📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 ইমাম আলী ইবন মুসাফির আল-উমাওয়ী (৫৫৫ হিজরী)

📄 ইমাম আলী ইবন মুসাফির আল-উমাওয়ী (৫৫৫ হিজরী)


ইমাম 'আদী ইবন মুসাফির আল-উমাওয়ী আল-হাক্কারী রাহিমাহুল্লাহ তাঁর 'ই'তিক্বাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ' গ্রন্থে বলেন, «وأنَّ اللهَ عَلى عَرْشِهِ بَائِنٌ مِنْ خَلْقِهِ، كَمَا وَصَفَ نَفْسَهُ فِي كِتَابِهِ وعلى لِسَانِ نَبِيِّهِ بلا كَيْف، أحاطَ بِكُلِّ شيء علما وهو بكُلِّ شيء عليم».
"আর এটাও আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের আকীদাহ যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর, সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা, যেমনটি তিনি নিজে তাঁর কিতাবে গুণান্বিত করেছেন আর তাঁর রাসূলের জবানীতে এসেছে, কোনো প্রকার ধরন নির্ধারণ ছাড়াই”।¹
টিকাঃ
১. ই'তিক্কাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ, পৃ. ৩০।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 আল্লামা ইয়াহইয়া ইবন আবুল মায়ের আল-‘ইমরানী (৫৫৮ হিজরী)

📄 আল্লামা ইয়াহইয়া ইবন আবুল মায়ের আল-‘ইমরানী (৫৫৮ হিজরী)


আল্লামা ইয়াহইয়া ইবন আবুল খায়ের আল-'ইমরানী তাঁর 'আল-ইন্তিসার ফির রাদ্দি আলাল মু'তাযিলাতিল কাদারিয়‍্যাতিল আশরার' গ্রন্থে বলেন, قد ذكرنا في أول الكتاب أن عند أصحاب الحديث والسنة أن الله سبحانه بذاته، بائن عن خلقه، على العرش استوى فوق السموات، غير مماس له ، وعِلْمُهُ محيط بالأشياء كلها. وقالت الكرامية : إنه مماس للعرش. وقالت المعتزلة : إن ذات الله بكل مكان حتى بالحشوش وأجواف الحيوان. قيل لبشر المريسي: فهو في جوف حمارك هذا؟ قال: نعم، وهذا قول الحلولية وهو كفر صريح لا إشكال فيه. وقالت الأشعرية: لا يجوز وصفه بأنه على العرش ولا في السماء.
ثم ذكر آيات وأحاديث دالة على علو الله إلى أن قال: ولأن المسلمين مجمعون عند الدعاء على رفع أبصارهم وأكفهم إلى نحو السماء؛ فدل على صححة ما قلناه. ويقال لهم: إذا لم يكن الله فوق العرش بمعنى يختص بالعرش كما قال أصحاب الحديث، وكان بكل مكان، فقولوا: إنه تحت الأرض والسماء فوقها فهو تحت التحت وأنه فوق الفوق والأشياء تحته وهذا متناقض.
فإن احتجوا بقوله تعالى : ﴿مَا يَكُونُ مِنْ نَجْوَى ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ وَلَا أَدْنَى مِنْ ذَلِكَ وَلَا أَكْثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا ﴾ [المجادلة: ٧]، وبقوله تعالى: ﴿وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ ﴾ [الحديد: ٤].
فالجواب: أن المراد بالآية ﴿مَا يَكُونُ مِنْ نَجْوَى ثَلَاثَة﴾ [المجادلة: ٧] أي من حديث بَيْنَ ثلاثة إلا هو رابعهم بالإحاطة والعِلْمِ ... وكذلك المعنى في قوله تعالى: ﴿وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ ﴾ [المجادلة: 7]. إلى قوله ﴿إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا ﴾ [المجادلة: 7]، يريد بالإحاطة والعِلْمِ لا بالذَّاتِ والحلول.
يَدُلُّ على صحة هذا التأويل قوله تعالى: ﴿أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ مَا يَكُونُ مِنْ نَجْوَى ثلاثة ﴾ [المجادلة: ٧] الآية .. إلى قوله : ﴿إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ﴾ [المجادلة: ٧] فبدأ الآيةَ بالعِلْمِ وختمها بالعِلْمِ، فَدَلَّ على أنَّ المراد بذلك كُلِّهِ الإخبارُ عَنْ عِلْمِهِ وَإِحَاطَتِهِ بهم في جميع هذه الحالات.
فإن احْتَجوا بقوله تعالى: ﴿وَهُوَ الَّذِي فِي السَّمَاءِ إِلَهُ وَفِي الْأَرْضِ إِلَهُ ﴾ [الزخرف: ٨٤] فأخبر أنه إله بكل واحد منهما।
فالجواب: أنَّ المراد بالآية أنه عند أهلِ السَّماءِ إله وعند أهل الأرض إله كما يقال : فلان نبيل مطاع في العراق ونبيل مطاع في الحجاز, يَعْنُونَ أَنَّهُ نبيل مطاع فيهما وليس يَعْنُونَ أنَّ ذاتَهُ في العراق وفي الحجاز.
فإن احتجوا بقوله تعالى: ﴿إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَوْا ﴾ [النحل : ۱۲۸] وبقوله تعالى: ﴿إِنَّنِي مَعَكُمَا أَسْمَعُ وَأَرَى﴾ [طه: ٤٦].
فالجواب : أن المراد على أنه أراد بالحفظ والرعاية والنصر والتأييد مع الذين اتقوا ومع المحسنين ومع موسى وهارون عليهما السلام, فلا يُقَاسُ على هذا أنه مع الفساق والكفَّارِ، ولا مَعَ الكلاب والخنازير تعالى الله عن ذلك عُلُوًّا كبيرًا.
وَتَأَوَّلَتِ المعتزلة ومَنْ تَابَعَهُم قول الله سبحانه: ﴿الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى ﴾ [طه: ٥] على أن الاستواء هو الاستيلاء والقهر واحتجوا بقول الشاعر : قد استوى بشر على العراق ... مِنْ غَيْرِ سَيْفٍ وَلَا دَمٍ مِهْرَاقِ
والجواب: أَنَّهُ لا يُقَالُ هذا إلا لمن كان عاجزا عن قهر شيء ثم قهره واستولى عليه، والله سبحانه قاهر ومُسْتَول على كل شيء.
ثم نقل كلام ابن الأعرابي في إبطال تفسير الاستواء بالاستيلاء ثم قال:
ولو كان ما ذكروه صحيحًا لجاز أنْ يُقالَ: إِنَّ الله مُسْتَو على الحشوش والأمكنة التي يرغبُ عَنْ ذِكرِهَا لأَنَّهُ مُسْتَول عليها، ولو كان كذلك لم يكن لذكره للعرش معنى.
وأما الأشعرية فقالوا: إذا قلتم إنَّه على العرش أفضى إلى أنه يكون محدودًا أو أنَّه يفتقر إلى مكان وجهة تحيط به، وتعالى الله عن ذلك.
والجواب: أنا وإن قلنا إنَّهُ على العرش كما أخبر بكتابه وأخبر به نبيه صلى الله عليه وسلم فلا نقول إنَّه محدود، ولا إنَّهُ يفتقر إلى مكان، ولا تحيط به جهة ولا مكان، بل كان ولا مكان ولا زمان ثمَّ خلق المكان والزمان، واستوى على العرش بلا كيفية، ولم يخلق العرش لحاجته إليه، بل كما حكي عن ذي النون المصري لما قيل له: ما أراد الله بخلق العرش؟ فقال: أراد الله أن لا تتية قلوب العارفين ولم يَخْلُقه لحاجته إليه، فإذا قيل للعبد المؤمن أينَ اللهُ؟ قال: عَلَى العرش.
"আমরা এ কিতাবের শুরুতে বলেছি যে, আসহাবুল হাদীস ও আহলুস সুন্নাহ'র নিকট আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং সত্তাগতভাবে, তাঁর সৃষ্টি থেকে আলাদা, 'আরশের উপর উঠেছেন, আসমানসমূহের উপরে, তবে সেটাকে স্পর্শ করে নয়, তাঁর জ্ঞান সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছে।
কাররামিয়‍্যাহ ফেরকার লোকেরা বলে, তিনি 'আরশের স্পর্শে আছেন। মু'তাযিলারা বলে, নিশ্চয় তাঁর সত্তা সর্বত্র, এমনকি ময়লা ও জীবজন্তুর পেটেও।
বিশর আল-মারীসীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি কি তোমার এ গাধার পেটেও? সে বলেছিল, হ্যাঁ। বস্তুত এটি হুলুলী সম্প্রদায়ের মত, এটা স্পষ্ট কুফুরী, যাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর আশ'আরী ফেরকার লোকেরা বলে, তাঁকে 'আরশের উপর কিংবা আসমানের উপর এ গুণে গুণান্বিত করা যাবে না।"
তারপর গ্রন্থকার আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপর রয়েছেন সেটা সাব্যস্ত করার জন্য কুরআনের আয়াত ও রাসূলের হাদীস থেকে অনেক দলীল নিয়ে আসেন। অবশেষে বলেন,
আরও যে কারণে আল্লাহকে উপরে মানতে হবে তা হচ্ছে, মুসলিমগণ তাদের দো'আর সময় চক্ষু উপরে উঠানো, হাতসমূহ উপরের দিকে প্রসারিত করার ব্যাপারে একমত যা প্রমাণ করে যে, আমরা যা বলেছি তা বিশুদ্ধ।
আর তাদেরকে বলা হবে, যদি আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপর না থাকেন, 'আরশের সাথে বিশেষ অর্থে, যেমনটি আসহাবুল হাদীসগণ বলে থাকেন, আর যদি তিনি সব জায়গায় থাকেন, তাহলে তোমরা বল, তিনি যমীনের নিচে আর আসমান যমীনের উপরে, সে হিসেবে তিনি তো নিচের নিচে হয়ে যান। আবার সব জায়গায় থাকার মর্ম অনুসারে তিনি উপরেরও উপরে থাকতে হয়, আর সবকিছু তাঁর নিচে থাকতে হয়, এভাবে তো পরস্পর বিরোধী বিষয়ে পরিণত হয়।
তারপর যদি তারা বলে, "তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোন গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থজন হিসেবে তিনি থাকেন না এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যেও হয় না যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি থাকেন না। তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশি হোক তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন তারা যেখানেই থাকুক না কেন।” [সূরা আল-মুজাদালাহ, আয়াত: ০৭] অনুরূপ "তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন যেখানেই তোমরা থাক না কেন।” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ০৪] এ বাণীসমূহের কী অর্থ?
উত্তর হবে, সূরা মুজাদালার "তিনজনের শলা-পরামর্শের তিনি অবশ্যই তাদের চতুর্থজন হন" [সূরা আল-মুজাদালাহ, আয়াত: ০৭], এর অর্থ আয়ত্ব ও জ্ঞানের মাধ্যমে। অনুরূপভাবে "ছয়জনের মাঝেও তিনি ষষ্ঠজন হন" [সূরা আল-মুজাদালাহ, আয়াত: ০৭] এর অর্থও অনুরূপ। তারপর আল্লাহ বলেছেন, "তবে তিনি তাদের সাথেই আছেন যেখানেই তারা থাকুক না কেন" অর্থাৎ তিনি আয়ত্ব ও ইলমে তাদের সাথে আছেন, সত্তাগতভাবে বা সৃষ্টির ভিতরে প্রবেশের মাধ্যমে নয়।
এ ব্যাখ্যা বিশুদ্ধ হওয়ার প্রমাণ হচ্ছে, আল্লাহর বাণী, "পাঁচ ব্যক্তির মধ্যেও হয় না যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি থাকেন না।" [সূরা আল-মুজাদালাহ, আয়াত: ০৭] এতে আয়াতের শুরু হয়েছে ইলম বা জ্ঞান দিয়ে, আর শেষ হয়েছে, ইলম বা জ্ঞান দিয়ে। সুতরাং বুঝা গেল যে, এ পুরো আয়াতের উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাঁর জ্ঞানের সংবাদ প্রদান করা এবং সকল অবস্থাতেই তিনি সকলকে (জ্ঞান ও কুদরতে) পরিবেষ্টন করে আছেন সেটার সংবাদ প্রদান করা।
আর যদি তারা আল্লাহর বাণী, “আর তিনি এমন সত্তা যিনি আসমানেও মা'বুদ, যমীনেও মা'বুদ" [সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ৮৪] এ আয়াত দিয়ে দলীল গ্রহণ করতে চায় এবং বলে যে, এখানে তো বলা হয়েছে তিনি আসমান ও যমীনের প্রত্যেকটিতে ইলাহ।
তখন জবাব বল, আয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, তিনি আসমানের অধিবাসীদেরও মা'বুদ, আবার তিনি যমীনের অধিবাসীদেরও মা'বুদ। যেমন বলা হয়, "অমুক ইরাকে ভদ্র ও আনুগত্য পাওয়ার অধিকারী, অনুরূপভাবে সে হিজাযেও ভদ্র ও আনুগত্য পাওয়ার অধিকারী” তখন তার অর্থ হয়, সে উভয় স্থানেই আনুগত্য পায়, তার অর্থ এটা নয় যে, তার সত্তা ইরাকে ও হিজাযে অবস্থিত।
তারপর যদি তারা আল্লাহর বাণী, "নিশ্চয় আল্লাহ যারা তাকওয়াবান তাদের সাথে আছেন" [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১২৮], অনুরূপ আল্লাহর বাণী "আমি তোমাদের দু' জনের সাথে আছি, শুনছি ও দেখছি” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ৪৬] আয়াতদ্বয় দিয়ে দলীল দেয়, তখন তার উত্তর হবে, এগুলোতে উদ্দেশ্য হচ্ছে, হিফাযত, দেখা-শোনা, সাহায্য ও সহযোগিতার মাধ্যমে তিনি নেককারদের সাথে, মুহসিনদের সাথে, মূসা ও হারুনের সাথে আছেন। এটাকে কখনও কিয়াস করে বদকার, কাফির লোকদের সাথে, কিংবা কুকুর ও শূকরের সাথে থাকার কথা বলা যায় না, আল্লাহ তাদের এসব কথা থেকে কতই না ঊর্ধ্বে।
আর মু'তাযিলা ও তাদের অনুসারীরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার বাণী "রহমান 'আরশের উপর 'ইস্তাওয়া' করেছেন” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫] এর অপব্যাখ্যা করে বলে, এখানে ইস্তেওয়া বলে 'ইস্তাওলা' তথা অধিকার করা, অধীনস্থ করা বুঝানো হয়েছে। তারা দলীল হিসেবে এক কবির কবিতাকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করে থাকে, সে কবিতাটি হচ্ছে,
قَدِ اسْتَوَى بِشْرٌ عَلَى الْعِرَاقِ ... مِنْ غَيْرِ سَيْفٍ وَلاَ دَمِ مِهْرَاقِ
'বিশর ইরাক অধিকার করেছে, *** কোনো প্রকার তরবারী ও রক্ত প্রবাহিত করা ছাড়াই'
তার উত্তর হচ্ছে, অধিকার করা এটি তখনই বলা হবে যখন কেউ কোনো কিছু অধিকার করতে অক্ষম হওয়ার পর প্রচেষ্টা ব্যয় করার পর সেটাকে দাপট খাটিয়ে অধিকার করে নেয়, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তো পূর্ব থেকেই দাপুটে নামের অধিকারী এবং সবকিছুই তাঁর অধিকারে।"¹
তারপর তিনি ইবনুল আ'রাবীর সে বক্তব্য নিয়ে এসেছেন, যেখানে ইস্তেওয়াকে ইস্তাওলা দ্বারা ব্যাখ্যা করাকে বাতিল হিসেবে গণ্য করেছেন। তারপর বলেন,
"যদিও তারা যা বলে শুদ্ধ হতো তবে এটা বলাও তো শুদ্ধ হতে হয় যে, তিনি (আল্লাহ) ময়লার জায়গা ও অনুরূপ অনাকাঙ্ক্ষিত স্থানের উপরও অধিষ্ঠিত হয়েছেন; কারণ তিনি সেটা অধিকারে রেখেছেন। যদি সেটাই অর্থ হয় তো 'আরশের কথা বর্ণনা করার কোনো মানে থাকে না। আশ'আরীরা বলে, যদি আল্লাহ তা'আলাকে 'আরশের উপর বলা হয়, তবে তাঁকে তো সীমাবদ্ধ করা হয়ে গেল, তাঁর জন্য এমন স্থানের প্রয়োজন দেখা দিল যা তাকে ঘিরে রাখবে, আর আল্লাহ তা থেকে পবিত্র।
এর উত্তর হচ্ছে, আমরা যদিও বলি যে, তিনি 'আরশের উপরে যেমনটি আল্লাহ তাঁর কিতাবে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাদীসে আমাদের জানিয়েছেন, কিন্তু আমরা এর দ্বারা কখনও বলি না যে, তিনি সীমাবদ্ধ, অনুরূপ তাঁর স্থানের প্রয়োজন রয়েছে এটাও আমরা বলি না, আরও বলি না যে, দিক বা স্থান তাঁকে ঘিরে রাখতে পারে, বরং তিনি ছিলেন তখনও যখন কোনো স্থান ছিল না, কাল ছিল না, তারপর তিনি স্থান ও কাল সৃষ্টি করেছেন। আর 'আরশের উপর উঠেছেন কোনো ধরন নির্ধারণ ছাড়াই। তিনি তাঁর প্রয়োজন পূরণের জন্য 'আরশ সৃষ্টি করেননি। বরং যেমনটি যুন-নূন আল-মিসরী থেকে বর্ণিত আছে, তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, আল্লাহ তা'আলা 'আরশ সৃষ্টি দ্বারা কী ইচ্ছা করেছেন? তিনি উত্তরে বললেন, আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছা করলেন যেন তাকে যারা চিনে জানে তাদের অন্তর দিগভ্রান্ত বা হতভম্ব হয়ে হারিয়ে না যায়, আল্লাহ তা'আলা 'আরشকে নিজের প্রয়োজনে সৃষ্টি করেননি। সুতরাং যখন ঈমানদার দাসকে জিজ্ঞেস করা হবে, আল্লাহ কোথায়? সে জবাবে বলবে, 'আরশের উপর।”²
টিকাঃ
১. আল-ইন্তিসার ফির রাদ্দি আলাল মু'তাযিলাতিল কাদারিয়‍্যাতিল আশরার' (২/৬০৭-৬২২)।
২. আল-ইন্তিসার ফির রাদ্দি আলাল মু'তাযিলাতিল কাদারিয়‍্যাতিল আশরার' (২/৬০৭-৬২২)।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 ইমাম আবদুল কাদের জীলানী (৫৬১ হিজরী)

📄 ইমাম আবদুল কাদের জীলানী (৫৬১ হিজরী)


সূফীকুল শিরোমনি, অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব, ইমাম শাইখুল ইসলাম আবু মুহাম্মাদ আবদুল কাদের ইবন আবু সালেহ জীলানী রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন সহীহ আকীদাহ বিশ্বাসের সিপাহসালার। আল্লাহ তা'আলার নাম ও গুণ বিষয়ক তার রয়েছে অনেক বিশুদ্ধ বক্তব্য। তিনি অন্য ইমামদের কথাও বর্ণনা করেছেন। নিচে আমরা কয়েকটি বক্তব্য তুলে ধরছি: • ইমাম আবু মুহাম্মাদ আবদুল কাদের জীলানী আল-হাম্বলী, তার আল-গুনইয়াতু লি ত্বালিবিল হক্ক গ্রন্থে বলেন,
أما معرفة الصانع بالآيات والدلالات على وجه الاختصار فهو أن يعرف ويتيقن أن الله واحد أحد». إلى أن قال: وهو بجهة العلو مستو على العرش، محتو على الملك، محيط علمه بالأشياء، إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالْعَمَلُ الصَّالِحُ يَرْفَعُهُ ، يُدَبِّرُ الْأَمْرَ مِنَ السَّمَاءِ إِلَى الْأَرْضِ ثُمَّ يَعْرُجُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ أَلْفَ سَنَةٍ مِّمَّا تَعُدُّونَ،
وَلا يَجُوزُ وَصْفُهُ بِأَنَّهُ فِي كُلِّ مَكَانٍ، بَلْ يُقَالُ إِنَّهُ فِي السَّمَاءِ عَلَى الْعَرْشِ كَمَا قَالَ الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى، وينبغي إطلاق صفة الاستواء من غير تأويل، وأنه استواء الذات على العرش، وكونه سبحانه وتعالى على العرش مذكور في كل كتاب أنزل على كل نبي أرسل بلا كيف
সংক্ষিপ্তভাবে আয়াত ও প্রমাণসমূহের মাধ্যমে স্রষ্টার মা'রেফত: জানা যায় ও নিশ্চিত হওয়া যায় যে, আল্লাহ এক, একক। অবশেষে তিনি বলেন, তিনি উপরের দিকে রয়েছেন, 'আরশের উপরে সমুন্নত। রাজত্বকে ধারণকারী। তাঁর ইলম সকল কিছুকে বেষ্টনকারী। "তাঁরই পানে উত্থিত হয় ভালো কথা আর নেক আমল তা উন্নীত করে।" "তিনি আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত সকল কার্য পরিচালনা করেন। তারপর তা একদিন তাঁর কাছেই উঠবে। যেদিনের পরিমাণ হবে তোমাদের গণনায় হাজার বছর।"
তাঁর ক্ষেত্রে এই গুণের বর্ণনা দেয়া জায়িয নয় যে, তিনি সর্বত্র বিরাজমান। বরং বলতে হবে, তিনি আসমানের ঊর্ধ্বে 'আরশের উপরে। যেমন, তিনি বলেছেন: পরম করুণাময় 'আরশের উপর উঠেছেন। উচিৎ হচ্ছে উপরে উঠার গুণকে তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা ছাড়াই ব্যবহার করা। তাঁর সত্তা 'আরশের উপরে উঠা, আল্লাহ সুবহাল্লাহু ওয়া তা'আলার 'আরশের উপর থাকার বিষয়টি প্রত্যেক নবী ও রাসূলের কাছে অবতীর্ণ প্রত্যেক কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে ধরন অজানা।¹
অনুরূপভাবে এ কিতাবের অন্যত্র তিনি বলেন, (فصل) في ذكر مقالة السالمية: وهي منسوبة إلى ابن سالم. ومن قولهم: إن الله تعالى في كل مكان، ولا فرق بين العرش وغيره من الأمكنة.
"আস-সালেমিয়্যাহ, এ ফেরকাটি ইবন সালেম নামক ব্যক্তির দিকে সম্পর্কিত। তার বক্তব্যের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, নিশ্চয় আল্লাহ সব জায়গায়, 'আরশ ও অন্য কোনো জায়গার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।”²
(এ কিতাবের অন্যত্র তিনি সেটা খণ্ডণ করে বলেন) "অথচ কুরআনে কারীমে তাদেরকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করা হয়েছে, মহান আল্লাহ বলেন, "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন" [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫] তাই বলা যাবে না, 'তিনি যমীনের উপর উঠেছেন, আরও বলা যাবে না 'তিনি গর্ভস্থ মহিলার পেটে কিংবা পাহাড়ের ভিতর, অনুরূপ জায়গায়।"
তাছাড়া তাঁর দিকে সম্পর্কিত করে যে আল-বাহজাহ গ্রন্থ রয়েছে, আর যা আবদুল ওয়াহহাব আশ-শা'রানী আল-ইউয়াক্বিতু ওয়াল জাওয়াহির গ্রন্থে বর্ণনা করেন, তাতে এসেছে,
اعلموا أن عباداتكم لا تدخل الأرض وإنما تصعد إلى السماء، قال تعالى : إليه يصعد الكلم الطيب والعمل الصالح يرفعه) [فاطر: ۱۰] فربنا سبحانه وتعالى في جهة العلو، الله على العرش استوى وعلى الملك احتوى وعلمه محيط بالأشياء، بدليل سبع آيات في القرآن العظيم في هذا المعنى، لا يمكنني ذكرها لأجل جهل الجاهل ورعونته». انتهى.
"জেনে রাখ, তোমাদের ইবাদাত যমীনে প্রবেশ করে না, বরং তা তো কেবল উপরের দিকে উত্থিত হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন, "তাঁর দিকেই উত্থিত হয় উত্তম বাক্যসমূহ আর সৎ আমল তিনি তা উপরে উঠিয়ে নেন।" [সূরা ফাত্বির, আয়াত: ১০] সুতরাং আমাদের আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা উপরের দিকে, আল্লাহ 'আরশের উপরে উঠেছেন, সকল রাজত্বকে পরিবেষ্টন করেছেন, আর তাঁর জ্ঞান সকল কিছুকে ঘিরে আছে, এ অর্থ কুরআনের সাতটি আয়াত দ্বারা সাব্যস্ত, যা আমি উল্লেখ করতে পারছি না, কোনো মূর্খের মূর্খতা ও আহম্মকির কারণে।"³
টিকাঃ
১. গুনিয়াতুত ত্বালেবীন: (১/৫৪-৫৭); ত্ববাকাতুল হানাবিলাহ: (১/২৯৬); মাজমু'উল ফাতাওয়া (৫/৮৫); যাহাবী, আল-আরশ, (২/৪৭০-৪৭২) অনুবাদ: আব্দুল্লাহ মাহমুদ; আল-'উলু, ১৯৩; ইজতিমা'উল জুয়ুশ, ২৭৭।
২. আবদুল কাদের জীলানী, আল-গুনইয়াতু লি ত্বালিবী ত্বারিকিল হাক্ক (১/১১৮)।
৩. আশ-শা'রানী, আল-ইউয়াক্বীতু ওয়াল জাওয়াহির ফী বায়ানি আক্বীদাতিল আকাবির, পৃ. ৮৯।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 ইমাম রুশদ আল-মালেকী (৫৮০ হিজরী)

📄 ইমাম রুশদ আল-মালেকী (৫৮০ হিজরী)


প্রখ্যাত ফকীহ, কাযী ও দার্শনিক আবুল ওয়ালীদ ইবন রুশদ বলেন,
القول بالجهة: وأما هذهِ الصَّفَةُ فلم يزل أهل الشريعة من أول الأمر يثبتونها الله سبحانه وتعالى، حتَّى نَفَتْها المعتزلة ثم تبعهم على نفيها متأخر و الأشعرية، ... وظواهر الشرع كلها تقتضي إثبات الجهة مثل قوله تعالى: ﴿يُدَبِّرُ الأَمْرَ مِنَ السَّمَاءِ إِلَى الْأَرْضِ ثُمَّ يَعْرُجُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ أَلْفَ سَنَةٍ لِمَا تَعُدُّونَ﴾ [السجدة: 5]، ومثل قوله تعالى: { تَعْرُجُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ إِلَيْهِ ﴾ [المعارج : ٤] ومثل قوله تعالى: ﴿ أَأَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ أَنْ يَخْسِفَ بِكُمُ الْأَرْضَ فَإِذَا هِيَ تمورُ ﴾ [الملك: ١٦]، إلى غير ذلك من الآيات، التي إن سُلّط عليها التأويل عادَ الشَّرِعُ كُلُّهُ مُؤَوَّلًا، وَإِنْ قِيلَ فِيهَا إِنَّهَا من المتشابهات عادَ الشَّرِعُ كُلُّهُ مُتَشَابِها؛ لأنَّ الشرائع كلَّها مَبْنِيَّةٌ على أنَّ اللهَ فِي السَّماءِ، وأنَّ منه تنزل الملائكة بالوحي إلى النبيين، وأنَّ مِنَ السماء نزلت الكتب، وإليها كان الإسراء بالنبي، حتَّى قرب من سدرة المنتهى. وجميع الحكماء قَدِ اتَّفقوا أَنَّ اللَّهَ والملائكة في السَّماءِ، كما اتَّفَقَتْ جميع الشرائع على ذلك».
"আল্লাহর জন্য দিক নির্ধারণ: এ (উপরে থাকার) গুণটি একেবারে শুরু থেকেই শরী'আহবিদরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার জন্য সাব্যস্ত করে আসছেন। অবশেষে মু'তাযিলারা তা অস্বীকার করেছে, তারপর তাদের অনুসরণে পরবর্তী আশ'আরীগণ তা অস্বীকার করেছে। ... শরী'আতের বাহ্যিক সকল দলীল-প্রমাণের দাবি হচ্ছে তাঁর জন্য দিক সাব্যস্ত করা। যেমন আল্লাহর বাণী, "তিনি আসমান থেকে যমীন পর্যন্ত সমুদয় বিষয় পরিচালনা করেন, তারপর সব কিছুই তাঁর সমীপে উত্থিত হবে এমন এক দিনে যার পরিমাণ হবে তোমাদের গণনা অনুসারে হাজার বছর।” [সূরা আস-সাজদাহ, আয়াত: ০৫] অনুরূপ আয়াতসমূহ, "তোমরা কি এ থেকে নির্ভয় হয়েছ যে, যিনি আসমানে রয়েছেন তিনি তোমাদেরকে সহ যমীনকে ধ্বসিয়ে দিবেন, অতঃপর তা হঠাৎ করেই থর থর করে কাঁপতে থাকবে?” [সূরা আল-মুলক, আয়াত: ১৬] তাতে যদি তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যার পথ উন্মুক্ত করা যায় তাহলে পুরো শরী'আতই অপব্যাখ্যার বিষয়ে পরিণত হবে। আর যদি বলা হয়, এগুলো 'মুতাশাবিহাত' অস্পষ্ট আয়াতের অন্তর্ভুক্ত, তাহলে পুরো শরী'আতই মুতাশাবিহ হয়ে যাবে। কারণ, শরী'আতের মূল কথা হচ্ছে আল্লাহ 'আরশের উপরে। তাঁর কাছ থেকেই নবীগণের কাছে ফিরিশতাগণ ওহী নিয়ে আসেন। আসমান থেকেই কিতাবসমূহ নাযিল করা হয়েছে। তাঁর দিকেই নবীর ইসরা ও মি'রাজ হয়েছিল। এমনকি তিনি সিদরাতুল মুন্তাহার নিকটবর্তী হয়েছিলেন। সকল দার্শনিক এ ব্যাপারে একমত যে, আল্লাহ ও তাঁর ফিরিশতাগণ উপরে তাদের অবস্থান। আর এ বিষয়টির ওপর সকল আসমানী শরী'আতও একমত।”¹
এর দ্বারা বুঝা গেল যে, ইবন রুশদ নিজে দর্শনতত্ত্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ে গেলেও তিনি শরী'আতের কিছু জিনিসকে দর্শনের সাথে মিশিয়ে অপব্যাখ্যার আশ্রয় নিতেন না। শরী'আতের দাবি বুঝতেন। তাই তিনি আল্লাহ তা'আলা উপরে হওয়ার বিষয়টি মেনে নিয়েছেন এবং এটিই যে কুরআনের কথা, হাদীসের কথা, সকল শরী'আতের কথা, পূর্ববর্তী সালাফদের আকীদাহ-বিশ্বাস ছিল তা নির্দ্বিধায় তুলে ধরেছেন।
টিকাঃ
১. ইবন রুশদ, আল-কাশফু 'আন মানাহিজিল আদিল্যাহ আন আকায়িদিল মিল্যাহ, পৃ. ১৪৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00