📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 শাইখ শহাউদ্দীন আবূ শাফস ‘উমার আস-সাহরাওয়াদী (৬৩২ হিজরী)

📄 শাইখ শহাউদ্দীন আবূ শাফস ‘উমার আস-সাহরাওয়াদী (৬৩২ হিজরী)


শাইখ শিহাবউদ্দীন আবু হাফস 'উমার আস-সাহরাওয়ার্দী রাহimামুল্লাহ, যিনি বিখ্যাত আলেমে দীন আবদুল কাদের জীলানী রাহিমাহুল্লাহ'র ছাত্র ছিলেন। তার রচিত অন্যতম গ্রন্থ হচ্ছে 'আওয়ারিফুল মা'আরিফ। তিনি আকীদাহ'র ওপর রচিত তাঁর 'আকীদাতু আরবাবিত তুর্কা' গ্রন্থে আল্লাহর সিফাত সাব্যস্ত করার বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেছেন। ইমাম ইবন হাজার আল-আসকালানী রাহিমাহুল্লাহ তা বর্ণনা করে বলেন,
وَقَالَ الشَّيْخُ شِهَابُ الدِّينِ السَّهْرَ وَرْدِيُّ فِي كِتَابِ الْعَقِيدَةِ لَهُ أَخْبَرَ اللهُ فِي كِتَابِهِ وَثَبَتَ عَنْ رَسُولِهِ الاسْتِوَاءُ وَالنُّزُولُ وَالنَّفْسُ وَالْيَدُ وَالْعَيْنُ فَلَا يُتَصَرَّفُ فِيهَا بِتَسْبِيهِ وَلَا تَعْطِيلٍ إِذْ لَوْلَا إِخْبَارُ اللهِ وَرَسُولِهِ مَا تَجَاسَرَ عَقْلٌ أَنْ يَحُومَ حَوْلَ ذَلِكَ الْحِمَى قَالَ الطَّيبِيُّ هَذَا هُوَ الْمُذْهَبُ المُعْتَمَدُ وَبِهِ يَقُولُ السَّلَفُ الصَّالِحُ .
"আর শাইখ শিহাব উদ্দীন আস-সাহরাওয়ার্দী তার আকীদাহ'র কিতাবে বলেন, "আল্লাহ তা'আলা তাঁর কিতাবে আমাদেরকে জানিয়েছেন আর তাঁর রাসূল থেকে প্রমাণিত হয়েছে আল্লাহর 'আরশের উপর উঠা, নিকটতম আসমানে অবতরণ, সত্তা, হাত, চক্ষু। সুতরাং এগুলোকে কোনো প্রকার সাদৃশ্য স্থাপন করার দিকে প্রত্যাবর্তন করা যাবে না, কোনো প্রকার তা'ত্বীল বা অর্থহীন করা যাবে না; কারণ যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদেরকে না জানাতেন, তাহলে কোনো বিবেকের যুক্তি তাঁর সে সংরক্ষিত এলাকার আশেপাশে যাওয়ার মত সাহস করতো না।”¹ এরপর ইবন হাজার বলেন, ইমাম ত্বীবী বলেন, এটাই হচ্ছে নির্ভরযোগ্য মাযহাব। সালাফে সালেহীন এটাই বলতেন।²
ইমাম শিহাব উদ্দীন আস-সাহراওয়ার্দী রাহيمাহুল্লাহ উক্ত কিতাবের সিফাত অধ্যায়ে বলেন,
الفصل الثالث: في صفة الله الذاتية الله تعالى الأسماء الحسنى والصفات العلى، لا نسميه إلا بما سمى به نفسه، ولا نصفه إلا بما وصف به قدسه، فكل اسم من الأسماء ينبئ عن صفة من الصفات، وله بكل صفة من صفاته أثر من آثار ربوبيته في خلقه، وهو مطالب بعبودية ملائمة لتلك الصفة، وهذه الصفات الذي أذكرها ذاتية، هي لوازم كمال الذات المقدس، وما أبرزها إلا لنعلمها، وما ذكرها إلا لنفهمها، ولولا ما أخبر وأنزل وفهم وعلَّم لعظم شأن الله أن يفوه بها لسان أو يعرب عنها بيان....
"তৃতীয় অধ্যায়, আল্লাহর সত্তাগত গুণাবলির বিষয়ে, আল্লাহ তা'আলার রয়েছে সুন্দর নামসমূহ ও সুউচ্চ গুণাবলি। আল্লাহ তা'আলাকে কেবল তা দিয়ে নামকরণ করব, যা দিয়ে তিনি নিজেকে নামকরণ করেছেন, আর তাঁকে কেবল তা দিয়েই গুণান্বিত করব যা দিয়ে তিনি তাঁর পবিত্র সত্তাকে গুণান্বিত করেছেন। কারণ তাঁর প্রতিটি নাম তাঁর কোনো না কোনো গুণের সংবাদ দিচ্ছে। আর প্রতিটি গুণ তাঁর সৃষ্টিতে তাঁর রবুবিয়াতের প্রভাবের কথা জানাচ্ছে। তিনি চাচ্ছেন যে, বান্দা সে গুণ অনুযায়ী তাঁর ইবাদাত করুক। আর এ গুণাবলিকে আমি সত্তাগত বলছি, কারণ এগুলো তাঁর পবিত্র সত্তার পূর্ণতা জ্ঞাপক আবশ্যকীয় গুণ। আর তিনি সেগুলোকে আমাদের জন্য এজন্যই প্রকাশ করেছেন যাতে আমরা সেগুলো জেনে নিই, এজন্যই উল্লেখ করেছেন যাতে সেগুলো আমরা বুঝি। যদি তিনি সেগুলোর সংবাদ আমাদের না দিতেন, নাযিল না করতেন, না বুঝাতেন, না জানাতেন, তাহলে কোনো জিহ্বার জন্য সেগুলো মুখে উচ্চারণ করা, সেগুলো কোনো বর্ণনা দিয়ে প্রকাশ করার চেয়ে আল্লাহর মর্যাদা অনেকে ঊর্ধ্বে।”³
টিকাঃ
১. আকীদাতু আরবাবিত তুক্কা, পাণ্ডুলিপি, পাতা ২৫; ইবন হাজার আল-আসকালানী, ফাতহুল বারী (১৩/৩৯০)।
২. ইবন হাজার, প্রাগুক্ত।
৩. পাণ্ডুলিপি, পাতা, ১৩-১৪।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 ইমাম তাকীউদ্দীন আল-মাকদেসী (৬৭৬ হিজরী) বা তার পূর্বে)

📄 ইমাম তাকীউদ্দীন আল-মাকদেসী (৬৭৬ হিজরী) বা তার পূর্বে)


ইমাম তাক্বীউদ্দীন আল-মাক্বদেসীর ব্যাপারে তার শত্রু আশ'আরীরা রটাতো যে, তিনি আল্লাহর দেহ সাব্যস্ত করতেন। বস্তুত এটি হচ্ছে আশ'আরী ও মাতুরিদীদের অস্ত্র, যা দিয়ে তারা সহীহ আকীদাহ'র লোকদেরকে যুগ যুগ ধরে কষ্ট দিত, মানুষদেরকে তাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতো, অপপ্রচার করতো। ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ তার সম্পর্কে বর্ণনা করেন,
رأيت له مُصَنَّفًا في الصفات، ولم يصح عنه ما كان يلطخ بهِ مِنَ التَّجسيم، فإنَّ الرجل كان أتقى الله وأخوف من أن يقول على الله ذلك، ولا ينبغي أنْ يُسْمَعَ فيه قول الخصوم.
وكان الواقع بينه وبين شيخنا العلامة شمس الدين ابن أبي عمر وأصحابه، وهو كان حنبليا خشنًا متحزقًا على لا والله ما قلته، لكن الله الأشعرية. وبلغني أن بعض المتكلمينَ قالَ لهُ : أنت تقول إنَّ الله استوى على العرش ؟ فقال : قاله، والرسول صلى الله عليه وسلم بلغَ، وأنا صَدَّقْتُ، وَأَنتَ كَذَّبْتَ. فَأَفْحَمَ الرَّجلَ».
"আমি আল্লাহর গুণাবলির ব্যাপারে তার একটি গ্রন্থ দেখেছি। লোকেরা তাকে যে দেহবাদী বলতো তা শুদ্ধ নয়। কারণ, তিনি আল্লাহর উপর এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করার চেয়ে অনেক বেশি তাকওয়ার অধিকারী ছিলেন। সুতরাং তার বিরুদ্ধে বিপক্ষ দলের বক্তব্য শোনা যাবে না।
তার সাথে শাইখ আল্লামা শামসুদ্দীন ইবন আবী 'উমার ও তার সাথীদের সমস্যা হয়েছিল। তিনি হাম্বলী ছিলেন, আশ'আরী মতবাদের বিরুদ্ধে কঠোরতা করতেন। আমার কাছে এ মর্মে সংবাদ এসেছে যে, একবার এক কালামশাস্ত্রবিদ তাকে বললেন, আপনি কি বলেন যে, আল্লাহ 'আরশের উপর উঠেছেন। তিনি জবাবে বললেন, না, আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি এটা বলিনি, বরং আল্লাহই সেটা বলেছেন আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেটা প্রচার করেছেন। আমি তাতে সত্যায়ন করেছি, আর তুমি মিথ্যারোপ করেছ। এভাবে তিনি তাকে জব্দ করলেন।"¹
টিকাঃ
১. যাহাবী, তারীখুল ইসলাম, ঘটনা-প্রবাহ ও মৃত্যু ৬৭১-৬৮০ হিজরী, পৃ. ৩২৪।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 শাইখুল হুয়ামীণ (৭১১ হিজরী)

📄 শাইখুল হুয়ামীণ (৭১১ হিজরী)


শাইখ ইমাম আরিফ আহমাদ ইবন ইবরাহীম ইবন ইবন আবদুর রহমান, ইমাদুদ্দীন আল-ওয়াসেত্বী ইবন শাইখুল হুযামীন তাঁর "আন-নাসীহাতু ফী সিফাতির রাব্বি জাল্লা ওয়া 'আলা" গ্রন্থে বলেন,
الحمد لله الَّذِي ... لَيْسَ كمثله شَيْءٍ وَهُوَ السَّمِيعِ الْبَصِيرِ لَهُ الرِّفْعَة وَالحَمْد والثناء والعلو والاستواء، ... متكلم شَاءَ مُريد فعال لما يُريد يقبض ويبسط ويرضى ويغضب وَيُحب ويبغض ويكره ويضحك وَيَأْمُر وَيَنْهَى ذُو الْوَجْه الكريم والسمع السَّمِيعِ وَالْبَصَرِ الْبَصِيرِ وَالْكَلَام المبين وَالْيَدَيْنِ والقبضتين والمقدرة وَالسُّلْطَانِ وَالْعَظَمَة والامتنان لم يزل كَذَلِكَ وَلَا يزال اسْتَوَى على عَرْشِه فَبَان من خلقه.
"হামদ জাতীয় যত প্রশংসা সব আল্লাহর জন্য, যিনি এমন এক সত্তা, যার মতো কোনো কিছু নেই, তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। তাঁর জন্য যাবতীয় উঁচু মর্যাদা, হামদ, প্রসংসা, সুউচ্চতা, উপরে উঠা... যা ইচ্ছা তা কথা বলেন, ইচ্ছাকারী, যা ইচ্ছা ইরাদা বাস্তবায়নকারী, সংকুচিত করেন, প্রসারিত করেন, সন্তুষ্ট হন, রাগ করেন, খুশি হন, রাগ করেন, ভালোবাসেন, ঘৃণা করেন, অপছন্দ করেন, হাসেন, নির্দেশ দেন, নিষেধ করেন, সম্মানিত চেহারার অধিকারী, শ্রবণের অধিকারী সর্বশ্রোতা, দেখার অধিকারী সর্বদ্রষ্টা। স্পষ্ট কথার অধিকারী, দু' হাতের অধিকারী, দু' মুষ্ঠির অধিকারী, ক্ষমাবান, প্রতিপত্তির অধিকারী, মর্যাদাবান, দয়া প্রদর্শনকারী, সর্বদা তিনি এসব গুণে গুণান্বিত ছিলেন এবং থাকবেন। তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন, তাঁর সৃষ্টি থেকে আলাদা থেকেছেন।”¹
তিনি আরও বলেন,
كنت بُرْهَة من الدهر متحيرا في ثلاث مسائل مَسْأَلَة الصَّفَاتِ وَمَسْأَلَة الْفَوْقِيَّة ومسالة الحرْفِ وَالصَّوْتِ فِي الْقُرْآن المجيد وكنت متحيرا فِي الْأَقوال المُخْتَلِفَة المُوْجُودَة في كتب أهل العصر في جميع ذلك من تأويل الصفات وتحريفها
أو إمرارها أو الْوُقُوف فِيهَا أَو إِثْبَاتِهَا بِلَا تَأْوِيل وَلَا تَعْطِيل وَلَا تَشْبِيهِ وَلَا تَمثيل فأجد النصوص في كتاب الله وسنة رسوله ناطقة مبينة الحقائق هَذِهِ الصِّفَات وَكَذَلِكَ فِي إِثْبَات الْعُلُوّ والفوقية وَكَذَلِكَ فِي الْحُرْفِ وَالصَّوْتِ ثُمَّ أَجد المتأخرين من المتكلمين في كتبهم منهم من تأول الاستواء بالقهر والاستيلاء وَتَأَول النُّزُول بنزول الْأَمر وَتَأَول اليدين بالنعمتين والقدرتين وتأول القدم بقدم صدق عند ربهم وأمثال ذلك ثمَّ اجدهم مَعَ ذَلِكَ يَجْعَلُونَ كَلَام الله معنى قَائِما بِالذَّاتِ بِلا حرف وَلَا صَوت ويجعلون هَذِه الحروف عبارة عن ذَلِكَ الْمُعْنَى الْقَائِمِ وَمِمَّنْ ذهب إِلَى هَذِهِ الْأَقْوَال أَو بَعْضَهَا قوم هُم فِي صَدْرِي منزلة مثل بعض فقهاء الاشعرية الشافعيين لِأَنِّي عَلى مَذْهَبِ الشَّافِعِي رَحْمَه الله تَعَالَى عرفت مِنْهُم فَرائض ديني وَأَحْكَامه.
فأجد مثل هَؤُلَاءِ الشُّيوخ الأجلة يذهبون إلى مثل هَذِهِ الْأَقْوَال وهم شيوخي ولي فيهم الاعتقاد التام لفضلهم وعلمهم ثمَّ إِنَّنِي مَعَ ذَلِك أجد في قلبي من هذه التأويلات حزازات لا يطمئن قلبي إِلَيْهَا وَأَجد الكدر والظلمة مِنْهَا وَأَجد ضيق الصدر وعدم انشراحه مَقْرُونا بها فكنت كالمتحير المضطرب في تحيره المتململ من قلبه في تقلبه تغيره وكنت أَخَاف من إطلاق القَوْل بِإِثْبَات الْعُلُو والاستواء وَالنُّزُول مَخَافَة الحضر والتشبيه وَمَعَ ذَلِك فَإِذا طالعت النُّصوص الْوَارِدَة في كتاب الله وسنة سوله أجدها نصوصا تُشير إلى حقائق هَذِهِ الْمَعَانِي وَاجِدَ الرَّسُولِ صلى اللهُ عَلَيْهِ وسلم قد صرح بها مخبرا عن ربه واصفا له بها وأعلم بالاضطرار أنه كان يحضر في مجلسه الشريف العالم والجاهل والذكي والبليد والأعرابي الجافي ثم لا أجد شَيْئًا يعقب تِلْكَ النُّصُوص الَّتِي كَانَ صلى اللهُ عَلَيْهِ وَسلم يصف بِهَا ربه لا نصا وَلَا ظاهرا بما يصرفها عن حقائقها ويؤولها كما تأولها هَؤُلَاءِ مشايخي الفقهاء المتكلمون مثل تأويلهم الاستواء بِالاسْتِيلَاءِ وَالنُّزُول بنزول الأمر وغير ذلك ولم أجد عَنهُ صلى الله عَلَيْهِ وَسلم انه كَانَ يحذر النَّاس من الإيمان بما يظهر من كلامه في صفة ربه من الْفَوْقِيَّةِ وَالْيَدَيْنِ وَغَيْرهما مثل أَن ينقل عَنهُ مقَالَة تدل على أَن هَذِهِ الصَّفَات معاني آخر باطنة غير ما يظهر من مدلولها مثل فوقية المرتبة وَيَد النِّعْمَة وَغير ذلِك وَأَجد الله عز وجل يَقُولُ الرَّحْمَن على الْعَرْشِ اسْتَوَى وَقَالَ خلق السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ فِي سَبْعَة مَوَاضِع .
"আমি একটি বিরাট সময় তিনটি বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভূগছিলাম, আল্লাহর গুণাবলি, আল্লাহর উপরে থাকা, আল্লাহর বাণী কুরআন মাজীদের বর্ণবিশিষ্ট ও আওয়াজবিশিষ্ট হওয়া। আমি বর্তমান সময়ের আলেমগণের গ্রন্থে এ সকল বিষয়ে যা এসেছে, তা নিয়ে হতভম্ব ছিলাম। আমি বুঝছিলাম না কী করব, সিফাত বা আল্লাহর গুণাবলির অপব্যাখ্যা দাঁড় করাব? বিকৃত করব? এগুলোকে যেভাবে আছে সেভাবে চলতে দিব, নাকি এগুলোর ব্যাপারে নীরব থাকবো? নাকি এগুলোকে কোনো প্রকার অপব্যাখ্যা, অর্থশূন্যতা, সাদৃশ্যতা, উদাহরণ পেশ ব্যতীতই সাব্যস্ত করব? কারণ, আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতে স্পষ্ট করে বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ তা'আলার এ গুণাবলিকে সাব্যস্ত করার নীতি দেখতে পাই, অনুরূপভাবে আল্লাহ তা'আলার উপরে ও সর্বোচ্চ থাকার মাসআলাতেও একই অবস্থা দেখতে পাই। তদ্রূপ আল্লাহ তা'আলার বাণীকে বর্ণ ও আওয়াজ দ্বারা দেখতে পাই। তারপর আমি পরবর্তী কালামশাস্ত্রবিদদের বিভিন্ন গ্রন্থে দেখতে পাই যে, তাদের কেউ কেউ 'ইস্তেওয়া' ('আরশের উপরে উঠা) গুণটিকে ইস্তাওলা (অধিকার করা) বা 'কাহর' (দখল) করা অর্থে ব্যবহার করেছে। আল্লাহর নিকটতম আসমানে নাযিল হওয়াকে নির্দেশ নাযিল হওয়া অর্থে ব্যবহার করেছে। আল্লাহ তা'আলার দু' হাতকে দু' শক্তি ও দু' ক্ষমতার অর্থ দিয়ে অপব্যাখ্যা করেছে। আল্লাহ তা'আলার 'পা'কে তাদের রবের কাছে সত্য অবস্থান ইত্যাদি নামে অপব্যাখ্যা করেছে। অনুরূপ আরও কিছু নীতি অবলম্বন করেছে। সর্বোপরি তারা আল্লাহর বাণীর সংজ্ঞায় বলছে যে, তা সত্তার সাথে সম্পৃক্ত একটি অর্থের নাম, যাতে কোনো বর্ণ নেই, যাতে কোনো আওয়াজ নেই; তারপর এ শব্দগুলোকে সেই সত্তার সাথে সম্পৃক্ত অর্থের ব্যক্তকারী বক্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করে নিয়েছে। যারা এসব মতবাদ ধারণ করে আছে তাদের জন্য আমার অন্তরে রয়েছে বড় মর্যাদা, যেমন শাফেয়ী মাযহাবের আশ'আরী মতবাদের ধারক ফকীহগণ, কারণ আমি নিজেও শাফে'য়ী রাহিমাহুল্লাহ'র মাযহাবের অনুসারী, তাদের কাছ থেকেই দীনের ফরয ও বিধি-বিধান জেনেছি, অতঃপর আমি এসব সম্মানিত শাইখদেরকে দেখি যে, তারা এসব মত গ্রহণ করে নিয়েছেন, তারা আমার উস্তাদ। তাদের উপর আমার পূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে, তাদের ফযীলত ও ইলমের কারণে। তারপরও আমি আমার অন্তরে এসব অপব্যাখ্যার কারণে খোঁচা অনুভব করি, যার কারণে মনে শান্তি পাই না, আমি এগুলোতে কদর্যতা ও অন্ধকারই দেখতে পাই, আমার অন্তরকে সংকীর্ণ ও অপ্রশস্ত দেখতে পাই। ফলে আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়রান পেরেশান হয়ে মন থেকে বিড়বিড় অবস্থায় নিপতিত হই। আমি সরাসরি আল্লাহ তা'আলার উপরে থাকা, 'আরশের উপর উঠা, অবতীর্ণ হওয়ার বিষয়টি সরাসরি বলতে আশঙ্কা করছিলাম, এতে কোনো সীমাবদ্ধ কিংবা সাদৃশ্য স্থাপন হয়ে যায় কি না? এতদসত্ত্বেও যখন আমি আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত পড়ি তখনই আমি সেসব ভাষ্যতে দেখতে পাই যে, এ শব্দগুলোর প্রকৃত অর্থের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, আর দেখতে পাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেগুলোর অর্থ সরাসরি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন, তাঁর রবের গুণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আর এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানিত মজলিসে আলেম, জাহেল, বুদ্ধিমান, বোকা, বেদুঈন সব রকমের মানুষ উপস্থিত থাকত; তারপরও আমরা সেসব ভাষ্যের পিছু নিয়ে কাউকে কিছু বলতে কখনো দেখা যায়নি যেগুলো দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রবের গুণ বর্ণনা করতেন। স্পষ্ট তো নয়ই আকার ইঙ্গিতেও নয়। কোথাও এমন কোনো কথা শোনা যায়নি যাতে সেগুলোকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রকাশ্য অর্থ থেকে পরিবর্তন করে অপ্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করার নামে অপব্যাখ্যা করে তার প্রকৃত অর্থ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। যেভাবে আমাদের এসব ফকীহ ও কালামশাস্ত্রবিদ উস্তাদগণ করে থাকেন। যেমনটি তারা 'ইস্তেওয়া' (উপরে উঠা) গুণটিকে 'ইস্তাওলা' (অধিকার করার) অর্থ নিয়েছেন। অনুরূপ 'অবতরণ'কে নির্দেশ অবতরণের অর্থ নিয়েছেন, ইত্যাদি আরও যেসব অপব্যাখ্যা তারা করে থাকেন তার কোনো কিছুই রাসূল থেকে আসেনি। আরও আমরা দেখতে পাই না যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাউকে সাবধান করেছেন যে, তোমরা এসব গুণের যে প্রকাশ্য অর্থ আছে তা গ্রহণ করো না, যেমন এগুলোতে উপরে উঠা ও থাকার কথা বলা হয়েছে, এগুলোতে দু' হাত সাব্যস্ত করা হয়েছে, ইত্যাদি গুণাবলির প্রকাশ্য অর্থ না নেয়ার কথা তিনি কখনও বলেননি। রাসূল থেকে এমন কোনো ভাষ্যও আসেনি, যাতে এটা প্রমাণ হবে যে, এ সিফাতগুলোর প্রকাশ্য যে অর্থ তোমাদের কাছে প্রতিভাত হয় সে অর্থের বিপরীতে গোপন অন্যান্য অর্থসমূহ রয়েছে, যেমন মর্যাদায় উপরে থাকা, কিংবা নি'আমতের হাত ইত্যাদি। বরং আমরা আল্লাহ তা'আলাকে স্পষ্ট বর্ণনা করতে দেখি যে, তিনি বলেন, "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন।” আরও বলেন, "তিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন ছয়দিনে, তারপর তিনি 'আরশের উপরে উঠেছেন। এভাবে তিনি সেটা সাত জায়গায় বলেছেন।"²
তারপর গ্রন্থের বাকী অংশে তিনি আল্লাহর 'আরশের উপর উঠার ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসের যাবতীয় ভাষ্য বর্ণনা করেন যার অধিকাংশই আমরা ইতোপূর্বে বর্ণনা করেছি।
টিকাঃ
১. আন-নাসীহাতু ফী সিফাতির রাব্বি জাল্লা ওয়া 'আলা, ৭-৮।
২. আন-নাসীহাতু ফী সিফাতির রাব্বি জাল্লা ওয়া 'আলা, ৮-৩০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00