📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 হাফিয আবূ বকর ইবন হুসাইন আল-বাইহাকী (৪৫৮ হিজরী)

📄 হাফিয আবূ বকর ইবন হুসাইন আল-বাইহাকী (৪৫৮ হিজরী)


আস-সুনানুল কাবীর ও অন্যান্য গ্রন্থকার ইমাম আবু বকর ইবন হুসাইন আল-বাইহাক্বী রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহর গুণাবলির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো মানহাজের ওপর ছিলেন না।
যেসব স্থানে তিনি সালাফদের মতের উপর ছিলেন: কখনও কখনও তিনি সালফে সালেহীনের মানহাজের উপর চলেছেন। যেমন, * তিনি আল্লাহর গুণাবলিকে দু'ভাগে ভাগ করেছেন। ১) যাতিয়্যা বা সত্তাগত গুণ ও ২) ফি'লিয়্যাহ বা কর্মগত গুণ। তারপর প্রত্যেকটিকে দু'ভাগে ভাগ করেছেন।
সুতরাং সত্তাগত গুণকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন: ১) যাতিয়্যাহ আকলিয়্যাহ, বা বিবেকগ্রাহ্য সত্তাগত গুণ যেমন জীবন, জ্ঞান, ক্ষমতা, ইচ্ছা, শোনা, দেখা, কথা বলা ইত্যাদি, ২) যাতিয়্যাহ খবরিয়‍্যাহ, বা সংবাদ (কুরআন ও সুন্নাহ) এর মাধ্যমে প্রাপ্ত সত্তাগত গুণ, যেমন চেহারা, দু' হাত, চোখ গুণ।
আবার কর্মগত গুণকে দু'ভাগে ভাগ করেছেন, ১) ফি'লিয়্যাহ আকলিয়্যাহ বা বিবেকগ্রাহ্য কর্মগত গুণ যেমন সৃষ্টি করা, রিযিক দেয়া, জীবিত করা, মৃত্যু দেয়া, ক্ষমা করা, শাস্তি প্রদান করা ইত্যাদি, ২) ফি'লিয়্যাহ খবরিয়‍্যাহ বা সংবাদ (কুরআন ও সুন্নাহ) এর মাধ্যমে প্রাপ্ত কর্মগত গুণ, যেমন ইস্তেওয়া 'আলাল 'আরশ, আগমন করা, আসা, অবতীর্ণ হওয়া ইত্যাদি।¹ বস্তুত সিফাতের এ ভাগটিতে তিনি সালাফে সালেহীনের পূর্ণ অনুসরণ করেছেন। * তিনি যাবতীয় যাতিয়্যাহ 'আকলিয়্যাহ গুণ ও ফিলিয়্যাহ 'আকলিয়‍্যাহ সাব্যস্ত করেছেন। এ সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে তিনি কুরআন ও হাদীস দিয়েই সেগুলোকে সাব্যস্ত করেছেন। শুধু বিবেকের ওপর নির্ভর করেননি। বস্তুত এখানেও তিনি সালাফে সালেহীনের নীতির পূর্ণ অনুসরণ করেছেন।
যেসব স্থানে তিনি সালাফে সালেহীনের মানহাজে থাকতে পারেননি: উপরে বর্ণিত দু'টি স্থান ব্যতীত অন্য কোথাও তিনি সালাফে সালেহীনের পথে চলতে পারেননি। আল্লাহর সিফাতের বাকী দু'টি স্থান অর্থাৎ যাতিয়্যাহ খবরিয়‍্যাহ ও ফি'লিয়‍্যাহ খবরিয়‍্যার ক্ষেত্রে তিনি সালাফে সালেহীনের সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। * তন্মধ্যে যাতিয়‍্যাহ খবরিয়‍্যাহ'র ক্ষেত্রে তিনি কোনো নির্দিষ্ট নিয়মে চলতে পারেননি। সেজন্য দেখবেন তিনি দু'হাত, চেহারা, চক্ষু গুণসমূহ যথার্থভাবে সাব্যস্ত করেছেন। কিন্তু বাকী সত্তাগত কুরআন ও হাদীস থেকে প্রাপ্ত গুণ যেমন, আঙ্গুল, ডান হাত সাব্যস্ত না করে সেগুলোর জন্য দু'টি পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন। এ গুণাবলিতে তিনি তা'ওয়ীল নামের দূরবর্তী অর্থের আশ্রয় নিয়েছেন।
* আর ফি'লিয়্যাহ খবরিয়‍্যাহ তথা আল্লাহর 'আরশের উপর উঠা, হাশরের মাঠে আসা, শেষ রাত্রিতে নিকটতম আসমানে নেমে আসা ইত্যাদি গুণগুলোর ক্ষেত্রে তিনি তাফওয়ীদ্ব নীতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। সুতরাং তার মতে এগুলোর অর্থ করা যাবে না। তিনি মনে করতেন এটিই বুঝি সালাফদের মত। সালাফদের মত যে অর্থ সাব্যস্ত করা, ধরন নির্ধারণ না করা, এটা তাঁর কাছে স্পষ্ট ছিল না।
আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তাঁর 'আরশের উপর উঠার ব্যাপারে বাইহাক্বীর মত: 'ইস্তেওয়া আলাল 'আরশ' এর ব্যাপারে বাইহাক্বী রাহিমাহুল্লাহ 'তাফওয়ীদ্ব' নামক অজ্ঞতার নীতি অবলম্বন করলেও আমরা দেখি যে, তিনি এ ব্যাপারে প্রচণ্ড অস্পষ্টতার মধ্যেও ছিলেন। এর মূল কারণ হচ্ছে, তিনি তাঁর সমকালীন কালামপন্থী উস্তাদদের দ্বারা বেশি প্রভাবিত ছিলেন, তারপরও তিনি সালাফদের কথা বর্ণনা করতেন। কিন্তু সেগুলো গ্রহণ করতেন না। গ্রহণ না করলেও তিনি সেগুলোর অর্থ সালাফ যা করেছেন সেটা বর্ণনা করতেন। আর তিনি জাহমিয়‍্যাদের আকীদাহ 'আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান' এটাকে সম্পূর্ণভাবে খণ্ডন করেছেন। কিন্তু তিনি যেহেতু আশ'আরী উস্তাদ ইবন ফুওরাক এর কালামশাস্ত্র দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন আর তৎকালীন কালামশাস্ত্রীয় আলেমগণের শিক্ষার প্রভাবে সালাফে সালেহীনের পদ্ধতি তার কাছে স্পষ্ট হতে পারেনি। ফলে তিনি স্পষ্টভাবে আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠার গুণটি গ্রহণ করেননি। তবে তিনি তাঁর দু'টি কিতাব, আল-আসমা ওয়াস সিফাত ও আল-ই'তিক্বাদ উভয়টিতেই সালাফে সালেহীন যে 'ইস্তেওয়া' শব্দের অর্থ করতেন তা বর্ণনা করেছেন। আর কথায় বলে, বিপক্ষের মুখ দিয়ে যে সত্য বের হয়ে পড়ে তা রুখার শক্তি নেই। তাই আমরা এখানে 'ইস্তেওয়া আলাল 'আরশ' এর ব্যাপারে তার বক্তব্য উপস্থাপন করবো: তিনি তার 'আল-ই'তিকাদ' গ্রন্থে বলেন,
بَابُ الْقَوْلِ فِي الاسْتِوَاءِ قَالَ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى: ﴿الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى﴾ [طه: ٥] ، وَالْعَرْشُ هُوَ السَّرِيرُ الْمَشْهُورُ فِيمَا بَيْنَ الْعُقَلَاءِ، قَالَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ: ﴿وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ﴾ [هود: ٧] ، وَقَالَ: ﴿وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ﴾ [التوبة: ١٢٩]، وَقَالَ: ﴿ذُو الْعَرْشِ الْمَجِيدُ﴾ [البروج: ١٥] , وَقَالَ: ﴿وَتَرَى الْمَلَائِكَةَ حَافِّينَ مِنْ حَوْلِ الْعَرْشِ﴾ [الزمر: ٧٥] , وَقَالَ: ﴿الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ﴾ [غافر : ٧] الْآيَةَ، وَقَالَ: ﴿وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَئِذٍ ثَمَانِيَةٌ﴾ [الحاقة : ١٧] , وَقَالَ: ﴿إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ﴾ [الأعراف: ٥٤] , وَقَالَ: ﴿اللَّهُ الَّذِي رَفَعَ السَّمَاوَاتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ﴾ [الرعد: ٢] , وَقَالَ: ﴿ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ﴾ [الأعراف: ٥٤] , وَقَالَ: ﴿وَهُوَ الْقَاهِرُ فَوْقَ عِبَادِهِ﴾ [الأنعام: ١٨] , وَقَالَ: ﴿يَخَافُونَ رَبَّهُمْ مِنْ فَوْقِهِمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ﴾ [النحل: ٥٠] , وَقَالَ: ﴿إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ﴾ [فاطر: ١٠] , إِلَى سَائِرِ مَا وَرَدَ فِي هَذَا الْمُعْنَى , وَقَالَ: ﴿أَأَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ﴾ [الملك: ١٦] , وَأَرَادَ مَنْ فَوْقَ السَّمَاءِ، كَمَا قَالَ: ﴿وَلَأُصَلِّبَنَّكُمْ فِي جُذُوعِ النَّخْلِ﴾ [طه: ٧١] , يَعْنِي عَلَى جُذُوعِ النَّخْلِ، وَقَالَ: ﴿فَسِيحُوا فِي الْأَرْضِ) [التوبة: ٢] , يَعْنِي عَلَى الْأَرْضِ، وَكُلُّ مَا عَلَا فَهُوَ سَمَاءُ , وَالْعَرْشُ أَعْلَى السَّمَاوَاتِ، فَمَعْنَى الْآيَةِ وَاللَّهُ أَعْلَمُ : أَأَمِنْتُمْ مَنْ عَلَى الْعَرْشِ، كَمَا صَرَّحَ بِهِ فِي سَائِرِ الْآيَاتِ.
"অধ্যায়, আল্লাহ তা'আলার 'ইস্তেওয়া' সংক্রান্ত আলোচনা। মহান আল্লাহ বলেন, "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন। [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫] আর 'আরশ হচ্ছে, খাট, এ অর্থটি বিবেকবানদের কাছে বিখ্যাত। মহান আল্লাহ বলেন, "আর তিনি মহা 'আরশের রব” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১২৯], আরও বলেন, "তিনি 'আরশের মালিক মহা সম্মানিত” [সূরা আল-বুরূজ, আয়াত: ১৫], আরও বলেন, "আপনি দেখতে পাবেন ফিরিশতাদেরকে তারা ঘিরে আছে 'আরশের চারপাশ থেকে" [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৭৫], আরও বলেন, "যারা 'আরশ বহন করে এবং যারা 'আরশের চারপাশে রয়েছে তারা সবাই তাদের রবের সপ্রশংসা তাসবীহ পাঠ করে" [সূরা গাফির, আয়াত: ০৭], আরও বলেন, "আর সেদিন আপনার রবের 'আরশ বহন করে তাদের উপর আটজন" [সূরা আল-হাক্কাহ, আয়াত: ১৭] আরও বলেন, "নিশ্চয় তোমাদের রব তো আল্লাহ, যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে, তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন” [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৫৪] আরও বলেন, “আল্লাহ, তিনি তো সে সত্তা যিনি উপরে উঠিয়েছেন আসমানসমূহকে কোনো খুঁটি ব্যতীত যা তোমরা দেখতে পাও, তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন” [সূরা আর-রা'দ, আয়াত: ০২] আরও বলেন, "তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন” [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৫৪] আরও বলেন, "তিনি তাঁর বান্দাদের উপরে থাকা দাপুটে রব” [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ১৮] আরও বলেন, "তারা (ফিরিশতারা) তাদের রব্বকে উপর থেকে ভয় করে, আর তাদেরকে যা আদেশ করা হয় তা তারা প্রতিপালন করে” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৫০] আরও বলেন, "উত্তম বাক্যসমূহ তাঁর দিকেই উত্থিত হয়।” [সূরা ফাত্বির, আয়াত: ১০]
অনুরূপ এ অর্থে যেসব বর্ণনা এসেছে, আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন, "যিনি আসমানের উপরে আছেন, তাঁর ব্যাপারে কি তোমরা ভয়হীন হয়ে গেছো?” [সূরা আল-মুলক, আয়াত: ১৬] এখানে 'ফিস সামায়ি' বলে উদ্দেশ্য, আসমানের ভিতরে নয়, বরং আসমানের উপরে। যেমনটি আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র বলেছেন, (ফির'আউন বলেছিল) "অবশ্যই আমি তোমাদেরকে খেজুর গাছের কাণ্ডে শূলিতে চড়াব” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ৭১] অর্থাৎ খেজুর গাছের কাণ্ডের উপর। অন্যত্র আরও বলেন, "সুতরাং তোমরা যমীনে পরিভ্রমণ কর" অর্থাৎ যমীনের উপর; কারণ, যা তোমার উপরে থাকবে তা-ই আসমান। আর 'আরশ হচ্ছে সকল আসমানের উঁচু। সুতরাং আয়াতের অর্থ, আল্লাহই ভালো জানেন, তোমরা কি নির্ভয় হয়ে গেছো তাঁর থেকে, যিনি 'আরশের উপর রয়েছেন? যেমনটি অপর সকল আয়াতে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।”²
অনুরূপভাবে তিনি 'ইস্তেওয়া' শব্দটির অর্থ সালাফে সালেহীন যা করেছেন, তা উল্লেখ করেছেন, যেমন তিনি বলেন, وَذَهَبَ أَبُو الْحَسَنِ عَلِيُّ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ مَهْدِيُّ الطَّبَرِيُّ فِي آخَرِينَ مِنْ أَهْلِ النَّظَرِ إِلَى أَنَّ اللَّهَ تَعَالَى فِي السَّمَاءِ فَوْقَ كُلِّ شَيْءٍ مُسْتَوِ عَلَى عَرْشِهِ بِمَعْنَى أَنَّهُ عَالٍ عَلَيْهِ، وَمَعْنَى الِاسْتِوَاءِ: الاعْتِلَاءُ، كَمَا يَقُولُ: اسْتَوَيْتُ عَلَى ظَهْرِ الدَّابَّةِ، وَاسْتَوَيْتُ عَلَى السَّطْحِ بِمَعْنَى عَلَوْتُهُ، وَاسْتَوَتِ الشَّمْسُ عَلَى رَأْسِي، وَاسْتَوَى الطَّيْرُ عَلَى قِمَّةِ رَأْسِي، بِمَعْنَى عَلَا فِي الْجُو، فَوُجِدَ فَوْقَ رَأْسِي.
"আবুল হাসান আলী ইবন মুহাম্মাদ ইবন মাহদী আত-ত্বাবারী অন্যান্য চিন্তাবিদদের সাথে এ মত পোষণ করেন যে, আল্লাহ তা'আলা আসমানের উপরে, সবকিছুর উপরে, তাঁর 'আরশের উপরে ইস্তেওয়া করেছেন, অর্থাৎ সেটার উপরে উঠেছেন। আর ইস্তেওয়া এর অর্থ হচ্ছে, উপরে উঠা। যেমন তুমি বল, 'ইস্তাওয়াইতু 'আলা যাহরিদ দাব্বাতি' (আমি বাহনের পিঠে উঠলাম) আরও বল, 'ইস্তাওয়াইতু আলাস সাত্বহি' এর অর্থ, (ছাদ) এর উপরে উঠলাম। আরও বল, সূর্য আমার মাথার উপর ইস্তেওয়া করেছে, পাখি আমার মাথার ঠিক উপরে ইস্তেওয়া করেছে, অর্থাৎ আকাশের খালি স্থানের উপরে উঠেছে, ফলে সেটা আমার মাথার উপর পাওয়া গেল।”³
তিনি আরও বর্ণনা করেন, وَقَدْ قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا: ثُمَّ اسْتَوَى صَعَدَ»
"ইবন 'আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা বলেন, 'সুম্মাস্তাওয়া' এর অর্থ, উপরে উঠলেন।”⁴
তিনি আরও বর্ণনা করেন,
وَيُذْكَرُ عَنْ أَبِي الْعَالِيَةِ فِي هَذِهِ الْآيَةِ أَنَّهُ قَالَ: « اسْتَوَى يَعْنِي: ارْتَفَعَ ».
"বর্ণিত আছে যে, আবুল আলীয়া রাহিমাহুল্লাহ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলতেন, 'ইস্তাওয়া' এর অর্থ উপরে উঠা।"⁵
আরও বলেন, عَنْ أَبِي صَالِحٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا فِي قَوْلِهِ: ﴿ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ﴾ [الأعراف: ٥٤] يَقُولُ: اسْتَقَرَّ عَلَى الْعَرْشِ.
"আবু সালেহ রাহিমাহুল্লাহ ইবন 'আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে 'সুম্মাস্তাওয়া আলাল 'আরশ' [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৫৪] এ ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেন, বলেন, তিনি 'আরশের উপর অবস্থান করলেন”।⁶
যদিও বাইহাক্বী রাহিমাহুল্লাহ এসব বর্ণনাকে গ্রহণ করেননি। এ ব্যাপারে বিভিন্ন অজুহাত তিনি পেশ করেছেন। বরং অপরাপর অর্থ যা বর্ণিত হয়েছে সেটাই গ্রহণ করেছেন। কিন্তু এসব কিন্তু প্রমাণ করে যে, সালাফে সালেহীন তাফওয়ীদ্ব (অর্থ না জানার নীতি অবলম্বন) করতেন না। তাফওয়ীদ্ব করলে তারা অর্থ বর্ণনা করতেন না।
অবশ্য মাঝে মধ্যে তার বক্তব্য থেকে বুঝা যায়, তিনি আল্লাহর জন্য 'আরশের উপর উঠা' এ গুণটি সাব্যস্ত না করলেও, আল্লাহ তা'আলা যে 'আরশের উপর রয়েছেন, সেটা সাব্যস্ত করেছেন, যেমন তিনি তার সর্বশেষ গ্রন্থ ই'তিক্বাদ এ বলেন,
بَابُ الْقَوْلِ فِي الاسْتِوَاءِ قَالَ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى: ﴿الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى﴾ [طه: ٥] ، وَالْعَرْشُ هُوَ السَّرِيرُ الْمَشْهُورُ فِيمَا بَيْنَ الْعُقَلَاءِ، قَالَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ: ﴿وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ﴾ [هود: ٧] ، وَقَالَ: ﴿وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ﴾ [التوبة: ١٢٩]، وَقَالَ: ﴿ذُو الْعَرْشِ الْمَجِيدُ﴾ [البروج: ١٥] , وَقَالَ: ﴿وَتَرَى الْمَلَائِكَةَ حَافِّينَ مِنْ حَوْلِ الْعَرْشِ﴾ [الزمر: ٧٥] , وَقَالَ: ﴿الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ﴾ [غافر : ٧] الْآيَةَ، وَقَالَ: ﴿وَيَحْمِلُ عَرْشَ رَبِّكَ فَوْقَهُمْ يَوْمَئِذٍ ثَمَانِيَةٌ﴾ [الحاقة : ١٧] , وَقَالَ: ﴿إِنَّ رَبَّكُمُ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ﴾ [الأعراف: ٥٤] , وَقَالَ: ﴿اللَّهُ الَّذِي رَفَعَ السَّمَاوَاتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ﴾ [الرعد: ٢] , وَقَالَ: ﴿ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ﴾ [الأعراف: ٥٤] , وَقَالَ: ﴿وَهُوَ الْقَاهِرُ فَوْقَ عِبَادِهِ﴾ [الأنعام: ١٨] , وَقَالَ: ﴿يَخَافُونَ رَبَّهُمْ مِنْ فَوْقِهِمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ﴾ [النحل: ٥٠] , وَقَالَ: ﴿إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ﴾ [فاطر: ١٠] , إِلَى سَائِرِ مَا وَرَدَ فِي هَذَا الْمُعْنَى , وَقَالَ: ﴿أَأَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ﴾ [الملك: ١٦] , وَأَرَادَ مَنْ فَوْقَ السَّمَاءِ، كَمَا قَالَ: ﴿وَلَأُصَلِّبَنَّكُمْ فِي جُذُوعِ النَّخْلِ﴾ [طه: ٧١] , يَعْنِي عَلَى جُذُوعِ النَّخْلِ، وَقَالَ: ﴿فَسِيحُوا فِي الْأَرْضِ) [التوبة: ٢] , يَعْنِي عَلَى الْأَرْضِ، وَكُلُّ مَا عَلَا فَهُوَ سَمَاءُ , وَالْعَرْشُ أَعْلَى السَّمَاوَاتِ، فَمَعْنَى الْآيَةِ وَاللَّهُ أَعْلَمُ : أَأَمِنْتُمْ مَنْ عَلَى الْعَرْشِ، كَمَا صَرَّحَ بِهِ فِي سَائِرِ الْآيَاتِ.
"অধ্যায়, আল্লাহ তা'আলার 'ইস্তেওয়া' সংক্রান্ত আলোচনা। মহান আল্লাহ বলেন, "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন। [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫] আর 'আরশ হচ্ছে, খাট, এ অর্থটি বিবেকবানদের কাছে বিখ্যাত। মহান আল্লাহ বলেন, "আর তিনি মহা 'আরশের রব” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ১২৯], আরও বলেন, "তিনি 'আরশের মালিক মহা সম্মানিত” [সূরা আল-বুরূজ, আয়াত: ১৫], আরও বলেন, "আপনি দেখতে পাবেন ফিরিশতাদেরকে তারা ঘিরে আছে 'আরশের চারপাশ থেকে" [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৭৫], আরও বলেন, "যারা 'আরশ বহন করে এবং যারা 'আরশের চারপাশে রয়েছে তারা সবাই তাদের রবের সপ্রশংসা তাসবীহ পাঠ করে" [সূরা গাফির, আয়াত: ০৭], আরও বলেন, "আর সেদিন আপনার রবের 'আরশ বহন করে তাদের উপর আটজন" [সূরা আল-হাক্কাহ, আয়াত: ১৭] আরও বলেন, "নিশ্চয় তোমাদের রব তো আল্লাহ, যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে, তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন” [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৫৪] আরও বলেন, “আল্লাহ, তিনি তো সে সত্তা যিনি উপরে উঠিয়েছেন আসমানসমূহকে কোনো খুঁটি ব্যতীত যা তোমরা দেখতে পাও, তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন” [সূরা আর-রা'দ, আয়াত: ০২] আরও বলেন, "তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন” [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৫৪] আরও বলেন, "তিনি তাঁর বান্দাদের উপরে থাকা দাপুটে রব” [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ১৮] আরও বলেন, "তারা (ফিরিশতারা) তাদের রব্বকে উপর থেকে ভয় করে, আর তাদেরকে যা আদেশ করা হয় তা তারা প্রতিপালন করে” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৫০] আরও বলেন, "উত্তম বাক্যসমূহ তাঁর দিকেই উত্থিত হয়।” [সূরা ফাত্বির, আয়াত: ১০]
অনুরূপ এ অর্থে যেসব বর্ণনা এসেছে, আল্লাহ তা'আলা আরও বলেন, "যিনি আসমানের উপরে আছেন, তাঁর ব্যাপারে কি তোমরা ভয়হীন হয়ে গেছো?” [সূরা আল-মুলক, আয়াত: ১৬] এখানে 'ফিস সামায়ি' বলে উদ্দেশ্য, আসমানের ভিতরে নয়, বরং আসমানের উপরে। যেমনটি আল্লাহ তা'আলা অন্যত্র বলেছেন, (ফির'আউন বলেছিল) "অবশ্যই আমি তোমাদেরকে খেজুর গাছের কাণ্ডে শূলিতে চড়াব” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ৭১] অর্থাৎ খেজুর গাছের কাণ্ডের উপর। অন্যত্র আরও বলেন, "সুতরাং তোমরা যমীনে পরিভ্রমণ কর" অর্থাৎ যমীনের উপর; কারণ, যা তোমার উপরে থাকবে তা-ই আসমান। আর 'আরশ হচ্ছে সকল আসমানের উঁচু। সুতরাং আয়াতের অর্থ, আল্লাহই ভালো জানেন, তোমরা কি নির্ভয় হয়ে গেছো তাঁর থেকে, যিনি 'আরশের উপর রয়েছেন? যেমনটি অপর সকল আয়াতে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।”⁷
টিকাঃ
১. আল-আসমা ওয়াস সিফাত, পৃ. ১১০।
২. আল-ই'তিক্বাদ, পৃ. ১১২-১১৪; অনুরূপ দেখুন, যাহাবী, আল-'উলু, পৃ. ১৮৪-১৮৫; আল-'আরশ (২/৪৫২-৪৫৪) অনুবাদ: আব্দুল্লাহ মাহমূদ; ইবন আবদুল হাদী, আল-কালাম আলা মাসআলাতিল ইস্তেওয়া 'আলাল 'আরش, পৃ. ৮৩।
৩. আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/৩০৭)।
৪. আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/৩০৭)।
৫. আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/৩১১)।
৬. আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/৩১১)।
৭. আল-ই'তিক্বাদ, পৃ. ১১২-১১৩।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 ইমাম আবূ ‘উমার ‘উসমান আস-সাকরাযয়ী আল-ফকীহ (বাইহাকীর সাথী)

📄 ইমাম আবূ ‘উমার ‘উসমান আস-সাকরাযয়ী আল-ফকীহ (বাইহাকীর সাথী)


ইমাম হাফেয ফকীহ মুহাদ্দিস আবু 'আমর উসমান ইবন আবুল হাসান ইবনুল হুসাইন আশ-শাহরাযূরী আশ-শাফে'য়ী 'উসুলুদ্দীন' নামে একটি গ্রন্থ লিখেন, তার শুরুতে তিনি বলেন, فصل: ومن صفاته تبارك وتعالى فوقيته واستواؤه على عرشه بذاته، كما وصف نفسه في كتابه، وعلى لسان رسوله صلى الله عليه وآله وسلم بلا كيف، بدليل قوله تعالى: ﴿الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى ﴾ [طه: ٥]، وقوله: {ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ الرَّحْمَنُ ﴾ [الفرقان: ٥٩] , وقوله في خمسة مواضع أُخر : ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ)، وقوله تعالى في قصة عيسى عليه السلام: ﴿ وَرَافِعُكَ إِلَيَّ ﴾ [آل عمران: ٥٥] , وساق آيات العلو - ثم قال: - وعلماء الأمة وأعيان الأئمة من السلف لم يختلفوا في أن الله سبحانه مستو على عرشه، وعرشه فوق سبع سماوات - ثم ذكر كلام عبد الله بن المبارك - : «نعرف ربنا بأنه فوق سبع سماواته على عرشه بائن من خلقه - وساق قول ابن خزيمة: «ومن لم يقر بأن الله تعالى على عرشه قد استوى فوق سبع سماواته فهو كافر».
"অধ্যায়: আর মহান আল্লাহর গুণসমূহের মধ্যে অন্যতম গুণ হচ্ছে, সত্তাগতভাবে তাঁর উপরে থাকা এবং 'আরশের উপর উঠা, যেমনটি তিনি তাঁর কিতাবে নিজেকে গুণান্বিত করেছেন, আর তাঁর নবী আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের যবানীতে সাব্যস্ত করেছেন, তবে সেটা কোনো প্রকার ধরণ নির্ধারণ ব্যতীতই। এর প্রমাণ হচ্ছে, আল্লাহর বাণী, "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন। [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫] অনুরূপ আল্লাহর বাণী “এরপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন, তিনি রহমান।" [সূরা আল-ফুরক্বান, আয়াত: ৫৯] অনুরূপ আরও পাঁচ জায়গায় এসেছে, "তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন"। অনুরূপ আল্লাহর বাণী, ঈসা 'আলাইহিস সালামের ব্যাপারে, "আপনাকে আমরা উপরে তুলে নিব।" [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৫৫] তারপর তিনি আল্লাহর 'উলু বা উপরে থাকা সংক্রান্ত আয়াতগুলো নিয়ে আসেন। তারপর বলেন, "আর উম্মাতের আলেমগণ, সালাফে সালেহীনের বিখ্যাতজনেরা কেউই এ ব্যাপারে মতভেদ করেনি যে, "আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর উঠেছেন।” তারপর তিনি আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকের বক্তব্য নিয়ে আসেন, যাতে তিনি বলেছেন, "আমরা চিনতে পারি আমাদের রব্বকে যে তিনি সাত আসমানের উপরে, তাঁর 'আরশের উপরে, সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা।" তারপর তিনি ইমাম ইবন খুযাইমাহ'র সে ঐতিহাসিক উক্তি বর্ণনা করেন, যাতে তিনি বলেছেন, "যে ব্যক্তি স্বীকার করবে না যে, আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপর; সাত আসমানের উপরে উঠেছেন সে কাফির।”¹
টিকাঃ
১. ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমাউল জুয়ূশ, পৃ. ১০৯; আবু ইসমাঈল আস-সাবুনী, ই'তিকাদু আহলিস সুন্নাতি ওয়া আসহাবিল হাদীস ওয়াল আয়িম্মাহ, পৃ. ১৪-২৩।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 আবূ ‘উমার ইবন আবদুল বার (৪৬৩ হিজরী)

📄 আবূ ‘উমার ইবন আবদুল বার (৪৬৩ হিজরী)


আল-ইস্তিআব, আল-ইস্তেযকার, আত-তামহীদ, বায়ানু জামে'উল ইলমি ওয়া ফাদ্বলিহী ও অন্যান্য চমৎকার গ্রন্থ প্রণেতা ইমাম, মাগরিবের হাফিয আবু 'উমার ইবন আবদুল বার, মালিকী মাযহাবের ইমাম এবং হাফিযদের অন্যতম। তিনি 'ইস্তেওয়া' এর অভিধানিক অর্থ সম্পর্কে বলেন, "هو العلو والارتفاع على الشيء والاستقرار والتمكن فيه , অর্থাৎ উপরে উঠা, কোনো কিছুর উপরে থাকা ও সেখানে অবস্থান করা”।¹
তিনি আল্লাহর 'আরশের উপর উঠার আকীদাহ সাব্যস্ত করতেন। তার প্রমাণ হচ্ছে তাঁর নিম্নোক্ত বাণী,
وَالَّذِي عَلَيْهِ جَمَاعَةُ أَهْلِ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةُ أَنَّهُ لَمْ يَزَلْ بِصِفَاتِهِ وَأَسْمَائِهِ لَيْسَ لِأَوَّلِيَّتِهِ ابْتِدَاءٌ وَلَا لِآخِرِيَّتِهِ انْقِضَاءُ، هُوَ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى».
"আর যার ওপর আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আকীদাহ প্রতিষ্ঠিত তা হচ্ছে, তিনি তাঁর যাবতীয় গুণাবলি ও যাবতীয় নামসহ বিদ্যমান। তাঁর অনাদি হওয়ার কোনো শুরু নেই, আর তাঁর অনন্ত হওয়ারও কোনো শেষ নেই, আর তিনি তাঁর 'আরশের উপর উঠেছেন।”²
অন্যত্র তিনি বলেন,
وَأَمَّا احْتِجَاجُهُمْ بِقَوْلِهِ عَزَّ وَجَلَّ : مَا يَكُونُ مِنْ نَجْوَى ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ وَلَا أَدْنَى مِنْ ذَلِكَ وَلَا أَكْثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَمَا كَانُوا فَلَا حُجَّةَ لَهُمْ فِي ظَاهِرِ هَذِهِ الْآيَةِ لِأَنَّ عُلَمَاءَ الصَّحَابَةِ وَالتَّابِعِينَ الَّذِينَ حَمَلْتُ عَنْهُمُ التَّأْوِيلَ فِي الْقُرْآنِ قَالُوا فِي تَأْوِيلِ هَذِهِ الْآيَةِ هُوَ عَلَى الْعَرْشِ وَعِلْمُهُ فِي كُلِّ مَكَانٍ.
"আর আল্লাহর বাণী "তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোনো গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থজন হিসেবে তিনি থাকেন না এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যেও হয় না যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি থাকেন না। তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশি হোক তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন যেখানেই তারা থাকুক না কেন।” [সূরা আল-মুজাদালাহ, আয়াত: ০৭]” এ আয়াত দ্বারা তাদের দলীল গ্রহণ করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ আয়াতের প্রকাশ্য ভাষ্যে তাদের দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই; কারণ সাহাবী ও তাবে'য়ী আলেমগণ, যাদের থেকে কুরআনের তাফসীর বর্ণিত হয়েছে, তারা সবাই এ আয়াতের তাফসীরে বলেছেন, "তিনি 'আরশের উপরে, আর তাঁর জ্ঞান সকল স্থানে”।³
অন্যত্র তিনি বলেন,
وَفِي هَذَا الْحَدِيثِ دَلِيلٌ عَلَى أَنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ فِي السَّمَاءِ عَلَى الْعَرْشِ مِنْ فَوْقِ سَبْعِ سَمَاوَاتٍ وَعِلْمُهُ فِي كُلِّ مَكَانٍ كَمَا قَالَتِ الْجَمَاعَةُ أَهْلُ السُّنَّةِ أَهْلُ الْفِقْهِ وَالْأَثَرِ ، وَحُجَّتُهُمْ ظَوَاهِرُ الْقُرْآنِ فِي قَوْلِهِ الرَّحْمَنُ عَلَى العرش استوى) طه ه».
"এ হাদীসে প্রমাণ রয়েছে যে, মহান আল্লাহ তিনি উপরে 'আরশের উপর, সাত আসমানের উপরে, আর তাঁর জ্ঞান সর্বত্র, যেমনটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আত, আহলুল ফিকহ ওয়াল আছার বলে থাকেন, আর তাদের দলীল হচ্ছে কুরআনের প্রকাশ্য অর্থ, যা আল্লাহর বাণীতে এসেছে, "রহমান তো 'আরশের উপর উঠেছেন।”⁴ তারপর তিনি ইস্তেওয়া এর অর্থ বর্ণনা করেছেন এবং সেটা যে মু'তাযিলাদের কথার বিপরীত সেটার দলীল প্রমাণাদি তুলে ধরেছেন। সেখানে তিনি ইমাম মালিকের সেই বিখ্যাত উক্তি, ইমাম রবী'আহর উক্তি, সুফইয়ান সাওরীর বক্তব্য, ইবনুল মুবারকের বক্তব্য, ইবন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর বক্তব্য তুলে ধরেছেন। [২/৫২৮-৫২৯]
অনুরূপভাবে তিনি মুআত্তা মালিকের হাদীস, আমাদের রব প্রতি রাতে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন, এর ব্যাখ্যায় বলেন,
هذا الحديث لم يختلف أهل الحديث في صحته، وفيه دليل على أن الله في السماء على العرش من فوق سبع سموات، كما قالت الجماعة، وهو من حجتهم على المعتزلة، وهذا أشهر عند العامة وأعرف من أن يحتاج إلى أكثر من حكايته، لأنه اضطرار لم يؤنبهم عليه أحد، ولا أنكره عليهم مسلم
"এই হাদীস সহীহ হওয়ার ব্যাপারে হাদীস বিশারদগণ মতানৈক্য করেননি। এ হাদীস প্রমাণ করে যে, আল্লাহ সাত আসমানের ঊর্ধ্বে 'আরশের উপরে। যেমনটি আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের মত। মু'তাযিলাদের বিপক্ষে এ হাদীস বিশারদগণের দলীল। এটি আম লোকদের কাছে অতি প্রসিদ্ধ এবং এতটাই পরিচিত যে, এর চেয়ে আর বেশি কিছুর প্রয়োজন নেই। কেননা তা আবশ্যক বিষয়। এ আকীদাহ পোষণকারীদেরকে কেউ তিরস্কার করেনি এবং কোনো মুসলিম তাদের বিরোধিতা করেনি।"⁵ তাছাড়া সেখানে তিনি ইমাম রবী'আহ, মালিক, ইবনুল আ'রাবী প্রমুখদের বক্তব্য নিয়ে এসেছেন।
টিকাঃ
১. আত-তামহীদ (৭/১৩১)।
২. জামে'উ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাদ্বলিহী (১/৫৭); আরও দেখুন: আত-তামহীদ (৫/৫১০), (১৪/১৫৭- ১৫৮০)।
৩. ইবন আবদুল বার, আত-তামহীদ (৭/১৩৮-১৩৯)।
৪. আল-ইস্তেযকার (২/৫২৭)।
৫. আত-তামহীদ, ইবন আব্দিল বার (৭/১৩৪) যাহাবী, আল-আরশ, (২/৪৫৪-৪৫৬) অনুবাদ: আব্দুল্লাহ মাহমুদ।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 আবূ বকর আল-খাতীব, খতীব আল বাগদাদী (৪৬৩ হিজরী)

📄 আবূ বকর আল-খাতীব, খতীব আল বাগদাদী (৪৬৩ হিজরী)


মুসলিম বিশ্বের পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার হাফিয আবু বকর খাতীব বলেন, গুণাবলির ব্যাপারে কথা হচ্ছে-
أما الكلام في الصفات؛ فإن ما روي منها في السنن الصحاح، فمذهب السلف: إثباتها وإجراؤها على ظواهرها، ونفي الكيفية والتشبيه عنها ....
والأصل في هذا أن الكلام في الصفات فرع على الكلام في الذات، ونحتذي في ذلك حذوه ومثاله .... وإذا كان معلوماً أن إثبات رب العالمين إنما هو إثبات وجود لا إثبات تحديد وتكييف، فكذلك إثبات صفاته فإنهما هو إثبات وجود لا إثبات تحديد وتكييف....
فإذا قلنا: يد وسمع وبصر ، فإنما هو إثبات صفات أثبتها الله لنفسه، ولا نقول إن معنى اليد: القدرة، ولا نقول: إن معنى السمع والبصر : العلم، ولا نقول: إنها جوارح وأدوات الفعل....
ونقول: إنما وجب إثباتها لأن التوقيف ورد بها، ووجب نفي التشبيه عنها، لقوله تعالى لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ البصير، وقوله وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ
"যেসব গুণ সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, সেসব গুণের ক্ষেত্রে সালাফদের নীতি হচ্ছে- তা সাব্যস্ত করা ও বাহ্যিকতার ওপর প্রয়োগ করা এবং ধরণ ও সাদৃশ্য দেয়াকে নাকচ করা। এ ব্যাপারে মূলনীতি হচ্ছে- গুণাবলির ব্যাপারে কথা বলা আল্লাহর সত্তার ব্যাপারে কথা বলার একটি শাখা। তাই সিফাত বা গুণের ক্ষেত্রে জাত তথা সত্তা ও তার দৃষ্টান্তের অনুসরণ করবো।
আর যখন এটা জানা বিষয় যে, জগৎসমূহের রবকে সাব্যস্ত করা মানে তার অস্তিত্বকে সাব্যস্ত করা, তাঁর সীমা ও ধরণ সাব্যস্ত করা নয়। অনুরূপভাবে তাঁর গুণাবলিকে সাব্যস্ত করা মানে তার অস্তিত্বকে সাব্যস্ত করা, সীমা ও ধরন সাব্যস্ত করা নয়।
যখন আমরা বলি, হাত, শ্রবণ ও চোখ, তখন এর দ্বারা শুধুমাত্র গুণাবলি সাব্যস্ত করা হয়, যে গুণাবলি স্বয়ং আল্লাহ নিজের ক্ষেত্রে সাব্যস্ত করেছেন। আমরা বলি না, হাত অর্থ কুদরাত বা ক্ষমতা। বলি না, শ্রবণ ও দর্শন অর্থ জ্ঞান। বলি না, এসব অঙ্গ এবং কাজের উপাদান।
আমরা বলি- শুধুমাত্র সাব্যস্ত করা ওয়াজিব। কেননা কুরআন ও সুন্নাহ'য় তা বর্ণিত হয়েছে। তাশবীহ বা সাদৃশ্য দেয়াকে নাকচ করা ওয়াজিব। কারণ, আল্লাহ বলেন: “তাঁর মত কিছু নেই আর তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।" আরও বলেন- "আর তাঁর কোনো সমকক্ষও নেই।"¹
তাছাড়া খত্বীব আল-বাগদাদী রাহিমাহুল্লাহ ইমাম শাফেয়ীর প্রশংসায় বলেছেন তাতেও তার বিশুদ্ধ আকীদাহ প্রকাশ পায়। তিনি ইমাম শাফে'য়ী রাহিমাহুল্লাহ'র প্রশংসা করে বলেন, أبى الله إِلَّا رَفْعَهُ وعُلُوهُ ... وليس لما يُعْلِيْهِ ذو العرش واضِعُ.
"আল্লাহ তা'আলা উঁচু মর্যাদা ও উচ্চাসন তিনি ব্যতীত অন্য আর কারও জন্য হওয়াকে অস্বীকার করছেন। আর 'আরশের অধিপতি যাকে উপরে উঠাবেন তাকে কেউ নীচে নামাতে পারে না।”²
টিকাঃ
১. জাওয়াবু আবু বকর আল-খতীব আলা আসয়িলাতি বা'দ্বি আহলি দিমাশকা ফিস সিফাত, (সংক্ষেপিত) পৃ. ৭৩-৭৫; যা আবু বকর আল-ইসমা'ঈলীর ই'তিকাদু আহলিস সুন্নাহ এর শেষে সংযুক্তি হিসেবে মুদ্রিত হয়েছে। তাহকীক, জামাল 'আযযূন, তাকদীম; শাইখ হাম্মাদ আল-আনসারী; দারুর রাইয়ান; এছাড়া তা ইমাম যাহাবীর বেশ কয়েকটি কিতাবে এসেছে, আল-'উলু, ২৫৩ (৫৭৭); আল-আরশ (২/৪৫৬-৪৫৮) অনুবাদ: আব্দুল্লাহ মাহমুদ: সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১৮/২৮৩-২৮৪); তাযকিরাতুল হুফফায (৩/২২৫); অনুরূপভাবে তা ইবন কুদামার যাম্মুল তা'ওয়ীলেও এসেছে, পৃ. ১৫।
২. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা (১০/৯৫)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00