📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 ইমাম আবূ আবদুল্লাহ ইবন বাত্তাহ আল-উকবারী (৩৮৭ হিজরী)

📄 ইমাম আবূ আবদুল্লাহ ইবন বাত্তাহ আল-উকবারী (৩৮৭ হিজরী)


ইমাম আবু আব্দুল্লাহ ইবন বাত্তাহ আল-উকবারী রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের ইমাম। তার রয়েছে আকীদাহ বিষয়ক দু'টি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। আল-ইবানাতুল কুবরা, আল-ইবানাতুস সুগরা। প্রথমটি শুধু আকীদার ওপর, দ্বিতীয়টিতে প্রথমে আকীদাহ পরে ফিকহের আলোচনা করেন।
তিনি তাঁর আল-ইবানাহ আল-কুবরা গ্রন্থে বলেন, باب الإيمان بأن الله على عرشه، بائن من خلقه، وعلمه محيط بخلقه.
أجمع المسلمون من الصحابة والتابعين، أن الله على عرشه فوق سمواته، بائن من خلقه... واحتج الجهمي بقوله مَا يَكُونُ مِن نَّجْوَى ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ
فقال: إن الله معنا وفينا، وقد فسر العلماء أن ذلك علمه، ثم قال في آخرها إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ .
فلو كان إنما عَلِمَ ذلك بالمشاهدة، لم يكن له فضل على الخلائق، وبطل فضل علمه بعلم الغيب.
আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপরে, তাঁর সৃষ্টি থেকে আলাদা এবং তাঁর ইলম তাঁর মাখলুককে বেষ্টনকারী-এসবের প্রতি ঈমান আনা বিষয়ক অধ্যায়।
সাহাবী ও তাবে'য়ী একমত যে, আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপরে, তাঁর আসমানসমূহের ঊর্ধ্বে, তাঁর সৃষ্টি থেকে আলাদা।"¹...
জাহমিয়‍্যাহ দলীল হিসেবে পেশ করে: ﴿مَا يَكُونُ مِن نَّجْوَى ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ "তিনজনের কোনো গোপন পরামর্শ হয় না, যাতে চতুর্থজন হিসেবে আল্লাহ থাকেন না" তারা বলে, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে ও আমাদের মাঝে। আলিমগণ এর ব্যাখ্যা 'ইলম' দ্বারা করেছেন। কারণ আয়াতের শেষে আল্লাহ বলেছেন: ﴾ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ﴿ "নিশ্চয় আল্লাহ সকল বিষয়ে অধিক জ্ঞাত।"
আল্লাহ যদি তা উপস্থিত হয়ে জানেন, তবে সৃষ্টির উপরে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব থাকে না এবং ইলমে গাইবের মাধ্যমে তাঁর ইলমের যে মর্যাদা তা বাতিল হয়ে যায়।²
তারপর তিনি তাদের মত উল্লেখ করেছেন যারা বলেছেন, আল্লাহর সঙ্গে থাকা ইলমের মাধ্যমে। যেমন, নু'আইম ইবন হাম্মাদ, দ্বাহহাক ইবন মুযাহিম, সুফইয়ান সাওরী, আহমাদ ইবন হাম্বল, ইসহাক ইবন রাহওয়াইহ থেকে এসব কথা সনদ সহকারে উল্লেখ করেছেন।
তারপর তিনি বলেন, لَكِنَّا نَقُولُ: إِنَّ رَبَّنَا تَعَالَى فِي أَرْفَعِ الْأَمَاكِنِ، وَأَعْلَى عِلَّيِّينَ، قَدِ اسْتَوَى عَلَى عَرْشِهِ فَوْقَ سَمَاوَاتِهِ، وَعِلْمُهُ مُحِيطٌ بِجَمِيعِ خَلْقِهِ، يَعْلَمُ مَا نَأَى كَمَا يَعْلَمُ مَا دَنَا ، وَيَعْلَمُ مَا بَطَنَ كَمَا يَعْلَمُ مَا ظَهَرَ كَمَا وَصَفَ نَفْسَهُ تَعَالَى، فَقَالَ: ﴿وَعِنْدَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ، وَمَا تَسْقُطُ مِنْ وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا، وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُبِينٍ) [الأنعام: ٥٩] ، فَقَدْ أَحَاطَ عِلْمُهُ بِجَمِيعِ مَا خَلَقَ فِي السَّمَاوَاتِ الْعُلَا، وَمَا فِي الْأَرَضِينَ السَّبْعِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَمَا تَحْتَ الثَّرَى، يَعْلَمُ السِّرَّ وَأَخْفَى، وَيَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ، وَيَعْلَمُ الخُطْرَةَ وَالهُمَّةَ، وَيَعْلَمُ جَمِيعَ مَا تُوَسْوِسُ النُّفُوسُ بِهِ، يَسْمَع وَيَرَى، وَهُوَ بِالنَّظَرِ الْأَعْلَى لَا يَعْزُبُ عَنْهُ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِينَ إِلَّا وَقَدْ أَحَاطَ عِلْمُهُ بِهِ، وَهُوَ عَلَى عَرْشِهِ سُبْحَانَهُ الْعَلِيُّ الْأَعْلَى تُرْفَعُ إِلَيْهِ أَعْمَالُ الْعِبَادِ، وَهُوَ أَعْلَمُ بِهَا مِنَ المَلَائِكَةِ الَّذِينَ شَهِدُوهَا وَكَتَبُوهَا ، وَرَفَعُوا إِلَيْهِ بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ، فَجَلَّ رَبُّنَا وَتَعَالَى عَمَّا يَنْسُبُهُ إِلَيْهِ الْجَاحِدُونَ، وَيُشَبِّهُهُ بِهِ الْمُلْحِدُونَ.
"নিশ্চয় আমাদের রব সর্বোচ্চ স্থানে, সর্বাচ্চ ইল্লিয়‍্যীনে, তিনি আসমানসমূহের উপরে তাঁর 'আরশের উপর উঠেছেন। আর তাঁর জ্ঞান সকল সৃষ্টিকে পরিবেষ্টন করে আছে, যা দূরে তা জানেন যেমন যা কাছে তা জানেন। যা গোপন তা জানেন যেমন জানেন যা প্রকাশ্য। যেমনটি তিনি তাঁর নিজের গুণ বর্ণনা করেছেন,
﴿وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَمَا تَسْقُطُ مِن وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ ﴾ [الانعام: ٥٩]
"আর গায়েবের চাবি তাঁরই কাছে রয়েছে, তিনি ছাড়া অন্য কেউ তা জানে না। স্থল ও সমুদ্রের অন্ধকারসমূহে যা কিছু আছে তা তিনিই অবগত রয়েছেন, তাঁর অজানায় একটি পাতাও পড়ে না। মাটির অন্ধকারে এমন কোন শস্যকণাও অঙ্কুরিত হয় না বা রসযুক্ত কিংবা শুষ্ক এমন কোনো বস্তু নেই যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই।” [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৫৯]
"সুতরাং তাঁর জ্ঞান সাত উপরস্থ আকাশ, সাত যমীন, এর মধ্যকার সবকিছু এবং যমীনের নিচের সকল সৃষ্টিকে পরিবেষ্টন করে আছেন, গোপন সব তিনি জানেন, গোপনের চেয়েও গোপন যা তাও তিনি জানেন, তিনি জানেন চক্ষু যা খেয়ানত করে এবং যা বুকে লুকায়িত থাকে, অন্তরে বুদ্বুদ আকারে উঠা জিনিস এবং ইচ্ছাকৃত জিনিস সবই তিনি জানেন। অন্তরসমূহে যা কুমন্ত্রণা আকারে আসে তাও জানেন, শুনেন ও দেখতে পান, তিনি সর্বাচ্চ দৃষ্টিতে তা দেখেন। আসমান ও যমীনে অণু পরিমাণ জিনিসও তার দৃষ্টি এড়ায় না, সবই তিনি তার জ্ঞান দিয়ে পরিবেষ্টন করে আছেন। অথচ তিনি তার সর্বোচ্চ মহান 'আরশের উপরে আছেন, তাঁর কাছে বান্দাদের আমল উপরে তুলে ধরা হয়, অথচ তিনি তা সেসব ফিরিশতাদের চেয়ে বেশি জানেন যারা তা দেখেছে এবং লিখেছে। তারা তাঁর কাছে সেসব আমল রাত দিন উঠিয়ে তুলে ধরছেন। সুতরাং আমাদের মহান ও সম্মানিত রব অস্বীকারকারীরা যা তার দিকে সম্পৃক্ত করে এবং যা মুলহিদরা তার সাথে তুলনা করে তা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র।”³ তাছাড়া তিনি তাঁর আল-ইবানাতুস সুগরায় বলেন,
ثم الإيمان بصفات الله تبارك وتعالى : بأن الله حي ... سميع بصير، يعلم السر وأخفى، يسمع ويرى وهو بالمنظر الأعلى، ويقبض ويبسط ويأخذ ويعطي، وهو على عرشه، بائن من خلقه ....
"তারপর ঈমান আনতে হবে আল্লাহ তাবারক ওয়া তা'আলার সকল সিফাতের উপর, এভাবে যে, আল্লাহ চিরঞ্জীব,... সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা, গোপন ও গোপনের চেয়েও গোপন জিনিসি তিনি জানেন, শুনেন-তু দেখেন, যদিও তিনি উপর থেকে দৃষ্টি দেন, তিনি মুষ্ঠিবদ্ধ করেন, প্রসারিত করেন, গ্রহণ করেন ও প্রদান করেন, আর তিনি তাঁর 'আরশের উপর, সকল সৃষ্টি থেকে আলাদা...।"⁴ অন্যত্র বলেন,
أن الله عز وجل يضع السموات على أصبع، والأرضين على أصبع، وأن الله يضع قدمه في النار فتقول قط قط، وقلوب العباد بين أصبعين من أصابع الرحمن، وأن الله عز وجل على العرش......
"নিশ্চয় মহান আল্লাহ আসমানসমূহকে এক আঙ্গুলের উপর রাখবেন, যমীনসমূহকে আরেক আঙ্গুলের উপর রাখবেন, আর আল্লাহ তা'আলা তাঁর পা রাখবেন জাহান্নামের উপর। তখন জাহান্নাম বলবে, কাত্ব, ক্বাত্ব (পূর্ণ হয়ে গেছি), আর বান্দাদের অন্তরসমূহ রহমানের দু' আঙ্গুলের মাঝখানে, আর মহান ও মর্যাদাপূর্ণ আল্লাহ 'আরশের উপর রয়েছেন। "⁵
টিকাঃ
১. আল-ইবানাহ (৩/১৩৬)।
২. আল-ইবানাহ (৩/১৪৩-১৪৬); যাহাবী, আল-আরশ, (২/৪১৬) অনুবাদ: আব্দুল্লাহ মাহমূদ।
৩. ইবন বাত্তাহ, আল-ইবানাতুল কুবরা (৭/১৪১-১৪২)।
৪. আশ-শারহু ওয়াল ইবানাহ, পৃ. ১৮৭-১৯১।
৫. আশ-শারহু ওয়াল ইবানাহ, পৃ. ২১৫।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 আবূ সুলাইমান আল-খাত্তাবী (৩৮৮ হিজরী)

📄 আবূ সুলাইমান আল-খাত্তাবী (৩৮৮ হিজরী)


ইমাম আবু সুলাইমান আল-খাত্তাবী রাহিমাহুল্লাহ আশ'আরী আকীদাহ'র লোক বলেই প্রসিদ্ধ। বস্তুত তাঁর বিভিন্ন অবস্থান ছিল। সবসময় তিনি 'তাফওয়ীদ্ব' বা সিফাতের আয়াত ও হাদীসের 'অর্থ জানা যায় না' এমন কথা বলতেন না। তিনি তাঁর আ'লামুল হাদীসে তা বলতেন, কিন্তু অন্য কিতাবে আমরা তাকে অর্থ সাব্যস্ত করার ব্যাপারে সোচ্চার দেখতে পাই। তিনি স্বীয় গ্রন্থ আল-গুনিয়াতু আনিল কালামে বলেন,
فأما ما سألت عنه من الكلام في الصفات، وما جاء منها في الكتاب وروي في السنن الصحاح». وقال: «مذاهب السلف إثباتها وإجراؤها على ظواهرها، ونفي الكيفية والتشبيه عنها.
"তুমি জানতে চেয়েছো যেসব গুণ কুরআনে ও সহীহ সুন্নায় বর্ণিত হয়েছে, তার ব্যাপারে নীতি কী?
তিনি জবাবে বলেন, সালাফদের নীতি হচ্ছে- তা সাব্যস্ত করা এবং তা বাহ্যিকতার ওপর প্রয়োগ করা এবং ধরন ও সাদৃশ্য দেয়াকে নাকচ করা।”¹ অনুরূপভাবে খাত্তাবী তার আ'লামুল হাদীসেও কখনও কখনও হক কথাটি বলেছেন, যেমন তিনি বলেন,
وليس معنى قول المسلمين: إن الله على العرش، هو أنه تعالى مماس له .. . لكنه بائن من جميع خلقه، وإنما هو خبر جاء به التوقيف، فقلنا به، ونفينا عنه التكييف إذ لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ).
"মুসলিমগণের কথা এর অর্থ এটা নয় যে, আল্লাহ তা'আলাকে তা স্পর্শ করে আছে... বরং তিনি সকল সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা। এটি তো একটি সংবাদ যা কুরআন ও সুন্নাহ'র মাধ্যমে আমাদের জানানো হয়েছে, সুতরাং আমরা তা বলব, তার ধরন নির্ধারণকে আমরা অস্বীকার করব; কারণ কোনো কিছু তার মত নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।²
কিন্তু তিনি তার 'শি'আরুদদীন' গ্রন্থে পরিষ্কারভাবে এর অর্থ বুঝা যায়, বললেন এবং ধরন সম্পর্কে খোঁজ নিতে নিষেধ করলেন, الْقَوْلِ فِي أَنَّ اللَّهَ تَعَالَى مُسْتَوٍ عَلَى الْعَرْشِ : هَذِهِ الْمُسْأَلَة سَبِيلَهَا التَّوْقِيف الْمُحْضِ وَلَا يَصِلَ إِلَيْهَا الدَّلِيلِ مِنْ غَيْرِ هَذَا الْوَجْهِ وَقَدْ نَطَقَ بِهِ الْكِتَابِ فِي غَيْرِ آية ووردت بِهِ الْأَخْبَارِ الصَّحِيحَة فَقَبُوله مِنْ جِهَةِ التَّوْقِيفِ وَاجِبِ وَالْبَحْتَ عَنْهُ وَطَلَبِ الْكَيْفِيَّة غَيْرَ جَائِز
"আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর সমুন্নত হওয়ার বিষয়টির ব্যাপারে কথা হচ্ছে, এ মাসআলাটির একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে কুরআন ও সুন্নাহ'র মাধ্যমে জ্ঞান লাভ, এ দিক ছাড়া সেদিকে পৌঁছার কোনো পথ নেই, কুরআন একাধিক আয়াতে তা সাব্যস্ত করেছে, আর বহু সহীহ হাদীস দ্বারা তা এসেছে, তাই জানিয়ে দেয়া পদ্ধতিতে সেটার ওপর ঈমান আনা ওয়াজিব, তার ব্যাপারে খোঁজাখুজি করা ও ধরন জানতে চাওয়া জায়েয নয়।"³ (তারপর তিনি ইমাম মালিক এর সেই বিখ্যাত বাণী বর্ণনা করেন এবং ইস্তাওলা বলার প্রতিবাদ করেন)
টিকাঃ
১. ইবন তাইমিয়্যাহ, হামাওয়িয়‍্যাহ, ৯৯- ১০০; যহাবী, আল-'উলু, ১৭২-১৭৩; আরবা'ঈন, ৯৩-৯৪, নং ৯৭; যাহাবী, আল-আরশ, (২/৪৫৮) অনুবাদ: আব্দুল্লাহ মাহমূদ।
২. আ'লামুল হাদীস (২/১৪৭৪)।
৩. ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসুল জাহমিয়্যাহ (৪/৪৯১); হাশিয়া ইবনুল কাইয়্যম আলা তাহযীবিস সুনান (১৩/২৫)। তাছাড়া ইমাম কুরতুবী রাহিমাহুল্লাহও এ কথাগুলো ইমাম খাত্তাবীর শি'আরুদ্দীন গ্রন্থের দিকে সম্পর্কযুক্ত করেছেন। দেখুন, আল-আসনা ফী আসমায়িল্লাহিল হুসনা (২/১২৩)। এর দ্বারা বুঝা যায় শাইখুল ইসলাম যা বর্ণনা করেছেন তাতে তিনি সত্যবাদী। সুতরাং কোনো জাহমীর জন্য খাত্তাবীর এ গ্রন্থের ব্যাপারে সন্দহ করার সুযোগ থাকলো না।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 ইমাম আহযাদ ইবন ফায়েস ইবন যাকারিয়া আর-রাযী (৩৯৫ হিজরী)

📄 ইমাম আহযাদ ইবন ফায়েস ইবন যাকারিয়া আর-রাযী (৩৯৫ হিজরী)


ইমাম আহমাদ ইবন ফারেস রাহিমাহুল্লাহ সহীহ আকীদাহ বিশ্বাস অনুসারে চলেছেন। ইবনুল জাওযী রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন যে, ভাষাবিদ ইবন ফারেস আল্লাহর 'আরশের উপর উঠার বিষয়ে 'ইস্তেওয়া' শব্দের অর্থ আরবী ভাষায় 'ইস্তাওলা' হওয়াকে অস্বীকার করেছেন। যখন তাকে বিশর ইবন মারওয়ান সংক্রান্ত কবিতা বর্ণনা করে সেখানে আসা 'ইস্তেওয়া' এর অর্থ 'ইস্তাওলা' করার বিষয়ে বলা হলো, তখন তিনি এ কবিতা দু'টি সম্পর্কে বলেন,
والبيتان لا يعرف قائلهما
"এ দু'টি কবিতার কবি সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না।”¹ এর দ্বারা বুঝা যায় যে, ইবন ফারেস বিশুদ্ধ আকীদাহ পোষণ করতেন।
টিকাঃ
১. যাদুল মাসীর (৩/২১৩)।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 ইমাম আবূ আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক ইবন মাননাহ (৩৯৫ হিজরী)

📄 ইমাম আবূ আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক ইবন মাননাহ (৩৯৫ হিজরী)


ইমাম ইবন মানদাহ রাহিমাহুল্লাহ তাঁর "কিতাবুত তাওহীদ ও মা'রিফাতি আসমায়িল্লাহি আয্যা ওয়া জাল্লা ওয়াসিফাতিহি 'আলাল ইত্তিফাকি ওয়াত-তাফাররুদ গ্রন্থে বলেন,
ومن أسماء الله عز وجل: العلي الأعلى العظيم، وذكرهما في سورة البقرة، وعن أبي هريرة عن النبي صلى الله عليه وسلم في أسماء الله العلي العظيم، قال أهل المعرفة بالتأويل معنى العلي: تعالى على الخلق وهو أعلى من كل شيء وتعالى في كل شيء فلا شيء أعلى منه ....
"আর আল্লাহর মহান নামসমূহের মধ্যে রয়েছে, আল-আলীয়্যু, আল-আ'লা, আল-আযীমু। আল্লাহ তা'আলা সেগুলোকে সূরা আল-বাকারায় উল্লেখ করেছেন। আর আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহু নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আল্লাহর নাম 'আলীয়্যুল আযীম বর্ণনা করেন। যারা ব্যাখ্যা করতে জানেন, এমন আলেমগণ বলেন, 'আল-আলিয়্যু শব্দের অর্থ, তিনি সৃষ্টি থেকে উপরে উঠেছেন, তিনি সবকিছুর উপরে, সবকিছু থেকে সর্বদিক থেকে উপরে, সুতরাং তাঁর উপরে কোনো কিছু নেই।”¹
অন্যত্র তিনি বলেন,
ذكر الآي المتلوة والأخبار المأثورة في أن الله عز وجل على العرش فوق خلقه، بائناً عنهم، وبدء خلق العرش والماء، قال الله عز وجل الرحمن على العرش استوى وقال: ثم استوى على العرش الرحمن) وقال: إن ربكم الله الذي خلق السموات والأرض في ستة أيام ثم استوى على العرش ... ثم ذكر الأحاديث التي ، منها: حديث عمران بن حصين في أول الخلق، وحديث عبد الله بن عمرو بن العاص في كتابة مقادير الخلائق، وحديث أبي هريرة في يمين الله ملاى.
"সেসব তিলাওয়াতকৃত আয়াতসমূহের বর্ণনা ও প্রমাণিত রাসূল ও সাহাবীগণ থেকে আগত আছার সমূহের বর্ণনা, যাতে এসেছে যে, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপরে, সকল সৃষ্টির উপরে, তাদের থেকে পৃথক, 'আরশ ও পানির সৃষ্টির সূচনা। মহান আল্লাহ বলেন, রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন।” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫] তিনি আরও বলেন, "তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠলেন। তিনিই 'রহমান'।” [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৫৯] তিনি আরও বলেন, "নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ্ যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন।” [সূরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৫৪] তারপর তিনি অনেকগুলো হাদীস নিয়ে এসেছেন, তন্মধ্যে রয়েছে, সৃষ্টির শুরু সংক্রান্ত ইমরান ইবন হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর হাদীস, তাকদীর লেখা সংক্রান্ত আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ইবনুল 'আস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমার হাদীস আর আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুর হাদীস আল্লাহর ডান হাত একেবারে পরিপূর্ণ।”
তারপর তিনি অপর একটি শিরোনাম দিয়ে বলেন,
আরেকটি বর্ণনা, যা প্রমাণ করে যে, 'আরশ আসমানসমূহের উপরে, আর আল্লাহ তা'আলা সৃষ্টির উপরে, তাদের থেকে পৃথক, আর তাতে রয়েছে বিখ্যাত মেঘ এর হাদীস।
তারপর তিনি আরেকটি শিরোনাম দিয়ে বলেন,
আরেকটি বর্ণনা প্রমাণ করে যে, 'আরশ আসমানসমূহের উপরে, তারপর তিনি সেখানে বেদুঈন ও শাফা'আতের সেই বিখ্যাত হাদীস নিয়ে আসেন।
তারপর তিনি আরেকটি শিরোনাম দিয়ে বলেন,
আরেকটি বর্ণনা প্রমাণ করে যে, রহমানের 'আরশ ফিরদাউসের উপরে, তারপর তিনি সেখানে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীদের মর্যাদা সংক্রান্ত হাদীস নিয়ে আসেন।
তারপর তিনি আরেকটি শিরোনাম দিয়ে বলেন,
আরেকটি বর্ণনা যা প্রমাণ করে যে, আল্লাহর 'আরশের ছায়া রয়েছে, যে ছায়ায় তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা তাকে রাখবেন, তারপর তিনি সেখানে আল্লাহর জন্য পরস্পর ভালোবাসা সংক্রান্ত হাদীস নিয়ে আসেন এবং সাত শ্রেণির লোকেরা যে 'আরশের নিচে ছায়া পাবে সেটা নিয়ে আসেন।²
এ গ্রন্থের অন্যত্র তিনি বলেন,
ذكر الآيات المتلوة والأخبار المأثورة بنقل الرواة المقبولة التي تدل على أن الله تعالى فوق سماواته وعرشه وخلقه فأورد فيه حديث : أنت الظاهر فليس فوقك شيء.... قاهراً لهم عالماً بهم.
"সেসব আয়াত ও মা'সূর হাদীসসমূহের উল্লেখ, যা গ্রহণযোগ্য বর্ণনাকারীদের বর্ণনার মাধ্যমে এসেছে, যা প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তা'আলা তাঁর আসমানসমূহের উপরে, 'আরশের উপরে, সৃষ্টির উপরে, সেখান থেকেই তাদের উপর তাঁর প্রতাপ খাটান, তাদের বিষয় তিনি জানেন.."। তারপর তিনি সেখানে সেই বিখ্যাত হাদীসটি নিয়ে আসেন, 'আল্লাহুম্মা আনতায যাহিরু ফা লাইসা ফাওক্বাকা শাই'।³
তিনি তার আস-সিফাত গ্রন্থে বলেন, فهو عز وجل موصوف غير مجهول، وهو موجود غير مدرك، ومرئي غير محاط به لقربه كأنك تراه، غير ملاصق وبعيد غير منقطع، يسمع، ويرى، وهو بالمنظر الأعلى، وعلى العرش استوى، فالقلوب تعرفه، والعقول لا تكيفه، وهو بكل شيء محيط.
"মহান আল্লাহ গুণান্বিত যা অজানা নয়; তিনি বিদ্যমান, তবে নাগালের বাইরে; তাকে দেখা যাবে, তবে বেষ্টন করা যাবে না; তার নিকটবর্তী হওয়ায় যেন তাকে দেখছো, তবে লেগে থাকার মতো নয়; দূরে তবে বিচ্ছিন্ন নন। তিনি শুনেন, দেখেন, তিনি ঊর্ধ্বের দৃশ্যপটে, 'আরশের উপরে উঠেছেন, অন্তরসমূহ তাকে চেনে, মস্তিষ্ক তার ধরন বর্ণনা করতে পারে না, তিনি সকল কিছুকে বেষ্টনকারী।"⁴
তারপর তিনি জুমু'আর দিনে আল্লাহ তাঁর 'আরশে উঠা সংক্রান্ত হাদীসটি নিয়ে আসেন। যার বর্ণনা ইমাম শাফে'য়ী থেকে ইতোপূর্বে এসেছে।⁵
টিকাঃ
১. কিতাবুত তাওহীদ ও মা'রিফাতি আসমায়িল্লাহি আয্যা ওয়া জাল্লা ওয়াসিফাতিহি 'আলাল ইত্তিফাক্কি ওয়াত-তাফাররুদ (২/১৪৭)।
২. কিতাবুত তাওহীদ ও মা'রিফাতি আসmায়িল্লাহি আয্যা ওয়া জাল্লা ওয়াসিফাতিহি 'আলাল ইত্তিফাক্কি ওয়াত-তাফাররুদ (৩/১৮৫-১৯৬)।
৩. কিতাবুত তাওহীদ, সিফাত (৩/২৬৮)।
৪. যাহাবী, আল-'আরশ (২/৪২০) অনুবাদ: আব্দুল্লাহ মাহমূদ; ইবন আবদুল হাদী, আল-কালাম আলা মাসআলাতিল ইস্তেওয়া 'আলাল 'আরশ, পৃ. ৭৭
৫. যাহাবী, আল-'আরش (২/৪২০) অনুবাদ: আব্দুল্লাহ মাহমূদ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00