📘 রহমান আরশের উপর উঠেছেন > 📄 ইবন কুতাব (২৪৫ হিজরী)

📄 ইবন কুতাব (২৪৫ হিজরী)


আব্দুল্লাহ ইবন সা'ঈদ ইবন কুল্লাব রাহimahuallah ছিলেন একজন মুনাযির, তিনি মু'তাযিলাদের সাথে মুনাযারা করতেন। কারণ তখন মু'তাযিলাদের জয়-জয়কার ছিল। মু'তাযিলারা আল্লাহ তা'আলাকে উপরে থাকা অস্বীকার করতো, তাঁর আরশের উপরে উঠাকেও অস্বীকার করতো। তখন তাদের বিরুদ্ধ ইমাম আব্দুল্লাহ ইবন সা'ঈদ ইবন কুল্লাব দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর সে অবস্থান ছিল প্রশংসনীয়। কিন্তু তিনি তাদের সাথে মুনাযারা ও বহس-মুবাহাসায় তাদের কিছু কালাম শাস্ত্রীয় নীতির যথার্থতা মেনে নিয়েছিলেন, যার কারণে আল্লাহ তা'আলার 'সিফাতে ফি'লিয়্যah 'ইখতিয়ারিয়‍্যাহ' (কর্মগত ইচ্ছাকৃত গুণ) অস্বীকার করে ফেলেছিলেন। এ সময় ইমাম আবুল হাসান আল-আশ'আরী রাহimahuallah তাঁর অনুসারী থাকার কারণে তিনিও তখন আল্লাহ তা'আলার 'সিফাতে ফি'লিয়্যah ইখতিয়ারিয়‍্যাহ অস্বীকার করতেন। ইমাম আব্দুল্লাহ ইবন সা'ঈদ ইবন কুল্লাব ও ইমাম আবুল হাসান আশ'আরী যে মত পোষণ করতেন পরবর্তীতে তা-ই আশ'আরী মতবাদ নামে সারা দুনিয়াতে প্রসারিত হয়ে যায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় কয়েকটি:
১- ইমাম আবুল হাসান আল-আশ'আরী পরবর্তীতে ইমাম আব্দুল্লাহ ইবন সা'ঈদ ইবন কুল্লাব এর অনুসরণ ছেড়ে দিয়ে খাঁটি সহীহ আকীদাহ গ্রহণ করেন। এ সময় তিনি কয়েকটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন, যাতে তাঁর মত থেকে সরে আসার ধারাবাহিকতা ও খাঁটিভাবে সহীহ আকীদাহ ও মানহাজ গ্রহণ করা প্রমাণ করে। যে কেউ তাঁর আল-উমاد, মাকালাতুল ইসলামিয়্যীন ও আল-ইবানاه ধারাবাহিকভাবে পড়বে সে সহজেই বুঝতে পারবে যে, ইমাম আশ'আরী রাহimahuallah এর সর্বশেষ আকীদাহ ছিল আল্লাহ তা'আলার সকল সত্তাগত ও কর্মগত গুণাবলি কোনো প্রকার বিকৃতি, অর্থহীনতা, তা'ওয়ীল নামক অপব্যাখ্যা, কিংবা সাদৃশ্য স্থাপন ব্যতীত স্বীকার করে নেয়া।
২- কিন্তু বর্তমান সময়ের সারা দুনিয়ার আশ'আরী মতবাদের অনুসারীরা ইমাম আবুল হাসান আল-আশ'আরীর সর্বশেষ বিশুদ্ধ মতটিকে গ্রহণ করে না। তারা ইমাম আব্দুল্লাহ ইবন সা'ঈদ ইবন কুল্লাব এর মত অনুসরণ করে থাকে। কিন্তু বাস্তবে তারা ইমাম আব্দুল্লাহ ইবন সা'ঈদ এর অনসুরণও করে না। তারা কিছু জায়গায় ইমাম ইবনু কুল্লাবের অনুসরণ করলেও কিছু ব্যাপারে ধীরে ধীরে তারা তার মত থেকে সরে গিয়ে আবার জাহমিয়্যাদের মতবাদই অনুসরণ করে, তার প্রমাণ আমরা পাই এভাবে যে, ইমাম আব্দুল্লাহ ইবন সা'ঈদ ইবন কুল্যাব আল্লাহ তা'আলার জন্য সর্বোচ্চে থাকা স্বীকার করতেন। তিনি আল্লাহ তা'আলা কোথায় এ প্রশ্ন করাকে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে জাহমিয়‍্যahদের দ্বারা তা অস্বীকার করাকে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, فرسول الله صلى الله عليه وسلم، وهو صفوة الله من خلقه، وخيرته من بريته، وأعلمهم جميعاً به، يجيز السؤال بأين، ويقوله، ويستصوب قول القائل: إنه في السماء، ويشهد له بالإيمان عند ذلك، وجهم بن صفوان وأصحابه لا يجيزون الأين زعموا، ويحيلون القول به.... "সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তিনি আল্লাহর সৃষ্টির মাঝে আল্লাহর সবচেয়ে পবিত্র ও পছন্দনীয় ব্যক্তি, সৃষ্টিকুলের মধ্যকার সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তি, সকলের চেয়ে আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী, তিনি "আল্লাহ কোথায়" এটাকে জায়েয করেছেন আর তিনি জিজ্ঞাসাও করেছেন, তাছাড়া তিনি এর উত্তরে যে বলেছিল 'তিনি আসমানের উপরে' তার উত্তরকে যথাযথ বলে সত্যায়ণও করেছিলেন, সে উত্তরদাতার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে সেটার ওপর ভিত্তি করে ঈমানের সাক্ষ্যও প্রদান করেছেন। অথচ জাহম ইবন সাফওয়ান ও তার অনুসারীরা আল্লাহ তা'আলা "কোথায়” এ প্রশ্ন করা জায়েয মনে করে না, বরং এ প্রশ্ন করা অগ্রহণযোগ্য বিবেচনা করে থাকে”. (৪৫৫)
একটু চিন্তা করলেই আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে কারা বর্তমানে 'আল্লাহ কোথায়' এ প্রশ্ন করা জায়েয মনে করে না? আর কারা এ প্রশ্ন করা জায়েয মনে করে এবং এর উত্তরে 'আল্লাহ তা'আলা উপরে' এ উত্তরকে সঠিক উত্তর বলে এবং তার জন্য ঈমানের সাক্ষ্য দেয়?
এর মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়ে যাবে, ইমাম আবু সা'ঈদ ইবন কুল্যাব কাদেরকে জাহমিয়‍্যাহ বলেছেন? তারা কারা যারা সহীহ মুসলিমে বর্ণিত, 'আল্লাহ কোথায়' এ হাদীসের প্রামাণ্যতা নিয়ে অযথা ঘোলা পানিতে মৎস শিকার করে? ইমাম আবু সা'ঈদ ইবন কুল্লাবের মত অনুযায়ী তারা কাদের অনুসারী হয়? তারা কি বাস্তবেই জাহমিয়্যাহদের অনুসারী নয়?
ভালো করে দেখুন, ইমাম আবু সা'ঈদ ইবন কুল্লাব জাহমিয়্যাদের ব্যাপারে বলেছেন, তারা আল্লাহ তা'আলার ব্যাপারে 'আইন' (কোথায়?) এটা বলা জায়েযে মনে করতো না। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যাবে বর্তমানে কারা জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের আকীদাহ ধারণ করে আছে.
এরপর ইমাম আবু সা'ঈদ ইবন কুল্লাব আরো বলেন, أولو كان خطأ كان رسول صلى الله عليه وسلم أحق بالإنكار له، وكان ينبغي أن يقول لها: لا تقولي ذلك، فتوهمين أن الله عز وجل محدود، وأنه في مكان دون مكان، ولكن قولي: إنه في كل مكان لأنه الصواب دون ما قلت. "আর যদি তা ভুল হতো তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা অস্বীকারকারী প্রধান ব্যক্তি হতেন। যদি এটা অগ্রহণযোগ্য হতো, তবে তিনি অবশ্যই বলতেন, 'হে দাসী, তুমি এটা বলো না, তোমার এটা বলার দ্বারা তো আল্লাহ তা'আলা সীমাবদ্ধ হয় যাবে, আর তাকে এক স্থান বাদে অন্য স্থানে নির্ধারণ করা হয়ে যাবে, তুমি বরং বলো, তিনি তো সব জায়গায়, কারণ সত্য সঠিক হচ্ছে যা তুমি বলেছ সেটা ব্যতীত অন্য কিছু'.” (অথচ রাসূল তা বলেননি, বরং দাসীর কথাকে সমর্থন করে গেছেন, তার ওপর ঈমানের বৈশিষ্ট্যের সাক্ষ্য প্রদান করেছেন)।
তাহলে ইমাম ইবন কুল্লাবের বক্তব্য থেকে বুঝা গেল যে, দাসীর কথার মূল্য রয়েছে, অর্থ আছে, যা জাহমিয়্যারা এ ধারণার বশবর্তী হয়ে অস্বীকার করে থাকে যে, এর মাধ্যমে আল্লাহকে সীমাবদ্ধ করা হয়, আল্লাহকে সব জায়গায় না বলে নির্দিষ্ট জায়গায় বলা হচ্ছে। তাহলে ইমাম ইবন কুল্লাবের কথাতেই বুঝা গেল যে, দাসীর কথা দ্বারা কেবল উচ্চ মর্যাদা বুঝানো হয়নি যা জাহমিয়্যারা অপব্যাখ্যা করে বলে থাকে। বরং উপরে থাকা দ্বারা এমন একটি জিনিস বুঝাচ্ছে যা জাহমিয়্যা সম্প্রদায় অস্বীকার করে থাকে যেমনটি ইবন কুল্লাব রাহimahuallah তুলে ধরেছেন.
এরপর ইবন কুল্লাব রাহimahuallah বলেন, كلا لقد أجازه رسول الله صلى الله عليه وسلم مع علمه بما فيه، وأنه أصوب الأقاويل، والأمر الذي يجب الإيمان به لقائله، ومن أجله شهد لها بالإيمان حين قالته، فكيف يكون الحق في خلاف ذلك، والكتاب ناطق به وشاهد له.... ولو لم يشهد لصحة مذهب الجماعة في هذا الفن خاصة إلا ما ذكرنا من هذه الأمور، لكان فيه ما يكفي، كيف وقد غرس في بنية الفطرة ومعارف الآدميين من ذلك ما لا شيء أبين منه ولا أوكد ؟ لأنك لا تسأل أحداً من الناس عنه، عربياً ولا عجمياً، ولا مؤمناً، ولا كافراً، فتقول: أين ربك؟ إلا قال: (في السماء) إن أفصح، أو أوما بيده، أو أشار بطرفه، إذا كان لا يفصح، لا يشير إلى غير ذلك من أرض ولا سهل ولا جبل، ولا رأينا أحداً داعياً له إلا رافعاً يديه إلى السماء، ولا وجدنا أحداً غير الجهمية يسأل عن ربه فيقول: في كل مكان، كما يقولون: وهم يدعون أنهم أفضل الناس كلهم، فتاهت العقول، وسقطت الأخبار، واهتدى جهم وحده وخمسون رجلاً معه، نعوذ بالله من مضلات الفتن "কখনও নয়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার উপরে থাকার এ সাক্ষ্যটি অনুমোদন করেছেন। তিনি ভালো করেই জেনেছেন এ সাক্ষ্যের অর্থ কী? তিনি এটাও জানতেন যে এটিই হচ্ছে সঠিক বক্তব্য, এটিই হচ্ছে এমন বিষয় যার ওপর ঈমান আনা ফরয, সেজন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাসীর ঈমানের সাক্ষ্য দিয়েছেন যখন দাসী তা বলেছে। তাহলে হক ও সত্য এর বিপরীতে কীভাবে হতে পারে? তাছাড়া কুরআন তা বলছে, এর ওপর সাক্ষ্য দিচ্ছে.... যদি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের মত বিশুদ্ধ হওয়ার পক্ষে যা আমরা উল্লেখ করেছি তাই কেবল সাক্ষ্য দিত, অন্য কোনো প্রমাণ নাও থাকতো তবুও তাতে যা এসেছে তা যথেষ্ট হতো, অথচ মানুষের স্বাভাবিক (ফিত্বরী) অস্তিত্বের সাথে, মানুষের জ্ঞানের মাঝে তা এমন স্পষ্টভাবে গেঁথে দেয়া আছে যে স্পষ্টতার থেকে স্পষ্টতা, যে তাকীদের চেয়ে তাকীদ কোনো কিছু নেই, সুতরাং সেটাকে তুমি কীভাবে অস্বীকার করবে? কারণ তুমি আরব, অনারব, ঈমানদার, কাফের, যাকেই জিজ্ঞেস কর, তোমার রব কোথায়? জবাবে সে বলবেই, "আসমানের উপরে" যদি সে কথা বলতে সক্ষম হয়, আর যদি কথা বলতে না পারে তো ইঙ্গিত করে আসমানের দিকে দেখাবে, অথবা চোখের কোণ সেদিকে তুলে ধরবে। কখনও সে উপরের দিক ব্যতীত অন্য কোনো ভূমি, পাহাড় বা সমতল ভূমিকে দেখাবে না। আর আমরা কাউকে আল্লাহকে আহ্বানকারী হিসেবে পাইনি যিনি উপরে আসমানের দিকে হাত তুলেন না। অনুরূপ আমরা জাহমিয়্যাহ ব্যতীত অপর কাউকে পাইনি যাকে তার রব কোথায় প্রশ্ন করা হলে সে বলেছে, তিনি সবজায়গায়, যেমনটি জাহমিয়্যারা বলে থাকে। অথচ এ জাহমিয়্যা সম্প্রদায়ের লোকেরা দাবি করে থাকে তারা মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, এভাবে তারা তাদের বিবেক হারিয়ে ফেলেছে, কুরআন ও হাদীসের বাণী তাদের হাত থেকে পড়ে গেছে, আর জাহমের দাবী অনুযায়ী সে ও তার পঞ্চাশজনজন সাথীই হিদায়াত পেয়ে গেছে। আল্লাহ তা'আলার কাছে আমরা পথভ্রষ্টকারী ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই."
এর দ্বারা বুঝা গেল যে, ইবুন কুল্লাব রাহimahuallah'র নিকট 'দাসীর উত্তর' (আল্লাহ আসমানের উপরে) এটি মানুষের স্বভাবজাত সত্য বিষয়, যা ফিত্বরাত নামে অভিহিত। সে স্বভাবজাত বিষয় কী?
ইবন কুল্লাব রাহimahuallah বলেন, তা হচ্ছে, যখনই কাউকে জিজ্ঞেস করা হবে, 'আল্লাহ কোথায়' তখনই সে জবাবে দাসীর জবাবটিই বলবে, অথবা হাত দিয়ে বা চোখ দিয়ে আসমানের দিকে ইঙ্গিত করবে। যমীনের দিকে নয়। এটিই সে স্বভাবজাত ফিত্বরী বিষয় যার কারণে আল্লাহ তা'আলাকে আহ্বানকারী তার হাত নিয়ে আসমানের অভিমুখী হয়।
তারপর তিনি জানালেন যে, এর বিপরীতে জাহমিয়‍্যারাই বলে থাকে, আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান.
এসব বর্ণনা থেকে এটা স্পষ্ট হলো যে, ইবন কুল্লাব রাহimahuallah আল্লাহ তা'আলার জন্য শুধু উচ্চ মর্যাদার কথা বলতেন না, অথবা শুধু শব্দগত উপরে বলতেন না যার অর্থ তাফওয়ীদ্ব নাম অর্থহীনতার মাধ্যমে বিকৃত করা হয়ে থাকে। বরং তিনি সত্তাগত উপরে থাকাকেই উদ্দেশ্য নিয়েছেন যা স্বভাবজাতভাবে মানুষের মনের কন্দরে গ্রথিত।
তারপর তিনি তাদেরকে নাস্তিকদের সাথে তুলনা করেন, যারা বলে রাব্বুল আলামীন জগত থেকে পৃথক নন, আবার তিনি অভ্যন্তরেও নন। এরপর তিনি তাদের বাণীকে সত্য বলে প্রমাণ করেন যারা বলে, রাব্বুল আলামীন সৃষ্টকুল থেকে পৃথক একক সত্তা।
এসবই প্রমাণ করে যে, ইবন কুল্লাব রাহimahuallah যিনি ইমাম আশ'আরীর উস্তাদ, তিনিও আল্লাহ তা'আলার জন্য সবকিছুর উপরে থাকা সাব্যস্ত করতেন। এর বিপরীত যারা বলতো তাদেরকে জাহমিয়্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অবশ্য বর্তমানে যারা আশ'আরী নামে নিজেদের অভিহিত করে তারা হুবহু জাহমিয়্যাদের আকীদাকেই ধারণ করে চলেছে, তাদের সে বোধটুকুও নেই.

টিকাঃ
৪৫৫. ইবনু তাইমিয়्यাহ, দার'উ তা'আরুদ্বিল আকলি ওয়ান নাক্কলি, ৬/১৯৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00