📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 ইবন তাইমিয়াহ (৭২৮ হিজরী)

📄 ইবন তাইমিয়াহ (৭২৮ হিজরী)


শাইখুল ইসলাম আহমাদ ইবন আবদুল হালীম ইবন আবদুস সালাম আল-হাররানী, যিনি ইবন তাইমিয়্যাহ নামে বিখ্যাত। তিনি আল্লাহ তা'আলার নাম ও গুণ বিষয়ে কুরআনুল কারীম, হাদীসুর রাসূল, সাহাবায়ে কেরাম, তাদের সুন্দর অনুসারী তাবে'য়ীন, তাবে তাবে'য়ীগণ, হিদায়াতের ইমামগণ, হাদীসের দিকপাল এবং তাদের প্রদর্শিত পথে বিচরণকারী পূর্ববর্তী সহীহ মানহাজের আলেমগণের মতকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন, জেলে গিয়েছেন, কষ্ট ও নির্যাতন সহ্য করেছেন। তার অবদানের কথা এ স্বল্প পরিসরে লিখে শেষ করা যাবে না। শুধু কয়েকটি ভাষ্য বর্ণনা করবো:
১- শাইখুল ইসলাম আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তাঁর 'আরশের উপর উঠার বিষয়টিতে ইজমা' বর্ণনা করে বলেন,
قد أثبت بالفطرة التي اتفق عليها أهل الفطر السليمة وبالنقول المتواترة عن المرسلين من الأخبار وما نطقت به كتب الله تعالى وما اتفق عليه المؤمنون بالرسل قبل حدوث البدع أن الله تعالى عز وجل فوق العالم وثبت أيضًا بالكتاب والسنة والإجماع أنه استوى على العرش فالعلو على العالم معروف بالفطرة والمعقول وبالشرعة والمنقول
“ফিত্বরাত বা স্বাভাবিক প্রকৃতি, যার ওপর নিরোগ ফিত্বরাতের লোকেরা অনুরূপ নবী-রাসূলগণ থেকে মুতাওয়াতির বা সন্দেহাতীত পর্যায়ের ধারাবাহিকভাবে হাদীস দ্বারা, যা আল্লাহ তা'আলা সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন, যা রাসূলগণের ওপর ঈমান আনয়নকারী ঈমানদারগণ বিদ'আতের উৎপত্তি হওয়ার আগে ঐকমত্য করেছেন তা হচ্ছে, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা জগতের উপরে। তাছাড়া কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা' দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপর উঠেছেন। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা জগতের উপরে থাকার বিষয়টি ফিত্বরাত, যুক্তি, শরী'আত ও কুরআন ও সুন্নাহ'র ভাষ্য দ্বারা সাব্যস্ত হবে।”¹
২- অন্যত্র তিনি বলেন,
ومن قال: إنَّه ليس على العرش رب ولا فوق السَّمواتِ خالق، بل ما هنالك إلَّا العدم المحض والنفي الصرف فهو معطل جاحد لرَبِّ العالمين مضاء الفرعون الذي قال: ﴿يَا هَامَانُ ابْنِ لِي صَرْحًا لَعَلِّي أَبْلُغُ الْأَسْبَابَ أَسْبَابَ السَّمَاوَاتِ فَأَطَّلِعَ إِلَى إِلَهِ مُوسَى وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ كَاذِبًا ﴾ [غافر : ٣٦ - ٣٧].
بل أهل السنة والحديث، وسلف الأمة متفقون على أنه فوق سمواته على عرشه بائن من خلقه ليس في ذاته شيء من مخلوقاته ولا في مخلوقاته شيء من ذاته، وعلى ذلك نصوص الكتاب والسنة وإجماع سلف الأمة وأئمة السنة، بل على ذلك جميع المؤمنينَ مِنَ الأوَّلِينَ والآخرين وأهل السنة وسلف الأُمَّةِ مِتَّفقون على أنَّ من تأوَّل استوى بمعنى استولى أو بمعنى آخر ينفي أن يكون الله فوق سمواته فهو جهمي ضال .
"আর যে কেউ বলবে, আল্লাহ 'আরশের উপর নয় অথবা বলবে, আসমানের উপর রব নেই অথবা বলবে যে, সেখানে কেবল নাস্তি, কিছুই নাই সে তো মু'আত্তিল, সৃষ্টিকে স্রষ্টা শূন্যকারী, রাব্বুল আলামীনকে অস্বীকারকারী, সে ফির'আউনের মতোই কথা বললো, সে বলেছিল, "হে হামান! আমার জন্য তুমি নির্মাণ কর এক সুউচ্চ প্রাসাদ যাতে আমি অবলম্বন পাই -আসমানে আরোহনের অবলম্বন, যেন দেখতে পাই মূসার ইলাহকে আর নিশ্চয় আমি তাকে মিথ্যাবাদী মনে করি।" [সূরা গাফির, আয়াত: ৩৬-৩৭]।
বরং আহলুস সুন্নাহ ও আহলুল হাদীস, উম্মতের সালাফগণ সবাই একমত যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর আসমানসমূহের উপর, 'আরশের উপর, তাঁর সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা। তাঁর সত্তাতে সৃষ্টির কোনো কিছু নেই, তেমনি সৃষ্টির অভ্যন্তরেও স্রষ্টার সত্তার কিছু নেই। আর এর ওপরই প্রমাণ দিচ্ছে, কুরআন, সুন্নাহ উম্মাতের সালাফ ও সুন্নাহ'র ইমামগণের ইজমা'। বরং এর ওপরই আগের ও পরের সকল মুমিন, আহলুস সুন্নাহ, সালাফুল উম্মাহ সবাই একমত, যে কেউ 'ইস্তাওয়া'কে 'ইস্তাওলা' দ্বারা অপব্যাখ্যা করবে অথবা অন্য কোনো অর্থ দিয়ে অপব্যাখ্যা করবে, যার মাধ্যমে সে আল্লাহ তা'আলাকে 'আরশের উপর থাকা অস্বীকার করবে সে জাহমী ও পথভ্রষ্ট।”²
৩- অন্যত্র তিনি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের আকীদাহ বর্ণনায় বলেন,
وقال أهل السنة وأصحاب الحديث ليس بجسم ولا يشبه الأشياء وانه على العرش كما قال الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ استوى [طه ٥] ولا نقدم بين يدي الله تعالى في القول بل نقول استوى بلا كيف وأن له وجها كما قال وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ [الرحمن ۲۷] وان له يدين كما قال خَلَقْتُ بِيَدَيَّ [ ص ٧٥] وأن له عينين كما قال تَجْرِي بِأَعْيُنِنَا [ القمر ١٤ ] وانه يجيء يوم القيامة هو وملائكته كما قال تعالى وَجَاءَ رَبُّكَ وَالْمَلَكُ صَفًّا صَفَاً [الفجر ٢٢] وأنه ينزل إلى سماء الدنيا كما جاء في الحديث ولم يقولوا شيئًا إلا ما وجدوه في الكتاب أو جاءت به الرواية عن رسول الله صلى الله عليه وسلم
"আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আত ও আসহাবুল হাদীস বলেন, তিনি শরীর বা দেহ নন; তিনি কোনো কিছুর মতো নন, তিনি 'আরশের উপরে যেমনটি আল্লাহ বলেছেন, "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫], আমরা কোনো কথায় আল্লাহর সামনে অগ্রণী হবো না, বরং বলবো, তিনি (আল্লাহ) কোনো প্রকার ধরন নির্ধারণ ছাড়া 'আরশের উপর উঠেছেন। আরও বলেন, আল্লাহর রয়েছে চেহারা। যেমন আল্লাহ বলেন, "আর অবশিষ্ট থাকবে আপনার রবের চেহারা, যা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানিত।” [সূরা আর-রহমান, আয়াত: ২৭] আরও বলেন, তাঁর রয়েছে, দু'টি হাত। যেমন আল্লাহ বলেছেন, "আমি সৃষ্টি করেছি দুই হাতে।” [সূরা সোয়াদ, আয়াত: ৭৫]; আরও বলেন, তাঁর রয়েছে, দু'টি চোখ, যেমনটি তিনি বলেন, "সে জাহাজ চলে, আমার চোখের সামনে দিয়ে।" [সূরা আল-ক্বামার, আয়াত: ১৪] আরও বলেন, তিনি এবং তাঁর ফিরিশতারা হাশরের মাঠে আগমন করবেন, যেমনটি আল্লাহ বলেন, "আর আসবে আপনার রব এবং ফিরিশতাগণ কাতারে কাতারে।” [সূরা আল-ফজর, আয়াত: ২২], আরও বলেন, মহান রব আল্লাহ নিকটতম আসমানে নেমে আসেন, যেমনটি হাদীসে এসেছে। তারা এমন কথা কখনও বলেনি, যার দলীল কুরআনুল কারীমে পাওয়া যায়নি অথবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত হয়নি।"³
৪- অন্যত্র তিনি আল্লাহ তা'আলার সিফাত এর ব্যাপারে সালাফে সালেহীনের মানহাজ তুলে ধরে বলেন,
ومذهب السلف بين التعطيل وبين التمثيل، فلا يمثلون صفات الله بصفات خلقه، كما لا يمثل ذاته بذات خلقه، ولا ينفون عنه ما وصف به نفسه، أو وصفه به رسوله صلى الله عليه وسلم فيعطلون أسماءه الحسنى وصفاته العلى، ويحرفون الكلم عن مواضعه، ويلحدون في أسماء الله وآياته.
وكل واحد من فريقي التعطيل والتمثيل فهو جامع بين التعطيل والتمثيل.
أما المعطلون؛ فإنهم لم يفهموا من أسماء الله وصفاته إلا ما هو اللائق بالمخلوق، ثم شرعوا في نفي تلك المفهومات، فقد جمعوا بين التمثيل والتعطيل، مثلوا أولاً، وعطلوا آخرا، وهذا تشبيه وتمثيل منهم للمفهوم من أسمائه وصفاته بالمفهوم من أسماء خلقه وصفاتهم، وتعطيل لما يستحقه هو سبحانه من الأسماء والصفات اللائقة بالله
فإنه إذا قال القائل: لو كان الله فوق العرش للزم إما أن يكون أكبر من العرش، أو أصغر أو مساويا، وكل ذلك محال، ونحو ذلك من الكلام.
فإنه لم يفهم من كون الله على العرش إلا ما يثبت لأي جسم كان على أي جسم كان، وهذا اللازم تابع لهذا المفهوم. [أما] استواء يليق بجلال الله ويختص به، فلا يلزمه شيء من اللوازم الباطلة التي يجب نفيها.
وصار هذا مثل قول الممثل: إذا كان للعالم صانع، فإما أن يكون جوهرًا، أو عرضًا، وكلاهما محال: إذ لا يعقل موجود إلا هذان، أو قوله: إذا كان مستويا على العرش، فهو مماثل لاستواء الإنسان على السرير أو الفلك، إذ لا يُعلم الاستواء إلا هكذا، فإن كلاهما مثل وكلاهما عَطَّل حقيقة ما وصف الله به نفسه، وامتاز [الأول] بتعطيل كل مسمى للاستواء الحقيقي, وامتاز الثاني بإثبات استواء هو من خصائص المخلوقين|
"সালাফে সালেহীনের মাযহাব তা'ত্বীল (অর্থশূন্য করা) ও তামছীল (সাদৃশ্য স্থাপন) করার মাঝখানে অবস্থিত। তারা আল্লাহর গুণাবলিকে সৃষ্টির গুণের সাথে সাদৃশ্য হিসেবে বিশ্বাস করে না। যেমন, তারা আল্লাহর সত্তাকে সৃষ্টির সত্তার সাথে একই রকম মনে করে না। তবে তারা আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজের জন্য যা সাব্যস্ত করেছেন, অনুরূপ তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর জন্য যা সাব্যস্ত করেছেন, তার কোনোটিকেই অস্বীকার করে না। ফলে তারা আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম, গুণসমূহকে অর্থশূন্য করে না, সেগুলোর ওপর প্রমাণবাহী বাক্যসমূহকে তার জায়গা থেকে বিকৃত করে ভিন্ন জায়গায় নিয়ে যায় না, অনুরূপ তারা আল্লাহর নাম ও গুণে ইলহাদও করে না"।
আর আল্লাহ তা'আলার নাম ও গুণকে তা'ত্বীলকারী (অর্থশূন্যকারী) ও নাম-গুণে তামছীল (সাদৃশ্য স্থাপনকারী) প্রত্যেক গোষ্ঠীই তাদের কর্ম দ্বারা তা'ত্বীল ও তামছীলের সমন্বয় করেছে।
যারা আল্লাহ তা'আলার নাম ও গুণাবলিকে তা'ত্বীল (অর্থশূন্য) করেছে, তারা আল্লাহর নাম ও গুণসমূহকে সৃষ্টির নাম ও গুণের উপযোগী করে বুঝেছে। তারপর তারা সে বুঝকে অস্বীকার করতে শুরু করেছে। এভাবেই তারা তা'ত্বীল ও তামছীলকে একত্র করেছে। প্রথমে তামছীল করেছে তারপর তা'ত্বীল করেছে। এটা হচ্ছে তাদের পক্ষ থেকে আল্লাহর নাম ও গুণের বুঝের ক্ষেত্রে সেগুলোকে আল্লাহর সৃষ্টির নাম ও গুণের বুঝের সাথে সাদৃশ্য প্রদান ও সমপর্যায়ের নির্ধারণ করা। অপরদিকে তা দ্বারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার সাথে উপযোগী তাঁর নাম ও গুণকে অর্থশূন্য করা।
তারপর যদি কেউ বলে, যদি আল্লাহ 'আরশের উপর হয়, তবে তো তিন অবস্থার যেকোনো একটি হতে হয়, হয় তিনি 'আরশ থেকে বড় হবেন অথবা ছোট হবেন অথবা সমান সমান হবেন। আর এ সবগুলোই (আল্লাহর জন্য) অসম্ভব; বা অনুরূপ কথা।
তখন উত্তরে বলা হবে, সে তো আল্লাহ তা'আলাকে 'আরশের উপরে থাকার বিষয়টিকে একটি দেহ যেমন আরেকটি দেহের উপর থাকে সে রকম করে বুঝে নিয়েছে, এ বুঝটির কারণেই সে উপরোক্ত (তিন অবস্থার) বাধ্যবাধকতা নিয়ে এসেছে। কিন্তু সে যদি আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠাকে তাঁর মহান সত্তার মান-মর্যাদার সাথে উপযোগী ও তাঁর বিশেষত্ব হিসেবে বুঝত, তাহলে সে আর এসব (তথাকথিত) বাধ্যবাধকতার সম্মুখীন হতো না। বস্তুত এসব বাধ্য-বাধকতার বিষয়গুলো আল্লাহ থেকে অবশ্যই অস্বীকার করতে হবে।
এর অবস্থা হচ্ছে সেই 'মুমাছছিল' যে আল্লাহ তা'আলার নাম ও গুণকে সৃষ্টির মতো করে বুঝে থাকে তার মতোই; কারণ 'মুমাছছিল' বা (আল্লাহর নাম ও গুণকে সৃষ্টির সাথে) সমতা বিধানকারী বলে, যদি জগতের একজন স্রষ্টা থাকে, তবে তিনি হয় জাওহার হবেন না হয় আরদ্ব। আর উভয়টিই অসম্ভব; কারণ যেকোনো অস্তিত্বশীল সত্তা এর বাইরে যেতে পারে না। [তখন 'মুমাছছিল' বা সমতা বিধানকারী ব্যক্তি আল্লাহর সত্তাকে সৃষ্টির মতো করেই বুঝে থাকে। এ হিসেবে মু'আত্তিল ও মুমাছছিলের মধ্যে বুঝের মিল পরিলক্ষিত হচ্ছে।] অথবা মুমাছছিল বললো, যদি আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপর উঠে থাকেন তবে অবশ্যই তা কোনো খাট বা নৌকায় মানুষের উঠার মতোই হবে, কারণ আমি উপরে উঠা বলতে এমনটিই বুঝে থাকি। তাহলে বুঝা গেল যে, মু'আত্তিল (অর্থশূন্যকারী) ও মুমাছছিল (পূর্ণসাদৃশ্য স্থাপনকারী) উভয়েই মূলত তামছীল (সাদৃশ্য স্থাপন) করেছে আর উভয়েই আল্লাহ তা'আলা যেসব গুণে তাঁর নিজেকে গুণান্বিত করেছেন তা তা'ত্বীল (অর্থশূন্য) করেছে। তবে প্রথম গোষ্ঠী (তা'ত্বীল বা অর্থশূন্যকারী)র বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা প্রকৃত অর্থে যে 'ইস্তেওয়া' এর অর্থ ছিল সেটার পুরোটাকেই পূর্ণরূপে অর্থশূন্য করেছে, আর দ্বিতীয় গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা এমন 'ইস্তেওয়া' সাব্যস্ত করেছে যা সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য, (স্রষ্টার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়)।⁴
৫- অন্যত্র তিনি আল্লাহ তা'আলার সিফাত এর ব্যাপারে কালামশাস্ত্রবিদদের আসল ভুল কীভাবে হয়েছে তা তুলে ধরে বলেন,
إن هؤلاء المبتدعة الذين يفضلون طريقة الخلف على طريقة السلف إنما أتوا من حيث ظنوا أن طريقة السلف هي مجرد الإيمان بألفاظ القرآن والحديث من غير فقه لذلك، بمنزلة الأميين الذين قال فيهم: ﴿وَمِنْهُمْ أُمِّيُّونَ لَا يَعْلَمُونَ الْكِتَابَ إِلَّا أَمَانِيَّ﴾ [البقرة: ٧٨] ، وأن طريقة الخلف هي استخراج معاني النصوص المصروفة عن حقائقها بأنواع المجازات وغرائب اللغات.
فهذا الظن الفاسد أوجب تلك المقالة التي مضمونها نبذ الإسلام وراء الظهر، وقد كذبوا على طريقة السلف، وضلوا في تصويب طريقة الخلف، فجمعوا بين الجهل بطريقة السلف في الكذب عليهم، وبين الجهل والضلال بتصويب طريقة الخلف.
وسبب ذلك اعتقادهم أنه ليس في نفس الأمر صفة دلت عليها هذه النصوص للشبهات الفاسدة التي شاركوا فيها إخوانهم من الكافرين، فلما اعتقدوا انتفاء الصفات في نفس الأمر - وكان مع ذلك لا بد للنصوص من معنى - بقوا مترددين بين الإيمان باللفظ وتفويض المعنى - وهي التي يسمونها طريقة السلف - وبين صرف اللفظ إلى معان بنوع تكلف . وهي التي يسمونها طريقة الخلف - فصار هذا الباطل مركبا من فساد العقل والكفر بالسمع، فإن النفي إنما اعتمدوا فيه على أمور عقلية ظنوها بينات وهي شبهات، والسمع حرفوا فيه الكلام عن مواضعه.
فلما انبنى أمرهم على هاتين المقدمتين الكفريتين كانت النتيجة استجهال السابقين الأولين، واستبلاههم، واعتقاد أنهم كانوا قوما أميين, بمنزلة الصالحين من العامة، لم يتبحروا في حقائق العلم بالله، ولم يتفطنوا لدقائق العلم الإلهي, وأن الخلف الفضلاء حازوا قصب السبق في هذا كله.
ثم هذا القول إذا تدبره الإنسان وجده في غاية الجهالة، بل في غاية الضلالة. كيف يكون هؤلاء المتأخرون - لا سيما والإشارة بالخلف إلى ضرب من المتكلمين - الذين كثر في باب الدين اضطرابهم، وغلظ عن معرفة الله حجابهم، وأخبر الواقف على نهايات إقدامهم بما انتهى إليه من مرامهم حيث يقول... أعلم بالله وأسمائه وصفاته؟
"এসব বিদ'আতীরা যারা 'খালাফ' (তথা পূর্বসূরীদের নীতির বাইরে অবস্থানকারী) লোকদের নীতিকে সালাফ (তথা সাহাবী ও তাদের সুন্দর অনুসারী সম্মানিত পূর্বসূরী) লোকদের নীতির ওপর প্রাধান্য দিয়ে থাকে, তাদের এ ভুলটি এসেছে এ কারণে যে, তারা মনে করেছে, (আল্লাহর নাম ও গুণের ব্যাপারে) সালাফদের পদ্ধতি হচ্ছে শুধু কুরআন ও হাদীসের শব্দের ওপর ঈমান আনয়ন করা, সেগুলোর অর্থ না বুঝা। তারা মনে করে বসেছে যে, সালাফগণ সেসব নিরক্ষর লোকদের মতো, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন, "আর তাদের মধ্যে এমন কিছু নিরক্ষর লোক আছে যারা মিথ্যা আশা ছাড়া কিতাব সম্পর্কে কিছুই জানে না, তারা শুধু অমূলক ধারণা পোষণ করে।" [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ৭৮], আর মনে করেছে, খালাফদের পদ্ধতি হচ্ছে, কুরআন ও সুন্নাহ'র ভাষ্যের অর্থকে তার মূল প্রকাশ্য অর্থ থেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বিভিন্ন প্রকার রূপক ও ভাষার বিরল অর্থে ব্যবহার করা।
এভাবেই কালামশাস্ত্রবিদগণ তাদের বিনষ্ট ধারণা দ্বারা ("সালাফদের পদ্ধতি অধিক নিরাপদ আর খালাফদের পদ্ধতি অধিক জ্ঞানগর্ভ") এ কথাটিকে নিজেদের জন্য আবশ্যক করে নিয়েছে। এর মাধ্যমে মূলত তারা সালাফদের পদ্ধতির ওপর মিথ্যাচার করেছে, আর খালাফদের পদ্ধতিকে বিশুদ্ধ নির্ধারণ করে পথভ্রষ্ট হয়েছে। এভাবেই তারা সালাফদের পদ্ধতি না জেনে তাদের ওপর মিথ্যাচার করেছে; কারণ তারা বিশ্বাস করছে যে, এসব ভাষ্যে আসলেই আল্লাহর কোনো গুণ সাব্যস্ত হবে না। এর মাধ্যমে তারা সন্দেহে নিপতিত হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের কাফির ভাইদের অংশীদার হয়েছে। অতঃপর যখন তারা মনে করেছে যে, এগুলোতে আসলেই আল্লাহর কোনো গুণ বর্ণিত হয়নি। তা সত্ত্বেও যখন তারা দেখলো যে, এগুলোর তো কোনো না কোনো অর্থ করতেই হয়, তখন তারা কুরআন ও হাদীসে আসা আল্লাহ তা'আলার গুণ বর্ণনাকৃত এসব ভাষ্যের ব্যাপারে শব্দের ওপর ঈমান আর অর্থকে সোপর্দ করার মাঝে দ্বিধান্বিত হতে থাকলো। এটাকেই তারা সালাফদের নীতি মনে করে বসেছে অথবা এসব ভাষ্যের শব্দকে জোর-জবরদস্তি বিভিন্ন অর্থে চালু করে দেয়ার পদ্ধতি অবলম্বন করেছে, এটাকেই তারা খালাফদের নীতি হিসেবে নামকরণ করেছে। এভাবে এ বাতিল দু'টি জিনিসের সংমিশ্রনে তৈরি হয়েছে, বিনষ্ট বিবেকের যুক্তি ও কুরআন-হাদীসের সাথে কুফুরী। কারণ তারা যখন কুরআন ও হাদীসের সিফাত বিষয়ক ভাষ্যগুলো অস্বীকার করলো, তখন তারা নির্ভর করেছে এমন বিবেকের যুক্তির উপর যে বিবেকের যুক্তি তার ধারণাকৃত বিষয়সমূহকে প্রমাণ মনে করেছে অথচ তা শুধু কিছু সন্দেহের সমষ্টি। অপর দিকে তারা কুরআন ও হাদীসের সিফাত বিষয়ক ভাষ্যগুলোর বাক্যসমূহকে তাদের স্থান থেকে বিকৃতপথে পরিচালিত করেছে।
যখন তাদের মূল বিষয়টি এ দু'টি কুফুরী নীতির প্রতিষ্ঠা করলো তখন তার পরিণতি দাঁড়ালো এই যে, উম্মতের প্রথম সারীর লোক (সাহাবায়ে কেরাম ও তাদের সুন্দর অনুসারী) দেরকে মূর্খ বানানো, তাদেরকে আত্মভোলা-পাগল সদৃশ মনে করা, তাদের প্রতি এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, তারা সবাই ছিল নিরক্ষর, যেমনটি সাধারণ নেককার মানুষ (দরবেশরা) হয়ে থাকে; যারা আল্লাহ সম্পর্কিত বিদ্যার সমুদ্রের প্রবেশ করতে পারেনি, তারা আল্লাহ সংক্রান্ত বিদ্যার সূক্ষ্মতার ব্যাপারে সচেতন হতে পারেনি। তার বিপরীতে তারা বিশ্বাস করতে থাকলো যে, এসব ব্যাপারে সম্মানিত (!) খালাফগণ প্রতিযোগিতায় সালাফদেরকে হারিয়ে ইলমের শিরোপা জিতে নিল!
তারপর এই قول যদি মানুষ গভীরভাবে চিন্তা করে দেখে তাহলে চরম অজ্ঞতা, বরং চরম পথভ্রষ্টতা বলে প্রমাণিত হবে। কীভাবে এই পরবর্তী যুগের মানুষরা - বিশেষ করে এখানে খালাফ দ্বারা একদল কালামশাস্ত্রবিদদেরকে ইঙ্গিত করা হয়েছে - যাদের দীনের ব্যাপারে প্রচুর অস্থিরতা, আল্লাহর পরিচিতি লাভের ব্যাপারে তাদের পর্দার বাধা মোটা, এবং যারা তাদের (জ্ঞানের) অগ্রগতির শেষ সীমায় পৌঁছেছে তারা স্বীকার করেছে যে, তারা তাদের উদ্দেশ্য পূর্তিতে সন্দেহ ও সংশয় ছাড়া কিছুই অর্জন করতে পারেনি।... "আল্লাহর ব্যাপারে, তাঁর নাম ও গুণের ব্যাপারে বেশি জ্ঞানী কে?"⁵
৬- অন্যত্র তিনি আল্লাহ তা'আলার উপরে থাকা ও 'আরশের উপর উঠা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কথা তুলে ধরে বলেন,
والقول الفاصل : هو ما عليه الأمة الوسط، من أنَّ الله مستو على عرشه استواء يليق بجلاله ويختص به، فكما أنه موصوف بأنه بكل شيء عليم، وعلى كل شيء قدير، وأنه سميع بصير ونحو ذلك، ولا يجوز أن يثبت للعلم والقدرة خصائص الأعراض التي كعلم المخلوقين وقدرتهم، فكذلك هو سبحانه فوق العرش ولا يثبت لفوقيته خصائص فوقية المخلوق على المخلوق وملزوماتها.
"এ ব্যাপারে মীমাংসিত কথা হচ্ছে, যার ওপর মধ্যমপন্থী উম্মতগণ চলে আসছেন তা হচ্ছে, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর রয়েছেন, যেমনটি উপরে থাকা তাঁর সম্মান ও মর্যাদার জন্য উপযোগী, ও তাঁর সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত হওয়া সম্ভব। সুতরাং যেভাবে তিনি সবকিছু সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞানী, সবকিছুর ওপর পূর্ণ ক্ষমতাবান, সবকিছু তিনি শোনেন ও দেখেন ইত্যাদি গুণে গুণান্বিত, এ গুণগুলোতে গুণান্বিত হওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ইলম ও কুদরতকে সৃষ্টির ইলম ও কুদরতের যে 'আরদ্ব' বা অস্থায়ী গুণের সাথে সম্পৃক্ত করা বৈধ হয় না, তেমনিভাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলাকে তাঁর 'আরশের উপর বিশ্বাস করতে হবে। তাঁর উপরে থাকাকে সৃষ্টির উপর সৃষ্টির অবস্থান করার বৈশিষ্ট্য ও তাদের উপরে থাকার সাথে যে বাধ্যবাধকতা এসে পড়ে সেটার মতো করে সাব্যস্ত করা যাবে না।”⁶
৭- অন্যত্র তিনি আল্লাহ তা'আলাকে তাঁর 'আরশের উপর ঈমান আনাকে আল্লাহ তা'আলার ওপর ঈমান আনার অংশ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন,
وَقَدْ دَخَلَ فِيمَا ذَكَرْنَاهُ مِنَ الْإِيمَانِ بِاللَّهِ: الْإِيمَانُ بِمَا أَخْبَرَ اللَّهُ بِهِ فِي كِتَابِهِ ، وَتَوَاتَرَ عَنْ رَسُولِهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَأَجْمَعَ عَلَيْهِ سَلَفُ الْأُمَّةِ: - مِنْ أَنَّهُ سُبْحَانَهُ فَوْقَ سَمَاوَاتِهِ عَلَى عَرْشِهِ، عَلِيٌّ عَلَى خَلْقِهِ. - وَهُوَ سُبْحَانَهُ مَعَهُمْ أَيْنَمَا كَانُوا يَعْلَمُ مَا هُمْ عَامِلُونَ.
كَمَا جَمَعَ بَيْنَ ذَلِكَ فِي قَوْلِهِ : هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ) [الحديد: ٤].
وَلَيْسَ مَعْنَى قَوْلِهِ : وَهُوَ مَعَكُمْ أَنَّهُ مُخْتَلِطٌ بِالْخَلْقِ.
- فَإِنَّ هَذَا لَا تُوجِبُهُ اللُّغَةُ. - وَهُوَ خِلَافُ مَا أَجْمَعَ عَلَيْهِ سَلَفُ الْأُمَّةِ. - وَخِلافُ مَا فَطَرَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْخُلْقَ.
بَلْ الْقَمَرُ» آيَةٌ مِنْ آيَاتِ اللهِ، مِنْ أَصْغَرِ مَخْلُوقَاتِهِ، هُوَ مَوْضُوعٌ فِي السَّمَاءِ، وَهُوَ مَعَ الْمُسَافِرِ، وَغَيْرِ الْمُسَافِرِ أَيْنَمَا كَانَ. وَهُوَ سُبْحَانَهُ فَوْقَ الْعَرْشِ، رَقِيبٌ عَلَى خَلْقِهِ، مُهَيْمِنٌ عَلَيْهِمْ مُطَّلِعُ إِلَيْهِمْ إِلَى غَيْرِ ذَلِكَ مِنْ مَعَانِي رُبُوبِيَّتِهِ.
وَكُلُّ هَذَا الْكَلَامِ الَّذِي ذَكَرَهُ اللَّهُ مِنْ : أَنَّهُ فَوْقَ الْعَرْشِ ، وَأَنَّهُ مَعَنَا؛ حَقٌّ عَلَى حَقِيقَتِهِ، لَا يَحْتَاجُ إِلَى تَحْرِيفِ، وَلَكِنْ يُصَانُ عَنِ الظُّنُونِ الْكَاذِبَةِ.
* আমরা আল্লাহর ওপর ঈমানের ক্ষেত্রে ইতোপূর্বে যা উল্লেখ করেছি, তাতে আরও যা প্রবেশ করবে তা হচ্ছে,
* আল্লাহ তা'আলা তাঁর কিতাবে, আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মুতাওয়াতির তথা ধারাবাহিক অবিচ্ছিন্ন অসংখ্য পদ্ধতিতে যা এসেছে এবং যার ওপর উম্মতের সালাফগণ একমত হয়েছেন যে,
* আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর আসমানের উপরে, 'আরশের উপরে, তাঁর সকল সৃষ্টির উপরে।
* আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁর সৃষ্টির সাথে, যেখানেই তারা থাকুক না কেন, তবে এ সাথে থাকার অর্থ হচ্ছে, জ্ঞানের মাধ্যমে সাথে থাকা, তিনি জানেন তারা কী করবে।
* যেমনটি আল্লাহ তা'আলা তাঁর বাণী "তিনি ছয়দিনে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন। তিনি জানেন যা কিছু যমীনে প্রবেশ করে এবং যা কিছু তা থেকে বের হয়, আর আসমান থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উত্থিত হয়। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন- তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, আর তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ৪] এ আয়াতে ('আরশের উপর থাকা ও সাথে থাকাকে) একসাথে বর্ণনা করেছেন।
* আর এখানে "তিনি তোমাদের সাথে আছেন" বলে সৃষ্টির সাথে স্রষ্টার সংমিশ্রণ বুঝানো হয়নি। কারণ:
ভাষা তা আবশ্যক করে না। [অর্থাৎ কোনো ভাষাতেই সাথে থাকা অর্থ শরীরের সাথে লেপটে থাকা আবশ্যক করে না।]
আর এটি উম্মতের সালাফগণের ঐকমত্যে বিপরীত কথা।
অনুরূপভাবে তা আল্লাহ তা'আলা তাঁর সৃষ্টিকে যে স্বভাবজাত প্রকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন তার বিপরীত কথা।
বরং "চাঁদ” আল্লাহর নিদর্শনসমূহের একটি নিদর্শন। আর সৃষ্টিসমূহের মধ্যে অনুপাতে ছোট একটি সৃষ্টি, যা আকাশে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, সেটি মুসাফিরের সাথে থাকে, আর যারা মুসাফির নয় তাদের সাথেও থাকে, যেখানেই তারা থাকুক না কেন।
মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা 'আরশের উপরে, সকল সৃষ্টির প্রতি তাঁর সুতীক্ষ্ম দৃষ্টি রয়েছে, তাদের ওপর যথাযথ আয়ত্ব প্রতিষ্ঠাকারী-বিচারক, তাদের প্রতি তাঁর রয়েছে পূর্ণ নজরদারী ইত্যাদি রবুবিয়াত বা প্রভৃত্বের যাবতীয় কর্মকাণ্ড তাদের ওপর প্রযোজ্য।
এসব কিছু যা আল্লাহ তা'আলা বর্ণনা করেছেন যে, তিনি 'আরশের উপর, তিনি আমাদের সাথে, সবই সত্য ও যথাযথ। যা প্রকৃত অর্থেই, কোনোটা সাব্যস্ত করতেই কোনো প্রকার বিকৃতির আশ্রয় নেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। তবে অবশ্যই মিথ্যা ধারণা থেকে অবশ্যই সংরক্ষিত রাখতে হবে।”⁷
শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ'র ওপর আরোপিত বিভিন্ন অভিযোগ ও তার জবাব: দুর্ভাগ্যবশত শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ'র মতো এ মর্দে মুজাহিদের ওপর মিথ্যাচারের পর মিথ্যাচার করা হয়েছে। কেউ তাকে দেহবাদী মুজাসসিমা বলেছে, কেউ তাকে বলেছে মুশাব্বিহা বা সাদৃশ্য স্থাপনকারী। কেউ বলেছেন, তিনি আল্লাহকে 'আরশের উপর মানুষের বসার মতো বসার কথা বলেছেন, কেউ বলেছেন, তিনি আল্লাহর নিকটতম আসমানে অবতরণ করাকে মানুষের মতো করে অবতরণ করার কথা বলেছেন। বস্তুত এসবই তাঁর ওপর মিথ্যাচার। তিনি কখনও এমন কথা বলেননি। শত্রুরা সব সময়েই মিথ্যাচার করে মজা পায়। আমরা শাইখুল ইসলামের কিছু বক্তব্য উল্লেখ করব, যার মাধ্যমে প্রমাণিত হবে যে, তিনি এসব কিছু বলেননি। যেমন তিনি বলেন,
১- আল্লাহ তা'আলা জগতের উপরে, জগত থেকে পৃথক, সৃষ্টিকুল তাকে সীমাবদ্ধ করতে পারে না, তাকে জায়গা দিতে পারে না, তিনি 'আরশ বা অন্য কিছুর মুখাপেক্ষী নন, তদুপরি তিনি 'আরশের উপরে, সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা, তাদের অনুরূপ নয়, তাদের ওপর যা ঘটা বৈধ তাঁর ওপর তা বৈধ নয়।⁸
২- নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপর, তিনি 'আরশের ভিতরে নয় অথবা 'আরশের প্রতি তার মুখাপেক্ষিতাও নেই।⁹
৩- আল্লাহ তা'আলা তিনি স্রষ্টা, তিনি সবকিছু থেকে অমুখাপেক্ষী, তিনি তাঁর সত্তা, গুণ ও কর্মের জন্য তাঁর থেকে আলাদা কোনো কিছুর মুখাপেক্ষী নন। বরং যা কিছুই তাঁর থেকে আলাদা তা-ই তাঁর মুখাপেক্ষী। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা এই পৃথক জিনিস থেকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী, সেই পৃথক সৃষ্টিই বরং তাঁর মুখাপেক্ষী। সুতরাং তিনি নিত্য-নতুন যেসব কাজ নিজের সত্তা দ্বারা সম্পন্ন করেন সেসব কাজ করতে তাঁর থেকে পৃথক কোনো কিছুর প্রতি মোটেও মুখাপেক্ষী নন।¹⁰
৪- তিনি কোনো বিদ্যমান দিকের মধ্যেও আবদ্ধ নন; বরং অস্তিত্ব তো রয়েছে কেবল স্রষ্টা ও সৃষ্টির। আর সৃষ্টিকর্তার অবস্থান তাঁর সৃষ্টিরাজি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি সকলের উপরের উপরে। সুতরাং তিনি কোনো সৃষ্টির মধ্যেই নন, চাই ঐ সৃষ্টিকে কোনো 'দিক' বলে অবহিত করা হোক, অথবা কোনো 'দিক' বলে অবহিত করা না হোক।¹¹
৫- নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টিকুলকে সৃষ্টি করার পূর্বেও বিদ্যমান ছিলেন; তারপর তিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি তাদের মধ্যে প্রবেশ করেননি এবং তাঁর নিজের মধ্যেও তিনি তাদেরকে শামিল করে নেননি। সুতরাং তাঁর সৃষ্টিকুলের মধ্যে তাঁর সত্তার কোনো কিছুই নেই, আবার তাঁর সত্তার মধ্যেও তাঁর সৃষ্টিকুলের মধ্য থেকে কোনো কিছুই নেই।¹²
টিকাঃ
১. বায়ানু তালবীসুল জাহমিয়্যাহ ফী তা'সীসিল বিদা'য়িহিমিল কালামিয়্যাহ (২/৪৫৪)।
২. ইবন তাইমিয়্যাহ, আল-ফাতাওয়াল কুবরা (৬/৪৬৮)।
৩. বায়ানুল তালবীসিল জাহমিয়্যাহ (২/৫৩৭)।
৪. ফাতওয়া আল-হামাওয়িয়‍্যাহ আল-কুবরা: ২৬৭-২৭০।
৫. ফাতাওয়া আল-হামওয়িয়‍্যাহ আল-কুবরা: ১৮৯-১৯৬।
৬. ফাতাওয়া আল-হামওয়িয়‍्याह আল-কুবরা, পৃ. ২৭০।
৭. আল-আকীদাতুল ওয়াসেত্বিয়্যাহ, পৃ. ৮৩-৮৪।
৮. মাজমূ'উল ফাতাওয়া (৫/৩০৭)।
৯. দার'উ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকল (৬/৩১৫)।
১০. দার'উ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকল (২/২৩২)।
১১. আল-জাওয়াবুস সহীহ লিমান বাদ্দালা দীনাল মাসীহ (৪/৩১৭)।
১২. মাজমূ' ফাতওয়া (১১/৪৮৪)।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 ইমাম আবদুল হাদী আল-মাকদেসী (৭৪৪ হিজরী)

📄 ইমাম আবদুল হাদী আল-মাকদেসী (৭৪৪ হিজরী)


ইমাম আহমাদ ইবন আবদুল হাদী আল-মাক্বদেসী শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ'র ছাত্র ছিলেন, সালাফে সালেহীনের পথের পথিক এ ব্যক্তিত্ব আকীদাহ'র ক্ষেত্রে সহীহ পদ্ধতির ধারক ও বাহক ছিলেন। আল্লাহ তা'আলার নাম ও গুণের ক্ষেত্রে তিনি তাই গ্রহণ করতেন ও প্রচার করতেন যা সালাফে সালেহীনের মানহাজ ছিল। আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠা এবং 'আরশের উপর থাকার এ আকীদাকে তিনি তাঁর গ্রন্থসমূহে তুলে ধরেছেন। এ আকীদাহ'র ওপর তিনি 'আল-কালামু 'আলা মাসআলাতিল ইস্তিওয়া 'আলাল 'আরশ' নামে স্বতন্ত্র একটি গ্রন্থও রচনা করেন। তিনি তাঁর উক্ত কিতাবের ভূমিকাতেই বলেন, الحمد لله العلي الأعلى، الموصوف بالصفات العلى....
"হামদ জাতীয় সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি সর্বোচ্চ ঊর্ধ্ব সত্তা, যিনি উপরে থাকার গুণে গুণান্বিত।”¹
তারপর অধ্যায় বিন্যাস করে বলেন, فصل في ذكر استواء الخالق سبحانه وتعالى الفعال لما يشاء على عرشه، قال الله تعالى: الرحمن على العرش استوى، وقال: ثم استوى على العرش، قال البخاري في صحيحه: قال مجاهد: استوى علا على العرش....
"অধ্যায়: পবিত্র স্রষ্টা আল্লাহ তা'আলা তিনি যা ইচ্ছা করতে সক্ষম, তিনি তাঁর 'আরশের উপর উঠেছেন সেটার বর্ণনা, আল্লাহ তা'আলা বলেন, "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন।" আরও বলেন, "তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন। ইমাম বুখারী তার সহীহ গ্রন্থে বলেন, মুজাহিদ বলেছেন, 'ইস্তাওয়া' অর্থ 'আলা 'আলাল 'আরশ' অর্থাৎ 'আরশের উপর উঠেছেন।”² তারপর তিনি আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর উঠেছেন এ আকীদাহ বিশ্বাস, আবুল 'আলীয়া আর-রিয়াহী থেকে ইমাম ত্বাবারী যা নিয়ে এসেছেন সেটা উল্লেখ করেন। তারপর ইমাম বাগাওয়ী কর্তৃক ইবন 'আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে যা নিয়ে এসেছেন সেটাও উদ্ধৃত করেন। তারপর তিনি কুরআন ও হাদীসের ভাষ্যসমূহ বর্ণনা করেন।
টিকাঃ
১. ইবন আবদুল হাদী, আল-কালামু আলা মাসআলাতিল ইস্তিওয়া 'আলাল 'আরশ, পৃ. ২৫
২. ইবন আবদুল হাদী, আল-কালামু 'আলা মাসআলাতিল ইস্তিওয়া 'আলাল 'আরশ, পৃ.২৫।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪৮ হিজরী)

📄 শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪৮ হিজরী)


মুহাদ্দিস (হাদীসবিদ), মুওয়াররিখ (ইতিহাসবিদ), মুক্করি (কিরআতবিদ) ইমাম শামছুদ্দীন আয-যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ'র প্রত্যক্ষ ছাত্র ছিলেন। কুরআন, সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরামের বাণী, তাবে'য়ীদের ভাষ্য, হিদায়াতের ইমামগণের বক্তব্য এবং তার পরবর্তী আলেমগণের দেয়া তথ্য তুলে ধরে তিনি 'আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তাঁর 'আরশের উপর উঠার বিষয়টি নিয়ে আলাদা তিনটি গ্রন্থ লিখেছেন, এক. আল-'উলূ লিল আলিয়ি‍্যল আযীম। দুই. কিতাবুল 'আরশ। তিন. আল-আরবা'ঈন ফী সিফাতি রাব্বিল আলামীন। তাছাড়া তিনি তাঁর সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, তারীখুল ইসলাম, তাযকিরাতুল হুফফায গ্রন্থসমূহেও এ বিষয়ে অনেক প্রামাণ্য বর্ণনা নিয়ে এসেছেন।
আমরা এখানে নমুনাস্বরূপ তার একটি কথা নিয়ে এসেছি। তিনি তাঁর 'আল-'উলূ গ্রন্থে আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তাঁর 'আরশের উপর উঠা সংক্রান্ত ইমাম মালিকের বিখ্যাত উক্তির ব্যাখ্যায় বলেন,
هذا ثابت عن مالك، وهو قول أهل السنة قاطبةً : أَنَّ كيفية الاستواء لا نَعْقِلُهَا، بَلْ نَجْهَلُهَا، وَأَنَّ استواءه معلوم كما أخبر في كتابه، وأنه كما يليق به، لا نتعمَّق ولا نَتَحَذْلَقُ، ولا نخوضُ في لوازم ذلك نفيا ولا إثباتا، بل نسكت ونقف كما وقف السلف، ونعلم أنَّهُ لو كان له تأويل البادر إلى بيانه الصحابة، والتابعون، ولما وسعهم إقراره وإمراره والسكوت عنه، ونعلم يقينا مَعَ ذلك أنَّ الله جل جلاله لا مِثْلَ له في صفاته، ولا في استوائه، ولا في نزوله، سبحانه وتعالى عما يقول الظالمون علوا كبيرًا».
"এটি ইমাম মালিক থেকে সাব্যস্ত আছে। আর এটাই সকল আহলুস সুন্নাহ'র মত। তারা বলেন, আমরা 'আরশের উপরে উঠার ধরন বিবেকের যুক্তি দিয়ে বুঝতে অক্ষম। বরং এটা আমরা জানি না। তবে তার 'ইস্তেওয়া' এর অর্থ আমরা জানি, যেমনটি আল্লাহ তাঁর কিতাবে জানিয়েছেন। আর তা নির্ধারিত হবে যেভাবে তার জন্য উপযোগী সেভাবে। আমরা এতে আরও বেশি গভীরতায় প্রবেশ করবো না, আরও বেশি পণ্ডিতি করবো না। এটা সাব্যস্ত করলে অমুক অমুক জিনিসের বাধ্যবাধতকা এসে যায় বলে সেটা টেনে এনে তা স্বীকার কিংবা অস্বীকারও করবো না। বরং ধরন নির্ধারণের ব্যাপারে সালাফে সালেহীন যেভাবে চুপ ও নীরব ছিলেন আমরাও সেরকম নীরব থাকবো। আমরা এটা দৃঢ়ভাবে জেনে নিব যে, এটার যদি কোনো অপব্যাখ্যা করার সুযোগ থাকতো তাহলে সাহাবায়ে কেরাম ও তাবে'য়ীগণ সেটা বর্ণনা করার ব্যাপারে অগ্রণী থাকতেন। তাদের জন্য সেটাকে শুধু অর্থের স্বীকৃতি প্রদান করে ধরনের বিষয়টিতে না গিয়ে কেবল চালিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং চুপ থাকা সম্ভব ছিল না। এর পরও আমরা দৃঢ়ভাবে এটা জানি যে, আল্লাহ তা'আলার গুণাবলিতে কেউ তাঁর মতো নয়। অনুরূপ তাঁর ইস্তেওয়া বা ('আরশের) উপরে উঠার ব্যাপারেও কেউ তাঁর মতো নয়। তদ্রূপ তাঁর নুযূল বা (নিকটতম আসমানে) অবতরণের ব্যাপারে কেউ তাঁর মতো নয়। যালিমরা যা বলে তা থেকে তিনি কতই না পবিত্র, আর তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে।”¹
মহান আল্লাহর নাম ও গুণসমূহের প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করতে হবে, তাফওয়ীদ্ব করা যাবে না। তবে প্রকাশ্য অর্থ কী, তা বুঝাতে গিয়ে ইমাম যাহাবী বলেন,
قلت: المتأخرون من أهلِ النَّظرِ قالوا مقالة مولدة, ما علمت أحدًا سبقهم بها.
قالوا: هذه الصفات تمر كما جاءت ولا تؤول، مع اعتقاد أن ظاهرها غير مراد، فتفرع من هذا أنَّ الظاهرَ يُعْنَى بِهِ أمران: أحدهما: أنه لا تأويل لها غير دلالة الخطاب كما قال السلف: الاستواء معلوم، وكما قال سفيان وغيره: قراءتها تفسيرها، يعني أنها بينة واضحة في اللغة لا يُبْتَغَى لها مضايق التأويل والتحريف، وهذا هو مذهب السلف مع اتفاقهم أيضًا أنها لا تُشْبِهُ صفات البشر بوجه، إذ الباري لا مثل له لا في ذاته ولا في صفاته.
الثاني: أن ظاهرها هو الذي يتشكل في الخيال من الصفة كما يتشكل في الذهن من وصف البشر، فهذا غير مراد، فإنَّ الله تعالى فرد صمد ليس له نظير، وإن تعددت صفاته فإنها حق، ولكن ما لها مثل ولا نظير، فمن ذا الذي عاينه ونعته لنا؟ ومن ذا الذي يستطيع أن ينعت لنا كيفَ سُمِعَ كلامه؟ والله إنَّا العاجزون كالُونَ حائرون باهتون في حد الروح التي فينا؛ وكيف تَعْرُجُ كل ليلة إذا توفاها بارئها؛ وكيف يرسلها، وكيف تستقل بعد الموت، وكيف حياة الشهيد المرزوق عند ربه بعد قتله، وكيف حياة النبيين الآن؟ وكيف شاهد النبي صلى الله عليه وسلم أخاه موسى يصلي في قبره قائما ? ثم رآه في السماء السادسة وحاوره وأشار عليه بمراجعة رب العالمين وطلب التخفيف منه على أمته? وكذلك نعجز عن وصف هيأتنا في الجنَّةِ ووصف الحور العين، فكيف بنا إذا انتقلنا إلى الملائكة وذواتهم وكيفيتها ... فالله أعلى وأعظم، وله المثل الأعلى والكمال المطلق ولا مثل له أصلا، ﴿آمَنَّا بِاللَّهِ وَاشْهَدْ بِأَنَّا مُسْلِمُونَ﴾ [آل عمران: ٥٢].
"আমি বলি: তথাকথিত পরবর্তী চিন্তাবিদরা (কালামশাস্ত্রবিদরা) এমন উক্তি আবিষ্কার করেছে, আমি জানি না তাদের আগে কেউ সেটা বলেছে কী না।
তারা বলেছে, এ গুণগুলোকে যেভাবে এসেছে সেভাবে চালিয়ে নিতে হবে, ব্যাখ্যাও করবো না, তবে এটা বিশ্বাস রাখবো যে, এগুলোর প্রকাশ্য অর্থ উদ্দেশ্য নয়। (বস্তুত এটা হচ্ছে তাদের তাফওয়ীদ্ব নীতি, যার মাধ্যমে তারা সালাফে সালেহীনের নীতি পূর্ণ বিরোধিতা করেছে। কারণ সালাফে সালেহীন এগুলোর অর্থ করতেন। অর্থহীন করতেন না, বা প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করা যাবে না, বলতেন না)
তাদের উক্ত নীতির মাধ্যমে বুঝা যাচ্ছে যে, যাহের বা প্রকাশ্য অর্থ বলতে দু'টি জিনিস বুঝানো হয়, এক. এর কোনো ব্যাখ্যা নেই, শুধু সম্বোধনের ভাষ্য থেকে যা বুঝা যায় তা-ই এর অর্থ, যেমনটি সালাফে সালেহীন বলেছেন, 'ইস্তেওয়া' শব্দটির অর্থ জানা আছে। (আর তা হচ্ছে উপরে উঠা) আরও যেমন বলেছেন, ইমাম সুফইয়ান ইবন 'উয়াইনাহ ও অনান্যগণ, যারা বলেছেন, এর পড়াই হচ্ছে এর তাফসীর। তাদের কথার অর্থ হচ্ছে, এগুলো ভাষার অভিধানে সুস্পষ্ট, এগুলোকে নিয়ে অপব্যাখ্যা ও বিকৃতির সংকীর্ণতার দিকে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বস্তুত এটাই হচ্ছে সালাফে সালেহীনের মাযহাব। সাথে সাথে তারা এটাতেও একমত ছিলেন যে, এ গুণগুলো কোনোভাবেই মানুষের গুণের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়; কারণ স্রষ্টার মতো কোনো কিছু নেই, তাঁর সত্তাতেও নয় অনুরূপ তাঁর গুণেও নয়।
দুই. এর প্রকাশ্য অর্থ বলতে বুঝায়, যা কারো ব্রেনের ধারণায় সেসব গুণের বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে, যেমন কখনো কোনো মানুষের গুণ বর্ণনা করলে ব্রেনে সেটার একটি রূপ পরিগ্রহ করে থাকে। বস্তুত প্রকাশ্য অর্থ বলে এটা উদ্দেশ্য নেয়া যাবে না। কারণ তিনি আল্লাহ, একক সত্তা, অমুখাপেক্ষী, তাঁর কোনো দৃষ্টান্ত নেই, যদিও তাঁর গুণ অনেক, সে গুণাবলি অবশ্যই সত্য ও সঠিক কিন্তু সেগুলোর অনুরূপ কোনো কিছু নেই, আর সেগুলোর দৃষ্টান্তও কোথাও নেই। কারণ এমন কে আছে যে, সে গুণাবলিকে দেখেছে এবং তার পূর্ণ বিবরণ আমাদের কাছে দিয়েছে? এমন কে আছে যে আমাদের নিকট বর্ণনা করবে কীভাবে তার বাণী শোনা যাবে? আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমরা অবশ্যই অপারগ, অক্ষম, হতভম্ব, অস্পষ্ট আমাদের রূহের পরিচয় দিতে, যা আমাদের শরীরের মাঝেই অবস্থান করে। কীভাবে সেটা প্রতি রাতে উপরে চলে যায়, যখন তার স্রষ্টা তাকে ঘুম নামক মৃত্যু প্রদান করেন? আবার কীভাবে সেটা ছাড় পেয়ে ফিরে আসে? কীভাবে মৃত্যুর পরে অবস্থান করে? শহীদের হত্যার পর তার রবের কাছে তার জীবনের প্রকৃত রূপ কী? বর্তমানে নবীদের জীবনের প্রকৃত স্বরূপ কী? নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ভাই মূসাকে কবরে দাঁড়িয়ে সালাত পড়তে কীভাবে দেখলেন? তারপর তার সাথে ষষ্ঠ আসমানে কীভাবে দেখলেন? কীভাবেই তার সাথে বিস্তারিত কথোপকথন করলেন? কীভাবে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ইঙ্গিত করলেন যেন তিনি রাব্বুল আলামীনের কাছে যাওয়া-আসা করেন? কীভাবে তিনি চাইলেন যেন তিনি রাব্বুল আলামীনের কাছে লাঘব করার আবেদন করেন? কীভাবে মূসা 'আলাইহিস সালাম তারপর (আদি) পিতা আদমের সাথে মুনাযারা করলেন? কীভাবে আদম ('আলাইহিস সালাম) তাকে পূর্ব তাকদীরের কথা বলে হারিয়ে দিলেন, এটা বলে যে তাওবা করা ও তা কবুল হওয়ার পরে তিরষ্কার করাতে কোনো উপকার নেই? অনুরূপভাবে আমরা জান্নাতে আমাদের অবস্থার বর্ণনা করতে অক্ষম, ডাগর নয়না হুরদের গুণাবলি বর্ণনা করতে অপারগ। তদ্রূপ যদি আমরা ফিরিশতাদের দিকে আলোচনা নিবদ্ধ করি, কেমন তাদের সত্তা, তাদের ধরন? কীভাবে তাদের কাউকে যদি বলা হয় পৃথিবীকে গিলে ফেলতে তবে সে এক লোকমা দিয়েই তা গিলে ফেলবে? তাছাড়া তাদের সৌন্দর্য, চিত্তাকর্ষকতা, তাদের আলোকিত (জাওহার বা) মৌলিক উপাদানই বা দেখতে কেমন? যদি এসব ব্যাপারেই আমাদের জ্ঞান না থাকে তাহলে আমরা কেন এটা বুঝি না যে, আল্লাহ তা'আলা এগুলোর চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে ও অনেক বড়, তাঁর জন্য সর্বোচ্চ পূর্ণ গুণাবলি, তার জন্য রয়েছে নিঃশর্ত পরিপূর্ণতা, তার মতো কেউ তো আসলেই নেই (সুতরাং ধরন না জেনে ঈমান আনতে অসুবিধা কোথায়?) "আমরা আল্লাহর ওপর ঈমান আনলাম এবং সাক্ষ্য থাক যে আমরা মুসলিম।" [সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ১১১]²
তবে ইমাম যাহাবী উপরোক্ত প্রশ্নগুলোর উত্তর অন্য গ্রন্থে দিয়েছেন, তিনি বলেছেন, "উত্তর: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে সেটার নমুনা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি মূসা 'আলাইহিস সালামকে একাধিকবার দেখেছেন। তাঁর চলনপথে মূসা 'আলাইহিস সালামকে দেখেছেন তার কবরে সালাত আদায় করতে, তারপর তাকে দেখেছেন বাইতুল মাকদিসে, তারপর তাকে দেখেছেন সপ্তম আসমানে, অন্যদেরকেও দেখেছেন। এতে বুঝা গেল নবীদেরেকেও উপরে তোলা হয়েছে যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উপরে উঠানো হয়েছে। আর নবীরা তাদের কবরে জীবিত যেমনটি শহীদগণ তাদের কবরে জীবিত। তাদের জীবন দুনিয়াবাসীদের জীবনের মতো নয়, আর তাদের জীবন আখেরাতের জীবনের মতোও নয়, বরং এটি ভিন্ন ধরনের জীবন। যেমনটি শহীদদের জীবনের বর্ণনায় এসেছে যে, আল্লাহ তা'আলা তাদের রূহকে সবুজ পাখির পেটে রাখবেন, যে পাখিগুলো জান্নাতের সর্বত্র ঘুরে বেড়াবে আর 'আরশের নিচে লটকে থাকা ঝাড়বাতিগুলোতে আশ্রয় নিবে। সুতরাং এ হিসেবে তারা তাদের রবের নিকট জীবিত, যেমনটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা খবর দিয়েছেন, আর তাদের দেহ তাদের কবরেই রবে। সুতরাং এই সকল বিষয় মানব বিবেক-বুদ্ধির চেয়ে বড় এবং এসবের প্রতি ইমান আনা ওয়াজিব যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, অথচ তাদের শরীর তাদের কবরেই রয়েছে।
وهذه الأشياء أكبر من عقول البشر، والإيمان بها واجب كما قال تعالى: ﴿ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ﴾ [البقرة: ٣].
বস্তুত এ জিনিসগুলো মানুষের বিবেকে ধরার চেয়ে বড়। এগুলোর ওপর ঈমান আনতে হবে, যেমন আল্লাহ বলেছেন, "যারা গায়েবের ওপর ঈমান রাখে”।³
টিকাঃ
১. আল-'উলু, পৃ. ৯৫৪।
২. আল-'উলূ, পৃ. ২৫১।
৩. যাহাবী, তারীখুল ইসলাম, আস-সীরাতুন নাবওয়িয়্যাহ, ২৬৯-২৭০।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 ইবনুল কাইয়্যেম (৭৫১ হিজরী)

📄 ইবনুল কাইয়্যেম (৭৫১ হিজরী)


ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ "আল্লাহর 'আরশের উপর উঠা" এ ব্যাপারে 'ইজতিমাউল জুয়ুশিল ইসলামিয়্যাহ' নামে স্বতন্ত্র গ্রন্থও প্রণয়ন করেছেন। তাছাড়া অপর কয়েকটি কিতাবে তিনি এ বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। যেমন, আস-সাওয়া'য়িকুল মুরসালাহ, ই'লামুল মুওয়াক্কি'য়ীন, আল-কাফিয়াতুশ শাফিয়াহ ফিল ইন্তিসার লিল ফিরক্বাতিন নাজিয়াহ (নূনিয়‍্যাহ) প্রভৃতি। এখানে সামান্য কয়েকটি ভাষ্য কেবল তুলে ধরছি।
ইবনুল কaiയ്യেম রাহিমাহুল্লাহ কোথাও এটা বলেছেন যে, কুরআনুল কারীম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস, সাহাবায়ে কেরামের ভাষ্য, তাবেয়ীগণের বক্তব্য সবই আল্লাহ তা'আলাকে 'আরশের উপর সাব্যস্ত করছে। তিনি বলেন,
وتأمل ما في هذه الآيات من الرد على طوائف المعطلين والمشركين ... قوله تعالى : ( ... ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ .... يتضمن : إبطال قول المعطلة والجهمية الذين يقولون: ليس على العرش شيء سوى العدم، وإن الله ليس مستويا على عرشه، ولا ترفع إليه الأيدي، ولا يصعد إليه الكلم الطيب، ولا رفع المسيح عليه الصلاة والسلام إليه، ولا عرج برسوله محمد - صلى الله عليه وسلم - إليه، ولا تعرج الملائكة والروح إليه، ولا ينزل من عنده جبريل عليه الصلاة والسلام ولا غيره، ولا ينزل هو كل ليلة إلى السماء الدنيا، ولا يخافه عباده من الملائكة وغيرهم من فوقهم، ولا يراه المؤمنون في الدار الآخرة عيانًا بأبصارهم من فوقهم، ولا تجوز الإشارة إليه بالأصابع إلى فوق، كما أشار إليه النبي - صلى الله عليه وسلم - في أعظم مجامعه في حجة الوداع إليه، وجعل يرفع إصبعه إلى السماء وينكبها إلى الناس ويقول: اللهم اشهد.
قال شيخ الإسلام : وهذا كتاب الله من أوله إلى آخره، وسنة رسوله - صلى الله عليه وسلم -، وعامة كلام الصحابة والتابعين، وكلام سائر الأئمة؛ مملوء بما هو نص أو ظاهر في أن الله سبحانه وتعالى فوق كل شيء، وأنه فوق العرش, فوق السموات مستو على عرشه.
"চিন্তা কর, এ আয়াতগুলোতে কীভাবে মু'আত্তিলা বা অর্থহীন যারা বলে সে সম্প্রদায় এবং শির্ক যারা করে সে সম্প্রদায়ের কথাকে খণ্ডন করা হয়েছে। আল্লাহর বাণী, "তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন" এ বাণীটিতে যাদের যুক্তি খণ্ডন করা হয়েছে, তন্মধ্যে রয়েছে মু'আত্তিলা ও জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের বক্তব্য; যারা বলে 'আরশের উপর 'না' ছাড়া আর কিছু নেই। তারা আরও বলে, আল্লাহ 'আরশের উপর উঠেননি। আরও বলে, তাঁর দিকে হাত তোলা যাবে না। আরও বলে, তাঁর দিকে উত্তম কালেমাসমূহ উত্থিত হয় না। আরও বলে, 'ঈসা 'আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালামকে উপরে উঠানো হয়নি। তারা আরও বলে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মি'রাজের জন্য উপরে নিয়ে যাওয়া হয়নি। আরও বলে, আল্লাহর দিকে ফিরিশতা ও রূহ উঠে যান না। আরও বলে, আল্লাহর নিকট থেকে জিবরীল 'আলাইহিস সালাম ও অন্য কেউ অবতরণ করেননি। আরও বলে, প্রতি রাতে আল্লাহ প্রথম আসমানে নাযিল হননি। আরও বলে, তাঁর বান্দাদের মধ্য হতে ফিরিশতা ও অন্যান্যগণ তাদের উপরস্থ সত্তাকে ভয় করেন না। আরও বলে, কিয়ামতের দিন মুমিনগণ তাদের চোখ দিয়ে উপরের দিকে তাদের রবকে চাক্ষুষ দেখবে না। আরও বলে, তাঁর দিকে উপরের দিকে আঙ্গুল দিয়ে ইঙ্গিত করে দেখানো জায়েয নেই, যেমনটি নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবচেয়ে বড় সম্মিলনস্থলে বিদায় হজের সময়ে ইঙ্গিত করে দেখিয়েছেন। তিনি তাঁর আঙ্গুলকে আসমানের দিকে উঠিয়েছেন এবং সেটাকে মানুষের দিকে নীচু করে বলেছিলেন, হে আল্লাহ, সাক্ষী থাক"।
শাইখুল ইসলাম বলেন, এ আল্লাহর কিতাব প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ, সকল সাহাবী, তাবে'য়ী এবং সকল ইমামের বক্তব্য, সরাসরি স্পষ্ট করে বা প্রকাশ্যভাবে এটাতে পরিপূর্ণ যে, নিশ্চয় আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'আলা সবকিছুর উপরে, তিনি 'আরশের উপরে, আসমানসমূহের উপরে, তাঁর 'আরশের উপর সমুন্নত।"¹
অন্যত্র তিনি ইমাম মালিকের সিফাত বিষয়ক ঐতিহাসিক বক্তব্য, “ইস্তেওয়ার অর্থ জানা, ধরন অজানা...." এর ব্যাখ্যায় বলেন,
فَرَّقَ بَيْنَ الْمُعْنَى الْمَعْلُومِ مِنْ هَذِهِ اللَّفْظَةِ، وَبَيْنَ الْكَيْفِ الَّذِي لَا يَعْقِلُهُ الْبَشَرُ. وَهَذَا الْجَوَابُ مِنْ مَالِكٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ شَافٍ، عَامٌ فِي جَمِيعِ مَسَائِلِ الصَّفَاتِ.
فَمَنْ سَأَلَ عَنْ قَوْلِهِ : إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى) [طه: ٤٦] كَيْفَ يَسْمَعُ وَيَرَى؟ أُجِيبَ بِهَذَا الْجَوَابِ بِعَيْنِهِ. فَقِيلَ لَهُ: السَّمْعُ وَالْبَصَرُ مَعْلُومٌ. وَالْكَيْفُ غَيْرُ مَعْقُولٍ.
وَكَذَلِكَ مَنْ سَأَلَ عَنِ الْعِلْمِ، وَالْحَيَاةِ، وَالْقُدْرَةِ، وَالْإِرَادَةِ، وَالنُّزُولِ، وَالْغَضَبِ، وَالرِّضَا، وَالرَّحْمَةِ، وَالضَّحِكِ، وَغَيْرِ ذَلِكَ. فَمَعَانِيهَا كُلُّهَا مَفْهُومَةٌ. وَأَمَّا كَيْفِيَّتُهَا فَغَيْرُ مَعْقُولَةٍ إِذْ تَعَقُلُ الْكَيْفِيَّةِ فَرْعُ الْعِلْمِ بِكَيْفِيَّةِ الذَّاتِ وَكُنْهِهَا . فَإِذَا كَانَ ذَلِكَ غَيْرَ مَعْقُول لِلْبَشَرِ ، فَكَيْفَ يُعْقَلُ هُمْ كَيْفِيَّةُ الصِّفَاتِ؟
وَالْعِصْمَةُ النَّافِعَةُ فِي هَذَا الْبَابِ : أَنْ يُوصَفَ اللهُ بِمَا وَصَفَ بِهِ نَفْسَهُ . وَبِمَا وَصَفَهُ بِهِ رَسُولُهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، مِنْ غَيْرِ تَحْرِيفٍ وَلَا تَعْطِيلٍ، وَمِنْ غَيْرِ تَكْيِيفِ وَلَا تَمْثِيلِ بَلْ تُثْبَتُ لَهُ الْأَسْمَاءُ وَالصَّفَاتُ، وَتُنْفَى عَنْهُ مُشَابَهَهُ الْمُخْلُوقَاتِ. فَيَكُونُ إِثْبَاتُكَ مُنَزَّهَا عَنِ التَّشْبِيهِ. وَنَفْيُكَ مُنَزَّهَا عَنِ التَّعْطِيلِ. فَمَنْ نَفَى حَقِيقَةَ الِاسْتِوَاءِ فَهُوَ مُعَطَّلٌ وَمَنْ شَبَّهَهُ بِاسْتِوَاءِ الْمُخْلُوقِ عَلَى الْمُخْلُوقِ فَهُوَ مُثَلُ . وَمَنْ قَالَ: اسْتِوَاءٌ لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ. فَهُوَ الْمُوَحِّدُ المنزه.
"এভাবে ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ 'ইস্তেওয়া' শব্দ থেকে যে অর্থ বুঝা যায় এবং যে ধরন মানুষের বিবেকে আসতে পারে এতদুভয়ের মধ্যে পার্থক্য করেছেন। বস্তুত ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ'র এ উত্তর আল্লাহর সকল গুণের ক্ষেত্রে একটি পূর্ণ উত্তর; আরোগ্যের মহৌষধ।
তাই যে কেউ প্রশ্ন করে বলবে, আল্লাহর বাণী "নিশ্চয় আমি তোমাদের দু'জনের সাথে আছি, শুনছি এবং দেখছি” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ৪৬] এ আয়াতে কীভাবে তিনি শুনেন ও দেখেন? উত্তরে একই কথা বলা হবে, তাকে বলা হবে, শোনা ও দেখার বিষয়টি সবার জানা, তবে আল্লাহ তা'আলার জন্য সেটার ধরন নির্ধারণ করা বিবেক-বুদ্ধির কাজ নয়। অনুরূপ কেউ যদি আল্লাহ তা'আলার জ্ঞান, জীবন, ক্ষমতা, ইচ্ছা, অবতরণ, ক্রোধ, সন্তুষ্টি, রহমত, হাসি ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন করে, তার উত্তরও হবে এই যে, এগুলোর অর্থ তো আমরা বুঝি; কিন্তু আল্লাহর জন্য এগুলোর ধরন নির্ধারণ করা বিবেকের যুক্তি দ্বারা অর্জন করা যায় না; কারণ কারো গুণের ধরন বিবেকের যুক্তি দ্বারা প্রাপ্ত হওয়া নির্ভর করছে সে সত্তার ধরণ ও তার প্রকৃত অবস্থা জানার ওপর। আর যেহেতু আল্লাহ তা'আলার সত্তার প্রকৃত জ্ঞান কোনো বিবেকের যুক্তি ধারণ করতে পারে না, তাই তাঁর গুণাবলির প্রকৃত অবস্থা ও ধরন কীভাবে বিবেধ ধারণ করবে?
এ অধ্যায়ে বাঁচার একমাত্র উপায় হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা নিজেকে যেসব গুণে গুণান্বিত ঘোষণা করেছেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামও আল্লাহকে যেসব গুণে গুণান্বিত বলেছেন, সেগুলো দিয়ে আল্লাহকে গুণান্বিত সাব্যস্ত করা। আর এ সাব্যস্তকরণের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার বিকৃত, অর্থশূন্যতা, কিংবা ধরন নির্ধারণ, কারো অনুরূপ নির্ধারণ করা যাবে না। বরং আল্লাহর জন্য তাঁর নামসমূহ ও গুণসমূহ সাব্যস্ত করা হবে আর তাঁর থেকে সৃষ্টিকুলের সাথে সাদৃশ্যতাকে নিষেধ করতে হবে। এটা করতে পারলে আপনার সাব্যস্তকরণ হবে তামছীল বা সাদৃশ্যমুক্ত আর আপনার নিষেধ করা হবে তা'ত্বীল বা অর্থহীন করা থেকে মুক্ত। সুতরাং যে কেউ 'ইস্তেওয়া' বা 'আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তাঁর 'আরশের উপর উঠা' এর প্রকৃত অর্থকে অস্বীকার করবে সে তো তা'ত্বীল (অর্থশূন্য) করলো এবং মু'আত্তিলা হয়ে গেল। আর যে কেউ আল্লাহ তা'আলার 'ইস্তেওয়া' বা 'আরশের উপর উঠা'কে সৃষ্টির কারও জন্য অপর কারও উপর উঠার সাথে সাদৃশ্য প্রদান করলো সে তো তামছীল (সাদৃশ্য স্থাপন) করলো এবং 'মুমাসসিলা' হয়ে গেল। আর যে কেউ বললো, 'তাঁর 'আরশের উপর উঠা' সৃষ্টির কারও মতো নয়, সে হচ্ছে তাওহীদের ঝাণ্ডাবাহী, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণাকারী।”²
অন্যত্র বলেন, والفوقية: هو تفسير الاستواء المذكور في القرآن والسنة "আর উপরে হওয়া, এটাই তো কুরআন ও সুন্নায় আসা 'ইস্তেওয়া' শব্দের অর্থ।”³
অন্যত্র ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ বেশ কিছু জিনিস বর্ণনা করেছেন, যার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠার বিষয়টি সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়, যেমন,
১- কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজের সম্পর্কে বলেছেন, وَلِلهِ الْمَثَلُ الْأَعْلَى﴿ [النحل: ٦٠] "আর আল্লাহর জন্যই সকল সর্বোচ্চ উদাহরণ” [সূরা নাহল, আয়াত: ৬০[, আরও বলেন, ﴿وَلَهُ الْمَثَلُ الْأَعْلَى [الروم: ۲۷] "আর তাঁর জন্য আসমান ও যমীনে রয়েছে সর্বোচ্চ উদাহরণ” [সূরা রূম, আয়াত: ২৭] এখানে সর্বোচ্চ উদাহরণ এর অর্থ কী? সবচেয়ে উত্তম ও মর্যাদাবান যতগুণ মহান আল্লাহর জন্যই নির্ধারিত হবে।⁴ ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আল্লাহর 'আরশের উপর উঠার এ গুণটিকে "আল-মাসালুল আ'লা” বা 'সর্বোচ্চ গুণ' হিসেবে নিতে হবে। তিনি এর ব্যাখ্যা করে বলেন,
وقد أخبر النبي صلى الله عليه وسلم: «إن السموات السبع في الكرسي كحلقة ملقاة بأرض فلاة والكرسي في العرش كحلقة ملقاة في أرض فلاة والعرش لا يقدر قدره إلا الله وهو سبحانه فوق عرشه يرى ما عباده عليه
فهذا هو الذي قام بقلوب المؤمنين المصدقين العارفين به سبحانه من المثل الأعلى فعرفوه به و عبدوه به وسألوه به فأحبوه وخافوه ورجوه وتوكلوا عليه وأنابوا إليه واطمأنوا بذكره وأنسوا بحبه بواسطة هذا التعريف فلم يصعب عليهم بعد ذلك فهم استوائه على عرشه وسائر ما وصف به نفسه من صفات كماله إذ قد أحاط عليهم بأنه لا نظير لذلك ولا مثل له ولم يخطر بقلوبهم مماثلته لشيء من المخلوقات وقد أعلمهم سبحانه على لسان رسوله أنه يقبض سماواته بيده والأرض باليد الأخرى ثم يهزهن»، وأن السماوات السبع والأرضين السبع في كفه تعالى كخردلة في كف أحدكم»، وأنه يضع السماوات على أصبع والأرضين على أصبع والجبال على أصبع والشجر على أصبع وسائر الخلق على أصبع
"নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে জানিয়েছেন যে, সাত আসমান কুরসীতে বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে ফেলে রাখা একটি রিং এর মতো, অনুরূপ কুরসী; তা 'আরশের তুলনায় বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে ফেলে রাখা একটি রিং এর মতো আর 'আরশের পরিমাণ তো কেবল আল্লাহই জানেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর, সেখানে থেকেই তিনি তাঁর বান্দারা কী করে সেটা জানতে পারেন। এ জিনিসটিই ঈমানদার, বিশ্বাসী, তাঁকে যারা জানে, তাদের অন্তরে আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম গুণাবলি হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। ফলে তারা তাঁকে চিনতে সক্ষম হয়েছে, তাঁকে সেটার মাধ্যমে ইবাদাত করেছে, তা দিয়েই তারা তাঁর কাছে যাচঞা করেছে আর এভাবেই তারা তাঁকে ভালোবেসেছে, তাঁকে ভয় করেছে, তাঁর কাছে আশা করেছে, তাঁর ওপর ভরসা করেছে, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তিত হয়েছে, তাঁর স্মরণে প্রশান্তি লাভ করেছে, তাঁর ভালোবাসার মাধ্যমে সাযুজ্যতা লাভ করেছে, এসবই হচ্ছে এই পরিচয়ের মাধ্যমে। সুতরাং তাদের কাছে তখন কঠিন মনে হয়নি আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠার বিষয়টি, অনুরূপ অন্যান্য যাবতীয় পূর্ণ গুণে গুণান্বিত হওয়ার বিষয়টি; কারণ তাদের অন্তর জুড়ে আছে যে, তাঁর কোনো দৃষ্টান্ত নেই, তাঁর অনুরূপ কোনো কিছু নেই, তাদের অন্তরে কখনও সৃষ্টির কারও মতো হওয়ার বিষয়টি উদিত হয় না; কারণ আল্লাহ তা'আলা তাঁর নবীর যবানীতে তাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, 'আল্লাহ তা'আলা তাঁর এক হাতে আসমানসমূহ ধরবেন, অপর হাতে যমীনকে ধরবেন, তারপর সেগুলোকে নাড়াচাড়া করবেন।' আরও জানিয়েছেন যে, 'সাত আসমান ও সাত যমীন তাঁর হাতের কব্জির উপরে যেন তোমাদের কারও হাতে একটি সরিষার দানা।' আরও জানিয়েছেন যে, 'আল্লাহ তা'আলা সকল আসমানকে এক আঙ্গুলের উপর রাখবেন, সকল যমীনকে এক আঙ্গুলের উপর রাখবেন, সকল পাহাড়কে এক আঙ্গুলের উপর রাখবেন, সকল গাছ-পালা আরেক আঙ্গুলের উপর, অনুরূপ সকল সৃষ্টিকে আরেক আঙ্গুলের উপর রাখবেন।”⁵
২- আল্লাহ তা'আলা বান্দার সাথে থাকা, কাছে থাকার সাথে যারা 'আরশের উপর উঠা ও 'আরশের উপর থাকাকে গুলিয়ে ফেলেন, তাদের জন্য ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম বলেন,
দৃষ্টির ইলম কুরব: ‘হুয়াক্কিকুল ক্বালবু বিলমুই’আখাছছাতি মায়া আল্লাহ। ফান্নাল মুঈ’আন্না নুও’আন। আ’ম্মাহু ওয়াহুয়া: মুঈ’য়াতুল ইলমে ওয়াল ইহাতা। কাওলিহি তায়া’লা: ‘ওয়াহুয়া মায়া’কুম আইনা মা কুন্তুুম’। [হাদীদ: ৪] ওয়া কাওলিহি: ‘মা ইয়াকুনু মিং নাজওয়া সালাছাতি ইল্লা হুয়া রাবিউহুম ওয়ালা খামছাতি ইল্লা হুয়া সা-দিছুহুম ওয়ালা আদনা মিং যা-লিকা ওয়ালা আকছারা ইল্লা হুয়া মায়াহুম আইনা মা কানু’। [মুজাদালা: ৭] ওয়া খাছ্ছাহু: ওয়াহুয়া মুঈ’য়াতুল কুরব, কাওলিহি তায়া’লা: ‘ইন্নাল্লাহা মায়াল্লাযিনা ইত্তাক্বও ওয়াল্লাযিনা হুম মুহসিনুন’। [নাহল: ১২৮] ওয়া কাওলিহি: ‘ইন্নাল্লাহা মাআছ ছাবিরীন’। [বাকারা: ১৫৩] ওয়া কাওলিহি: ‘ওয়ানাল্লাহা লামাআল মুহসিনীন’। [আনকাবুত: ৬৯]
ফাহায্যুহি মুঈ’য়াতু ক্বরব: তাত্বাম্মানুল মুওয়ালাতা, ওয়ান্নাছর, ওয়াল হিফজ। ওয়াক্কাল মুঈ’ইয়িন মুছাহাবাতুন লিলআ’বদি। লাকিন হাজিহি মুছাহাবাতু ইত্তিলাআন ওয়া ইহাতা। ওয়াহাজিহি মুছাহাবাতু মুওয়ালাতান ওয়া নুছরা ওয়া ইয়াআনাহ। ফা ‘মাআ’ ফি লুঘাতিল আ’রবি তুফিদুস ছুহবাতাল লাযিক্বা। লা তুশিমুর ইমতিযাজ ওয়াল ইখতিলাত্বা، ওয়ালা তুজাওয়িরুহু، ওয়ালা তুজানিবুহু। فামান جل্লা মিন যা হাজা শাইয়ান ছুওআন فاهوا آ’হك.
ওয়া আম্মাল ক্বুরব: ফালা ইয়াক্বিউ’ল কুরআনা ইল্লা খাছ্ছান। ওয়াহুয়া নুও’আন: ক্বুরবাতু মিন দাঈয়ি বিল ইজাবাতি। ওয়াক্বুরবুহু বিলাল ইয়াতাহ। ফাওয়্যুলুহু কাওলিহি তায়া’লা: ‘ওয়াইযা ছাআলাকা ইবাদি আ’ন্নি ফা ইন্নি ক্বারীব। উজ্বীবু দা’ওয়াতাদ দাঈ ইযা দাআ’ন’। [বাকারা: ১৮৬] ওয়াহা যা নাযালাত জওয়াবা ল্লিছছাহাবাতি রাদিয়াল্লাহু আ’নহুম। ওয়া ক্বাদ ছাআলু রাসূল আল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম: রব্বুনা ক্বারীবুং ফুনাজীহি আম বাঈ’দুন ফুনাদিহু? ফাআংযালা তায়া’লা হাজিহিল আয়া।
ওয়াছ্ছানি: ক্বাওলুহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম: ‘আক্বারবু মা ইয়াকুনুল আ’বদু মির রব্বিহি ওয়াহুয়া সাজিদ’। ওয়া আক্বারবু মা ইয়াকুনুর রববু মিন আ’বদিহি ফি জওফিল লাইল। ফাহাযা ক্বুরবুহু মিন আহলি তাআ’তিহি।
ওয়া ফিছ ছহীহ: আ’ن আবি মুছা রাদিয়াল্লাহু আ’নহু ক্বালা: ‘কুন্না মায়া আন্নাবিয়্যু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামু ফি ছাফার। ফায্যারাফত আছওয়াতুনা বিত্তাক্ববির। ফাক্বালা: ইয়া আইয়্যুহান নাছু, আরবিউ আ’লা আংফুছিকুম। ইন্নাকুম লা তাদউনা আছম্ম ওয়ালা গায়িবান। ইন্নাল্লাযি তাদউনা ছামীউ’ন ক্বারীব। আক্বারবু ইলা আহাদিকুম মিন ই’নিক্বি রাঝিলাহি’।
ফাহাযা ক্বুরব খাছ্ছুদ দাঈয়ি দুআউল ইবাদাতু ওয়াছানাও ওয়াল হাম্দ। ওয়াহাযা ক্বুরবুং লা ইয়ুনাক্বি মাবানিতুর রব বু লি খালক্বিহি, ওয়াশতিওয়াউহু আ’লা আরশিহি। বিল মুজামিআতি ওয়া ইউলাঝিমুহু। ফা ইন্নাহু লাইছা কা ক্বুরবিল আজছামি বা’দ্বাহা মিং বা’দ্ব। তায়া’লা আল্লাহু আ’ন যা-লিকা উলুওয়ান কাবিরা। ওয়ালকিত্তা নুও’আ আ’খর।
""আল্লাহর নৈকট্য বিদ্যা, বান্দার অন্তরকে আল্লাহর সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত করে দেয়। কারণ সাথে থাকার বিষয়টি দু’ধরনের:
* এক. সাধারণভাবে সাথে থাকা; আর তা হচ্ছে জ্ঞান ও পরিবেষ্টনে সাথে থাকা। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘তিনি তোমাদের সাথে আছেন যেখানেই তোমরা থাক না কেন।" [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ০৪] অনুরূপ আল্লাহ বলেন, ‘‘তিনি ব্যক্তির মধ্যে এমন কোনো গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থজন হিসেবে তিনি থাকেন না এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যেও হয় না যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি থাকেন না। তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশি হোক তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন যেখানেই তারা থাকুক না কেন।" [সূরা আল-মুজাদালাহ, আয়াত: ০৭]
দুই. বিশেষভাবে সাথে থাকা; আর তা হচ্ছে নৈকট্যের মাধ্যমে সাথে থাকা। যেমন, আল্লাহ বলেন, "নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা মুহসিন।" [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১২৮] অনুরূপ আল্লাহর বাণী "নিশ্চয় আল্লাহ্ সবরকারীদের সাথে আছেন।" [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ১৫৩] অনুরূপ আল্লাহর বাণী "আর নিশ্চয় আল্লাহ মুহসিনদের সাথে আছেন।" [সূরা আল-'আনকাবূত, আয়াত: ৬৯] এ দ্বিতীয়টিই হচ্ছে নৈকট্যের মাধ্যমে সাথে থাকা। যাতে সাহায্য-সহযোগিতা, হিফাযত করা অন্তর্ভুক্ত।
বস্তুত উভয় অর্থই তাঁর পক্ষ থেকে বান্দার সাথী হওয়া সাব্যস্ত করে। তবে প্রথমটি হচ্ছে দেখা ও বেষ্টনের মাধ্যমে সাথে থাকা আর দ্বিতীয়টি সাহায্য-সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের মাধ্যমে সাথে থাকা। সুতরাং বুঝা গেল যে, "ع" শব্দটি যার অর্থ সাথে থাকা, তা আরবী ভাষায় যথাযোগ্য সঙ্গী হওয়া বুঝায়; কখনও মিশে যাওয়া বা লেগে থাকা বুঝায় না, পড়শিত্বও বুঝায় না, পাশাপাশি অবস্থান করাও বুঝায় না। তাই যে কেউ এগুলোর কোনোটি মনে করবে সে তার খারাপ বুঝ থেকে তা বলছে।
আর নৈকট্য: কুরআনুল কারীমে সেটা কখনও বিশেষ অর্থে ব্যতীত ব্যবহার হয়নি। আর এ বিশেষ অর্থেও তা দু' ভাবে এসেছে,
ক. তাঁকে যারা ডাকবে তাদের ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য তিনি আহ্বানকারীর নিকটে।
খ. তাঁর ইবাদাতকারী, তাদের সাওয়াব প্রদানের জন্য তিনি তাদের নিকটে।
প্রথমটির উদাহরণ যেমন, আল্লাহর বাণী: "আর আমার বান্দাগণ যখন আমার সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করে, (তখন বলে দিন যে) নিশ্চয় আমি অতি নিকটে। আহ্বানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে আমি তার আহবানে সাড়া দেই।” [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ১৮৬] আর এজন্যই সাহাবায়ে কেরামের প্রশ্নের উত্তরে নাযিল হয়েছে, তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করেছিলেন, আমাদের রব কী নিকটে যে, আমরা তার সাথে মিনমিন করে কথা বলবো, নাকি দূরে, ফলে তাকে শব্দ করে ডাকবো? তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত নাযিল করলেন।
দ্বিতীয়টির উদাহরণ হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী, "একজন দাস তার মনিবের সবচেয়ে নিকটে থাকে যখন সে সাজদায় থাকে, আর রব সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বান্দার সবচেয়ে কাছে অবস্থান করে রাতের মধ্যভাগে; এটা হচ্ছে আল্লাহর বান্দাদের জন্য বিশেষ নৈকট্য যা তিনি তাঁর আনুগত্যশীলদের জন্য মঞ্জুর করেছেন।"
অনুরূপ সহীহ হাদীসে এসেছে, আবু মূসা আল-আশ'আরী রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কোনো এক সফরে ছিলাম। আমাদের শব্দসমূহ তাকবীর ধ্বনীতে মুখরিত হচ্ছিল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, "হে লোকেরা, তোমাদের নিজেদের ওপর কোমলতা অবলম্বন কর; কারণ তোমরা কোনো বধির কিংবা অনুপস্থিতকে ডাকছ না, নিশ্চয় তোমরা যাকে ডাকছ তিনি সর্বশ্রোতা ও নিকটে; তোমাদের কারও বাহনের ঘাঁড়ের থেকেও তিনি নিকটে।" এটাও বিশেষ ধরনের নৈকট্য; যা তাঁকে আহ্বানকারীর জন্য বিশেষভাবে নির্ধারিত যা দো'আ, প্রশংসা, ও স্তুতির ইবাদাতের কারণে অর্জিত হয়। এভাবে কোনো সৃষ্টি কর্তৃক রব্বে করীমের নিকটে থাকা তাঁর পূর্ণরূপে সৃষ্টি থেকে আলাদা থাকা এবং তাঁর 'আরশের উপরে থাকাকে নিষেধ করে না। বরং নিকটে থাকা ও 'আরশের উপর সৃষ্টি থেকে আলাদা থাকা, দুটো জিনিস একই সাথে হতে পারে, একই সাথে হওয়াকে আবশ্যকও করে। কারণ এ নৈকট্য দুনিয়ার দেহ বিশিষ্টদের একে অপরের নিকটে থাকার মতো নয়। মহান আল্লাহ সে রকম হওয়া থেকে বহু ঊর্ধ্বে। এ তো ভিন্ন রকমের নৈকট্য ও নিকটে থাকা।”⁶
৩- তিনি এটা তুলে ধরার চেষ্টা করেন যে, 'আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর উঠা' প্রমাণ করে যে, তিনি সৃষ্টি থেকে আলাদা। এ বিষয়টি সাব্যস্ত করতে তিনি বলেন,
قوله هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ )) [الحديد: ٤] من أدل شيء على مباينة الرب لخلقه فانه لم يخلقهم في ذاته بل خلقهم خارج عن ذاته ثم بان عنهم باستوائه على عرشه وهو يعلم ما هم عليه فيراهم وينفذهم بصره ويحيط بهم علما وقدرة وإرادة وسمعا وبصرا فهذا معنى كونه سبحانه معهم أينما كانوا
"আল্লাহর বাণী, "তিনি ছয়দিনে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন। তিনি জানেন যা কিছু যমীনে প্রবেশ করে এবং যা কিছু তা থেকে বের হয়, আর আসমান থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উত্থিত হয়। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন--তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, আর তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ্ তার সম্যক দ্রষ্টা।” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ০৪] এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে, স্রষ্টা তার সৃষ্টি থেকে আলাদা; কারণ তিনি সৃষ্টিকে নিজের সত্তার ভিতরে সৃষ্টি করেননি, বরং তাদেরকে তাঁর সত্তার বাইরে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তাদের থেকে আলাদা থেকেছেন তাঁর 'আরশের উপর উঠা'র মাধ্যমে। তিনি জানেন তারা যা যা করছে, তিনি তাদের দেখছেন, তাঁর দৃষ্টি তাদেরকে ভেদ করে, আর জ্ঞান, ক্ষমতা, শ্রবণ, দেখার মাধ্যমে তিনি তাদেরকে ঘিরে রেখেছেন। এটাই হচ্ছে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা কর্তৃক তারা যেখানেই থাকুক সেখানে তাদের সাথে থাকা।”⁷
৪- তিনি "আরশ যে সবচেয়ে প্রশস্ত, বড় ও সম্মানিত সৃষ্টি সেটা প্রমাণ করে তাতে উঠা ও সেখানে অবস্থান করা সবচেয়ে বড় ও মহৎ গুণের অধিকারী রাব্বুল আলামীনের শানের সাথে সংগতিপূর্ণ সেটা বর্ণনা করে বলেন,
يَقْرِنُ اسْتِوَاءَهُ عَلَى الْعَرْشِ بِهَذَا الاسْمِ كَثِيرًا، كَقَوْلِهِ تَعَالَى الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى) [طه: ٥] ، ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ الرَّحْمَنُ ﴾ [الفرقان: ٥٩] فَاسْتَوَى عَلَى عَرْشِهِ بِاسْمِ الرَّحْمَنِ، لِأَنَّ الْعَرْشَ مُحِيطٌ بِالْمُخْلُوقَاتِ قَدْ وَسِعَهَا، وَالرَّحْمَةُ مُحِيطَةٌ بِالْخُلْقِ وَاسِعَةٌ هُمْ، كَمَا قَالَ تَعَالَى وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ﴾ [الأعراف: ١٥٦] فَاسْتَوَى عَلَى أَوْسَعِ الْمُخْلُوقَاتِ بِأَوْسَعِ الصِّفَاتِ، فَلِذَلِكَ وَسِعَتْ رَحْمَتُهُ كُلَّ شَيْءٍ، وَفِي الصَّحِيحِ مِنْ حَدِيثِ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَّا قَضَى اللَّهُ الْخُلْقَ كَتَبَ فِي كِتَابٍ فَهُوَ عِنْدَهُ مَوْضُوعٌ عَلَى الْعَرْشِ إِنَّ رَحْمَتِي تَغْلِبُ غَضَبِي وَفِي لَفْظٍ فَهُوَ عِنْدَهُ عَلَى الْعَرْشِ» . فَتَأَمَّلِ اخْتِصَاصَ هَذَا الْكِتَابِ بِذِكْرِ الرَّحْمَةِ، وَوَضْعَهُ عِنْدَهُ عَلَى الْعَرْشِ، وَطَابِقُ بَيْنَ ذَلِكَ وَبَيْنَ قَوْلِهِ الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى) [طه: ٥] وَقَوْلِهِ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ الرَّحْمَنُ فَاسْأَلْ بِهِ خَبِيرًا ﴾ [الفرقان: ٥٩] يَنْفَتِحُ لَكَ بَابٌ عَظِيمٌ مِنْ مَعْرِفَةِ الرَّبِّ تَبَارَكَ وَتَعَالَى إِنْ لَمْ يُغْلِقْهُ عَنْكَ التَّعْطِيلُ وَالتَّجَهُمُ.
"আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর উঠা' এ গুণটিকে প্রায়শই 'রহমান' নামটির সাথে যুক্ত করেন। যেমন তিনি বলেন, "দয়াময় (আল্লাহ্) 'আরশের উপর উঠেছেন।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫], "তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠলেন। তিনিই 'রহমান', সুতরাং তাঁর সম্বন্ধে যে অবহিত তাকে জিজ্ঞেস করে দেখুন।” [সূরা আল-ফুরক্বান, আয়াত: ৫৯] এভাবে দেখা যাচ্ছে, তিনি রহমান নাম নিয়েই 'আরশের উপর উঠেছেন। কারণ 'আরশ সকল সৃষ্টিকুলকে ঘিরে রেখেছে; যা তাতে জায়গা হয় আর রহমতও সকল সৃষ্টিকুলকে ঘিরে আছে, তাদের জন্য তা প্রশস্ত হয়। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন, "আর আমার রহমত সবকিছুর জন্য প্রশস্ত”। [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ১৫৬] সুতরাং তিনি সবচেয়ে প্রশস্ত সৃষ্টির উপরে উঠেছেন সবচেয়ে প্রশস্ত গুণাবলি নিয়ে। এজন্যই তাঁর রহমত সবকিছুকে ঘিরে রয়েছে। সহীহ হাদীসে আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আল্লাহ তা'আলা যখন সৃষ্টির ফয়সালা করেন তখন তিনি একটি কিতাব লেখেন যা তাঁর নিকট 'আরশের উপর বিদ্যমান, তাতে লেখা রয়েছে, আমার রহমত আমার ক্রোধের ওপর প্রাধান্য পাবে”। অপর বর্ণনায় এসেছে, “সেটা তাঁর কাছে 'আরশের উপর"।
তাহলে চিন্তা করুন, এ কিতাবটিতে বিশেষ করে তাঁর রহমতের উল্লেখ রয়েছে আর সেটাকে তিনি তাঁর কাছে 'আরশের উপরই রেখেছেন, এবার তাহলে এটার সাথে আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণী দু'টোর মিল খুঁজে দেখুন। "দয়াময় (আল্লাহ্) 'আরশের উপর উঠেছেন।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫], “তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠলেন। তিনিই 'রহমান', সুতরাং তাঁর সম্বন্ধে যে অবহিত তাকে জিজ্ঞেস করে দেখুন।” [সূরা আল-ফুরক্বান, আয়াত: ৫৯] দেখবেন, আল্লাহর মারেফত বা সত্যিকারের পরিচয় লাভের ক্ষেত্রে আপনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে, যদি না সেটা আপনার পক্ষ থেকে তা'ত্নীল (অর্থশূন্য) করার নীতি ও জাহমী হওয়ার নীতি দ্বারা বন্ধ হয়ে থাকে।”⁸
৫- অন্যত্র তিনি আল্লাহর নাম 'আল-মালিক' হওয়ার দাবি হিসেবেও তিনি 'আরশের উপর উঠবেন, 'আরশের উপর থাকবেন সেটাকে সাব্যস্ত করার জন্য বলেছেন,
وَاسْمَهُ الْمُلِكَ « يَدُلُّ عَلَى مَا يَسْتَلْزِمُ حَقِيقَةً مُلْكِهِ : مِنْ قُدْرَتِهِ، وَتَدْبِيرِهِ، وَعَطَائِهِ وَمَنْعِهِ، وَثَوَابِهِ وَعِقَابِهِ، وَبَثُ رُسُلِهِ فِي أَقْطَارِ مَمْلَكَتِهِ، وَإِعْلَامِ عَبِيدِهِ بِمَرَاسِيمِهِ، وَعُهُودِهِ إِلَيْهِمْ، وَاسْتِوَائِهِ عَلَى سَرِيرِ مَمْلَكَتِهِ الَّذِي هُوَ عَرْشُهُ الْمَجِيدُ. "আর আল্লাহর 'মালিক' বা বাদশাহ নামটি প্রমাণ করছে তাঁর প্রকৃত রাজত্বের দাবি অনুসারে তাঁর থাকবে ক্ষমতা, পরিচালনা, দান করা, নিষেধ করা, সাওয়াব দেয়া, শাস্তি দেয়া, তাঁর রাজত্বের চারদিকে তাঁর দূতদের প্রেরণ করা, তাঁর দাসদেরকে তাঁকে সম্মান প্রদর্শনের নিয়ম- কানুন জানিয়ে দেয়া, তাদের কাছ থেকে আনুগত্যের অঙ্গীকার নেয়া, তাঁর রাজকীয় খাটের উপর উঠা, যার অপর নাম হচ্ছে তাঁর মহান 'আরশ।”⁹
৬- অন্যত্র তিনি এটা তুলে ধরেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজেকে 'আরশের মালিক বলা দ্বারা এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এ 'আরশ একান্তভাবেই তাঁর। অন্য কেউ তাতে উঠবে এমনটি কখনও উপযোগী নয়। তিনি বলেন, ووصفه بأنه ذو العرش الذي لا يقدر قدره سواه أن عرشه المختص به لا يليق بغيره أن يستوى عليه ووصفه بالمجد المتضمن لسعة العلم والقدرة والملك والغنى والجود والإحسان والكرم. "আর মহান আল্লাহ তাঁর নিজেকে 'যুল 'আরশ' 'আরশ ওয়ালা গুণ দিয়ে গুণান্বিত করা, যার পরিমাণ তিনি ব্যতীত আর কেউ নির্ধারিতভাবে বলতে পারে না, এটা প্রমাণ করে যে, তাঁর সাথে বিশেষায়িত এ 'আরশ তিনি ব্যতীত আর কারও জন্য তার উপরে উঠা উপযোগী হবে না। অনুরূপ তিনি 'মাজদ' বা 'মহামর্যাদা'র গুণে গুণান্বিত করলেন, প্রশস্ত জ্ঞান, ক্ষমতা, রাজত্ব, অমুখাপেক্ষিতা, দান, বিশেষ দাক্ষিন্ন, সম্মান প্রদান এসব তাঁর গুণ একান্তভাবে তাঁর হওয়ার কারণেই।”¹⁰
৭- তাছাড়া তিনি তাঁর ই'লামুল মুওয়াক্কে'ঈন গ্রন্থে আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর রয়েছেন সেটাকে অনেকগুলো উদাহরণের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বিদ'আতপন্থীদের মূল কাজ দু'টি: এক. হাদীস দ্বারা কোনো কিছু তাদের মনঃপুত না হলে সেটাকে কুরআনের বিরোধী প্রমাণে উঠে পড়ে লাগা। দুই. কুরআনের কোনো কিছু মনঃপুত না হলে, সেটা যদিও সম্পূর্ণভাবে মুহকাম বা সুদৃঢ় অর্থের বিষয় হয়, তবুও সেটাকে মুতাশাবিহ বানানোর জন্য যাবতীয় প্রচেষ্টা নিবদ্ধ করা।¹¹ এ দু'টি নীতিই আমরা যাবতীয় পথভ্রষ্ট দলগুলোর মাঝে কমন হিসেবে দেখতে পাই।
তারপর ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর সেটা প্রমাণ করার জন্য ১৮ (আঠারো) প্রকার দলীল উপস্থাপন করেছেন।¹²
৮- অনুরূপভাবে ইবনুল কাইয়্যেম তাঁর নূনিয়া কাব্যগ্রন্থে একটি নমূনা বিচার ব্যবস্থা করেছেন, যাতে 'আল্লাহর 'আরশের উপর উঠা' বলার পক্ষের আর যারা বিপক্ষে রয়েছে তাদের মধ্যে মুনাযারা ব্যবস্থা করে দেখিয়েছেন যে, 'আরশের উপর উঠেছে যারা বলেছে তারা ব্যতীত অন্যদের দেয়ার মতো দলীল নেই। তারপর তিনি বলেন, "কেউ আমাদেরকে মুজাসসিমা (দেহবাদী), মুশাব্বিহা (সাদৃশ্য স্থাপনকারী) বা হাশওয়িয়‍্যাহ (বেহুদা বক্তৃতাকারী) বললেই তাদের এসব মিথ্যা বদনামীর ভয়ে আমরা আমাদের রবের গুণে তাকে গুণান্বিত করা ছেড়ে দিব? কখনও না।"¹³
এ হচ্ছে সামান্য কিছু উদাহরণ; যার মাধ্যমে আমরা ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রাহيمাহুল্লাহ কর্তৃক 'আল্লাহর 'আরশে উঠা' এ গুণটি সাব্যস্ত করার বিভিন্নমুখী প্রচেষ্টা এখানে তুলে ধরলাম। বস্তুত ইবনুল কাইয়্যেমের মত এ ব্যাপারে এতই প্রসিদ্ধ যে, তার জন্য দলীল পেশ করার খুব বেশি প্রয়োজন হয় না।
টিকাঃ
১. ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ুশ, ৯৫-৯৬।
২. ইবনুল কaiയ്യেম, মাদারিজুস সালেকীন (২/৮৫)।
৩. মুখতাসারুস সাওয়া'য়িকুল মুরসালাহ (২/৩৬৩)।
৪. আল-ওয়াহেদী, আল-ওয়াজীয, পৃ. ৮৪১; ইবনুল কাইয়্যেম, আস-সাওয়া'য়িকুল মুরসালাহ (৩/১০৩৩)।
৫. আস-সাওয়া'য়িকুল মুরসালাহ (২/৪৩১-৪৩২)।
৬. মাদারিজুস সালেকীন (২/২৫৪-২৫৫)।
৭. হাদিউল আরওয়াহ ইলা বিলাادিল আফরাহ: ২৯৫।
৮. মাদারিজুস সালেকীন (১/৫৭)।
৯. মাদারেজুস সালেকীন (৩/৩৭৪-৩৭৫)।
১০. আত-তিবইয়ান ফী আক্বসামিল কুরআন, পৃ. ৯৮।
১১. ই'লামুল মুওয়াকে'ঈন (২/২০৯)।
১২. ই'লামুল মুওয়াকে'ঈন (২/২০৯-২১৭)।
১৩. দেখুন: আলে ঈসা, শারহুল কাফিয়্যাতুশ শাফিয়্যাহ (১/১৬)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00