📄 ইমাম আবুল কাসিম হিযাতুল্লাহ লালকাই (৪১৮ হিজরী)
ইমাম আবুল কাসিম হিবাতুল্লাহ ইবন হাসান লালেকাঈ শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ আকীদার জগতে এক অনন্য নাম। তিনি তাঁর পূর্ববর্তী লোকদের আকীদার যত ছোট ছোট গ্রন্থ, পুস্তিকা ছিল তার যতটুকু সম্ভব নিজের গ্রন্থে স্থান দিয়েছেন। এর মাধ্যমে পূর্বের অনেক সালাফে সালেহীনের বাণী, বক্তব্য, আছার আমাদের কাছে পৌঁছেছে। তাঁর এ মূল্যবান গ্রন্থটি শারহু উসূলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আত নামে বিখ্যাত। উক্ত গ্রন্থে তিনি বলেন, سياق ما روي في قوله: الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى، وأن الله على عرشه في السماء، قال عز وجل: إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيب، وقال: أأَمِنتُم مَّن فِي السَّمَاء ، وقال وَهُوَ القَاهِرُ فَوْقَ عِبَادِهِ ، قال : فدلت هذه الآيات أنه في السماء وعلمه محيط بكل مكان، وروي ذلك عن عمر، وابن مسعود، وابن عباس، وأم سلمة، ومن التابعين ربيعة، وسليمان التيمي، ومقاتل بن حيان، وبه قال مالك، والثوري، وأحمد بن حمبل
"আল্লাহর বাণী: "পরম করুণাময় 'আরশের উপর উঠেছেন"-এর ব্যাপারে যা বর্ণিত হয়েছে তার আলোচনা। আল্লাহ আসমানের ঊর্ধ্বে তাঁর 'আরশের উপরে। আল্লাহ তা'আলা বলেন, তাঁর দিকে পবিত্র বাক্যসমূহ ঊর্ধ্বে ওঠে।" আরও বলেন, "তোমরা কি এ থেকে নির্ভয় হয়েছ যে, যিনি আসমানে আছেন।” অন্যত্র বলেন- "আর তিনিই নিজ বান্দাদের ওপর ক্ষমতাবান" তিনি বলেন, এসব আয়াত প্রমাণ করে যে, তিনি আসমানের উপরে আর তাঁর ইলম সর্বস্থানকে বেষ্টন করে আছে। এ বক্তব্য বর্ণিত আছে 'উমার, ইবন মাসউদ, ইবন 'আব্বাস ও উম্মু সালামাহ থেকে। আর তাবে'য়ীদের মধ্যে রবী'আহ, সুলাইমান তাইমী ও মুকাতিল ইবন হাইয়ান থেকে বর্ণিত আছে। ইমাম মালিক, সাওরী ও আহমাদ ইবন হাম্বলেরও একই বক্তব্য।”¹ তিনি 'আরশের ওপর উঠার ব্যাপারে ইতোপূর্বে বর্ণিত, বিশর ইবন 'উমার, উম্মে সালামাহ, মালিক ইবন আনাস, রবী'আহ ইবন আবদুর রাহমান আর-রা'য়, ইবনুল আ'রাবী, আবুল 'আব্বাস সা'লাব, সবার কথা বর্ণনা করেছেন।²
টিকাঃ
১. লালেকাঈ, শারহু উসুলি ই'তিকাদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ (৩/৪২৯-৪৩৮); ইবন আবদুল হাদী, আল-কালাম আলা মাসআলাতিল ইস্তেওয়া 'আলাল 'আরশ, পৃ. ৭৯; যাহাবী, আল-আরশ, (২/৪৩৯-৪৪০) অনুবাদ: আব্দুল্লাহ মাহমুদ।
২. লালেকাঈ, শারহু উসুলি ই'তিকাদি আহلিস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আহ (৩/৪৪0-৪৪৬)।
📄 সুলতানুল মুসলেমীন মাহমদু ইবন সাবুক্তগীন (৪২২ হিজরী)
ইমাম আবু 'আলী ইবনুল বান্না বলেন, আলী ইবনুল হুসাইন আল-উকবারী বর্ণনা করেন, তিনি আবু মাসউদ আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ আল-বাজালীকে বলতে শুনেছেন, دخل ابن فورك على السلطان محمود، فقال: لا يجوز أن يُوصف الله بالفوقية لأنَّ لازم ذلك وصفه بالتحتية، فمن جاز أن يكون له فوق، جاز أن يكون له تحت. فقال السلطان: ما أنا وصفته حتَّى يُلْزِمَنِي، بَلْ هُوَ وَصَفَ نَفْسَهُ. فبهت ابن فورك، فلما خرج من عنده مات. فيقال: انشقَّتْ مَرَارَتُه».
"বিখ্যাত কালামশাস্ত্রবিদ ইবন ফুওরাক তৎকালীন সুলতান মাহমুদের কাছে প্রবেশ করে বললেন, 'আল্লাহকে উপরে থাকার গুণে গুণান্বিত বলা যাবে না; কারণ এর দাবি হচ্ছে তাকে নিচে থাকার গুণেও গুণান্বিত করা; কারণ যার জন্য উপরে থাকা বৈধ, তার জন্য নিচে থাকাও বৈধ। তখন সুলতান মাহমূদ বললেন, আমি তো এ গুণে তাকে গুণান্বিত বলিনি যে তুমি আমাকে এভাবে তোমার কথা দ্বারা বাধ্য করবে, বরং আল্লাহ স্বয়ং তাঁর নিজেকে উক্ত গুণে গুণান্বিত করেছেন। তখন ইবন ফুওরাক হতভম্ব হয়ে গেল, কোনো জাওয়াব দিতে পারলো না। তারপর যখন ইবন ফুওরাক রাহিমাহুল্লাহ সুলতান মাহমুদের দরবারে থেকে বের হয়ে গেল তখন মারা গেল। বলা হয়ে থাকে তার মুরারাহ তথা পিত্ত ফেটে তিনি মারা গিয়েছিলেন।”¹
টিকাঃ
১. যাহাবী, সিয়ার (১৭/৪৮৭)।
📄 বকীলাতুন মুসলিমীন কাসের বিল্লাহ, আল-ইমাম আবুল ‘আব্বাস আহমাদ ইবনুল আমীর ফযলক ইবনুল বলীয়া আল-মুতওয়াক্কিল ইবনুল মুকতাদির ইবনুল মু‘তাযিদ ইবন আলহা মুতওয়াক্কিল ইবনুল মু‘তাসিম ইবন হারুন ইবন আবূ জা‘ফর আল-মানসুর আল-হাশেমী আল-আব্বাসী আল-বাগদাদী (৪২২ হিজরী)
তিনি যে আকীদাহ'র গ্রন্থ তৎকালীন আহলুস সুন্নাহ'র জন্য নির্ধারণ করে লিখেন, তাতে বলেন, يجب على الإنسان أن يعلم أن الله عز وجل وحده لا شريك له لم يلد ولم يولد ولم يكن له كفواً أحد، لم يتخذ صاحبة ولا ولداً، ولم يكن له شريك في الملك، وهو أول لم يزل وآخر لا يزال .... كان ربنا واحد لا شيء معه، ولا مكان يحويه، فخلق كل شيء بقدرته، وخلق العرش لا لحاجته إليه، فاستوى عليه كيف شاء وأراد، لا استقرار، راحة كما يستريح الخلق، وهو مدبّر السموات والأرضين ومدبر ما فيهما، ومن في البر والبحر، ولا مدبر غيره
"প্রতিটি মানুষের জন্য এটা জানা আবশ্যক যে, আল্লাহ তা'আলা এক, তাঁর কোনো শরীক নেই, তিনি জন্ম গ্রহণ করেননি, কাউকে জন্মও দেননি, আর তাঁর সমকক্ষও কেউ নেই। তিনি কোনো স্ত্রী কিংবা সন্তান গ্রহণ করেননি, তাঁর রাজত্বেও কেউ শরীক নেই, তিনিই প্রথম, সর্বদা আছেন, তিনিই শেষ, সর্বদা থাকবেন।
আমাদের রব একাই ছিলেন, তাঁর সাথে আর কেউ ছিল না, কোনো স্থানও তাকে আবদ্ধ করতো না, তারপর তিনি সবকিছু সৃষ্টি করলেন তাঁর শক্তিতে, 'আরশ সৃষ্টি করেছেন, তবে সেটার প্রতি মুখাপেক্ষী হয়ে নয়, তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন যেভাবে তিনি চেয়েছেন ও ইরাদা করেছেন। তবে সেটা আরাম করার জন্য অবস্থান করা নয়, যেমনটি সৃষ্টিকুল আরাম করার জন্য করে থাকে। আর তিনি আসমান ও যমীনের পরিচালক, এ দুয়ের মাঝে যা আছে তার পরিচালক, আর যা আছে ডাঙ্গায় ও সমুদ্রে সেগুলোরও পরিচালক তিনি, তিনি ব্যতীত আর কোনো পরিচালক নেই।”¹
টিকাঃ
১. আল-ই'তিকাদুল কাদরী, ০৩; খত্বীব আল-বাগদাদী, (৪/৩৭); আল-ইসনাওয়ী, আত-ত্বাবাক্বাত (২/৩১০); আস-সাফাদী, আল-ওয়াফী বিল ওয়াফায়াত, ইবনুস সালাহ, ত্বাবাক্বাতুশ শাফে'ঈয়্যাহ (১/৩২৫); ইবন কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ (১১/৩০৯); ইবনুল জাওযী, আল-মুনাযাম (১৫/১৯৭-১৯৮)।
📄 ইমাম আবূ যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবন ‘আম্মার আস-সিজিস্তানী (৪২২ হিজরী)
ইমাম আল-মুফাসসির ইয়াহইয়া ইবন 'আম্মার আস-সিজিস্তানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, كل مسلم من أول العصر إلى عصرنا هذا إذا دعا الله سبحانه رفع يديه إلى السماء. والمسلمون من عهد النبي صلى الله عليه وسلم إلى يومنا هذا، يقولون في الصَّلاةِ ما أمرهم الله تعالى به في قوله تعالى: (سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى ) [الأعلى: 1].
ولا حاجة الله سبحانه وتعالى إلى العرش، لكن المؤمنين كانوا محتاجين إلى معرفة ربهم عزَّ وجلَّ. وكلُّ من عبد شيئًا أشار إلى موضع، أو ذكر من معبوده علامةً. فجبَّارُنَا وخالقنا، إِنَّما خَلَقَ عرشه ليقول عبده المؤمن، إذا سُئل عنْ ربه عزَّ وجلَّ أينَ هوَ الرحمنُ؟ عَلَى العَرْشِ اسْتَوَى، معناه فوقَ كُلِّ مُحْدَثٍ عَلَى عَرْشِهِ العَظيمِ، وَلَا كيفيَّةَ وَلَا شَبَة.
ولا نحتاج في هذا الباب إلى قول أكثر من هذا أن نؤمن به، وننفي الكيفية عنه، ونتَّقيَ الشَّكَ فِيهِ، ونوقن بأنَّ ما قاله الله سبحانه وتعالى ورسوله صلى الله عليه وسلم، ولا نتفكر في ذلك، ولا نسلط عليه الوهم والخاطر والوسواس. وتعلم حقا يقينا أنَّ كلَّ ما تُصُوِّر في همك ووهمك من كيفية أو تشبيه، فالله بخلافه وغيره. نقولُ: هُوَ بِذَاتِهِ على العَرْشِ، وَعِلْمُهُ مُحِيطٌ بِكُلِّ شَيْءٍ».
"প্রত্যেক মুসলিম প্রথম যুগ থেকে আজ পর্যন্ত যখনি দো'আ করে তখনি তার দু'হাত আসমানের দিকে উঠিয়ে দো'আ করে। আর মুসলিমগণ নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ থেকে আমাদের আজকের দিন পর্যন্ত সালাতে তা বলে যা তাদেরকে আল্লাহ বলার নির্দেশ দিয়েছেন, আল্লাহর সে বাণীতে, যাতে তিনি বলেন, “সাব্বিহিসমা রাব্বিকাল আ'লা” বা আপনার সর্বোচ্চ রবের নামের তাসবীহ পাঠ করুন। [সূরা আল-আ'লা, আয়াত: ০১]
তবে আল্লাহ তা'আলার 'আরশের কোনো প্রয়োজন থেকে তাতে উঠেননি। বরং মুমিনগণ তাদের মহান রবকে চিনবে, জানবে এটার বেশি মুখাপেক্ষী। যে কেউ কোনো কিছুর ইবাদাত করে সে সেটার দিকেই ইঙ্গিত করে থাকে অথবা সে তার উপাস্যের কোনো আলামত বর্ণনা করে। তাই আমাদের জাব্বার, আমাদের স্রষ্টা তিনি তাঁর 'আরশ সৃষ্টি করলেন যাতে তার ঈমানদার বান্দা বলে, যখন তাকে তার রব সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়, কোথায় সে রহমান? (তখন মুমিন জবাবে বলে) তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন। এর অর্থ হচ্ছে তিনি যাবতীয় সৃষ্টির উপরে মহান 'আরশের উপরে। সেটা সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে কোনো ধরণ নির্ধারণ করা যাবে না, কারো সাথে তাশবীহ বা সাদৃশ্যও স্থাপন করা যাবে না।
এ অধ্যায়ে আমরা এর চেয়ে বেশি বলার প্রয়োজন নেই, ঈমান আনার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। আমরা তাঁর থেকে ধরন নির্ধারণের বিষয়টি অস্বীকার করব, তাঁর ব্যাপারে কোনো সন্দেহ থেকে বেঁচে থাকব। আর আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবো, যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা'আলা বলেছেন তা সত্য; আমরা এ ব্যাপারে ধরন নিয়ে চিন্তা করবো না, আমরা তাঁর ওপর ধারণা, মনের উপলব্ধি কিংবা ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা দ্বারা প্রভাবিত হবো না।
আর এটা হক ও দৃঢ়ভাবে জানতে হবে যে, তোমার চিন্তা-চেতনায় যত রকমের ধরন কিংবা সাদৃশ্য এসে উদিত হবে আল্লাহ তা'আলা এর বিপরীত। আমরা বলবো, তিনি সত্তাগতভাবে 'আরশের উপর উঠেছেন। তবে তাঁর জ্ঞান সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছে।”¹ ইমাম আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবন 'আম্মার আস-সিজিস্তানী তার 'রেসালাহ'তে বলেন,
لا نقول كما قال الجهمية، إنه مداخل للأمكنة، وممازج لكل شيء ولا نعلم أين هو ، بل هو بذاته على العرش، وعلمه محيط بكل شيء، وعلمه، وسمعه وبصره، وقدرته، مدركة لكل شيء، وهو معنى قوله وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ ، وهو بذاته على عرشه كما قال سبحانه و كما قال رسوله
"আমরা জাহমিয়্যাদের মতো বলবো না যে, আল্লাহ জায়গাসমূহে প্রবেশ করেছেন, বস্তুর সাথে মিশে গেছেন এবং এটাও বলবো না যে, তিনি কোথায় তাও জানি না।
বরং তিনি সত্তাগতভাবে 'আরশের উপরে এবং তাঁর ইলম সকল কিছুকে বেষ্টন করে আছে। তাঁর ইলম, তাঁর শ্রবণ, তাঁর দর্শন এবং তাঁর ক্ষমতা সকল কিছুকে আয়ত্তে রেখেছে। সে অর্থে আল্লাহর বাণী: "তিনি তো তোমাদের সঙ্গেই আছেন তোমরা যেখানেই থাকো না কেন।" তিনি তাঁর সত্তাগতভাবে তাঁর 'আরশের উপরে, যেমনটি আল্লাহ সুবহানাহু এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন।”²
টিকাঃ
১. আবুল কাসেম আত-তাইমী, আল-হুজ্জাহ ফী বায়ানিল মাহাজ্জাহ (২/১০৬-১০৭)।
২. আবুল কাসেম আত-তাইমী, আল-হুজ্জাহ ফী বায়ানিল মাহাজ্জাহ (২/১০৭); ইবনু তাইমিয়্যাহ, মাজমু'উল ফাতাওয়া (৫/১৯১); যাহাবী, আল-'উলু, ১৭৭-১৭৮; যাহাবী, আল-আরশ, (২/৪৪৫-৪৪৬) অনুবাদ: আব্দুল্লাহ মাহমূদ; ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুযূশ, পৃ. ২৭৯।