📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 জামালুদ্দীন ইবন আবদুল হাদী ইবনুল মাবরিদ (৮০৩ হিজরী)

📄 জামালুদ্দীন ইবন আবদুল হাদী ইবনুল মাবরিদ (৮০৩ হিজরী)


ইমাম ইউসুফ ইবন আবদুল হাদী সহীহ আকীদাহ'র লোক ছিলেন। তিনি সাহাবায়ে কেরাম, তাবে'য়ীন, আসহাবুল হাদীসের আকীদাহ সাব্যস্ত করার জন্যই ইমাম ইবন আসাকির এর বিরোধিতায় 'জাম'উল জুয়ূশ ওয়াদ দাসাকির ফির রাদ্দি 'আলা ইবন আসাকির' গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। তাছাড়া তিনি আকীদাহ'র ওপরও গ্রন্থ রচনা করেন, যাতে তিনি তা'ওয়ীল এর বিরোধিতা করেন। তাঁর 'তুহফাতুল উসূল ইলা ইলমিল উসূল' সেটার ওপর প্রমাণবহ। তুহফাতুল উসূল গ্রন্থে আমরা দেখতে পাই, তিনি অধ্যায় বিন্যাস করেছেন,
فصل: الباري سبحانه مختص به العلو دون غيرها من الجهات .....
واتفق أصحابنا أنه فوق السبع سماوات، ويجوز أن يقال هو في السماء لنص الأحاديث على ذلك، والمراد فوقها، قال ابن حامد ومن المتعلق بصفات الذات إثبات الذات في المكان، قال: وقد نص أحمد على ذلك، وهو قول سائر أهل الصلاة، إثبات الذات على العرش، وعلمه بكل مكان....
ولا يختلف أصحابنا أن الله تعالى مستو على عرشه ....
"অধ্যায়, আল্লাহ সুবহানাহু উপরের দিক দ্বারা সুনির্দিষ্ট, অন্য কোনো দিক নয়"।
আর আমাদের মাযহাবের আলেমগণ একমত যে, আল্লাহ সাত আসমানের উপর। তবে এভাবে বলা জায়েয আছে যে, তিনি আসমানে, কারণ হাদীসে এমন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। অবশ্য তখন উদ্দেশ্য হবে, আসমানের উপরে। ইবন হামেদ বলেন, আল্লাহ তা'আলার সত্তাগত গুণের মধ্যে যা সম্পর্ক রাখে তা হচ্ছে তার জন্য স্থান সাব্যস্তকরণ। তিনি বলেন, ইমাম আহমাদ স্পষ্ট করে তা বলেছেন, আর এটি সকল সালাত আদায়কারীর বক্তব্য, তাঁর সত্তা 'আরশের উপর, তাঁর জ্ঞান সকল জায়গায়। ...
আর আমাদের মাযহাবের আলেমগণের মাঝে দ্বিমত নেই যে, নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপর আরোহণ করেছেন।"¹
জাম'উল জুয়ূশ গ্রন্থে তিনি ইমাম খুযাইমাহ থেকে বর্ণনা করেন, «من لم يقل إن الله في السماء على العرش استوى ضربت عنقه، وألقيت جثته على مزبلة بعيدة عن البلد حتى لا يتأذى بنتن ريحها أحد من المسلمين ولا من المعاهدين».
"যে কেউ এটা বলবে না যে, আল্লাহ তা'আলা আসমানের উপর 'আরশের উপরে উঠেছেন, তার শাস্তিবিধান করা হবে, তার ঘাড় থেকে মাথা আলাদা করা হবে (মুরতাদ হিসেবে), তার শরীর কোনো ময়লার স্তুপে ফেলে দেয়া হবে, শহরের বাইরে, যাতে কোনো মুসলিম ও সাধারণ অমুসলিম তার দুর্গন্ধ দ্বারা কষ্ট না পায়।"²
এর মাধ্যমে তিনি প্রশাসনিক বিচারের অবস্থা বর্ণনা করেছেন। কারণ কোনো মুসলিমের আল্লাহ সম্পর্কে আকীদাহ বিশ্বাস বিনষ্ট হয়ে গেলে প্রথমে তাকে তা জানাতে হবে, তার সন্দেহ থাকলে দূর করতে হবে, কিন্তু তারপরও যারা তা শুনবে না, ইমাম ইবন খুযাইমার দৃষ্টিতে সে প্রশাসন থেকে মুরতাদ হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি প্রাপ্ত হবে। মুসলিমদের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে না।
তিনি অন্যত্র ইমাম আবুল হাসান আল-আশ'আরী সম্পর্কে বলেন, «قُلْتُ: بَلْ مَذْهَبُهُ التَّأْوِيلُ، وَرَدَّ آيَاتِ الصَّفَاتِ وَالْأَحَادِيثِ بِالتَّأْوِيلِ الْعَقْلِي، فَالْمُعْتَزِلَةُ وَالْجُهْمِيَّةُ صَرَّحُوا بِالنَّفْيِ، وَهُوَ مَوَّهَ عَلَى النَّاسِ، وَحَقِيقَةُ قَوْلِهِ النَّفْيُ الأَنَّهُ أَثْبَتَ الصَّفَاتِ وَتَأَوَّلَهَا وَرَدَّ غَالِبَهَا إِلَى غَيْرِ الظَّاهِرِ مِنْهُ بِحُجَجِهِ الْعَقْلِيَّةِ وَتَرَكَ الأُمُورَ النَّفْلِيَّةَ، وَتَحَلُّ الإِنْصَافِ أَنَّ مَا حَكَاهُ عَنْهُ فِي الاعْتِقَادِ فِيهِ الْخُطَأُ وَالصَّوَابُ وَفِيهِ الْحُسُنِ وَالرَّدِيء».
"আমি বলবো, বরং তার মাযহাব ছিল তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করার; আল্লাহর গুণাবলি সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীসসমূহের বিবেকের যুক্তি দিয়ে অপব্যাখ্যা করা; জাহমিয়্যাহ আর মু'তাযিলারা সরাসরি অস্বীকার করেছে, আর তিনি মানুষের উপর নিজের মত লুকানোর কাজ করেছে। তার প্রকৃত কথা হচ্ছে অস্বীকার করা; কারণ আল্লাহর গুণাবলি সংক্রান্ত আয়াতসমূহ সাব্যস্ত করেছে তবে তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করেছে, অধিকাংশকেই তার প্রকাশ্য অর্থের বিপরীতে নিয়ে গেছে, তার নিজের বিবেকের যুক্তির প্রমাণ দিয়ে, কুরআন ও সুন্নাহ'র বিষয়গুলো ছেড়ে দিয়েছে। তার ব্যাপারে ইনসাফের কথা হচ্ছে, তিনি আকীদাহ হিসেবে যা বর্ণনা করেছেন তার মধ্যে ভুল ও সঠিক উভয়টিই আছে, আছে তাতে ভালো ও মন্দ।”³
বস্তুত ইমাম ইউসুফ ইবন আবদুল হাদীর কাছে ইমাম আশ'আরীর জীবনের তৃতীয় অধ্যায় অর্থাৎ পরিপূর্ণভাবে সালাফে সালেহীনের আকীদায় ফিরে আসার বিষয়টি প্রমাণিত হয়নি, তাই তিনি ইমাম আশ'আরীর বিরোধিতায় এসব কথা বলেছেন। আল্লাহ তাকে ও ইমাম আশ'আরীকে ক্ষমা করুন। আমাদের দেখার বিষয় হচ্ছে, সহীহ আকীদাহ'র প্রতি তার প্রচণ্ড আত্মমর্যাদাবোধ তাকে ইমাম আশ'আরী সম্পর্কে এ কথা বলতে বাধ্য করেছে। তাছাড়া উক্ত গ্রন্থে তিনি অন্য গ্রন্থে ইমাম লালেকাঈ থেকে মু'তাযিলাদের আকীদাহ বর্ণনা করে তা খণ্ডন করেন,
وأنكروا أن يكون الله يدان مع قوله : (لما خلقت بيدي) [ ص: ٧٥] ، وأنكروا أن يكون الله عينان مع قوله: (تجري بأعيننا ) [القمر: ١٤ ] ، ولقوله : ( ولتصنع على عيني) [طه: ٣٩].
ونفوا ما روي عن النبي صلى الله عليه وسلم من قوله: «إن الله ينزل إلى السماء الدنيا ... " ٤ ، فإن قال قائل: قد أنكرتم قول المعتزلة، والقدرية، والجهمية، والحرورية، والرافضة، والمرجئة فعرفونا قولكم الذي تقولون، وديانتكم التي بها تدينون، قيل له : قولنا الذي به نقول وديانتنا التي ندين بها التمسك بكتاب الله وسنة نبيه صلى الله عليه وسلم وما روي عن الصحابة، والتابعين، وأئمة الحديث، ونحن بذلك معتصمون، وبما كان عليه أحمد بن حنبل قائلون.
"আর তারা অস্বীকার করেছে যে আল্লাহর দু'টি হাত রয়েছে, অথচ আল্লাহ বলেন, “যা আমি আমার দু' হাতে সৃষ্টি করেছি” [সূরা সাদ, আয়াত: ৭৫], তারা আরও অস্বীকার করে যে তাঁর দু'টি চোখ রয়েছে, অথচ আল্লাহ বলেন, “সে জাহাজ আমাদের দেখার মাঝে চলছিল।” [সূরা আল-ক্বামার, আয়াত: ১৪], অপর বাণী "আর যাতে আপনি আমার চোখের সামনে গড়ে উঠতে পারেন।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ৩৯]
তারা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যা বর্ণিত হয়েছে যে "আল্লাহ নিকটতম আসমানে নেমে আসেন" তা অস্বীকার করে। যদি কোনো ব্যক্তি প্রশ্ন করে বলে, আপনি তো মু'তাযিলা, কাদরিয়া, জাহমিয়্যাহ, হারুরিয়া, রাফেদ্বা, মুরজিয়াদের বক্তব্য অস্বীকার করলেন, তাহলে আমাকে জানান আপনার বক্তব্য কী? আপনি কী আকীদাহ পোষণ করেন? তাকে বলা হবে, আমাদের আকীদাহ-বিশ্বাস যা আমরা বলে থাকি, আর যা দীন হিসেবে আমরা গ্রহণ করে থাকি, তা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব ও নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ আঁকড়ে থাকা, আরও আঁকড়ে থাকা যা সাহাবায়ে কেরাম থেকে এসেছে, তাবে'য়ীনদের কাছ থেকে এসেছে, হাদীসের ইমামগণের কাছ থেকে বর্ণিত হয়েছে, আমরা সেটাকে কঠোরভাবে ধরে রাখি আর যার ওপর ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল ছিলেন সেটাকেই বলে থাকি।”⁵
মোটকথা, ইবনুল মাবরিদ তাঁর সকল গ্রন্থেই আল্লাহ তা'আলার জন্য সকল গুণাবলি সাব্যস্ত করেছেন। তন্মধ্যে তাঁর 'আরশের উপরে উঠা এবং 'আরশের উপর থাকার বিষয়টি বিশেষভাবে বর্ণনা করেছেন।
টিকাঃ
১. তুহফাতুল উসূল পাণ্ডুলিপি পাতা, ২৩-২৪।
২. [ইউসুফ ইবন আবদুল হাদী, জাম'উল জুয়ুশি ওয়াদ দাসাকির, পৃ. ৯৪]
৩. জাম'উল জুয়শি ওয়াদ দাসাকির, পৃ. ১৪৪।
৪. জাম'উল জুয়ুশি ওয়াদ দাসাকির, পৃ. ১৪৪।
৫. জাম'উল জুয়ুশি ওয়াদ দাসাকির, পৃ. ১৪৪।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 আবুল হাসান নূরুদ্দীন ইবন আবূল হাদী, আস-সিনফী (১১০৮ হিজরী)

📄 আবুল হাসান নূরুদ্দীন ইবন আবূল হাদী, আস-সিনফী (১১০৮ হিজরী)


ইমাম নূরুদ্দীন আস-সিন্দী আল-হানাফী রাহিমাহুল্লাহ অধিকাংশ হাদীস গ্রন্থের ওপর হাশিয়া বা টীকা সংযোজন করেছেন। তিনি বিভিন্ন জায়গায় তা'ওয়ীল করলেও এক জায়গায় যখন তা'ওয়ীলের অসারতা তার কাছে স্পষ্ট হয় তখন বলেন,
وَالْحَقُّ فِي هَذَا الْحَدِيثِ وَكَذَا فِيمَا قَبْلَهُ وَبَعْدَهُ مَا ذَكَرَهُ الْمُحَقِّقُونَ قَالَ الْبَغَوِيُّ فِي شَرْحِ السُّنَّةِ كُلُّ مَا جَاءَ فِي الْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ مِنْ هَذَا الْقَبِيلِ فِي صِفَاتِهِ تَعَالَى كَالنَّفْسِ وَالْوَجْهِ وَالْعَيْنِ وَالْأُصْبُعِ وَالْيَدِ وَالرِّجْلِ وَالْإِنْيَانِ وَالْمَجِيءِ وَالنُّزُولِ إِلَى السَّمَاءِ وَالِاسْتِوَاءِ عَلَى الْعَرْشِ وَالضَّحِكِ وَالْفَرَحِ فَهَذِهِ وَنَظَائِرُهَا صِفَاتُ اللَّهِ تَعَالَى عَزَّ وَجَلَّ وَرَدَ بِهَا السَّمْعُ فَيَجِبُ الْإِيمَانُ بِهَا وَإِبْقَاؤُهَا عَلَى ظَاهِرِهَا مُعْرِضًا فِيهَا عَنِ التَّأْوِيلِ مُجْتَنِبًا عَنِ التَّشْبِيهِ مُعْتَقِدًا أَنَّ الْبَارِيَ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى لَا يُشْبِهُ مِنْ صِفَاتِهِ صِفَاتُ الْخَلْقِ كَمَا لَا تُشْبِهُ ذَاتُهُ ذَوَاتِ الْخُلْقِ قَالَ تَعَالَى لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ [الشورى: ١١] وَعَلَى هَذَا مَضَى سَلَفُ الْأُمَّةِ وَعُلَمَاءُ السُّنَّةِ تَلَقَّوْهَا جَمِيعًا بِالْقَبُولِ وَتَجَنَّبُوا فِيهَا عَنِ التَّمْثِيلِ وَالتَّأْوِيلِ وَوَكَّلُوا الْعِلْمَ فِيهَا إِلَى اللَّهِ تَعَالَى كَمَا أَخْبَرَ سُبْحَانَهُ عَنِ الرَّاسِخِينَ فِي الْعِلْمِ فَقَالَ عَزَّ وَجَلَّ وَالرَّاسِخُونَ فِي الْعِلْمِ يَقُولُونَ آمَنَّا بِهِ كُلٌّ مِنْ عِنْدِ رَبِّنَا [آل عمران: ٧] قَالَ سُفْيَانُ بْنُ عُيَيْنَةَ كُلُّ مَا وَصَفَ اللَّهُ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى بِهِ نَفْسَهُ فِي كِتَابِهِ فَتَفْسِيرُهُ قِرَاءَتُهُ وَالسُّكُوتُ عَلَيْهِ لَيْسَ لِأَحَدٍ أَنْ يُفَسَّرَهُ إِلَّا اللهُ عَزَّ وَجَلَّ وَرُسُلُهُ وَسَأَلَ رَجُلٌ مَالِكَ بْنَ أَنَسٍ عَنْ قَوْلِهِ تَعَالَى الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى [ طه : ٥] كَيْفَ اسْتَوَى فَقَالَ الاسْتِوَاءُ غَيْرُ مَجْهُولٍ وَالْكَيْفُ غَيْرُ مَعْقُولٍ وَالْإِيمَانُ بِهِ وَاجِبٌ وَالسُّؤَالُ عَنْهُ بِدْعَةٌ وَمَا أَرَاكَ إِلَّا ضَالَّا وَأُمِرَ بِهِ أَنْ يُخْرَجَ مِنَ الْمُجْلِسِ وَقَالَ الْوَلِيدُ بْنُ مُسْلِمٍ سَأَلْتُ الْأَوْزَاعِيَّ وَسُفْيَانَ بْنَ عُيَيْنَةَ وَمَالِكًا عَنْ هَذِهِ الْأَحَادِيثِ فِي الصَّفَاتِ وَالرُّؤْيَةِ فَقَالَ أَمِرُّوهَا كَمَا جَاءَتْ بِلَا كَيْفِ وَقَالَ الزُّهْرِيُّ عَلَى اللَّهِ الْبَيَانُ وَمَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ [النور: ٥٤] وَعَلَيْنَا التَّسْلِيمُ وَقَالَ بَعْضُ السَّلَفِ قَدْمُ الْإِسْلَامِ لَا تَثْبُتُ إِلَّا عَلَى قَنْطَرَةِ التَّسْلِيمِ انْتَهَى وَبِنَحْوِ هَذَا صَرَّحَ كَثِيرٌ مِنَ الْمُحَقِّقِينَ فَعَلَيْكَ بِهِ وَاللَّهُ الْمُوَفِّقُ.
"আর সত্য ও সঠিক কথা হচ্ছে, এ হাদীস, অনুরূপ যা এর আগে এসেছে এবং যা এর পরে আসছে সেসব হাদীসের ক্ষেত্রে তাই গ্রহণ করতে হবে যা মুহাক্কিক বা সত্যনিষ্ঠ আলেমগণ বলেছেন, ইমাম বাগাওয়ী তাঁর শারহুস সুন্নাহ গ্রন্থে বলেন, কুরআন ও সুন্নায় আল্লাহ তা'আলার এ রকম যত গুণ এসেছে যেমন, নফস, চেহারা, চোখ, হাত পা, আসা, আগমন করা, নিকটতম আসমানে অবতরণ করা, 'আরশের উপরে উঠা, হাসা ও খুশি হওয়া, এগুলো এবং অনুরূপ আরও যা এসেছে, সবই আল্লাহর গুণাবলি। কুরআন ও সুন্নায় যা এসেছে, সেগুলোর অর্থের ওপর ঈমান আনতে হবে, সেগুলোকে তার প্রকাশ্য অর্থে পরিচালিত করতে হবে, তা'ওয়ীল বা অপব্যখ্যা করে দূরবর্তী অর্থ গ্রহণ করা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকতে হবে। তাশবীহ থেকে বেঁচে থাকতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে যে, মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর কোনো গুণ সৃষ্টির কোনো গুণের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়। যেমন তাঁর সত্তা সৃষ্টির কোনো সত্তার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়। মহান আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন, "তাঁর মতো কোনো কিছু নেই, আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা”। [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১]
আর এ নীতির ওপরই উম্মতের সালাফে সালেহীন, সুন্নাহর ইমামগণ সবাই গত হয়েছেন। তারা এগুলোর ওপর ঈমান এনেছেন এগুলোকে গ্রহণ করে নিয়েছেন। এগুলো থেকে তামছীল (সৃষ্টির কারও অনুরূপ বলা) ও তা'ওয়ীল (অপব্যাখ্যা) করা থেকে দূরে থেকেছেন। তারা এগুলোর প্রকৃত জ্ঞান মহান আল্লাহ তা'আলার কাছে সোপর্দ করেছেন। যেমন মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা ইলমে সুদৃঢ় লোকদের সম্পর্কে বলেছেন, "আর যারা ইলমে সুদৃঢ় তারা বলে, আমরা এগুলোর ওপর ঈমান আনলাম, এসবই আমাদের রবের পক্ষ থেকে এসেছে। [সূরা আলে ইমরান: ০৭]
ইমাম সুফইয়ান ইবন 'উয়াইনাহ বলেন, "মহান আল্লাহ তাঁর কুরআনে যা দিয়ে নিজেকে গুণান্বিত করেছেন সেগুলোর ব্যাখ্যা হচ্ছে, সেগুলো পাঠ করে বুঝে নিয়ে চুপ থাকা, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ব্যতীত কারও জন্য সেগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা করার অধিকার নেই"।
এক ব্যক্তি ইমাম মালেক ইবন আনাস রাহিমাহুল্লাহকে মহান আল্লাহর বাণী "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন" [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫] এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে উঠলেন? তিনি জবাবে বললেন, "উপরে উঠার বিষয়টি অজানা নয়, এর ধরন বিবেকের যুক্তি দ্বারা প্রাপ্য বিষয় নয়, আর এর উপর ঈমান আনা ফরয, এর ধরণ সম্পর্কে প্রশ্ন করা বিদ'আত। আর আমি তো তোমাকে একজন পথভ্রষ্ট লোকই দেখতে পাচ্ছি, আর তাকে মজলিস থেকে বের করে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হলো।"
ইমাম ওয়ালীদ ইবন মুসলিম বলেন, আমি ইমাম আওযা'ঈ, সুফইয়ান ইবন 'উয়াইনাহ, মালেক ইবন আনাসকে আল্লাহ তা'আলার গুণাবলি ও আল্লাহ তা'আলাকে দেখার ব্যাপারে আসা হাদীসসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি, তারা সবাই বলেছেন, "এগুলোকে যেভাবে এসেছে সেভাবে বুঝে চালু করে দাও, তবে ধরন নির্ধারণ করো না।"
ইমাম যুহরী বলেন, "আল্লাহর পক্ষ থেকে বর্ণনা এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে সেটা পৌঁছানোই দায়িত্ব [সূরা আন-নূর, আয়াত: ৫৪] আর আমাদের ওপর কর্তব্য হচ্ছে সেটা মেনে নেয়া।"
সালাফদের কেউ কেউ বলেছেন, ইসলামে কারও পা দৃঢ় ততক্ষণ হবে না, যতক্ষণ না মেনে নেয়ার সাঁকোতে আরোহণ করবে।" এতটুকু ইমাম বাগাওয়ী বলেছেন। বস্তুত এমন কথাই স্পষ্ট করে বহু সত্যনিষ্ঠ আলেম বলেছেন। সুতরাং তোমার ওপর কর্তব্য হচ্ছে এটা গ্রহণ করে নেয়া। আল্লাহই তাওফীক্বদাতা।"¹
এর দ্বারা বুঝা গেল, এ বিখ্যাত হানাফী আলেম তাঁর জীবনের ইলমী অভিজ্ঞতায় এ সত্যকেই বিশ্বাস করে নিয়েছেন যে, আল্লাহ তা'আলার গুণাবলিকে অপব্যাখ্যা কিংবা অর্থহীন করা যাবে না। আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠার বিষয়টিও স্বীকার করে নিতে হবে। আর তাই তিনি সেটাকে গ্রহণ করে নেয়ার জন্য সকলকে আহ্বান জানিয়েছেন।
টিকাঃ
১. সিন্দী, হাশিয়াতুস সিন্দী, কিফায়াতুল হাজাহ ফী শারহি সুনani ইবন মাজাহ ১/৮৮-৮৯।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 আশ-শাইখ আল-মুহাদ্দিস মুহাম্মাদ কাছের ইদাহবাদী (১১৮৪ হিজরী)

📄 আশ-শাইখ আল-মুহাদ্দিস মুহাম্মাদ কাছের ইদাহবাদী (১১৮৪ হিজরী)


মদীনার বিখ্যাত শাইখ মুহাম্মাদ হায়াত সিন্ধী রাহিমাহুল্লাহ'র সুযোগ্য ছাত্র, আশ-শাইখ আল-মুহাদ্দিস মুহাম্মাদ ফাখের ইবন মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া ইবন মুহাম্মাদ আমীন আল-আব্বাসী, আল-ইলাহাবাদী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
وهو فوق العرش وفوق السموات، والعرش وما حواه في يده كخردلة في يد أحدنا، وعلمه محيط بالكائنات السفلية والعلوية، فما كان وما يكون محاط له، كما قال: الرحمن على العرش استوى) [طه: 5] وأحاط بكل شيء علماً، وهذا الاستواء في سبع مواضع من القرآن الكريم، والأصل أن يعتقد ما ورد به القرآن ولا يأوله، ولا يصرفه عن وجهه، ... ثم قال بعد سرد الأدلة من القرآن وأدلة علو العلي الأعلى في القرآن تزيد على ذلك وهو نص أو ظاهر في أن الله تعالى فوق الخلق فوق العرش، بائن من المخلوقات بالمعنى الذي يليق بجنابه الأقدس، وتأويله إخراج النص أو الظاهر عن معناه، وذلك لا يجوز قطعاً، إلا عند معارضة المثل ووجدانه ودونه خرط القتاد، وقوله ليس كمثله شيء﴾ [الشورى: ۱۱] لا ينافي ذلك؛ لأن المراد إما مماثلة بجميع الوجوه، كما يقول أهل السنة، أو في أخص الأوصاف كما يقوله المعتزلة، وكلاهما مفقودان في هذا المقام، وهكذا حكم الأحاديث الشريفة النبوية على صاحبها الصلاة والسلام أن يؤمن بها، بما ورد فيها، ويعلم أن الصرف وتأويل العقول الضعيفة حلقة خارج الباب، ... ثم سرد الأحاديث وقال في آخرها وفي الباب أحاديث كثيرة عسيرة الاستقصاء في هذه المقدمة في غاية الكثرة، والآيات والأحاديث تغني عن إيرادها. انتهى.
"আর তিনি (আল্লাহ) 'আরশের উপর, আসমানসমূহের উপর, 'আরশ ও এর চারপাশে যা আছে সবই তাঁর হাতে আমাদের কারও হাতে অবস্থিত যেমন শর্ষে দানার মতো। আর তাঁর জ্ঞান নিচ ও উপরের যাবতীয় সৃষ্টিকে পরিবেষ্টন করে আছে। সুতরাং যা হয়েছে আর যা হবে সবই তাঁর জ্ঞানে পরিবেষ্টিত। যেমন তিনি বলেন, "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫], আর তিনি সবকিছুকে জ্ঞানে পরিবেষ্টন করে আছেন। এই যে ইস্তেওয়া ('আরশের উপর উঠা) গুণটি কুরআনে কারীমের সাত জায়গায় এসেছে। এ ব্যাপারে মূলনীতি হলো, কুরআনে কারীমে যা এসেছে তাতে বিশ্বাস স্থাপন করা, কোনো প্রকার অপব্যাখ্যার আশ্রয় না নেয়া আর সেগুলোকে তাঁর দিক থেকে অন্যদিকে প্রত্যাবর্তন না করানো। ..... তারপর তিনি কুরআনের দলীল উল্লেখের পর বলেন, মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির উপর থাকার বিষয়ে কুরআনে কারীমে এর চেয়েও বেশি প্রমাণাদি রয়েছে, যা সুস্পষ্টভাবে বা প্রকাশ্যভাবে এটা প্রমাণ করছে যে, মহান আল্লাহ সৃষ্টির উপর, 'আরশের উপর, সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা, যেভাবে তাঁর পবিত্র সত্তার জন্য উপযোগী। এটার তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করার অর্থ হচ্ছে সুস্পষ্ট বা প্রকাশ্য ভাষ্যসমূহকে তার অর্থ থেকে বের করা আর তা অকাট্যভাবে নাজায়েয। তবে যদি কোনো সমপর্যায়ের সাথে বিরোধিতা দেখা দেয়, আর যদি তেমন কিছু পাওয়া যায়; কিন্তু যদি তা না পাওয়া যায়, তাহলে অপব্যাখ্যার আশ্রয় নেয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আর আল্লাহর বাণী, "তাঁর মতো কোনো কিছু নেই।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১] এ আয়াত আল্লাহর 'আরশের উপর থাকা বিরোধী নয়। কারণ, (নিষিদ্ধ হওয়ার জন্য) কোনো কিছু আল্লাহর মত হওয়ার বিষয়টি হয় সর্বদিক থেকে হতে হবে যেমনটি আহলুস সুন্নাহ বলে থাকে, নতুবা কোনো বিশেষ গুণের মতো হলেই নিষিদ্ধ হবে যেমন মু'তাযিলারা বলে থাকে, এখানে উভয়টির কোনোটিই পাওয়া যায়নি।
অনুরূপভাবে হাদীসের ক্ষেত্রেও বিধান হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সকল হাদীসে যা এসেছে তার ওপর ঈমান আনয়ন করা, এটা জেনে নেয়া যে, অন্যদিকে সেগুলোর অর্থকে ফিরানো বা দুর্বল বিবেকের যুক্তি দিয়ে সেগুলোর তা'ওয়ীল করা এ অধ্যায়ের বাইরের জিনিস। তারপর তিনি অনেক হাদীস উল্লেখ করেছেন, তারপর শেষে বলেন আর এ অধ্যায়ে অনেক হাদীস রয়েছে যার সবগুলো এ ভূমিকাতে জমা করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার, কারণ তা অনেক বেশি। বস্তুত যে আয়াত ও হাদীসসমূহ উল্লেখ করা হলো তা বাকী হাদীস উল্লেখ করা থেকে অমুখাপেক্ষী করে দিবে।" (শেষ)।¹
টিকাঃ
১. সিদ্দিক হাসান খান, আল-ইস্তিক্বাদুর রাজীহ ফী শারহিল ই'তিকাদিস সহীহ, পৃ. ৯০।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 শাইখ মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফ আল-বিন্নড়লী (১১৯৩ হিজরী)

📄 শাইখ মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফ আল-বিন্নড়লী (১১৯৩ হিজরী)


শাইখ মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফ আল-বিলগ্রামী রাহimাহুল্লাহ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ (আল-ফার'উন নাবিত মিনাল আসলিস সাবিত) গ্রন্থে বলেন,
«قد علم من هذه الآية يعني أأمنتم من في السماء وهذا الحديث يعني أنا أمين من في السماء» رواه الشيخان، أنه تعالى في السماء، وهو بائن من مخلوقاته كما يليق بشأنه الأقدس، فلا يصح تعيين كيفية هذا العلو الذي نطقت به الآية الكريمة الرحمن على العرش استوى على ما في صحيح البخاري، قال أبو العالية: استوى على العرش: ارتفع، وقال مجاهد: استوى علا على العرش، يعلمها الكيفية إلا هو، لأن المعنى التشبيهي مسلوب عن ذاته تعالى بدليل قوله: ليس كمثله شيء، والدليل على أن المراد بالاستواء الارتفاع الحقيقي، أعني أنه تعالى فوق العرش كما ذهب إليه جمهور المحدثين لا التأويل بأن الاستواء هو الاستيلاء - هذه الآية: ﴿فَإِذَا اسْتَوَيْتَ أَنتَ وَمَن مَّعَكَ عَلَى الْفُلْكِ) وهذه الآية: ﴿وَاسْتَوَتْ عَلَى الْجُودِي ، وهذه الآية : ﴿ لِتَسْتَوُوا عَلَى ظُهُورِهِ، والآيات والأحاديث الدالة على كون ذاته تعالى من حيث هو على علوه، وكونه فوق السماء ......
"এ আয়াত অর্থাৎ “তোমরা কি নির্ভয় হয়ে গেছ তার থেকে, যিনি আসমানের উপর আছেন।” [সূরা আল-মুলক, আয়াত: ১৬] অনুরূপ এ হাদীস অর্থাৎ “আমি তাঁর পক্ষ থেকে আমানতদার, যিনি আসমানের উপর আছেন।”¹ থেকে জানা গেল যে, আল্লাহ তা'আলা আসমানের উপরে, তাঁর সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা, যেমনটি তাঁর পবিত্র সত্তার জন্য থাকা উপযোগী। সুতরাং সে উপরে থাকার কোনো ধরন নির্ধারণ করা যাবে না, যার কথা কুরআনের এ আয়াত বলেছে, “রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫], বরং সেটাই বলা হবে যা সহীহ বুখারীতে এসেছে, আবুল 'আলীয়া বলেন, ইস্তাওয়া 'আলাল 'আরش অর্থ 'আরশের উপর উঠেছেন। মুজাহিদ বলেন, ইস্তাওয়া অর্থ, 'আরশের উপর উঠলেন, তার ধরন সম্পর্কে তিনি ব্যতীত কেই জানে না। কারণ সাদৃশ্য সাব্যস্তকৃত অর্থ মহান আল্লাহর সত্তা থেকে নিষিদ্ধ থাকবে, কারণ আল্লাহ বলেছেন, "তাঁর মতো কোনো কিছু নেই।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১] আর 'ইস্তেওয়া' শব্দের হাকীকী বা বাস্তব অর্থ যে উপরে উঠা তার প্রমাণ, অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপর, যেমনটি অধিকাংশ মুহাদ্দিস বলেছেন, ইস্তাওয়া এর অর্থ 'ইস্তাওলা' (অধিকার করা) দিয়ে তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করা নয়, তার প্রমাণ হচ্ছে, আল্লাহর বাণী, “অতঃপর যখন আপনি ও আপনার সংগীরা নৌযানের উপরে স্থির হবেন”, অনুরূপ আল্লাহর বাণী, "আর নৌকা জুদী পর্বতের উপর স্থির হলো” তদ্রূপ আল্লাহর বাণী "যাতে তোমরা এর পিঠে স্থির হয়ে বসতে পার"। বস্তুত এর উপর প্রমাণবাহী অনেক আয়াত ও হাদীস রয়েছে যা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে, মহান আল্লাহ তা'আলা সর্বোপরে, আসমানের উপরে..."।²
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৩৫১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৪৪।
২. সিদ্দীক হাসান খান, আল-ইস্তিক্কাদুর রাজীহ ফী শারহিল ই'তিকাদিস সহীহ, পৃ. ৯০-৯১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00