📄 আবূ আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবন আহমদ ইবন ‘ঈসা ইবন আবী যামানিন (৩৯৯ হিজরী)
আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ ইবন ঈসা ইবন আবী যামানিইন বলেন, وَمِنْ قَوْلِ أَهْلِ السُّنَّةِ : أَنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ خَلَقَ الْعَرْشَ وَاخْتَصَّهُ بِالْعُلُوِّ وَالارْتِفَاعِ فَوْقَ جَمِيعِ مَا خَلَقَ، ثُمَّ اسْتَوَى عَلَيْهِ كَيْفَ شَاءَ، كَمَا أَخْبَرَ عَنْ نَفْسِهِ فِي قَوْلِهِ: اَلرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَمَا تَحْتَ الثَّرَى وَفِي قَوْلِهِ : ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنْزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا ) فَسُبْحَانَ مَنْ بَعْدَ فَلَا يُرَى، وَقَرُبَ بِعِلْمِهِ وَقُدْرَتِهِ فَسَمِعَ النَّجْوَى .... وَمِنْ قَوْلِ أَهْلِ السُّنَّةِ : أَنَّ الْكُرْسِيَّ بَيْنَ يَدَيْ الْعَرْشِ وَأَنَّهُ مَوْضِعُ الْقَدَمَيْنِ.
"আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের বক্তব্য হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা 'আরশ সৃষ্টি করেছেন, আর সেটাকে তাঁর সকল সৃষ্টির উপর উঁচু ও উপরে থাকার বৈশিষ্ট্য প্রদান করেছেন। তারপর তিনি যেভাবে চেয়েছেন সেভাবে 'আরশের উপর উঠেছেন। যেমনটি তিনি নিজরে সম্পর্কে জানিয়েছেন, তাঁর বাণীতে, "দয়াময় (আল্লাহ্) 'আরশের উপর উঠেছেন। যা আছে আসমানসমূহে ও যমীনে এবং এ দু'য়ের মধ্যবর্তী স্থানে ও ভূগর্ভে তা তাঁরই।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ৫-৬]
অনুরূপ তাঁর আরেক বাণীতে বলেছেন, "তিনি ছয় দিনে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন। তিনি জানেন যা কিছু যমীনে প্রবেশ করে এবং যা কিছু তা থেকে বের হয়, আর আসমান থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উত্থিত হয়।” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ০৪]
সুতরাং সে সত্তার পবিত্রতা ঘোষণা করছি, যিনি দূরে আছেন তাই দেখা যায় না। আর তাঁর জ্ঞান ও ক্ষমতায় নিকটে আছেন তাই তিনি গোপন শলা-পরামর্শও শুনতে পান।
অনুরূপভাবে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের বক্তব্যের মধ্যে আরও রয়েছে, কুরসী 'আরশের সামনে, আর কুরসী তাঁর দু'পা রাখার স্থান।”¹
টিকাঃ
১. উসূলুস সুন্নাহ, পৃ. ২২০-২২৩।
📄 আবূ বকর আল-বাকিললানী (৪০৩ হিজরী)
ইমাম যাহাবী বলেন, আবু বকর মুহাম্মাদ ইবন আত-তাইয়িব আল-বাকিল্লানীর চেয়ে কালামপন্থী আশ'আরীদের উত্তম কেউ নেই; তার আগের কেউ না এবং পরেরও কেউ না। তিনি আল্লাহ তা'আলাকে 'আরশের উপর বিশ্বাস করতেন। তিনি তাঁর 'তামহীদ' গ্রন্থে বলেন,
فإن قيل: هل تقولون إنه في كل مكان؟ قيل له: معاذ الله، بل هو مستو على عرشه، كما أخبر في كتابه فقال : الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى ، وَقَالَ: إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ، وقال: أَأَمِنْتُم مَّن فِي السَّمَاء، ولو كان في كل مكان، لكان في جوف الإنسان، وفمه، وفي الحشوش، والمواضع التي يرغب عن ذكرها - تعالى عن ذلك .. ولوجب أن يزيد بزيادة الأماكن، إذا خلق منها ما لم يكن خلقه، وينقص بنقصانها إذا بطل منها من كان، ولصح أن يرغب إليه إلى نحو الأرض، وإلى خلفنا، وإلى وراء ظهورنا، عن أيماننا وشمائلنا، وهذا قد أجمع المسلمون على خلافه وتخطئة قائله.
অতঃপর যদি বলা হয়, আপনারা কি বলেন আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান?
তাকে জবাব দিতে হবে, নাউযুবিল্লাহ! বরং তিনি তার 'আরশের উপরে রয়েছেন। যেমন, আল্লাহ বলেন,﴾الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى "পরম করুণাময় 'আরশের উপর উঠেছেন”, ﴾إِلَيْهِ يَصْعَدُ الْكَلِمُ الطَّيِّبُ "তারই দিকে আরোহন করে পবিত্র বাক্য।” ﴾أَأَمِنْتُم مَّن فِي السَّمَاء﴿ "যিনি আসমানের উপর আছেন, তোমরা তার থেকে নিরাপদ হয়ে গেছ?”¹
যদি আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান হন তবে তিনি মানুষের পেটে, মুখে ও পায়খানায়, আরও কিছু জায়গায় থাকতে হয় যা উল্লেখ করা যায় না, যা থেকে আল্লাহ অনেক উর্ধ্বে। আরও আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায় যে, কোনো স্থান বড় হলে আল্লাহও বড় হবেন; যখন সে স্থানে এমন কিছু সৃষ্টি করা হয় যা ইতোপূর্বে সৃষ্টি করা হয়েছিল না। অনুরূপ কোনো স্থান বিনষ্ট হলে তিনিও ছোট হয়ে যাবেন, তাছাড়া আল্লাহর প্রতি মনোযোগী হতে হলে যমীনের দিকে যাওয়া, আমাদের পিছনে যাওয়া, আমাদের ডানে যাওয়া ও আমাদের বামে যাওয়া বৈধ হয়ে যায়। অথচ সকল মুসলিম এ আকীদাহ'র বিপরীতে আকীদাহ পোষণ করে এবং সকলের মতে এ মতবাদে বিশ্বাসী ব্যক্তি সম্পর্কে বলা হবে যে, সে ভুলে লিপ্ত।
তিনি আরও বলেন,
فإن قالوا: أفليس قد قال الله عز وجل : وهو الذي في السماء إله وفي الأرض إله فأخبر أنه في السماء وفي الأرض؟ وقال: إن الله مع الذين اتقوا والذين هم محسنون؛ وقال: إنني معكما أسمع وأرى؛ وقال: ما يكون من نجوى ثلاثة إلا هو رابعهم ولا خمسة إلا هو سادسهم ولا أدنى من ذلك ولا أكثر إلا هو معهم في نظائر لهذه الآيات، فما أنكرتم أنه في كل مكان؟
يقال لهم: قوله تعالى : وهو الذي في السماء إله وفي الأرض إليه المراد به أنه إله عند أهل السماء، وإله عند أهل الأرض، كما تقول العرب فلان نبيل مطاع بالعراق ونبيل مطاع بالحجاز يعنون بذلك أنه مطاع في المصرين وعند أهلهما، وليس يعنون أن ذات المذكور بالحجاز والعراق موجودة
وقوله : إن الله مع الذين اتقوا والذين هم محسنون يعني بالحفظ والنصر والتأييد، ولم يرد أن ذاته معهم . يتعالى عن ذلك .! وقوله : إنني معكما أسمع وأرى محمول على هذا التأويل. وقوله: ما يكون من نجوى ثلاثة إلا هو رابعهم .... يعني أنه عالم بهم وبما خفي من سرائرهم ونجواهم. وهذا إنما يستعمل كما ورد به في القرآن فلذلك لا يجوز أن يقال قباسا على هذا، إن الله سبحانه بالبردان وبمدينة السلام، وأنه مع الثور ومع الحمار؛ ولا أن يقال: إنه مع الفساق والمجان... قياساً على قوله إن الله مع الذين اتقوا والذين هم محسنون)، فوجب أن يكون التأويل على ما وصفناه.
ولا يجوز أن يكون معنى استوائه على العرش هو استيلاؤه عليه - كما قال الشاعر : استوى بشر على العراق *** من غير سيف ودم مهراق
لأن الاستيلاء هو القدرة والقهر ، والله تعالى لم يزل قادراً قاهراً عزيزاً مقتدراً. وقوله: ثم استوى على العرش يقتضي استفتاح هذا الوصف بعد أن لم يكن، فبطل ما قالوه.
"অতঃপর যদি বলা হয়, মহান আল্লাহ কি বলেননি যে, "তিনিই যিনি আসমানে ইলাহ, আর যমীনে ইলাহ” [সূরা আয-যুখরুফ: আয়াত ৮৪] এভাবে আল্লাহ তা'আলাই তো সংবাদ দিচ্ছেন যে, তিনি আসমান ও যমীনে রয়েছেন? তাছাড়া আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে রয়েছেন, যারা তাকওয়া অবলম্বন করেন, যারা হচ্ছেন ইহসানকারী”। [সূরা আন-নাহল: আয়াত ১২৮] আরও বলেছেন, “নিশ্চয় আমি তোমাদের দু'জনের সাথে রয়েছি, আমি দেখি ও শুনি”। [সূরা ত্বা-হা: আয়াত ৪৮] আরও বলেছেন, "তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোনো গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থ জন হিসেবে তিনি থাকেন না এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যেও হয় না যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি থাকেন না। তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশি হোক তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন তারা যেখানেই থাকুক না কেন।” [সূরা আল-মুজাদালাহ: আয়াত ০৭] অনুরূপ আয়াতসমূহ। তাহলে তোমরা এসব আয়াত কীভাবে অস্বীকার করছ, যেগুলো থেকে বুঝা যায় তিনি সর্বত্র বিরাজমান?"
তখন উত্তরে বলা হবে, আল্লাহর বাণী, "তিনিই যিনি আসমানে ইলাহ, আর যমীনে ইলাহ” [সূরা আয-যুখরুফ: আয়াত ৮৪], এর দ্বারা উদ্দেশ্য, তিনিই সে সত্তা, যিনি আসমানবাসীদের কাছে ইলাহ, আর তিনি যমীনবাসীদের জন্যও ইলাহ। যেমন আরবরা বলে থাকে, 'অমুক অত্যন্ত ভদ্র, ইরাকে আনুগত্যকৃত আর হিজাযেও তিনি ভদ্র ও আনুগত্যকৃত সত্তা', এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য এটা বলা যে, তিনি উভয় নগরীতে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব, উভয় নগরীর লোকেরা তার আনুগত্য করে থাকে। তারা কখনও এটা বুঝে না যে, তার সত্তা ইরাক ও হিজাযে উভয়স্থানে অবস্থিত।
আর আল্লাহর বাণী, "নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে রয়েছেন, যারা তাকওয়া অবলম্বন করেন, যারা হচ্ছেন ইহসানকারী"। [সূরা আন-নাহল: আয়াত ১২৮] এর অর্থ হচ্ছে, তিনি তাদের সাথে আছেন হিফাযত করা, সাহায্য করা, সহযোগিতা করার মাধ্যমে, এখানে বলা হয়নি যে, তিনি তাদের সাথে সত্তাগতভাবে রয়েছেন। আল্লাহ তা থেকে কতই না সুউচ্চে।
আর আল্লাহর বাণী, "নিশ্চয় আমি তোমাদের দু'জনের সাথে রয়েছি, আমি দেখি ও শুনি”। [সূরা ত্বা-হা: আয়াত ৪৮] এটাও উপরে প্রদত্ত ব্যাখ্যার মতোই ব্যাখ্যা করা হবে।
আর আল্লাহর বাণী, "তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোনো গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থজন হিসেবে তিনি থাকেন না এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যেও হয় না যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি থাকেন না। তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশি হোক তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন তারা যেখানেই থাকুক না কেন।"। [সূরা আল-মুজাদালাহ: আয়াত ০৭] এর অর্থ, তিনি তাদের ব্যাপারে জানেন, আরো জানেন যা তাদের অন্তরে গোপন করে রাখা ভেদসমূহ ও পরামর্শসমূহ। এটা তো ব্যবহৃত করা হবে সেভাবে যেভাবে কুরআনে এসেছে। আর তাই তার ওপর কিয়াস করে এটা বলা জায়েয হবে না যে, আল্লাহ তা'আলা বারাদান ও মাদীনাতুস সালামের অভ্যন্তরে। এটাও বলা যাবে না যে, আল্লাহ তা'আলা গরুর সাথে ও গাধার সাথে, .... এটার ওপর কিয়াস করে যে আল্লাহ তো বলেছেন, 'তিনি তাকওয়ার অধিকারীদের সাথে এবং ইহসানকারীদের সাথে'। সুতরাং সেটার ব্যাখ্যা আমরা যেভাবে করেছি সেভাবে করাই সুনির্ধারিত”।
অনুরূপ এটাও বলা যাবে না যে, তাঁর 'আরশের উপরে উঠা যা 'ইস্তেওয়া' শব্দ দ্বারা বর্ণিত হয়েছে, তার অর্থ হচ্ছে দখল করা বা করায়ত্ব করা বা অধিকার করা বা মালিকানা লাভ করা, যেমনটি তারা দলীল হিসেবে কোনো কবির নিম্নোক্ত কবিতা পেশ করে থাকে, অবশ্যই বিশর ইরাকের ওপর অধিকার স্থাপন করেছে কোনো প্রকার তরবারী কিংবা রক্ত প্রবাহ ব্যতীতই
(এখানে আরবীতে ইস্তেওয়া এসেছে, যার অর্থ করা হয়েছে অধিকার স্থাপন করা)। এ কবিতা দ্বারা দলীল গ্রহণ সঠিক হবে না, কারণ 'ইস্তীলা' বা 'অধিকার করা'র অর্থ হচ্ছে ক্ষমতা ও দাপট ব্যবহার করা, আল্লাহ তা'আলা তো সর্বদাই সক্ষম ও দাপুটে, প্রবল পরাক্রমশালী, পূর্ণ শক্তিমান। যদি 'ইস্তেওয়া 'আলাল 'আরশ' অর্থ অধিকার করা বলা হয়, তখন এর মাধ্যমে এটা আবশ্যক হয়ে পড়ে যে, তিনি 'আরশের উপর অধিকার করার গুণে আগে গুণান্বিত ছিলেন না, এ সময় লাভ করলেন, আর এটা যে বাতিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই, সুতরাং তারা যা বলেছে তাও বাতিল।² তাছাড়া ইমাম বাকেল্লানী তাঁর আত-তামহীদ ও ইবানাহ উভয় গ্রন্থে বলেন,
فإن قال قائل : ففصلوا لي صفات ذاته من صفات أفعاله لأعرف ذلك. قيل له: صفات ذاته هي التي لم يزل ولا يزال موصوفاً بها، وهي: الحياة، والعلم والقدرة، والسمع والبصر، والكلام، والإرادة، والبقاء والوجه والعينان واليدان والغضب والرضا.. والرحمة والسخط والولاية والعداوة والحب والإيثار والمشيئة.....
"তারপর যদি কেউ বলে, আমাকে আল্লাহ তা'আলার সত্তাগত গুণ ও কর্মগতগুণের বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনা করুন যাতে আমি তা চিনতে পারি।
তাকে বলা হবে, আল্লাহ তা'আলার সত্তাগত গুণাবলি সর্বদা তাঁর ছিল, আছে, চিরন্তনভাবে সেসব গুণাবলিতে গুণান্বিত। তাহলো জীবন, জ্ঞান, ক্ষমতা, শ্রবণ, দর্শন, কথা বলা, ইচ্ছা, অবশিষ্ট থাকা, চেহারা, দু' চোখ, দু' হাত, রাগ ও সন্তুষ্টি... রহমত, ক্রোধ, বন্ধুত্ব, শত্রুতা, ভালোবাসা, প্রাধান্য প্রদান, ইচ্ছা করা...
আর তাঁর কর্মগত গুণ হচ্ছে, সৃষ্টি করা, রিযিক দেয়া, ইনসাফ করা, দয়া প্রদর্শন, অতিরিক্ত প্রদান, নি'আমত দেয়া, সাওয়াব দেয়া, শাস্তি দেয়া, হাশর ও নশর করা।"³
এভাবে আমরা দেখতে পাই যে, তিনি আল্লাহ তা'আলার গুণাবলিকে দুভাগে ভাগ করেছেন, সত্তাগত গুণ ও কর্মগত গুণ, যাতে রয়েছে সালাফে সালেহীনের নীতির প্রতিফলন।
টিকাঃ
১. বাকেল্লানী, তামহীদুল আওয়ায়েল ও তালখীসুদ দালায়েল, পৃ. ২৬০। উল্লেখ্য যে, এ গ্রন্থটি প্রথম যারা বের করেন তারা তার কিছু অংশ বাকী রেখেই ছাপিয়েছেন। পরবর্তীতে পাদ্রী রিচার্ড যোসেফ মুকারথী আল-ইয়াসূ'য়ী পূর্ণ কলেবরে বের করেন। সুতরাং কেউ যদি কোনো অংশ বর্তমান ছাপায় না পান তাহলে বাগদাদী ও বৈরুতের ছাপার স্মরণাপন্ন হবেন। বৈরুতের মাকতাবাতুশ শারকিয়্যাহ ১৯৫৭ সালে পূর্ণ কপি ছাপিয়েছে। যার মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে, ইতোপূর্বে শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ ও ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম এ কিতাব থেকে যা বর্ণনা করেছেন তা পূর্ণ আমানতদারীতার সাথেই বর্ণনা করেছেন। কোনো এক জাহমী এ ব্যাপারে শাইখুল ইসলাম ও ইবনুল কাইয়্যেমের ওপর যে অপবাদ দিয়েছিল তা আল্লাহ তা'আলা ঘুছিয়ে দিয়েছেন।
২. বাকেল্লানী, তামহীদুল আওয়ায়েল ও তালখীসুদ দালায়েল, পৃ. ২৬১-২৬২।
৩. বাকেল্লানী, তামহীদুল আওয়ায়েল ও তালখীসুদ দালায়েল, পৃ. ২৬২। আরও দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজmu'উল ফাতাওয়া (৫/৯৮-৯৯)।
📄 ইবন মাণ্ডুব আল-মাকবুরী আল-মালেকী (৪০৬ হিজরী)
ইমাম আবু বكر মুহাম্মাদ ইবন মাওহাব আল-মাকবুরী আল-মালেকী তার শারহু রিসালাতু ইবন আবী যাইদ আল-ক্বাইরোয়ানীতে বলেন, أما قوله: (إِنَّهُ فَوْقَ عَرْشِهِ الْمَجِيدِ بِذَاتِهِ) فمعنى (فَوْقَ) و (على) عند جميع العرب واحد. وفي الكتاب والسنة تصديق ذلك، وَهُوَ قوله تَعَالَى: {ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ [الأعراف: ٥٤]، وقال: الرَّحْمَانُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى } [طه: ٥] ، وقال : يَخَافُونَ رَبَّهُمْ مِنْ فَوْقِهِمْ﴾ [النحل: ٥٠].
وقد تأتي لفظة (في) في لغة العرب بمعنى فوق، كقولهِ تَعَالَى: ﴿فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا [الملك: ١٥] و في جُذُوعِ النَّخْلِ ﴾ [طه: ۷۱] و «أَأَمِنْتُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ ﴾ [الملك: ١٦]. قَالَ أهل التأويل : يريد فوقهَا، وَهُوَ قول مالك مما فهمه عمن أدركَ مِنَ التَّابعينَ ممَّا فَهِمُوهُ عَنِ الصَّحابة، مما فهموهُ عَنِ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم أنَّ اللهَ فِي السَّماءِ، يعني فَوْقَها وعَلَيْهَا، فلذلك قَالَ الشيخ أبو محمد : (إِنَّهُ فَوْقَ عَرْشِه ) ثمَّ بَيَّنَ أَنَّ عُلُوَّهُ فَوْقَ عَرشِهِ إِنَّمَا هُوَ بِذَاتِهِ لأَنَّهُ تَعَالَى بائن عن جميع خلقه بلا كيفٍ، وَهُوَ فِي كُلِّ مكانٍ بِعِلْمِهِ لَا بِذَاتِهِ. إِذْ لا تحويه الأماكن، لأنَّهُ أعظمُ منها».
"ইমাম ইবন আবী যায়েদ আল-ক্বাইরোয়ানীর কথা 'নিশ্চয় তিনি তাঁর সম্মানিত 'আরশের উপর সত্তাগতভাবে রয়েছেন' এখানে 'ফাওকা' (উপরে) ও 'আলা' (উপore) সকল আরবদের নিকট একই। আর কুরআন ও সুন্নায় সেটার সত্যায়ন রয়েছে, আর তা হচ্ছে, আল্লাহর বাণী, (তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠলেন) [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৫৪], (রহমান 'আরশের উপর উঠলেন) [ত্বা-হা, আয়াত: ৫], (তারা তাদের রবকে ভয় পায়, উপর থেকে) [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৫০] 'ফী' শব্দটি আরবী ভাষাতে কখনও কখনও 'উপরে' শব্দের অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন আল্লাহর বাণী, (সুতরাং তোমরা যমীনের ঘাড়ের উপর বিচরণ কর) [সূরা আল-মুলক, আয়াত: ১৫], (খেজুর গাছের উপরে), [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ৭১], (যিনি আসমানের উপর রয়েছেন তার ব্যাপারে কি তোমরা ভয়হীন হয়ে গেছ?), ব্যাখ্যাকারগণ বলেন, অর্থাৎ তার উপরে। আর এটাই ইমাম মালিক যেসব তাবে'য়ী পেয়েছেন তাদের কাছ থেকে বুঝে বলেছেন, সেসব তাবে'য়ীও যেসব সাহাবীকে পেয়েছেন তাদের থেকে বুঝে বলেছেন, আর সাহাবীগণও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে পেয়েছেন যে, 'আন্নাল্লাহা ফিস-সামায়ি' অর্থ 'আল্লাহ আলাস সামায়ি বা আল্লাহ আসমানের উপরে, আসমানের ঊর্ধ্বে। আর এজন্যই শাইখ আবু মুহাম্মাদ বলেন, 'নিশ্চয় তিনি তাঁর 'আরশের উপরে' তারপর তিনি বর্ণনা করলেন যে, তাঁর 'আরশের উপরে থাকা এটা কেবল সত্তাগতভাবে। কারণ তিনি তাঁর সকল সৃষ্টি থেকে আলাদা, কোনো প্রকার ধরন নির্ধারণ ছাড়াই। তিনি সকল স্থানেই তাঁর ইলম বা জ্ঞানের মাধ্যমে, সত্তাগতভাবে নন। কারণ কোনো স্থান তাকে পরিবেষ্টন করতে পারে না, কারণ তিনি তা থেকে অনেক বড়”।¹ তারপর তিনি আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক তাঁর 'আরশের উপর উঠার প্রমাণ হিসেবে বেশ কিছু আয়াত ও হাদীস পেশ করার পর বলেন,
فَلَمَّا أيقن المنصفون إفراد ذِكْرِهِ بالاستواءِ عَلَى عَرْشِهِ بعد خلق سماواته وأرضه، وتخصيصه بصفة الاستواء، عَلِمُوا أنَّ الاسْتِوَاء هنا غير الاستيلاء ونحوه، فأَقَرُّوا بوصفه بالاستواء عَلَى عرشه ، وأَنَّهُ عَلَى الحقيقةِ لَا عَلَى الْمَجَازِ، لأَنَّهُ الصَّادِقُ فِي قِيْلِهِ، وَوَقَفُوا عَنْ تكييف ذَلِكَ وتمثيلِهِ، إِذْ لَيْسَ كمثله شيء».
"সুতরাং যখন ইনসাফপূর্ণ আলেমগণ দৃঢ়ভাবে একথা জানতে পারলো যে, আসমান ও যমীন সৃষ্টির পরে তিনি বিশেষভাবে আলাদা করে 'ইস্তাওয়া' বা উপরে উঠার গুণটি উল্লেখ করেছেন, আর নিজেকে 'ইস্তাওয়া' গুণটির সাথে বিশেষায়িত করেছেন, তারা জেনে নিল যে, এখানে 'ইস্তাওয়া' বলে 'ইস্তাওলা' বা অনুরূপ কিছু বুঝানো হয়নি। তাই তারা আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠার গুণটি স্বীকার করে নিল এবং এটাও বুঝলো যে, এটি প্রকৃত অর্থেই কোনো রূপক অর্থে নয়; কারণ তিনি তাঁর বক্তব্যে সত্যবাদী। তবে তারা এটার ধরন নির্ধারণ ও উদাহরণ দেয়া থেকে বিরত থাকলো; কারণ তাঁর মতো কোনো কিছু নেই।”²
টিকাঃ
১. মুখতাসারুল 'উলু, পৃ. ২৮০-২৮১।
২. মুখতাসারুল উলু, পৃ. ২৮২-২৮৩; আরও দেখুন, যাহাবী, আল-আরশ, (২/৪৪৭) অনুবাদ: আব্দুল্লাহ মাহমুদ।
📄 মা‘মার ইবন আহমাদ ইবন মিয়াদ আল-আসাবাহানী (৪১৮ হিজরী)
ইয়াহইয়া ইবন 'আম্মার, আবু নু'আইম ও তাদের যুগের সূফীদের শাইখ, ইমাম, 'আরিফ, মা'মার ইবন আহমাদ ইবন যিয়াদ আল-আসবাহানী বলেন,
আমি পছন্দ করছি যে, আমি আমার ছাত্রদের একটি অসিয়ত করবো। সে অসিয়ত হবে সুন্নাহ এবং পূর্ববর্তী পরবর্তী আহলুল হাদীস ও মা'রিফাত এবং তাসাউফপন্থীদের ইজমা'র আলোকে। তারপর তিনি অসিয়ত করেন। এক পর্যায়ে তিনি বলেন,
وَأَنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ اسْتَوَى عَلَى عَرْشِهِ بِلَا كَيْفَ وَلَا تَشْبِيه وَلَا تَأْوِيل، فالاستواء مَعْقُول، والكيف فيه مجهول، والإيمان به واجب، والإنكار له كفر ، وَأَنَّهُ جل جلاله مستو عَلَى عَرْشِه بِلَا كَيْفَ، وَأَنه جل جلال بائن من خلقه والخلق بالنون مِنْهُ، فَلَا حُلُول وَلَا ممازجة وَلَا اختلاط وَلَا ملاصقة لأَنَّهُ الْفَرد الْبَائِن من خلقه، الْوَاحِدِ الْغَنِي عَنِ الخلق، علمه بِكُل مكان، وَلَا يَخْلُو من علمه مكان لا يعزب عَنهُ مِثْقَال ذرة فِي الأَرْضِ وَلَا فِي السَّماء، يعلم ما تجنه البحور وما تكنه الصُّدُورِ ﴿وَمَا تَسْقُطُ مِنْ وَرَقَةٍ إِلا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كتاب مبين وَأَنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ سميع بَصِير ، عليم خَبِير، يتكلم ويرضى ويسخط ويضحك ويعجب ويتجلى لِعِبَادِهِ يَوْمِ الْقِيَامَة ضاحِكا، وينزل كل لَيْلَةٍ إِلَى سَمَاءِ الدُّنْيَا كَيْفَ يَشَاء.
"আর মহান আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপর উঠেছেন, কোনো রকম ধরন নির্ধারণ ছাড়াই। সাদৃশ্য প্রদান ও তা'ওয়ীল করা ছাড়াই। উপরে উঠা বোধগম্য, কিন্তু ধরন অবোধগম্য, তার ওপর ঈমান আনা ওয়াজিব, উপরে উঠাকে অস্বীকার করা কুফুরী। তিনি তাঁর 'আরশের উপর উঠেছেন ধরন নির্ধারণ ব্যতীতই।
আর মহান আল্লাহ সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা ও পৃথক, সৃষ্টিকুলও তার থেকে আলাদা। মাখলুকের মাঝে প্রবেশ করেননি, মিশে যাননি ও মিলে যাননি। কারণ, তিনি তাঁর সৃষ্টি থেকে পৃথক একক সত্তা, সকল সৃষ্টিকুল থেকে অমুখাপেক্ষী। তাঁর জ্ঞান সর্বত্র। তাঁর জ্ঞান থেকে কোনো কিছু অবশিষ্ট নেই। আসমান ও যমীনের সামান্যতম জিনিসও তাঁর জ্ঞান থেকে অগোচরে থাকে না। সমুদ্রে যা গোপন রয়েছে তা তিনি জানেন, অন্তরসমূহে যা সুপ্ত তাও তিনি জানেন। "তাঁর অজানায় একটি পাতাও পড়ে না। মাটির অন্ধকারে এমন কোনো শস্যকণাও অঙ্কুরিত হয় না বা রসযুক্ত কিংবা শুষ্ক এমন কোনো বস্তু নেই যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই।"
আল্লাহ তা'আলা সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা, সর্বজ্ঞানী, সর্বঅবহিত, কথা বলেন, সন্তুষ্ট হন, অসন্তুষ্ট হন, হাসেন, আশ্চর্য হন। কিয়ামতের দিন তাঁর বান্দাদের সামনে প্রকাশ হবেন হাস্যোজ্জ্বল হয়ে, প্রতি রাতে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন, যেভাবে ইচ্ছা করেন।'¹
টিকাঃ
১. আবুল কাসেম আত-তাইমী, আল-হুজ্জাহ ফী বায়ানিল মাহাজ্জাহ (১/২৪৯); অনুরূপ ইবন তাইমিয়্যাহ, দার'উ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নকল (৬/২৫৬-২৫৭); মাজমুউল ফাতাওয়া (৫/১৯১)।