📄 ইমাম ফকীহ আবূ বকর মুহাম্মাদ ইবন মাহমদ ইবন সাওরহ আন-নাইসাপুরী (৪৭৭ হিজরী)
ইমাম ফকীহ আবু বকর মুহাম্মাদ ইবন মাহমূদ ইবন সাওরাহ আত-তামীমী আন-নাইসাপূরী বলেন, لَا أُصَلِّي خَلْفَ مَنْ يُنْكِرُ الصِّفَاتِ، وَلَا خَلْفَ مَنْ يَقُولُ بِقَوْلِ أَهْلِ الْفَسَادِ، وَلَا خَلْفَ مَنْ لَمْ يُثْبِتِ الْقُرْآنَ فِي الْمُصْحَفِ، .... وَلَا يُقِرُّ بِأَنَّ اللَّهَ تَعَالَى فَوْقَ عَرْشِهِ بَائِنٌ مِنْ خَلْقِهِ.
"যারা আল্লাহর সিফাত বা গুণ অস্বীকার করে আমি তাদের পিছনে সালাত আদায় করি না, অনুরূপ তাদের পিছনেও সালাত আদায় করি না যারা ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করে। আর তাদের পিছনেও নয়, যারা কুরআনের কপিতে কুরআন আছে বলে না, ... আর যারা স্বীকার করে না যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর, সৃষ্টিকুলের থেকে পৃথক।”¹
তাছাড়া তার থেকে আরও বর্ণিত আছে তিনি শাইখ আবুল মুযাফফার আস-সাম'আনীকে নাইসাপূরে বলেছিলেন, «إن أردت أن يكون لك درجة الإيمان في الدنيا والآخرة فعليك بمذهب السلف الصالح، وإياك أن تداهن في ثلاث مسائل: مسألة القرآن، ومسألة النبوة، ومسألة استواء الرحمن على العرش».
"যদি তুমি চাও তোমার জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে ঈমানের স্তর হাসিল হোক, তবে তোমার কর্তব্য হবে সালফে সালেহীনের মত গ্রহণ করা। আর সাবধান তিনটি মাসআলাতে কারও কোনো পরোয়া করে কথা বলবে না, কুরআনের মাসআলায় (সৃষ্ট বলবে না), নবুওয়াতের মাসআলায় আর রহমানের 'আরশের উপর উঠার মাসআলায়।”²
টিকাঃ
১. ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ূশ, ১০৬, ১০৭]
২. ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমাউল জুয়ূশ, ১০৭।
📄 ইমামুল হারামাইন আবুল মা‘আলী আল-জুয়াইনী (৪৭৮ হিজরী)
ইমামুল হারামাইন আবুল মা'আলী আল-জুওয়াইনী রাহিমাহুল্লাহ কুল্লাবী-আশ'আরী আকীদাহ প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রে জীবনের বেশিরভাগ শ্রম ব্যয় করেছেন। কিন্তু কখনও কখনও মানুষ নিজের ফিত্বরাতকে অস্বীকার করতে পারে না। তাঁর স্বভাবজাত যে বিশ্বাস দিয়ে আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন সেটার কাছে তার ভুল শিক্ষা পরাজিত হয়ে যায়। এমনি একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন, হাফেয হুজ্জাহ আবদুল কাদের আর-রাহাওয়ী, তিনি বলেন, আমি আবদুর রহীম ইবন আবিল ওয়াফাকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি মুহাম্মাদ ইবন ত্বাহের আল-মাক্বদেসীকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবুল হাসান আল-ক্বাইরোয়ানীকে নিসাপুরে বলতে শুনেছি, যিনি উস্তাদ আবুল মা'আলী আল-জুওয়াইনীর দারসে হাজির হতেন, তিনি তার কাছে কালামশাস্ত্র পড়তেন, তিনি বলেন, 'আবুল মা'আলী বলেছেন, 'হে আমার সাথীরা (ছাত্ররা), তোমরা কালামশাস্ত্র নিয়ে রত হয়ো না, যদি আমি জানতাম যে, কালামশাস্ত্র আমাকে যে পর্যায়ের সমস্যায় নিপতিত করেছে, তাতে নিপতিত করবে, তাহলে অবশ্যই আমি তা শিক্ষায় রত হতাম না।'
ইমাম আবুল ফাতহ মুহাম্মাদ ইবন আলী আল-ফকীহ বলেন, আমরা ইমাম আবুল মা'আলীর মৃত্যুর সময় তাকে দেখতে প্রবেশ করলাম, তিনি বসে পড়লেন এবং আমাদের বললেন, "আমি তোমাদেরকে সাক্ষ্য বানাচ্ছি যে, আমি আমার প্রত্যেক কথা থেকে প্রত্যাবর্তন করছি যা আমি সালাফে সালেহীনের মতের বাইরে প্রদান করেছি। আমি নাইসাপুরের বৃদ্ধারা যার ওপর মারা যায় আমি তার ওপর মারা যাচ্ছি।"¹
ইবন তাইমিয়্যাহ ও যাহাবী রাহিমাহুমাল্লাহ এর ওপর মন্তব্য করে বলেন, কারণ বৃদ্ধাদের ফিতরী বা স্বভাবজাত আকীদাহ কালামশাস্ত্রের এসব কুফুরী ও শির্কী আকীদাহ গ্রহণের চেয়ে অনেক ভালো।²
তার একটি ঘটনা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ, যা ইমাম ইয়াহইয়া ইবন আবি মানসূর আল-ফক্বীহ তার কিতাবে বর্ণনা করেছেন, তিনি হাফেয আবদুল কাদের থেকে, তিনি বলেন, আমাদেরকে আবুল 'আলা আল-হামাযানী (মৃত ৫৩১) বলেন, তিনি বলেন, আবু জা'ফার আল-হাফেয বলেন, আমি শুনছিলাম যে আবুল মা'আলীকে ﴾ الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন” এটা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, 'আল্লাহ ছিলেন, কোনো 'আরশ ছিল না', তারপর বাকী উত্তর দিতে গিয়ে বারবার আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছিলেন, তখন আমি তাকে বললাম, যা আবশ্যকীয়ভাবে এসে যায় তা প্রতিরোধ করার আপনার কাছে কি কোনো উপায় আছে? তিনি তখন বললেন, তুমি কোন দিকে ইঙ্গিত করছ? আমি বললাম, যখনই আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞানী কোনো লোক, হে রব! বলে, তখনই তার জিহ্বা নড়াচড়া করার আগেই তার অভ্যন্তরভাগ থেকে একটি ইচ্ছা ডান-বাম না তাকিয়ে সোজা উপরের দিকে চলে যায়, আপনার কাছে কি এ আবশ্যক জিনিসটি প্রতিরোধ করার কোনো উপায় আছে? তাহলে আমাদেরকে তা জানান, এর মাধ্যমে আমরা উপর-নিচ এর ঝামেলা থেকে মুক্ত হতে পারি? আমি কেঁদে দিলাম, উপস্থিত সবাই কেঁদে দিল। তখন তিনি তাঁর হাতের আস্তিন বিচানার উপর মারলেন এবং পেরেশান হওয়ার মতো চীৎকার করলেন, কাপড় ছিঁড়ে ফেললেন, মসজিদে যেন কিয়ামত সংঘটিত হয়ে গেল, তিনি তার বিচানা থেকে নামলেন এবং বললেন, বন্ধু, আমি হয়রান ও পেরেশান হয়ে গেছি আমার ওপর ভীতি কাজ করছে।³
টিকাঃ
১. মুখতাসারুল 'উলু, ২৭৫।
২. দেখুন: বায়ানু তালবীসুল জাহমিয়্যাহ (১/১২২); আল-'উলু, ১৩৪৫।
৩. যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৮/৪৭৭)।
📄 ইমাম ইসমা‘ঈল আল-আনসারী (৪৮১ হিজরী)
সূফীকুল শিরোমনি, শাইখুল ইসলাম আবু ইসমা'ঈল আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ আনসারী স্বীয় গ্রন্থ আল-ফারূক ফিস-সিফাতে বলেন-
باب إثبات استواء الله على عرشه فوق السماء السابعة، بائناً من خلقه، من الكتاب والسنة. في أخبار شتى أن الله عز وجل في السماء السابعة على العرش بنفسه، وهو ينظر كيف تعملون، علمه، وقدرته، واستماعه، ونظره، ورحمته في كل مكان.
কিতাব ও সুন্নাহ থেকে আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক সপ্তম আসমানের ঊর্ধ্বে 'আরশের উপরে উঠার বিষয়টি সাব্যস্তকরণ এবং তিনি তাঁর সৃষ্টিকুল থেকে পৃথক ও আলাদা হওয়া -সংক্রান্ত অধ্যায়। তারপর তিনি কুরআন ও সুন্নাহ থেকে দলীলাদি উল্লেখ করে বলেন, বিভিন্ন হাদীসে রয়েছে আল্লাহ সত্তাগতভাবে সপ্তম আসমানের ঊর্ধ্বে 'আরশের উপরে। তিনি দেখেন তোমরা কীভাবে আমল করছো। তাঁর ইলম, তাঁর ক্ষমতা, তাঁর শ্রবণ, তাঁর দৃষ্টি এবং তাঁর রহমত সর্বত্র।¹ তাছাড়া তিনি আরও বলেন,
إِلهُنَا مَرْنِي عَلى العَرْشِ مُسْتَو ... كَلَامُهُ أَزَلِيٌّ رَسُولُهُ عَرَبِيٌّ مَذْهَبُنَا مَذْهَبٌ حَنْيَلِي ... كُلُّ مَنْ قَالَ غَيْرَ هَذَا أَشْعَرِيٌّ
"আমাদের ইলাহ, তাকে দেখা যাবে, তিনি 'আরশের উপর সমুন্নত আছেন, তাঁর বাণী সর্বপ্রাচীন, তাঁর রাসূল আরবী ভাষাভাষী। যারাই এটার বিপরীত বলবে তারা আশ'আরী, আমাদের মাযহাব হচ্ছে হাম্বলী তথা ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বলের মাযহাব।”²
টিকাঃ
১. যাহাবী, আল-আরش, (২/৪৬৫-৪৬৬) অনুবাদ: আব্দুল্লাহ মাহমূদ; যাহাবী, আল-'উলু, ১৮৯।
২. আয-যাইলু আলা ত্বাবাক্বাতিল হানাবিলাহ (১/১২১)।
📄 ইমাম আবূ বকর মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আল-কাইরোয়ানী (৪৮৯ হিজরী)
ইমাম আবু বকর মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আল-হাদ্বরামী আল-ক্বাইরোয়ানী তার 'আল-ঈমা ইলা মাসআলাতিল ইস্তেওয়া' গ্রন্থে ইমাম ত্বাবারী, ইবন আবী যাইদ আল-ক্বাইরোয়ানী, ক্বাযী আবদুল ওয়াহহাব প্রমুখের সেসব বক্তব্য নিয়ে এসেছেন যাতে এসেছে যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপরে উঠেছেন এবং তিনি সেখানে সত্তাগতভাবে বিদ্যমান। তারপর তিনি বলেন,
وأطلقوا في بعض الأماكن أَنَّهُ فَوْقَ عرشه. ثمَّ قَالَ: وهذا هُوَ الصَّحِيحُ الَّذِي أَقولُ بِهِ مِنْ غيرِ تحديدٍ، وَلَا تَكُن فِي مكان، ولا كون فيه ولا مماسة».
"আর এসব মনীষী কোনো কোনো জায়গায় নিঃশর্তভাবে বলেছেন যে, আল্লাহ 'আরশের উপর। তারপর তিনি বলেন, আর এটিই বিশুদ্ধ মত, যা আমি বলি, কোনো প্রকার সীমা নির্ধারণ ব্যতীতই, কোনো স্থানে ঝেঁকে থাকা ব্যতীতই, অভ্যন্তরে থাকা ছাড়াই, কোনো প্রকার স্পর্শ ছাড়াই”।¹
ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ এ ভাষ্য বর্ণনা করার পর বলেন, (সীমা, বেঁকে থাকা, স্পর্শ) এসব জিনিস নাই বলা কিংবা সাব্যস্ত করা দলীল নির্ভর। যদি কোনো কিছু আসত তো আমরা সেটা উচ্চারণ করতাম, যেহেতু আসেনি আমাদের উচিত এ ব্যাপারে চুপ থাকা। এসব কথা বলা থেকে বিরত থাকাই হচ্ছে সালাফে সালেহীনের আদর্শ। কারণ, এগুলোতে প্রবৃত্ত হওয়া মানেই হচ্ছে ধরণ নির্ধারণে লেগে যাওয়া; যা অজানা। অনুরূপ আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই কুরআন, সুন্নাহ বা আছার ব্যতীত তাঁর 'আরশের উপর উঠাকে স্পর্শ, বেঁকে থাকা সাব্যস্ত করা থেকে। বরং আমরা মোটের উপর এটাই জানি যে, তিনি তাঁর 'আরশের উপরে আছেন যেমনটি কুরআন ও হাদীসের ভাষ্য দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে।²
আল্লামা ইবন উসাইমীন বলেন, কোনো কোনো লোককে দেখা যায় এটা বলতে যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর উঠেছেন কোনো প্রকার স্পর্শ ছাড়া!! আমরা বলবো, স্পর্শ ছাড়া কিংবা স্পর্শ সহকারে এ দু'য়ের কোনোটিই বলার অধিকার তোমার নেই। এটা ছাড়, যা সাহাবীগণ ইলমের প্রতি অত্যন্ত আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও, আল্লাহর প্রতি অধিক সম্মান থাকার পরও তারা এগুলো বলা ছেড়ে দিয়েছেন, তাই 'স্পর্শ সহকারে কিংবা স্পর্শ ব্যতীত' এসব বাক্য বাদ দেয়া কর্তব্য।³
টিকাঃ
১. মুখতাসারুল 'উলু, পৃ. ২৭৯।
২. যাহাবী, আল-'উলু, ২৭৯।
৩. শারহুস সাফারীনীয়্যাহ।