📄 আবূ আহমাদ আল-আসসাল (৩৪১ হিজরী)
কাযী আবু আহমাদ আল-'আসসাল, যিনি হাদীসের হাফিয, আসবাহান নগরীর অধিবাসী, তিনি গুণাবলি সংক্রান্ত স্বীয় গ্রন্থ আল-মারিফাহ-এ "রহমান 'আরশের উপরে উঠেছেন" -এ আয়াতের তাফসীরে ইমামদের মতামত বর্ণনা করেছেন। যেমন, রাবী'আহ, মালিক, দ্বাহহাক, আবু 'ঈসা ইয়াহইয়া ইবন রাফে', আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক ও কা'ব আল-আহবার। আরও উল্লেখ করেছেন, ইবন মাসউদের হাদীস-কুরসী ও পানির মধ্যে পাঁচশ' বছর। 'আরশ পানির উপর, আর আল্লাহ 'আরশের উপরে। তাঁর কাছে তোমাদের কোনো আমল গোপন নেই। (৫৪১)
📄 আবূ বকর মুহাম্মাদ ইবনুল হুসাইন আল-আজুররী (৩৬০ হিজরী)
ইমাম আবু বকর আল-আজুররী স্বীয় গ্রন্থ আশ-শারী'আহ-তে বলেন,
باب في التحذير من مذهب الحلولية الذي يذهب إليه أهل العلم، أن الله عز وجل على عرشه، فوق سمواته، وعلمه محيط بكل شيء، قد أحاط علمه بجميع ما خلق في السموات العلى، وبجميع ما في سبع أراضين، وما بينهما وما تحت الثرى، يعلم السر وأخفى ويعلم خائنة الأعين وما تخفي الصدور ... يسمع ويرى .. وهو على عرشه سبحانه العلي الأعلى، ترفع إليه أعمال العباد.
ফإن قال قائل: إيش يكون معنى قوله مَا يَكُونُ مِن نَّجْوَى ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ﴾ الآية التي [احتجوا] بها؟. قيل له: علمه، والله عز وجل على عرشه، وعلمه محيط بهم، وبكل شيء من خلقه، كذا فسره أهل العلم، والآية يدل أولها وآخرها على أنه العلم.
فإن قال قائل : كيف؟ قيل: قال الله عز وجل: ﴿ أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ مَا يَكُونُ مِنْ نَجْوَى ثَلَاثَةٍ إِلَّا هُوَ رَابِعُهُمْ وَلَا خَمْسَةٍ إِلَّا هُوَ سَادِسُهُمْ وَلَا أَدْنَى مِنْ ذَلِكَ وَلَا أَكْثَرَ إِلَّا هُوَ مَعَهُمْ أَيْنَ مَا كَانُوا ثُمَّ يُنَبِّئُهُمْ بِمَا عَمِلُوا يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِنَّ اللهَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ فابتدأ الله عز وجل الآية بالعلم وختمها بالعلم، فعلمه عز وجل محيط بجميع خلقه، وهو على عرشه، وهذا قول المسلمين.
"সর্বেশ্বরবাদ-অহংবাদ মতবাদের ব্যাপারে সতর্কীকরণ অধ্যায়।"
আলিমগণ এ দিকে গিয়েছেন যে, নিশ্চয় মহান আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপরে তাঁর আসমানসমূহের ঊর্ধ্বে, তাঁর ইলম সবকিছুকে বেষ্টনকারী। তাঁর ইলম বেষ্টন করেছে ঊর্ধ্ব আসমানসমূহে যা সৃষ্টি করেছেন সবকিছুকে এবং সাত যমীনে যা কিছু আছে সবকিছুকে। আর যা এ দুয়ের মাঝখানে আছে সে সকল কিছুকে, আর যা মাটির নিচে সেটাকে। তিনি গোপন জিনিস জানেন, আরও জানেন যা গোপনের চেয়েও গোপন, চোখসমূহ যা খেয়ানত করে এবং যা অন্তরে গোপন রাখা হয়। তিনি শুনেন ও দেখেন অথচ তিনি তাঁর সর্বোচ্চ মহা 'আরশের উপর। তাঁর কাছে বান্দাদের আমল উঠানো হয়।...
যদি কেউ বলে, “তিন ব্যক্তির এমন কোনো পরামর্শ হয় না যাতে তিনি চতুর্থ না থাকেন" আয়াতের অর্থ কী? যে আয়াতের মাধ্যমে তারা দলীল পেশ করে।
তাকে বলতে হবে, এর অর্থ হলো তাঁর জ্ঞান, আর মহান আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপরে। তাঁর ইলম তাদের বেষ্টন করে আছে। আলিমগণ এমনটি ব্যাখ্যা করেছেন। আয়াতের প্রথম ও শেষ অংশ প্রমাণ করে যে, এর অর্থ ইলম।
তারপর যদি কেউ বলে সেটা কেমন?
উত্তরে বলা হবে, মহান আল্লাহ তা'আলা বলেন, "আপনি কি লক্ষ্য করেন না যে, আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে আল্লাহ্ তা জানেন? তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোনো গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থজন হিসেবে তিনি থাকেন না এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যেও হয় না যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি থাকেন না। তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশি হোক তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন তারা যেখানেই থাকুক না কেন। তারপর তারা যা করে, তিনি তাদেরকে কিয়ামতের দিন তা জানিয়ে দিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।” [সূরা আল-মুজাদালাহ, আয়াত: ০৭] এখানে আল্লাহ তা'আলা আয়াতটি শুরু করেছেন ইলম বা 'জানা' দিয়ে, শেষ করেছেন ইলম বা 'জানা' দিয়ে। সুতরাং তাঁর ইলম তাঁর সকল সৃষ্টিকে পরিবেষ্টন করে আছে, কিন্তু তিনি তাঁর 'আরশের উপরে। এটাই মুসলিমদের কথা ।
আরও বলেন, আমাদেরকে বর্ণনা করেছেন ইবন মাখলাদ, তিনি বলেন, আমাদের বর্ণনা করেছেন আবু দাউদ, তিনি বলেন, আমাদের বর্ণনা করেছেন আহমাদ ইবন হাম্বল, তিনি বলেন, আমাদের বর্ণনা করেছেন সুরাইজ ইবন নু'মান, তিনি বলেন আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন আবদুল্লাহ ইবন নাফে', তিনি বলেন, মালিক বলেছেন, আল্লাহ আসমানের উপরে, তাঁর ইলম সর্বত্র, তাঁর ইলম থেকে কোনো স্থান খালি নেই।
তারপর তিনি তার নিজস্ব সনদে আল্লাহর ঊর্ধ্বে থাকা সংক্রান্ত কিছু হাদীস উল্লেখ করেন। তন্মধ্যে ইবন 'আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে সে হাদীসটি উল্লেখ করেন, যাতে এসেছে,
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ اسْتَوَى عَلَى عَرْشِهِ قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ شَيْئًا فَكَانَ أَوَّلَ مَا خَلَقَ الْقَلَمُ فَأَمَرَهُ أَنْ يَكْتُبَ مَا هُوَ كَائِنُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ فَإِنَّمَا يَجْرِي النَّاسُ فِي أَمْرٍ قَدْ فُرِغَ مِنْهُ»
"নিশ্চয় মহান আল্লাহ সবকিছু সৃষ্টির পূর্বে তাঁর 'আরশের উপর উঠেছেন, তারপর প্রথম যা সৃষ্টি করলেন তা হচ্ছে, কলম। অতঃপর তাকে নির্দেশ দিলেন কিয়ামত পর্যন্ত যা হবে তা লিখতে। মানুষ তো এখন সেসব অনুসারেই চলে যে ব্যাপারটি পূর্বেই সমাধা হয়ে গেছে।”¹
টিকাঃ
১. আশ-শরী'আহ, হাদীস নং ৬৬৬; হাসান সনদে।
📄 আল-ইমাম আল-হাফিম আবূল কাসিম আত-ত্বাবারানী (৩৬০ হিজরী)
হাফিয আবুল কাসিম আত-তবরানী সুলাইমান ইবন আহমাদ ইবন আইউব স্বীয় গ্রন্থ আস- সুন্নাহ-তে বলেন:
باب ما جاء في استواء الله تعالى على عرشه، وأنه بائن من خلقه.
আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপরে উঠেছেন এবং তাঁর সৃষ্টি থেকে তিনি আলাদা সংক্রান্ত বিষয়ে যা বর্ণিত হয়েছে- তার আলোচনা।
তারপর তিনি বর্ণনা করেন, আবু রাযীনের হাদীস- আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের রব কোথায় ছিলেন? এবং 'আবদুল্লাহ ইবন খালীফার বরাতে 'উমারের হাদীস- বকরী ও 'আরশ তাদের পিঠের উপরে হওয়া, আর আল্লাহ তার উপরে থাকা¹ ও অন্যান্য হাদীস।
টিকাঃ
১. আস-সুন্নাহ, হাদীস নং ২৪; যাহাবী, আল-আরশ, (২/৪০৩-৪০৪) অনুবাদ: আব্দুল্লাহ মাহমূদ।
📄 আবূ আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবন আহমাদ ইবন মুজাহিদ আত-ত্বায়ী আল-বসরী (৩৬০ এর পরে)
কালামপন্থী আলেমে দীন, ইমাম আবুল হাসান আল-আশ'আরীর বিখ্যাত ছাত্র, উসূলবিদ, ইমাম আবু বকর আল-বাকেল্লানীর উস্তায, আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ আহমাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন ইয়া'কূব ইবন মুজাহিদ আত-ত্বায়ী, যিনি আশ'আরী মতবাদের লোকদের নিকট ইবন মুজাহিদ নামে প্রসিদ্ধ। তিনি আল্লাহ তা'আলার জন্য সর্বোচ্চ সত্তা সাব্যস্ত করেছেন। তিনি বলেন,
الإجماع التاسع من إجماعات أهل السنة وأنه تعالى فوق سماواته على عرشه دون أرضه، وقد دل على ذلك بقوله: أأمنتم من في السماء أن يخسف بكم الأرض وقال: إليه يصعد الكلم الطيب والعمل الصالح يرفعه وقال: الرحمن على العرش استوى وليس استواؤه على العرش استيلاء كما قال أهل القدر، لأنه عز وجل لم يزل مستوليا على كل شيء.
"আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের ইজমার অন্তর্ভুক্ত নবম ইজমা হচ্ছে, 'নিশ্চয় মহান আল্লাহ তাঁর সকল আসমানের উপরে 'আরশের উপরে রয়েছেন। তিনি যমীনে নন। এ বিষয়টি প্রমাণ করে আল্লাহর বাণী, “তোমরা কি আসমানের উপরে যিনি আছেন, তার ব্যাপারে নিঃশঙ্ক হয়ে গেছ যে, তিনি তোমাদের নিয়ে যমীন ধ্বসিয়ে দিবেন না?”। অনুরূপ অপর বাণী, "তাঁর দিকেই উত্থিত হয় বাণীসমূহ, আর সৎ আমল তিনি তা উঠিয়ে নেন"। অপর বাণীতে আল্লাহ বলেন, "রহমান 'আরশের উপরে উঠেছেন", আর তাঁর 'আরশের উপর উঠার বিষয়টি 'ইস্তীলা' বা অধিকার করা বা মালিক হওয়া নয়, যেমনটি কাদরিয়া (মু'তাযিলা) সম্প্রদায় বলে থাকে। কারণ মহান আল্লাহ সর্বদা সবকিছুর ওপর কর্তৃত্বশীল"।¹
এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, এ সময় পর্যন্ত আশ'আরী মতবাদের ইমামগণ আল্লাহ তা'আলাকে সত্তাগত সর্বোচ্চ সত্তা সাব্যস্ত করতেন, তেমনিভাবে তারা তখনও আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠাকে অস্বীকার করেননি। বরং পরবর্তী আশায়েরাদের মধ্যে প্রসিদ্ধ 'ইস্তেওয়া' কে ইস্তাওলা বা অধিকার করা নামক তা'ওয়ীল বা অপব্যাখ্যা করাকে তারা অস্বীকার করতেন। তখনও তারা জানতেন যে, এভাবে 'ইস্তাওয়া' এর অর্থ 'ইস্তাওলা' বা 'অধিকার করা' এ অপব্যাখ্যা মু'তাযিলারা করে থাকে, আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ইবন মুজাহিদ রাহিমাহুল্লাহ ঠিকই এভাবে অপব্যাখ্যা করে তারা যা সাব্যস্ত করতে চাচ্ছে তার খারাপ দিকটি তুলে ধরেছেন, সেটা হচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা তো সর্বদাই সবকিছুর ওপর কর্তৃত্ববান তাহলে আবার আরশের উপরে উঠাকে 'কর্তৃত্ব করা' দ্বারা তা'ওয়ীল করা কোনোভাবেই শুদ্ধ হতে পারে না।
টিকাঃ
১. রিসালাতুন ইলা আহলিস সাগার ২৩২-২৩৪; তিনি ইমাম আবুল হাসান আল-আশ'আরীর এ গ্রন্থের বর্ণনাকারী।