📄 মুকাতিল ইবন হাইয়ান (১৪৯/১৫০ হিজরী)
মুকাতিল ইবন হাইয়ান থেকে বর্ণিত আছে, আল্লাহর বাণী: "তিনজনের কোনো গোপন পরামর্শ হয় না, যাতে চতুর্থজন হিসেবে আল্লাহ থাকেন না." -এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন- هو على عرشه وعلمه معهم. 'আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপর, আর তাঁর ইলম তাদের সাথে'. (৩৪)
অপর বর্ণনায় বুকাইর ইবন মা'রূফ, মুক্বাতিল ইবন হাইয়ান থেকে বর্ণনা করেন, মুকাতিল বলেন, আল্লাহর বাণী: هُوَ الأَوَّلُ وَالْآخِرُ وَالظَّاهِرُ والباطنُ) "তিনিই সর্বপ্রথম, সর্বশেষ, সর্বোপরে ও সর্বনিকটে." -এর ব্যাপারে আমরা জানতে পেরেছি, هو الأول قبل كل شيء، والآخر بعد كل شيء، والظاهر فوق كل شيء، والباطن أقرب من كل شيء، وإنما يعني بالقرب بعلمه وقدرته وهو فوق عرشه، وهو بكل شيء عليم. 'তিনি সকল কিছুর পূর্বে অনাদি, সকল কিছুর পরে অনন্ত, সকল কিছুর উপরে প্রকাশিত ও সকল কিছুর অতি নিকটে। তিনি তাঁর ইলম ও কুদরাতের মাধ্যমে নিকটে অথচ তিনি তাঁর 'আরশের উপরেই রয়েছেন। তিনি সর্বব্যাপারে সর্বজ্ঞানী.' এটি বাইহাকী নিজস্ব সনদে মুকাতিল থেকে বর্ণনা করেন. (৩৪৫)
অপর বর্ণনায় তিনি 'ইস্তেওয়া' এর অর্থ করেছেন, 'আরশের উপর অবস্থান করা. (৩৪৬)
টিকাঃ
৩৪৪. মুকাতিল রাহিমاهullah দ্বাহহাক থেকে এরূপ আছার বর্ণনা করেছেন। যাহাবী, আল-'উলু, পৃ. ১০২; আরবা'ঈن, পৃ. ৬৪. নং ৪৭; আল-আরش ২/২৩৬। অনুবাদ আব্দুল্লাহ মাহমুদ।
৩৪৫. বাইহাকী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত, (২/৩৪২) নং ৯১০; যাহাবী, আল-'উলু, পৃ. ১০২-১০৩; আরবাঈن, পৃ. ৬৪, নং ৪৭; ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুযূশ, পৃ. ১২৯।
৩৪৬. ইবন আবী হাতেম (৬/১৯২৫)।
📄 ইমাম আবূ হানীফা নু‘মান ইবন সবিত রাহিমাহুল্লাহ (১৫০ হিজরী)
আবু হানীফা রাহimahuallah ঊর্ধ্ব আকাশের সুরাইয়া তারকার মতো ব্যক্তিত্ব। এ মহান ব্যক্তিত্বের রয়েছে আকীদাহ'র ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ভাষ্য। কিন্তু তার পরবর্তী অনুসারীদের মধ্যে জাহমী, মু'তাযিলী ও মাতুরিদী আকীদাহ'র প্রভাব বেশি হওয়ার কারণে তারা তাঁর অনেক ভাষ্যকে নিজেদের মত করে ব্যাখ্যা করেছে, অস্বীকার করেছে, অংশ বিশেষ বাদ দিয়ে দিয়েছে। আবার কেউ কেউ তাঁকে বিশুদ্ধ আকীদাহ থেকে ভিন্ন কিছু সাব্যস্ত করার জন্য যাবতীয় প্রচেষ্টা নিবদ্ধ করেছে। তারা তাঁর সেসব বক্তব্যের অপব্যাখ্যা করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যে বক্তব্যগুলোর মাধ্যমে তিনি কুরআন ও হাদীসের প্রকাশ্য শত শত ভাষ্য এবং তাঁর পূর্ববর্তী বিশুদ্ধ আকীদাহ-বিশ্বাসের ধারক-বাহক সাহাবায়ে কেরাম, বড় বড় তাবে'য়ীগণের মতের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে প্রদান করে সোনালী চেইনের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। এ মহান ব্যক্তিত্ব প্রকৃতই একজন সংস্কারক ছিলেন, মাযলুম, অপবাদ আরোপকৃত। আমরা এ ইমামের সেসব বক্তব্য এখানে বর্ণনা করব যা তার থেকে বিশ্বস্ত লোকেরা বর্ণনা করেছে, যা কেউ পরিবর্তন করেনি বলে আমাদের বিশ্বাস হয়েছে, যা একজন ইমামের শানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আল্লামা আবুল মা'আলী মাহমূদ শুকরী আল-আলুসী বলেন, আবু হানীফা রাহimahuallah (الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى ) এর তাফসীরে বলেছেন অর্থাৎ উপরে উঠেছেন। (৩৪৭)
আবু মুতী' হাকাম ইবন আবদুল্লাহ বালখী আল-ফিকহুল আকবার-এ বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, سألت أبا حنيفة عمن يقول : لا أعرف ربي في السماء أو في الأرض فقال: من لم يقر أن الله على العرش قد كفر لأن الله تعالى يقول الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى وعرشه فوق سبع سموات، فقلت: إنه يقول عَلَى الْعَرْشِ استوى ، ولكن لا يدري العرش في السماء أم في الأرض. فقال: إذا أنكر أنه في السماء فقد كفر. "আমি আবু হানীফাকে জিজ্ঞাসা করলাম এমন ব্যক্তি সম্পর্কে যে বলে, আমি জানি না আমার রব আসমানের উপরে না যমীনে? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি স্বীকার করলো না আল্লাহ 'আরশের উপরে, সে কুফুরী করলো। কেননা আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: “পরম করুণাময় 'আরশের উপর উঠেছেন." তাঁর 'আরশ সাত আসমানের উপরে। আমি বললাম: যদি সে বলে- তিনি 'আরশের উপরে উঠেছেন, কিন্তু জানি না 'আরশ আসমানের উপরে না যমীনে। তিনি বললেন- 'আরশ আসমানের উপরে থাকাকে যে অস্বীকার করলো, সে কুফুরী করলো." (৩৪৮)
উল্লেখ্য যে, এ বর্ণনাটি ইবন তাইমিয়্যাহ'র, ইমাম ইবনুল কাইয়্যেমের বিভিন্ন গ্রন্থে এবং ইমাম যাহাবীর আল-উলূ ও আল-'আরশ গ্রন্থে এভাবে এসেছে। তাছাড়া তা ইমাম ইবন আবিল ইযয আল-হানাফীও শারহুত তাহাওয়িয়্যাহ গ্রন্থেও তা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু বর্তমান ফিকহুল আবসাত্ব এর যে ব্যাখ্যাগ্রন্থ দেখতে পাওয়া যায় তাতে মতন, শরাহ ও হাশিয়া একসাথে লেখায় বিভ্রান্তির উৎপত্তি হয়েছে। ফলে কোনো কোনো কট্টর জাহমী হানাফী এ বর্ণনাকে অস্বীকার করতে দুঃসাহস করেছে। (৩৪৯)
অনুরূপ বর্ণনায় এসেছে, ইমাম যাহাবী বলেন, আমি আমার উস্তাদ কাযী আবু মুহাম্মাদ আল-মা'আররীকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি ইমাম আবু মুহাম্মাদ ইবন কুদামাহ আল-মাকদেসীকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমার কাছে আবু হানীফা রাহimahuallah থেকে এ সংবাদ পৌঁছেছে যে, তিনি বলেছেন, «من أنكر أن الله في السماء فقد كفر » "যে কেউ আল্লাহ তা'আলার উপরে থাকাকে অস্বীকার করবে সে কাফের হয়ে যাবে”. (৩৫০)
তদ্রূপ মোল্লা আলী আল-কারী বর্ণনা করেন, ইমাম আবু হানীফা রাহimahuallah তাঁর ওয়াসিয়্যাহ কিতাবে বর্ণনা করেন, نقر بأن الله على العرش استوى من غير أن يكون له حاجة إليه واستقرار عليه، وهو الحافظ للعرش وغير العرش، فلو كان محتاجاً لما قدر على إيجاد العالم وتدبيره كالمخلوق، ولو كان محتاجاً إلى الجلوس والقرار فقبل خلق العرش أين كان الله تعالى، فهو منزه عن ذلك علواً كبيراً "আমরা স্বীকৃতি দিই যে, আল্লাহ তা'আলা 'আরশের উপর উঠেছেন, তবে সেটার প্রতি প্রয়োজনীয়তা কিংবা সুস্থিরতার জন্য নয়, তিনিই তো 'আরশ ও 'আরশ ব্যতীত সবকিছুর সংরক্ষক। যদি তিনি মুখাপেক্ষী হতেন তাহলে জগত সৃষ্টি ও তা পরিচালনা করতে সক্ষম হতেন না, সৃষ্টির মতো। আর যদি তাঁর বসা কিংবা সুস্থির হওয়ার প্রয়োজন হতো তবে 'আরশের সৃষ্টির পূর্বে তিনি কোথায় ছিলেন? সুতরাং তিনি তা থেকে পবিত্র, অতি উঁচু.”(৩৫১)
মোল্লা আলী আল-ক্বারী রাহimahuallah আরও বলেন, اعلم أن الإمام الأعظم صنف الفقه الأكبر في حال الحياة، والوصية عند الممات» انتهى "জেনে রাখ যে, ইমামে আ'যম আল-ফিকহুল আকবার গ্রন্থটি তাঁর জীবদ্দশায় গ্রন্থিত করেছেন। অপরদিকে 'আল-ওসিয়্যাহ কিতাবটি মৃত্যুর সময় গ্রন্থিত করেছেন.” (৩৫২)
টিকাঃ
৩৪৭. গায়াতুল আমানী ফির রাদ্দি আলান নাবহানী (১/৪৬০)।
৩৪৮. আল-কিকহুল আবসাত্ব পৃ. ৪৯; শারহুল ফিকহুল আবসাত্ব লিস সামারকান্দী পৃ. ১৭।
৩৪৯. আবু হানীফা রাহimahuallah'র আকীদাকে বিকৃত করার ব্যাপারে আরও বিস্তারিত জানতে ইবন আবিল ইয এর শারহুত তাহাওয়িয়্যাহ পড়ুন, পৃ. ২৮৮; শাইখ মুহাম্মাদ নাসেরুদ্দীন আল-আলবানী, মুখতাসারুল উলু, ১৩৬-১৩৭, নং ১০৩।
৩৫০. ইবন কুদামা, ইসবাতু সিফাতিল উলু ১১৬-১১৭; ইমাম যাহাবী, আল-উলু ১০১-১০২; আল-আরश ২/২২৭ অনুবাদ, আব্দুল্লাহ মাহমূদ।
৩৫১. শারহুল ফিকহিল আকবার পৃ. ৬১; কিতাউল ওয়াসিয়্যাহ, ২৬।
৩৫২. শারহুল ফিকহিল আকবার পৃ. ১৬৯।
📄 ইমাম আবদুর রহমান আল-আওয়াযঈ (১৫৭ হিজরী)
ইমাম আবদুর রহমান আল-আওযা'ঈ হচ্ছেন, তাবে তাবে'য়ীগণের বিখ্যাত চারজন আলেমের একজন। যাদেরকে বলা হতো, মালিক; হিজাযবাসীদের ইমাম, আওযা'ঈ; শামবাসীদের ইমাম, লাইস; মিসরবাসীদের ইমাম, সাওরী; ইরাকবাসীদের ইমাম। তাঁর সময়ে যখন আল্লাহর 'আরশের উপর উঠার গুণটি অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা দিয়েছিল তখন তিনি আল্লাহর গুণের ব্যাপারে সুস্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছিলেন। যেমন,
মুহাম্মাদ ইবন শু'আইব ইবন সাবুর থেকে বর্ণিত, তিনি তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, "এক লোক ইমাম আওযা'ঈকে (আর-রহমান 'আলাল 'আরশিস্তাওয়া) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, هو على العرش كما وصف نفسه، وإني لأراك رجلا ضالا. 'তিনি তাঁর 'আরশের উপর' যেভাবে তিনি বলেছেন, আর আমি তো তোমাকে পথভ্রষ্ট ব্যক্তিই দেখতে পাচ্ছি.”(৩৫৩)
তার থেকে আরও বর্ণিত আছে তিনি বলেছেন, كنا والتابعون متوافرون، نقول: إن الله فوق عرشه، ونؤمن بما وردت به السنة من صفاته. "আমরা ও তাবে'য়ীগণ পর্যাপ্ত পরিমাণ ছিলাম। আমরা বলতাম- "আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপর এবং সুন্নাহ'য় আল্লাহর যেসব গুণ বর্ণিত হয়েছে, তার প্রতি আমরা ঈমান রাখি.” এ বক্তব্য বাইহাকী 'আল-আসমা ওয়াস-সিফাত' গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। এর রাবীগণ- ইমাম ও নির্ভরযোগ্য. (৩৫৪)
টিকাঃ
৩৫৩. তাফসীর আস-সা'লাবী (৪/২৩৯)।
৩৫৪. বাইহাকী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/৩০৪), নং ৮৬৫; ইবন বাত্তাহ, আল-ইবানah, পৃ. ২২৯; ইবন তাইমিয়্যাহ, মাজমু'উল ফাতওয়া (৫/৩৯), তিনি এর সনদ সহীহ বলেছেন; যাহাবী, সিয়ার (৭/১২০-১২১), (৮/৪০২); আল-'উলু, পৃ. ১০২; ইবনুল কাইয়্যেম, ইজতিমা'উল জুয়ুশ, ১৩১, ১৩৫; তিনি বলেন, এর সনদ সহীহ; ইবন হাজার, ফাতহুল বারী (১৩/৪০৬)।
📄 ইমাম সুফইয়ান ইবন সা‘ঈদ আস-সাওরী (১৬১ হিজরী)
সুফইয়ান ইবন সা'ঈদ আস-সাওরী, যিনি তৎকালীন সময়কার জগদ্বিখ্যাত চার ইমামের একজন। তিনি জাহমিয়্যাহ আকীদাহ'র বিরোধিতা করেন। যারা আল্লাহ তা'আলাকে সর্বত্র বলতো, তিনি তাদের বক্তব্যের প্রতিবাদ করে আল্লাহ তা'আলাকে 'আরশের উপর সাব্যস্ত করেছেন আর জাহমিয়্যাদের সন্দেহের উত্তর দিয়েছেন। قَالَ معدان: سألت سفيان الثوري عن قولهِ عزَّ وجلَّ: ﴿وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ ﴾ [الحديد: ٤] قَالَ : عِلْمُهُ. "মা'দান বলেন, আমি সুফইয়ান আস-সাওরীকে 'আর তিনি তোমাদের সাথেই আছেন যেখানেই তোমরা থাক না কেন' মহান আল্লাহর এ বাণী সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, "তাঁর জ্ঞান”. (৩৫৫)
টিকাঃ
৩৫৫. আজুররী, আশ-শরী'আহ পৃ. ২৮৯; লালেকাঈ, শারহু উসুলি ই'তিক্কাদি আহলিস সুন্নাতি ওয়াল জামা'আহ (৩/৪০১); বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত পৃ. ৫৪১; যাহাবী, আস-সিয়ার (৭/২৭৪), সহীহ সনদে, অনুরূপ আল-আরশ ২/২৩৪। অনুবাদ, আব্দুল্লাহ মাহমুদ।