য, বাস্তব অবস্থা ও সেগুলোর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়াদি তাদের জন্য জানা অসম্ভব, আবার তাদেরকে আল্লাহর গুণাবলি সম্পর্কে কিছু না জানতে দিলে তারা আল্লাহর রুবুবিয়াতের পরিচয় থেকে মাহরুম হয়ে যাবে, যা মানব মনকে বিশুদ্ধ করার সবচেয়ে উপকারী মাধ্যম, তাই আল্লাহর হিকমতের দাবি হলো যে, -আর তিনি সকল প্রজ্ঞাবানদের চেয়ে উত্তম প্রজ্ঞাবান- মানুষের গুণাবলির মধ্যে সেগুলো তাঁর নিজের জন্য বর্ণনা করেছেন, যা আমরা চিনি, যা আমরা দেখি, যার দ্বারা আমরা পরস্পর প্রশংসা করি, যে গুণগুলো থাকলে আমরা গর্ব করি, এ রকম বিবিধ সম্মানিত গুণগুলো বর্ণনা করেছেন, যা দিয়ে তিনি সূক্ষ্ম, অপ্রকাশক অর্থ প্রকাশ করেছেন, যার মর্যাদা ও বড়ত্ব বুঝার ক্ষমতায় কোনো মানুষের বিবেকের যুক্তি পৌঁছতে পারে না। তারপর তিনি সেগুলোর জন্য একটি ফয়সালামূলক বাক্য বলে দিয়েছেন, 'তাঁর মত কোনো কিছু নেই' যাতে করে সে মারাত্মক অজ্ঞতার রোগ থেকে বাঁচার জন্য মহৌষধ হিসেবে, নিজের দেখা ও আয়ত্ব করার স্বল্পতা থেকে মুক্তির জন্য তা ব্যবহার করতে পারে। আর যাতে মানুষের গুণের মতো কোনো গুণ, যা তার ধারণার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে এমন কোনো বাতিল আকীদায় পতিত হওয়া থেকে নিষেধ করে দিয়েছেন, যেমন কেউ তার জন্য সন্তান, বা ক্রন্দন ইত্যাদি সাব্যস্ত না করে বসে।
আল্লাহ ও তাঁর রাসূল থেকে প্রাপ্ত (তাওক্বীফ নির্ভর) না হয়ে আল্লাহর গুণ সাব্যস্ত করার বিপদ: আর যদি আপনি আল্লাহর গুণাবলি নিয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে ভালো করে চিন্তা করেন ও গবেষণা করেন তাহলে আপনার কাছে স্পষ্ট হবে যে, মানুষ তার অনর্জিত স্বভাবজাত গুণের মাধ্যমে অগ্রসর হয়ে আল্লাহর দিকে কোন কোন গুণ সম্পৃক্ত করা যাবে, যা সম্পৃক্ত করলে কোনো ত্রুটিতে পড়বে না, আর তাঁর জন্য কোন কোন গুণ ব্যবহার করলে বাতিল চিন্তা ও বিকৃত আকীদায় পড়ে যাবে এ দু'য়ের মধ্যে পার্থক্য করা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও মারাত্মক সমস্যাসঙ্কুল স্থান। যার গভীরে পৌঁছা তার জন্য সম্ভব নয়, যার প্রকৃত রহস্য ভেদ করা সকলের জন্য সম্ভবপর নয়। এজন্য রাব্বুল আলামীন সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, আল্লাহর গুণের বিষয়টি তাওক্বীফী (আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কর্তৃক জানানো হতে) হবে, এগুলোতে পরিপূর্ণ স্বাধীনভাবে গবেষণা কাজ ও চিন্তা চলবে না।"⁸
মোটকথা, শাইখ শাহ ওয়ালীউল্লাহ আদ-দেহলাওয়ী রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহর নাম ও গুণের ক্ষেত্রে খাঁটি সালাফে সালেহীনের আকীদায় ছিলেন। কালামশাস্ত্রবিদদের ভুলসমূহ তিনি যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি বলেন যে তিনি প্রাচীন আহলুস সুন্নাহ'র আকীদায় বিশ্বাসী।⁹
আর যদি আমরা ইমাম শাহ ওয়ালীউল্লাহ আদ-দেহলাওয়ী রাহিমাহুল্লাহ লিখিত অনুবাদ দেখি, তাহলে আমরা স্পষ্ট এটা দেখতে পাই যে, তিনি “ইস্তেওয়া আলাল 'আরশ” কুরআনে কারীমের সর্বত্র অর্থ করেছেন باز مستقر شد بر عرش যার অর্থ, "তারপর তিনি 'আরশের উপরে অবস্থান করলেন।"¹⁰
অনুরূপভাবে তিনি তাঁর তা'ওয়ীল আহাদীস গ্রন্থে বলেন,
واعلم أن النبي صلى الله عليه وسلم لم يبح لنا بشيء من باب التفكر في الذات بل نهانا عنه.... فدخل في النهي مباحث الصفات، أعني حقائق صفاته تعالى وكيفية اتصافه بها، [مثل] أن السمع والبصر هما غير العلم أو عين العلم، والكلام نفسي أو شيء آخر، وعلى هذا القياس. اللهم أشياء وجد النبي نفوس العرب والعجم تدركها، وتصف الرب بها من تعظيم أو تقديس، وتنزيه وتشبيه لقدرته على الخلق بسياسة الملك ونحو ذلك، حيث رآهم لا يكمل لهم كمالهم إلا بمعرفتها، ووجدهم لا ينفكون عن وصف الرب بها في قرن من القرون. فينبئ التذكير بأيام الله وآلائه عليها واستعملها في كلامه كما يستعلمون لم يشتغل لشرح حقائقها واكتناه كنهها، ولم يتكعكع عن استعمال التشبيهات كاليد والرجل والضحك، ومضى على ذلك القرون المشهود لها بالخير. ثم نشأ ناس يسمون أنفسهم أهل السنة، والسنة عنهم بمراحل فيكلفوا ما لا يعنيهم وما لم يأت به نبيهم. فيا لهم من مصيبة عمت فأعمت، والله المستعان.
"আর জেনে রাখ, আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য আল্লাহর সত্তাতে চিন্তা করার কোনো কিছুই জায়েয করেননি। বরং তিনি তা থেকে আমাদেরকে নিষেধ করেছেন।... এ নিষেধাজ্ঞার ভেতরে প্রবেশ করেছে সিফাত বা আল্লাহর গুণাবলি বিষয়ক অধ্যায়ও। অর্থাৎ আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলির প্রকৃত স্বরূপ, সেগুলো দ্বারা তাঁর গুণান্বিত হওয়ার ধরন। [যেমন] শোনা ও দেখা এ দু'টি কি জ্ঞান ছাড়া অন্যকিছু নাকি জ্ঞানই? আল্লাহর কালাম কি কালামে নাফসী নাকি অন্য কিছু? অনুরূপ আরও যা যা তারা বলে থাকে, (এসবই প্রকৃত অবস্থান জানার প্রচেষ্টা, যা নিষিদ্ধ) তবে সেসব জিনিস অবশ্যই নিষিদ্ধ নয়, যেগুলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখেছেন যে, আরব ও অনারব সবার অন্তরে তা স্বভাবতই সহজে ধারণ করতে পারে, আর রবকে সেগুলোতে গুণান্বিত করার মাধ্যমে রবের সম্মান অথবা মর্যাদা, পবিত্রতা, সৃষ্টির ওপর তাঁর ক্ষমতা বুঝায়, রাজার রাজত্ব পরিচালনাজনিত কর্মকাণ্ড ইত্যাদি দিয়ে তিনি আল্লাহকে গুণান্বিত করতেন। কারণ তিনি দেখেছেন যে, রব সম্পর্কে তাদের জ্ঞানের পূর্ণতা কেবল এগুলো জানার মাধ্যমেই লাভ হতে পারে। তিনি আরও দেখেছেন, যুগ যুগ ধরে সেগুলো দ্বারা রবকে গুণান্বিত করা থেকে কেউ মুক্ত করেনি। তাই তিনি বান্দাদের ওপর আল্লাহর আযাব-গযবের দিনগুলোর স্মরণ করানো, তাদের ওপর তাঁর নি'আমতসমূহ স্মরণ করানোর জন্য এ গুণগুলো দিয়ে আল্লাহ সম্পর্কে জানাতেন। আর তিনি তাঁর কথা-বার্তায়, বাণী ও কালামে তা ব্যবহার করতেন, যেভাবে ইতোপূর্বে তা ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। তিনি কখনো সেসব গুণের ব্যাখ্যা ও সেগুলোর প্রকৃত রহস্য ব্যাখ্যায় রত হননি। হাত, পা, হাঁসি এ ধরনের সাদৃশ্য ব্যবহার করতে তিনি কখনো বিরত হননি, দ্বিধা করেননি। আর এর ওপরই চলে গেছে সেসব প্রজন্ম যাদের কল্যাণের ওপরে হওয়ার বিষয়টি সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত। তারপর কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটেছে যারা নিজেদেরকে 'আহলুস সুন্নাহ' দাবি করেছে, অথচ সুন্নাহ তাদের থেকে যোজন দূরত্বে, তারা এমন সব বিষয়ে নিজেদেরকে জোর করে নিয়োজিত করেছে যা অর্থহীন, তাদের কোনো কাজে লাগবে না আর এমন সব জিনিসের আমদানী ঘটিয়েছে যা তাদের নবী নিয়ে আসেননি। হায়! আফসোস, এর চেয়ে বড় বিপদ আর কী হতে পারে, যা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, আর সে ব্যাপকতা সবাইকে অন্ধ বানিয়ে দিয়েছে। আল্লাহই একমাত্র সাহায্যকারী। "¹¹
সুবহানাল্লাহ, কী সুন্দর করে শাইখ শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলাওয়ী রাহিমাহুল্লাহ এখানে আল্লাহর গুণাবলির ব্যাপারে তার বক্তব্য তুলে ধরেছেন। তিনি বলতে চেয়েছেন যে,
১- এ গুণাবলি দ্বারাই আল্লাহকে চেনা যাবে। এগুলো ছাড়া আল্লাহর মা'রেফত বা সত্যিকারের পরিচয় কেউ লাভ করতে পারবে না।
২- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম চেয়েছেন এর মাধ্যমেই আল্লাহর পরিচয় তুলে ধরতে।
৩- যে জিনিসটি নিয়ে আলোচনা করতে নিষেধ করেছেন তা হচ্ছে শুধু সে গুণাবলির প্রকৃত ধরন।
৪- আল্লাহর গুণাবলির ক্ষেত্রে নিষিদ্ধের অন্যতম উদারহণ হচ্ছে আল্লাহর শোনা ও দেখা নিয়ে এমন চিন্তা করা যে, সেগুলো কী জ্ঞানের অর্থে নাকি অন্য অর্থে? অনুরূপ আল্লাহর কালাম সেটা কী কালামে নাফসী নাকি অন্য কিছু? এ জাতীয় প্রশ্নই তো নিষিদ্ধ। স্বাভাবিকভাবে এগুলোর অর্থ বুঝা ও সেগুলোকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়াতে কোনো নিষিদ্ধতা নেই।
৫- আল্লাহর 'আযাব, গযব, শান্তি ও নিরাপত্তার বিষয়ে এ গুণাবলির মাধ্যমে যুগ যুগ ধরে রাসূলগণ জানিয়েছেন, আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাঁর উম্মতকে সেগুলোর মাধ্যমে তা জানিয়েছেন।
৬- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝেছিলেন যে, আরব হোক বা অনারব তাদের এ গুণাবলি বুঝতে কোনো বেগ পেতে হবে না।
৭- আগের নবী-রাসূলগণও নির্দ্বিধায় এসব গুণাবলি তাদের কথাবার্তায় ব্যবহার করতেন, যুগ যুগ ধরে তা ব্যবহৃত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাঁর কথা- বার্তায় এ গুণাবলি ব্যবহার করতে কোনো প্রকার অস্বস্তি কিংবা দ্বিধা কিছুই করেননি। সাবলীলভাবে তিনি সেটা বলে গেছেন আর শিক্ষিত, অশিক্ষিত, শহুরে, গ্রাম্য, স্থায়ী, বেদুঈন সবাই সেটা কোনো প্রকার সন্দেহ ছাড়াই বুঝে নিয়েছে, আল্লাহর পরিচয় পেয়েছে, সেগুলো থেকে হিদায়াত লাভ করেছে।
৮- হাত, পা, হাসি ইত্যাদি গুণ নিয়ে পরবর্তীরা যেসব চিন্তায় নিমগ্ন হয়েছে রাসূলের সাহাবী ও উত্তম প্রজন্মের কেউই সেগুলো নিয়ে কোনো প্রকার সমস্যা অনুভব করেননি।
৯- এ জাতীয় আংশিক সাদৃশ্যপূর্ণ (অর্থাৎ শব্দ ও অর্থগত মিল সম্পন্ন) শব্দ দিয়েই তিনি এ গুণগুলো বর্ণনা করেছেন, যাতে রাজার রাজত্ব চালাতে প্রজাদের যা বুঝালে তারা বুঝে সে রকম করে মহা রাজাধিরাজ রাব্বুল আলামীনের সেসব গুণকে তিনি আমাদেরকে শব্দ ও অর্থে সাদৃশ্যসহই বুঝিয়েছেন; যাতে সে গুণ বুঝতে অসুবিধা না হয়। শরী'আতে যে সাদৃশ্য নিষিদ্ধ সেটা এ সাদৃশ্য নয় (যা তিনি অন্যত্র বলেছেন)।
১০- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনও সেসব গুণের প্রকৃত রহস্য ও আসল রূপ খোঁজার দিকে মনোনিবেশ করেননি, অন্য কাউকেও সেটা করার নির্দেশনা দেননি।
১১- পরবর্তীরা (আশ'আরী ও মাতুরিদী সম্প্রদায়ের) যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের উক্ত পদ্ধতি অনুসরণ না করেও নিজেদেরকে আহলুস সুন্নাত দাবি করে থাকে, তিনি তাদের সে মিথ্যা দাবির অসারতা তুলে ধরে বলেছেন, এরা সুন্নাহ থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছে।
১২- পরবর্তীরা এসব ফেরকার লোকেরা বস্তুত এমন সব অপব্যাখ্যা কিংবা অর্থহীন করার নীতি অবলম্বন করেছে যা তাদের নবী কখনও অনুমোদন করেননি।
১৩- এ বিপদ সর্বগ্রাসী। এ বিপদের জন্য তিনি শুধু আফসোস করে গেছেন। এর বিপরীত শ্রোত যে কথা বেশি ও ভয়াবহ তা তাঁর আক্ষেপ থেকেই বুঝা যায়।
* অনুরূপভাবে শাহ সাহেব রাহিমাহুল্লাহ আল-আক্বীদাতুল হাসানায় বলেন,
وَهُوَ فَوْقَ الْعَرْشِ كَمَا وَصَفَ نَفْسَهُ، وَلَكِنْ لَا بِمَعْنَى التَّحَيُّزِ وَالْجِهَةِ، بَلْ لَا يَعْلَمُ كُنْهَ هَذَا التَّفَوُّقَ وَالْإِسْتِوَاءَ إِلَّا هُوَ
"আর তিনি (আল্লাহ তা'আলা) 'আরশের উপর, যেমনটি তিনি তাঁর নিজের গুণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে 'আরশের উপরে থাকার অর্থ কোনো জায়গা বা দিকের ভেতরে থাকা নয়।¹⁴ এ 'ফাওক্বিয়াত' এবং 'ইস্তেওয়া'র এর হাকীকত তথা প্রকৃত ধরন তিনি ছাড়া আর কেউ জানে না।"¹⁵
এর দ্বারা বুঝা গেল যে, শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলাওয়ী রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহর জন্য তাঁর 'আরশের উপরে উঠা ও 'আরশের উপরে অবস্থানের আকীদাহ পোষণ করতেন, তবে তিনি এর প্রকৃত ধরন নির্ধারণের বিষয়টি আল্লাহর দিকে সোপর্দ করতেন। তারপর তিনি সতর্ক করলেন যে, 'আরশের উপর থাকা বলে কোনো জায়গার ভেতরে সীমাবদ্ধতা বুঝায় না। বস্তুত আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আত একই কথা সবসময় বলে এসেছে। আল-আকীদাতুল হাসানাহ একটি মূল্যবান কিতাব। যার সঠিক ব্যাখ্যা হয়ে আসলে সেটা আকীদাহ'র ক্ষেত্রে সঠিক ধারাকে বিকশিত করবে। আল্লামা সিদ্দিক হাসান খান ভূপালী আরবী ভাষায় তার যে ব্যাখ্যা করেছেন সেটাই গ্রহণযোগ্য। দুর্ভাগ্যবশত, কিছু লোক আছে যারা ইমাম দেহলাওয়ীর এ আকীদাকে পরবর্তী আশ'আরী ও মাতুরিদী আকীদাহ'র নামে জাহমিয়‍্যাহ ও মু'তাযিলাদের আকীদাহ প্রচার করার জন্য ব্যাখ্যা করার জন্য সেটাকে বিকৃত করেছে।
টিকাঃ
১. হুজ্জাতিল্লাহিল বালিগাহ (১/১৯৯); দীন সহজ অধ্যায়।
২. আল-ফাদ্বলুল মুবীন, ১১।
৩. হুজ্জাতিল্লাহিল বালিগাহ (১/১২৩)।
৪. দেহলাওয়ী, হুজ্জাতিল্লাহিল বালিগাহ (১/১২৪); ইবন হাজার, ফাতহুল বারী (১৩/৩৯০)।
৫. দেহলাওয়ী, হুজ্জাতিল্লাহিল বালিগাহ (১/১২৪)।
৬. আল-ফাউযুল কাবীর, পৃ. ৩৭-৩৮।
৭. আল-ফাওযুল কাবীর পৃ. ৬৩।
৮. আল-ফাওযুল কাবীর (৬৪-৬৫)।
৯. আত-তাফহীমাত (২/২৪০)।
১০. দেহলাওয়ী, ফাতহুর রহমান পৃ. ১৬০-১৬১।
১১. দেহলাওয়ী, তা'ওয়ীলুল আহাদীস, পৃ. ৯২-৯৩।
১২. তাক্বওয়িয়াতুল ঈমান, পৃ. ১৬১।
১৩. দেহলাওয়ী, তা'ওয়ীলুল আহাদীস, পৃ. ৯২-৯৩।
১৪. এখানে আমরা দিকের ভেতরে নয় এ অর্থ এজন্য করেছি, কারণ তিনি নিজেই অন্যত্র আল্লাহ তা'আলার জন্য দিক সাব্যস্ত করেছেন এবং এটাকে ইসলাম সহজ ও সঠিক দীন হওয়ার প্রমাণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দেখুন, হুজ্জাতিল্লাহিল বালিগাহ (১/১৯৯)।
১৫. আদ-দেহলাওয়ী, আল-আকীদাতুল হাসানাহ, পৃ. ৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00