📄 কুরআনের অন্যত্র ‘ইস্তেওয়া’ শব্দের অর্থ উপরে উঠা
এ হচ্ছে রাব্বুল আলামীনের 'ইস্তেওয়া'; আরবী ভাষাতে অন্যদের জন্যেও যখন এ শব্দটি عَلَى বা إِلَى যোগে ব্যবহৃত হয় তখনও তা উপরে উঠা অর্থে এসেছে। এমনকি কুরআনুল কারীমেও সেভাবে মানুষের গুণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন, ﴿فَإِذَا اسْتَوَيْتَ أَنتَ وَمَن مَّعَكَ عَلَى الْفُلْكِ فَقُل﴾ [المؤمنون: ٢٨] "অতঃপর যখন আপনি ও আপনার সাথীরা জাহাজের উপর উঠবেন তখন বলুন...". [সূরা আল-মুমিনূন, আয়াত: ২৮]
﴿لِتَسْتَوُوا عَلَى ظُهُورِهِ، ثُمَّ تَذْكُرُوا نِعْمَةَ رَبِّكُمْ إِذَا اسْتَوَيْتُمْ عَلَيْهِ﴾ [الزخرف: ١٣] "যাতে করে তোমরা তার পিঠের উপর উঠতে পার, তারপর তোমাদের রবের নি'আমতকে স্মরণ করতে পার যখন তোমরা তার উপর উঠবে..". [সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ১৩]
﴿مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ .... كَزَرْعٍ أَخْرَجَ شَطْأَهُ فَآزَرَهُ فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوَى عَلَى سُوقِهِ، يُعْجِبُ الزُّرَّاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ ﴾ [الفتح: ٢٩] "মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল; আর তার সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর, তাদের পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল; .... তাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে এমন একটি চারাগাছ, যা থেকে নির্গত হয় কচিপাতা, তারপর তা শক্ত ও পুষ্ট হয় এবং পরে কাণ্ডের উপর দাঁড়ায় দৃঢ়ভাবে যা চাষীর জন্য আনন্দদায়ক.” [সূরা আল-ফাতহ, আয়াত: ২৯] অনুরূপ আয়াতে আল্লাহ বলেন, ﴿وَاسْتَوَتْ عَلَى الْجُودِيِّ﴾ [هود: ٤٤] "আর তা জুদী পাহাড়ের উপর উঠলো.” [সূরা হুদ, আয়াত: ৪৪]
সুতরাং বুঝা গেল যে, 'ইস্তেওয়া' শব্দটি যখন عَلَى বা إِلَى যোগে ব্যবহৃত হয়, তখন উপরে উঠার অর্থই সর্বজন স্বীকৃত।
📄 সত্তা অনুসারে গুণ হয়ে থাকে
আর এটাও জানা কথা যে, স্রষ্টা ও সৃষ্টির জন্য শব্দ এক রকম ব্যবহৃত হলেই তার ধরন এক রকম হওয়া জরুরী নয়। বরং আল্লাহর জন্য উপরে উঠার বিষয়টি তাঁর সম্মান ও মর্যাদার সাথে যেভাবে সামঞ্জস্যশীল সেভাবে হবে, আর সৃষ্টির জন্য উপরে উঠার বিষয়টি তার সাথে যেভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে সেভাবে সাব্যস্ত করা হবে।
তবে মানুষের জন্য ব্যবহৃত হলেই তা আল্লাহর জন্য ব্যবহৃত হবে না বলে কেউ যেন না বলে। কারণ, আল্লাহ তা'আলা কুরআনে কারীমে এমন বহু গুণ নিজের জন্য সাব্যস্ত করেছেন, যেগুলোকে আবার তিনি বান্দার গুণ হিসেবেও সাব্যস্ত করেছেন, যেমন,
তিনি আল্লাহ নিজেকে সামী' (শ্রোতা) ও বাসীর (দ্রষ্টা) বলেছেন, [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১] অপর দিকে তিনি মানুষদেরকেও সামী' (শ্রোতা) ও বাসীর (দ্রষ্টা) বলেছেন। [সূরা আদ-দাহর, আয়াত: ০২]
তিনি আল্লাহ নিজেকে ক্বাদীর (সক্ষম) বলেছেন, [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ২০] অপর দিকে তিনি মানুষদেরকেও (সক্ষম) বলেছেন। [সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৩৪; ফাতহ, আয়াত: ২১]
তিনি নিজেকে 'হাই' (জীবিত) গুণে গুণান্বিত বলেছেন, [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ২২৫] অপরদিকে তিনি মানুষদেরকেও 'হাই' (জীবিত) গুণে গুণান্বিত করেছেন, [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৩০]
তিনি নিজেকে 'ইরাদা' (ইচ্ছা) করার গুণে গুণান্বিত করেছেন, [সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৪২; বুরুজ, আয়াত: ১৬] অপরদিকে তিনি মানুষদেরকেও 'ইরাদা' (ইচ্ছা) করার গুণে গুণান্বিত করেছেন, [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ১০৮; আন-নিসা, আয়াত: ৮৮; আন-নিসা, আয়াত: ১৪৪; আল-আনফাল, আয়াত: ৬৭; আল-কাহাফ, আয়াত: ২৮ আরও অনেক]
তিনি নিজেকে 'আলীম' (জ্ঞানী) গুণে গুণান্বিত করেছেন, [সূরা আল-বাক্বারাহ, আয়াত: ২৯] অপরদিকে সৃষ্টিকেও তিনি অনুরূপ গুণ দিয়েছেন। [সূরা আল-হিজর, আয়াত: ৫৩; আয-যারিয়াত, আয়াত: ২৮]
তিনি নিজেকে 'কালাম' (কথা বলা) গুণে গুণান্বিত করেছেন, [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৬৪] অনুরূপ তার সৃষ্টিকেও কালাম বা কথা বলার গুণে গুনান্বিত করেছেন। [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৫৩]
অনুরূপ আরও বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। আর সবার জানা বিষয় যে, আল্লাহর জন্য যেভাবে এসব গুণ সাব্যস্ত হবে মানুষের জন্য সেভাবে হবে না। আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত হবে তাঁর সম্মান ও মর্যাদা অনুযায়ী, আর মানুষের জন্য সাব্যস্ত হবে তাদের অবস্থা অনুযায়ী। প্রত্যেক সত্তা অনুযায়ী তার গুণ নির্ধারিত হয়ে থাকে। আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত হবে পূর্ণরূপে; আর মানুষের জন্য তা সাব্যস্ত হবে অপূর্ণরূপে। (১২২)
টিকাঃ
১২২. আশ-শানকীত্বী, মানহাজ ও দিরাসাত ফী আয়াতিল আসমা ওয়াস সিফাত, পৃ. ৫-৭।
📄 “ইস্তেওয়া ‘আলাল ‘আরশ’” এর ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আকীদার মৌলিক দিকসমূহ
আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন। ( الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى ) [طه: ٥] "রহমান 'আরশের উপর উঠেছেন.” [সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ০৫]
সুতরাং কোনো মানুষের ঈমান ও তাওহীদ ততক্ষণ শুদ্ধ হবে না, যতক্ষণ আল্লাহ তা'আলার জন্য এ গুণটি সাব্যস্ত না করবে। যতক্ষণ বিশ্বাস না করবে যে, তিনি স্বয়ং সত্তাগতভাবে তাঁর গুণসমেত সম্মানিত 'আরশের উপর উঠেছেন। যে 'আরশ সকল আসমান ও যমীনের উপরে, সকল সৃষ্টির উপরে, বাস্তবিক অর্থেই, কোনোরূপ রূপক অর্থে নয়। তিনি তাঁর সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা। এতে কোনো ধরন নির্ধারণ করা যাবে না, শরীর বা দেহ সাব্যস্ত করে নয়, উদাহরণ দিয়ে নয়, অপব্যাখ্যা করে নয়, অর্থহীন করে নয় এবং বিকৃতি সাধন করে নয়।
আরও বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে যে, আসমান তাঁকে বহন করে না, তাঁকে ছায়া দেয় না, তাঁকে পরিবেষ্টন করে না। 'আরশও তাঁকে বহন করে না, কুরসীরও তিনি সাহায্য নেন না, বরং তিনি তাঁর 'আরশের উপর, 'আরশকে তিনি পরিবেষ্টন করেন। তিনি 'আরশ ও তার চেয়ে নিম্ন যা কিছু আছে সবকিছু থেকে অমুখাপেক্ষী। নূরের পর্দা তাঁকে তাঁর সৃষ্টি থেকে পর্দাবৃত করে দেয় না, বরং তাঁর চেহারার আলোতে জলসে যাওয়া থেকে পর্দাসমূহ সৃষ্টিকে পর্দাবৃত করে। তিনি সৃষ্টিকে শত পর্দার পিছন থেকেও দেখেন, তাদের গোপন শলা-পরামর্শ শোনেন, ভালো কিংবা মন্দ যাই তারা করুক না কেন, আর তিনি জানেন অন্তরের অন্তঃস্থলে যা কিছু গোপন করেছে, যা কোনো অন্তর আড়াল করে রেখেছে। তিনি 'আরশের উপর থেকেই তাদের জীবন-জীবিকা নিয়ন্ত্রণ করেন, বরং সকল কিছুই তিনিই পরিচালনা করেন।
(ইস্তেওয়া 'আলাল 'আরশ) এর ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা'আতের আকীদাহ নিম্নোক্ত কয়েকটি পয়েন্টে আমরা তুলে ধরতে পারি:
১- আল্লাহ তা'আলা তিনি 'আরশের উপর উঠেছেন। এ 'উঠা' বাস্তব অর্থেই। এ ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নায় যা এসেছে তা সাব্যস্ত করেন। তারা কোনো প্রকার অর্থ বিকৃতি করে তা সাব্যস্ত করার নীতি গ্রহণ করেন না। আর অর্থ না করে কেবল শব্দের ওপর ঈমান আনা যা কারও কারও নিকট 'তাফওয়ীদ্ব' নামে পরিচিত তা তাদের নীতি নয়। বরং তা জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের মত।
২- আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠা এটি একটি 'ফি'লী সিফাত' কর্মগত গুণ যা আল্লাহর ইচ্ছা ও চাওয়ার সাথে সম্পৃক্ত। তখন যা ইচ্ছা তা করেন। তাঁর কর্মে বাধা প্রদানকারী কেউ নেই।
৩- আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠা, তাঁর সবকিছুর উপরে থাকা অতিরিক্ত আরেকটি গুণ। কারণ সবকিছুর উপরে থাকা তাঁর সত্তাগত গুণ যা মানব মনের স্বাভাবিক নীতি, বিবেকের যুক্তি, সকল জাতির ঐকমত্য দ্বারা সাব্যস্ত। কিন্তু 'আরশের উপর উঠার বিষয়টি তিনি বা তাঁর রাসূল না জানালে আমাদের জানার কোনো সুযোগ নেই।
৪- 'আরশের উপর উঠা' এ কথাটি আমরা বুঝি; কিন্তু তিনি কীভাবে 'আরশের উপর উঠলেন সেটা আমাদের কারও জানা নেই। এ জন্য সুফইয়ান আস-সাওরী, আল-আওযা'ঈ, লাইস ইবন সা'দ, সুফইয়ান ইবন 'উয়াইনাহ, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারকসহ বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহ ইমামগণ বলতেন, "أمرّوها كما جاءت بلا كيف "এ ভাষ্যগুলোকে কোনো প্রকার ধরন নির্ধারণ ব্যতীত সাব্যস্ত করে যাও.”(১২৩) এখানে লক্ষণীয় যে তারা সবাই 'ধরন নির্ধারণ ব্যতীত' কথাটি বলেছেন। সুতরাং অর্থ সাব্যস্ত যদি না করা হয় তাহলে এ 'ধরন নির্ধারণ ব্যতীত' কথাটি মূল্য থাকে না।
৫- 'আরশের উপর উঠা'র ধরন সম্পর্কে প্রশ্ন করা বিদ'আত বা নতুন বিষয়; কারণ সাহাবায়ে কেরাম এ প্রশ্নটি তুলেননি; তারা জানতেন যে, এটি গায়েবী বিষয়; আর গায়েবী বিষয়ে যতটুকু আল্লাহ জানিয়েছেন ততটুকুতেই আমাদের সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। কোনো কোনো সাহাবী, তাবে'য়ী এবং তাবে তাবে'য়ীদের স্পষ্টভাবে ধরন সম্পর্কে প্রশ্ন করাকে বিদ'আত বলা হয়েছে।
৬- 'আরশের উপর উঠা'র ধরনের প্রকৃত বিষয়টি আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিতে হবে। তবে এর অর্থ এটা নয় যে, 'আরশের উপর উঠার কোনো ধরন নেই, বরং ধরন আছে; কারণ যেকোনো কাজ ও বস্তুরই একটি ধরন আছে; কিন্তু আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠার ধরণ আল্লাহও বলেননি, তাঁর রাসূলও বলেননি, তাঁর সাহাবীগণও নির্ধারণ করে কিছু বলেননি, আর আমরা আল্লাহকেও দেখিনি, তাঁর মতোও কাউকে দেখিনি, আমাদের বিবেকের যুক্তি দ্বারা নির্ধারণ করা অসম্ভব। সুতরাং ধরন নির্ধারণ করার কোনো সুযোগ নেই। তবে অর্থ অবশ্যই জানা আছে। কারণ, সালাফগণ এর অর্থ করেছেন, স্পষ্ট করে বর্ণনা দিয়েছেন, যারা অর্থ করে না সেসব জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে লড়েছেন, বই লিখেছেন। আর এ 'ইস্তেওয়া' শব্দটি একেবারে স্পষ্ট ও প্রকাশিত আরবী শব্দ, যার অর্থ আরবী ভাষার অভিধানে পাওয়া যায়। সুতরাং অর্থ করতে হবে, অর্থ না করলে জাহমিয়্যাহ ফেরকার লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
৭- আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক 'আরশের উপর উঠার বিষয়টি কখনও মুতাশাবিহ বা অস্পষ্ট আয়াতসমূহের অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা আল্লাহর সিফাতের আয়াতগুলোর কোনোটিই মুতাশাবিহ বা অস্পষ্ট আয়াতসমূহের অন্তর্ভুক্ত নয়। সালাফে সালেহীন এগুলোর অর্থ করেছেন যা আমরা ইতোপূর্বে দেখিয়েছি।
৮- আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক 'আরশের উপর উঠার বিষয়টি কখনও সৃষ্টিকুলের কারও উঠার মতো নয়। কারণ, যেভাবে তার সত্তার অস্তিত্ব আমরা স্বীকার করি ধরণ না জেনেও, তেমনিভাবে তার গুণের ধরন না জেনেও আমরা তা মানতে বাধ্য।
৯- সবচেয়ে বড় সৃষ্টি। 'আরশ আল্লাহর বহনকারী নয়। আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং 'আরশ ও তার বাহকসহ সকল সৃষ্টির রক্ষাকারী।
১০- আল্লাহ তা'আলার 'আরশ সবকিছুর উপর। মহান আল্লাহ তাঁর 'আরশের উপরে অর্থাৎ সবকিছুর উপরে। তাঁর কাছে আমলনামা উত্থিত হয়, ফিরিশতারা উঠেন, রূহ উপরে নীত হয়, হাত তার দিকেই তোলা হয়। সুতরাং মহান আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত হবে, সত্তাগতভাবে উপরে থাকা, ক্ষমতা ও মর্যাদাগত উপরে থাকা, গুণগতভাবে উপরে থাকা।
১০- 'আরশ' শব্দের ভাষাগত দু'টি অর্থ রয়েছে, এক. কোনো কিছুর উপরস্থিত জিনিস। সকল সৃষ্টির উপরে 'আরশ। দুই. বিছানা, যার উপর অবস্থান করা হয়। এ অর্থেও আল্লাহর তা'আলার 'আরশ প্রযোজ্য।
১১- 'আরশের উপরে থাকার পরও তিনি সৃষ্টির সবকিছু সম্পর্কে জানেন, দেখেন, শুনেন, সাহায্য- সহযোগিতা করেন, তাদের কর্মকাণ্ড তিনিই পরিচালনা করেন, এটাই তাঁর সাথে থাকার অর্থ। এটিই সালাফে সালেহীন ইমামগণ অর্থ করেছেন ও ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিয়েছেন। এটা কোনো অপব্যাখ্যা নয় বা বিকৃতি নয়। এ ব্যাপারে জাহমিয়্যাহ, সর্বেশ্বরবাদী, অহংবাদী, সোহংবাদী ও হুলুলী সম্প্রদায় ব্যতীত অপর যাবতীয় ফেরকার লোকেরা আহলুস সুন্নাতের আকীদাহ'র বিরোধিতা করেনি।
১২- 'আরশের উপর থেকেও আল্লাহ তা'আলা বান্দার নিকটবর্তী হন, যেভাবে সেটা তার জন্য প্রযোজ্য। কুরআন ও হাদীসে যেখানে যেখানে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে, তা প্রকৃত অর্থেই নিকটবর্তী হওয়া। তবে তার ধরন আমাদের অজানা।
১৩- 'আরশের উপর থেকেও তিনি নিকটবর্তী আসমানে নাযিল হন, সেটার ওপর ঈমান আনতে হবে। তাঁর নাযিল বা অবতীর্ণ হওয়া প্রকৃত অর্থেই, সেটার ধরন আমাদের অজানা। এটা তার উপরে থাকাকে নিষেধ করে না। কারণ এটা আল্লাহর ব্যাপার, তাঁর সত্তার অস্তিত্ব যেভাবে ধরন না দেখে মানতে পারি, তেমনি তাঁর গুণাবলিও সেভাবে ধরন না দেখে মানতে হবে।
১৪- আসমান তাঁকে বহন করে না, তাঁকে ছায়াও দেয় না, আর আসমান তাঁকে ঘিরেও রাখতে পারে না। কোনো স্থান তাঁকে ঘিরে রাখে না বরং তিনি সবকিছুকে তাঁর জ্ঞান, ক্ষমতা ও পরিচালনা দ্বারা পরিবেষ্টন করে আছেন। সত্তাগতভাবে ঘিরে থাকা নয়, অনুরূপ সৃষ্টিও স্রষ্টার অভ্যন্তরে নয়।
১৫-'আরশ তাঁকে বহন করে না, কুরসীরও সাহায্য তাঁর লাগে না। বরং তিনিই 'আরশ, কুরসী ও সেগুলার বাহকদেরকে তাঁর কুদরতে বহন করে আছেন। তিনিই আসমানকে তাঁর বড়ত্ব দিয়ে উপরে তুলে রেখেছেন, তাকে যমীনের উপর পড়ে যাওয়া থেকে নিয়ন্ত্রণ করে আছেন। ইবন 'আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা বলেন, "যে কুরসীর অভ্যন্তরে আসমান ও যমীনের জায়গা হয় তা তাঁর দু' কদম রাখার স্থান, আর 'আরশের পরিমাণ যিনি সেটা সৃষ্টি করেছেন তিনি ব্যতীত আর কেউ জানে না। আর আসমানসমূহ আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টির উপর যেন একটি মরুভূমির উপর একটি গম্বুজ.”(১২৪)
১৬-আল্লাহ তা'আলা 'আরশের মুখাপেক্ষী হওয়া থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। কারণ, তিনি 'আস-সামাদ'। বরং সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী। সবাই ফকীর, তিনিই হচ্ছেন দাতা।
১৭- 'আরশ ও কুরসী ভিন্ন ভিন্ন জিনিস। 'আরশের সামনে কুরসী একটি স্থান, যাতে আসমান- যমীন সহ সকল সৃষ্টির জায়গা হয়। তবুও 'আরশের সামনে কুরসীর কোনো তুলনা হয় না। কুরসী 'আরশের সামনে ফেলে রাখা একটি ছোট ভূমি ব্যতীত আর কিছু নয়। আর আল্লাহর 'আরশের পরিমাণ আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানে না। মহান আল্লাহ সেখানে থেকেও তাঁর সৃষ্টির সকল অবস্থা জানেন, দেখেন। তাদের ডাক শুনেন ও তাদের প্রয়োজন পূরণ করেন।
১৮-কুরসী হচ্ছে 'আরশের সামনে থাকা মহান আল্লাহর পা রাখার স্থান, যা ইবন 'আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে। আর এটাই বিশুদ্ধ আকীদাহ যা একজন ঈমানদার পোষণ করবে, কখনও তা শুধু জ্ঞান নয়, বা শুধু রাজত্ব নয় যেমনটি ভ্রষ্ট লোকেরা বলে থাকে।
১৯-আল্লাহ তা'আলা তাঁর 'আরশের উপর কথাটি বুঝানোর জন্য বলতে হবে, তিনি তাঁর সৃষ্টি থেকে আলাদা। অর্থাৎ তিনি কখনও তাঁর সৃষ্টির কারও সাথে মিশে যাননি, কারও ভিতরে ঢুকে পড়েননি, কারও সাথে লেগে থাকেননি। সুতরাং তাঁকে সত্তাগতভাবে সব স্থানে আছে বলা কুফুরী।
২০-যে কেউ আল্লাহ তা'আলার 'আরশের উপর উঠার বিষয়টি অস্বীকার করবে, তাঁকে তাঁর সৃষ্ট আসমান ও যমীনের উপরে অবস্থিত 'আরশের উপর উঠা ও সেখানে থাকার বিষয়টি মানবে না, তাকে সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা সত্তায় সৃষ্টিকুলের বাইরে মানবে না, সে কাফির হয়ে যাবে, আল্লাহ তা'আলার লা'নতের হক্কদার হবে। কারণ, সে কুরআন ও হাদীসের ভাষ্যকে অস্বীকার করছে।
২১-আল্লাহ তা'আলার 'আরশের সামনে সৃষ্টিজগত থেকে নূরের পর্দাসমূহ রয়েছে, যার কারণে সৃষ্টি পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাচ্ছে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إِنَّ اللَّهَ لَا يَنَامُ وَلَا يَنْبَغِي لَهُ أَنْ يَنَامَ، يَرْفَعُ الْقِسْطَ وَيَخْفِضُهُ، وَيُرْفَعُ إِلَيْهِ عَمَلُ النَّهَارِ بِاللَّيْلِ، وَعَمَلُ اللَّيْلِ بِالنَّهَارِ» “নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা ঘুমান না, তাঁর জন্য ঘুম উপযোগীও নয়, পাল্লা উপরে উঠান এবং নিচে নামান (বান্দার আমল অনুযায়ী), তাঁর কাছে দিনের আমল রাতে উপস্থাপন করা হয়, আর রাতের আমল দিনে তুলে ধরা হয়। তাঁর পর্দা হচ্ছে নূরের। যদি তিনি সে পর্দা উন্মুক্ত করতেন তবে তাঁর চেহারার আলোর ঝলকানি তাঁর সৃষ্টির যতটুকুতে তাঁর চোখ পড়ত সবটুকুই পুড়ে যেত.” (১২৫)
ইবন আবী শাইবাহ বলেন, 'তাঁর সেসব পর্দা, যা দিয়ে তিনি বান্দাদের থেকে নিজেকে আলাদা রেখেছেন, তা কখনও তাঁর বান্দাদের সবচেয়ে নিম্ন যমীনে যা আছে তা দেখতে ও শুনতে তার কোনো বাধা হয় না. (১২৬)
ইবন তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তবে তাঁর পর্দাসমূহ সৃষ্টিকুলের নিকট তাঁর আলো আসতে বাধা দেয়। কারণ হাদীসে এসেছে, "তাঁর পর্দা হচ্ছে নূরের। যদি তিনি সে পর্দা উন্মুক্ত করতেন তবে তাঁর চেহারার আলোর ঝলকানি তাঁর সৃষ্টির যতটুকুতে তাঁর চোখ পড়ত সবটুকুই পুড়ে যেত”. এর অর্থ হচ্ছে, তাঁর চোখ সকল সৃষ্টিকে দেখে, কিন্তু তাঁর চেহারার আলো সেটা পর্দা দ্বারা আবৃত। (১২৭)
ইমাম দারেমী বলেন, কে এ পর্দার পরিমাণ নির্ণয় করতে পারবে যা দিয়ে মহা প্রতাপশালী রব পর্দার অন্তরালে রয়েছেন? কে বলতে পারবে সেটা কেমন? তবে তিনি সবকিছুকে তাঁর ইলম বা জ্ঞানে পরিবেষ্টন করে আছেন। "সবকিছুর সংখ্যা তিনি গুনে রেখেছেন" [সূরা আল-জিন্ন, আয়াত: ২৮] এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, তিনি সৃষ্টিকুল থেকে আলাদা, তাদের থেকে পর্দার আড়ালে। জিবরীল 'আলাইহিস সালাম আল্লাহর নৈকট্যবান ফিরিশতা হওয়া সত্ত্বেও সে পর্দার নিকটে যাওয়ার অধিকার রাখেন না. (১২৮)
ইবন 'আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু 'আনহুমা বলেন, "সবকিছু সম্পর্কে চিন্তা কর, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা সম্পর্কে চিন্তা করো না; কারণ সপ্তম আসমান ও তাঁর কুরসীর মাঝখানে হাজার নূর। আর তিনি তার উপরে.” (১২৯)
চিন্তা না করার কারণ হচ্ছে আল্লাহ সম্পর্কে চিন্তা করে কোনো কূল কিনারা করতে কেউ পারবে না। কারণ চিন্তাজগত কেবল সৃষ্টির মাঝেই কার্যকর হয়, স্রষ্টার মাঝে নয়.
টিকাঃ
১২৩. মারাসীলে আবী দাউদ, পৃ. ১৮২; আস-সিফাত লিদ দারাকুতনী, ৭১; আল-উলু পৃ. ১৫৬, সিয়ার (৮/৪৬৭); আকীদাতুস সালাফ পৃ. ৬৮; বাইহাক্বী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/১৫৮, ৩০৭)।
১২৪. সহীহ, আবদুল্লাহ ইবন ইমাম আহমাদ, ৫৮৬; ইবন খুযাইমাহ, আত-তাওহীদ (১/২৪৮); হাকিম, মুস্তাদরাক (২/২৮২), এর সনদকে আলবানী রাহিমাহুল্লাহ মুখতাসারুল উলু গ্রন্থে সহীহ বলেছেন।
১২৫. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৭৯।
১২৬. আল-'আরশ, পৃ. ২৮৯।
১২৭. মাজমূ'উল ফাতাওয়া (৬/১০)।
১২৮. দারেমী, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যা ৩১; আল-রাদ্দু আলা বিশر আল-মারিসী ৫২৬।
১২৯. এর সনদ উত্তম। আসবাহানী, আত-তারগীব ওয়াত তারহীব (২/১৭৩); আবুশ শাইখ, আল-আযামাহ, বাইহাকী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত: ৫৩০; সুয়ূত্বী, আল-জামে'উস সাগীর (১/১৩২); মানাওয়ী, ফাইদুল কাদীর (৩/২৯৩); সাখাওয়ী, আল-মাকাসিদুল হাসানাহ, ১৫৯; ইবন আবী শাইবাহ, আল-আরশ, ৩৪৩। ইমাম ইবন হাজার, ফাতহুল বারী, (১৩/৩৮২) বলেন, এর সনদ উত্তম।