📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 ইমাম আবী যাইদ আল-কাইরোয়ানী (৩৮৬ হিজরী)

📄 ইমাম আবী যাইদ আল-কাইরোয়ানী (৩৮৬ হিজরী)


ইমাম আবু মুহাম্মাদ ইবন আবু যাইদ মালিকী মাগরিবী, যাকে তার ইলমের কারণে 'মালেক আস-সাগীর' (ছোট ইমাম মালেক) বলা হয়, তিনি মালিকী মাযহাবের ফিকহের উপরে যে গ্রন্থ লিখেন তার নাম প্রদান করেন আর-রিসালাহ। সে কিতাবের ভূমিকাতে তিনি আকীদার আলোচনা করেন। সেটি মুকাদ্দামাতু ইবন আবী যায়েদ আল-কাইরোয়ানী নামে বিখ্যাত, সেখানে তিনি বলেন,
على العرش استوى وعلى الملك احتوى
"তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন, আপন রাজত্বকে পরিবেষ্টন করে আছেন"।¹
তিনি আরও বলেন,
وأنه فوق عرشه المجيد بذاته، وأنه في كل مكان بعلمه
আল্লাহ সত্তাগতভাবে তাঁর মহান 'আরশের উপরে আর তিনি সর্বত্র তাঁর ইলমের মাধ্যমে।²
লক্ষ্য করুন, এখানে ইমাম ইবন আবী যাইদ আল-কাইরোয়ানী 'সত্তাগতভাবে' কথাটি বলেছেন, যা একেবারেই সত্য। ইতোপূর্বে মুহাম্মাদ ইবন 'উসমান ইবন আবু শাইবাহ'র একই বক্তব্য আগে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি তার সমকালীন যুগে কৃফার ইমাম ও মুহাদ্দিস ছিলেন। অনুরূপভাবে শাইখুল ইসলাম আবু ইসমা'ঈল আনসারীর উস্তায ইয়াহইয়া ইবন 'আম্মার, তিনি তার রিসালাহতেও একথা বলেছেন। অনুরূপ হাফিয ইমাম আবু নাসর আস-সিজযী স্বীয় গ্রন্থ আল-ইবানাহতে বলেন,
وأئمتنا الثوري، ومالك، وابن عيينة، وحماد بن سلمة، وحماد بن زيد، وابن المبارك، وفضيل بن عياض، وأحمد وإسحاق، متفقون على أن الله فوق عرشه بذاته، وأن علمه بكل مكان
আমাদের ইমাম সাওরী, মালিক, ইবন 'উয়াইনাহ, হাম্মাদ ইবন সালামাহ, হাম্মাদ ইবন যাইদ, ইবনুল মুবারক, ফুদ্ধাইল ইবন 'ইয়াদ্ব ও আহমাদ ইবন ইসহাক একমত যে, আল্লাহ সত্তাগতভাবে তাঁর 'আরশের উপরে আর তাঁর ইলম সর্বত্র।³ অনুরূপভাবে শাইখুল ইসলাম আবু ইসমা'ঈল আল-আনসারী বলেন,
في أخبار شتى إن الله في السماء السابعة، على العرش بنفسه
বিভিন্ন হাদীসে আছে, স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা সপ্তম আসমানের ঊর্ধ্বে 'আরশের উপর রয়েছেন। আর তার ছাত্র আবুল হাসান আল-কারজী আকীদাতু আসহাবিল হাদীস গ্রন্থে বলেন,
عقائدهم أن الإله بذاته ... على عرشه مع علمه بالغوائب
আসহাবুল হাদীসের আকীদাহ হচ্ছে, আল্লাহ সত্তাগতভাবে তাঁর 'আরশের উপর। সেখান থেকেই যাবতীয় গায়েবী বিষয় তাঁর ইলমের অন্তর্ভুক্ত। আর একই কথা বলেছেন হাফিয আহমাদ আত-ত্বারকী এবং শাইখুল ইসলাম, যার সুপথপ্রাপ্তির ব্যাপারে সবাই একমত এবং যিনি অসংখ্য কারামতের অধিকারী, শাইখ আবদুল কাদের জীলানী, অনুরূপভাবে শাইখ আবদুল আযীয ইবন মুহাম্মাদ আল-কুহাইতী ও অন্যান্যগণ।⁴
ইমাম ইবন আবী যাইদ আল-ক্বাইরোয়ানী অন্য গ্রন্থে বলেন,
فيها أجمعت عليه الأمة من أمور الديانة، ومن السنن التي خلافها بدعة وضلالة أن الله تبارك اسمه له الأسماء الحسنى والصفات العلى، لم يزل بجميع صفاته وأسمائه، له الأسماء الحسنى والصفات العلى، أحاط علما بجميع ما برأ قبل كونه وفطر الأشياء بإرادته... وأنه يسمع ويرى ويقبض ويبسط، وأن يديه مبسوطتان والأرض جميعا قبضته يوم القيامة والسماوات مطويات بيمينه، وأنه يجى يوم القيامة بعد أن لم يكن جائيا) والملك صفا صفا لعرض الأمم وحسابها وعقوبتها وثوابها، فيغفر لمن يشاء من المذنبين، ويعذب منهم من يشاء، وأنه يرضى عن الطائعين ويحب التوابين ويسخط على من كفر به ويغضب فلا يقوم شيء لغضبه، وأنه فوق سماواته على عرشه دون أرضه، وأنه في كل مكان بعلمه، وأن الله سبحانه وتعالى كرسيا كما قال (عز وجل): ﴿وَسِعَ كُرْسِيُّهُ السَّمواتِ والأرْضِ) [البقرة: ٢٥٥] ومما جاءت به الأحاديث أن الله سبحانه يضع كرسيه يوم القيامة لفصل القضاء.
"দীনের যেসব বিষয়ে উম্মতগণ একমত হয়েছেন, অনুরূপ যেসব সুন্নাতেও তারা ঐকমত্য ব্যক্ত করেছেন, যার বিপরীতটি বিদ'আত ও পথভ্রষ্টতা, সে ঐকমত্যের বিষয়গুলো হচ্ছে, নিশ্চয় বরকতময় নামের অধিকারী আল্লাহ তা'আলার রয়েছে সুন্দর যত নাম, সুউচ্চ যত গুণ। তিনি সর্বদা তাঁর সকল গুণ ও নামসমূহ নিয়ে আছেন। তাঁর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নামসমূহ ও সুউচ্চ গুণসমূহ, সৃষ্টি করার আগেই যা হবে সেসবের জ্ঞান তার আয়ত্বাধীন, সকল কিছুকে তিনি তাঁর ইচ্ছায় সৃষ্টি করেছেন।... আর তিনি সবকিছু শুনেন, দেখেন, সংকীর্ণ করেন, প্রশস্ত করেন, তাঁর দু' হাত প্রসারিত, সম্পূর্ণ যমীন কিয়ামতের দিন তাঁর হাতের মুঠের ভিতর, আসমানসমূহ তাঁর ডান হাতে ভাঁজ করা, আর তিনি কিয়ামতের দিন আসবেন, (আগে থেকেই সেখানে আসা অবস্থায় থাকবেন না), আর ফিরিশতাগণও কাতারে কাতারে, সকল উম্মতকে তার সামনে পেশ করার জন্য, তাদের হিসাবের জন্য, তাদের শাস্তি বিধানের জন্য, তাদের সাওয়াব দেয়ার জন্য, অতঃপর তিনি গোনাহগারদের যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন, আর যাকে ইচ্ছা শাস্তি দিবেন। আরও এটা যে, তিনি আনুগত্যশীল বান্দাদের প্রতি সন্তুষ্ট হন, তিনি তাওবাকারীদের পছন্দ করেন, যারা তার সাথে কুফুরী করে তাদের ওপর রাগ করেন এবং ক্রোধান্বিত হন, তাঁর ক্রোধের কারণে কোনো কিছু দাঁড়াবে না (সুপারিশের জন্য)। আর তিনি তাঁর আসমানসমূহের উপরে, তাঁর 'আরশের উপরে যমীনের উপর নন। তবে তিনি তাঁর জ্ঞানে সর্বত্র। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'আলার জন্য রয়েছে একটি কুরসী, যেমনটি মহান আল্লাহ বলেছেন, "তাঁর কুরসীতে আসমান ও যমীন জায়গা হয়" [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ২৫৫], অনুরূপভাবে অনেক হাদীসে এসেছে, আল্লাহ তা'আলা কিয়ামতের দিন তাঁর কুরসীকে স্থাপন করবেন সৃষ্টির মাঝে বিচার-ফয়সালা করার জন্য।”⁵
টিকাঃ
১. রিসালাহ: ২১-২২।
২. কাইরাওয়ানী, আর-রিসালাহ, ৪; যাহাবী, আল-আরশ, (২/৩৩৮) অনুবাদ: আব্দুল্লাহ মাহমুদ; ইবন আবদুল হাদী, আল-কালাম আলা মাসআলাতিল ইস্তেওয়া 'আলাল 'আরশ, পৃ. ৭৮।
৩. ইবন তাইমিয়্যাহ, দারউ তাআরুযিল আকল ওয়ান নাকল, (৬/২৫০)।
৪. যাহাবী, আল-'আরশ (২/৪৩৮) অনুবাদ: আব্দুল্লাহ মাহমুদ।
৫. আল-জামে'উ ফিস সুনান ওয়াল আদাবি ওয়াল মাগাযী ওয়াত তারিখ, পৃ. ১০৭-১০৮।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 ইমাম আবূ আবদুল্লাহ ইবন বাত্তাহ আল-উকবারী (৩৮৭ হিজরী)

📄 ইমাম আবূ আবদুল্লাহ ইবন বাত্তাহ আল-উকবারী (৩৮৭ হিজরী)


ইমাম আবু আব্দুল্লাহ ইবন বাত্তাহ আল-উকবারী রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের ইমাম। তার রয়েছে আকীদাহ বিষয়ক দু'টি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। আল-ইবানাতুল কুবরা, আল-ইবানাতুস সুগরা। প্রথমটি শুধু আকীদার ওপর, দ্বিতীয়টিতে প্রথমে আকীদাহ পরে ফিকহের আলোচনা করেন।
তিনি তাঁর আল-ইবানাহ আল-কুবরা গ্রন্থে বলেন, باب الإيمان بأن الله على عرشه، بائن من خلقه، وعلمه محيط بخلقه.
أجمع المسلمون من الصحابة والتابعين، أن الله على عرشه فوق سمواته، بائن من خلقه... واحتج الجهمي بقوله مَا يَكُونُ مِن نَّجْوَى ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ
فقال: إن الله معنا وفينا، وقد فسر العلماء أن ذلك علمه، ثم قال في آخرها إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ .
فلو كان إنما عَلِمَ ذلك بالمشاهدة، لم يكن له فضل على الخلائق، وبطل فضل علمه بعلم الغيب.
আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপরে, তাঁর সৃষ্টি থেকে আলাদা এবং তাঁর ইলম তাঁর মাখলুককে বেষ্টনকারী-এসবের প্রতি ঈমান আনা বিষয়ক অধ্যায়।
সাহাবী ও তাবে'য়ী একমত যে, আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপরে, তাঁর আসমানসমূহের ঊর্ধ্বে, তাঁর সৃষ্টি থেকে আলাদা।"¹...
জাহমিয়‍্যাহ দলীল হিসেবে পেশ করে: ﴿مَا يَكُونُ مِن نَّجْوَى ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ "তিনজনের কোনো গোপন পরামর্শ হয় না, যাতে চতুর্থজন হিসেবে আল্লাহ থাকেন না" তারা বলে, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে ও আমাদের মাঝে। আলিমগণ এর ব্যাখ্যা 'ইলম' দ্বারা করেছেন। কারণ আয়াতের শেষে আল্লাহ বলেছেন: ﴾ إِنَّ اللَّهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ﴿ "নিশ্চয় আল্লাহ সকল বিষয়ে অধিক জ্ঞাত।"
আল্লাহ যদি তা উপস্থিত হয়ে জানেন, তবে সৃষ্টির উপরে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব থাকে না এবং ইলমে গাইবের মাধ্যমে তাঁর ইলমের যে মর্যাদা তা বাতিল হয়ে যায়।²
তারপর তিনি তাদের মত উল্লেখ করেছেন যারা বলেছেন, আল্লাহর সঙ্গে থাকা ইলমের মাধ্যমে। যেমন, নু'আইম ইবন হাম্মাদ, দ্বাহহাক ইবন মুযাহিম, সুফইয়ান সাওরী, আহমাদ ইবন হাম্বল, ইসহাক ইবন রাহওয়াইহ থেকে এসব কথা সনদ সহকারে উল্লেখ করেছেন।
তারপর তিনি বলেন, لَكِنَّا نَقُولُ: إِنَّ رَبَّنَا تَعَالَى فِي أَرْفَعِ الْأَمَاكِنِ، وَأَعْلَى عِلَّيِّينَ، قَدِ اسْتَوَى عَلَى عَرْشِهِ فَوْقَ سَمَاوَاتِهِ، وَعِلْمُهُ مُحِيطٌ بِجَمِيعِ خَلْقِهِ، يَعْلَمُ مَا نَأَى كَمَا يَعْلَمُ مَا دَنَا ، وَيَعْلَمُ مَا بَطَنَ كَمَا يَعْلَمُ مَا ظَهَرَ كَمَا وَصَفَ نَفْسَهُ تَعَالَى، فَقَالَ: ﴿وَعِنْدَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ، وَمَا تَسْقُطُ مِنْ وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا، وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُبِينٍ) [الأنعام: ٥٩] ، فَقَدْ أَحَاطَ عِلْمُهُ بِجَمِيعِ مَا خَلَقَ فِي السَّمَاوَاتِ الْعُلَا، وَمَا فِي الْأَرَضِينَ السَّبْعِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَمَا تَحْتَ الثَّرَى، يَعْلَمُ السِّرَّ وَأَخْفَى، وَيَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ، وَيَعْلَمُ الخُطْرَةَ وَالهُمَّةَ، وَيَعْلَمُ جَمِيعَ مَا تُوَسْوِسُ النُّفُوسُ بِهِ، يَسْمَع وَيَرَى، وَهُوَ بِالنَّظَرِ الْأَعْلَى لَا يَعْزُبُ عَنْهُ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِينَ إِلَّا وَقَدْ أَحَاطَ عِلْمُهُ بِهِ، وَهُوَ عَلَى عَرْشِهِ سُبْحَانَهُ الْعَلِيُّ الْأَعْلَى تُرْفَعُ إِلَيْهِ أَعْمَالُ الْعِبَادِ، وَهُوَ أَعْلَمُ بِهَا مِنَ المَلَائِكَةِ الَّذِينَ شَهِدُوهَا وَكَتَبُوهَا ، وَرَفَعُوا إِلَيْهِ بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ، فَجَلَّ رَبُّنَا وَتَعَالَى عَمَّا يَنْسُبُهُ إِلَيْهِ الْجَاحِدُونَ، وَيُشَبِّهُهُ بِهِ الْمُلْحِدُونَ.
"নিশ্চয় আমাদের রব সর্বোচ্চ স্থানে, সর্বাচ্চ ইল্লিয়‍্যীনে, তিনি আসমানসমূহের উপরে তাঁর 'আরশের উপর উঠেছেন। আর তাঁর জ্ঞান সকল সৃষ্টিকে পরিবেষ্টন করে আছে, যা দূরে তা জানেন যেমন যা কাছে তা জানেন। যা গোপন তা জানেন যেমন জানেন যা প্রকাশ্য। যেমনটি তিনি তাঁর নিজের গুণ বর্ণনা করেছেন,
﴿وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَمَا تَسْقُطُ مِن وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ ﴾ [الانعام: ٥٩]
"আর গায়েবের চাবি তাঁরই কাছে রয়েছে, তিনি ছাড়া অন্য কেউ তা জানে না। স্থল ও সমুদ্রের অন্ধকারসমূহে যা কিছু আছে তা তিনিই অবগত রয়েছেন, তাঁর অজানায় একটি পাতাও পড়ে না। মাটির অন্ধকারে এমন কোন শস্যকণাও অঙ্কুরিত হয় না বা রসযুক্ত কিংবা শুষ্ক এমন কোনো বস্তু নেই যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই।” [সূরা আল-আন'আম, আয়াত: ৫৯]
"সুতরাং তাঁর জ্ঞান সাত উপরস্থ আকাশ, সাত যমীন, এর মধ্যকার সবকিছু এবং যমীনের নিচের সকল সৃষ্টিকে পরিবেষ্টন করে আছেন, গোপন সব তিনি জানেন, গোপনের চেয়েও গোপন যা তাও তিনি জানেন, তিনি জানেন চক্ষু যা খেয়ানত করে এবং যা বুকে লুকায়িত থাকে, অন্তরে বুদ্বুদ আকারে উঠা জিনিস এবং ইচ্ছাকৃত জিনিস সবই তিনি জানেন। অন্তরসমূহে যা কুমন্ত্রণা আকারে আসে তাও জানেন, শুনেন ও দেখতে পান, তিনি সর্বাচ্চ দৃষ্টিতে তা দেখেন। আসমান ও যমীনে অণু পরিমাণ জিনিসও তার দৃষ্টি এড়ায় না, সবই তিনি তার জ্ঞান দিয়ে পরিবেষ্টন করে আছেন। অথচ তিনি তার সর্বোচ্চ মহান 'আরশের উপরে আছেন, তাঁর কাছে বান্দাদের আমল উপরে তুলে ধরা হয়, অথচ তিনি তা সেসব ফিরিশতাদের চেয়ে বেশি জানেন যারা তা দেখেছে এবং লিখেছে। তারা তাঁর কাছে সেসব আমল রাত দিন উঠিয়ে তুলে ধরছেন। সুতরাং আমাদের মহান ও সম্মানিত রব অস্বীকারকারীরা যা তার দিকে সম্পৃক্ত করে এবং যা মুলহিদরা তার সাথে তুলনা করে তা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র।”³ তাছাড়া তিনি তাঁর আল-ইবানাতুস সুগরায় বলেন,
ثم الإيمان بصفات الله تبارك وتعالى : بأن الله حي ... سميع بصير، يعلم السر وأخفى، يسمع ويرى وهو بالمنظر الأعلى، ويقبض ويبسط ويأخذ ويعطي، وهو على عرشه، بائن من خلقه ....
"তারপর ঈমান আনতে হবে আল্লাহ তাবারক ওয়া তা'আলার সকল সিফাতের উপর, এভাবে যে, আল্লাহ চিরঞ্জীব,... সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা, গোপন ও গোপনের চেয়েও গোপন জিনিসি তিনি জানেন, শুনেন-তু দেখেন, যদিও তিনি উপর থেকে দৃষ্টি দেন, তিনি মুষ্ঠিবদ্ধ করেন, প্রসারিত করেন, গ্রহণ করেন ও প্রদান করেন, আর তিনি তাঁর 'আরশের উপর, সকল সৃষ্টি থেকে আলাদা...।"⁴ অন্যত্র বলেন,
أن الله عز وجل يضع السموات على أصبع، والأرضين على أصبع، وأن الله يضع قدمه في النار فتقول قط قط، وقلوب العباد بين أصبعين من أصابع الرحمن، وأن الله عز وجل على العرش......
"নিশ্চয় মহান আল্লাহ আসমানসমূহকে এক আঙ্গুলের উপর রাখবেন, যমীনসমূহকে আরেক আঙ্গুলের উপর রাখবেন, আর আল্লাহ তা'আলা তাঁর পা রাখবেন জাহান্নামের উপর। তখন জাহান্নাম বলবে, কাত্ব, ক্বাত্ব (পূর্ণ হয়ে গেছি), আর বান্দাদের অন্তরসমূহ রহমানের দু' আঙ্গুলের মাঝখানে, আর মহান ও মর্যাদাপূর্ণ আল্লাহ 'আরশের উপর রয়েছেন। "⁵
টিকাঃ
১. আল-ইবানাহ (৩/১৩৬)।
২. আল-ইবানাহ (৩/১৪৩-১৪৬); যাহাবী, আল-আরশ, (২/৪১৬) অনুবাদ: আব্দুল্লাহ মাহমূদ।
৩. ইবন বাত্তাহ, আল-ইবানাতুল কুবরা (৭/১৪১-১৪২)।
৪. আশ-শারহু ওয়াল ইবানাহ, পৃ. ১৮৭-১৯১।
৫. আশ-শারহু ওয়াল ইবানাহ, পৃ. ২১৫।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 আবূ সুলাইমান আল-খাত্তাবী (৩৮৮ হিজরী)

📄 আবূ সুলাইমান আল-খাত্তাবী (৩৮৮ হিজরী)


ইমাম আবু সুলাইমান আল-খাত্তাবী রাহিমাহুল্লাহ আশ'আরী আকীদাহ'র লোক বলেই প্রসিদ্ধ। বস্তুত তাঁর বিভিন্ন অবস্থান ছিল। সবসময় তিনি 'তাফওয়ীদ্ব' বা সিফাতের আয়াত ও হাদীসের 'অর্থ জানা যায় না' এমন কথা বলতেন না। তিনি তাঁর আ'লামুল হাদীসে তা বলতেন, কিন্তু অন্য কিতাবে আমরা তাকে অর্থ সাব্যস্ত করার ব্যাপারে সোচ্চার দেখতে পাই। তিনি স্বীয় গ্রন্থ আল-গুনিয়াতু আনিল কালামে বলেন,
فأما ما سألت عنه من الكلام في الصفات، وما جاء منها في الكتاب وروي في السنن الصحاح». وقال: «مذاهب السلف إثباتها وإجراؤها على ظواهرها، ونفي الكيفية والتشبيه عنها.
"তুমি জানতে চেয়েছো যেসব গুণ কুরআনে ও সহীহ সুন্নায় বর্ণিত হয়েছে, তার ব্যাপারে নীতি কী?
তিনি জবাবে বলেন, সালাফদের নীতি হচ্ছে- তা সাব্যস্ত করা এবং তা বাহ্যিকতার ওপর প্রয়োগ করা এবং ধরন ও সাদৃশ্য দেয়াকে নাকচ করা।”¹ অনুরূপভাবে খাত্তাবী তার আ'লামুল হাদীসেও কখনও কখনও হক কথাটি বলেছেন, যেমন তিনি বলেন,
وليس معنى قول المسلمين: إن الله على العرش، هو أنه تعالى مماس له .. . لكنه بائن من جميع خلقه، وإنما هو خبر جاء به التوقيف، فقلنا به، ونفينا عنه التكييف إذ لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ).
"মুসলিমগণের কথা এর অর্থ এটা নয় যে, আল্লাহ তা'আলাকে তা স্পর্শ করে আছে... বরং তিনি সকল সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা। এটি তো একটি সংবাদ যা কুরআন ও সুন্নাহ'র মাধ্যমে আমাদের জানানো হয়েছে, সুতরাং আমরা তা বলব, তার ধরন নির্ধারণকে আমরা অস্বীকার করব; কারণ কোনো কিছু তার মত নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।²
কিন্তু তিনি তার 'শি'আরুদদীন' গ্রন্থে পরিষ্কারভাবে এর অর্থ বুঝা যায়, বললেন এবং ধরন সম্পর্কে খোঁজ নিতে নিষেধ করলেন, الْقَوْلِ فِي أَنَّ اللَّهَ تَعَالَى مُسْتَوٍ عَلَى الْعَرْشِ : هَذِهِ الْمُسْأَلَة سَبِيلَهَا التَّوْقِيف الْمُحْضِ وَلَا يَصِلَ إِلَيْهَا الدَّلِيلِ مِنْ غَيْرِ هَذَا الْوَجْهِ وَقَدْ نَطَقَ بِهِ الْكِتَابِ فِي غَيْرِ آية ووردت بِهِ الْأَخْبَارِ الصَّحِيحَة فَقَبُوله مِنْ جِهَةِ التَّوْقِيفِ وَاجِبِ وَالْبَحْتَ عَنْهُ وَطَلَبِ الْكَيْفِيَّة غَيْرَ جَائِز
"আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর সমুন্নত হওয়ার বিষয়টির ব্যাপারে কথা হচ্ছে, এ মাসআলাটির একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে কুরআন ও সুন্নাহ'র মাধ্যমে জ্ঞান লাভ, এ দিক ছাড়া সেদিকে পৌঁছার কোনো পথ নেই, কুরআন একাধিক আয়াতে তা সাব্যস্ত করেছে, আর বহু সহীহ হাদীস দ্বারা তা এসেছে, তাই জানিয়ে দেয়া পদ্ধতিতে সেটার ওপর ঈমান আনা ওয়াজিব, তার ব্যাপারে খোঁজাখুজি করা ও ধরন জানতে চাওয়া জায়েয নয়।"³ (তারপর তিনি ইমাম মালিক এর সেই বিখ্যাত বাণী বর্ণনা করেন এবং ইস্তাওলা বলার প্রতিবাদ করেন)
টিকাঃ
১. ইবন তাইমিয়্যাহ, হামাওয়িয়‍্যাহ, ৯৯- ১০০; যহাবী, আল-'উলু, ১৭২-১৭৩; আরবা'ঈন, ৯৩-৯৪, নং ৯৭; যাহাবী, আল-আরশ, (২/৪৫৮) অনুবাদ: আব্দুল্লাহ মাহমূদ।
২. আ'লামুল হাদীস (২/১৪৭৪)।
৩. ইবন তাইমিয়্যাহ, বায়ানু তালবীসুল জাহমিয়্যাহ (৪/৪৯১); হাশিয়া ইবনুল কাইয়্যম আলা তাহযীবিস সুনান (১৩/২৫)। তাছাড়া ইমাম কুরতুবী রাহিমাহুল্লাহও এ কথাগুলো ইমাম খাত্তাবীর শি'আরুদ্দীন গ্রন্থের দিকে সম্পর্কযুক্ত করেছেন। দেখুন, আল-আসনা ফী আসমায়িল্লাহিল হুসনা (২/১২৩)। এর দ্বারা বুঝা যায় শাইখুল ইসলাম যা বর্ণনা করেছেন তাতে তিনি সত্যবাদী। সুতরাং কোনো জাহমীর জন্য খাত্তাবীর এ গ্রন্থের ব্যাপারে সন্দহ করার সুযোগ থাকলো না।

📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 ইমাম আহযাদ ইবন ফায়েস ইবন যাকারিয়া আর-রাযী (৩৯৫ হিজরী)

📄 ইমাম আহযাদ ইবন ফায়েস ইবন যাকারিয়া আর-রাযী (৩৯৫ হিজরী)


ইমাম আহমাদ ইবন ফারেস রাহিমাহুল্লাহ সহীহ আকীদাহ বিশ্বাস অনুসারে চলেছেন। ইবনুল জাওযী রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন যে, ভাষাবিদ ইবন ফারেস আল্লাহর 'আরশের উপর উঠার বিষয়ে 'ইস্তেওয়া' শব্দের অর্থ আরবী ভাষায় 'ইস্তাওলা' হওয়াকে অস্বীকার করেছেন। যখন তাকে বিশর ইবন মারওয়ান সংক্রান্ত কবিতা বর্ণনা করে সেখানে আসা 'ইস্তেওয়া' এর অর্থ 'ইস্তাওলা' করার বিষয়ে বলা হলো, তখন তিনি এ কবিতা দু'টি সম্পর্কে বলেন,
والبيتان لا يعرف قائلهما
"এ দু'টি কবিতার কবি সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না।”¹ এর দ্বারা বুঝা যায় যে, ইবন ফারেস বিশুদ্ধ আকীদাহ পোষণ করতেন।
টিকাঃ
১. যাদুল মাসীর (৩/২১৩)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00