📄 ইবনুল কাইয়্যেম (৭৫১ হিজরী)
ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ "আল্লাহর 'আরশের উপর উঠা" এ ব্যাপারে 'ইজতিমাউল জুয়ুশিল ইসলামিয়্যাহ' নামে স্বতন্ত্র গ্রন্থও প্রণয়ন করেছেন। তাছাড়া অপর কয়েকটি কিতাবে তিনি এ বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। যেমন, আস-সাওয়া'য়িকুল মুরসালাহ, ই'লামুল মুওয়াক্কি'য়ীন, আল-কাফিয়াতুশ শাফিয়াহ ফিল ইন্তিসার লিল ফিরক্বাতিন নাজিয়াহ (নূনিয়্যাহ) প্রভৃতি। এখানে সামান্য কয়েকটি ভাষ্য কেবল তুলে ধরছি।
ইবনুল কaiയ്യেম রাহিমাহুল্লাহ কোথাও এটা বলেছেন যে, কুরআনুল কারীম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস, সাহাবায়ে কেরামের ভাষ্য, তাবেয়ীগণের বক্তব্য সবই আল্লাহ তা'আলাকে 'আরশের উপর সাব্যস্ত করছে। তিনি বলেন,
وتأمل ما في هذه الآيات من الرد على طوائف المعطلين والمشركين ... قوله تعالى : ( ... ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ .... يتضمن : إبطال قول المعطلة والجهمية الذين يقولون: ليس على العرش شيء سوى العدم، وإن الله ليس مستويا على عرشه، ولا ترفع إليه الأيدي، ولا يصعد إليه الكلم الطيب، ولا رفع المسيح عليه الصلاة والسلام إليه، ولا عرج برسوله محمد - صلى الله عليه وسلم - إليه، ولا تعرج الملائكة والروح إليه، ولا ينزل من عنده جبريل عليه الصلاة والسلام ولا غيره، ولا ينزل هو كل ليلة إلى السماء الدنيا، ولا يخافه عباده من الملائكة وغيرهم من فوقهم، ولا يراه المؤمنون في الدار الآخرة عيانًا بأبصارهم من فوقهم، ولا تجوز الإشارة إليه بالأصابع إلى فوق، كما أشار إليه النبي - صلى الله عليه وسلم - في أعظم مجامعه في حجة الوداع إليه، وجعل يرفع إصبعه إلى السماء وينكبها إلى الناس ويقول: اللهم اشهد.
قال شيخ الإسلام : وهذا كتاب الله من أوله إلى آخره، وسنة رسوله - صلى الله عليه وسلم -، وعامة كلام الصحابة والتابعين، وكلام سائر الأئمة؛ مملوء بما هو نص أو ظاهر في أن الله سبحانه وتعالى فوق كل شيء، وأنه فوق العرش, فوق السموات مستو على عرشه.
"চিন্তা কর, এ আয়াতগুলোতে কীভাবে মু'আত্তিলা বা অর্থহীন যারা বলে সে সম্প্রদায় এবং শির্ক যারা করে সে সম্প্রদায়ের কথাকে খণ্ডন করা হয়েছে। আল্লাহর বাণী, "তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন" এ বাণীটিতে যাদের যুক্তি খণ্ডন করা হয়েছে, তন্মধ্যে রয়েছে মু'আত্তিলা ও জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের বক্তব্য; যারা বলে 'আরশের উপর 'না' ছাড়া আর কিছু নেই। তারা আরও বলে, আল্লাহ 'আরশের উপর উঠেননি। আরও বলে, তাঁর দিকে হাত তোলা যাবে না। আরও বলে, তাঁর দিকে উত্তম কালেমাসমূহ উত্থিত হয় না। আরও বলে, 'ঈসা 'আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালামকে উপরে উঠানো হয়নি। তারা আরও বলে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মি'রাজের জন্য উপরে নিয়ে যাওয়া হয়নি। আরও বলে, আল্লাহর দিকে ফিরিশতা ও রূহ উঠে যান না। আরও বলে, আল্লাহর নিকট থেকে জিবরীল 'আলাইহিস সালাম ও অন্য কেউ অবতরণ করেননি। আরও বলে, প্রতি রাতে আল্লাহ প্রথম আসমানে নাযিল হননি। আরও বলে, তাঁর বান্দাদের মধ্য হতে ফিরিশতা ও অন্যান্যগণ তাদের উপরস্থ সত্তাকে ভয় করেন না। আরও বলে, কিয়ামতের দিন মুমিনগণ তাদের চোখ দিয়ে উপরের দিকে তাদের রবকে চাক্ষুষ দেখবে না। আরও বলে, তাঁর দিকে উপরের দিকে আঙ্গুল দিয়ে ইঙ্গিত করে দেখানো জায়েয নেই, যেমনটি নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবচেয়ে বড় সম্মিলনস্থলে বিদায় হজের সময়ে ইঙ্গিত করে দেখিয়েছেন। তিনি তাঁর আঙ্গুলকে আসমানের দিকে উঠিয়েছেন এবং সেটাকে মানুষের দিকে নীচু করে বলেছিলেন, হে আল্লাহ, সাক্ষী থাক"।
শাইখুল ইসলাম বলেন, এ আল্লাহর কিতাব প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ, সকল সাহাবী, তাবে'য়ী এবং সকল ইমামের বক্তব্য, সরাসরি স্পষ্ট করে বা প্রকাশ্যভাবে এটাতে পরিপূর্ণ যে, নিশ্চয় আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'আলা সবকিছুর উপরে, তিনি 'আরশের উপরে, আসমানসমূহের উপরে, তাঁর 'আরশের উপর সমুন্নত।"¹
অন্যত্র তিনি ইমাম মালিকের সিফাত বিষয়ক ঐতিহাসিক বক্তব্য, “ইস্তেওয়ার অর্থ জানা, ধরন অজানা...." এর ব্যাখ্যায় বলেন,
فَرَّقَ بَيْنَ الْمُعْنَى الْمَعْلُومِ مِنْ هَذِهِ اللَّفْظَةِ، وَبَيْنَ الْكَيْفِ الَّذِي لَا يَعْقِلُهُ الْبَشَرُ. وَهَذَا الْجَوَابُ مِنْ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ شَافٍ، عَامٌ فِي جَمِيعِ مَسَائِلِ الصَّفَاتِ.
فَمَنْ سَأَلَ عَنْ قَوْلِهِ : إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى) [طه: ٤٦] كَيْفَ يَسْمَعُ وَيَرَى؟ أُجِيبَ بِهَذَا الْجَوَابِ بِعَيْنِهِ. فَقِيلَ لَهُ: السَّمْعُ وَالْبَصَرُ مَعْلُومٌ. وَالْكَيْفُ غَيْرُ مَعْقُولٍ.
وَكَذَلِكَ مَنْ سَأَلَ عَنِ الْعِلْمِ، وَالْحَيَاةِ، وَالْقُدْرَةِ، وَالْإِرَادَةِ، وَالنُّزُولِ، وَالْغَضَبِ، وَالرِّضَا، وَالرَّحْمَةِ، وَالضَّحِكِ، وَغَيْرِ ذَلِكَ. فَمَعَانِيهَا كُلُّهَا مَفْهُومَةٌ. وَأَمَّا كَيْفِيَّتُهَا فَغَيْرُ مَعْقُولَةٍ إِذْ تَعَقُلُ الْكَيْفِيَّةِ فَرْعُ الْعِلْمِ بِكَيْفِيَّةِ الذَّاتِ وَكُنْهِهَا . فَإِذَا كَانَ ذَلِكَ غَيْرَ مَعْقُول لِلْبَشَرِ ، فَكَيْفَ يُعْقَلُ هُمْ كَيْفِيَّةُ الصِّفَاتِ؟
وَالْعِصْمَةُ النَّافِعَةُ فِي هَذَا الْبَابِ : أَنْ يُوصَفَ اللهُ بِمَا وَصَفَ بِهِ نَفْسَهُ . وَبِمَا وَصَفَهُ بِهِ رَسُولُهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، مِنْ غَيْرِ تَحْرِيفٍ وَلَا تَعْطِيلٍ، وَمِنْ غَيْرِ تَكْيِيفِ وَلَا تَمْثِيلِ بَلْ تُثْبَتُ لَهُ الْأَسْمَاءُ وَالصَّفَاتُ، وَتُنْفَى عَنْهُ مُشَابَهَهُ الْمُخْلُوقَاتِ. فَيَكُونُ إِثْبَاتُكَ مُنَزَّهَا عَنِ التَّشْبِيهِ. وَنَفْيُكَ مُنَزَّهَا عَنِ التَّعْطِيلِ. فَمَنْ نَفَى حَقِيقَةَ الِاسْتِوَاءِ فَهُوَ مُعَطَّلٌ وَمَنْ شَبَّهَهُ بِاسْتِوَاءِ الْمُخْلُوقِ عَلَى الْمُخْلُوقِ فَهُوَ مُثَلُ . وَمَنْ قَالَ: اسْتِوَاءٌ لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ. فَهُوَ الْمُوَحِّدُ المنزه.
"এভাবে ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ 'ইস্তেওয়া' শব্দ থেকে যে অর্থ বুঝা যায় এবং যে ধরন মানুষের বিবেকে আসতে পারে এতদুভয়ের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। বস্তুত ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ'র এ উত্তর আল্লাহর সকল গুণের ক্ষেত্রে একটি পূর্ণ উত্তর; আরোগ্যের মহৌষধ।
তাই যে কেউ প্রশ্ন করে বলবে, আল্লাহর বাণী "নিশ্চয় আমি তোমাদের দু'জনের সাথে আছি, শুনছি এবং দেখছি” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ৪৬] এ আয়াতে কীভাবে তিনি শুনেন ও দেখেন? উত্তরে একই কথা বলা হবে, তাকে বলা হবে, শোনা ও দেখার বিষয়টি সবার জানা, তবে আল্লাহ তা'আলার জন্য সেটার ধরন নির্ধারণ করা বিবেক-বুদ্ধির কাজ নয়। অনুরূপ কেউ যদি আল্লাহ তা'আলার জ্ঞান, জীবন, ক্ষমতা, ইচ্ছা, অবতরণ, ক্রোধ, সন্তুষ্টি, রহমত, হাসি ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন করে, তার উত্তরও হবে এই যে, এগুলোর অর্থ তো আমরা বুঝি; কিন্তু আল্লাহর জন্য এগুলোর ধরন নির্ধারণ করা বিবেকের যুক্তি দ্বারা অর্জন করা যায় না; কারণ কারো গুণের ধরন বিবেকের যুক্তি দ্বারা প্রাপ্ত হওয়া নির্ভর করছে সে সত্তার ধরণ ও তার প্রকৃত অবস্থা জানার ওপর। আর যেহেতু আল্লাহ তা'আলার সত্তার প্রকৃত জ্ঞান কোনো বিবেকের যুক্তি ধারণ করতে পারে না, তাই তাঁর গুণাবলির প্রকৃত অবস্থা ও ধরন কীভাবে বিবেধ ধারণ করবে?
এ অধ্যায়ে বাঁচার একমাত্র উপায় হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা নিজেকে যেসব গুণে গুণান্বিত ঘোষণা করেছেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামও আল্লাহকে যেসব গুণে গুণান্বিত বলেছেন, সেগুলো দিয়ে আল্লাহকে গুণান্বিত সাব্যস্ত করা। আর এ সাব্যস্তকরণের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার বিকৃত, অর্থশূন্যতা, কিংবা ধরন নির্ধারণ, কারো অনুরূপ নির্ধারণ করা যাবে না। বরং আল্লাহর জন্য তাঁর নামসমূহ ও গুণসমূহ সাব্যস্ত করা হবে আর তাঁর থেকে সৃষ্টিকুলের সাথে সাদৃশ্যতাকে নিষেধ করতে হবে। এটা করতে পারলে আপনার সাব্যস্তকরণ হবে তামছীল বা সাদৃশ্যমুক্ত আর আপনার নিষেধ করা হবে তা'ত্বীল বা অর্থহীন করা থেকে মুক্ত। সুতরাং যে কেউ 'ইস্তেওয়া' বা 'আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তাঁর 'আরশের উপর উঠা' এর প্রকৃত অর্থকে অস্বীকার করবে সে তো তা'ত্বীল (অর্থশূন্য) করলো এবং মু'আত্তিলা হয়ে গেল। আর যে কেউ আল্লাহ তা'আলার 'ইস্তেওয়া' বা 'আরশের উপর উঠা'কে সৃষ্টির কারও জন্য অপর কারও উপর উঠার সাথে সাদৃশ্য প্রদান করলো সে তো তামছীল (সাদৃশ্য স্থাপন) করলো এবং 'মুমাসসিলা' হয়ে গেল। আর যে কেউ বললো, 'তাঁর 'আরশের উপর উঠা' সৃষ্টির কারও মতো নয়, সে হচ্ছে তাওহীদের ঝাণ্ডাবাহী, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণাকারী।”²
অন্যত্র বলেন, والفوقية: هو تفسير الاستواء المذكور في القرآن والسنة "আর উপরে হওয়া, এটাই তো কুরআন ও সুন্নায় আসা 'ইস্তেওয়া' শব্দের অর্থ।”³
অন্যত্র ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ বেশ কিছু জিনিস বর্ণনা করেছেন, যার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠার বিষয়টি সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়, যেমন,
১- কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজের সম্পর্কে বলেছেন, وَلِلهِ الْمَثَلُ الْأَعْلَى﴿ [النحل: ٦٠] "আর আল্লাহর জন্যই সকল সর্বোচ্চ উদাহরণ” [সূরা নাহল, আয়াত: ৬০[, আরও বলেন, ﴿وَلَهُ الْمَثَلُ الْأَعْلَى [الروم: ۲۷] "আর তাঁর জন্য আসমান ও যমীনে রয়েছে সর্বোচ্চ উদাহরণ” [সূরা রূম, আয়াত: ২৭] এখানে সর্বোচ্চ উদাহরণ এর অর্থ কী? সবচেয়ে উত্তম ও মর্যাদাবান যতগুণ মহান আল্লাহর জন্যই নির্ধারিত হবে।⁴ ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আল্লাহর 'আরশের উপর উঠার এ গুণটিকে "আল-মাসালুল আ'লা” বা 'সর্বোচ্চ গুণ' হিসেবে নিতে হবে। তিনি এর ব্যাখ্যা করে বলেন,
وقد أخبر النبي صلى الله عليه وسلم: «إن السموات السبع في الكرسي كحلقة ملقاة بأرض فلاة والكرسي في العرش كحلقة ملقاة في أرض فلاة والعرش لا يقدر قدره إلا الله وهو سبحانه فوق عرشه يرى ما عباده عليه
فهذا هو الذي قام بقلوب المؤمنين المصدقين العارفين به سبحانه من المثل الأعلى فعرفوه به و عبدوه به وسألوه به فأحبوه وخافوه ورجوه وتوكلوا عليه وأنابوا إليه واطمأنوا بذكره وأنسوا بحبه بواسطة هذا التعريف فلم يصعب عليهم بعد ذلك فهم استوائه على عرشه وسائر ما وصف به نفسه من صفات كماله إذ قد أحاط عليهم بأنه لا نظير لذلك ولا مثل له ولم يخطر بقلوبهم مماثلته لشيء من المخلوقات وقد أعلمهم سبحانه على لسان رسوله أنه يقبض سماواته بيده والأرض باليد الأخرى ثم يهزهن»، وأن السماوات السبع والأرضين السبع في كفه تعالى كخردلة في كف أحدكم»، وأنه يضع السماوات على أصبع والأرضين على أصبع والجبال على أصبع والشجر على أصبع وسائر الخلق على أصبع
"নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে জানিয়েছেন যে, সাত আসমান কুরসীতে বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে ফেলে রাখা একটি রিং এর মতো, অনুরূপ কুরসী; তা 'আরশের তুলনায় বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে ফেলে রাখা একটি রিং এর মতো আর 'আরশের পরিমাণ তো কেবল আল্লাহই জানেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর, সেখানে থেকেই তিনি তাঁর বান্দারা কী করে সেটা জানতে পারেন। এ জিনিসটিই ঈমানদার, বিশ্বাসী, তাঁকে যারা জানে, তাদের অন্তরে আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম গুণাবলি হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। ফলে তারা তাঁকে চিনতে সক্ষম হয়েছে, তাঁকে সেটার মাধ্যমে ইবাদাত করেছে, তা দিয়েই তারা তাঁর কাছে যাচঞা করেছে আর এভাবেই তারা তাঁকে ভালোবেসেছে, তাঁকে ভয় করেছে, তাঁর কাছে আশা করেছে, তাঁর ওপর ভরসা করেছে, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে, তাঁর স্মরণে প্রশান্তি লাভ করেছে, তাঁর ভালোবাসার মাধ্যমে সাযুজ্যতা লাভ করেছে, এসবই হচ্ছে এই পরিচয়ের মাধ্যমে। সুতরাং তাদের কাছে তখন কঠিন মনে হয়নি আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠার বিষয়টি, অনুরূপ অন্যান্য যাবতীয় পূর্ণ গুণে গুণান্বিত হওয়ার বিষয়টি; কারণ তাদের অন্তর জুড়ে আছে যে, তাঁর কোনো দৃষ্টান্ত নেই, তাঁর অনুরূপ কোনো কিছু নেই, তাদের অন্তরে কখনও সৃষ্টির কারও মতো হওয়ার বিষয়টি উদিত হয় না; কারণ আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীর যবানীতে তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, 'আল্লাহ তা'আলা তাঁর এক হাতে আসমানসমূহ ধরবেন, অপর হাতে যমীনকে ধরবেন, তারপর সেগুলোকে নাড়াচাড়া করবেন।' আরও জানিয়েছেন যে, 'সাত আসমান ও সাত যমীন তাঁর হাতের কব্জির উপরে যেন তোমাদের কারও হাতে একটি সরিষার দানা।' আরও জানিয়েছেন যে, 'আল্লাহ তা'আলা সকল আসমানকে এক আঙ্গুলের উপর রাখবেন, সকল যমীনকে এক আঙ্গুলের উপর রাখবেন, সকল পাহাড়কে এক আঙ্গুলের উপর রাখবেন, সকল গাছ-পালা আরেক আঙ্গুলের উপর, অনুরূপ সকল সৃষ্টিকে আরেক আঙ্গুলের উপর রাখবেন।”⁵
২- আল্লাহ তা'আলা বান্দার সাথে থাকা, কাছে থাকার সাথে যারা 'আরশের উপর উঠা ও 'আরশের উপর থাকাকে গুলিয়ে ফেলেন, তাদের জন্য ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম বলেন,
দৃষ্টির ইলম কুরব: ‘হুয়াক্কিকুল ক্বালবু বিলমুই’আখাছছাতি মায়া আল্লাহ। ফান্নাল মুঈ’আন্না নুও’আন। আ’ম্মাহু ওয়াহুয়া: মুঈ’য়াতুল ইলমে ওয়াল ইহাতা। কাওলিহি তায়া’লা: ‘ওয়াহুয়া মায়া’কুম আইনা মা কুন্তুুম’। [হাদীদ: ৪] ওয়া কাওলিহি: ‘মা ইয়াকুনু মিং নাজওয়া সালাছাতি ইল্লা হুয়া রাবিউহুম ওয়ালা খামছাতি ইল্লা হুয়া সা-দিছুহুম ওয়ালা আদনা মিং যা-লিকা ওয়ালা আকছারা ইল্লা হুয়া মায়াহুম আইনা মা কানু’। [মুজাদালা: ৭] ওয়া খাছ্ছাহু: ওয়াহুয়া মুঈ’য়াতুল কুরব, কাওলিহি তায়া’লা: ‘ইন্নাল্লাহা মায়াল্লাযিনা ইত্তাক্বও ওয়াল্লাযিনা হুম মুহসিনুন’। [নাহল: ১২৮] ওয়া কাওলিহি: ‘ইন্নাল্লাহা মাআছ ছাবিরীন’। [বাকারা: ১৫৩] ওয়া কাওলিহি: ‘ওয়ানাল্লাহা লামাআল মুহসিনীন’। [আনকাবুত: ৬৯]
ফাহায্যুহি মুঈ’য়াতু ক্বরব: তাত্বাম্মানুল মুওয়ালাতা, ওয়ান্নাছর, ওয়াল হিফজ। ওয়াক্কাল মুঈ’ইয়িন মুছাহাবাতুন লিলআ’বদি। লাকিন হাজিহি মুছাহাবাতু ইত্তিলাআন ওয়া ইহাতা। ওয়াহাজিহি মুছাহাবাতু মুওয়ালাতান ওয়া নুছরা ওয়া ইয়াআনাহ। ফা ‘মাআ’ ফি লুঘাতিল আ’রবি তুফিদুস ছুহবাতাল লাযিক্বা। লা তুশিমুর ইমতিযাজ ওয়াল ইখতিলাত্বা، ওয়ালা তুজাওয়িরুহু، ওয়ালা তুজানিবুহু। فামান جل্লা মিন যা হাজা শাইয়ান ছুওআন فاهوا آ’হك.
ওয়া আম্মাল ক্বুরব: ফালা ইয়াক্বিউ’ল কুরআনা ইল্লা খাছ্ছান। ওয়াহুয়া নুও’আন: ক্বুরবাতু মিন দাঈয়ি বিল ইজাবাতি। ওয়াক্বুরবুহু বিলাল ইয়াতাহ। ফাওয়্যুলুহু কাওলিহি তায়া’লা: ‘ওয়াইযা ছাআলাকা ইবাদি আ’ন্নি ফা ইন্নি ক্বারীব। উজ্বীবু দা’ওয়াতাদ দাঈ ইযা দাআ’ন’। [বাকারা: ১৮৬] ওয়াহা যা নাযালাত জওয়াবা ল্লিছছাহাবাতি রাদিয়াল্লাহু আ’নহুম। ওয়া ক্বাদ ছাআলু রাসূল আল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম: রব্বুনা ক্বারীবুং ফুনাজীহি আম বাঈ’দুন ফুনাদিহু? ফাআংযালা তায়া’লা হাজিহিল আয়া।
ওয়াছ্ছানি: ক্বাওলুহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম: ‘আক্বারবু মা ইয়াকুনুল আ’বদু মির রব্বিহি ওয়াহুয়া সাজিদ’। ওয়া আক্বারবু মা ইয়াকুনুর রববু মিন আ’বদিহি ফি জওফিল লাইল। ফাহাযা ক্বুরবুহু মিন আহলি তাআ’তিহি।
ওয়া ফিছ ছহীহ: আ’ن আবি মুছা রাদিয়াল্লাহু আ’নহু ক্বালা: ‘কুন্না মায়া আন্নাবিয়্যু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামু ফি ছাফার। ফায্যারাফত আছওয়াতুনা বিত্তাক্ববির। ফাক্বালা: ইয়া আইয়্যুহান নাছু, আরবিউ আ’লা আংফুছিকুম। ইন্নাকুম লা তাদউনা আছম্ম ওয়ালা গায়িবান। ইন্নাল্লাযি তাদউনা ছামীউ’ন ক্বারীব। আক্বারবু ইলা আহাদিকুম মিন ই’নিক্বি রাঝিলাহি’।
ফাহাযা ক্বুরব খাছ্ছুদ দাঈয়ি দুআউল ইবাদাতু ওয়াছানাও ওয়াল হাম্দ। ওয়াহাযা ক্বুরবুং লা ইয়ুনাক্বি মাবানিতুর রব বু লি খালক্বিহি, ওয়াশতিওয়াউহু আ’লা আরশিহি। বিল মুজামিআতি ওয়া ইউলাঝিমুহু। ফা ইন্নাহু লাইছা কা ক্বুরবিল আজছামি বা’দ্বাহা মিং বা’দ্ব। তায়া’লা আল্লাহু আ’ন যা-লিকা উলুওয়ান কাবিরা। ওয়ালকিত্তা নুও’আ আ’খর।
""আল্লাহর নৈকট্য বিদ্যা, বান্দার অন্তরকে আল্লাহর সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত করে দেয়। কারণ সাথে থাকার বিষয়টি দু’ধরনের:
* এক. সাধারণভাবে সাথে থাকা; আর তা হচ্ছে জ্ঞান ও পরিবেষ্টনে সাথে থাকা। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘তিনি তোমাদের সাথে আছেন যেখানেই তোমরা থাক না কেন।" [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ০৪] অনুরূপ আল্লাহ বলেন, ‘‘তিনি ব্যক্তির মধ্যে এমন কোনো গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থজন হিসেবে তিনি থাকেন না এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যেও হয় না যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি থাকেন না। তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশি হোক তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন যেখানেই তারা থাকুক না কেন।" [সূরা আল-মুজাদালাহ, আয়াত: ০৭]
দুই. বিশেষভাবে সাথে থাকা; আর তা হচ্ছে নৈকট্যের মাধ্যমে সাথে থাকা। যেমন, আল্লাহ বলেন, "নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা মুহসিন।" [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১২৮] অনুরূপ আল্লাহর বাণী "নিশ্চয় আল্লাহ্ সবরকারীদের সাথে আছেন।" [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ১৫৩] অনুরূপ আল্লাহর বাণী "আর নিশ্চয় আল্লাহ মুহসিনদের সাথে আছেন।" [সূরা আল-'আনকাবূত, আয়াত: ৬৯] এ দ্বিতীয়টিই হচ্ছে নৈকট্যের মাধ্যমে সাথে থাকা। যাতে সাহায্য-সহযোগিতা, হিফাযত করা অন্তর্ভুক্ত।
বস্তুত উভয় অর্থই তাঁর পক্ষ থেকে বান্দার সাথী হওয়া সাব্যস্ত করে। তবে প্রথমটি হচ্ছে দেখা ও বেষ্টনের মাধ্যমে সাথে থাকা আর দ্বিতীয়টি সাহায্য-সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের মাধ্যমে সাথে থাকা। সুতরাং বুঝা গেল যে, "ع" শব্দটি যার অর্থ সাথে থাকা, তা আরবী ভাষায় যথাযোগ্য সঙ্গী হওয়া বুঝায়; কখনও মিশে যাওয়া বা লেগে থাকা বুঝায় না, পড়শিত্বও বুঝায় না, পাশাপাশি অবস্থান করাও বুঝায় না। তাই যে কেউ এগুলোর কোনোটি মনে করবে সে তার খারাপ বুঝ থেকে তা বলছে।
আর নৈকট্য: কুরআনুল কারীমে সেটা কখনও বিশেষ অর্থে ব্যতীত ব্যবহার হয়নি। আর এ বিশেষ অর্থেও তা দু' ভাবে এসেছে,
ক. তাঁকে যারা ডাকবে তাদের ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য তিনি আহ্বানকারীর নিকটে।
খ. তাঁর ইবাদাতকারী, তাদের সাওয়াব প্রদানের জন্য তিনি তাদের নিকটে।
প্রথমটির উদাহরণ যেমন, আল্লাহর বাণী: "আর আমার বান্দাগণ যখন আমার সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করে, (তখন বলে দিন যে) নিশ্চয় আমি অতি নিকটে। আহ্বানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে আমি তার আহবানে সাড়া দেই।” [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ১৮৬] আর এজন্যই সাহাবায়ে কেরামের প্রশ্নের উত্তরে নাযিল হয়েছে, তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করেছিলেন, আমাদের রব কী নিকটে যে, আমরা তার সাথে মিনমিন করে কথা বলবো, নাকি দূরে, ফলে তাকে শব্দ করে ডাকবো? তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত নাযিল করলেন।
দ্বিতীয়টির উদাহরণ হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী, "একজন দাস তার মনিবের সবচেয়ে নিকটে থাকে যখন সে সাজদায় থাকে, আর রব সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বান্দার সবচেয়ে কাছে অবস্থান করে রাতের মধ্যভাগে; এটা হচ্ছে আল্লাহর বান্দাদের জন্য বিশেষ নৈকট্য যা তিনি তাঁর আনুগত্যশীলদের জন্য মঞ্জুর করেছেন।"
অনুরূপ সহীহ হাদীসে এসেছে, আবু মূসা আল-আশ'আরী রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কোনো এক সফরে ছিলাম। আমাদের শব্দসমূহ তাকবীর ধ্বনীতে মুখরিত হচ্ছিল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হে লোকেরা, তোমাদের নিজেদের ওপর কোমলতা অবলম্বন কর; কারণ তোমরা কোনো বধির কিংবা অনুপস্থিতকে ডাকছ না, নিশ্চয় তোমরা যাকে ডাকছ তিনি সর্বশ্রোতা ও নিকটে; তোমাদের কারও বাহনের ঘাঁড়ের থেকেও তিনি নিকটে।" এটাও বিশেষ ধরনের নৈকট্য; যা তাঁকে আহ্বানকারীর জন্য বিশেষভাবে নির্ধারিত যা দো'আ, প্রশংসা, ও স্তুতির ইবাদাতের কারণে অর্জিত হয়। এভাবে কোনো সৃষ্টি কর্তৃক রব্বে করীমের নিকটে থাকা তাঁর পূর্ণরূপে সৃষ্টি থেকে আলাদা থাকা এবং তাঁর 'আরশের উপরে থাকাকে নিষেধ করে না। বরং নিকটে থাকা ও 'আরশের উপর সৃষ্টি থেকে আলাদা থাকা, দুটো জিনিস একই সাথে হতে পারে, একই সাথে হওয়াকে আবশ্যকও করে। কারণ এ নৈকট্য দুনিয়ার দেহ বিশিষ্টদের একে অপরের নিকটে থাকার মতো নয়। মহান আল্লাহ সে রকম হওয়া থেকে বহু ঊর্ধ্বে। এ তো ভিন্ন রকমের নৈকট্য ও নিকটে থাকা।”⁶
৩- তিনি এটা তুলে ধরার চেষ্টা করেন যে, 'আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর উঠা' প্রমাণ করে যে, তিনি সৃষ্টি থেকে আলাদা। এ বিষয়টি সাব্যস্ত করতে তিনি বলেন,
قوله هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ )) [الحديد: ٤] من أدل شيء على مباينة الرب لخلقه فانه لم يخلقهم في ذاته بل خلقهم خارج عن ذاته ثم بان عنهم باستوائه على عرشه وهو يعلم ما هم عليه فيراهم وينفذهم بصره ويحيط بهم علما وقدرة وإرادة وسمعا وبصرا فهذا معنى كونه سبحانه معهم أينما كانوا
"আল্লাহর বাণী, "তিনি ছয়দিনে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন। তিনি জানেন যা কিছু যমীনে প্রবেশ করে এবং যা কিছু তা থেকে বের হয়, আর আসমান থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উত্থিত হয়। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন--তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, আর তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ্ তার সম্যক দ্রষ্টা।” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ০৪] এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে, স্রষ্টা তার সৃষ্টি থেকে আলাদা; কারণ তিনি সৃষ্টিকে নিজের সত্তার ভিতরে সৃষ্টি করেননি, বরং তাদেরকে তাঁর সত্তার বাইরে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তাদের থেকে আলাদা থেকেছেন তাঁর 'আরশের উপর উঠা'র মাধ্যমে। তিনি জানেন তারা যা যা করছে, তিনি তাদের দেখছেন, তাঁর দৃষ্টি তাদেরকে ভেদ করে, আর জ্ঞান, ক্ষমতা, শ্রবণ, দেখার মাধ্যমে তিনি তাদেরকে ঘিরে রেখেছেন। এটাই হচ্ছে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা কর্তৃক তারা যেখানেই থাকুক সেখানে তাদের সাথে থাকা।”⁷
৪- তিনি "আরশ যে সবচেয়ে প্রশস্ত, বড় ও সম্মানিত সৃষ্টি সেটা প্রমাণ করে তাতে উঠা ও সেখানে অবস্থান করা সবচেয়ে বড় ও মহৎ গুণের অধিকারী রাব্বুল আলামীনের শানের সাথে সংগতিপূর্ণ সেটা বর্ণনা করে বলেন,
يَقْرِنُ اسْتِوَاءَهُ عَلَى الْعَرْشِ بِهَذَا الاسْمِ كَثِيرًا، كَقَوْلِهِ تَعَالَى الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى) [طه: ٥] ، ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ الرَّحْمَنُ ﴾ [الفرقان: ٥٩] فَاسْتَوَى عَلَى عَرْشِهِ بِاسْمِ الرَّحْمَنِ، لِأَنَّ الْعَرْشَ مُحِيطٌ بِالْمُخْلُوقَاتِ قَدْ وَسِعَهَا، وَالرَّحْمَةُ مُحِيطَةٌ بِالْخُلْقِ وَاسِعَةٌ هُمْ، كَمَا قَالَ تَعَالَى وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ﴾ [الأعراف: ١٥٦] فَاسْتَوَى عَلَى أَوْسَعِ الْمُخْلُوقَاتِ بِأَوْسَعِ الصِّفَاتِ، فَلِذَلِكَ وَسِعَتْ رَحْمَتُهُ كُلَّ شَيْءٍ، وَفِي الصَّحِيحِ مِنْ حَدِيثِ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَّا قَضَى اللَّهُ الْخُلْقَ كَتَبَ فِي كِتَابٍ فَهُوَ عِنْدَهُ مَوْضُوعٌ عَلَى الْعَرْشِ إِنَّ رَحْمَتِي تَغْلِبُ غَضَبِي وَفِي لَفْظٍ فَهُوَ عِنْدَهُ عَلَى الْعَرْشِ» . فَتَأَمَّلِ اخْتِصَاصَ هَذَا الْكِتَابِ بِذِكْرِ الرَّحْمَةِ، وَوَضْعَهُ عِنْدَهُ عَلَى الْعَرْشِ، وَطَابِقُ بَيْنَ ذَلِكَ وَبَيْنَ قَوْلِهِ الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى) [طه: ٥] وَقَوْلِهِ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ الرَّحْمَنُ فَاسْأَلْ بِهِ خَبِيرًا ﴾ [الفرقان: ٥٩] يَنْفَتِحُ لَكَ بَابٌ عَظِيمٌ مِنْ مَعْرِفَةِ الرَّبِّ تَبَارَكَ وَتَعَالَى إِنْ لَمْ يُغْلِقْهُ عَنْكَ التَّعْطِيلُ وَالتَّجَهُمُ.
"আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর উঠা' এ গুণটিকে প্রায়শই 'রহমান' নামটির সাথে যুক্ত করেন। যেমন তিনি বলেন, "দয়াময় (আল্লাহ্) 'আরশের উপর উঠেছেন।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫], "তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠলেন। তিনিই 'রহমান', সুতরাং তাঁর সম্বন্ধে যে অবহিত তাকে জিজ্ঞেস করে দেখুন।” [সূরা আল-ফুরক্বান, আয়াত: ৫৯] এভাবে দেখা যাচ্ছে, তিনি রহমান নাম নিয়েই 'আরশের উপর উঠেছেন। কারণ 'আরশ সকল সৃষ্টিকুলকে ঘিরে রেখেছে; যা তাতে জায়গা হয় আর রহমতও সকল সৃষ্টিকুলকে ঘিরে আছে, তাদের জন্য তা প্রশস্ত হয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, "আর আমার রহমত সবকিছুর জন্য প্রশস্ত”। [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ১৫৬] সুতরাং তিনি সবচেয়ে প্রশস্ত সৃষ্টির উপরে উঠেছেন সবচেয়ে প্রশস্ত গুণাবলি নিয়ে। এজন্যই তাঁর রহমত সবকিছুকে ঘিরে রয়েছে। সহীহ হাদীসে আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আল্লাহ তা'আলা যখন সৃষ্টির ফয়সালা করেন তখন তিনি একটি কিতাব লেখেন যা তাঁর নিকট 'আরশের উপর বিদ্যমান, তাতে লেখা রয়েছে, আমার রহমত আমার ক্রোধের ওপর প্রাধান্য পাবে”। অপর বর্ণনায় এসেছে, “সেটা তাঁর কাছে 'আরশের উপর"।
তাহলে চিন্তা করুন, এ কিতাবটিতে বিশেষ করে তাঁর রহমতের উল্লেখ রয়েছে আর সেটাকে তিনি তাঁর কাছে 'আরশের উপরই রেখেছেন, এবার তাহলে এটার সাথে আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী দু'টোর মিল খুঁজে দেখুন। "দয়াময় (আল্লাহ্) 'আরশের উপর উঠেছেন।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫], “তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠলেন। তিনিই 'রহমান', সুতরাং তাঁর সম্বন্ধে যে অবহিত তাকে জিজ্ঞেস করে দেখুন।” [সূরা আল-ফুরক্বান, আয়াত: ৫৯] দেখবেন, আল্লাহর মারেফত বা সত্যিকারের পরিচয় লাভের ক্ষেত্রে আপনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে, যদি না সেটা আপনার পক্ষ থেকে তা'ত্নীল (অর্থশূন্য) করার নীতি ও জাহমী হওয়ার নীতি দ্বারা বন্ধ হয়ে থাকে।”⁸
৫- অন্যত্র তিনি আল্লাহর নাম 'আল-মালিক' হওয়ার দাবি হিসেবেও তিনি 'আরশের উপর উঠবেন, 'আরশের উপর থাকবেন সেটাকে সাব্যস্ত করার জন্য বলেছেন,
وَاسْمَهُ الْمُلِكَ « يَدُلُّ عَلَى مَا يَسْتَلْزِمُ حَقِيقَةً مُلْكِهِ : مِنْ قُدْرَتِهِ، وَتَدْبِيرِهِ، وَعَطَائِهِ وَمَنْعِهِ، وَثَوَابِهِ وَعِقَابِهِ، وَبَثُ رُسُلِهِ فِي أَقْطَارِ مَمْلَكَتِهِ، وَإِعْلَامِ عَبِيدِهِ بِمَرَاسِيمِهِ، وَعُهُودِهِ إِلَيْهِمْ، وَاسْتِوَائِهِ عَلَى سَرِيرِ مَمْلَكَتِهِ الَّذِي هُوَ عَرْشُهُ الْمَجِيدُ. "আর আল্লাহর 'মালিক' বা বাদশাহ নামটি প্রমাণ করছে তাঁর প্রকৃত রাজত্বের দাবি অনুসারে তাঁর থাকবে ক্ষমতা, পরিচালনা, দান করা, নিষেধ করা, সাওয়াব দেয়া, শাস্তি দেয়া, তাঁর রাজত্বের চারদিকে তাঁর দূতদের প্রেরণ করা, তাঁর দাসদেরকে তাঁকে সম্মান প্রদর্শনের নিয়ম- কানুন জানিয়ে দেয়া, তাদের কাছ থেকে আনুগত্যের অঙ্গীকার নেয়া, তাঁর রাজকীয় খাটের উপর উঠা, যার অপর নাম হচ্ছে তাঁর মহান 'আরশ।”⁹
৬- অন্যত্র তিনি এটা তুলে ধরেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজেকে 'আরশের মালিক বলা দ্বারা এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এ 'আরশ একান্তভাবেই তাঁর। অন্য কেউ তাতে উঠবে এমনটি কখনও উপযোগী নয়। তিনি বলেন, ووصفه بأنه ذو العرش الذي لا يقدر قدره سواه أن عرشه المختص به لا يليق بغيره أن يستوى عليه ووصفه بالمجد المتضمن لسعة العلم والقدرة والملك والغنى والجود والإحسان والكرم. "আর মহান আল্লাহ তাঁর নিজেকে 'যুল 'আরশ' 'আরশ ওয়ালা গুণ দিয়ে গুণান্বিত করা, যার পরিমাণ তিনি ব্যতীত আর কেউ নির্ধারিতভাবে বলতে পারে না, এটা প্রমাণ করে যে, তাঁর সাথে বিশেষায়িত এ 'আরশ তিনি ব্যতীত আর কারও জন্য তার উপরে উঠা উপযোগী হবে না। অনুরূপ তিনি 'মাজদ' বা 'মহামর্যাদা'র গুণে গুণান্বিত করলেন, প্রশস্ত জ্ঞান, ক্ষমতা, রাজত্ব, অমুখাপেক্ষিতা, দান, বিশেষ দাক্ষিন্ন, সম্মান প্রদান এসব তাঁর গুণ একান্তভাবে তাঁর হওয়ার কারণেই।”¹⁰
৭- তাছাড়া তিনি তাঁর ই'লামুল মুওয়াক্কে'ঈন গ্রন্থে আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর রয়েছেন সেটাকে অনেকগুলো উদাহরণের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বিদ'আতপন্থীদের মূল কাজ দু'টি: এক. হাদীস দ্বারা কোনো কিছু তাদের মনঃপুত না হলে সেটাকে কুরআনের বিরোধী প্রমাণে উঠে পড়ে লাগা। দুই. কুরআনের কোনো কিছু মনঃপুত না হলে, সেটা যদিও সম্পূর্ণভাবে মুহকাম বা সুদৃঢ় অর্থের বিষয় হয়, তবুও সেটাকে মুতাশাবিহ বানানোর জন্য যাবতীয় প্রচেষ্টা নিবদ্ধ করা।¹¹ এ দু'টি নীতিই আমরা যাবতীয় পথভ্রষ্ট দলগুলোর মাঝে কমন হিসেবে দেখতে পাই।
তারপর ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর সেটা প্রমাণ করার জন্য ১৮ (আঠারো) প্রকার দলীল উপস্থাপন করেছেন।¹²
৮- অনুরূপভাবে ইবনুল কাইয়্যেম তাঁর নূনিয়া কাব্যগ্রন্থে একটি নমূনা বিচার ব্যবস্থা করেছেন, যাতে 'আল্লাহর 'আরশের উপর উঠা' বলার পক্ষের আর যারা বিপক্ষে রয়েছে তাদের মধ্যে মুনাযারা ব্যবস্থা করে দেখিয়েছেন যে, 'আরশের উপর উঠেছে যারা বলেছে তারা ব্যতীত অন্যদের দেয়ার মতো দলীল নেই। তারপর তিনি বলেন, "কেউ আমাদেরকে মুজাসসিমা (দেহবাদী), মুশাব্বিহা (সাদৃশ্য স্থাপনকারী) বা হাশওয়িয়্যাহ (বেহুদা বক্তৃতাকারী) বললেই তাদের এসব মিথ্যা বদনামীর ভয়ে আমরা আমাদের রবের গুণে তাকে গুণান্বিত করা ছেড়ে দিব? কখনও না।"¹³
এ হচ্ছে সামান্য কিছু উদাহরণ; যার মাধ্যমে আমরা ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহيمাহুল্লাহ কর্তৃক 'আল্লাহর 'আরশে উঠা' এ গুণটি সাব্যস্ত করার বিভিন্নমুখী প্রচেষ্টা এখানে তুলে ধরলাম। বস্তুত ইবনুল কাইয়্যেমের মত এ ব্যাপারে এতই প্রসিদ্ধ যে, তার জন্য দলীল পেশ করার খুব বেশি প্রয়োজন হয় না।
টিকাঃ
১. ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ুশ, ৯৫-৯৬।
২. ইবনুল কaiയ്യেম, মাদারিজুস সালেকীন (২/৮৫)।
৩. মুখতাসারুস সাওয়া'য়িকুল মুরসালাহ (২/৩৬৩)।
৪. আল-ওয়াহেদী, আল-ওয়াজীয, পৃ. ৮৪১; ইবনুল কাইয়্যেম, আস-সাওয়া'য়িকুল মুরসালাহ (৩/১০৩৩)।
৫. আস-সাওয়া'য়িকুল মুরসালাহ (২/৪৩১-৪৩২)।
৬. মাদারিজুস সালেকীন (২/২৫৪-২৫৫)।
৭. হাদিউল আরওয়াহ ইলা বিলাادিল আফরাহ: ২৯৫।
৮. মাদারিজুস সালেকীন (১/৫৭)।
৯. মাদারেজুস সালেকীন (৩/৩৭৪-৩৭৫)।
১০. আত-তিবইয়ান ফী আক্বসামিল কুরআন, পৃ. ৯৮।
১১. ই'লামুল মুওয়াকে'ঈন (২/২০৯)।
১২. ই'লামুল মুওয়াকে'ঈন (২/২০৯-২১৭)।
১৩. দেখুন: আলে ঈসা, শারহুল কাফিয়্যাতুশ শাফিয়্যাহ (১/১৬)।
📄 ইবন কাসীর (৭৭৪ হিজরী)
ইমাম ইবন কাসীর রাহিমাহুল্লাহ সালাফে সালেহীনের পথের পথিক ছিলেন। তিনি একাধারে মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ঐতিহাসিকসহ বহু গুণের অধিকারী ছিলেন। তার বিভিন্ন গ্রন্থে তিনি আল্লাহর গুণাবলি সম্পর্কে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের নীতিমালা বর্ণনা করেছেন এবং 'আরশের উপর উঠার বিষয়টিও তুলে ধরেছেন। নিম্নে আমরা আমাদের কথার সমর্থনে কয়েকটি ভাষ্য বর্ণনা করব।
ইবন কাসীর রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহর গুণাবলির ব্যাপারে কী নীতি অবলম্বন করতে হবে তা বর্ণনা করে বলেন,
وَأَمَّا قَوْلُهُ تَعَالَى: {ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ فَلِلنَّاسِ فِي هَذَا الْمُقَامِ مَقَالَاتٌ كَثِيرَةٌ جِدًا، لَيْسَ هَذَا مَوْضِعَ بَسْطِهَا، وَإِنَّمَا يُسلك فِي هَذَا الْمُقَامِ مَذْهَبُ السَّلَفِ الصَّالِحِ : مَالِكٌ، وَالْأَوْزَاعِيُّ ، والثوري، وَاللَّيْثُ بْنُ سَعْدٍ، وَالشَّافِعِيُّ، وَأَحْمَدُ بْنُ حَنْبَلٍ، وَإِسْحَاقُ بْنُ رَاهَوَيْهِ وَغَيْرُهُمْ، مِنْ أَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ قَدِيرًا وَحَدِيثًا، وَهُوَ إِمْرَارُهَا كَمَا جَاءَتْ مِنْ غَيْرِ تَكْبِيفٍ وَلَا تَشْبِيهِ وَلَا تَعْطِيلِ. وَالظَّاهِرُ المُتَبَادَرُ إِلَى أَذْهَانِ المُشَبِّهِينَ مَنْفِيٌّ عَنِ اللَّهِ، فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُشْبِهُهُ شَيْءٌ مِنْ خَلْقِهِ، وَ لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ﴾ [الشَّورَى : ۱۱] بَلِ الْأَمْرُ كَمَا قَالَ الْأَئِمَّةُ - مِنْهُمْ نُعَيْمِ بْنُ حَمَّادِ الْخَزَاعِيُّ شَيْخُ الْبُخَارِيُّ - : مَنْ شَبَّهَ اللَّهَ بِخَلْقِهِ فَقَدْ كَفَرَ ، وَمَنْ جَحَدَ مَا وَصَفَ اللَّهُ بِهِ نَفْسَهُ فَقَدْ كَفَرَ». وَلَيْسَ فِيهَا وَصَفَ اللَّهُ بِهِ نَفْسَهُ وَلَا رَسُولَهُ تَشْبِيةٌ، فَمَنْ أَثْبَتَ اللهِ تَعَالَى مَا وَرَدَتْ بِهِ الْآيَاتُ الصَّرِيحَةُ وَالْأَخْبَارُ الصَّحِيحَةُ، عَلَى الْوَجْهِ الَّذِي يَلِيقُ بِجَلَالِ اللَّهِ تَعَالَى، وَنَفَى عَنِ اللَّهِ تَعَالَى النَّقَائِصَ، فَقَدْ سَلَكَ سَبِيلَ الْهُدَى.
"আল্লাহর বাণী, 'তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠলেন'। এ জায়গায় এসে লোকদের মাঝে বহু মতামত লক্ষ্য করা যায়। এ ব্যাপারে আমরা শুধুমাত্র সালাফে সালেহীন বা পূর্ববর্তী সহীহ আমলকারী বিজ্ঞজনদের মতামত অবলম্বন করছি। তাঁরা হচ্ছেন মালিক, আওযা'ঈ, সাওরী, লাইস ইবন সা'দ, শাফেয়ী, আহমাদ, ইসহাক ইবন রাহওয়াইহ এবং ইসলামের নবীন ও প্রবীণ গ্রহণযোগ্য মুসলিম ইমামগণ। আর সে মতামত হচ্ছে এই যে, যা কিছু আল্লাহ তা'আলা বলেছেন সেটাকে কোনো প্রকার ধরন অথবা সাদৃশ্য অথবা অর্থহীন করা ছাড়াই সাব্যস্ত করে নিতে হবে। আর যারা সাদৃশ্য নির্ধারণ করে তাদের মনে যে প্রকাশ্য অর্থের সঞ্চার হয় তা আল্লাহ থেকে নিষেধ করতে হবে। কেননা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন: "তাঁর মতো কোনো কিছু নেই, তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১] বরং বিষয়টি তেমনভাবে সাব্যস্ত করতে হবে, যেমনটি ইমামগণ বলেছেন। এদের মধ্যে নু'আঈম ইবন হাম্মাদ আল-খুযা'ঈ অন্যতম, যিনি হচ্ছেন ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ'র উস্তাদ। তিনি বলেন: যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলাকে কোনো মাখলুকের সঙ্গে সাদৃশ্যযুক্ত করে সে কাফির হয়ে যাবে, আর যে ব্যক্তি আল্লাহ তা'আলা নিজেকে যেসব গুণে ভূষিত করেছেন তা অস্বীকার করবে সে কাফির হয়ে যাবে।" বস্তুত আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আল্লাহর জন্য যা সাব্যস্ত করেছেন তাতে কোনো সাদৃশ্য নেই। তাই যেসব গুণ স্পষ্টরূপে আল্লাহর কিতাবের আয়াতসমূহে ও বিশুদ্ধ হাদীসগুলোতে বর্ণিত হয়েছে, যদি কেউ আল্লাহর সম্মান ও মর্যাদার সাথে উপযোগী করে সাব্যস্ত করবে এবং তাঁর থেকে সর্বপ্রকার ত্রুটি অস্বীকার করবে, সে ব্যক্তিই সঠিক পথে চলতে সমর্থ হয়েছে।”¹
• তাছাড়া তিনি তাঁর তাফসীর গ্রন্থের অন্যত্র আল্লাহ তা'আলার মুষ্ঠির ভিতরে যমীন থাকার বিষয়টি তুলে ধরে বলেন,
وَقَدْ وَرَدَتْ أَحَادِيثُ كَثِيرَةٌ مُتَعَلِّقَةٌ بِهَذِهِ الْآيَةِ الْكَرِيمَةِ، وَالطَّرِيقُ فِيهَا وَفِي أَمْثَالِهَا مَذْهَبُ السَّلَفِ، وَهُوَ إِمْرَارُهَا كَمَا جَاءَتْ مِنْ غَيْرِ تَكْيِيفٍ وَلَا تَحْرِيفِ.
"এ বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত অনেকগুলো হাদীস এসেছে, এ ব্যাপারে ও অনুরূপ বিষয়ে নীতি হলো, সালাফদের মতকে গ্রহণ করে নেয়া, আর তা হচ্ছে, যেভাবে এসেছে সেভাবে চালিয়ে নেয়া, কোনো প্রকার ধরন নির্ধারণ করা যাবে না, বিকৃতি সাধনও করা যাবে না।”²
টিকাঃ
১. তাফসীর ইবন কাসীর (৩/৪২৭)।
২. তাফসীর ইবন কাসীর (৭/১১৩)।
📄 ইবন আবিল ইয আল-হানাফী (৭৯২ হিজরী)
ইমাম ইবন আবিল ইযয আল-হানাফী রাহিমাহুল্লাহ আকীদাহ বিষয়ক ইমাম ত্বাহাওয়ীর ভাষ্যের ওপর যে ব্যাখ্যা রচনা করেছেন তা কালজয়ী ভাষ্যের মর্যাদা পেয়েছে। তাঁর এ গ্রন্থ থেকে পরবর্তী সকল হানাফী আলেমগণ উপকৃত হয়েছেন। বিশেষ করে মোল্লা আলী ক্বারী আল-হানাফী রাহিমাহুল্লাহ তাঁর 'শারহুল ফিকহিল আকবার' গ্রন্থে তা ইমাম ইবন আবিল ইযয থেকে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উদ্ধৃত করেছেন। ইমাম ইবন আবিল ইযয রাহিমাহুল্লাহ'র এ গ্রন্থটি এতই গ্রহণযোগ্য হয়েছে যে, পরবর্তীকালে বিভিন্ন আলেমগণের নিকট তা সংক্ষিপ্ত আকীদাহ'র গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তা পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সে গ্রন্থ থেকে আমরা যৎ সামান্য কিছু এখানে বর্ণনা করব।
• ইমাম ইবন আবিল ইযয রাহিমাহুল্লাহ 'আরশ ও কুরসীর বাস্তবতা তুলে ধরে বলেন,
(وَالْعَرْشُ وَالْكُرْسِيُّ حَقٌّ كَمَا بَيَّنَ تَعَالَى فِي كِتَابِهِ، قَالَ تَعَالَى: ذُو الْعَرْشِ الْمَجِيدُ فَقَالَ لَمَا يُرِيدُ) (۲)، (رَفِيعُ الدَّرَجَاتِ ذُو الْعَرْشِ) (۳)، (ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ) (٤) ، في غير ما آية من القرآن، الرَّحْمَنُ عَلَى (الْعَرْشِ اسْتَوَى) (٥)، (لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيمِ ) (٦) ، ( اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ) (٢٦)، ( الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِهِ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آمَنُوا) (۸)، (وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَئِذٍ ثَمَانِيَةٌ ) (۱۷) ، (وَتَرَى الْمَلَائِكَةَ حَافِّينَ مِنْ حَوْلِ الْعَرْشِ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ (رَبِّهِمْ) (۱۰) ، وَفِي دُعَاءِ الْكَرْبِ المُرْوِيِّ فِي الصَّحِيحِ: «لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ الْعَظِيمُ الْحَلِيمُ، لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمُ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَرَبُّ الْأَرْضِ رَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيمُ
"আর 'আরশ ও কুরসী সত্য। যেমনটি আল্লাহ তা'আলা তাঁর কিতাবে বর্ণনা করেছেন ""আরশের অধিকারী ও সম্মানিত।" [সূরা আল-বুরূজ, আয়াত: ১৫] "তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন।" [সূরা আস-সাজদাহ, আয়াত: ০৪] "দয়াময় (আল্লাহ) 'আরশের উপর উঠেছেন।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫] "তিনি ছাড়া কোন হক্ক ইলাহ্ নেই; তিনি সম্মানিত 'আরশের রব।” [সূরা আল-মুমিনূন, আয়াত: ১১৬] "আল্লাহ্, তিনি ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই, তিনি মহা 'আরশের রব।” [সূরা আন-নামল, আয়াত: ২৬] "যারা 'আরশ ধারণ করে আছে এবং যারা এর চারপাশে আছে, তারা তাদের রবের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে প্রশংসার সাথে এবং তাঁর ওপর ঈমান রাখে, আর মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।” [সূরা গাফির, আয়াত: ০৭] “আর সেদিন আটজন ফিরিশতা আপনার রবের 'আরশকে ধারণ করবে তাদের উপরে।” [সূরা আল-হাক্কাহ, আয়াত: ১৭] "আর আপনি ফিরিশতাদেরকে দেখতে পাবেন যে, তারা 'আরশের চারপাশে ঘিরে তাদের রবের সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছে।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৭৫] অনুরূপ বিপদগ্রস্তের দো'আয় সহীহ বুখারীতে এসেছে, “আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য উপাস্য নেই, তিনি অতি মহান ও সহনশীল। আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য মা'বুদ নেই, তিনি বিশাল 'আরশের মালিক, আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য ইলাহ নেই, তিনি আসমানের রব, যমীনের রব ও সম্মানিত 'আরশের রব।”¹
তারপর তিনি হাদীসে আও'য়াল নামক 'আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর বিখ্যাত হাদীস নিয়ে আসেন, যাতে 'আরশকে সাত আসমানের উপরে সাব্যস্ত করা হয়েছে, আল্লাহকে তাঁর উপর সাব্যস্ত করা হয়েছে।
তারপর তিনি বেদুঈনের সে হাদীস নিয়ে এসেছেন, যাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেছেন যে, 'আরশ আসমানসমূহের উপর গম্বুজের ন্যায়।
তারপর তিনি বুখারীর সে হাদীস নিয়ে আসেন, যাতে জান্নাতের উপর আল্লাহর 'আরশের কথা বর্ণনা করা হয়েছে।
তারপর তিনি কিয়ামতের দিন মূসা 'আলাইহিস সালাম কর্তৃক 'আরশের খুঁটি ধরে রাখার হাদীসটি নিয়ে আসেন। তারপর তিনি 'আরশ বলে যে খাট বুঝানো হয় সেটা সাব্যস্ত করেছেন এবং সেটা যে কুরসী নয়, কুরসী যে আল্লাহর পা রাখার স্থান তা সাব্যস্ত করেন।²
ইমাম ইবন আবিল ইযয রাহিমাহুল্লাহ 'আরশ সাব্যস্তের পর 'আরশ সবকিছুর উপর সেটাও দলীল-প্রমাণ দিয়ে সাব্যস্ত করেন, তারপর তিনি আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর উঠেছেন সেটা সাব্যস্ত করার জন্য অনেক ধরনের দলীল পেশ করেন, তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ হচ্ছে,
১) কুরআনুল কারীমে ফিরিশতাগণ কর্তৃক আল্লাহকে ভয় করার ব্যাপারটি উল্লেখের সময় বলা হয়েছে,
﴿ يَخَافُونَ رَبَّهُم مِّن فَوْقِهِمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ ﴾ [النحل: ٥٠]
"তারা ভয় করে তাদের উপরস্থ তাদের রবকে এবং তাদেরকে যা আদেশ করা হয় তারা তা করে।" [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৫০] এখানে তাদের উপর থেকে তাদের রবকে ভয় করে বলা হয়েছে। আর এখানে )من( অব্যয়টি ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে 'উপরে নয়' বলার যুক্তি কেউ দেখাতে পারবে না।
২) কুরআনুল কারীমে সরাসরি আল্লাহ তা'আলাকে তাঁর বান্দাদের উপর বলা হয়েছে। যেমন,
﴿وَهُوَ الْقَاهِرُ فَوْقَ عِبَادِهِ ﴾ [الانعام: ١٨، ٦١]
"আর তিনিই আপন বান্দাদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকারী।” [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ১৮, ৬১]
৩) কুরআনুল কারীমে তাঁর দিকে বিভিন্ন জিনিস ও প্রাণী উত্থিত হয় বলা হয়েছে। আর উত্থিত হওয়ার অর্থই যার দিকে উত্থিত হয় তিনি উপরে। যেমন- আল্লাহ বলেন,
﴿ تَعْرُجُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ إِلَيْهِ ﴾ [المعارج: ٤]
“ফিরিশতা এবং রূহ আল্লাহর দিকে ঊর্ধ্বগামী হয়।” [সূরা আল-মা'আরিজ, আয়াত: ০৪]
৪) কুরআনে আল্লাহ তাঁর দিকে বিভিন্ন জিনিস আরোহন করার কথা বলেছেন। যেমন,
﴿ إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ ﴾ [فاطر: ١٠]
“তাঁরই দিকে পবিত্র বাণীসমূহ হয় সমুত্থিত।” [সূরা ফাতির, আয়াত: ১০]
৫) কুরআনে আল্লাহ তা'আলা তাঁর দিকে কোনো কিছু উঠানোর কথা বলেছেন, যেমন,
﴿بَل رَفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ ﴾ [النساء : ١٥٨]
"বরং আল্লাহ্ তাকে তাঁর নিকট তুলে নিয়েছেন।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৫৮]
৬) কুরআনে আল্লাহ তা'আলার জন্য 'আলী' বা উপরে থাকার গুণ ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন,
﴿وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ﴾ [البقرة: ٢٥٥]
"আর তিনি সুউচ্চ সুমহান।" [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ২৫৫]
৭) কুরআনুল কারীমে আল্লাহর কাছ থেকে কিছু অবতরণ করার কথা বলা হয়েছে,
تَنزِيلُ الْكِتَابِ لَا رَيْبَ فِيهِ مِن رَّبِّ الْعَالَمِينَ ﴾ [السجدة : ٢]
"এ কিতাব সৃষ্টিকুলের রবের পক্ষ থেকে নাযিল হওয়া, এতে কোনো সন্দেহ নেই।" [সূরা আস-সাজদাহ, আয়াত: ০২]
৮) কুরআনুল কারীমে ও হাদীসে বিশেষ বিশেষ সৃষ্টি আল্লাহর কাছে থাকার কথা বলা হয়েছে,
إِنَّ الَّذِينَ عِندَ رَبِّكَ لَا يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِهِ، وَيُسَبِّحُونَهُ وَلَهُ يَسْجُدُونَ ﴾ [الأعراف: ٢٠٦]
"নিশ্চয় যারা আপনার রবের সান্নিধ্যে রয়েছে তারা তাঁর ইবাদাতের ব্যাপারে অহংকার করে না। আর তারা তাঁরই তাসবীহ পাঠ করে এবং তাঁরই জন্য সাজদাহ করে।" [সূরা আস-সাজদাহ, আয়াত: ২০৬]
৯) কুরআনে আল্লাহ তা'আলা নিজেকে আসমানের উপর ঘোষণা করেছেন। যেমন,
أَأَمِنتُم مَّن فِي السَّمَاءِ أَن يَخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْضَ فَإِذَا هِيَ تَمُورُ ﴾ [الملك: ١٦]
"তোমরা কি এ থেকে নির্ভয় হয়েছ যে, যিনি আসমানে রয়েছেন তিনি তোমাদেরকে সহ যমীনকে ধ্বসিয়ে দেবেন, অতঃপর তা হঠাৎ করেই থর থর করে কাঁপতে থাকবে?” [সূরা আল-মুলক, আয়াত: ১৬]
১০) কুরআনে কারীমে আল্লাহ তা'আলা নিজেকে 'আরশের উপর উঠেছেন বলে ঘোষণা করেছেন।
ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ ﴾ [الأعراف: ٥٤]
"এরপর তিনি 'আরশে উঠেছেন।” [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৫৪]
১১) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহীহ হাদীসে আল্লাহ তা'আলা প্রথম আসমানে প্রতি রাতে নেমে আসার কথা বর্ণিত হয়েছে। আর নেমে আসা উপর থেকেই হয়।
১২) আল্লাহর দিকে হাত তোলে দো'আ করার কথা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
১৩) হাদীসে এসেছে, উপরের দিকে ইঙ্গিত করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরাম থেকে সাক্ষ্য নিয়েছেন।
১৪) হাদীসে এসেছে, 'আল্লাহ কোথায়' এমন প্রশ্ন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক দাসীকে করেছিলেন।
১৫) হাদীসে এসেছে, 'আল্লাহ কোথায়' প্রশ্নের জবাবে সে দাসী 'আসমানে' বলেছিল।
১৬) ফির'আউন আসমানে চড়ার চেষ্টা করেছিল আল্লাহকে দেখার জন্য। যেমনটি কুরআনে এসেছে।
১৭) মি'রাজের রাত্রে বারবার মূসা ও আল্লাহর কাছে উপরের দিকে গমন করার বিষয়টি বহু সহীহ হাদীসে এসেছে।
১৮) হাদীসে এসেছে, জান্নাতীরা আল্লাহর দিকে জান্নাত থেকে উপরের দিকে তাকাবেন।
১৯) তাছাড়া বিবেকের যুক্তি বলে, উপরে থাকা সবচেয়ে সম্মানের বিষয়, তাই আল্লাহর জন্য তা সাব্যস্ত হবে।
২০) স্বভাবজাত প্রকৃতি বা ফিত্বরী প্রমাণ হচ্ছে, সৃষ্টি মাত্রই তার বিপদাপদে উপরের দিকে প্রত্যাবর্তন করে। তবে যার প্রকৃতি নষ্ট হয়ে গেছে তার কথা ভিন্ন।³
. ইমাম ইবন আবিল ইয্য রাহিমাহুল্লাহ সূরা আল-আ'রাফের আয়াতের তাফসীরে 'ইস্তাওয়া'র ধরন সম্পর্কে বলেন, قوله تعالى: ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ كيف استوى؟ فقال: الاستواء معلوم والكيف مجهول. ويُروى هذا الجواب عن أم سلمة رضي الله عنها موقوفاً ومرفوعاً إلى النبي صلى الله عليه وسلم.
"আল্লাহর বাণী, 'তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠলেন' কীভাবে তিনি উঠলেন? তখন ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ বললেন, 'ইস্তেওয়া' এর অর্থ জানা, এর ধরন অজানা।' এ একই উত্তর উম্মে সালামাহ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহা থেকে বর্ণিত হয়েছে, মাওকুফ সূত্রে ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মারফু' সূত্রে।"⁴
ইমাম ইবন আবিল ইয্য আল-হানাফী রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহর নাম ও গুণের ক্ষেত্রে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের নীতির বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, لما ذَكَرَ فِيهَا تَقَدَّمَ أَنَّ الْقُرْآنَ كَلَامُ اللهِ حَقِيقَةٌ مِنْهُ بَدَا نَبَّهُ بَعْدَ ذَلِكَ عَلَى أَنَّهُ تَعَالَى بِصِفَاتِهِ لَيْسَ كَالْبَشَرِ، نَفْيًا لِلتَّشْبِيهِ عَقِيبَ الْإِثْبَاتِ، يَعْنِي أَنَّ اللَّهَ تَعَالَى وَإِنْ وُصِفَ بِأَنَّهُ مُتَكَلِّمْ، لَكِنْ لَا يُوصَفُ بِمَعْنَى مِنْ مَعَانِي الْبَشَرِ الَّتِي يَكُونُ الْإِنْسَانُ بِهَا مُتَكَلَّما ، فَإِنَّ اللَّهَ لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ. وَمَا أَحْسَنَ الْمُثَلَ الْمُضْرُوبَ لِلْمُثْبِتِ لِلصَّفَاتِ مِنْ غَيْرِ تَشْبِيهِ وَلَا تَعْطِيلِ، بِاللَّبَنِ الْخَالِصِ السَّائِعِ لِلشَّارِبِينَ، يَخْرُجُ مِنْ بَيْنِ فَرْثِ التَّعْطِيلِ وَدَمِ التَّسْبِيهِ.
"যখন ইমাম ত্বাহাওয়ী রাহিমাহুল্লাহ উল্লেখ করলেন যে, কুরআন বাস্তবেই আল্লাহর বাণী, তখন তিনি সাবধান করতে চাইলেন যে, মহান আল্লাহ তাঁর গুণসমূহে মানুষের মতো নয়। সাব্যস্ত করার পরে সাদৃশ্য স্থাপন করাকে অস্বীকার করার জন্য। অর্থাৎ নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা, যদিও তাকে কথা বলার গুণে গুণান্বিত করছি, কিন্তু তাঁর সে কথাকে মানুষের সাথে অর্থপূর্ণ করে সাব্যস্ত করা যাবে না, যেভাবে মানুষ কথা বলার গুণ অর্জন করে সেভাবে নয়। কারণ আল্লাহ তা'আলা তাঁর মতো কোনো কিছু নেই, তিনি সর্বশ্রোতা সর্বদ্রষ্টা। যারা কোনো প্রকার সাদৃশ্য স্থাপন ও অস্বীকৃতি করণের মাঝে অবস্থান করে আল্লাহর গুণাবলি সাব্যস্ত করে তাদের ব্যাপারে কত সুন্দর উদাহরণ দিয়ে বলা হয় যে, সে যেন অস্বীকৃতির বিষ্টা ও সাদৃশ্যের রক্তের মাঝখান থেকে বের হয়ে আসা এমন খাঁটি দুধ সংগ্রহ করলো যা পানকারীর জন্য উপাদেয়।”⁵
টিকাঃ
১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৩৪৬।
২. শারহুত ত্বাহাওয়িয়্যাহ: ২৫৪-২৬২
৩. দেখুন: শারহুত ত্বাহাওয়িয়্যাহ: ২৬৩-২৭৩ থেকে সংক্ষেপিত।
৪. শারহুল আকীদাতুত ত্বাহাওয়িয়्यাহ, ৩৭২-৩৭৩।
৫. শারহুত ত্বাহাওয়িয়্যাহ, পৃ. ১৫২।
📄 ইবন রাজাব (৭৯৫ হিজরী)
ইমাম ইবন রাজাব রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহ তা'আলাকে 'আরশের উপর বিশ্বাস করতেন। বান্দার আমল 'আরশের দিকে উত্থিত হয় বলে তিনি ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন,
فالكلمة الطيبة هي كلمة التوحيد وهي أساس الإسلام، وهي جارة على لسان المؤمن وثبوت أصلها هو ثبوت التصديق بها في قلب المؤمن، وارتفاع فرعها في السماء هو علو هذه الكلمة وبسوقها وأنها تخرق الحجب ولا تتناهى دون العرش.
"সুতরাং কালেমা তাইয়্যেবাহ বা উত্তম কালেমা হচ্ছে তাওহীদের কালেমা, আর তা হচ্ছে ইসলামের মূলভিত্তি। আর এটি মুমিনের জিহ্বায় সর্বদা জারী থাকে, তার মূলটি সাব্যস্ত হওয়ার অর্থ হচ্ছে, ঈমানদারের ক্বলবে সেটার সত্যায়ন প্রোথিত থাকা, তার শাখা আসমানের দিকে উপরে থাকার অর্থ, এ বাণীটির উঁচু মর্যাদাসম্পন্ন হওয়া, এ কালেমাটির কাণ্ড অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়া, আর সেটি যাবতীয় পর্দা ভেদ করে চলে যায়, 'আরশে না যাওয়া পর্যন্ত তা ক্ষ্যান্ত হয় না।”¹
হাফেয ইবন রাজাব রাহিমাহুল্লাহ অন্যত্র তাদের প্রতিবাদ করেছেন, যারা কুরআন ও হাদীসে আসা আল্লাহ কর্তৃক বান্দার নিকটে থাকা আর আল্লাহ কর্তৃক বান্দার সাথে থাকার ভুল অর্থ করে আল্লাহকে সব জায়গায় বলেন, তিনি তাদের সম্পর্কে বলেন,
ولم يكن أصحاب النبي - صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - يفهمون من هذه النصوص غير المعنى الصحيح المراد بها، يستفيدون بذلك معرفة عظمة الله وجلاله، وإطلاعه على عباده وإحاطته بهم، وقربه من عابديه، وإجابته لدعائهم، فيزدادون به خشية الله وتعظيمها وإجلالا ومهابة ومراقبة واستحياء، ويعبدونه كأنهم يرونه.
ثم حدث بعدهم من قل ورعه، وساء فهمه وقصده، وضعفت عظمة الله وهيبته في صدره، وأراد أن يري الناس امتيازه عليهم بدقة الفهم وقوة النظر، فزعم أن هذه النصوص تدل على أن الله بذاته في كل مكان، كما يحكى ذلك عن طوائف من الجهمية والمعتزلة ومن وافقهم، تعالى الله عما يقولون علوا كبيرا، وهذا شيء ما خطر لمن كان قبلهم من الصحابة - رضي الله عنهم -، وهؤلاء ممن يتبع ما تشابه منه ابتغاء الفتنة وابتغاء تأويله، وقد حذر النبي - صلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - أمته منهم في حديث عائشة الصحيح المتفق عليه.
وتعلقوا - أيضا - بما فهموه بفهمهم القاصر مع قصدهم الفاسد بآيات في كتاب الله، مثل قوله تعالى: ﴿وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ﴾ [الحديد: ٤] وقوله : ﴿مَا يَكُونُ مِنْ نَجْوَى ثَلاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ﴾ [المجادلة: 7] ، فقال من قال من علماء السلف حينئذ: إنما أراد أنه معهم بعلمه، وقصدوا بذلك إبطال ما قاله أولئك، مما لم يكن أحد قبلهم قاله ولا فهمه من القرآن.
ومن قال: أن هذه المعية بالعلم مقاتل بن حيان، وروي عنه أنه رواه عن عكرمة، عن ابن عباس وقاله الضحاك، قال: الله فوق عرشه، وعلمه بكل مكان، وروي نحوه عن مالك وعبد العزيز الماجشون والثوري واحمد وإسحاق وغيرهم من أئمة السلف. وروى الإمام أحمد: ثنا عبد الله بن نافع، قال: قال مالك: الله في السماء، وعلمه بكل مكان. وروي هذا المعنى عن علي وابن مسعود أيضا. وقال الحسن في قوله تعالى: إِنَّ رَبَّكَ أَحَاطَ بِالنَّاسِ ) [الإسراء: ٦۰] ، قال : علمه بالناس وحكى ابن عبد البر وغيره إجماع العلماء من الصحابة والتابعين في تأويل قوله: ﴿وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ ﴾ [الحديد: ٤] أن المراد علمه، وكل هذا قصدوا به رد قول من قال: أنه تعالى بذاته في كل مكان|
"নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ এসব ভাষ্য থেকে কখনও যা বিশুদ্ধভাবে উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে তা ভিন্ন অপর কোনো অর্থ বুঝতেন না। তাঁরা এসব ভাষ্য থেকে আল্লাহর মহত্ব, সম্মান, মর্যাদা বুঝতেন, আরও বুঝতেন যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের দিকে তাকান, তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রাখেন, তাঁর ইবাদাতকারীদের নিকটে এবং তাকে আহ্বানকারীদের ডাকে সাড়া প্রদান করেন; ফলে তাদের মাঝে আল্লাহর ভয়, সম্মান, মর্যাদা, ভীতি, দৃষ্টি, লজ্জা বৃদ্ধি পেত, আর তারা তাঁর ইবাদাত করতেন এমনভাবে যেন তারা তাঁকে দেখছেন।
তারপর তাদের পরে এমন লোকদের আবির্ভাব ঘটলো, যাদের পরহেযগারী কমে গেল, তাদের বুঝ ও উদ্দেশ্যে ত্রুটি এসে গেল, তাদের কাছে আল্লাহর মহত্ব, তাদের সীনায় আল্লাহর ভীতি দুর্বল হয়ে গেল, আর সে ইচ্ছা করল মানুষের মাঝে তার বিশেষ সূক্ষ্ম বুঝ ও প্রখর দৃষ্টির বিশেষত্ব প্রকাশ হোক, তাই সে মনে করল যে, কুরআন ও হাদীসের এসব ভাষ্য প্রমাণ করছে যে, আল্লাহ সত্তাগতভাবে সব জায়গায়, যেমনটি জাহমিয়্যাহ, মু'তাযিলা সম্প্রদায় ও তাদের সাথে যারা একমত হয়েছে এমন বেশ কিছু লোকদের থেকে বর্ণনা করা হয়। আল্লাহ তা'আলা তারা যা বলে তা থেকে বহু ঊর্ধ্বে। বস্তুত এ জাতীয় কোনো কিছু তাদের আগে যারা চলে গেছে সাহাবায়ে কেরামের অন্তরে কখনও উদিত হয়নি। এরাই হচ্ছে সেসব লোক যারা কুরআনের অস্পষ্ট আয়াতের অনুসরণ করে চলে, ফিতনার উদ্দেশ্যে এবং সেটার অপব্যাখ্যা দাঁড় করানোর উদ্দেশ্যে। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মতকে 'আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহা বর্ণিত বুখারী ও মুসলিমের ঐকমত্যে বর্ণিত হাদীসে তাদের থেকে সাবধান করেছেন।
আর তারা তাদের অসম্পূর্ণ বুঝ দিয়ে খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে আল্লাহ তা'আলার বেশ কিছু আয়াত থেকে যা কিছু বুঝেছে তার সাথে সম্পৃক্ত হলো। যেমন আল্লাহর বাণী, "আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন তিনি তোমাদের সাথে আছেন।" [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ০৪], অপর বাণী, "তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোনো গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থজন হিসেবে তিনি থাকেন না।” [সূরা আল-মুজাদালাহ, আয়াত: ০৭] তখন তৎকালীন সালাফে সালেহীনের আলেমগণ তাদেরকে বলেছিলেন, আল্লাহ তা'আলা তো এখানে উদ্দেশ্য নিয়েছেন যে, তিনি জ্ঞানে তাদের সাথে রয়েছেন। তারা এটা বলেছেন এ লোকগুলোর বক্তব্যকে খণ্ডন করার জন্য, যা ইতোপূর্বে কেউ কোনোদিন বলেনি, কুরআন থেকেও তা বুঝেনি।
যারা আল্লাহর সাথে থাকার অর্থ করেছেন জ্ঞানের মাধ্যমে সাথে থাকা, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, মুক্বাতিল ইবন হাইয়্যান। আরও বর্ণিত আছে যে, তিনি তা বর্ণনা করেছেন ইকরিমাহ থেকে, ইকরিমাহ তা ইবন 'আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে বর্ণনা করেছেন। অনুরূপ সাথে থাকার অর্থ যারা জ্ঞানের মাধ্যমে সাথে থাকার অর্থ করেছেন তাদের অন্যতম হচ্ছেন, দ্বাহহাক। তিনি বলেন, "আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপর, আর তাঁর জ্ঞান সব জায়গায়। তাছাড়া অনুরূপ বর্ণনা মালিক, আবদুল আযীয ইবনুল মাজেশূন, আস-সাওরী, আহমাদ, ইসহাক্ব প্রমুখ সালাফে সালেহীন ইমামদের থেকেও এসেছে। আর ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমাকে হাদীস শুনিয়েছেন আবদুল্লাহ ইবন নাফে', তিনি বলেন, আমাকে মালিক বলেন, আল্লাহ আসমানের উপরে আর তাঁর জ্ঞান সর্বত্র। তাছাড়া অনুরূপ অর্থে বর্ণনা এসেছে আলী ও ইবন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকেও। আর হাসান (বসরী) আল্লাহর বাণী "নিশ্চয় আপনার রব মানুষদেরকে পরিবেষ্টন করে আছেন।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৬০] এর ব্যাখ্যায় বলেন, এর উদ্দেশ্য মানুষের ব্যাপারে তাঁর জ্ঞান। আর ইমাম ইবন আবদুল বার ও অন্যান্যগণ সাহাবায়ে কেরাম ও তাবে'ঈন আলেমগণের ইজমা' উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহর বাণী "তিনি তোমাদের সাথেই আছেন যেখানেই তোমরা থাক না কেন।” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ০৪] এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহর জ্ঞান। আর তাদের এসব বর্ণনা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে তাদের কথা খণ্ডন করা যারা বলে মহান আল্লাহ সত্তাগতভাবে সব জায়গায় রয়েছেন।”²
অপর জায়গায় তিনি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আহ ও অন্যান্যদের মধ্যে দলীল গ্রহণ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন,
فأهل العلم والايمان يمتثلون في هذه الشبهات ما أمروا به من الاستعاذة بالله، والانتهاء عما ألقاه الشيطان، وقد جعل النبي - صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ - ذلك من علامات الأيمان، وغيرهم فيصغون إلى تلك الشبهات، ويعبرون عنها بألفاظ مشتبهات، لا حرمة لها في نفسها، وليس لها معنى يصح، فيجعلون تلك الألفاظ محكمة لا تقبل التأويل، فيردون كلام الله ورسوله إليها، ويعرضونه عليها، ويحرفونه عن مواضعه لأجلها.
هذه طريقة طوائف أهل البدع المحضة من الجهمية والخوارج والروافض والمعتزلة ومن أشبههم، وقد وقع في شيء من ذلك كثير من المتأخرين المنتسبين إلى السنة من أهل الحديث والفقه والتصوف من أصحابنا وغيرهم في بعض الأشياء دون بعض.
وأما السلف وأئمة أهل الحديث، فعلى الطريقة الأولى، وهي الأيمان بجميع ما أثبته الله لنفسه في كتابه، أو صح عن رسول الله - صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم - أنه أثبته له، مع نفي التمثيل والكيفية عنه، كما قاله ربيعة ومالك وغيرهما من أئمة الهدى في الاستواء، وروي عن أم سلمة أم المؤمنين، وقال مثل ذلك غيرهم من العلماء في النزول، وكذلك القول في سائر الصفات، والله سبحانه وتعالى الموفق.
"আর ইলম ও ঈমানের অধিকারীগণ এসব সন্দেহের সময় তাদেরকে যে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে তার পূর্ণ অনুসরণ করেন, তাদেরকে সন্দেহ উদ্রেক হওয়ার সময় আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে বলা হয়েছে, শয়তান যা ঢেলে দিয়েছে তা থেকে বেরিয়ে এসে তা ছেড়ে দিতে বলেছে। আর নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে দূর করতে পারাকে ঈমানের আলামত হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু যারা ইলম ও ঈমানের অধিকারী নয় তারা এসব সন্দেহের প্রতি কান লাগিয়ে রাখে, সেগুলোকে অস্পষ্ট বিভিন্ন সন্দেহজনক শব্দ দিয়ে প্রকাশ করতে থাকে, যেসব শব্দের বাস্তবিক কোনো মর্যাদা নেই, আর সেগুলোর কোনো বিশুদ্ধ অর্থও হয় না। তারপরও তারা এসব শব্দকে এমন অকাট্য হিসেবে গ্রহণ করে যেন এগুলোর তাদের বর্ণিত অর্থ ব্যতীত ভিন্ন কোনো ব্যাখ্যা হয় না। তারপর তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বাণীকে এসব (সন্দেহপূর্ণ) শব্দের দিকে প্রত্যাবর্তন করায়; (আল্লাহ ও তার রাসূলের বাণীকে গ্রহণযোগ্যতা হওয়া না হওয়া নির্ধারণের জন্য) সেগুলোর উপর পেশ করে, সেসব (সন্দেহপূর্ণ) শব্দের সাথে খাপ-খাওয়ানোর জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বাণীর বিকৃতি ঘটায়।
বস্তুত এটি হচ্ছে যাবতীয় বিদ'আতী গোষ্ঠীর পদ্ধতি। যেমন, জাহমিয়্যাহ, খারেজী, রাফেদ্বী, মু'তাযিলা এবং অনুরূপ ফেরকাসমূহের নীতি। এদের এসবের কিছু খারাপ নীতির মধ্যে সুন্নাহ'র দিকে সম্পর্কিত আহলুল হাদীস, আহলুল ফিকহ ও আহলুত তাসাউফের পরবর্তী কেউ কেউ পতিত হয়ে গেছে; যারা আমাদেরই সাথের লোক; তবে তারা সবকিছুতে তাদের নীতি গ্রহণ করেনি, কিছু কিছুতে তা করেছে, অপর কিছু কিছুতে তারা বিশুদ্ধ পদ্ধতির ওপর রয়েছে।
কিন্তু সালাফে সালেহীন ও হাদীস অনুসারীদের ইমামগণ তারা প্রথম নীতির ওপরই রয়েছেন। আর তা হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর কিতাবে যা তাঁর নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন অথবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যা বিশুদ্ধভাবে বর্ণিত হয়ে এসেছে যে, তিনি আল্লাহর জন্য তা সাব্যস্ত করেছেন। সাথে সাথে তারা এসব সাব্যস্ত করাকে কোনো সৃষ্টির মতো করে বা ধরন নির্ধারণ করাকে অস্বীকার করেন। যেমনটি রবী'আহ, মালিক ও অন্যান্য হিদায়াতের ইমামগণ ইস্তেওয়া তথা 'আল্লাহর 'আরশের উপর উঠা'র ব্যাপারে বলেছেন। আর যা উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামাহ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহা থেকেও বর্ণিত হয়েছে। আর তারা ব্যতীত অন্যান্য আলেমগণ অনুরূপ কথা বলেছেন 'আল্লাহর নিকটতম আসমানে নাযিল হওয়া'র বিষয়ে। অনুরূপ কথাই বলা হবে যাবতীয় গুণের ব্যাপারে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলাই হচ্ছেন তাওফীকদাতা।”³
অন্যত্র তিনি আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর থাকা ও সাথে, নিকটে থাকার মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করতে গিয়ে বলেন,
وزعم بعض من تحذلق أن ما قاله هؤلاء الأئمة خطأ؛ لأن علم الله صفة لا تفارق ذاته، وهذا سوء ظن منه بأئمة الإسلام؛ فإنهم لم يريدوا ما ظنه بهم، وإنما أرادوا أن علم الله متعلق بما في الأمكنة كلها ففيها معلوماته، لا
صفة ذاته، كما وقعت الإشارة في القرآن إلى ذلك بقوله تعالى: ﴿وَسِعَ كُلَّ شَيْءٍ عِلْمًا ﴾ [طه: ۹۸] وقوله: ﴿رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَحْمَةً وَعِلْمًا ) [غافر: ٧] وقوله : {ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنْزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ ﴾ [الحديد: ٤] .
وقال حرب: سألت إسحاق عن قوله: مَا يَكُونُ مِنْ نَجْوَى ثَلاثَةٍ إِلا هُوَ رَابِعُهُمْ ﴾ [المجادلة: ٧]؟ قال: حيث ما كنت هو أقرب إليك من حبل الوريد، وهو بائن من خلقه.... فالمعية العامة تقتضي التحذير من علمه وإطلاعه وقدرته وبطشه وانتقامه والمعية الخاصة تقتضي حسن الظن بإجابته ورضاه وحفظه وصيانته فكذلك القرب.
وليس هذا القرب كقرب الخلق المعهود منهم، كما ظنه من ظنه من أهل الضلال، وإنما هو قرب ليس يشبه قرب المخلوقين، كما أن الموصوف به لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ) [الشورى: ١١ ] .
وهكذا القول في أحاديث النزول إلى سماء الدنيا فإنه من نوع قرب الرب من داعيه وسائليه ومستغفريه.
وقد سئل عنه حماد بن زيد فقال: هو في مكانه يقرب من خلقه كما يشاء... وقال حنبل: سألت أبا عبد الله: ينزل الله إلى سماء الدنيا ؟ قال: نعم. قلت: نزوله بعلمه أو بماذا؟ قال: اسكت عن هذا، مالك ولهذا؟ أمض الحديث على ما روي بلا كيف ولا حد، إلا بما جاءت به الآثار، وجاء به الكتاب، قال الله: {فَلا تَضْرِبُوا لله الأَمْثَالَ ) [النحل: ٧٤] ينزل كيف يشاء، بعلمه وقدرته وعظمته، أحاط بكل شيء علما، لا يبلغ قدره واصف، ولا ينأى عنه هرب هارب عز وجل.
ومراده أن نزوله تعالى ليس كنزول المخلوقين، بل هو نزول يليق بقدرته وعظمته وعلمه المحيط بكل شيء، والمخلوقون لا يحيطون به علما، وإنما ينتهون إلى ما أخبرهم به عن نفسه، أو أخبر به عنه رسوله.
فلهذا اتفق السلف الصالح على إمرار هذه النصوص كما جاءت من غير زيادة ولا نقص، وما أشكل فهمه منها، وقصر العقل عن إدراكه وكل إلى عالمه.
"আর তাদের মধ্যে যারা নিজেকে খুব বুদ্ধিমান দাবি করে সে মনে করেছে, (ইসলামের সালাফে সালেহীন) মহান ইমামগণ (আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপর অবস্থান করেও সৃষ্টির সাথে থাকা 'জ্ঞানের মাধ্যমে' হওয়ার বিষয়ে) যা বলেছেন তা ভুল; কারণ তাদের নিকট আল্লাহর ইলম বা জ্ঞান তাঁর সত্তার সাথে সম্পৃক্ত; যা তাঁর সত্তা থেকে আলাদা হতে পারে না। বস্তুত এ রকম কথা ইসলামের ইমামগণের ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষণ করা। কারণ, তারা ইমামদের ব্যাপারে যা ধারণা করেছে ইমামগণ তা বলেননি। ইমামগণের উদ্দেশ্য এটা বলা যে, আল্লাহর জ্ঞান সর্বজায়গার সাথে সম্পৃক্ত; যেখানে তার জ্ঞাত বিষয় রয়েছে, তাঁর সত্তার গুণ সেখানে চলে গেছে এমন কথা ইমামগণ কখনো বলেননি। আর এটা সে রকম হবে যার প্রতি ইঙ্গিত সংঘটিত হয়েছে আল্লাহর বাণীতে, "সবকিছু তাঁর জ্ঞানের পরিধিভুক্ত।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ৯৭] "হে আমাদের রব! আপনি দয়া ও জ্ঞান দ্বারা সবকিছুকে পরিব্যাপ্ত করে রেখেছেন।" [সূরা গাফির, আয়াত: ০৭] "তিনি জানেন যা কিছু যমীনে প্রবেশ করে এবং যা কিছু তা থেকে বের হয়, আর আসমান থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উত্থিত হয়। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন-তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন।” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ০৪]
হারব বলেন, আমি ইসহাক্ব ইবন রাহওয়াইহকে প্রশ্ন করলাম, আল্লাহর বাণী "তাদের মধ্যে তিনজনের শলা-পরামর্শ হলে সেখানে চতুর্থজন হন আল্লাহ।” [সূরা আল-মুজাদালাহ, আয়াত: ০৭] সম্পর্কে। তখন ইমাম ইসহাক্ব ইবন রাহওয়াইহ উত্তরে বললেন, তুমি যেখানেই থাক না কেন আল্লাহ তোমার ঘাড়ের ধমনীর চেয়েও নিকটে, অথচ তিনি সৃষ্টির থেকে আলাদা....
সুতরাং 'সাধারণভাবে সাথে থাকা' এর চাহিদা হচ্ছে, আল্লাহর জ্ঞান, তাঁর দেখা, তাঁর ক্ষমতা, তাঁর পাকড়াও, তাঁর শাস্তি সম্পর্কে সাবধান থাকা। আর 'বিশেষভাবে সাথে থাকা' এর চাহিদা হচ্ছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার ডাকে সাড়া দেয়া, বান্দার ওপর সন্তুষ্ট হওয়া, তার হিফাযত করা, তার রক্ষণাবেক্ষণ করার ব্যাপারে সুধারণা রাখা।
ঠিক আল্লাহ বান্দার নিকটে থাকার বিষয়টিও অনুরূপ। তবে এটা জানা দরকার যে, এ নিকটে থাকার বিষয়টি কখনও সৃষ্টি যেভাবে একে অপরের নিকটে থাকে সেরকম কোনো নিকটে থাকা নয়, যা কোনো কোনো পথভ্রষ্ট লোকেরা মনে করে থাকে। বরং সেটা এমন এক নিকটে থাকা যা সৃষ্টির নিকটে থাকার সাথে সাদৃশ্য রাখে না। যেমনিভাবে যার সাথে এ গুণটি সম্পৃক্ত তাঁর মতো কোনো সত্তা নেই, তিনি সর্বশ্রোতা-সর্বদ্রষ্টা।
ঠিক অনুরূপই বলা হবে আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক নিকটতম আসমানে অবতরণ করার ব্যাপারে; সেটাও রবের পক্ষ থেকে তাঁকে আহ্বানকারী, তাঁর কাছে যাচঞাকারী, তাঁর কাছে ক্ষমাপ্রার্থীর জন্য বিশেষ এক প্রকার নৈকট্য।
হাম্মাদ ইবন যায়েদকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, তিনি তাঁর স্থানেই আছেন, সেখান থেকেই তিনি তাঁর সৃষ্টির নিকটে যান যেভাবে ইচ্ছা।...
হাম্বল বলেন, আমি আবদুল্লাহ আহমাদ ইবন হাম্বলকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আল্লাহ তা'আলা কি নিকটতম আসমানে নেমে আসেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, তাঁর অবতীর্ণ হওয়া কি জ্ঞানের মাধ্যমে নাকি অন্য কিছু দ্বারা? তিনি বললেন, এ ব্যাপারে চুপ থাকো, তোমার কী আর এটার কী? হাদীসকে যেভাবে এসেছে সেভাবে চলতে দাও, কোনো প্রকার ধরন নির্ধারণ করবে না, কোনো প্রকার সংজ্ঞাও প্রদান করবে না। তবে যদি হাদীসে বা সালাফদের কাছ থেকে ও আল্লাহর কিতাবে কিছু বর্ণনা এসে থাকলে সেটা ভিন্ন কথা। আল্লাহ তা'আলা বলেন, "সুতরাং তোমরা আল্লাহর জন্য উপমা সেট করো না।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৭৪] যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে নাযিল হন, তাঁর জ্ঞানে, তাঁর ক্ষমতায়, তাঁর বড়ত্বের মাধ্যমে। তিনি সবকিছুকে জ্ঞানে পরিবেষ্টন করে আছেন, তাঁর গুণ বর্ণনাকারী কেউ তার মর্যাদা বর্ণনা করে শেষ করতে পারবে না, কোনো পলায়নকারী পালালেই তাঁর থেকে দূরে চলে যেতে পারবে না। মহান আল্লাহ তিনি।
ইমাম আহমাদের এ কথার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহর নিকটতম আসমানে অবতরণ করা সৃষ্টির কারো অবতরণের মতো নয়। বরং সেটা এমন এক অবতরণ যা তাঁর শক্তি, মহত্ব ও তাঁর সর্বব্যাপী জ্ঞানের সাথে উপযোগী করে নির্ধারণ করতে হবে। সৃষ্টিকুল তাঁকে জ্ঞানে পরিবেষ্টন করতে পারে না, তারা শুধু ততদূর গিয়ে থেমে যায় যতটুকু তিনি তাদেরকে তাঁর সম্পর্কে জানিয়েছেন অথবা তাঁর ব্যাপারে তাঁর রাসূল জানিয়েছেন।
এ জন্যই সালাফে সালেহীন এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে, এ ভাষ্যগুলোকে যেভাবে এসেছে সেভাবে কোনোরূপ হ্রাস-বৃদ্ধি করা ব্যতীতই চালিয়ে নিতে হবে। তন্মধ্যে যা বুঝতে অসুবিধা হবে, বিবেকের যুক্তি যা ধারণ করতে অক্ষম হবে সেটাকে এ বিষয়ে যে জ্ঞানী তার কাছে সোপর্দ করতে হবে।”¹
টিকাঃ
১. ইবন রাজাব, ফাতহুল বারী (৩/১১৫-১১৮)।