📄 ইমাম কাযী আবদুল ওয়াহহাব আল-মালেকী (৪২২ হিজরী)
প্রখ্যাত আলেম, ফকীহ, উসূলী, মুনাযির কাযী আবদুল ওয়াহহাব আল-মালেকী বলেন,
اعلم أن الوصف له تعالى بالاستواء اتباع للنص، وتسليم للشرع، وتصديق لما وصف نفسه تعالى به
"জেনে রাখ যে, আল্লাহ তা'আলাকে 'ইস্তেওয়া' বা 'আরশের উপর উঠা গুণ সাব্যস্ত করা নস বা কুরআন ও হাদীসের ভাষ্যের অনুসরণ, শরী'আতের প্রতি আত্মসমর্পণ আর যা দিয়ে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নিজেকে গুণান্বিত বলেছেন সেটাকে সত্যায়ন।”¹
টিকাঃ
১. কাযী আবদুল ওয়াহহাব আল-মালেকী, শারহু মুকাদ্দিমাতু ইবন আবী যাইদ আল-কাইরোয়ানী; অনুরূপ তার থেকে বর্ণনা করেছেন, ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদুল আকলি ওয়ান নাকল (৬/২০৩-২০৪); ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ূশ, পৃ. ১৬৪।
📄 ইমাম আবূ ‘উমার আত-ত্বালামাকী আল-মালেকী (৪২৯ হিজরী)
ইমাম আবু 'উমার আত-ত্বালামাঙ্কী রাহimামুল্লাহ তাঁর 'আল-উসূল ইলা মা'রিফাতিল উসূল' যা দু খণ্ডে সমাপ্ত, তাতে বলেন,
أجمع المسلمون من أهل السنة على أن معنى قولِهِ : ﴿ وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ ﴾ [الحديد: ٤]، ونحو ذلك مِنَ القرآن أَنَّهُ عِلْمُهُ، وأنَّ اللهَ تعالى فوقَ السَّماواتِ بِذَاتِهِ، مستو على عَرْشِهِ كَيْفَ شَاءَ.
وقال أهلُ السُّنَّةِ في قوله: ﴿الرَّحْمَانُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى) [طه: ٥] : إِنَّ الاستواء مِنَ الله عَلى عَرْشِهِ على الْحَقِيقَةِ لا على المجاز».
"মুসলিমগণের মধ্যে আহলুস সুন্নাত এ ব্যাপারে ঐকমত্য করেছেন যে, আল্লাহর বাণী 'তিনি তোমাদের সাথে আছেন যেখানেই তোমরা থাক না কেন' [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ০৪], ও অনুরূপ কুরআনের আয়াতগুলোর অর্থ, আল্লাহর ইলম বা জ্ঞান। তারা আরও একমত হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা সত্তাগতভাবে আসমানের উপরে, তাঁর 'আরশের উপর উঠেছেন, যেমনটি তিনি চেয়েছেন। আর আহলুস সুন্নাহ বলেন, মহান আল্লাহর বাণী, 'রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন' [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫] আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর 'আরশের উপর উঠা বাস্তব অর্থেই, কোনো রূপক অর্থে নয়।”¹
টিকাঃ
১. মুখতাসারুল 'উলু, পৃ. ২৬৪।
📄 আবূ নু‘আইম আল-আসবাহানী (৪৩০ হিজরী)
হাফিয আবু নু'আইم আহমাদ ইবন আবদুল্লাহ আসবাহানী যে আকীদাহ সংকলন করেছেন তাতে বলেন,
আমাদের তরীকাহ হচ্ছে কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমায়ে উম্মাহ'র অনুসরণকারী সালাফদের তরীকা। তারা যে আকীদাহ পোষণ করতেন, তা হলো- আল্লাহ তাঁর অনাদি গুণাবলি সহকারে সর্বদা পরিপূর্ণভাবে আছেন সেসব কখনো নিঃশেষ হবে না, সেসবের কোনো রূপান্তরও নেই। তিনি অনাদি জ্ঞান সহকারে সর্বদা জ্ঞানী, দর্শন সহকারে সর্বদ্রষ্টা, শ্রবণ সহকারে সর্বশ্রোতা, কথা সহকারে কথক। তারপর তিনি পদার্থ ছাড়াই বস্তুসমূহ সৃষ্টি করেছেন।
কুরআন আল্লাহর কালাম। অনুরূপ সমস্ত আসমানী কিতাব তাঁর কালাম। তাঁর কালাম মাখলুক নয়। কুরআন পড়া হোক, তিলাওয়াত করা হোক, সংরক্ষণ করা হোক, শোনা হোক, লেখা হোক বা উচ্চারণ করা হোক- সকল ক্ষেত্রেই প্রকৃতভাবেই তা আল্লাহর কালাম; বিবরণ কিংবা অনুবাদ নয়। কুরআন আমাদের শব্দের সাথেও আল্লাহর কালাম, মাখলুক নয়।
কুরআনের ব্যাপারে (মাখলুক কিংবা মাখলুক নয় এমন বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত প্রদান না করে) নীরবতা পালনকারী এবং যে বলে আমাদের শব্দের সাথে কুরআন মাখলুক, সে জাহমিয়্যাদের অন্তর্ভুক্ত। যে ব্যক্তি যে-কোনোভাবে যদি মনে করে আল্লাহর কালাম সৃষ্টি, তবে সালাফদের মতে সে জাহমিয়্যাদের অন্তর্ভুক্ত। আর সালাফদের মতে জাহমিয়্যারা কাফির। এরপর তিনি আরও অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা করেন।
অবশেষে তিনি বলেন, 'আরশের ব্যাপারে ও তাঁর উপর আল্লাহর উঠার ব্যাপারে যেসব হাদীস নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত, তারা তা সাব্যস্ত করেন। তবে ধরন নির্ধারণ করেন না এবং দৃষ্টান্ত দেন না। তিনি তাঁর সৃষ্টি থেকে আলাদা ও পৃথক। সৃষ্টিও তাঁর থেকে আলাদা ও পৃথক। সৃষ্টির মাঝে হুলুল বা ঢুকে যান না ও তাদের সাথে মিশেও যান না। তিনি তাঁর আসমানের ঊর্ধ্বে তাঁর 'আরশের উপরে, যমীনে নয়, তার সৃষ্টির ভিতরেও নয়।"¹ তারপর তিনি সালাফদের সকল আকীদাহ এবং এ ব্যাপারে তাদের ইজমা' তুলে ধরেন।
তাছাড়া তিনি তাঁর 'মাহাজ্জাতুল ওয়াসেকীন ও মাদরাজাতুর রামেক্বীন' গ্রন্থে বলেন,
وأجمعوا أنَّ اللهَ فَوْقَ سماواتِهِ، عالٍ عَلَى عرشِهِ، مُسْتَوِ عليهِ، لَا مُسْتولٍ عَلَيْهِ كَما تقول الجهمية : إِنَّهُ بكل مكان، خلافًا لما نزل في كتابهِ : أَأَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ ) [الملك: ١٦]. ﴿إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ ﴾ [فاطر: ١٠]، ﴿الرَّحْمَانُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى) [طه: ٥]».
"আর মুসলিমগণ একমত হয়েছেন যে, আল্লাহ তা'আলা আসমানের উপর, 'আরশের উপরে তাঁর অবস্থান। 'আরশের উপরে তিনি সমুন্নত হয়েছেন; সেটার উপর অধিষ্ঠিত অর্থে নয় যেমনটি জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায় বলে থাকে। তারা বলে তিনি সব জায়গায়; তারা এটা বলে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তারা তার বিরোধিতা করে। আল্লাহ বলেন, “তোমরা কি এ থেকে নির্ভয় হয়েছ যে, যিনি আসমানে রয়েছেন।” [সূরা আল-মুলক, আয়াত: ১৬] তিনি আরও বলেন, “তাঁরই দিকে পবিত্র বাণীসমূহ হয় সমুত্থিত।” [সূরা ফাতির, আয়াত: ১০] তিনি আরও বলেন, "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫]²
ইমাম যাহাবী বলেন, আবু নু'আইم হচ্ছেন মুহাম্মাদ ইবন ইউসুফ আল-বান্নার নাতি। তিনি ছিলেন দুনিয়াবিমুখ এবং আসবাহানের অপ্রতীদ্বন্দ্বী শাইখ। আল্লাহ তাকে হাদীস, হিফয ও জ্ঞানবুদ্ধিতে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। তার দরবারে দূর দূরান্ত থেকে লোকজন উপস্থিত হতেন। ইমাম ও হাফিযগণ তার দরজায় ভিড় জমাতেন। এক মাস কম ৯৪ বছর বয়সে ৪৩০ হিজরীর সফর মাসে তিনি মারা যান।³
টিকাঃ
১. ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাকল (৬/২৫২); ফাতাওয়া হামাওয়িয়্যাহ, ১০০-১০১; মাজমু'উল ফাতাওয়া (৫/১৯০-১৯১); ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ূশ, ২৭৯; মুখতাসারুস সওয়া'ইক (২/২১৪); আল-'উলু, পৃ. ২৪৩; আল-'আরش (২/৪৪২) অনুবাদ: আব্দুল্লাহ মাহমুদ।
২. মাহাজ্জাতুল ওয়াসেক্বীন ও মাদরাজাতুর রামেক্কীন, পৃ. ৩।
৩. যাহাবী, আল-আরش, (২/৪৪২) অনুবাদ: আব্দুল্লাহ মাহমূদ।
📄 আবুল হাসান আলী ইবন ‘উমার ইবন মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আল-কায়সীনী (৪৪২ হিজরী)
ইমাম আবুল হাসান আলী ইবন 'উমার ইবন মুহাম্মাদ আল-কাযওয়ীনী রাহিমাহুল্লাহ তার কিতাবুস সুন্নাহ'য় বলেন,
"আর আমাদের বিশ্বাসের অন্যতম হচ্ছে,
ومما نعتقد : أَنَّ للهِ عزَّ وجلَّ عَرشا، وهو على العَرْشِ، وعِلْمُهُ تعالى محيط بكل مكان، ما تسقط من ورقة إلَّا يعلمها، ولا حبة في ظلمات الأرض، ولا رطب ولا يابس إلا في كتاب مبين. والعرش فوق السَّماءِ السابعة، واللهُ تَعَالَى على العَرْشِ، قال الله تعالى: ﴿إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ ﴾ [فاطر: ١٠]، وقال عزَّ وجلَّ : إِنِّي مُتَوَفِّيكَ وَرَافِعُكَ إِلَيَّ ) [آل عمران: ٥٥]، وقال: تَعْرُجُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ إِلَيْهِ﴾ [المعارج: ٤]، وقال: ﴿أَأَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ ﴾ [الملك: ١٦]. وللعرش حَمَلَةٌ يحملونه على ما شاء الله من غير تكييف والاستواء معلوم والكيف مجهول».
"আমরা আরও যা বিশ্বাস করি তা হচ্ছে, নিশ্চয় আল্লাহর জন্য রয়েছে 'আরশ, আর তিনি 'আরশের উপর রয়েছেন। আর তাঁর জ্ঞান সকল স্থানকে পরিবেষ্টন করে আছে। এমন কোনো কাগজ পতিত হয় না যা তিনি জানেন না, অনুরূপ এমন কোনো শষ্য দানা যমীনের অন্ধকারে অথবা পানিতে কিংবা ডাঙ্গায় পতিত হয় না, যা এক স্পষ্ট কিতাবে লিখা নেই।
আর 'আরশ সপ্তম আসমানের উপরে, আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপরে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, "তাঁরই দিকে পবিত্র বাণীসমূহ হয় সমুত্থিত।" [সূরা ফাতির, আয়াত: ১০] তিনি আরও বলেন, "নিশ্চয় আমি আপনাকে পরিগ্রহণ করব, আমার নিকট আপনাকে উঠিয়ে নিব।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৫৫] তিনি আরও বলেন, "ফিরিশতা এবং রূহ আল্লাহর দিকে ঊর্ধ্বগামী হয়।" [সূরা আল-মা'আরিজ, আয়াত: ০৪] আর 'আরশের রয়েছে বহনকারীগণ, যারা আল্লাহ যেভাবে চায় সেভাবে সেটাকে বহন করেন। কোনো প্রকার ধরন নির্ধারণ করা যাবে না, আর 'ইস্তেওয়া' বা 'আরশের উপরে উঠার বিষয়টি জানা, তবে তার ধরণ অজানা।”¹
টিকাঃ
১. আবুল কাসেম আত-তাইমী, আল-হুজ্জাহ ফী বায়ানিল মাহাজ্জাহ (১/২৪৮-২৫০)।